আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল আমার নিজের মায়ের সঙ্গে বিয়ে করবে বলে। সবাই আমাকে বলেছিল, ভুলে যাও, চুপচাপ সরে যাও। কিন্তু আমি যাইনি। আমি তাদের বিয়েতেই হাজির হয়েছিলাম। আর যেই না সে বলল, কবুল, তারা জানতই না খেলা তখনই শুরু হয়ে গেছে। আমন্ত্রণপত্র এসেছিল সাদা খামে। চারপাশে সোনালি বর্ডার। যেন সৌন্দর্য দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার কদর্যতা ঢেকে রাখা যায়। আমার মায়ের নাম—রায়হানা—লেখা ছিল আমার প্রাক্তন স্বামী, মিস্টার নীলের পাশে। নিচে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা: “শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে।” আমি একবার পড়লাম। তারপর হাসলাম। হাসিটা মজার ছিল না। তোমার স্বামী তোমাকে ছেড়ে সেই নারীর কাছে যাচ্ছে, যিনি তোমাকে জন্ম দিয়েছেন এতে মজার কিছু নেই। হাসিটা ছিল ঠান্ডা, ধারালো। যেন ভেতরের কিছু একটা চিরচির করে ভেঙে গেল। নীল তিন মাস আগেই তালাকের কাগজ পাঠিয়েছিল।
“তুমি খুব দূরের মানুষ,” সে বলেছিল।
“কাজপাগল। যথেষ্ট কোমল নও।”
আমার মা, রায়হানা, তখন আমার সোফায় বসে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। পুরুষরা উষ্ণতা চায়, তানহা, ফিসফিস করে বলেছিলেন। তুই সবসময়ই একটু কঠিন।
দুই সপ্তাহ পর, তিনি আমার বাড়িতে চলে এলেন।
নীলের সঙ্গে যেখানে থাকতাম, সেই বাড়িতে নয়।
আমার বাড়িতে।
যে বাড়িটা দাদু ট্রাস্ট করে আমার নামে দিয়ে গিয়েছিলেন যেটা নীল কখনো খেয়ালই করেনি, আর রায়হানা বোঝার চেষ্টাও করেননি।
তালাকের শুনানির দিন নীল এসেছিল নেভি ব্লু স্যুট পরে। মুখে নিখুঁত অনুতাপের মুখোশ।
আমার মায়ের গলায় মুক্তোর মালা।
টেবিলের নিচে তাদের আঙুল একে অপরকে খুঁজে নিচ্ছিল, যতক্ষণ না আমার উকিল সেটা ধরে ফেললেন।
আমি কিছু বলিনি। এটাই তাদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
তারা আমার কান্না দেখতে চেয়েছিল। চিৎকার।
এমন একটা দৃশ্য, যাতে আমি ভেঙে পড়া, দুর্বল, অপমানিত দেখাই। কিন্তু আমি একটা শব্দও খরচ না করে সব কাগজে সই করে দিলাম। পরে নীল ঝুঁকে এসে বলল,
“নিজেকে ছোট কোরো না, তানহা। মুভ অন করো।”
আমার মা আমার গালে চুমু খেলেন।
“একদিন তুই আমাকে ধন্যবাদ দিবি। ও এমন কাউকে ডিজার্ভ করে, যে সত্যি ভালোবাসতে জানে।”
আমি তার নিখুঁত হাসিটার দিকে তাকালাম।
“তুমি ঠিক বলেছ,” আমি আস্তে বললাম।
“ও ঠিক সেটাই পাবে, যা ওর জন্য অপেক্ষা করছে।”
তিনি এক মুহূর্তের জন্য থমকালেন। শুধু এক মুহূর্ত।
তারপর হেসে উঠলেন। আর সবাই হাসল।
আমার কাজিনরা। নীলের বন্ধুরা। এমনকি আমার খালাও মেসেজ দিয়ে বললেন, “আর সিন ক্রিয়েট করিস না।”
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ না। এখান থেকেই আসল “খারাপ” শুরু।
“খারাপ” ছিল নীলের জিম ব্যাগে হোটেলের রসিদ খুঁজে পাওয়া। “খারাপ” ছিল দেখা, আমার মা আমার মেডিকেল রেকর্ডে ঢুকে আমাকে “মানসিকভাবে অস্থির” বানিয়ে রেখেছেন। “খারাপ” ছিল বোঝা, নীল আমাদের কোম্পানি থেকে চুপচাপ টাকা সরাচ্ছে, আর আমাকে বিশ্বাস করাচ্ছে আমি নাকি ভুল দেখছি।
কিন্তু তারা যা জানত না আমি সেই কোম্পানি দাঁড় করিয়েছিলাম,
নীল যখন “বিনিয়োগ” বানানও করতে পারত না, তখন।
আর তারা ভেবেছিল আমি এই সবকিছু নীরবে সজ্য করে যাবো, কোনো প্রতিবাদ করা ছাড়াই।
আমি শুধু চুপ ছিলাম। এটা ভেবে একজন মা কি করে, তার মেয়ের সংসার ভেঙ্গে, সেই মেযের জামাইকে বিয়ে করেন।
এখন আর আমি চুপ থাকবো না, প্রতিবাদ করবোই। রাত তখন প্রায় বারোটা। পুরো বাড়িটা কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে ছিল। শুধু দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটার টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি ডাইনিং টেবিলের সামনে বসে ছিলাম। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে ছিল কিছু ফাইল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর ল্যাপটপ। অনেকক্ষণ ধরে একই জিনিস দেখছি, তবুও মাথার ভেতর যেন কিছুই পরিষ্কার হচ্ছিল না।
শুধু একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল একজন মা কিভাবে নিজের মেয়ের জীবনটা এভাবে ধ্বংস করতে পারে?
