আরিয়ান হাঁটছিল। বয়স আটাশ। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন, চোখে চশমা। একটা আইটি কোম্পানিতে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে চাকরি করে। আজ অফিস থেকে বেরিয়ে বাস মিস হয়ে গেছে। বন্ধুর বাসায় ঘুরে ফিরছিল। হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল জীবনটা কত একঘেয়ে। প্রতিদিন অফিস, কোডিং, খাওয়া, ঘুম। কোনো রোমাঞ্চ নেই, কোনো নতুনত্ব নেই।
হঠাৎ আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল। প্রথমে ফোঁটা ফোঁটা, তারপর ঝেঁপে। আরিয়ান দৌড়ে একটা বড় বটগাছের নিচে আশ্রয় নিল। গাছের নিচে ইতিমধ্যে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সাদা সালোয়ার কামিজ বৃষ্টিতে ভিজে আধা-স্বচ্ছ হয়ে গেছে। লম্বা কালো চুল কাঁধের উপর এলোমেলো। হাতে একটা ছোট ব্যাগ, ভেতর থেকে কয়েকটা বই উঁকি দিচ্ছে।
“এখানে দাঁড়াতে পারি?” আরিয়ান নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল।
মেয়েটি চমকে উঠে তাকাল। তার চোখ দুটো বড় বড়, গাঢ় কালো, যেন গভীর কোনো সমুদ্র। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “হ্যাঁ… দাঁড়ান।”
বৃষ্টির শব্দ ছাড়া প্রথম কয়েক মিনিট কোনো কথা হলো না। আরিয়ান লক্ষ্য করল মেয়েটির হাত কাঁপছে একটু। হয়তো ঠান্ডায়।
“আপনার ছাতা নেই?” আরিয়ান জিজ্ঞাসা করল।
“ভুলে ফেলে এসেছি।” মেয়েটি হালকা হাসল। তার হাসিতে একটা ক্লান্তি মেশানো সৌন্দর্য।
“আমিও। আজ সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।”
কথা শুরু হলো। প্রথমে আবহাওয়া নিয়ে, তারপর রাস্তার অবস্থা নিয়ে। মেয়েটি বলল তার নাম মায়া। বয়স চব্বিশ। সাভারের একটা কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ায়। আরিয়ানও বলল তার নাম আর তার চাকরির কথা।
বৃষ্টি যখন একটু কমল, তখনও তারা দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। মায়া বলল, “আমি প্রায়ই এই রাস্তা দিয়ে হাঁটি। শহরের ভিড় থেকে একটু দূরে থাকতে ভালো লাগে।”
“আমিও। আজ প্রথমবার এই রাস্তায় হাঁটছি। মনে হচ্ছে ভালোই করেছি।” আরিয়ান হাসতে হাসতে বলল।
মায়ার চোখে একটা কৌতূহল জ্বলে উঠল। “কেন? কী এমন ভালো লাগল?”
“আপনার সাথে কথা বলতে পারছি। অচেনা একজনের সাথে এত সহজে কথা বলা যায়, এটা আশ্চর্যজনক।”
মায়া লজ্জায় একটু মাথা নিচু করল। “আমারও তাই মনে হচ্ছে। সাধারণত আমি কারো সাথে এত কথা বলি না।”
বৃষ্টি থেমে গেল। দুজনে হাঁটতে শুরু করল একসাথে। রাস্তা ফাঁকা। শুধু তাদের পায়ের শব্দ, মাঝে মাঝে পাখির ডাক আর দূরের গাড়ির আওয়াজ।
তারা কথা বলতে বলতে হাঁটছিল। মায়া তার ছোটবেলার কথা বলল — গ্রামের বাড়ি, বাবা-মা’র কথা, কলেজে পড়ার সময়ের স্বপ্ন। আরিয়ান বলল তার একাকীত্বের কথা, কীভাবে শহরে এসে সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হয়।
রাস্তার একটা মোড়ে এসে তারা থামল। সামনে দুটো রাস্তা।
মায়া বলল, “এখানে আমার রাস্তা আলাদা। আমি ডান দিকে যাব।”
আরিয়ানের বুকের ভিতরটা কেমন খালি হয়ে গেল। “আবার দেখা হবে কি?”
