তোমায় নিয়ে চাঁদের রাত

রাত নামার সাথে সাথে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাগুলো একটু একটু করে শান্ত হয়ে আসছিল। আকাশে চাঁদ উঠেছে, কিন্তু শহরের আলোর দাপটে তার জেল্লা ঢাকা পড়ে গেছে। তবু আফিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।

kxz

“আজকে কখন আসবে?” আফিয়া মনে মনে বলল। তার স্বামী রাহাত গত তিন দিন ধরে চট্টগ্রামে অফিসের কাজে গিয়েছে। বিয়ের পর এটাই প্রথম লম্বা আলাদা থাকা। মাত্র ছয় মাস হয়েছে তাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু এই ছয় মাসে আফিয়া বুঝতে পেরেছে, রাহাত তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

রাহাত একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। শান্ত, চুপচাপ, কিন্তু তার চোখ দুটো যখন আফিয়ার দিকে তাকায়, তখন সব কথা বলে দেয়। আফিয়া গ্রামের মেয়ে। ঢাকায় এসে প্রথমে ভয় লাগত। কিন্তু রাহাতের হাত ধরে সে শহরকে ভালোবেসে ফেলেছে।

kx/춺'

দরজায় চাবির শব্দ হতেই আফিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। সে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল। রাহাত ক্লান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ব্যাগ। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ঠোঁটে হাসি।

“এসেছো!” আফিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকে। রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল কপালে।

“মিস করেছি তোমাকে, আফি।”

সেই রাতে তারা দুজনে অনেকক্ষণ বসে গল্প করল। রাহাত চট্টগ্রামের সমুদ্রের গল্প বলল। আফিয়া শোনাল কীভাবে প্রতিদিন তার জন্য রান্না করে অপেক্ষা করেছে। খাওয়াদাওয়ার পর তারা বিছানায় শুয়ে পড়ল। রাহাত আফিয়াকে কাছে টেনে নিল।

“তোমার গন্ধটা মিস করেছিলাম,” রাহাত ফিসফিস করে বলল। আফিয়ার গাল লাল হয়ে গেল। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে আস্তে চুমু খাওয়া শুরু হল। রাহাতের ঠোঁট আফিয়ার ঠোঁট স্পর্শ করতেই যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আফিয়া তার বুকে হাত রেখে চুমু ফিরিয়ে দিল।

সেই রাতে তাদের মিলন ছিল ধীর, গভীর আর ভালোবাসায় ভরা। রাহাত আফিয়ার প্রতিটা অংশকে চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিল। আফিয়া তার কাঁধ আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমার। শুধু তোমার।”

পরদিন সকালে রাহাত অফিসে যাওয়ার আগে আফিয়াকে বলল, “এই উইকেন্ডে আমরা গ্রামে যাব। তোমার বাড়িতে।”

আফিয়ার চোখ চকচক করে উঠল। “সত্যি?”

“হ্যাঁ। তোমার মা-বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। আর তোমার সাথে কিছুদিন একা থাকতে চাই। শহরের এই ভিড় থেকে দূরে।”

শুক্রবার সকালে তারা বাসে করে আফিয়ার গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। পথে আফিয়া রাহাতের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। রাহাত তার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে ভাবছিল – এই মেয়েটাকে কতটা ভালোবাসে সে।

গ্রামে পৌঁছে আফিয়ার বাড়িতে সবাই খুব খুশি। আফিয়ার মা রান্না করে খাওয়ালেন। বাবা রাহাতের সাথে গল্প করলেন। সন্ধ্যায় আফিয়া আর রাহাত গ্রামের পুকুরপাড়ে হাঁটতে গেল। চারদিকে জোনাকি জ্বলছে। দূরে বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে।

“এখানে এলে মনে হয় সময় থেমে গেছে,” রাহাত বলল।

আফিয়া তার হাত ধরে বলল, “তুমি যেখানে আছ, সেখানেই আমার সময় থেমে যায়।”