নীলের বিশ্বাসঘাতকতা আমাকে যতটা না কষ্ট দিয়েছে, তার থেকেও বেশি কষ্ট দিয়েছে রায়হানার মুখটা। সেই মানুষটা, যিনি ছোটবেলায় আমার অসুখ হলে সারারাত আমার পাশে বসে থাকতেন, তিনিই আজ আমার স্বামীকে নিজের করে নিয়েছেন। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল সবকিছু দুঃস্বপ্ন।
কিন্তু সামনে পড়ে থাকা কাগজগুলো আমাকে বারবার বাস্তবে ফিরিয়ে আনছিল। গত আট মাসে কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েক কোটি টাকা সরানো হয়েছে।
সব ট্রানজেকশনে আমার ডিজিটাল সিগনেচার ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম হয়তো হিসাবের কোনো ভুল। কিন্তু যত গভীরে যাচ্ছিলাম, তত বুঝতে পারছিলাম কেউ খুব পরিকল্পনা করেই আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। আমি ক্লান্ত হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।
অচেনা নাম্বার। কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে থেকে রিসিভ করলাম। “হ্যালো?”
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর একটা শান্ত, ভারী পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। “নীল শুধু তোমার সংসার ভাঙেনি, তোমার কোম্পানিটাও শেষ করার প্ল্যান করছে।”
আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“কে আপনি?”
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “ইয়াসিন। হয়তো একমাত্র মানুষ, যে এখনো তোমাকে বিশ্বাস করে।”
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। নামটা আগে কখনো শুনিনি।
তবুও লোকটার গলায় এমন একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, যেটা অবহেলা করা কঠিন। “আপনি এসব জানলেন কিভাবে?”
ওপাশ থেকে শান্ত গলায় উত্তর এলো, “কারণ আমি অনেকদিন ধরে নীলকে ফলো করছি।
“কেন?”
হালকা একটা হাসির শব্দ শোনা গেল। তারপর সে বলল, “সব কথা ফোনে বলা যাবে না। কাল সকাল দশটায় গুলশানের ব্লু অর্কিড ক্যাফেতে আসো। একা আসবে।”
“আমি কেন আপনাকে বিশ্বাস করব?”
লোকটা খুব ধীর গলায় বলল, “বিশ্বাস করো না।
কিন্তু যদি নিজের কোম্পানি আর নিজের জীবনটা বাঁচাতে চাও, তাহলে আসতে হবে।” তারপরই কল কেটে গেল।
সারারাত আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারলাম না। বারবার মনে হচ্ছিল, লোকটা কে? কেন আমাকে সাহায্য করতে চায়? আর সবচেয়ে বড় কথা, সে এত কিছু জানে কিভাবে?
পরদিন সকালবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিলাম। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে।
গত কয়েক মাসে আমি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি। তবুও আজ আমি দুর্বল দেখাতে চাইনি। কালো শাড়ি পরে চুলগুলো খোলা রাখলাম। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলাম। ক্যাফেতে ঢুকতেই চারপাশে তাকালাম। কোণের একটা টেবিলে বসে থাকা মানুষটাকে দেখে আমার পা থেমে গেল। সাদা শার্ট, কালো ঘড়ি, পরিপাটি দাড়ি আর অদ্ভুত শান্ত চোখ। লোকটা আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল।
“তানহা?”