মায়া তার চোখে চোখ রেখে হাসল। “ভাগ্য যদি চায়… হয়তো।”
সে চলে গেল। আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। তার মনে হলো এই সন্ধ্যাটা তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সন্ধ্যা হয়ে উঠেছে।
সেই রাতের পর আরিয়ানের ঘুম আসছিল না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বারবার মায়ার সেই বড় বড় চোখ, তার হাসি, তার গলার সুর মনে পড়ছিল। কয়েক ঘণ্টার পরিচয়, অথচ মনে হচ্ছিল যেন কতদিনের চেনা। পরের দিন অফিসে গিয়েও তার মন বসছিল না। কোড লিখতে লিখতে হঠাৎ হাত থেমে যাচ্ছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল — মায়া এখন কী করছে? সে কি আর কখনো সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটবে?
তিন দিন কেটে গেল। আরিয়ান প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই পুরনো রাস্তায় হাঁটতে যেত। কখনো বৃষ্টি, কখনো শুধু হাওয়া। কিন্তু মায়াকে দেখা গেল না। চতুর্থ দিন সন্ধ্যায় যখন সে হতাশ হয়ে ফিরছিল, তখন হঠাৎ দূর থেকে একটা পরিচিত ছায়া দেখতে পেল।
মায়া। সাদা সালোয়ারের উপর হালকা নীল ওড়না। হাতে বইয়ের ব্যাগ। সে-ও হাঁটছিল, মাথা নিচু করে।
আরিয়ানের হৃদয়টা লাফিয়ে উঠল। সে দ্রুত পা চালাল। “মায়া!”
মায়া চমকে মুখ তুলল। তার চোখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর একটা উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। “আরিয়ান? আপনি এখানে?”
“হ্যাঁ… আসলে এই কয়েকদিন প্রতিদিন আসছি। আপনাকে আবার দেখার আশায়।” আরিয়ান লজ্জা পেয়ে স্বীকার করল।
মায়া একটু লাল হয়ে গেল। “আমিও… মানে, ভেবেছিলাম হয়তো আর দেখা হবে না। কিন্তু আজ মনে হলো একটু হেঁটে আসি।”
দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। এবার আর অচেনা নয়। কথা অনেক সহজে বয়ে যাচ্ছিল। মায়া বলল তার কলেজের কথা — ছাত্রছাত্রীদের সাথে ক্লাস, কীভাবে সাহিত্যের মাধ্যমে তাদের মনে স্বপ্ন জাগাতে চায়। আরিয়ান বলল তার কাজের কথা, কীভাবে কোড লিখতে লিখতে সময় কেটে যায়, কিন্তু ভেতরে একটা শূন্যতা থেকে যায়।
রাস্তার পাশে একটা ছোট চায়ের দোকান পড়ল। আরিয়ান বলল, “এক কাপ চা খাবেন?”
মায়া একটু ইতস্তত করল, তারপর হাসি দিয়ে রাজি হলো। দোকানের বেঞ্চে বসে তারা চা খেতে খেতে আরও গভীর কথা বলতে লাগল। মায়া বলল তার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে, মা একা সংসার সামলান। সে নিজে চায় একদিন লেখক হতে, কিন্তু ভয় হয় — হয়তো তার লেখা কেউ পড়বে না। আরিয়ান তাকে উৎসাহ দিল, “আপনার কথা শুনেই তো মনে হয় আপনি অনেক সুন্দর করে লিখতে পারবেন। একদিন আমাকে আপনার লেখা পড়াবেন?”
