চাঁদের আলোয় ভেজা রাতের বাতাসে তার চোখ দুটো যেন আমার হৃদয়ের সব তারা একসাথে জ্বালিয়ে দিল। সোরমি। নামটা শুনলেই মনে হয় কোনো কবিতার লাইন। সে দাঁড়িয়ে ছিল ধানখেতের পাশের সেই ছোট্ট বাঁশের সেতুর উপর। তার লম্বা কালো চুল বাতাসে উড়ছিল, আর সাদা শাড়ির আঁচলটা হালকা করে তার কাঁধ থেকে সরে পড়ছিল। আমি, রাহাত, কলেজের শেষ বছরের ছাত্র, সেই রাতে কেন যে সেখানে গিয়েছিলাম নিজেও জানি না। হয়তো মনের ভিতরের অশান্তি থেকে পালাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সোরমিকে দেখার পর থেকে আমার সব অশান্তি যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল।
সোরমি ছিল আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামের মেয়ে। তার বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক, আর মা গৃহিণী। সে ঢাকায় পড়ত, ইংরেজি সাহিত্যে। গ্রামে এসেছিল ছুটিতে। আমরা আগে কখনো কথা বলিনি, শুধু দূর থেকে দেখা হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু সেই রাতে, যখন সে একা একা চাঁদ দেখছিল, আমি আর থাকতে পারলাম না। পা দুটো নিজে নিজেই এগিয়ে গেল।
“কে?” — সোরমির কণ্ঠস্বরটা ভয়ে কেঁপে উঠল।
“আমি রাহাত। তোমার পাশের গ্রামের। ভয় পেয়ো না।” আমি হালকা হেসে বললাম।সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে চাঁদের আলো পড়ে ঝলমল করছিল। “রাহাত? যে ছেলেটা সবসময় বই নিয়ে ঘুরে?”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। “তুমি আমাকে চেনো?”
সোরমি হেসে উঠল। তার হাসিটা যেন ফুল ফুটিয়ে দিল চারপাশ। “গ্রামে সবাই সবাইকে চেনে। তুমি তো কবিতা লেখো, তাই না?”
সেই রাত থেকে আমাদের গল্প শুরু হল। পরের দিন সকালে আমি তার বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। সে জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাত তুলে হাসল। আমিও হাসলাম। তারপর থেকে প্রতিদিন ছোট ছোট কথা। কখনো ধানখেতের পথে, কখনো নদীর ঘাটে, কখনো বিকেলের আলোয় আমগাছের নিচে।
সোরমি বলত, “রাহাত, তুমি যখন কথা বলো, মনে হয় পুরোনো কোনো রোমান্টিক উপন্যাস পড়ছি। তোমার চোখে এমন একটা গভীরতা আছে যে আমার ভয় করে।”
আমি জবাব দিতাম, “আর তোমার হাসিতে এমন একটা আলো আছে যে আমার সব অন্ধকার দূর হয়ে যায়।”
দিনগুলো কাটছিল স্বপ্নের মতো। আমরা একসাথে নদীর ধারে হাঁটতাম। সোরমি তার প্রিয় কবিতা শোনাত—জীবনানন্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথ। আমি তাকে আমার লেখা কবিতা পড়ে শোনাতাম। একদিন বিকেলে বৃষ্টি নামল। আমরা একটা পুরোনো আমগাছের নিচে আশ্রয় নিলাম। বৃষ্টির ফোঁটা তার চুলে পড়ছিল। আমি তার চুল থেকে একটা ফোঁটা মুছে দিতে গিয়ে তার হাতটা ধরে ফেললাম।
সোরমি লজ্জায় মাথা নিচু করল, কিন্তু হাত সরাল না। “রাহাত, এটা কি ঠিক হচ্ছে?”