আমি ধীরে মাথা নেড়ে সামনে গিয়ে বসলাম।
“আপনিই ইয়াসিন?” লোকটা হালকা হাসল। “জি।”
আমি সময় নষ্ট না করে সরাসরি বললাম, “এখন বলুন, আপনি কে?” ইয়াসিন কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করে আমার সামনে রাখল। “আমি তোমাদের কোম্পানির পুরোনো ইনভেস্টরদের একজন। তোমার দাদু আমাকে চিনতেন।”
দাদুর কথা শুনে আমি থমকে গেলাম। “দাদু?”
“হ্যাঁ। উনি মারা যাওয়ার আগে কোম্পানির কিছু শেয়ার আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। কারণ উনি জানতেন, একদিন তোমার চারপাশে এমন মানুষ আসবে যারা তোমাকে ব্যবহার করবে।” আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। আমি ফাইলটা খুলতেই বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
কিছু হোটেল বিল, ব্যাংক ট্রানজেকশন আর কয়েকটা ছবি।
ছবিগুলোতে নীল আর আমার মা একসঙ্গে। খুব কাছাকাছি। খুব স্বাভাবিকভাবে। আমার হাত কাঁপতে শুরু করল। ছবির তারিখগুলো দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। সেগুলো আমার বিয়ের আগের। মানে তখন থেকেই তাদের সম্পর্ক ছিল। আমি ফিসফিস করে বললাম, “না… এটা হতে পারে না…” ইয়াসিন নিচু গলায় বলল, “ওদের সম্পর্ক নতুন না, তানহা।” আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। এতদিন ধরে আমি যেটাকে ভালোবাসা ভেবেছিলাম, সেটা আসলে একটা সাজানো প্রতারণা ছিল।
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “ওরা আমাকে নিয়ে খেলেছে।” ইয়াসিন শান্ত স্বরে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি।” আমি ওর দিকে তাকালাম। অনেকদিন পর কেউ আমাকে করুণা না করে শক্ত হওয়ার কথা বলছে।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “নীল পুরো কোম্পানির কন্ট্রোল নিতে চায়। আর তোমার মা তাকে সাহায্য করছে।” “কিভাবে?”
“তোমাকে মানসিকভাবে অস্থির প্রমাণ করে।” আমি হতবাক হয়ে গেলাম। “কি?”
“তোমার মেডিকেল রিপোর্ট পরিবর্তন করা হয়েছে। যদি কোর্টে প্রমাণ হয় তুমি মানসিকভাবে অসুস্থ, তাহলে তোমার সম্পত্তি আর কোম্পানির কন্ট্রোল তারা সহজেই নিয়ে নিতে পারবে।” নিজের মায়ের কথা মনে হতেই বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, “ওদের আমি শেষ করে দেব।” ইয়াসিন শান্তভাবে বলল, “রাগ দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।”
ঠিক তখনই আমার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘মা’।
আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে কল রিসিভ করলাম। ওপাশে রায়হানার মিষ্টি কণ্ঠ। “তানহা মা, কেমন আছিস?”
আমি ঠান্ডা স্বরে বললাম, “কাজের কথা বলুন।”
তিনি একটু থেমে বললেন, “আজ রাতে আমাদের গায়ে হলুদ। তুই আসবি তো?”
আমার ঠোঁটে ধীরে একটা তিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
“আমাকে অপমান করার জন্য?” তিনি নরম গলায় বললেন, “এসব কি বলছিস? তুই তো আমার মেয়ে।”
আমি চোখ বন্ধ করলাম। এই নারী এত সুন্দর অভিনয় কিভাবে করেন?
তারপর ধীরে বললাম, “আমি আসব।”
কল কেটে দেওয়ার পর ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি সত্যিই যাচ্ছ?” আমি ধীরে মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ। এতদিন ওরা খেলেছে। এবার আমার পালা।”
রাত আটটার দিকে বাড়িটা আলোয় ঝলমল করছিল।
চারদিকে অতিথিদের ভিড়, হাসাহাসি, গানবাজনা। যেন এটা কোনো স্বাভাবিক বিয়ে। যেন কেউ ভুলেই গেছে এখানে মেয়ের প্রাক্তন স্বামী আর মায়ের বিয়ে হচ্ছে।
আমি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকতেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই ফিসফিস করতে শুরু করল। কেউ অবাক, কেউ কৌতূহলী, কেউ আবার মজা দেখার অপেক্ষায়।
আমি কারো দিকে তাকালাম না। সোজা সামনে এগিয়ে গেলাম। স্টেজের ওপর রায়হানা হলুদ শাড়ি পরে বসে আছেন। পাশে নীল। আমাকে দেখেই নীলের মুখের রঙ বদলে গেল। আমি স্টেজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“কেমন আছেন আপনারা?”