মায়া হাসল। “যদি আপনি প্রমিস করেন সমালোচনা করবেন না।”
“কখনো না। শুধু প্রশংসা।”
চা শেষ করে তারা আবার হাঁটতে শুরু করল। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এসেছে। আকাশে তারা ফুটছে। মায়া হঠাৎ থেমে একটা ফুল তুলল রাস্তার পাশ থেকে। “দেখুন, এই ফুলটা কত সুন্দর। শহরে এমন ফুল দেখা যায় না।”
আরিয়ান ফুলটা নিয়ে তার চুলের খাঁজে গুঁজে দিল। মায়া চোখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু তার ঠোঁটে হাসি লুকিয়ে রইল।
সেই রাতে বিদায় নেওয়ার সময় আরিয়ান বলল, “আপনার নাম্বারটা দিতে পারবেন? যদি কখনো কথা বলতে ইচ্ছা হয়…”
মায়া এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে তার ফোন বের করল। নাম্বার এক্সচেঞ্জ হলো।
পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের মধ্যে কথা চলতে লাগল। প্রথমে মেসেজ, তারপর কল। রাতে ঘুমানোর আগে দুজনেরই অভ্যাস হয়ে গেল একে অপরের সাথে কথা বলা। মায়া আরিয়ানকে তার কবিতা শোনাত, আরিয়ান তাকে তার প্রোগ্রামিংয়ের ছোট ছোট গল্প শোনাত।
একদিন সপ্তাহান্তে মায়া বলল, “আজকে একটা বইমেলা চলছে সাভারে। যাবেন?”
আরিয়ান রাজি। সেদিন তারা বইমেলায় ঘুরল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মায়া বইয়ের স্তূপের মধ্যে হারিয়ে যেত। আরিয়ান তার পছন্দের বই কিনে দিল। একটা কবিতার বই আর একটা রোমান্টিক উপন্যাস। মায়া লজ্জায় বলল, “আপনি এত করছেন কেন?”
“কারণ আপনার সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে।”
বইমেলা থেকে বেরিয়ে তারা একটা নির্জন পার্কে গেল। সেখানে বসে সূর্যাস্ত দেখল। আকাশ লাল হয়ে গেল। মায়া আরিয়ানের কাঁধে মাথা রাখল একটু। “আরিয়ান, আমার মনে হয় আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে চিনি।”
আরিয়ান তার হাত ধরল। “আমিও। মনে হয় এই রাস্তাটাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।”
তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে গভীর হতে লাগল। কিন্তু সমস্যাও এল। মায়ার মা চান তাকে গ্রামের বাড়িতে বিয়ে দিতে। আরিয়ানের অফিসে প্রমোশনের জন্য অনেক চাপ, রাত জেগে কাজ করতে হয়। কখনো কখনো দুজনের দেখা হয় না কয়েকদিন।
একদিন বৃষ্টির রাতে মায়া ফোন করে কাঁদল। “আমার মা বলছে পরের মাসে পাত্র দেখবে। আমি কী করব আরিয়ান?”
আরিয়ান বলল, “আমি তোমার কাছে আসছি।”
সেই রাতে সে মায়ার বাড়ির কাছে গেল। বৃষ্টির মধ্যে তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলল। মায়া কাঁদতে কাঁদতে আরিয়ানের বুকে মাথা রাখল। আরিয়ান তাকে জড়িয়ে ধরল। “আমি তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না মায়া। আমরা একসাথে লড়ব।”
সেই মুহূর্তে তাদের মধ্যে প্রথম চুমু হলো। বৃষ্টির পানিতে ভিজে, হৃদয়ের উষ্ণতায়।
বৃষ্টির সেই রাতের পর থেকে আরিয়ান আর মায়ার জীবন আর আগের মতো রইল না। প্রথম চুমুতে তাদের হৃদয় দুটো যেন এক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব জীবন কখনো সহজ হয় না। মায়ার মা জোর করে পাত্র দেখতে শুরু করেছিলেন। গ্রামের বাড়ি থেকে ফোন আসত প্রতিদিন — “মায়া, তোর বয়স হয়েছে। এবার বিয়ে কর। আমি একা আর কতদিন সামলাব?”
মায়া কাঁদতে কাঁদতে আরিয়ানকে বলত, “আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে পারব না। কিন্তু মা’কে কীভাবে বোঝাব?”
