নদীর পাড়ে প্রথম দেখা

সন্ধ্যার নরম আলোয় যখন নদীর জলে সোনালি রং ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনই প্রথমবার তার চোখে চোখ পড়ল আমার। বাতাসে হালকা শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল, আর নদীর ঢেউগুলো যেন আমাদের দুজনের হৃদয়ের তালে তাল মিলিয়ে ছলাৎ ছলাৎ করে উঠছিল। সে দাঁড়িয়ে ছিল পাড়ের কিনারায়, লম্বা কালো চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছিল। তার পরনে ছিল হালকা নীল সালোয়ার কামিজ, যা বাতাসে একটু একটু উড়ে তার সুন্দর শরীরের আভাস দিচ্ছিল। চোখ দুটোয় যেন পুরো নদীর গভীরতা আর আকাশের নীলতা মিশে গিয়েছিল।

kxz

আমি রাহাত। বয়স ২৮। ঢাকায় একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করি। গ্রামের বাড়িতে মায়ের শরীর খারাপ, তাই কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে এসেছি। অফিসের চাপে মনটা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে একা হাঁটতে বেরিয়েছিলাম।

সে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

kx/춺'

“এখানে এত সুন্দর সন্ধ্যায় একা একা কী করছেন?” — তার গলায় মিষ্টি সুর।

আমার গলা শুকিয়ে গেল। কোনোমতে বললাম, “আপনার মতোই… নদীকে একটু দেখতে এসেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নদীর চেয়েও সুন্দর কিছু পেয়ে গেছি।”

সে লজ্জায় গাল লাল করে মাথা নিচু করল। “আপনি তো খুব ফাজিল।”

“না, সত্যি বলছি। আপনার নাম কী?”

“নিশি। নিশাত সুলতানা।”

সেই প্রথম দেখার পর আমরা নদীর পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল আমরা যেন অনেকদিনের চেনা। সে বলল, সে চট্টগ্রাম থেকে এসেছে তার দিদির বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য। দিদির বিয়ে হয়েছে এখানে। আমি আমার চাকরি, ঢাকার ব্যস্ত জীবন, আর গ্রামের প্রতি ভালোবাসার কথা বললাম।

রাত বাড়ছিল। চাঁদ উঠেছিল আকাশে। নদীর জলে চাঁদের আলো ঝিকমিক করছিল। আমরা দুজন একটা বড় পাথরের উপর বসলাম। কোনো কথা না বলেও মনে হচ্ছিল হাজারো কথা হচ্ছে।

“রাহাত, আপনি কি প্রায়ই এখানে আসেন?” — নিশি জিজ্ঞাসা করল।

“হ্যাঁ, ছোটবেলা থেকে। এই নদী আমার অনেক কথা শুনেছে। আজ প্রথমবার কাউকে সাথে নিয়ে বসলাম।”

সে হেসে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে একটা আলাদা আলো।

পরের দিন থেকে আমাদের দেখা হতে লাগল প্রতিদিন সন্ধ্যায়। কখনো সে তার প্রিয় গোলাপ ফুল নিয়ে আসত, কখনো আমি তার জন্য চকলেট আর আইসক্রিম। আমরা একসাথে বৃষ্টিতে ভিজেছি। বৃষ্টির দিনে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সে আমার হাত ধরে বলেছিল, “রাহাত, তোমার সাথে থাকলে সব ঝড়ও সুন্দর লাগে।”

আমি তার কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলাম, “নিশি, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঝড়।”

দিন যত যাচ্ছিল, আমাদের ভালোবাসা তত গভীর হচ্ছিল। আমরা নদীর ধারে গান গাইতাম, কবিতা পড়তাম, আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতাম। নিশি বলত, সে ডাক্তার হতে চায়। আমি বলতাম, আমি একটা নিজের কোম্পানি খুলব আর তাকে সবসময় সুখী রাখব।

কিন্তু ভালোবাসার পথ কখনো সোজা হয় না।

একদিন নিশি কাঁদতে কাঁদতে এল। “রাহাত, আমার বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। ছেলেটা ঢাকায় বড় ব্যবসায়ী। পরশু আমাকে নিয়ে যাবে।”

আমার বুকের ভিতরটা ফেটে গেল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “নিশি, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলব।”

সে কাঁদতে কাঁদতে আমার বুকে মাথা রেখে বলল, “আমিও তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। কিন্তু পরিবার… সম্মান…”

সেই রাতে আমরা নদীর পাড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম। পরদিন সকালে নিশির দিদির বাড়িতে গিয়ে তার দিদির সাথে কথা বললাম। দিদি প্রথমে রাগ করল, কিন্তু আমাদের ভালোবাসার কথা শুনে নরম হয়ে গেল। সে বলল, “আমি বাবাকে বোঝাব।”

তারপর শুরু হলো ঝড়। নিশির বাবা প্রথমে রাজি হলেন না। বললেন, “তোমার মতো সাধারণ চাকুরে ছেলের সাথে আমি মেয়ের বিয়ে দিতে পারব না।” আমি অনেক কষ্ট করে তাদের বাড়িতে গিয়ে সব খুলে বললাম — আমার ভালোবাসা, আমার স্বপ্ন, আমার নিশির প্রতি শ্রদ্ধা। নিশি কাঁদতে কাঁদতে বাবার পায়ে পড়ল।

অনেকদিনের কথাবার্তা, অনেক কান্না, অনেক বোঝাপড়ার পর অবশেষে তার বাবা রাজি হলেন। শর্ত ছিল — আমাকে আরও ভালো পজিশনে যেতে হবে। আমি প্রমিস করলাম।

আর তারপর এল সেই দিন। সেই নদীর পাড়েই, যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, সেখানেই এক সুন্দর সন্ধ্যায় সবাইকে নিয়ে আমাদের বিয়ে হলো। নিশি লাল বেনারসি পরে এসেছিল। তার চোখে আনন্দের জল। আমি তার হাতে চুমু খেয়ে বললাম, “তুমি আমার চিরকালের।”

বিয়ে হয়ে গেল। আমরা ঢাকায় চলে এলাম। কিন্তু প্রতি মাসে একবার করে গ্রামে আসি। নদীর পাড়ে হাত ধরে হাঁটি।

একদিন সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে নিশি আমার কানে কানে বলল, “রাহাত, আমি মা হতে চলেছি।”

আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম আনন্দে। নদী যেন আমাদের আশীর্বাদ করছিল।

আজও, বহু বছর পর, আমরা প্রতি সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে আসি। হাতে হাত রেখে। আর মনে হয়, এই নদী আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে অনন্তকাল ধরে বয়ে চলেছে।

শেষ

....
👁 565