নীল অস্বস্তিতে বলল, “তানহা… তুমি এসেছ?”
আমি ঠান্ডা হাসলাম। “কেন? আসতে নেই?”
রায়হানা দ্রুত হাসি ফিরিয়ে এনে বললেন, “আমি জানতাম তুই আসবি। শেষ পর্যন্ত আমি তোর মা।”
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললাম, “মায়েরা কি মেয়ের জীবন চুরি করে?”
চারপাশ মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল। নীল দাঁড়িয়ে বলল, “এখানে নাটক করো না।” আমি শান্ত গলায় বললাম, “নাটক তো তোমরা করছো। আমি শুধু সত্যিটা দেখাতে এসেছি।”
ঠিক তখনই হলরুমের বড় স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। একের পর এক ছবি আর ভিডিও চলতে শুরু করল। সেখানে নীল আর রায়হানা একসঙ্গে। রিসোর্টে। হোটেলে। হাত ধরাধরি করে।
ভিডিওগুলোর তারিখ দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।
কারণ সেগুলো আমার বিয়ের আগের। চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। কেউ ভিডিও করছে, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
রায়হানা কাঁপা গলায় চিৎকার করে উঠলেন, “এগুলো বন্ধ করো!” নীলের মুখ পুরো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে স্টেজে উঠে সবার সামনে দাঁড়ালাম।
“আপনারা সবাই ভাবছিলেন আমি আজ এখানে অপমানিত হতে এসেছি। কিন্তু না। আমি এসেছি সত্যিটা দেখাতে।” আমি নীলের দিকে তাকালাম। “তুমি বলেছিলে আমি ভালোবাসতে জানি না।” তারপর রায়হানার দিকে তাকালাম। “আর আপনি বলেছিলেন, উনি এমন কাউকে ডিজার্ভ করেন, যে সত্যি ভালোবাসতে জানে।”
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, “আজ সবাই দেখুক আপনাদের ভালোবাসা কত পুরোনো।” ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো। “এটা তো কেবল শুরু।”
আমি ঘুরে তাকালাম। কালো স্যুট পরে ইয়াসিন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছে। আর নীলের মুখ দেখে বুঝলাম সে এই মানুষটাকে খুব ভালোভাবেই চেনে।
হলরুমের ভেতর তখন সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা। কয়েক মিনিট আগেও যেখানে হাসি, গান আর কৃত্রিম আনন্দে ভরা পরিবেশ ছিল, সেখানে এখন শুধু ফিসফাস, অবাক দৃষ্টি আর মোবাইল ক্যামেরার ঝলকানি। বিশাল স্ক্রিনে একের পর এক ছবি চলছিল। কোনো ছবিতে নীল আমার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, কোনো ছবিতে দুজনে রিসোর্টের সুইমিংপুলের পাশে হাসছে। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তারিখগুলো। প্রতিটা ছবি আমার বিয়ের আগের। মানে আমি যখন নীলকে বিশ্বাস করে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলাম, তখনই আমার নিজের মা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আমার জীবনটা ভেঙে দিচ্ছিলেন।
আমি স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম। চারপাশের সবাই কখনো আমার দিকে, কখনো রায়হানা আর নীলের দিকে তাকাচ্ছিল। রায়হানার মুখের নিখুঁত হাসিটা অনেক আগেই মুছে গেছে। মুখটা ফ্যাকাশে। চোখেমুখে ভয় আর অপমান স্পষ্ট। নীলও অস্থির হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছিল। সে বারবার স্ক্রিন বন্ধ করার জন্য লোকজনকে ইশারা করছিল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
অতিথিদের অর্ধেকই ভিডিও করা শুরু করে দিয়েছে।
ঠিক তখনই হলরুমের পেছন দিক থেকে ইয়াসিন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। কালো স্যুট পরা, শান্ত মুখের মানুষটা যেন পুরো বিশৃঙ্খলার মাঝেও অদ্ভুতভাবে স্থির। তার চোখ সরাসরি নীলের দিকে। আর নীলের চোখে আমি প্রথমবারের মতো সত্যিকারের ভয় দেখলাম।
আমার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
নীল কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ বলল, “তুমি এখানে কি করছো?” ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বলল, “সত্যিটা দেখতে এসেছি। যদিও তুমি জানতেই, একদিন আমি আসব।” চারপাশের মানুষজন অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছিলাম, এখানে এমন কিছু আছে যেটা আমি এখনো জানি না।
রায়হানা কাঁপা গলায় বললেন, “নীল, এই লোকটা কে?”
