প্রথম দেখায় হারিয়ে গেলাম

আমি রিকশায় করে ফিরছিলাম ইউনিভার্সিটি থেকে। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল জানালার কাচে, আর রাস্তার আলোয় সবকিছু ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা বড় জলের ছাঁট এসে রিকশার ভিতর ঢুকে পড়ল। আমি চমকে উঠে দেখলাম, পাশের ফুটপাতে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা লাল ছাতা, কিন্তু ছাতাটা বাতাসে উলটে গেছে। তার চুল ভিজে গিয়ে কপালে লেপটে আছে, আর চোখ দুটো যেন কোনো গভীর সমুদ্র।

kxz

সে আমার দিকে তাকাল। আমি রিকশাওয়ালাকে থামতে বললাম। “আপনি উঠে আসুন, বৃষ্টি তো খুব জোরে,” বলে আমি নিজেই ছাতা বাড়িয়ে দিলাম। সে একটু ইতস্তত করে উঠে পড়ল। তার নাম ছিল আয়েশা। সে বলল, “আমি নর্থ সাউথে পড়ি, এখন লাইব্রেরি থেকে ফিরছি। বৃষ্টিটা হঠাৎ এসে গেল।” তার গলার স্বরটা ছিল মিষ্টি, যেন বৃষ্টির ফোঁটার মতোই নরম।

সেই রিকশার যাত্রায় আমরা খুব কম কথা বলেছিলাম। কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তে আমার হৃদয়টা অদ্ভুতভাবে দ্রুত চলছিল। তার হাতের কাছে আমার হাতটা ছুঁয়ে গেল একবার। সেই স্পর্শে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরে। আমি নাম বললাম, “আমি রাহাত। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ি।” সে হাসল। সেই হাসিতে তার গালে টোল পড়ল। আমি সেই টোলটা চিরকাল মনে রেখে দেব বলে মনে মনে ঠিক করলাম।

kx/춺'

রিকশা যখন তার থাকার জায়গার কাছে পৌঁছাল, সে নামার আগে বলল, “আজকের জন্য ধন্যবাদ। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে যাচ্ছিলাম।” আমি বললাম, “কোনো সমস্যা নেই। আবার দেখা হবে হয়তো।” সে শুধু হাসল আর চলে গেল। সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। তার চোখ দুটো বারবার মনে পড়ছিল। প্রথম ভালোবাসা এভাবেই আসে—অপ্রত্যাশিত, অদম্য, আর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

পরের কয়েকদিন আমি ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে ঘুরঘুর করতে শুরু করলাম। আয়েশা যেখানে পড়ে, সেখানকার কাছাকাছি। একদিন দেখা হয়ে গেল। সে বই নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি সাহস করে কাছে গেলাম। “মনে আছে আমাকে?” জিজ্ঞাসা করলাম। সে হেসে বলল, “রিকশার সেই ছেলে? অবশ্যই মনে আছে। বৃষ্টির নায়ক।” আমরা হাসলাম। তারপর থেকে কথা বলা শুরু হলো। প্রথমে ছোট ছোট কথা—ক্লাস, বই, ঢাকার ট্রাফিক, বৃষ্টির গান। কিন্তু প্রতিটা কথায় আমাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য সুতো বাঁধা হয়ে যাচ্ছিল।

এক সন্ধ্যায় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে বসে ছিলাম। সূর্য ডুবছিল। আকাশটা লাল-কমলা হয়ে গিয়েছিল। আয়েশা বলল, “আমার খুব ভালো লাগে এই সময়টা। মনে হয় সবকিছু নতুন হয়ে যায়।” আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “তোমার সাথে থাকলে সব সময়টাই নতুন লাগে।” সে লজ্জায় মাথা নিচু করল। তারপর আস্তে করে বলল, “রাহাত, তুমি খুব সুন্দর করে কথা বলো।” সেই মুহূর্তে আমি তার হাতটা ধরলাম। তার আঙুলগুলো ঠান্ডা ছিল, কিন্তু আমার হাতে যেন আগুন ধরিয়ে দিল।

