রাতের আকাশে চাঁদ উঠলে সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো হয়ে যায়। নরম আলোয় ছড়িয়ে পড়ে চারপাশ। ঠিক তেমনই ছিল সে – আয়েশা। চাঁদের মতোই শান্ত, উজ্জ্বল, আর অসম্ভব সুন্দর। আমি, রাহাত, কখনো ভাবিনি যে একটা সাধারণ ট্রেনের যাত্রায় আমার জীবনটা এমন করে বদলে যাবে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ট্রেন। সেই দীর্ঘ যাত্রা। আমি জানালার পাশে বসে বাইরের অন্ধকার দেখছিলাম। হঠাৎ করে একটা মেয়ে এসে আমার পাশের সিটে বসল। তার পরনে হালকা সবুজ সালোয়ার কামিজ, চুল খোলা, আর চোখে একটা নরম হাসি। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই সিটটা কি খালি?”
আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। কথা বলতে পারছিলাম না। তার গলার স্বরটা যেন মধুর মতো মিষ্টি। সে বসে ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল – “প্রেমের গল্প”। আমি হাসলাম মনে মনে।
“কী দেখছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
“কিছু না। আপনার বইটা দেখছিলাম।”
“আপনিও কি রোমান্টিক গল্প পড়েন?” তার চোখে কৌতূহল।
“পড়ি। কিন্তু বাস্তবে রোমান্স খুব কমই দেখা যায়।”
সে হেসে বলল, “কে জানে, হয়তো এই যাত্রাতেই দেখা যাবে।”
নাম জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, “আয়েশা। আর আপনি?”
“রাহাত।”
সেই রাতটা শুরু হলো আমাদের কথায়। ট্রেন চলছিল, বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। আমরা কথা বলছিলাম জীবনের ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে। সে বলল, সে চট্টগ্রামে একটা কলেজে পড়ে, ইংরেজি সাহিত্য। আমি বললাম, আমি একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করি ঢাকায়। কিন্তু মনটা সবসময় চায় গ্রামের শান্তিতে ফিরে যেতে।
রাত গভীর হলে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তার মাথাটা একটু একটু করে আমার কাঁধে এসে পড়ল। আমি নড়লাম না। চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে তার মুখে পড়ছিল। সত্যি, চাঁদের মতোই লাগছিল তাকে।
সকালে চট্টগ্রাম স্টেশনে নামার সময় সে বলল, “আবার দেখা হবে তো?”
আমি হাসলাম, “অবশ্যই।”
সেই দেখা হওয়াটা হয়েছিল। প্রথমে ফোন, তারপর মেসেজ। তারপর একদিন সে বলল, “আমার বাসায় আসবেন? মা-বাবা আছেন, কোনো সমস্যা নেই।”
আমি গেলাম। তার বাড়িটা সমুদ্রের কাছাকাছি। ছোট্ট একটা বাড়ি, কিন্তু ভরা আদরে। তার মা খুব আদর করে খাবার দিলেন। বাবা আমার সাথে কথা বললেন রাজনীতি আর ব্যবসা নিয়ে। আয়েশা পাশে বসে শুধু হাসছিল।
দিন যেতে যেতে আমাদের সম্পর্ক গভীর হলো। সে ছিল আমার সবচেয়ে বড় সমর্থন। যখন অফিসের চাপে আমি ভেঙে পড়তাম, সে ফোন করে বলত, “রাহাত, তুমি পারবে। চাঁদ তো সবসময় অন্ধকারেও আলো দেয়।”
একদিন আমরা সমুদ্রের ধারে গেলাম। সূর্যাস্তের সময়। লাল আকাশ, ঢেউয়ের শব্দ। সে আমার হাত ধরে বলল, “রাহাত, আমি তোমাকে ভালোবাসি। অনেক অনেক।”
আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। তার চুলে সমুদ্রের হাওয়া লাগছিল। সেই মুহূর্তে মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটা আমার কাছে।
কিন্তু জীবন তো শুধু স্বপ্নের নয়। কয়েক মাস পর তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হার্টের সমস্যা। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগবে। আমি আমার সব সঞ্চয় দিলাম। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুমি কেন এত করছ?”