নীল চুপ। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।
ইয়াসিন ধীরে স্টেজের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনারা সবাই আজ একটা বিয়ে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু আসলে আজ একটা প্রতারণার মুখোশ খুলছে।” চারপাশ আবার গুঞ্জনে ভরে উঠল।
আমার খালা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “তানহা, এসব কি হচ্ছে? এত বড় কেলেঙ্কারি কেন করছিস?”
আমি ধীরে তার দিকে তাকালাম। “কেলেঙ্কারি আমি করিনি খালা। আমি শুধু সত্যিটা দেখিয়েছি।”
তিনি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। কারণ স্ক্রিনে তখন আরেকটা ভিডিও চলছিল। সেখানে নীল স্পষ্টভাবে বলছে, “তানহাকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না। কোম্পানির কন্ট্রোল হাতে আসলেই সব সহজ হয়ে যাবে।”
পুরো হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমি ধীরে নীলের দিকে তাকালাম। “এবারও বলবে আমি ভুল বুঝেছি?”
নীল দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি বুঝতে পারছো না তুমি কি করছো।” আমি তিক্ত হেসে ফেললাম। “না নীল, এতদিন আমি কিছুই বুঝিনি। এখন সব বুঝতে পারছি।”
রায়হানা হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখ লাল হয়ে গেছে। “তুই নিজের মায়ের সম্মান এভাবে নষ্ট করলি?” আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর খুব আস্তে বললাম, “আপনি যখন নিজের মেয়ের স্বামীকে নিজের করে নিচ্ছিলেন, তখন কি একবারও মনে হয়েছিল আপনি একজন মা?”
আমার কথায় চারপাশে আবার চাপা গুঞ্জন শুরু হলো।
রায়হানা কাঁপা গলায় বললেন, “আমি নীলকে ভালোবাসি।”
আমি হাসলাম। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না।
“ভালোবাসা? নাকি লোভ? কোম্পানির টাকার লোভ? এই বাড়ির লোভ?”
নীল এবার রাগে চিৎকার করে উঠল, “Enough!”
তার চিৎকারে কয়েকজন অতিথি চমকে উঠল। কিন্তু ইয়াসিন একটুও নড়ল না। সে শুধু শান্ত চোখে নীলের দিকে তাকিয়ে রইল। “চিৎকার করে লাভ নেই,” ইয়াসিন বলল।
“সব প্রমাণ এখন বের হয়ে গেছে।”
নীল এবার সরাসরি ইয়াসিনের দিকে এগিয়ে এলো। “তুমি ভাবছো তুমি জিতে গেছো?” ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, “আমি না। তানহা জিতবে।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। মানুষটা এত শান্তভাবে কথা বলে, অথচ তার প্রতিটা কথার ভেতর অদ্ভুত একটা শক্তি। ঠিক তখনই আমার ফোনে একটার পর একটা নোটিফিকেশন আসতে শুরু করল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষজন শেয়ার করছে।
কমেন্ট করছে। কেউ নীলকে অভিশাপ দিচ্ছে, কেউ রায়হানাকে। আমি বুঝলাম, আজকের পর আর কিছু আগের মতো থাকবে না। হঠাৎ নীল আমার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। “তুমি এসবের ফল ভোগ করবে, তানহা।”
আমি ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম না। শুধু ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকালাম। “ভয় দেখাচ্ছো?”
নীল কিছু বলার আগেই ইয়াসিন তার হাতটা সরিয়ে দিল।
এত দ্রুত করল যে আমি নিজেও অবাক হয়ে গেলাম।
“ওর গায়ে আর হাত দেবে না,” ইয়াসিন নিচু গলায় বলল।
দুজনের চোখে চোখ আটকে গেল। কয়েক সেকেন্ডের সেই নীরবতা পুরো হলরুমকে আরও ভারী করে তুলল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এদের মধ্যে পুরোনো কোনো হিসাব আছে। নীল ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তুমি এখনো আগের মতোই নায়ক সাজার চেষ্টা করছো।”
ইয়াসিন শান্ত স্বরে বলল, “আর তুমি এখনো আগের মতোই নিচু।” আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালাম।
“তোমরা একে অপরকে আগে থেকেই চেনো?”
