রাতের ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনটা ছাড়ার ঠিক আগে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল রিয়ান। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি। সবে অফিসের প্রমোশন পেয়েছে, কিন্তু মনটা খালি। ত্রিশ বছর বয়স, চাকরি ভালো, কিন্তু কেউ নেই যার সাথে এই সাফল্যটা শেয়ার করবে। বাবা-মা গ্রামে, বোন বিদেশে। একা।
ট্রেনে উঠে তার সিট খুঁজছিল সে। এসি চেয়ার কারের ১৭ নম্বর সিট। পাশের সিটটা খালি। জানালার ধারে বসে বাইরের আলো দেখছিল। হঠাৎ একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল। লম্বা, ফর্সা, চুল খোলা, পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ। চোখে একটা নরম হাসি।
“এক্সকিউজ মি, এটা কি ১৮ নম্বর?”
রিয়ান মাথা তুলে তাকাল। মেয়েটার চোখ দুটো যেন চাঁদের আলো ধরে রেখেছে। “হ্যাঁ, বসুন।”
মেয়েটা বসল। নাম বলল আয়েশা। চট্টগ্রামের একটা কলেজে লেকচারার। বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে হুট করে ঢাকা থেকে যাচ্ছে। কথা শুরু হলো ধীরে ধীরে। প্রথমে আবহাওয়া, তারপর চাকরি, তারপর স্বপ্ন। রিয়ান বলল তার একা লাগে। আয়েশা হেসে বলল, “একা তো সবাই। কিন্তু কেউ কেউ একসাথে একা থাকতে পারে।”
রাত বাড়ছিল। ট্রেনের জানালা দিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। আলো কমে এসেছে। আয়েশা তার শালটা ভালো করে জড়িয়ে নিল। রিয়ান দেখল তার হাতটা ঠান্ডা। নিজের জ্যাকেটটা খুলে দিতে চাইল। আয়েশা লজ্জা পেয়ে প্রথমে না বলল, কিন্তু পরে নিল। তাদের হাত একটু ছুঁয়ে গেল। সেই ছোঁয়ায় দুজনেরই শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল।
“আপনার হাত গরম,” আয়েশা ফিসফিস করে বলল।
রিয়ান হাসল, “আপনার চোখ আরও গরম।”
কথা আর থামল না। রাত দুটোর দিকে ট্রেন একটা স্টেশনে থামল। বেশিরভাগ যাত্রী ঘুমিয়ে। আয়েশা বলল, “একটু চা খাবেন?” দুজনে প্ল্যাটফর্মে নামল। চা খেতে খেতে আয়েশা তার জীবনের গল্প বলল। কীভাবে প্রেমে পড়েছিল একবার, কিন্তু ছেলেটা ঠকিয়েছে। রিয়ান বলল তারও একটা ব্রেকআপ হয়েছে পাঁচ বছর আগে। দুজনেই বুঝল, এই যাত্রাটা হয়তো শুধু ট্রেনের যাত্রা নয়।
ট্রেন আবার চলল। এবার তারা পাশাপাশি আরও কাছে বসল। আয়েশার মাথা রিয়ানের কাঁধে একটু ঠেকল। রিয়ান তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। “ভয় লাগছে না তো?” আয়েশা চোখ বন্ধ করে বলল, “না। আপনার কাছে নিরাপদ লাগছে।”
সেই রাতে তারা অনেক কথা বলল। স্বপ্নের কথা, ভবিষ্যতের কথা। রিয়ান বলল, “যদি এই ট্রেনটা কখনো না থামতো?” আয়েশা হেসে বলল, “তাহলে আমরা চিরকাল এভাবে একসাথে থাকতাম।”
চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাল সকালে। আয়েশা নামার আগে তার নাম্বার দিল। “যোগাযোগ রাখবেন।” রিয়ানও দিল। কিন্তু দুজনেই জানত, এটা শেষ নয়।
তিন দিন পর রিয়ান চট্টগ্রাম গেল আয়েশাকে দেখতে। আয়েশার বাবা হাসপাতালে। রিয়ান সেখানে গিয়ে সাহায্য করল। আয়েশার মা খুশি হয়ে বললেন, “বাবা, তুমি খুব ভালো ছেলে।” আয়েশা লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
সেই থেকে তাদের দেখা শুরু হলো। প্রথমে কফি শপে, তারপর সমুদ্র সৈকতে। পতেঙ্গায় বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে রিয়ান আয়েশার হাত ধরল। “আমি তোমাকে ভালোবাসি, আয়েশা। প্রথম দিন থেকেই।”
আয়েশা চোখে জল নিয়ে বলল, “আমিও। কিন্তু আমার বাবা...”
