ঢাকার ভিড়ে ভরা মিরপুরের একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকতো আরিফ। বয়স ২৮। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দিনরাত কোড লিখে, কফি খেয়ে, আর মাঝে মাঝে ছাদে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো। তার চোখে একটা অস্থিরতা ছিল। যেন কিছু খুঁজে পাচ্ছিল না। বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে। বোনটা চট্টগ্রামে পড়ে। আরিফ একা।
সেই একা একা জীবনে হঠাৎ একদিন এলো সে।
নাম তার নিলুফা। বয়স ২৪। মিরপুরের একটা স্কুলে বাংলা পড়াতো। ছোট্ট একটা সাদা শাড়ি পরে, চুলটা খোলা রেখে, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। প্রথম দেখাতেই আরিফের মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা যেন চাঁদের আলোয় তৈরি।
তারা প্রথম দেখা হয়েছিল ফ্ল্যাটের ছাদে। আরিফ রাত এগারোটায় ছাদে উঠে সিগারেট খাচ্ছিল। নিলুফা তার ছোট বোনকে নিয়ে ছাদে বই পড়ছিল। বোনটা হঠাৎ বলে উঠলো, “আপু, এই ভাইয়া তোমার দিকে তাকিয়ে আছে!”
নিলুফা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আরিফও বিব্রত হয়ে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে হাসলো। “সরি, আমি... মানে, আকাশটা দেখছিলাম।”
সেই থেকে শুরু। ছোট ছোট কথা। “কেমন আছেন?” “ভালো। আপনি?” তারপর ধীরে ধীরে আরও বেশি।
একদিন বৃষ্টি পড়ছিল। আরিফ অফিস থেকে ফিরে দেখে নিলুফা ছাদে দাঁড়িয়ে ভিজছে। তার শাড়ির আঁচলটা উড়ছে। আরিফ ছাতা নিয়ে উঠে গেল।
“ভিজে যাবেন কেন?”
নিলুফা হাসলো। “বৃষ্টি আমার খুব প্রিয়। মনে হয় যেন সব দুঃখ ধুয়ে যায়।”
আরিফ তার পাশে দাঁড়ালো। “তাহলে আমিও ভিজি।”
সেই রাতে তারা প্রথম অনেকক্ষণ কথা বললো। নিলুফা বললো তার গ্রামের কথা। সিলেটের একটা ছোট গ্রাম। বাবা মারা গেছেন। মা আর ছোট বোনকে নিয়ে ঢাকায় এসেছে। স্কুলে পড়ায়, বাসায় টিউশনি করে। স্বপ্ন দেখে একদিন নিজের ছোট্ট একটা লাইব্রেরি খুলবে।
আরিফ বললো তার একাকিত্বের কথা। “সবাই বলে আমি সফল। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হয় কেউ নেই।”
নিলুফা চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে যেন একটা আলো জ্বলে উঠলো।
দিনগুলো যেতে লাগলো। তারা প্রতি সন্ধ্যায় ছাদে দেখা করতো। কখনো চা নিয়ে, কখনো বিস্কুট। কখনো শুধু চুপ করে বসে থাকতো। আরিফ নিলুফার জন্য ছোট ছোট উপহার আনতো। একদিন একটা বই — “প্রেমের গল্প”। নিলুফা লজ্জায় মাথা নিচু করে বললো, “আপনি খুব খারাপ।”
কিন্তু তার চোখে হাসি ছিল।
একদিন আরিফের বোন এলো চট্টগ্রাম থেকে। সে দেখলো ভাইয়ের চোখে নতুন আলো। জিজ্ঞাসা করলো, “কী রে ভাইয়া, কেউ আছে নাকি?”
আরিফ হাসলো। “হ্যাঁ রে। একজন আছে। খুব সুন্দর।”
বোন বললো, “তাহলে নিয়ে আয় বাসায়। মা-বাবাকে বল।”
কিন্তু নিলুফা ভয় পেয়ে গেল। “আমাদের অবস্থা তো দেখছেন। আমি সাধারণ মেয়ে। আপনার পরিবার...”
