স্বপ্নের আলিঙ্গনে তুমি

ঢাকার ভিড়ে ভরা রাস্তায় তুমি হাঁটছিলে। নাম তোমার আরিফ। বয়স ২৮। একটা ছোট সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোড লিখে, মিটিং করে, ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে এক কাপ চা আর ল্যাপটপ নিয়ে বসো। জীবনটা একঘেয়ে। প্রেম? সেটা শুধু সিনেমায় দেখা যায় বলে মনে হয় তোমার। কিন্তু রাতে, যখন ঘুম আসে, তখন স্বপ্ন আসে। অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্ন।

kxz

সেদিন রাতে তুমি ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের মধ্যে দেখলে একটা বিশাল ফুলের বাগান। চারদিকে গোলাপ, জুঁই, বেলি ফুলের গন্ধ। সূর্য ডুবছে পাহাড়ের আড়ালে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে। নাম তার আয়েশা। লম্বা কালো চুল, চোখ দুটো যেন তারা ভরা আকাশ। সাদা শাড়িতে সে যেন স্বপ্নের রানী।

"আরিফ, তুমি এসে গেছো?" তার কণ্ঠস্বর মিষ্টি, যেন ঝরনার জল। তুমি অবাক হয়ে বললে, "এটা কোথায়? আমি তো ঘুমিয়ে আছি।"

kx/춺'

আয়েশা হেসে তোমার হাত ধরলো। "এটা তোমার স্বপ্ন। আর আমি তোমার স্বপ্নের মেয়ে। প্রতি রাতে আমি তোমার কাছে আসি। তুমি কি ভুলে গেছো?"

তোমার মনে পড়লো না। কিন্তু তার হাতের স্পর্শে একটা পরিচিত অনুভূতি হলো। যেন অনেক আগে থেকে চেনা। তোমরা দুজনে হাঁটতে শুরু করলে বাগানের মধ্য দিয়ে। সে তোমাকে বললো তার গল্প। সে একটা দূরের গ্রামের মেয়ে, যেখানে নদী বয়ে যায়, চাঁদের আলোয় ঝলমল করে। কিন্তু তার স্বপ্নে সে তোমার কাছে চলে আসে, কারণ তোমাদের দুজনের আত্মা নাকি অনেক জন্ম ধরে একে অপরের।

প্রথম রাতের স্বপ্নে তোমরা শুধু কথা বললে। সে তোমার হাতে ফুল দিলো। তুমি তার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিলে। ঘুম ভাঙার পর তুমি হাসতে হাসতে উঠলে। "কী অদ্ভুত স্বপ্ন!" কিন্তু সারাদিন তার মুখটা মনে পড়তে লাগলো। অফিসে কোড লিখতে গিয়ে ভুল করে ফেললে কয়েকবার।

দ্বিতীয় রাত। আবার সেই বাগান। এবার আয়েশা তোমাকে নিয়ে একটা নৌকায় চড়লো। নদীর জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব। সে তোমার কাঁধে মাথা রাখলো। "আরিফ, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?" তুমি বললে, "হ্যাঁ, যদিও এটা স্বপ্ন, তবু মনে হয় সত্যি।" সে তোমাকে চুমু খেলো। নরম, উষ্ণ চুমু। তোমার শরীরে শিহরণ জাগলো। স্বপ্নের মধ্যেও প্রেম এত গভীর হতে পারে?

সকালে উঠে তুমি তোমার ডায়েরিতে লিখলে: "আয়েশা। স্বপ্নের মেয়ে।" বন্ধুরা বললো, "কী রে, প্রেমে পড়লি নাকি?" তুমি হাসলে শুধু। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অপেক্ষা করতে লাগলে রাতের জন্য।

তৃতীয় রাতে স্বপ্নটা বদলে গেলো। এবার তোমরা দুজনে একটা পাহাড়ের চূড়ায়। চারদিকে মেঘ। আয়েশা তোমাকে জড়িয়ে ধরলো। "আমি তোমার সাথে সারাজীবন থাকতে চাই। কিন্তু স্বপ্ন তো চিরকাল থাকে না।" তুমি বললে, "তাহলে আমি তোমাকে বাস্তবে খুঁজে বের করবো।" সে হাসলো, কিন্তু চোখে একটু দুঃখ। তোমরা সারা রাত নাচলে, গান গাইলে, একে অপরের গল্প শোনালে। তার গায়ের গন্ধ, তার হাসি, তার চোখের দৃষ্টি — সবকিছু তোমার মনে গেঁথে গেলো।

