পাহাড়ের চূড়ায় প্রেম

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে, সিলেটের কাছে একটা ছোট্ট পাহাড়ি এলাকা—জৈন্তাপুর। সেখান থেকে আরও উঁচুতে, ভারত সীমান্তের কাছাকাছি একটা অজানা পাহাড়ি ট্রেইল। নাম তার ‘মেঘের চূড়া’। স্থানীয়রা বলে, এখানে মেঘ নেমে আসে মাটিতে, আর চূড়ায় পৌঁছালে মনে হয় স্বর্গের দরজায় দাঁড়িয়ে আছো।

kxz

রিয়া ছিল ঢাকার একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী। বিষয় ইংরেজি সাহিত্য। কিন্তু তার মনটা ছিল ভ্রমণপিপাসু। পড়াশোনার চাপে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বন্ধুরা বলল, “একটা ট্রিপে যা। মেঘের চূড়ায় গেলে সব ভুলে যাবি।” রিয়া একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তার ব্যাকপ্যাকে কয়েকদিনের খাবার, একটা টেন্ট, ক্যামেরা আর কিছু বই।

ট্রেইলে উঠতে উঠতে সূর্য ডুবছিল। পথটা সরু, দুপাশে ঘন জঙ্গল। হঠাৎ একটা মোড়ে সে দেখল একটা লোক বসে আছে। তার নাম আরিফ। আরিফ ছিল পেশায় ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। ঢাকায় থাকে, কিন্তু পাহাড়-নদী তার নেশা। সেও একা ট্রেকিং করতে এসেছে।

kx/춺'

“এখানে একা? সন্ধ্যা হয়ে গেছে।” আরিফ হাসতে হাসতে বলল।

রিয়া একটু সতর্ক হয়ে বলল, “তুমিও তো একা।”

দুজনের মধ্যে কথা শুরু হলো। আরিফ বলল সে এই ট্রেইল দুবার এসেছে, চূড়ায় সানরাইজ দেখা তার প্রিয়। রিয়া বলল সে প্রথমবার। ধীরে ধীরে তারা একসাথে হাঁটতে শুরু করল। রাতটা কাটানোর জন্য একটা সমতল জায়গায় টেন্ট খাটাল দুজনে। আগুন জ্বালিয়ে চা বানাল আরিফ।

“তোমার চোখে কী যেন আছে—যেন পাহাড়ের মতোই রহস্যময়।” আরিফ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল।

রিয়া লজ্জা পেয়ে হাসল, “আর তুমি? ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়াও, কিন্তু নিজের ছবি কখনো তোলো না?”

সেই রাতে তারা অনেক গল্প করল। রিয়ার বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়, মা একা লড়াই করে তাকে মানুষ করেছেন। আরিফেরও একটা ভাঙা প্রেমের গল্প—যে মেয়েটা শহরের আলোয় হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ কারো অতীত নিয়ে বেশি প্রশ্ন করল না। শুধু বর্তমানের এই পাহাড়ি রাতটুকু উপভোগ করল।

পরের দিন সকালে তারা আবার রওনা দিল। পথটা আরও খাড়া। কখনো হাত ধরে একজন আরেকজনকে সাহায্য করছে। রিয়া একবার পা পিছলে গেলে আরিফ তাকে জড়িয়ে ধরে ফেলল। সেই মুহূর্তে দুজনের চোখাচোখি হলো। সময় যেন থেমে গিয়েছিল।

“ভয় পেয়ো না। আমি আছি।” আরিফের গলা নরম।

রিয়ার হৃদয়টা দ্রুত চলছিল। সে কখনো এমন অনুভব করেনি। শহরের ছেলেদের সাথে তার দেখা হয়েছে, কিন্তু এই পাহাড়ি ছেলেটার চোখে যেন প্রকৃতির শান্তি।

দুপুরে একটা ঝরনার কাছে বিশ্রাম নিল তারা। আরিফ তার ক্যামেরায় রিয়ার ছবি তুলল। “তুমি যেন এই পাহাড়েরই অংশ।” বলে সে একটা ছবি দেখাল। রিয়া লজ্জায় মুখ লুকাল।

সন্ধ্যার আগে তারা মাঝপথের একটা ছোট গ্রামে পৌঁছাল। স্থানীয় এক বুড়ো তাদের থাকার জায়গা দিল। রাতে আকাশ ভর্তি তারা। আরিফ রিয়াকে তার প্রিয় কবিতা শোনাল—জীবনানন্দ দাশের। রিয়া তার পড়া ইংরেজি কবিতা অনুবাদ করে শোনাল।

“তুমি জানো, প্রেম মানে কী?” আরিফ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

রিয়া চুপ করে রইল। তারপর বলল, “প্রেম মানে হয়তো এই মুহূর্ত। যেখানে কোনো প্রত্যাশা নেই, শুধু অনুভূতি।”