কেউ উত্তর দিল না।
কয়েক সেকেন্ড পর ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানে দাঁড়িয়ে আর কোনো লাভ নেই। চলো।”
আমি চারপাশে তাকালাম। সবাই আমাদের দিকেই তাকিয়ে।
কেউ ফিসফিস করছে, কেউ ভিডিও করছে। রায়হানা স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু আজ প্রথমবার তাকে অসহায় লাগছে। একসময় যেই নারী সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন, আজ তিনিই সবার বিচারাধীন।
আমি ধীরে স্টেজ থেকে নেমে এলাম। বের হওয়ার সময় একবার পেছনে তাকালাম। নীলের চোখে তখন রাগ, অপমান আর ভয় একসঙ্গে। বাইরে বের হতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। মনে হচ্ছিল অনেকদিন পর নিঃশ্বাস নিতে পারছি। ইয়াসিন গাড়ির দরজা খুলে দিল। আমি চুপচাপ ভেতরে বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
শুধু গাড়ির ভেতর হালকা মিউজিক বাজছিল। অনেকক্ষণ পর আমি ধীরে বললাম, “তুমি আসলে কে?”
ইয়াসিন স্টিয়ারিংয়ের দিকে তাকিয়েই বলল, “যে মানুষটা অনেক আগেই বুঝেছিল নীল কেমন।” “কিন্তু তুমি তাকে এত ভালোভাবে চেনো কিভাবে?” সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকল। তারপর বলল, “কারণ একসময় ও আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল।” আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
“কি?”
“আমরা একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। আমি ওকে ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করতাম।” আমি স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “তারপর একদিন বুঝলাম, ও শুধু টাকা আর সুযোগ বোঝে। সম্পর্ক না।” “তাহলে?”
“ও আমার কোম্পানির টাকা আত্মসাৎ করেছিল। আমাকে ফাঁসিয়ে সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছিল। তখনই আমি ওর আসল চেহারা দেখি।” আমি ধীরে বললাম, “আর তারপর?” “তারপর আমি ওর জীবন থেকে সরে যাই।
কিন্তু দূর থেকে নজর রাখতাম। কারণ আমি জানতাম, একদিন ও আরও বড় কিছু করবে।” আমি জানালার বাইরে তাকালাম। রাস্তার লাইটগুলো দ্রুত পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
“আর সেই বড় জিনিসটা আমি?”
ইয়াসিন প্রথমবার সরাসরি আমার দিকে তাকাল। “হ্যাঁ।”
তার চোখে করুণা ছিল না। ছিল এক ধরনের সত্যি অনুভূতি, যেটা অনেকদিন কেউ আমাকে দেয়নি।
আমি আস্তে বললাম, “সবাই আমাকে দোষ দিয়েছে। সবাই বলেছে আমি নাকি যথেষ্ট ভালো স্ত্রী ছিলাম না।”
ইয়াসিন ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “যারা প্রতারণা করে, তারা সবসময় অন্য মানুষকে দোষী বানানোর চেষ্টা করে। এতে তাদের অপরাধটা ছোট মনে হয়।”
আমার গলা ভারী হয়ে এলো। এতদিন পরে মনে হলো কেউ আমাকে সত্যিই বুঝছে। গাড়ি এসে একটা লেকের পাশে থামল। চারপাশে শান্ত পরিবেশ। দূরে পানির ওপর আলো ঝিলমিল করছে। আমি ধীরে বললাম, “এখন কি হবে?”
ইয়াসিন সিটে হেলান দিয়ে বলল, “এখন যুদ্ধ শুরু হবে।”
“মানে?”
“আজ তুমি শুধু ওদের মুখোশ খুলেছো। কিন্তু নীল এত সহজে হার মানবে না। ও চেষ্টা করবে সবকিছু নিজের কন্ট্রোলে আনতে।” “আর আমি?” “তুমি প্রস্তুত হবে।”
আমি তিক্ত হেসে বললাম, “আমি তো ক্লান্ত।”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বলল, “ক্লান্ত মানুষও লড়তে পারে, যদি তার হারানোর কিছু না থাকে।” আমি চুপ করে রইলাম।
হঠাৎ ফোন আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে নীলের নাম।
আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে রিসিভ করলাম।
ওপাশে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।
তারপর নীল নিচু গলায় বলল, “তুমি ভুল করেছো, তানহা।”
আমি ঠান্ডা স্বরে বললাম, “আজ প্রথমবার ঠিক কাজ করেছি।” নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “তুমি ভাবছো সব প্রমাণ তোমার হাতে?” আমার বুক ধক করে উঠল। “মানে?” সে হালকা হেসে বলল, “খেলা এখনো শেষ হয়নি। তোমার কোম্পানির সবচেয়ে বড় গোপন ব্যাপারটা তুমি এখনো জানো না।”
আমি কিছু বলার আগেই কল কেটে গেল।
আমার হাত ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কি হয়েছে?”
