রাহাতের বয়স তখন উনিশ। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ। পুরান ঢাকার একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকতো সে, বাবা-মা চট্টগ্রামে। রোজ সকালে বাস ধরে ক্লাসে যেতো। তার জীবন ছিল বই, কফি আর একাকীত্বের মিশ্রণ। প্রেম? সেটা তার কাছে ছিল শুধু বইয়ের পাতায়। বাস্তবে কখনো কারো দিকে তাকিয়ে দেখেনি।
সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল খুব। জুন মাসের বৃষ্টি। রাহাত ক্লাস শেষ করে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়েছিল। ছাতা ভুলে গিয়েছিল ঘরে। বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে বাস স্টপের দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা মেয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
“এক্সকিউজ মি, আপনার ছাতাটা কি একটু শেয়ার করা যাবে? আমারটা ভেঙে গেছে।”
মেয়েটার গলার স্বরটা ছিল বৃষ্টির মতোই ঠান্ডা আর মিষ্টি। রাহাত মুখ তুলে তাকাল। লম্বা চুল, কপালে এক ফোঁটা বৃষ্টির জল, চোখ দুটো যেন কালো মেঘের ভিতর আলো। আফিয়া। পরে জেনেছিল তার নাম।
রাহাত কথা বলতে পারছিল না। শুধু ছাতাটা একটু এগিয়ে দিল। দুজনে পাশাপাশি হাঁটছিল। বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছিল। আফিয়া হাসতে হাসতে বলল, “আপনি কি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?”
রাহাত লজ্জায় লাল হয়ে গেল। “না… মানে… বৃষ্টিতে কথা বলতে ভালো লাগে না।”
আফিয়া হেসে উঠল। সেই হাসিটা রাহাতের বুকের ভিতর কোথাও একটা দরজা খুলে দিল।
সেই প্রথম দেখা। তারপর থেকে রাহাতের দিনগুলো বদলে যেতে শুরু করল।
পরের দিন ক্যাম্পাসে আবার দেখা। আফিয়া ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী। তৃতীয় বর্ষ। লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে বই খুঁজছিল। রাহাত সাহস করে এগিয়ে গেল।
“হ্যালো… কালকের জন্য থ্যাঙ্কস।”
আফিয়া ঘুরে তাকিয়ে হাসল। “ওহ, তুমি! বৃষ্টির ছেলে। কী নাম তোমার?”
“রাহাত।”
“আমি আফিয়া। চলো, ক্যান্টিনে এক কাপ চা খাই। বৃষ্টির পর চা ছাড়া চলে?”
দুজনে ক্যান্টিনে বসল। আফিয়া অনেক কথা বলতো। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়, বাবা স্কুল শিক্ষক, মা গৃহিণী। সে চায় সিভিল সার্ভিস করতে। রাহাত শুধু শুনছিল। তার কথা বলার অভ্যাস ছিল না, কিন্তু আফিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল সে যেন অনেকদিন ধরে চেনে এই মেয়েটাকে।
সেইদিন থেকে প্রতিদিন দেখা হতো। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো টিএসসিতে, কখনো বৃষ্টির দিনে শাহবাগের রাস্তায়। রাহাতের প্রথম প্রেমের অনুভূতি জেগে উঠছিল ধীরে ধীরে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আফিয়ার কথা মনে পড়তো। ক্লাসে বসে তার হাসির কথা ভাবতো। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তার মেসেজের অপেক্ষায় থাকতো।
একদিন আফিয়া বলল, “রাহাত, তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?”
রাহাত মাথা নিচু করে বলল, “না।”
আফিয়া চুপ করে গেল। তারপর আস্তে করে বলল, “আমিও না।”
সেই মুহূর্তটা ছিল তাদের প্রথম স্বীকারোক্তির মতো। কিন্তু কেউ কাউকে সরাসরি বলল না। শুধু চোখে চোখ রেখে হাসল।
গ্রীষ্মের ছুটি এসে গেল। আফিয়া কুমিল্লায় চলে গেল। রাহাত ঢাকায় একা। ফোনে কথা হতো প্রতিদিন। রাত দশটায় আফিয়া কল করতো।
“আজ কী করলে?”
“বই পড়ছিলাম। তুমি?”
