প্রথম বৃষ্টি, প্রথম প্রেম

ঢাকা শহরের ভিড়ে ক্লান্ত একটা সন্ধ্যা। রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল মিলে যেন একটা অস্থির সিম্ফনি বাজছে। আরিফ বাস থেকে নেমে ছাতা খুলল। বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। তার কলেজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলছে, ভেতরে কয়েকটা নোটবুক আর একটা পুরনো উপন্যাস। আরিফের বয়স চব্বিশ। স্লিম চেহারা, চশমা পরা, চুলগুলো সবসময় এলোমেলো। সে কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র, কিন্তু তার মনটা সাহিত্য আর স্বপ্নের দিকে বেশি ঝোঁকে।

kxz

বাস স্টপ থেকে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার চোখ পড়ল একটা মেয়ের দিকে। মেয়েটা ছাতা হারিয়ে ভিজছে। তার লম্বা চুল ভিজে কপালে লেপটে আছে, সাদা সালোয়ার কামিজটা বৃষ্টিতে আধভেজা। মেয়েটা ফোন বের করে কাউকে কল করার চেষ্টা করছে, কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই। আরিফ থমকে দাঁড়াল। তার হৃদয়টা অদ্ভুতভাবে দ্রুত বেজে উঠল।

“আপু, ছাতা নিন। আমি এখানে থেকে বাড়ি যাবো,” আরিফ বলল নরম গলায়।

kx/춺'

মেয়েটা চোখ তুলে তাকাল। তার চোখ দুটো বড় বড়, গভীর, যেন কোনো অচেনা সমুদ্র। “না না, ঠিক আছে। আপনি নিয়ে যান,” সে লজ্জা পেয়ে বলল।

“বৃষ্টি বাড়ছে। আমার বাড়ি কাছেই। আপনি নিন।” আরিফ জোর করে ছাতাটা তার হাতে দিয়ে দিল।

মেয়েটার নাম ছিল নাফিসা। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বয়স বাইশ। তার হাসিটা ছিল মিষ্টি, কথা বলার সময় গালে ছোট্ট একটা টোল পড়ত। সেদিন থেকে তাদের দেখা হওয়া শুরু হলো। প্রথমে শুধু হাসি-হাসি, তারপর ছোট ছোট কথা। আরিফ প্রতিদিন বাস স্টপে অপেক্ষা করত। নাফিসাও কখনো কখনো দেরি করে বের হতো যাতে আরিফের সাথে দেখা হয়।

দিনগুলো কাটছিল। একদিন বৃষ্টির দিনে তারা দুজন একই ছাতার নিচে হাঁটছিল। আরিফের হাতটা নাফিসার কাঁধের কাছে। বৃষ্টির ফোঁটা ছাতার উপর পড়ে টুপ টুপ শব্দ করছে।

“তোমার প্রিয় কবিতা কী?” নাফিসা জিজ্ঞেস করল।

“জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’। আর তোমার?” আরিফ বলল।

“রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’র কিছু লাইন। ভালোবাসা যখন অসম্ভব হয়, তখনও সুন্দর।” নাফিসা হাসল।

সেই মুহূর্তে আরিফ বুঝল, সে পড়ে গেছে। গভীরভাবে।

তাদের প্রেমটা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিল। আরিফ নাফিসাকে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরত। একদিন তারা গেল বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে। সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল হয়ে গিয়েছিল। নাফিসা তার কাঁধে মাথা রেখে বলল, “আরিফ, তুমি না থাকলে আমার জীবনটা কত ফাঁকা লাগত।”

আরিফ তার হাতটা শক্ত করে ধরল। “আমিও তোমাকে ছাড়া ভাবতে পারি না। তুমি আমার সবকিছু।”

কিন্তু জীবন তো সবসময় সহজ নয়। নাফিসার বাবা ছিলেন একজন কড়া মানুষ। তিনি চাইতেন মেয়ে তার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করুক। আরিফের পরিবারও মধ্যবিত্ত, তাদের অনেক স্বপ্ন। দুই পরিবারের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব ছিল। নাফিসার বাড়িতে খবর চলে গেল যে সে কারো সাথে ঘুরছে।

একদিন নাফিসা কাঁদতে কাঁদতে আরিফকে ফোন করল। “বাবা বলেছে, আর দেখা করবি না। নইলে পড়াশোনা বন্ধ করে দেবে।”