আমি ফিসফিস করে বললাম, “নীল বলল… আমি এখনো সব জানি না।” ইয়াসিনের চোখ হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল।
“তার মানে ও পরের চাল দিতে যাচ্ছে।” ঠিক তখনই আমার ফোনে একটা মেসেজ এলো। অচেনা নাম্বার। আমি খুলতেই বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। সেখানে একটা ছবি। ছবিতে আমি। আর আমার পাশে দাঁড়িয়ে ইয়াসিন।
তার নিচে শুধু একটা লাইন লেখা আজ রাতে “এবার তোমাদের দুজনকেই শেষ করব। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমার হাত ধীরে ধীরে কাঁপতে শুরু করল। ছবিটা স্পষ্ট। আমি আর ইয়াসিন লেকের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েক মিনিট আগের ছবি। তার মানে কেউ আমাদের ফলো করছে। শুধু ফলো না, আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ নজরে রাখছে।
ছবির নিচে লেখা লাইনটা বারবার চোখে ভাসছিল।
“এবার তোমাদের দুজনকেই শেষ করব।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি জমে উঠল। এতক্ষণ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল আমি পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে শুরু করেছি। কিন্তু এই একটা মেসেজ যেন বুঝিয়ে দিল, খেলা এখনো অনেক বড়।
ইয়াসিন আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার মুখের শান্ত ভাবটা বদলে গেল। চোখ দুটো কঠিন হয়ে উঠল।
“নাম্বারটা ট্রেস করা যাবে?” আমি আস্তে জিজ্ঞেস করলাম।
ইয়াসিন ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। তারপর নিচু গলায় বলল, “এটা সাধারণ কোনো ভয় দেখানো না। যারা এটা পাঠিয়েছে, তারা জানে আমরা কোথায় আছি।” আমি অস্বস্তিতে চারপাশে তাকালাম। লেকের পাশটা প্রায় ফাঁকা। দূরে কয়েকটা গাড়ির আলো, হালকা বাতাসে পানির ঢেউ, আর মাঝেমধ্যে কুকুরের ডাক ছাড়া তেমন কিছু নেই। কিন্তু হঠাৎ করেই মনে হতে লাগল অন্ধকারের ভেতর কেউ আমাদের দেখছে।
“নীল?” আমি ফিসফিস করে বললাম।
ইয়াসিন ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “সম্ভব। কিন্তু আমি নিশ্চিত ও একা না।” আমার বুকের ভেতর আবার ধক করে উঠল।
“মানে?”
ইয়াসিন এবার সোজা হয়ে বসল। “তোমার কোম্পানির টাকার পেছনে আরও মানুষ আছে। নীল শুধু সামনে ছিল।”
আমি হতবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। “তুমি আগে বলোনি কেন?”
“কারণ পুরো প্রমাণ ছাড়া তোমাকে কিছু বলতে চাইনি।”
আমি মাথা নিচু করলাম। গত কয়েক মাসে এত মিথ্যা শুনেছি যে এখন সত্যিটাও ভয় লাগছে।
হঠাৎ মনে হলো আমি যেন নিজের জীবনটাই চিনতে পারছি না। যাদের আপন ভাবতাম, তারা সবাই একে একে মুখোশ খুলছে। ইয়াসিন গাড়ি স্টার্ট দিল। “আজ রাতে তুমি একা থাকবে না।” আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। “কি?”
“ওরা এখন বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। কারণ আজকের পর ওদের ইমেজ শেষ।” আমি তিক্ত হাসলাম। “ইমেজ? ওদের কি আদৌ কোনো সম্মান বাকি আছে?”
ইয়াসিন উত্তর দিল না। শুধু গাড়িটা ধীরে রাস্তার দিকে ঘুরিয়ে দিল। পুরো রাস্তা আমি চুপচাপ ছিলাম। মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছিল। ইয়াসিন কে? কেন এত সাহায্য করছে? আর নীল আসলে কতদূর যেতে পারে?
গাড়ি এসে আমার বাড়ির সামনে থামতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। গেটের বাইরে দুটো মিডিয়া ভ্যান দাঁড়িয়ে। কয়েকজন রিপোর্টার ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
আমাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এলো। “ম্যাম, আপনার মা আর প্রাক্তন স্বামীর সম্পর্ক নিয়ে কি বলবেন?” “আপনি কি আগে থেকেই জানতেন?”