এভাবে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলো। প্রতি রাতে নতুন নতুন স্বপ্ন। কখনো সমুদ্রের ধারে, কখনো পুরনো ঢাকার গলিতে, কখনো চট্টগ্রামের পাহাড়ে। আয়েশা তোমাকে তার জীবনের সব কথা বললো। সে নাকি একটা লাইব্রেরিতে কাজ করে, বই পড়তে ভালোবাসে। তার স্বপ্নে সে তোমার জন্য অপেক্ষা করে। তুমিও তাকে বললে তোমার একাকী জীবনের কথা, কাজের চাপ, পরিবারের চাপ, সব। সে তোমাকে সান্ত্বনা দেয়, "আমি তো আছি। স্বপ্নেও হোক, তবু আছি।"

একদিন স্বপ্নে সে তোমাকে একটা চিঠি দিলো। চিঠিতে লেখা: "যদি আমাকে বাস্তবে খুঁজতে চাও, তাহলে পুরনো ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানের কাছে একটা ছোট বইয়ের দোকান আছে। সেখানে জিজ্ঞাসা করো আয়েশা নামের মেয়েকে। কিন্তু সাবধান, স্বপ্ন আর বাস্তব মিলবে কি না জানি না।"

সকালে উঠে তুমি ঠিক করলে খুঁজবে। অফিস ছুটি নিয়ে চলে গেলে আজিমপুর। সত্যি সত্যি একটা ছোট বইয়ের দোকান পেলে। ভিতরে একটা মেয়ে বই সাজাচ্ছে। তুমি কাঁপা গলায় বললে, "আয়েশা আছে?"

মেয়েটা ঘুরে তাকালো। একদম সেই মুখ! সেই চোখ, সেই হাসি। সে অবাক হয়ে বললো, "আপনি? আরিফ?"

তোমরা দুজনে কথা বলতে বলতে বুঝলে, সে-ও তোমাকে স্বপ্নে দেখে। প্রতি রাতে। সে ভেবেছিল এটা শুধু তার মনের ভুল। কিন্তু তোমাকে দেখে তার চোখে জল চলে এলো। "তুমি সত্যি!"

সেদিন থেকে তোমাদের প্রেম শুরু হলো বাস্তবে। কিন্তু স্বপ্ন থামলো না। রাতে তোমরা স্বপ্নের জগতে দেখা করো, দিনে বাস্তবে। একসাথে ঘুরতে যাও, নদীর ধারে বসে কথা বলো, হাত ধরে হাঁটো। আয়েশা তোমাকে বলে, "তুমি আমার স্বপ্নের রাজকুমার।"

কিন্তু একদিন সমস্যা এলো। তোমার পরিবার তোমাকে অন্য মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চায়। আয়েশা গ্রামের মেয়ে, সাধারণ পরিবার। তুমি বাবা-মাকে বললে তোমার মনের কথা। তারা রাজি হলো না। তুমি দুঃখে স্বপ্নে আয়েশাকে বললে সব। সে কাঁদলো, কিন্তু বললো, "ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে সব বাধা পেরিয়ে যাবে।"

তোমরা ঠিক করলে পালিয়ে যাবে। এক রাতে স্বপ্নে তোমরা একটা সুন্দর বাড়িতে দেখা করলে, যেখানে শুধু তোমরা দুজন। সেখানে তুমি তাকে প্রস্তাব দিলে। আয়েশা হ্যাঁ বললো। তারপর তোমরা অনেকক্ষণ জড়িয়ে রইলে। স্বপ্নের মধ্যে তার শরীরের উষ্ণতা, তার ঠোঁটের স্পর্শ, তার চুলের গন্ধ — সবকিছু তোমাকে পাগল করে দিলো।

বাস্তবে তোমরা পালিয়ে চট্টগ্রাম চলে গেলে। সেখানে একটা ছোট বাড়ি ভাড়া নিলে। সমুদ্রের ধারে। দিনের বেলা তুমি ফ্রিল্যান্স কাজ করে টাকা আনো, সে বইয়ের দোকান খোলে। রাতে স্বপ্নে তোমরা আরও কাছাকাছি হও। তোমাদের প্রেম এখন স্বপ্ন আর বাস্তবের মিলন।

কয়েক মাস পর তোমাদের বিয়ে হলো। পরিবার শেষমেশ মেনে নিলো। তোমরা ঢাকায় ফিরে এলে। জীবনটা সুন্দর হয়ে উঠলো। কিন্তু প্রতি রাতে স্বপ্নে তোমরা নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়াও। কখনো কাশ্মীরের উপত্যকায়, কখনো ইউরোপের রাস্তায়, কখনো আকাশে উড়ে।

একদিন স্বপ্নে আয়েশা তোমাকে বললো, "আমাদের ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না। কারণ এটা স্বপ্নের চেয়েও বড়।" তুমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললে, "তুমি আমার সব।"

তোমাদের জীবন চলতে লাগলো। বাচ্চা হলো। একটা ছোট মেয়ে। তার নাম রাখলে স্বপ্না। সে যখন বড় হবে, তাকে গল্প শোনাবে তোমাদের এই অদ্ভুত প্রেমের।