আরিফের বুকটা ভেঙে গেল। সে রাতে ঘুমাতে পারল না। পরের দিন সে নাফিসার কলেজের গেটে অপেক্ষা করল। নাফিসা এলো চোখ লাল করে। তারা দুজন চুপচাপ হাঁটছিল। কোনো কথা নেই, শুধু হাতে হাত।

“আমরা কি আলাদা হয়ে যাবো?” নাফিসা ফিসফিস করে বলল।

“কখনো না। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। আমরা লড়ব।” আরিফের গলা দৃঢ়।

তারপর শুরু হলো তাদের লুকোচুরি প্রেম। কখনো ক্যাম্পাসের লাইব্রেরিতে, কখনো পার্কে, কখনো বৃষ্টির দিনে ছাদে। একদিন তারা গেল সোনারগাঁওয়ের কাছে একটা গ্রামে। নাফিসার মামার বাড়ি। সেখানে তারা একটা পুকুর পাড়ে বসে সারা দিন গল্প করল। সূর্য ডোবার সময় আরিফ হাঁটু গেড়ে বসল।

“নাফিসা, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। যতদিন লাগে, যত কষ্ট হোক। তুমি আমার জীবনের আলো।”

নাফিসার চোখে জল। সে আরিফকে জড়িয়ে ধরল। “আমিও চাই। তুমি ছাড়া আমার কোনো জীবন নেই।”

কিন্তু সমস্যা বাড়ছিল। নাফিসার বাবা একটা প্রস্তাব এনেছিলেন। ছেলেটা বিদেশে থাকে, ভালো চাকরি। নাফিসা রাজি হলো না। সে বাবার সাথে ঝগড়া করল। বাড়ি থেকে বের হয়ে আরিফের কাছে চলে এলো। আরিফ তাকে তার বন্ধুর ফ্ল্যাটে রাখল কয়েকদিন।

সেই দিনগুলো তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। সকালে একসাথে চা খাওয়া, রাতে একসাথে রান্না করা, বৃষ্টিতে জানালার পাশে বসে কবিতা পড়া। আরিফ নাফিসার চুলে হাত বুলিয়ে বলত, “তোমার চোখে যখন তাকাই, মনে হয় পুরো পৃথিবীটা আমার।”

নাফিসা হেসে বলত, “তুমি আমার কবি। আমার প্রেমিক। আমার সব।”

এক রাতে বৃষ্টি খুব জোরে পড়ছিল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। তারা দুজন ছাদে উঠে গেল। ভিজে যাচ্ছিল দুজনেই। আরিফ নাফিসাকে কাছে টেনে নিল। তাদের ঠোঁট মিলিত হলো প্রথমবার। সেই চুমুতে ছিল বৃষ্টির স্বাদ, ভালোবাসার আবেগ আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। নাফিসার হাত আরিফের বুকে। আরিফের হাত তার কোমরে। সময় যেন থেমে গিয়েছিল।

“আমি তোমাকে ভালোবাসি, নাফিসা। চিরকাল।” আরিফ ফিসফিস করে বলল।

“আমিও তোমাকে, আরিফ। এই ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না।”

কয়েক মাস পর তাদের পরিবারগুলো বুঝল। আরিফের মা-বাবা নাফিসাকে পছন্দ করে ফেললেন। নাফিসার বাবাও শেষমেশ রাজি হলেন, ছেলেটার পরিশ্রম আর সততা দেখে। তারা বিয়ে করল। ছোট একটা অনুষ্ঠান। বৃষ্টির দিনে।

বিয়ের পর তারা একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করল। আরিফ চাকরি পেল একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে। নাফিসা পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করল। তাদের জীবনটা ছিল সাধারণ কিন্তু ভরপুর ভালোবাসায়। প্রতি সন্ধ্যায় তারা বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখত। আরিফ নাফিসার হাত ধরে বলত, “যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম বৃষ্টিতে ভিজতে, সেদিনই বুঝেছিলাম তুমিই আমার।”

নাফিসা হেসে তার কপালে চুমু খেত। “আর আমি বুঝেছিলাম, তুমি ছাড়া আমার কোনো গল্প নেই।”

তাদের প্রেমটা বছরের পর বছর চলতে থাকল। সন্তান হলো, সুখ-দুঃখ এলো, কিন্তু ভালোবাসা কখনো কমল না। বৃষ্টির ছোঁয়ায় যেভাবে ফুল ফোটে, তাদের ভালোবাসাও তেমনি ফুটে উঠেছিল। চিরকালের জন্য।

....
👁 158