প্রথম চোখের আলো

একটা বড় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। বর্ষাকাল। আকাশটা সারাদিন মেঘলা, মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টি। বিজ্ঞান অনুষদের তৃতীয় তলায় লাইব্রেরির জানালার পাশে বসে আরিফ বইয়ের পাতায় চোখ রেখেছিল। কিন্তু তার মন ছিল অন্য কোথাও।

kxz

আরিফ, ২১ বছর বয়স। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। শান্ত, একটু লাজুক ধরনের। বন্ধুরা বলতো, “তুই তো কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকাস না রে!” কিন্তু সেটা আর সত্যি ছিল না। কারণ গত দুই মাস ধরে তার চোখ একটা মেয়ের পিছনে আটকে গিয়েছে।

তার নাম নাফিসা

kx/춺'

নাফিসা ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। লম্বা চুল, হালকা ফর্সা গায়ের রং, চোখে সবসময় একটা স্বপ্নিল দৃষ্টি। সে হাসলে পুরো ক্যাম্পাস যেন আলো হয়ে যায়। আরিফ প্রথম তাকে দেখেছিল ক্যান্টিনে। সে একা বসে কফি খাচ্ছিল আর বই পড়ছিল। সেই থেকে আরিফের হৃদয়ে একটা অদ্ভুত ঝড় শুরু হয়েছে।

একদিন লাইব্রেরিতে আরিফের পাশের টেবিলে নাফিসা এসে বসল। আরিফের হাত কাঁপছিল। সে কলমটা ফেলে দিল। নাফিসা মুখ তুলে হেসে বলল,

“কী হয়েছে? নার্ভাস লাগছে?”

আরিফ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। “না... মানে... হ্যাঁ, একটু।”

নাফিসা আবার হাসল। “আমি নাফিসা। ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট। তুমি?”

“আরিফ... সিএসই।”

সেই ছোট্ট কথোপকথন থেকে শুরু। ধীরে ধীরে তারা দুজনের মধ্যে কথা বাড়তে থাকল। প্রথমে লাইব্রেরিতে, তারপর ক্যাম্পাসের বাগানে, তারপর কখনো কখনো ক্যাফেতে। আরিফ বুঝতে পারছিল না এটা তার প্রথম ক্রাশ নাকি কিছু বেশি। কিন্তু প্রতিদিন নাফিসার সাথে দেখা না হলে তার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগত।

এক বর্ষার সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়ে তারা দুজন বসেছিল। বৃষ্টি পড়ছিল হালকা হালকা। নাফিসা তার ছাতাটা আরিফের মাথায় ধরে বলল,

“তুমি খুব চুপচাপ কেন থাকো সবসময়?”

আরিফ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কারণ... আমি যা বলতে চাই, সেটা বলতে ভয় লাগে।”

নাফিসা তার দিকে তাকাল। “কী বলতে চাও?”

আরিফের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। সে অনেক কষ্টে বলল, “নাফিসা... আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে পছন্দ করি। প্রথম যেদিন তোমাকে দেখেছি, সেদিন থেকে আমার দিনগুলো বদলে গেছে। তুমি না থাকলে আমার সবকিছু ফাঁকা লাগে।”

নাফিসা চুপ করে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর ধীরে ধীরে হাসল। তার চোখে পানি চিকচিক করছিল।

“আরিফ... আমিও তোমাকে অনেকদিন ধরে লক্ষ্য করছিলাম। তুমি যেভাবে লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে থাকো, সেটা আমার খুব ভালো লাগে। আমিও তোমাকে পছন্দ করি।”

সেই মুহূর্তে বৃষ্টিটা যেন আরও জোরে পড়তে শুরু করল। কিন্তু দুজনের মধ্যে যে উষ্ণতা তৈরি হয়েছিল, সেটা কোনো বৃষ্টিতে ভেজেনি। আরিফ সাহস করে নাফিসার হাতটা ধরল। নাফিসা হাত সরিয়ে নেয়নি।

তারপর থেকে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হতে লাগল। তারা একসাথে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ধানমন্ডি লেকে ঘুরতে যেত। নাফিসা আরিফকে তার লেখা কবিতা শোনাত। আরিফ নাফিসাকে কোডিং শেখাতো। দুজনের মধ্যে ছোট ছোট ঝগড়া হতো, আবার মিটে যেত একটা হাসিতে।

কিন্তু জীবন তো সবসময় সোজা পথে চলে না।

নাফিসার বাবা ছিলেন একজন কড়া মানুষ। তিনি চাইতেন না তার মেয়ে কোনো ছেলের সাথে ঘুরুক। একদিন তিনি জেনে গেলেন আরিফের কথা। নাফিসাকে বাড়িতে আটকে রাখলেন। আরিফের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন।

আরিফের দিনগুলো অন্ধকার হয়ে গেল। সে ক্লাসে যেত না, খেত না, শুধু নাফিসার কথা ভাবত। একদিন রাতে সে নাফিসাকে মেসেজ করল:

“আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। যদি তুমি চাও, আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলব।”

নাফিসা উত্তর দিল: “আমিও তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না আরিফ। কিন্তু বাবা খুব রাগী।”

অবশেষে আরিফ সাহস করে নাফিসার বাড়িতে গেল। নাফিসার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল,

“স্যার, আমি নাফিসাকে সত্যিকারের ভালোবাসি। আমি তাকে কখনো কষ্ট দিব না। আমি পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করব। আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমি আপনার মেয়েকে সুখী করার চেষ্টা করব।”

নাফিসার বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ছেলে, ভালোবাসা সহজ কথা না। কিন্তু তোমার চোখে যে সততা দেখছি, সেটা আমাকে ভাবিয়েছে। ঠিক আছে, কিন্তু পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো অতিরিক্ত কথা চলবে না।”

সেই দিন থেকে তাদের সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।

দুই বছর পর...

আরিফ গ্র্যাজুয়েশন করে একটা ভালো সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে। নাফিসাও পড়াশোনা শেষ করেছে। এক সন্ধ্যায় ধানমন্ডি লেকের সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আরিফ নাফিসার হাতে একটা ছোট্ট রিং পরিয়ে দিয়ে বলল,

“নাফিসা, তুমি আমার প্রথম ক্রাশ, প্রথম ভালোবাসা, আর শেষ ভালোবাসা। তুমি কি আমার সাথে সারাজীবন থাকবে?”

নাফিসার চোখে জল। সে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ... হ্যাঁ আরিফ। আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”

তাদের চারপাশে বর্ষার হালকা বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছিল। কিন্তু এবার সেটা আনন্দের বৃষ্টি।

গল্প শেষ।

....
👁 423