আরিয়ান তাকে জড়িয়ে ধরে বলত, “ভয় পেও না। আমরা একসাথে লড়ব। আমি তোমার মায়ের সাথে কথা বলব।”
দুই সপ্তাহ পর একটা শনিবার। আরিয়ান সাভারের মায়ার বাড়িতে গেল। হাতে ফুল আর মিষ্টির বাক্স। মায়া দরজা খুলে তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল। “তুমি এখানে? মা বাড়িতে আছে!”
“জানি। আজ সবকিছু স্পষ্ট করে বলব।”
মায়ার মা প্রথমে রাগ করলেন। “কে এই ছেলে? তুমি কলেজে পড়াও, আর এর সাথে ঘুরছ?” কিন্তু আরিয়ান তার শান্ত গলায়, সম্মান দিয়ে সব খুলে বলল — কীভাবে সেই বৃষ্টির রাতে দেখা হয়েছিল, কীভাবে তারা একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছে, কীভাবে সে মায়াকে সুখী করতে চায়।
মায়ার মা অনেকক্ষণ চুপ করে শুনলেন। তার চোখে জল চলে এল। “আমি শুধু মেয়ের ভালো চাই। তুমি যদি সত্যি ওকে ভালোবাসো, তাহলে প্রমাণ করো।”
আরিয়ান প্রমাণ করল। পরের কয়েক মাস সে প্রতি সপ্তাহে মায়ার বাড়িতে যেত। মায়ার মাকে সাহায্য করত, তার অসুস্থতার সময় হাসপাতালে নিয়ে যেত। ধীরে ধীরে মায়ার মা তাকে পছন্দ করে ফেললেন।
এদিকে আরিয়ানের অফিসে প্রমোশন হয়েছিল। সে এখন আরও ভালো বেতন পাচ্ছিল। একদিন সে মায়াকে নিয়ে সেই পুরনো রাস্তায় গেল — যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। সেই বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আরিয়ান হাঁটু গেড়ে বসল।
“মায়া, সেই বৃষ্টির দিন থেকে তুমি আমার জীবনের আলো হয়ে গেছ। আমি তোমাকে ছাড়া আর কিছু চাই না। তুমি কি আমার সাথে সারাজীবন হাঁটবে?”
মায়ার চোখে জল। সে হাসতে হাসতে কাঁদছিল। “হ্যাঁ… হ্যাঁ, আরিয়ান। আমিও তোমাকে ভালোবাসি।”
তারা জড়িয়ে ধরল। চারপাশে সেই একই রাস্তা, একই ধানের খেত, একই হাওয়া। কিন্তু এবার আর অচেনা নয় — এটা তাদের রাস্তা হয়ে গিয়েছিল।
বিয়ে হয়ে গেল ছয় মাস পর। সাভারের একটা ছোট হলঘরে, স্বল্প আয়োজনে কিন্তু অনেক ভালোবাসায়। মায়ার মা কাঁদতে কাঁদতে আশীর্বাদ করলেন। আরিয়ানের বন্ধুরা সবাই এসেছিল। বিয়ের পর তারা একটা ছোট ফ্ল্যাট নিল সাভারে।
প্রতি সন্ধ্যায় তারা সেই পুরনো রাস্তায় হাঁটতে যেত। মায়া এখন তার স্বপ্নের ছোট লাইব্রেরি শুরু করেছে। আরিয়ান তাকে সাহায্য করে। কখনো কখনো বৃষ্টি হলে তারা সেই বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে পুরনো দিনের কথা বলে।
এক বছর পর। মায়া অন্তঃসত্ত্বা। তারা দুজনে রাস্তায় হাঁটছে। মায়া আরিয়ানের হাত ধরে বলল, “মনে আছে? এই রাস্তাতেই আমাদের গল্প শুরু হয়েছিল।”
আরিয়ান তার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “হ্যাঁ। আর এই রাস্তাই আমাদের গল্পকে চিরকাল বয়ে নিয়ে যাবে।”
সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। আকাশ লাল। দুজনের ছায়া এক হয়ে লম্বা হয়ে গিয়েছিল রাস্তার উপর। অচেনা দুটো মানুষ একদিন রাস্তায় দেখা হয়ে, আজ এক হয়ে গিয়েছে।
সমাপ্ত।
....