সেই রাতে দুজনে পাশাপাশি শুয়ে অনেকক্ষণ কথা বলল। হাতে হাত লাগল অজান্তেই। কোনো কথা হলো না, শুধু হৃদয়ের স্পন্দন শোনা যাচ্ছিল।

তৃতীয় দিন। সবচেয়ে কঠিন অংশ। পথটা খুব খাড়া, বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কাদায় পা পিছলাচ্ছে। আরিফ রিয়াকে পিঠে করে কিছুটা পথ নিয়ে গেল। রিয়া প্রতিবাদ করলেও তার চোখে কৃতজ্ঞতা।

“তুমি ছাড়া আমি হয়তো ফিরে যেতাম।” রিয়া ফিসফিস করে বলল।

“আর আমি তোমাকে ছাড়া এই চূড়ায় উঠতাম না।” আরিফের উত্তর।

বিকেলের দিকে তারা চূড়ায় পৌঁছাল। চারদিকে মেঘের সমুদ্র। সূর্য ডুবছে পশ্চিমে, লাল আলোয় পুরো পাহাড় ঝলমল করছে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। দুজনে পাথরের উপর বসল।

আরিফ রিয়ার হাত ধরল। “রিয়া, আমি জানি না এটা কতটা তাড়াতাড়ি, কিন্তু... আমি তোমাকে পছন্দ করি। খুব বেশি।”

রিয়ার চোখে জল এসে গেল। “আমিও আরিফ। এই পাহাড় আমাদের মিলিয়ে দিয়েছে।”

তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রথম চুমু। চারপাশে মেঘ, নিচে উপত্যকা, উপরে আকাশ। সময় যেন থেমে গিয়েছিল। সেই চুমুতে ছিল সব আবেগ—ভয়, আনন্দ, ভালোবাসা।

রাতে তারা টেন্ট খাটাল চূড়ার কাছে। আগুন জ্বালিয়ে গরম চা খেল। আরিফ তার ক্যামেরায় তাদের দুজনের ছবি তুলল। “এই ছবি আমার জীবনের সেরা।”

চূড়ায় দুদিন কাটিয়ে নামার পথে সমস্যা শুরু হলো। রিয়ার ফোনের নেটওয়ার্ক চলে গেল। তার মা চিন্তা করছে। আরিফেরও একটা জরুরি কাজ ছিল ঢাকায়। নামার সময় রিয়া একবার পা মচকে গেল। আরিফ তাকে কাঁধে নিয়ে নামল।

নিচে নেমে দুজনে আলাদা হয়ে যেতে হবে। রিয়া কাঁদল, “তুমি কি ভুলে যাবে?”

আরিফ তার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “এই পাহাড়ের চূড়া আমাদের সাক্ষী। আমি কখনো ভুলব না।”

ঢাকায় ফিরে তারা যোগাযোগ রাখল। কিন্তু শহরের ব্যস্ততা তাদের দূরে সরিয়ে দিতে চাইছিল। রিয়ার মা চাইছিলেন ভালো ছেলের সাথে বিয়ে। আরিফেরও পরিবারের চাপ। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে তারা ফোনে কথা বলত। আরিফ রিয়াকে ছবি পাঠাত—সেই চূড়ার ছবি।

একদিন রিয়া বলল, “আমি আর পারছি না। চলো আবার যাই।”

ছয় মাস পর। আবার তারা জৈন্তাপুরে। এবার দুজনের হাতে হাত। পথটা এখন চেনা। কিন্তু এবার আরও গভীর আবেগ। চূড়ায় পৌঁছে আরিফ হাঁটু গেড়ে বসল।

“রিয়া, তুমি কি আমার সাথে সারাজীবন এই পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে থাকবে? আমাকে বিয়ে করবে?”

রিয়ার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। “হ্যাঁ... হ্যাঁ আরিফ।”

সেই চূড়ায় তারা প্রতিজ্ঞা করল। নিচে নেমে পরিবারকে বলবে। সূর্যোদয় দেখতে দেখতে তারা জড়িয়ে রইল।

বিয়ে হয়ে গেল। তারা ঢাকায় ছোট একটা বাসায় থাকে। কিন্তু প্রতি বছর তারা মেঘের চূড়ায় যায়। আরিফের ছবি এখন বিখ্যাত। রিয়া একটা বই লিখেছে—‘পাহাড়ের চূড়ায় প্রেম’।

তাদের জীবনে অনেক ঝড় এসেছে—চাকরির চাপ, পরিবারের অসুস্থতা, অর্থের সমস্যা। কিন্তু যখনই তারা চূড়ার ছবি দেখে, মনে পড়ে সেই প্রথম চুমুর কথা। প্রেম মানে শুধু আনন্দ নয়, একসাথে পাহাড় ডিঙানো।

একদিন তাদের ছোট মেয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি মা’কে কোথায় প্রপোজ করেছিলে?”

আরিফ হেসে বলল, “পাহাড়ের চূড়ায়, যেখানে মেঘ আর আকাশ মিলেমিশে এক হয়।”

....
👁 425