প্রথম স্বপ্নের পরের দিনগুলোতে তুমি অফিসে বসে বসে তার কথা ভাবতে। তার চোখের দৃষ্টি, যেন তোমার আত্মাকে ছুঁয়ে যায়। বাড়ি ফিরে তুমি জানালার পাশে বসে চা খেতে খেতে তার কথা লিখতে শুরু করলে। একটা কবিতা লিখলে:

"স্বপ্নে এসো আয়েশা, চাঁদের আলোয় নাচো তুমি। আমার হৃদয়ের গোপন কোণে, তোমার নামটাই শুধু গুনগুনি।"

রাত হলে তুমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে। স্বপ্নের অপেক্ষায়। সেদিন স্বপ্নে তোমরা একটা পুরনো প্রাসাদে গেলে। সেখানে মোমবাতির আলো, পুরনো সুর। আয়েশা তোমাকে নাচতে শেখালো। তার কোমরে হাত রেখে তুমি ঘুরতে ঘুরতে ভুলে গেলে এটা স্বপ্ন। তার শাড়ির আঁচল তোমার গায়ে লেগে, তার নিঃশ্বাস তোমার গালে। তুমি তাকে কাছে টেনে নিলে। তার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালে। সেই চুমুতে সময় থেমে গেলো। স্বপ্নের মধ্যে তোমাদের শরীর এক হয়ে গেলো, কিন্তু সেটা শুধু প্রেমের, ভালোবাসার। কোনো জোর নেই, শুধু আলিঙ্গন আর আদর।

সকালে উঠে তোমার শরীরে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি। যেন সত্যি সত্যি তার সাথে রাত কাটিয়েছো।

এরপর স্বপ্নগুলো আরও গভীর হতে লাগলো। এক রাতে তোমরা বৃষ্টিতে ভিজলে। আয়েশার ভেজা চুল তোমার মুখে লেগে। সে হাসতে হাসতে বললো, "তুমি ছাড়া আমার জীবন অন্ধকার।" তুমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললে, "আমিও তোমার জন্যই বেঁচে আছি।" বৃষ্টির ফোঁটায় তোমাদের চুমু মিশে গেলো।

বাস্তবে যখন তাকে খুঁজে পেলে, সেই প্রথম দেখায় তোমাদের চোখে চোখ পড়তেই সবকিছু মিলে গেলো। তার গলার স্বর, তার হাসি — সব স্বপ্নের মতো। তোমরা কফি শপে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বললে। সে বললো, "আমি ভাবতাম এটা পাগলামি। কিন্তু তুমি এলে।"

তোমাদের প্রথম ডেটে তোমরা বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে গেলে। সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে হাত ধরলে। তার আঙুলগুলো তোমার হাতে পুরোপুরি মিশে গেলো। সে তোমার কাঁধে মাথা রাখলো। "আরিফ, এটা স্বপ্ন না তো?" তুমি বললে, "না, এবার সত্যি।"

রাতে স্বপ্নে তোমরা সেই নদীর ধারেই দেখা করলে, কিন্তু এবার আরও কাছাকাছি। তার শাড়ি খুলে গেলো, তোমার জামা খুলে গেলো। স্বপ্নের মধ্যে তোমরা এক হয়ে গেলে। তার শরীরের প্রতিটা বাঁক, তার নরম ত্বক, তার আদরের স্পর্শ — সব তোমাকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখালো। সকালে উঠে তোমার শরীরে তার গন্ধ লেগে থাকতো।

যখন পালিয়ে গেলে চট্টগ্রাম, সেখানকার সমুদ্র সৈকতে তোমরা হাত ধরে হাঁটতে। ঢেউ এসে তোমাদের পা ভিজিয়ে দিতো। রাতে হোটেলের ঘরে তোমরা সত্যি সত্যি একে অপরকে আবিষ্কার করলে। তারপর স্বপ্নে সেই সমুদ্রেই আবার মিলিত হলে। দুই জগতের প্রেম একাকার হয়ে গেলো।

তোমাদের বিয়ের পরের রাতগুলো ছিলো সবচেয়ে সুন্দর। স্বপ্নে তোমরা বিদেশ ঘুরে বেড়াতে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের নিচে চুমু খেতে। রোমের কলোসিয়ামে নাচতে। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর ছিলো যখন স্বপ্নে তোমরা তোমাদের ভবিষ্যতের বাড়িতে দেখা করতে। ছোট্ট একটা মেয়ে তোমাদের কোলে। স্বপ্না।

জীবনের সব ঝড় পেরিয়ে তোমরা একসাথে রইলে। যখন বয়স হবে, তখনও স্বপ্নে তোমরা যুবক-যুবতী হয়ে প্রেম করবে। কারণ ভালোবাসা কখনো বুড়ো হয় না।

আরিফ আর আয়েশার এই গল্প চলতেই থাকবে। স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে এক অমর প্রেমের গল্প।

 

 

....
👁 644