শাড়ির আঁচলে বাঁধা হৃদয়

আয়েশা তার লাল-কমলা শাড়ির আঁচলটা কাঁধে জড়িয়ে বসে ছিল জানালার পাশে। তার চোখ দুটো বাইরের বৃষ্টির দিকে নিবদ্ধ, কিন্তু মনটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। শাড়ির পাড়ে সোনালি জরির কাজ, আর তার গলায় একটা সরু সোনার হার—সব মিলিয়ে তাকে দেখাচ্ছিল যেন কোনো পুরনো বাংলা সিনেমার নায়িকা।

kxz

রাহাত ঢুকল ভিজে কোট নিয়ে। তার চুল থেকে পানি ঝরছে। চাকরির ইন্টারভিউ শেষ করে ফিরছিল সে। কফি শপে আশ্রয় নিতে গিয়ে চোখ পড়ল আয়েশার দিকে। সেই মুহূর্তে তার হৃদয়টা যেন কেঁপে উঠল। শাড়ির আঁচলে বাঁধা সেই নরম, সুন্দর হাত দুটো দেখে তার মনে হলো—এই হাতেই হয়তো তার পুরো জীবন বাঁধা পড়ে যাবে।

“একটা কফি, প্লিজ।” রাহাত কাউন্টারে বলল, কিন্তু চোখ সরাতে পারছিল না।

kx/춺'

আয়েশা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। তার চোখে একটা মৃদু হাসি। “বৃষ্টিতে ভিজে এসেছেন? বসুন, জায়গা আছে।”

তাদের প্রথম কথোপকথন এভাবেই শুরু হলো। রাহাত জানাল সে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, নতুন চাকরি খুঁজছে। আয়েশা বলল সে একটা স্কুলে শিক্ষিকা। তার বাবা-মা চট্টগ্রামে থাকেন, সে ঢাকায় একা। কথায় কথায় সময় কেটে গেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বৃষ্টি থামলেও তারা উঠল না।

সেই রাতে বাসায় ফিরে রাহাত তার ডায়েরিতে লিখল: “আজ একটা শাড়ি পরা মেয়ের আঁচলে আমার হৃদয়টা বেঁধে গেল।”

পরের কয়েক সপ্তাহ তাদের দেখা হতে লাগল নিয়মিত। কখনো পার্কে, কখনো বইয়ের দোকানে। আয়েশা শাড়ি ছাড়া কখনো বের হতো না। তার শাড়ির বিভিন্ন রঙ—নীল, সবুজ, গোলাপি—প্রতিটা রঙে সে যেন নতুন করে জেগে উঠত। রাহাতের চোখে সে ছিল স্বপ্নের নায়িকা।

একদিন বিকেলে তারা হাঁটছিল হাতিরঝিলের ধারে। আয়েশার শাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়ছিল। রাহাত হাত বাড়িয়ে আঁচলটা ধরে ফেলল। “উড়ে যাবে যে।”

আয়েশা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। “আপনার হাতে বেঁধে রাখুন তাহলে।”

সেই মুহূর্তে রাহাত তার হাতটা ধরল। “আয়েশা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। অনেক দিন ধরে।”

আয়েশার চোখে জল এসে গেল। “আমিও। কিন্তু আমার পরিবার... তারা চাইবে না যে আমি এভাবে...”

তারা জানত, সমাজের বাধা অনেক। কিন্তু হৃদয় যখন বাঁধা পড়ে, তখন কোনো বাধাই বড় হয় না।

তাদের প্রেম বেড়ে উঠতে লাগল ধীরে ধীরে। রাহাত আয়েশাকে নিয়ে চলে গেল কক্সবাজার। সমুদ্রের ধারে বসে আয়েশা তার শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে হাসছিল। রাহাত তার কপালে চুমু খেল।

“তোমার এই শাড়ির আঁচলেই আমি আমার সব স্বপ্ন বেঁধে রাখতে চাই।”

রাতে হোটেলের ঘরে আয়েশা তার শাড়ির প্যাঁচ খুলতে খুলতে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরল। তাদের শরীর এক হয়ে গেল নরম আলোয়। আয়েশার নরম বুক, তার কোমরের ভাঁজ, শাড়ির আঁচলের মতোই রাহাতকে জড়িয়ে রাখল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল। চুমুর পর চুমু, স্পর্শের পর স্পর্শ। আয়েশা ফিসফিস করে বলল, “আমার হৃদয় তোমারই, চিরকালের জন্য।”

সেই রাতে তারা অনেকবার ভালোবাসল। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের সাথে তাদের নিঃশ্বাস মিলে গেল। রাহাত তার আঙুল দিয়ে আয়েশার শরীরের প্রতিটা বাঁক অনুভব করল। আয়েশা তার পিঠে নখ বসিয়ে দিল আনন্দের তীব্রতায়।

ঢাকায় ফিরে সমস্যা শুরু হলো। আয়েশার বাবা জানতে পারলেন। তিনি বললেন, “রাহাতের কোনো বাড়ি-গাড়ি নেই, কীভাবে মেয়েকে সুখী করবে?”

আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে রাহাতকে ফোন করল। “আমাকে বিয়ে দিতে চায় অন্য জায়গায়।”

রাহাত বলল, “আমি লড়ব। তোমার জন্য সব করব।”

সে চাকরিতে উন্নতি করল। রাত জেগে প্রজেক্ট করল। আয়েশা তার শাড়ির আঁচলে চিঠি লিখে রাহাতকে পাঠাত। “এই আঁচলে তোমার নাম বুনে রেখেছি।”

একদিন আয়েশার বাড়িতে গিয়ে রাহাত তার বাবার সামনে দাঁড়াল। “আমি আয়েশাকে ভালোবাসি। তাকে সুখী করব, এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।”

বাবা প্রথমে রাগ করলেন, কিন্তু রাহাতের দৃঢ়তা দেখে নরম হলেন।

বিয়ের দিন আয়েশা লাল শাড়ি পরল। তার আঁচলে সোনালি ফুলের কাজ। রাহাত তাকে দেখে মুগ্ধ। মন্দিরে ফুল ছড়িয়ে তারা বিয়ে করল।

বিয়ের রাতে আয়েশা লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে ছিল। রাহাত তার ঘোমটা সরিয়ে দিল। “আজ থেকে তুমি আমার।”

তারা আবার এক হয়ে গেল। এবার আরও গভীরভাবে। আয়েশার শরীর রাহাতের চুমুতে ফুলের মতো ফুটে উঠল। তারা সারা রাত ভালোবাসায় মগ্ন রইল। আয়েশা তার স্বামীর বুকে মাথা রেখে বলল, “এই শাড়ির আঁচলের মতোই তোমার সাথে বাঁধা পড়ে গেছি চিরকাল।”

বিয়ের পর তাদের জীবন হয়ে উঠল স্বপ্নের মতো। রাহাত চাকরিতে প্রমোশন পেল। আয়েশা স্কুলের পাশাপাশি বাসায় ছোট্ট একটা লাইব্রেরি চালাতে শুরু করল।

সন্ধ্যায় রাহাত বাসায় ফিরলে আয়েশা শাড়ি পরে তাকে অভ্যর্থনা করত। তারা একসাথে রান্না করত, হাসত, গল্প করত। রাত হলে শোবার ঘরে তাদের ভালোবাসা নতুন করে জেগে উঠত।

একদিন আয়েশা গর্ভবতী হলো। রাহাত তার পেটে হাত রেখে কাঁদল আনন্দে। “আমাদের ভালোবাসার ফল।”

গর্ভাবস্থায় আয়েশা আরও সুন্দর হয়ে উঠল। তার শাড়ির আঁচল এখন তার সন্তানের জন্যও বাঁধা। রাহাত প্রতিদিন তার পা টিপে দিত, মাথায় হাত বুলিয়ে দিত।

কিন্তু জীবন সবসময় মসৃণ নয়। রাহাতের কোম্পানিতে সংকট এল। চাকরি চলে যাওয়ার উপক্রম। আয়েশা তাকে সাহস দিল। “আমি আছি তোমার সাথে। শাড়ির আঁচলে যেমন সবকিছু বাঁধা, তেমনি আমাদের ভালোবাসাও।”

রাহাত নতুন উদ্যোগ নিল। তার স্টার্টআপ সফল হলো। আয়েশা তার পাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু সামলাল।

সন্তান জন্ম নিল—একটা মেয়ে। নাম রাখলেন ‘আঁচল’। ছোট্ট আঁচল যেন তাদের ভালোবাসার প্রতীক।

বছরগুলো কেটে গেল। আয়েশা এখনও শাড়ি পরে। রাহাত এখনও তার আঁচল ধরে টানে, চুমু খায়। তাদের ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি।

এক সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে আয়েশা বলল, “তোমার হৃদয় আমার শাড়ির আঁচলে বাঁধা আছে। আর আমারটা তোমার বুকে।”

রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “চিরকাল এভাবেই থাকব আমরা।”

তাদের গল্প চলতে থাকল। প্রতিটা দিন নতুন করে ভালোবাসায় ভরে উঠত। শাড়ির আঁচলের মতোই তাদের হৃদয় একসাথে বাঁধা রইল—অটুট, অম্লান।

 

....
👁 152