আমাদের প্রথম ডেট ছিল একটা ছোট ক্যাফেতে, মিরপুরে। সে চা খেতে খেতে তার গল্প বলছিল। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। বাবা-মা দুজনেই ডাক্তার। সে ঢাকায় পড়তে এসেছে। আমি বললাম আমার কথা—গ্রামের ছেলে, স্বপ্ন দেখি লেখক হবার। সে বলল, “তাহলে আমার জন্য একটা গল্প লিখো।” আমি হাসলাম, “ইতিমধ্যে লিখতে শুরু করে দিয়েছি। তোমাকে নিয়ে।”

দিনগুলো কাটছিল দ্রুত। আমরা প্রায়ই দেখা করতাম। কখনো বুক ফেয়ারে, কখনো হাতিরঝিলের ধারে হাঁটতে হাঁটতে। একদিন বৃষ্টি পড়ছিল আবার। আমরা একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার চুলে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরছিল। আমি তার কপালে একটা চুমু দিলাম। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। “রাহাত, আমি তোমাকে ভালোবাসি,” ফিসফিস করে বলল সে। আমার হৃদয়টা লাফিয়ে উঠল। “আমিও তোমাকে, আয়েশা। প্রথম থেকেই।”

কিন্তু ভালোবাসা শুধু মধুর হয় না। একদিন তার বাবা ফোন করে জানালেন যে তাকে চট্টগ্রামে ফিরে যেতে হবে। পরিবারের কিছু সমস্যা। আয়েশা কাঁদছিল ফোনে। “আমি যেতে চাই না। তোমাকে ছেড়ে যেতে পারব না।” আমি বললাম, “আমি অপেক্ষা করব। যতদিন লাগে।” সেই রাতে আমরা শেষবারের মতো দেখা করলাম। হাতিরঝিলের ব্রিজের উপর। সে আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদছিল। আমি তার চুলে হাত বুলিয়ে বললাম, “দূরত্ব আমাদের আলাদা করতে পারবে না। প্রতিটা তারায় তোমার নাম লিখে রাখব।”

সে চলে গেল চট্টগ্রামে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ খুব কষ্ট হচ্ছিল। ফোনে কথা হতো রাত জেগে। সে বলত, “রাহাত, তুমি না থাকলে আমার দিনগুলো ফাঁকা লাগে।” আমি তাকে গল্প পাঠাতাম। প্রতিদিন একটা করে ছোট ছোট প্রেমের গল্প। তার মধ্যে আমাদের স্মৃতি মিশিয়ে। একদিন সে বলল, “এই গল্পগুলো আমার সবচেয়ে প্রিয়।”

মাস কয়েক পর একটা সুযোগ এল। আমি চট্টগ্রাম যাওয়ার টিকিট কাটলাম। ট্রেনে করে যাচ্ছিলাম। পুরো পথটা তার কথা ভাবছিলাম। যখন স্টেশনে নামলাম, সে অপেক্ষা করছিল। তার পরনে সেই লাল সালোয়ার কামিজ, যেটা প্রথম দেখায় পরেছিল। আমি দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। “আমি আর কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না,” বললাম। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমিও না।”

আমরা সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিলাম সেদিন। কক্সবাজারে নয়, স্থানীয় একটা ছোট সমুদ্রতীরে। ঢেউ আছড়ে পড়ছিল। সূর্য ডুবছিল। আমি হাঁটু গেড়ে বসে বললাম, “আয়েশা, তুমি কি আমার সাথে সারাজীবন কাটাতে চাও?” সে হ্যাঁ বলে চোখের জল ফেলল। আমরা চুমু খেলাম। সেই চুমুতে ছিল প্রথম ভালোবাসার সব মধুরতা, সব অপেক্ষা, সব স্বপ্ন।

বছরখানেক পর আমরা বিয়ে করলাম। ঢাকায় ছোট অনুষ্ঠান। তার বাবা-মা রাজি হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। আমাদের ছোট্ট ঘরে প্রতিদিন সকালে তার হাসি দিয়ে শুরু হয় দিন। আমি লেখক হয়েছি। আমার প্রথম বইয়ের নাম ছিল “প্রথম বৃষ্টি”। সেটা উৎসর্গ করেছিলাম আয়েশাকে।

এখনও, অনেক বছর পরেও, যখন বৃষ্টি পড়ে, আমরা দুজনে জানালার কাছে বসি। সে আমার কাঁধে মাথা রাখে। আর আমি ফিসফিস করে বলি, “যখন তোমার চোখে চোখ পড়েছিল, তখনই জানতাম এটা চিরকালের।”

....
👁 792