সমুদ্রের মতো ভালোবাসা

যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে চলে, সেখানে একটা ছোট্ট কফি শপের কোণে বসে আমি প্রথমবার তোমাকে দেখেছিলাম। তুমি ছিলে একটা সাদা সালোয়ার কামিজে, চুল খোলা, চোখে একটা হালকা হাসি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। তুমি জানালার পাশে বসে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখছিলে আর তোমার আঙ্গুল দিয়ে কাপের কিনারায় আঁকিবুকি কাটছিলে। আমার হৃদয়টা যেন থেমে গিয়েছিল সেই মুহূর্তে।

kxz

আমার নাম রাহাত। তোমার নাম? তুমি বলেছিলে, “আমি অনন্যা।” সেই নামটা আমার কানে এখনো বাজে। আমরা দুজনেই একই ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম, কিন্তু কখনো দেখা হয়নি। সেদিন কফি শপে আমি তোমার সামনে বসে জিজ্ঞাসা করলাম, “বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে?” তুমি হেসে বললে, “ভিজতে না, বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগে। যেন আকাশও কাঁদছে আমার মতো।” তোমার কথায় এমন একটা গভীরতা ছিল যে আমি সারা সন্ধ্যা তোমার সাথে গল্প করেছিলাম।

সেই থেকে আমাদের গল্প শুরু।

kx/춺'

প্রথম কয়েক মাস ছিল শুধুই বন্ধুত্বের। আমরা ঢাকা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ঘুরতাম, লাইব্রেরিতে বসে পড়তাম, রাতে ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম। তুমি বলতে, “রাহাত, জীবনটা এত জটিল কেন?” আমি বলতাম, “জটিল না, আমরা জটিল করে ফেলি।” তোমার চোখে যখন স্বপ্ন দেখতাম, তখন আমার মনে হতো এই মেয়েটাই আমার জীবনের অর্থ।

একদিন বিকেলে আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসেছিলাম। বাতাসে ফুলের গন্ধ। তুমি হঠাৎ আমার হাতটা ধরলে। তোমার হাত ঠান্ডা, কিন্তু স্পর্শটা গরম। “রাহাত, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?” তোমার প্রশ্নটা সোজা। আমি চুপ করে তোমার চোখে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, “অনন্যা, আমি তোমাকে এত ভালোবাসি যে ভাষায় বলা যায় না। তুমি আমার শ্বাস, আমার স্বপ্ন, আমার সবকিছু।”

সেই দিন থেকে আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা।

ভালোবাসা কখনো সহজ হয় না। আমাদেরও হয়নি। তোমার বাবা ছিলেন সরকারি অফিসার, খুব严শাসন। আমি একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তুমি বলতে, “বাবা কখনো মানবে না।” কিন্তু আমি বলতাম, “ভালোবাসা সব জয় করে।” আমরা গোপনে দেখা করতাম। কখনো নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানে, কখনো ধানমন্ডির লেকের ধারে। রাতে তুমি ফোন করে বলতে, “রাহাত, আজ তোমার কথা খুব মনে পড়ছে।” আমি তোমাকে গান শোনাতাম – “তুমি যে আমার...”

একবার বর্ষাকাল। ঢাকায় প্রচুর বৃষ্টি। তুমি আমাকে বললে, “চলো কোথাও ঘুরে আসি।” আমরা চলে গেলাম কক্সবাজার। ট্রেনের জার্নি ছিল অনেকক্ষণের। সারা রাত আমরা জানালার পাশে বসে কথা বললাম। তোমার মাথা আমার কাঁধে। বাইরে বৃষ্টি, ভিতরে শুধু আমাদের হৃদয়ের শব্দ। সমুদ্রের ধারে পৌঁছে তুমি দৌড়ে গেলে ঢেউয়ের কাছে। আমি তোমাকে ধরে রাখলাম। “অনন্যা, এই সমুদ্রের মতোই আমার ভালোবাসা অসীম।”

সেখানে আমরা অনেকক্ষণ হাঁটলাম। সূর্যাস্ত দেখলাম। তোমার চুল উড়ছিল বাতাসে। আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “তুমি ছাড়া আমি কিছু না।” তুমি চোখ বন্ধ করে বললে, “আমিও তোমাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।” সেই রাতে হোটেলের বারান্দায় বসে আমরা তারা গুনলাম। তুমি আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লে। আমি তোমার চুলে হাত বুলিয়ে ভাবলাম – এই মুহূর্তটা যেন চিরকাল থেকে যায়।

কিন্তু জীবন চ্যালেঞ্জ ছাড়া চলে না। ফিরে এসে তোমার বাবা জেনে গেলেন আমাদের সম্পর্ক। তিনি তোমাকে বাড়িতে আটকে রাখলেন। আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন। আমি পাগলের মতো হয়ে গেলাম। প্রতিদিন তোমার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। একদিন তুমি চুপিসারে বেরিয়ে এসে বললে, “রাহাত, বাবা বলেছে অন্য জায়গায় বিয়ে দেবে। আমি কী করব?”