তারা একটা বড় গাছের নিচে বসল। রাহাত আফিয়াকে কোলে টেনে নিল। চাঁদের আলোয় আফিয়ার মুখটা আরও সুন্দর লাগছিল। রাহাত তার গালে হাত বুলিয়ে বলল, “তুমি জানো, তোমাকে প্রথম দেখার দিন থেকেই আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।”

আফিয়া লজ্জায় মুখ লুকাল তার বুকে। “আমিও। কিন্তু বলতে পারিনি।”

সেই রাতে তারা ঘরের ছাদে শুয়ে তারা দেখল। রাহাত আফিয়ার কানে কানে অনেক স্বপ্নের কথা বলল – তাদের ভবিষ্যতের সন্তান, একটা ছোট বাড়ি, একসাথে বুড়ো হওয়া। আফিয়া তার বুকে হাত রেখে শুনছিল। তারপর আস্তে আস্তে তাদের শরীর একে অপরের কাছে সাড়া দিল। ছাদের খোলা আকাশের নিচে, চাঁদের আলোয় তাদের মিলন হল। এবার আরও গভীর, আরও আবেগপূর্ণ। আফিয়া রাহাতের নাম ধরে কেঁপে উঠছিল। রাহাত তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলছিল, “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।”

পরদিন তারা গ্রামের আশেপাশে ঘুরল। আফিয়া রাহাতকে তার ছোটবেলার জায়গাগুলো দেখাল – স্কুল, নদীর ঘাট, আমবাগান। রাহাত সবকিছু মন দিয়ে দেখছিল। সন্ধ্যায় তারা দুজনে নদীর পাড়ে বসল। পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব কাঁপছিল।

“রাহাত, আমার একটা ইচ্ছে আছে,” আফিয়া বলল।

“কী?”

“আমরা যদি এখানে একটা ছোট বাড়ি বানাই? শুক্র-শনিবার এসে থাকব।”

রাহাত হেসে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু একটা শর্ত।”

“কী শর্ত?”

“প্রতি মাসে অন্তত একবার এখানে এসে তোমাকে চাঁদের আলোয় ভালোবাসব।”

আফিয়া হেসে তার গালে চুমু খেল।

সেই সপ্তাহান্তে তারা খুব কাছাকাছি হয়ে গেল। রাহাত আফিয়াকে নিয়ে নৌকা ভ্রমণ করল, একসাথে মাছ ধরল, রান্না করল। রাতে তাদের শরীরের ভাষা আরও জোরালো হয়ে উঠল। আফিয়া রাহাতের প্রতিটা স্পর্শে কেঁপে উঠছিল। রাহাত তাকে এমনভাবে আদর করছিল যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস।

ঢাকায় ফিরে আসার আগের রাতে আফিয়া রাহাতকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি তোমাকে আরও বেশি ভালোবাসি এখন।”

রাহাত তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমিও। তুমি আমার জীবন।”

ঢাকায় ফিরে তাদের রুটিন শুরু হল। কিন্তু এবার আর আগের মতো নয়। প্রতিদিন রাতে তারা একে অপরকে সময় দিত। কখনো রান্না করে খাওয়াত, কখনো সিনেমা দেখত, কখনো শুধু জড়িয়ে শুয়ে থাকত।

কয়েক মাস পর আফিয়া একদিন রাহাতকে বলল, “আমি মা হতে যাচ্ছি।”

রাহাত প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর আফিয়াকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। “আমাদের ছোট্ট পরিবার হবে।”

সেই রাত থেকে রাহাত আরও যত্নশীল হয়ে গেল। আফিয়ার পেটে হাত রেখে গল্প বলত। আফিয়া তার বুকে মাথা রেখে শুনত।

সময় এগিয়ে চলল। আফিয়ার পেট বড় হল। রাহাত প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে তার পা টিপে দিত, মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। রাতে তারা এখনো একে অপরকে ভালোবাসত, কিন্তু খুব আস্তে, খুব যত্ন করে।

একদিন রাতে আফিয়া বলল, “রাহাত, তুমি কি জানো? আমি যখন তোমার সাথে থাকি, তখন সবকিছু চাঁদনী রাতের মতো সুন্দর লাগে।”

 

....
👁 384