“কারণ তুমি আমার চাঁদ। চাঁদের জন্য সবকিছু করা যায়।”
অস্ত্রোপচার সফল হলো। তার বাবা সুস্থ হয়ে উঠলেন। সেই রাতে আয়েশা আমাকে ফোন করে বলল, “রাহাত, তুমি আমার নায়ক।”
আমাদের ভালোবাসা আরও গভীর হলো। কিন্তু সমস্যা এলো অন্য দিক থেকে। আমার পরিবার চাইছিল আমি অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করি। তাদের পছন্দের। আমি রাজি হলাম না। ঝগড়া হলো বাড়িতে। আমি চলে এলাম চট্টগ্রামে আয়েশার কাছে।
সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “ভয় পেয়ো না। আমরা একসাথে সব পারব।”
সেই সময়টা ছিল কঠিন। আমি চাকরি ছাড়লাম না, কিন্তু বাসা ভাড়া করে থাকতে শুরু করলাম। আয়েশা প্রতিদিন আসত, রান্না করত, গল্প করত। রাতে আমরা ছাদে বসে চাঁদ দেখতাম। সে বলত, “দেখো, চাঁদ কখনো একা থাকে না। তার তারা আছে। আমিও তোমার তারা।”
একদিন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে করব। কিন্তু তার পরিবারও কিছুটা আপত্তি করল। তারা বলল, “ছেলেটা তো চাকরি ছাড়েনি, কিন্তু পরিবারের সাথে সম্পর্ক খারাপ।”
আয়েশা দৃঢ় গলায় বলল, “আমি রাহাত ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না।”
শেষমেশ দুই পরিবারের মাঝে কথা হয়। আমার বাবা-মা আয়েশাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তার সেই নরম স্বভাব, তার হাসি, তার বুদ্ধি – সবকিছু তাদের মন জয় করল।
বিয়ে হলো এক সুন্দর দিনে। সমুদ্রের ধারে ছোট্ট অনুষ্ঠান। সে লাল বেনারসি পরে এসেছিল। আমি তাকে দেখে মনে মনে বললাম – তুমি সত্যি চাঁদের মতো।
বিয়ের পর আমরা ঢাকায় চলে এলাম। ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট। সকালে সে চা বানিয়ে দিত, আমি অফিস যেতাম। বিকেলে ফিরে দেখতাম সে লেখাপড়া করছে বা গান গাইছে। তার গলায় গান শুনলে মনটা শান্ত হয়ে যেত।
এক বছর পর সে বলল, “রাহাত, আমি মা হতে যাচ্ছি।”
আমি আনন্দে উড়ে গেলাম। সেই রাতে আমরা ছাদে বসে চাঁদ দেখলাম। সে আমার কোলে মাথা রেখে বলল, “আমাদের সন্তানও যেন তোমার মতো দায়িত্বশীল হয়, আর আমার মতো স্বপ্নবিলাসী।”
সময় যেতে লাগল। আমাদের ছেলে হলো – নাম রাখলাম আরিয়ান। আরিয়ান যখন হাসত, তখন আয়েশার চোখ দুটো চকচক করে উঠত। আমি দুজনকে দেখে ভাবতাম – এটাই তো স্বর্গ।
কিন্তু জীবনে ঝড় আসে। আরিয়ানের বয়স যখন তিন বছর, তখন আয়েশার শরীর খারাপ হতে শুরু করল। ডাক্তার বললেন, কিডনির সমস্যা। খুব জটিল অবস্থা।
আমি ভেঙে পড়লাম। কিন্তু আয়েশা বলল, “কাঁদো না। চাঁদ কখনো মরে না, শুধু ঢাকা পড়ে। আমি ঠিক হয়ে যাব।”
অনেক টাকা লাগল। আমি রাতদিন কাজ করলাম। বন্ধুরা সাহায্য করল। তার পরিবার এসে থাকল। কিন্তু অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল।
এক রাতে হাসপাতালে সে আমার হাত ধরে বলল, “রাহাত, যদি আমি না ফিরি, তাহলে আরিয়ানকে বলো যে তার মা তাকে অনেক ভালোবাসত। আর তুমি... তুমি আরেক