আমার চোখে জল চলে এসেছিল। “অনন্যা, তুমি যদি চাও তাহলে আমরা চলে যাই। কোথাও, যেখানে শুধু আমরা দুজন।” তুমি কাঁদতে কাঁদতে বললে, “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। কিন্তু পরিবার...”

সেই রাতটা ছিল সবচেয়ে কষ্টের। আমরা ফোনে কথা বললাম অনেকক্ষণ। তুমি বললে, “রাহাত, আমাদের ভালোবাসা যেন কখনো শেষ না হয়।” আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, “কখনো না। এটা অবিরাম।”

তারপর একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি তোমার বাবার সাথে দেখা করলাম। তাঁকে সব খুলে বললাম। আমার ভালোবাসার কথা, তোমার জন্য আমার স্বপ্নের কথা। প্রথমে তিনি রাগ করলেন। কিন্তু আমার চোখের সততা দেখে কিছুটা নরম হলেন। বললেন, “ছেলে, ভালোবাসা দেখিয়েছ তো প্রমাণ করো। চাকরি করো, সংসার চালানোর যোগ্যতা দেখাও।”

আমি রাতদিন পরিশ্রম করলাম। চাকরি পেলাম একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। কঠিন পরিশ্রম। কিন্তু তোমার জন্য সব সম্ভব। এক বছর পর তোমার বাবা রাজি হলেন।

বিয়ের দিন। তুমি লাল বেনারসিতে। আমি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না। তোমার চোখে জল, আমার চোখেও। যখন কাজী সাহেব বললেন “কবুল”, তখন মনে হলো পুরো দুনিয়াটা আমাদের।

বিয়ের পর আমরা ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট নিলাম মিরপুরে। জীবন শুরু হলো নতুন করে। সকালে তুমি চা বানিয়ে দিতে। আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে বলতাম, “এই চা-এর চেয়েও মিষ্টি তুমি।” তুমি হাসতে। রাতে আমরা ছাদে বসে গল্প করতাম। তোমার কোলে মাথা রেখে আমি বলতাম, “অনন্যা, তুমি আমার সব।”

কিন্তু ভালোবাসার পরীক্ষা আরো আসবে। তোমার শরীর খারাপ হলো। ডাক্তার বললেন, “প্রেগন্যান্ট।” আমরা আনন্দে পাগল। কিন্তু কমপ্লিকেশন ছিল। তুমি অনেক কষ্ট পেলে। আমি রাত জেগে তোমার পাশে বসে থাকতাম। তোমার কপালে হাত বুলিয়ে বলতাম, “আমি আছি। ভয় পেয়ো না।”

একটা সুন্দর মেয়ে হলো। নাম রাখলাম আনন্দিতা। তার চোখ তোমার মতো। যখন সে প্রথম “বাবা” বলল, আমাদের চোখে জল। আমরা তিনজন মিলে ছোট্ট সংসার। সপ্তাহে একদিন আমরা পুরান ঢাকায় যেতাম ইলিশ খেতে। তুমি বলতে, “এই মুহূর্তগুলোই জীবন।”

বছর গড়িয়ে গেল। আনন্দিতা বড় হলো। আমরা বুড়ো হয়ে গেলাম। কিন্তু ভালোবাসা কমেনি। বরং বেড়েছে। তোমার চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু তোমার হাসিটা এখনো সেই প্রথম দিনের মতো। আমি তোমার হাত ধরে বলি, “অনন্যা, এখনো তোমাকে প্রথম দেখার মতো ভালোবাসি।”

একদিন সন্ধ্যায় আমরা ছাদে বসে আছি। আনন্দিতা তার স্বামীর সাথে বাইরে। তুমি আমার কাঁধে মাথা রেখে বললে, “রাহাত, আমাদের ভালোবাসা সত্যিই অবিরাম। অনেক ঝড় এসেছে, কিন্তু আমরা একসাথে।”

আমি তোমার কপালে চুমু খেয়ে বললাম, “হ্যাঁ, এই ভালোবাসা মৃত্যুর পরেও থাকবে। আমরা আবার জন্ম নেব, আবার একে অপরকে খুঁজে নেব।”

সেই রাতে তুমি ঘুমিয়ে পড়লে আমার বুকে। আমি তারা দেখতে দেখতে ভাবলাম – এই জীবনটা তোমার জন্যই সার্থক।

আমাদের গল্প এখানে শেষ না। এটা চলতেই থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কারণ ভালোবাসা অবিরাম। তুমি আমার, আমি তোমার। চিরকাল।

 

....
👁 190