ঘন সবুজে লুকিয়ে থাকা প্রেম

চাঁদের আলোয় তার চোখ দুটো যেন স্বপ্নের মতো জ্বলছিল, আর আমি বুঝতে পারলাম, এই জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়াটাও যেন আমাদের জন্যই নিয়তি লিখে দিয়েছে।

kxz

সূর্যটা তখন ঢলে পড়ছিল পশ্চিম দিকে। ঘন সবুজ জঙ্গলের মাথায় লাল-কমলা আলো ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি আর রিয়া দুজনেই হাঁটছিলাম একটা সরু পায়ে হাঁটা পথ ধরে। অফিসের টিম বিল্ডিং প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে আমরা এসেছিলাম এই সুন্দরবনের কাছাকাছি একটা জঙ্গল রিসোর্টে। কিন্তু আজ সকালের ট্রেকিংয়ের সময় আমরা দল থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম।

রিয়া আমার সহকর্মী। মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। তার হাসি দেখলেই অফিসের সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়। লম্বা কালো চুল, গভীর কালো চোখ, আর একটা মিষ্টি হাসি যা যেকোনো মানুষের মন জয় করে নেয়। আমি রাহাত। আইটি ডিপার্টমেন্টে। সাধারণত চুপচাপ থাকি, কিন্তু রিয়ার সাথে কথা বলতে গেলে কেন জানি ভিতরটা উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

kx/춺'

“রাহাত, মনে হয় আমরা ভুল পথে চলে এসেছি,” রিয়া একটু চিন্তিত গলায় বলল। তার কপালে ঘামের ফোঁটা জ্বলজ্বল করছিল।

“চিন্তা করো না। ম্যাপ দেখি,” আমি বললাম। কিন্তু মোবাইলের নেটওয়ার্ক ছিল না। জঙ্গলের গভীরে সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছিল না। সূর্য ডুবে গেল। চারদিক অন্ধকার হয়ে এল।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট্ট খোলা জায়গায় পৌঁছালাম। চারপাশে উঁচু গাছ, লতাপাতা, আর দূরে কোথাও পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। রিয়া আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার নরম হাতের স্পর্শে আমার শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল।

চাঁদের আলোয় তার চোখ দুটো যেন স্বপ্নের মতো জ্বলছিল, আর আমি বুঝতে পারলাম, এই জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়াটাও যেন আমাদের জন্যই নিয়তি লিখে দিয়েছে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। চাঁদ উঠেছে। তার আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছে রিয়ার মুখে। তার চোখ দুটো যেন দুটো তারা। ভয় মিশ্রিত এক অদ্ভুত আকর্ষণ।

“রাহাত… আমি ভয় পাচ্ছি,” সে ফিসফিস করে বলল।

আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম। “আমি আছি তো। কিছু হবে না। চলো, এখানে একটু বসি। ভোর হলে নিশ্চয়ই কেউ খুঁজতে আসবে।”

আমরা একটা বড় গাছের গোড়ায় বসলাম। মাটিতে শুকনো পাতা বিছিয়ে। রিয়া আমার খুব কাছে সরে এল। তার শরীর থেকে একটা মিষ্টি ফুলের গন্ধ আসছিল। আমার হৃদয় দ্রুত চলতে শুরু করল।

রাত বাড়তে লাগল। জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে মাঝে মাঝে পোকার ডাক, দূরের কোনো জন্তুর শব্দ। আমরা কথা বলতে শুরু করলাম। প্রথমে অফিসের গল্প, তারপর নিজেদের জীবনের কথা।

“তুমি জানো রাহাত, আমি ছোটবেলা থেকে জঙ্গল দেখতে চাইতাম। কিন্তু এভাবে হারিয়ে যাব ভাবিনি,” রিয়া হেসে বলল।

আমি তার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলাম। “আমিও। কিন্তু তোমার সাথে হারিয়ে গিয়ে মনে হচ্ছে এটা ভালোই হয়েছে।”

সে লজ্জায় মুখ নিচু করল। কিন্তু তার চোখে একটা আলো জ্বলে উঠল। আমরা আরও কাছাকাছি সরে এলাম। তার মাথা আমার কাঁধে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। তার শরীরের উষ্ণতা আমার শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। আমরা একে অপরের স্বপ্ন, ভয়, আনন্দের গল্প শেয়ার করলাম। রিয়া বলল তার ব্রেকআপের কথা, আমি বললাম আমার একাকীত্বের কথা। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে দূরত্ব মিলিয়ে যাচ্ছিল।

রাত দুটোর দিকে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করল। রিয়া কাঁপছিল। আমি আমার জ্যাকেট খুলে তাকে পুরোপুরি ঢেকে দিলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি না থাকলে আমি পাগল হয়ে যেতাম।”

আমি তার কপালে একটা আলতো চুমু দিলাম। “আমিও তোমাকে ছাড়া এই জঙ্গলে এক মুহূর্ত থাকতে চাইতাম না।”

সেই মুহূর্তে তার ঠোঁট আমার ঠোঁটের খুব কাছে চলে এল। চাঁদের আলোয় আমরা একে অপরকে দেখছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের ঠোঁট মিলিত হল। প্রথম চুমুটা ছিল নরম, অনিশ্চিত। কিন্তু তারপর গভীর, আবেগপূর্ণ। জঙ্গলের নীরবতায় শুধু আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।

সেই রাতে আমরা অনেক কিছু শেয়ার করলাম। শুধু কথা নয়, অনুভূতি, স্পর্শ, আলিঙ্গন। রিয়া আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি তার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবছিলাম — এই হারিয়ে যাওয়াটাই হয়তো আমাদের খুঁজে পাওয়া।

(গল্পের বিস্তারিত অংশ চলছে...)

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। পাখিরা গান গাইতে শুরু করেছে। রিয়া জেগে উঠে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে লজ্জা আর আনন্দ মিশ্রিত। “কাল রাতে… সব সত্যি ছিল তো?” সে জিজ্ঞাসা করল।

আমি তার হাত ধরে বললাম, “পুরোপুরি সত্যি। আর এটা শুরু মাত্র।”

আমরা হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। অবশেষে দূর থেকে উদ্ধারকারী দলের গলা শোনা গেল। তারা আমাদের খুঁজে পেল। কিন্তু আমাদের হৃদয় দুটো জঙ্গলেই রয়ে গিয়েছিল।

অফিসে ফিরে আমাদের সম্পর্ক নতুন করে শুরু হল। প্রতি সপ্তাহে আমরা ছোট ছোট ট্রিপে যেতাম। জঙ্গলের সেই রাত আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে রইল।

কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। আমি আর রিয়া পরবর্তী মাসগুলোতে অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমাদের ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। জঙ্গলের সেই রাতের পর আমরা বুঝেছিলাম, সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো হারায় না, বরং নতুন পথ খুঁজে দেয়।

....
👁 328