এক ছাতার নিচে

ক্লাসরুমে ঢুকতেই তার চোখ আটকে গেল দ্বিতীয় সারির একটা মেয়ের দিকে। লম্বা চুল, সাদা সালোয়ার কামিজ, চোখে হালকা কাজল। মেয়েটা জানালার দিকে তাকিয়ে কী যেন লিখছিল। তার নাম ছিল নুসরাত। রাহাত আগেও দেখেছে তাকে, কিন্তু আজ কেন জানি হৃদয়টা একটু দ্রুত চলতে শুরু করল।

kxz

লেকচার চলছিল। প্রফেসর স্যার ইলেকট্রনিক্সের সার্কিট ব্যাখ্যা করছিলেন। রাহাতের কলম চলছিল না। তার চোখ বারবার নুসরাতের দিকে চলে যাচ্ছিল। মেয়েটা একবার মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। চোখাচোখি হতেই রাহাত দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। গাল লাল হয়ে গেল।

ক্লাস শেষে সোহেল বলল, “কী রে, নুসরাতের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন?”

kx/춺'

“চুপ কর। কিছু না।”

সেদিন রাতে হলে ফিরে রাহাত তার ডায়েরিতে লিখল:

“আজ একটা মেয়েকে দেখলাম। তার চোখে যেন পুরো বর্ষার মেঘ জমা। নাম নুসরাত। কী যে হলো...”


দিনগুলো কাটছিল। রাহাত আর নুসরাত একই বিভাগে। একদিন ল্যাবে গ্রুপ প্রজেক্টের জন্য দল বানানো হলো। ভাগ্যক্রমে রাহাত, নুসরাত, সোহেল আর আরেকটা মেয়ে একসাথে পড়ল। প্রথম মিটিংয়ে নুসরাত খুব কম কথা বলল। কিন্তু তার হাসিটা ছিল নরম, লজ্জায় ভরা।

“তোমার নাম রাহাত, তাই না?” নুসরাত প্রথমবার সরাসরি কথা বলল।

“হ্যাঁ। আর তুমি নুসরাত।”

“তুমি চট্টগ্রাম থেকে এসেছো শুনলাম। আমার মামার বাড়ি সেখানে।”

সেই ছোট কথোপকথন থেকে শুরু। প্রজেক্টের জন্য প্রায়ই লাইব্রেরিতে বসতে হতো। রাহাত লক্ষ্য করল, নুসরাত খুব মনোযোগী। তার হাতের লেখা সুন্দর, চিন্তা গভীর। একদিন বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে তারা দুজন আলাদা হয়ে যাবে।

“ছাতা আছে?” রাহাত জিজ্ঞাসা করল।

নুসরাত মাথা নাড়ল। “না।”

“চলো, আমার ছাতায় একসাথে যাই।”

বৃষ্টির মধ্যে দুজন এক ছাতার নিচে। রাহাতের কাঁধে নুসরাতের কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টির ফোঁটা ছাতায় পড়ে শব্দ করছিল। নুসরাত হালকা গলায় বলল, “আমার খুব বৃষ্টি ভালো লাগে। ছোটবেলায় গ্রামে থাকতাম। বৃষ্টিতে ভিজে খেলতাম।”

রাহাত হাসল। “আমিও। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতাম।”

সেই দিন থেকে দুজনের মধ্যে একটা সেতু তৈরি হতে শুরু করল।


মাস কয়েক কেটে গেল। রাহাত এখন প্রতিদিন নুসরাতকে দেখার জন্য অপেক্ষা করে। সকালে ক্যাম্পাসে এসেই চোখ খুঁজে। নুসরাতও কখনো কখনো হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়। একদিন ক্যান্টিনে নুসরাতের বন্ধুরা তাকে ডাকল। রাহাত একা বসে চা খাচ্ছিল।

“রাহাত ভাই, এসো আমাদের সাথে বসো।” নুসরাত নিজে ডাকল।

সেদিন অনেকক্ষণ কথা হলো। নুসরাত বলল তার স্বপ্নের কথা— সে ডাক্তার হতে চায়। রাহাত বলল তার গ্রামের কথা, বাবার কষ্টের কথা। দুজনের মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পেল।

রাতে রাহাত লিখল:

“তার সাথে কথা বললে মনে হয় পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। তার হাসিতে যেন সূর্য উঠে। আমি কি পড়ে যাচ্ছি? প্রথমবার এমন অনুভব করছি।”


একদিন কলেজের বার্ষিকী অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নুসরাত গান গাইবে। রাহাত সামনের সারিতে বসে অপেক্ষা করছিল। নুসরাত মাইকের সামনে এসে গাইল:

“আমার ভাঙা ঘরে... তুমি এসো...”