“ভালোবাসা কখনো ভুল হয় না, সোরমি।” আমি ফিসফিস করে বললাম।
সেই মুহূর্তে আমাদের প্রথম চুমু হল। বৃষ্টির শব্দের মাঝে, আমগাছের পাতার আড়ালে। তার ঠোঁট ছিল নরম, মিষ্টি। যেন সারা জীবনের অপেক্ষা শেষ হয়ে গেল এক নিমেষে।
কিন্তু রোমান্সের গল্পে শুধু সুখ থাকে না। সোরমির বাবা চাইতেন না আমার সাথে তার সম্পর্ক। কারণ আমি সাধারণ ঘরের ছেলে, আর তারা একটু অবস্থাসম্পন্ন। সোরমি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “রাহাত, বাবা বলেছে ঢাকায় ফিরে যেতে। আমি যেতে চাই না।”
আমি তার হাত ধরে বললাম, “আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। চলো, আমরা একসাথে লড়াই করি।”
সেই রাতে আমরা পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। না, পুরোপুরি পালিয়ে নয়। আমি সোরমির বাবার সাথে কথা বলব বলে ঠিক করলাম। পরের দিন সকালে আমি তার বাড়িতে গেলাম। সোরমি জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল, চোখে ভয় আর আশা মিশে।
তার বাবা প্রথমে রেগে গেলেন। কিন্তু যখন আমি আমার ভালোবাসার কথা বললাম, যখন বললাম আমি সোরমিকে সুখী করব, তাকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সাহায্য করব—তখন তিনি একটু নরম হলেন। “ছেলে, ভালোবাসা সহজ নয়। অনেক পরীক্ষা দিতে হয়।”
সোরমি তার বাবার পায়ে পড়ে কাঁদল। “বাবা, রাহাত ছাড়া আমি বাঁচব না।”
শেষ পর্যন্ত তার বাবা রাজি হলেন, কিন্তু শর্ত দিলেন—আমাকে প্রথমে চাকরি করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম।তারপরের দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতো। সোরমি ঢাকায় ফিরে গেল, কিন্তু প্রতিদিন ফোনে কথা হতো। আমি গ্রামে থেকে পড়াশোনা শেষ করলাম এবং চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিলাম। ছুটিতে সোরমি এলে আমরা একসাথে সময় কাটাতাম। কখনো নদীর ঘাটে বসে গান গাইতাম, কখনো তার হাত ধরে হাঁটতাম চাঁদের আলোয়।
একবার আমরা ঢাকায় গেলাম একসাথে। সোরমি আমাকে তার কলেজ ক্যাম্পাস দেখাল। সেখানে একটা বেঞ্চে বসে সে বলল, “রাহাত, তুমি না থাকলে আমার জীবন অন্ধকার হয়ে যেত। তুমি আমার আলো।”আমি তার কপালে চুমু খেয়ে বললাম, “আর তুমি আমার সবকিছু, সোরমি।”
বছরখানেক পর আমি একটা ভালো চাকরি পেলাম ঢাকায়। তারপর আমরা বিয়ে করলাম। ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান। সোরমি লাল বেনারসি পরে এসেছিল। তার চোখে সেই একই আলো, যেদিন প্রথম দেখেছিলাম।
বিয়ের পর আমাদের জীবনটা পূর্ণতা পেল। সকালে তার হাতের চা খেতে খেতে আমরা কথা বলতাম। রাতে জড়িয়ে শুয়ে তার চুলে হাত বুলাতাম। সোরমি বলত, “রাহাত, তুমি আমাকে যেভাবে ভালোবাসো, সেটা কোনো গল্পের চেয়েও সুন্দর।”
আমি জবাব দিতাম, “কারণ তুমি আমার গল্পের নায়িকা, সোরমি। চিরকালের।”
তাদের জীবনে ছোট ছোট ঝগড়া হতো, কিন্তু প্রতিবারই ভালোবাসা জয়ী হতো। একদিন সোরমি গর্ভবতী হল। আমি তার পেটে হাত রেখে বললাম, “আমাদের ছোট্ট স্বপ্ন আসছে।”
সন্তান জন্ম নেওয়ার পর সোরমি আরও সুন্দর হয়ে উঠল। আমরা তিনজনে হাঁটতাম পার্কে, হাসতাম, গল্প করতাম। সোরমি তার ছেলেকে কোলে নিয়ে বলত, “দেখো রাহাত, আমাদের ভালোবাসার ফল।”
বছরের পর বছর কেটে গেল। কিন্তু আমাদের ভালোবাসা কখনো কমল না। বুড়ো বয়সেও আমরা হাত ধরে সেই একই নদীর ধারে বসতাম। সোরমি আমার কাঁধে মাথা রেখে বলত, “রাহাত, সেই প্রথম রাতের চাঁদটা আজও একই রকম আছে।”আমি তার চুলে চুমু খেয়ে বলতাম, “কিন্তু তোমার সৌন্দর্য আরও বেড়েছে, আমার সোরমি।”
এভাবেই তাদের রোমান্টিক জীবন চলতে থাকল, চাঁদের আলোয়, ভালোবাসার গানে, আর অফুরন্ত আবেগে।
....