রিয়ান বলল, “আমি সবকিছু সামলাব। তুমি শুধু আমার হাত ধরে থাকো।”
তাদের প্রেম বাড়তে লাগল। রিয়ান চট্টগ্রামে বদলি হয়ে গেল। দুজনে একসাথে সময় কাটাত। আয়েশা তার কলেজ থেকে ফিরলে রিয়ান অপেক্ষা করত। রাতে ফোন করে অনেকক্ষণ কথা বলত। একদিন আয়েশা বলল, “আজকে আমার বাসায় আসো। মা-বাবা গ্রামে গেছে।”
রিয়ান গেল। বাসাটা ছোট কিন্তু সুন্দর। আয়েশা রান্না করল। তারা খেতে খেতে হাসাহাসি করল। খাওয়ার পর আয়েশা বলল, “একটু গান শোনাবে?” রিয়ান গিটার নিয়ে গান গাইল। আয়েশা তার কাছে এসে বসল। তাদের চোখে চোখ পড়ল। রিয়ান আস্তে করে আয়েশার ঠোঁটে চুমু দিল। প্রথম চুমু। নরম, আদুরে, ভালোবাসায় ভরা।
আয়েশা চোখ বন্ধ করে সাড়া দিল। তার হাত রিয়ানের বুকে। ধীরে ধীরে চুমু গভীর হলো। রিয়ান তার গালে, ঘাড়ে চুমু দিতে লাগল। আয়েশার শ্বাস ভারী হয়ে গেল। “রিয়ান... আমি তোমাকে চাই।”
তারা সোফায় শুয়ে পড়ল। রিয়ান আয়েশার সালোয়ারের উপর দিয়ে তার শরীর ছুঁয়ে দেখল। আয়েশার শরীর কাঁপছিল আনন্দে। সে রিয়ানের শার্ট খুলে তার বুকে চুমু দিল। দুজনের শরীর এক হয়ে গেল ধীরে ধীরে। রাতটা তাদের জন্য স্বপ্নের মতো হয়ে উঠল। প্রতিটা স্পর্শে ভালোবাসা, প্রতিটা চুমুতে আত্মসমর্পণ। আয়েশা রিয়ানের কানে ফিসফিস করে বলল, “তুমি আমার সব।”
সেই রাতের পর তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। কিন্তু সমস্যাও এল। আয়েশার এক দূর সম্পর্কের চাচা চাইত আয়েশাকে তার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে। রিয়ানকে বলা হলো যে সে উপযুক্ত নয়। আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”
রিয়ান বলল, “আমরা লড়ব।”
তারা গ্রামে গেল আয়েশার বাবার কাছে। রিয়ান সব খুলে বলল। আয়েশার বাবা প্রথমে রাগ করলেন, কিন্তু রিয়ানের সততা আর ভালোবাসা দেখে রাজি হয়ে গেলেন। “তোমরা যদি সত্যি ভালোবাসো, তাহলে আমার আশীর্বাদ আছে।”
বিয়ে ঠিক হলো। ঢাকায় ফিরে তারা প্রস্তুতি নিতে লাগল। বিয়ের আগের রাতে আয়েশা রিয়ানকে ফোন করে বলল, “আজকে আসো। শেষবারের মতো একা সময় কাটাই।”
রিয়ান গেল। তাদের ঘরে মোমবাতি জ্বলছিল। আয়েশা সুন্দর করে সাজিয়েছে নিজেকে। লাল শাড়ি, খোলা চুল। রিয়ান দরজা খুলেই থমকে গেল। “তুমি... অপূর্ব।”
তারা কাছে এল। এবার আর কোনো লজ্জা নেই। রিয়ান আয়েশাকে জড়িয়ে ধরল। শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার কাঁধে চুমু দিল। আয়েশা তার জামা খুলে ফেলল। তাদের শরীর মিলে গেল আবার। এবার আরও তীব্র, আরও গভীর ভালোবাসায়। রিয়ান আয়েশার প্রতিটা অংশ আদর করল। আয়েশা তার নাম নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আরও কাছে এসো... আমার সব তোমার।”