আরিফ তার হাত ধরলো প্রথমবার। “তুমি যা, তাই যথেষ্ট। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না।”
তারা প্রথমবার হাত ধরে হাঁটলো মিরপুরের রাস্তায়। রাত হয়ে গিয়েছিল। দোকানপাট বন্ধ। শুধু রাস্তার বাতি জ্বলছে। নিলুফা লজ্জায় মাথা নিচু করে হাঁটছিল। আরিফ বললো, “তোমার হাতটা খুব ঠান্ডা।”
নিলুফা ফিসফিস করে বললো, “আপনার জন্য হার্টবিট বেড়ে গেছে।”
সেই রাতে তারা একটা ছোট পার্কে বসলো। চাঁদ উঠেছিল। আরিফ নিলুফার কপালে একটা চুমু দিলো। নিলুফা চোখ বন্ধ করে রইলো। “আরিফ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
আরিফের চোখে পানি চলে এলো। “আমিও তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি, নিলু।”
কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না।
নিলুফার মা জানতে পারলেন। তিনি খুব রাগ করলেন। “তোর বিয়ে দিয়ে দিতে চাই। একটা ভালো ছেলে পেয়েছি। গ্রামের দিকে। চাকরি করে।”
নিলুফা কাঁদতে কাঁদতে বললো, “মা, আমি আরিফকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবো না।”
মা বললেন, “তোর বাবা মারা যাওয়ার পর আমি একা কত কষ্ট করে তোদের মানুষ করেছি। এখন তুই এমন একটা ছেলেকে ভালোবাসিস যার সাথে আমাদের কোনো মিল নেই?”
নিলুফা অনেক কাঁদলো। আরিফকে ফোন করে বললো, “আমাদের হয়তো আর দেখা হবে না।”
আরিফ পাগলের মতো হয়ে গেল। সে সোজা নিলুফাদের বাসায় চলে গেল। নিলুফার মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো।
“আম্মা, আমি নিলুকে সারাজীবন খুশি রাখবো। আমার বাবা-মা আপনাদের সাথে কথা বলবে। আমরা গ্রামে গিয়ে সবাই মিলে থাকবো। প্লিজ...”
নিলুফার মা প্রথমে রাগ করলেন। কিন্তু আরিফের চোখের সততা দেখে গলে গেলেন। “ঠিক আছে। কিন্তু তোমার বাবা-মাকে নিয়ে আসো।”
আরিফের বাবা-মা এলেন। দুই পরিবার মিলে কথা হলো। সবাই রাজি হয়ে গেল।
বিয়ের দিন ঠিক হলো।
বিয়ের আগের রাতে আরিফ আর নিলুফা ছাদে দেখা করলো। চাঁদনী রাত। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।
আরিফ নিলুফাকে জড়িয়ে ধরলো। “তুমি আমার সবকিছু।”
নিলুফা তার বুকে মাথা রেখে বললো, “তুমি আমার চাঁদ।”
তারা অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। বাতাসে ফুলের গন্ধ। দূরে কোনো রিকশার ঘণ্টা বাজছে।
বিয়ের দিনটা ছিল স্বপ্নের মতো। নিলুফা লাল বেনারসি পরে এলো। আরিফ তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভুলে গেল সবকিছু।
বিয়ে হয়ে গেল। তারপর তারা গ্রামের বাড়িতে চলে গেল হানিমুনে।
গ্রামের সেই ছোট নদীর পাড়ে, ধানক্ষেতের মাঝে, তারা হাঁটতো হাত ধরে। সন্ধ্যায় নদীর ঘাটে বসে গল্প করতো। রাতে ছাদে চাঁদ দেখতো।
একদিন নিলুফা বললো, “আরিফ, আমি মা হতে চলেছি।”
আরিফ আনন্দে নিলুফাকে তুলে ঘুরালো। “আমাদের ছোট্ট পরিবার হবে।”
সময় যেতে লাগলো। তাদের ছেলে হলো। নাম রাখলো “আলো”।
আরিফ তার চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে একটা ছোট সফটওয়্যার কোম্পানি শুরু করলো। নিলুফা তার স্বপ্নের লাইব্রেরি খুললো গ্রামে।
প্রতি পূর্ণিমায় তারা ছাদে বসে চাঁদ দেখে। আরিফ নিলুফার হাত ধরে বলে, “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প।”
নিলুফা হেসে বলে, “আর তুমি আমার চিরকালের প্রেমিক।”
তাদের ভালোবাসা কখনো কমেনি। বরং বেড়েছে। ঝগড়া হয়েছে, মান অভিমান হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তারা আরও কাছে চলে এসেছে।
একদিন বুড়ো বয়সে, তাদের নাতি-নাতনির সামনে আরিফ বললো, “ভালোবাসা মানে শুধু আবেগ না, ভালোবাসা মানে প্রতিশ্রুতি। চাঁদনী রাতের মতো, যা কখনো ম্লান হয় না।”
নিলুফা তার হাত ধরে হাসলো। চোখে এখনো সেই প্রথম দিনের লজ্জা আর ভালোবাসা।
....