“ছাদে বসে আকাশ দেখছি। এখানে তারা অনেক সুন্দর। ঢাকায় তো দেখাই যায় না।”
রাহাত চুপ করে শুনতো। আফিয়ার গলার স্বরটা তার কানে বাজতো। একদিন সে সাহস করে বলল, “আফিয়া, তোমার গলা শুনলে ভালো লাগে।”
আফিয়া হেসে বলল, “তোমারও তো।”
ছুটির পর ক্যাম্পাসে ফিরল আফিয়া। এবার আর শুধু দেখা নয়, একসাথে সময় কাটানো শুরু হল। শুক্রবার সকালে তারা দুজনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গেল। ঘাসের ওপর বসে আইসক্রিম খেল। আফিয়া রাহাতের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “এখানে বসে থাকতে ভালো লাগে।”
রাহাতের হৃদয়টা ধক করে উঠল। সে আফিয়ার হাতটা ধরতে চাইছিল, কিন্তু সাহস পাচ্ছিল না। শেষমেশ আফিয়াই তার হাতটা নিজের হাতে নিল।
“রাহাত, আমি তোমাকে পছন্দ করি। অনেক।”
রাহাতের চোখে জল চলে এল। “আমিও, আফিয়া। প্রথমবারের মতো।”
সেদিন তারা প্রথম হাত ধরে হাঁটল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। বৃষ্টি শুরু হল আবার। দুজনে এক ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। রাহাত আফিয়ার কপালে একটা চুমু দিতে চাইছিল, কিন্তু লজ্জায় পারল না। শুধু বলল, “তুমি আমার জীবনের প্রথম বৃষ্টি।”
তাদের প্রেম ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিল। কিন্তু সমস্যাও আসছিল। আফিয়ার বাবা খুব কড়া। তিনি চান না মেয়ে কারো সাথে ঘুরুক। রাহাতের পরিবারও মধ্যবিত্ত, তারা চায় ছেলে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করুক।
একদিন আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, “বাবা জেনে গেছে আমরা একসাথে ঘুরি। বলেছে আর যোগাযোগ করলে বাড়ি থেকে বের করে দেবে।”
রাহাতের বুকটা ভেঙে গেল। সে আফিয়াকে জড়িয়ে ধরল প্রথমবার। “আমি ছেড়ে দেব না তোমাকে। কোনোদিন না।”
তারা গোপনে দেখা করা শুরু করল। কখনো লাইব্রেরির পিছনে, কখনো নতুন বাজারের ছোট ক্যাফেতে। রাহাত আফিয়ার জন্য ছোট ছোট চিঠি লিখতো। কবিতা। আফিয়া সেগুলো লুকিয়ে রাখতো তার ডায়েরিতে।
এক রাতে আফিয়া ফোন করে বলল, “রাহাত, আমি তোমাকে ভালোবাসি। সত্যি সত্যি।”
রাহাত কাঁপা গলায় বলল, “আমিও তোমাকে ভালোবাসি, আফিয়া। তুমি আমার প্রথম আর শেষ।”
কিন্তু জীবন সহজ নয়। আফিয়ার বাবা তাকে অন্য জেলায় পাঠিয়ে দিলেন পড়াশোনার জন্য। চট্টগ্রামে। রাহাত একা হয়ে গেল। প্রতিদিন মেসেজ করতো, কল করতো। কখনো আফিয়া কাঁদতো, কখনো হাসতো।
“রাহাত, দূরত্ব কি প্রেম মেরে ফেলে?”
“না। দূরত্ব প্রেমকে আরও শক্ত করে।”
তারা এক বছর পর আবার দেখা করল ঢাকায়। আফিয়া ফিরে এসেছিল পরীক্ষার জন্য। দুজনে বুড়িগঙ্গার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখল। রাহাত আফিয়ার হাত ধরে বলল, “আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। যতদিন লাগে।”
আফিয়া তার কাঁধে মাথা রেখে বলল, “আমিও। তুমি আমার প্রথম প্রেম। শেষও।”
বছরখানেক পর। রাহাত গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে। আফিয়াও। তারা দুজনেই চাকরি পেয়েছে। আফিয়ার বাবা শেষমেশ রাজি হয়েছেন। কারণ রাহাতের পরিশ্রম আর সততা দেখে।
বিয়ে হয়েছিল এক বৃষ্টির দিনে। ঠিক যেদিন তারা প্রথম দেখা করেছিল।
আজও, অনেক বছর পর, তারা যখন ছাদে বসে বৃষ্টি দেখে, রাহাত আফিয়ার হাত ধরে বলে, “তোমাকে প্রথম দেখার সেই দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন।”
আফিয়া হেসে বলে, “আর আমারও। প্রথম প্রেম কখনো ভোলে না।”
....