রাতভর তারা একে অপরকে ভালোবাসল। শরীর আর আত্মা মিলে এক হয়ে গেল। সকালে আয়েশা রিয়ানের বুকে মাথা রেখে বলল, “এখন থেকে প্রতি রাত এমনই হবে।”
বিয়ে হলো জাঁকজমক করে। ঢাকা আর চট্টগ্রামের আত্মীয়স্বজন সবাই এল। আয়েশা লাল বেনারসি পরে অপূর্ব লাগছিল। রিয়ান তার হাত ধরে বলল, “তুমি আমার চাঁদ।”
বিয়ের পর তারা নতুন ফ্ল্যাটে উঠল ঢাকায়। প্রতিদিন সকালে রিয়ান আয়েশাকে চুমু দিয়ে অফিস যেত। আয়েশা কলেজে যেত। সন্ধ্যায় ফিরে দুজনে রান্না করত, গল্প করত, হাসত। রাতে তাদের ঘর ভরে উঠত ভালোবাসায়। কখনো আয়েশা রিয়ানের কোলে বসে তার চুলে হাত বুলাত। রিয়ান তার কানে কানে বলত কতটা ভালোবাসে।
একদিন আয়েশা বলল, “আমি মা হতে যাচ্ছি।” রিয়ান আনন্দে কেঁদে ফেলল। তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমাদের ভালোবাসার ফল।”
গর্ভাবস্থায় রিয়ান আয়েশার খুব যত্ন নিত। রাতে তার পেটে হাত রেখে গল্প বলত বাচ্চাকে। আয়েশা হাসত, “তুমি এত ভালো বাবা হবে।”
সন্তান হলো। একটা মেয়ে। নাম রাখল চাঁদনী। তিনজনে ছোট্ট সংসার। রিয়ান চাকরিতে আরও উন্নতি করল। আয়েশা কলেজে পড়াত। কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় তারা একসাথে বারান্দায় বসে চাঁদ দেখত। রিয়ান বলত, “যেদিন তোমাকে ট্রেনে দেখেছিলাম, সেদিনই জানতাম তুমি আমার।”
আয়েশা তার গালে চুমু দিয়ে বলত, “আর আমি জানতাম, তুমি আমার চিরকালের।”
বছর গড়িয়ে গেল। চাঁদনী বড় হলো। তারা আরও দুটো সন্তানের বাবা-মা হলো। কিন্তু প্রতি রাতে যখন আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ত, তখনও তাদের ভালোবাসা নতুন করে শুরু হতো। রিয়ান আয়েশার শরীরকে এখনও সেই প্রথম রাতের মতো আদর করত। আয়েশা তার বুকে মাথা রেখে বলত, “তোমার সাথে এই জীবনটা স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর।”
একদিন বৃদ্ধ বয়সে তারা একই ট্রেনে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। সেই একই সিট। আয়েশা রিয়ানের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “মনে আছে সেই প্রথম রাত?”
রিয়ান তার হাত ধরে বলল, “প্রতিটা মুহূর্ত মনে আছে। তুমি আমার চাঁদের আলো।”
ট্রেন চলছিল। বাইরে চাঁদ উঠেছিল। দুজনে হাত ধরে চুপচাপ বসে ছিল। তাদের ভালোবাসা কখনো শেষ হয়নি। বরং প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নিয়েছে।
....