গানের কথাগুলো যেন রাহাতের হৃদয়ে সরাসরি আঘাত করল। নুসরাত গাইতে গাইতে একবার তার দিকে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই নুসরাতের গাল লাল হয়ে গেল।

অনুষ্ঠান শেষে রাহাত ফুল নিয়ে গেল। “খুব সুন্দর গেয়েছো।”

নুসরাত লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল, “থ্যাংক ইউ।”

সেদিন রাতে প্রথমবার রাহাত তার ফোন নম্বর চাইল। নুসরাত দিল।


মেসেজিং শুরু হলো। প্রথমে শুধু প্রজেক্টের কথা, তারপর নিজেদের কথা। নুসরাত লিখত:

“আজ বৃষ্টি হচ্ছে। তোমার কথা মনে পড়ছে।”

রাহাত উত্তর দিত: “আমিও। তোমার সাথে বৃষ্টিতে হাঁটতে ইচ্ছে করছে।”

একদিন নুসরাত বলল, “আমার বাড়িতে কেউ জানে না যে আমি এভাবে কথা বলি কারো সাথে। তুমি আমার প্রথম... বন্ধু এরকম।”

রাহাতের হৃদয়টা ধড়াস করে উঠল। সে বুঝতে পারছিল এটা শুধু বন্ধুত্ব নয়।


পূজার ছুটিতে নুসরাত চলে গেল তার মামার বাড়ি চট্টগ্রামে। রাহাত ঢাকায় একা। প্রতিদিন মেসেজ। একদিন নুসরাত লিখল:

“এখানে বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হচ্ছে তুমি পাশে থাকলে ভালো হতো।”

রাহাত সাহস করে লিখল: “নুসরাত, আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি। শুধু বন্ধুর মতো নয়।”

অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না। রাহাতের বুক কাঁপছিল। তারপর নুসরাতের মেসেজ:

“আমিও... তোমাকে। কিন্তু ভয় লাগছে।”


ছুটি শেষে ফিরে আসার পর দুজন দেখা করল ক্যাম্পাসের পেছনের বাগানে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আকাশে মেঘ।

“রাহাত, আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। কিন্তু আমাদের পরিবার...”

রাহাত তার হাতটা ধরল প্রথমবার। নরম, ঠান্ডা হাত। “আমি অপেক্ষা করব। তোমার জন্য সবকিছু করব।”

নুসরাতের চোখে জল। “এটা আমার প্রথম প্রেম। কখনো ভাবিনি এমন হবে।”

দুজন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। হাতে হাত। বৃষ্টি শুরু হলো। তারা ভিজতে ভিজতে হাসল। প্রথম প্রেমের প্রথম বৃষ্টি।


সময় চলতে লাগল। দুজনের সম্পর্ক গভীর হলো। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা, চিঠি লেখা, রাতে ফোনে অনেকক্ষণ কথা বলা। রাহাত নুসরাতকে তার গ্রামের গল্প শোনাত। নুসরাত তাকে তার স্বপ্নের কথা।

একদিন রাহাত লিখল একটা কবিতা:

“তোমার চোখে হারিয়ে যাই, প্রথম বৃষ্টির মতো নামি। হৃদয়ের গোপন কোণে, তুমি আলো হয়ে জ্বলো সারাক্ষণে।”

নুসরাত পড়ে কেঁদে ফেলল। “এটা আমার জন্য?”

“হ্যাঁ। সব তোমার জন্য।”


কিন্তু জীবন সবসময় সহজ নয়

....
👁 493