হৃদয় জুড়ে তুমি

একটি মৃদু বাতাসের স্পর্শে যেন তার চোখের তারায় ফুটে উঠলো চাঁদের আলোর মতো নরম আলো, আর জেবার হৃদয়ে প্রথমবারের মতো জেগে উঠলো এক অচেনা সুরের মূর্ছনা।

kxz

জেবা ছিল ঢাকার একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা। তার চুলগুলো ছিল কালো সিল্কের মতো, আর চোখ দুটোতে ছিল গভীর কোনো স্বপ্নের ছায়া। বয়স চব্বিশ। সে একটা ছোট প্রাইভেট ফার্মে মার্কেটিংয়ের কাজ করতো। জীবনটা তার কাছে ছিল একটা রুটিন—অফিস, বাসা, বই পড়া আর মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে কফি। কিন্তু তার ভেতরে ছিল একটা অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, যেন কোনো এক রোমান্টিক গানের অপেক্ষায় থাকা একটা হারানো সুর।

সেদিনটা ছিল বৃষ্টির। ঢাকার আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। অফিস থেকে ফেরার পথে জেবা ভিজে গিয়েছিল। তার হাতে একটা ছোট ছাতা ছিল, কিন্তু বাতাসের জোরে সেটা কাজে আসেনি। ভিজে চুলগুলো তার কপালে লেপটে ছিল। সে দৌড়ে একটা বাস স্টপের আশ্রয়ে গিয়ে দাঁড়ালো। সেখানে আরেকজন ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। লম্বা, ফর্সা, চশমা পরা। তার নাম ছিল আরিফ।

kx/춺'

“ভিজে গেছেন তো অনেক।” আরিফ হাসলো। তার হাসিতে ছিল একটা উষ্ণতা যা বৃষ্টির ঠান্ডায়ও গরম লাগছিল।

জেবা লজ্জায় মাথা নিচু করলো। “হ্যাঁ, ছাতাটা কাজে লাগলো না।”

“আমার ছাতাটা বড়। চলুন, শেয়ার করি। কোথায় যাবেন?”

সেই প্রথম দেখা। আরিফের সাথে জেবার কথা শুরু হলো বাস স্টপে, চলতে চলতে বাসে, আর তারপর একটা ছোট কফি শপে। আরিফ ছিল একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তার কথায় ছিল গভীরতা, চোখে ছিল স্বপ্ন। সে বললো, “জীবনটা শুধু কাজ আর ঘুম নয়। এতে রোমান্সও থাকা উচিত। একটা গান, একটা বই, আর একটা হাসি।”

জেবা হাসলো। তার হাসিতে ছিল লজ্জা আর আনন্দের মিশেল। সেই রাতে বাসায় ফিরে জেবা প্রথমবারের মতো তার ডায়েরিতে লিখলো: “আজ একটা অচেনা ছেলের সাথে কথা বললাম। তার চোখ দেখে মনে হলো, যেন আমার হারানো কোনো অংশ খুঁজে পেয়েছি।”

দিনগুলো কাটতে লাগলো। আরিফ আর জেবার মধ্যে মেসেজ আদান-প্রদান শুরু হলো। প্রথমে শুধু “কেমন আছো”, তারপর “আজকের বৃষ্টি মনে পড়ছে”, তারপর কবিতা শেয়ার করা। জেবা জানতে পারলো আরিফ ভালোবাসে পুরনো বাংলা গান, বিশেষ করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের। আর জেবা বললো সে ভালোবাসে রবীন্দ্রনাথের কবিতা।

একদিন আরিফ বললো, “চলো, সন্ধ্যায় লেকে যাই।” জেবা রাজি হলো। মিরপুরের লেকের ধারে তারা হাঁটছিল। চারপাশে লাল-হলুদ আলো জ্বলছিল। বাতাসে ছিল ফুলের গন্ধ। আরিফ হঠাৎ জেবার হাতটা ধরলো। জেবার হৃদয়টা দ্রুত চলতে শুরু করলো।

“জেবা, তোমার সাথে কথা বলতে বলতে মনে হয় সময় থেমে যায়।” আরিফের গলায় ছিল আবেগ।

জেবা চোখ নামিয়ে বললো, “আমারও।”

সেই রাতে তারা প্রথম চুমু খেলো। লেকের এক কোণে, চাঁদের আলোয়। জেবার ঠোঁটে ছিল মিষ্টি ভয় আর আনন্দ। আরিফের বুকে মাথা রেখে জেবা ভাবলো, এটাই তো সেই রোমান্স যার জন্য সে অপেক্ষা করছিল।

কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না। জেবার পরিবার ছিল রক্ষণশীল। তার বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে, মা গৃহিণী। তারা চাইতো জেবা বিয়ে করুক কোনো ভালো ছেলের সাথে যে তাদের পরিচিত। আরিফের পরিবারও ছিল একইরকম। দুজনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠতে উঠতে সমস্যা শুরু হলো।

একদিন জেবার মা দেখে ফেললো তার ফোনে আরিফের মেসেজ। “এটা কে?” মায়ের প্রশ্নে জেবা চুপ করে গেলো। তারপর সব খুলে বললো। মা রেগে গেলো। “তুমি কি পাগল হয়েছ? আমরা কি তোমার জন্য ছেলে খুঁজছি না?”

জেবা কাঁদলো। কিন্তু তার ভেতরে ছিল একটা দৃঢ়তা। সে আরিফকে ফোন করে বললো, “আমি তোমাকে ছাড়তে পারবো না।”

আরিফ বললো, “আমিও না। চলো, আমরা একসাথে লড়বো।”

তারপর শুরু হলো তাদের সংগ্রাম। জেবা অফিসে যেতো, কিন্তু বাসায় ফিরে মায়ের চাপ সামলাতো। আরিফ তার পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করতো। একদিন তারা দুজনে পালিয়ে গেলো না, বরং সিদ্ধান্ত নিলো ধৈর্য ধরবে।

এক বছর কেটে গেলো। এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটলো। জেবা একবার অসুস্থ হয়ে পড়লো। আরিফ রাত জেগে তার দেখাশোনা করলো হাসপাতালে। জেবা কাঁদতে কাঁদতে বললো, “তুমি না থাকলে আমি কী করতাম?”

আরিফ তার কপালে চুমু দিয়ে বললো, “আমি সবসময় থাকবো।”

অবশেষে জেবার বাবা-মা বুঝলেন। আরিফের পরিবারও রাজি হলো। বিয়ের দিনটা ছিল স্বপ্নের মতো। জেবা লাল বেনারসিতে সেজেছিল। তার চোখে ছিল আনন্দের অশ্রু। আরিফ তার হাত ধরে বললো, “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গান।”

বিয়ের পর তারা ছোট একটা ফ্ল্যাট নিলো। জীবনটা ছিল সাধারণ কিন্তু ভরপুর রোমান্সে। সকালে আরিফ জেবাকে চা বানিয়ে দিতো। জেবা তার জন্য লাঞ্চ বক্স তৈরি করতো। সন্ধ্যায় তারা বারান্দায় বসে গল্প করতো। রাতে জেবা আরিফের বুকে মাথা রেখে ঘুমাতো।

কিন্তু রোমান্স শুধু সুখের নয়। একদিন আরিফের চাকরিতে সমস্যা হলো। কোম্পানি লে-অফ করলো। জেবা তখন তার পাশে দাঁড়ালো। সে বললো, “চিন্তা করো না। আমরা একসাথে নতুন শুরু করবো।”

জেবা তার জব ছেড়ে দিয়ে একটা ছোট অনলাইন বিজনেস শুরু করলো—হ্যান্ডমেড জুয়েলারি। আরিফ নতুন চাকরি খুঁজতে লাগলো। দিনগুলো কঠিন ছিল, কিন্তু তাদের ভালোবাসা আরও গভীর হলো।

দুই বছর পর আরিফ নতুন চাকরি পেলো। জেবার বিজনেসও ভালো চলছিল। তারা একটা ছোট বাড়ি কিনলো। আর তারপর এলো তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহার—একটা মেয়ে। নাম রাখলেন ‘আরজু’।

জেবা মা হয়ে আরও সুন্দর হয়ে উঠলো। আরিফ প্রতি রাতে মেয়েকে ঘুম পাড়াতো আর জেবাকে বলতো, “তুমি আমার সব।”

বছর গড়িয়ে যেতে লাগলো। জেবা আর আরিফ বুড়ো হয়ে গেলো, কিন্তু তাদের ভালোবাসা কখনো কমলো না। তারা প্রতি বছর সেই লেকে যেতো যেখানে প্রথম চুমু খেয়েছিল। জেবা হাত ধরে বলতো, “এখনো তোমার চোখে সেই একই আলো দেখি।”

আরিফ হেসে বলতো, “আর আমি তোমার হাসিতে সেই প্রথম দিনের জেবাকে দেখি।”

 

....
👁 187