“ভিডিওগুলো কি আপনি প্রকাশ করেছেন?”
“আপনার মা কি সত্যিই আপনার সম্পত্তি দখল করতে চেয়েছিলেন?” একটার পর একটা প্রশ্ন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ চোখে এসে লাগছিল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর শান্ত গলায় বললাম, “আজকে যা দেখেছেন, সেটাই সত্যি। আর খুব শিগগিরই আরও সত্যি সামনে আসবে।”
সবাই একসঙ্গে আবার প্রশ্ন শুরু করল। কিন্তু ইয়াসিন দ্রুত আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হতেই আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম। মনে হচ্ছিল বাইরে পুরো পৃথিবী আমার জীবন নিয়ে আলোচনা করছে।
আমি সোফায় বসে মাথা চেপে ধরলাম। “আমি আর পারছি না…” ইয়াসিন ধীরে বলল, “তোমাকে পারতেই হবে।”
আমি মাথা তুলে তার দিকে তাকালাম। “তুমি এত নিশ্চিত কিভাবে?” সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কারণ তোমার ভেতরে এখনো ভেঙে না পড়া একটা অংশ আছে।”
আমি হালকা হেসে ফেললাম। “সবাই আমাকে শক্ত ভাবে।
কিন্তু সত্যি বলতে আমি ক্লান্ত।”
ইয়াসিন ধীরে আমার সামনে বসে বলল, “শক্ত মানুষরা কখনো কাঁদে না, এটা ভুল ধারণা। তারা কাঁদে। ভেঙেও পড়ে। কিন্তু আবার উঠে দাঁড়ায়।”
কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিল। অনেকদিন পর কেউ আমাকে মানুষ হিসেবে বুঝতে চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই দরজার বেল বেজে উঠল।
আমি চমকে উঠলাম। এত রাতে কে আসবে?
ইয়াসিন সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল। সে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। রায়হানা দাঁড়িয়ে আছেন।
তার চুল এলোমেলো। মুখের মেকআপ নষ্ট হয়ে গেছে। চোখ দুটো লাল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যেন মানুষটা অনেক বুড়িয়ে গেছেন। আমি স্থির হয়ে গেলাম। রায়হানা ধীরে ভেতরে ঢুকে বললেন, “আমার তোর সঙ্গে কথা আছে।”
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, “এখন?” তিনি আমার দিকে তাকালেন। “প্লিজ।” আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সোফার দিকে ইশারা করলাম। রায়হানা বসে পড়লেন। কিন্তু আজ প্রথমবার তাকে আত্মবিশ্বাসহীন লাগছিল।
তিনি ধীরে বললেন, “তুই আজ যা করেছিস, সেটা খুব বড় ভুল।” আমি অবিশ্বাসের হাসি হাসলাম। “ভুল?”
“তুই বুঝতে পারছিস না ব্যাপারটা কত দূর যাবে।”
আমি সামনে ঝুঁকে বললাম, “আমার জীবনটা ধ্বংস করার সময় আপনার এসব মনে হয়নি?”
রায়হানা চোখ নামিয়ে ফেললেন।
কয়েক সেকেন্ড পর খুব নিচু গলায় বললেন, “আমি নীলকে ভালোবাসতাম।” আমার ভেতরটা জ্বলে উঠল। “সে আমার স্বামী ছিল।” তিনি হঠাৎ মাথা তুলে তাকালেন। “ও কখনো তোকে ভালোবাসেনি।” কথাটা শুনে বুকের ভেতর কেমন ছ্যাঁৎ করে উঠল। আমি ঠান্ডা স্বরে বললাম, “আর আপনাকে ভালোবেসেছে?” রায়হানা চুপ। তার নীরবতাই উত্তর দিয়ে দিল। হঠাৎ তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “আমি জানতাম না ব্যাপারটা এত দূর যাবে।”
আমি তিক্ত হাসলাম। “আপনি জানতেন না? আমার মেডিকেল রিপোর্ট বদলানো হচ্ছিল, কোম্পানির টাকা সরানো হচ্ছিল, আর আপনি কিছুই জানতেন না?”
রায়হানার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “কে বলেছে এসব?”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
তিনি বুঝে গেলেন। ধীরে ধীরে তার চোখ ইয়াসিনের দিকে গেল।
“তুমি…”
ইয়াসিন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।
রায়হানা ফিসফিস করে বললেন, “তুমি আবার ফিরে এসেছো…”
আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালাম। “তোমরা একে অপরকে চেনো?”
কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না। তারপর ইয়াসিন ধীরে বলল, “অনেক আগে থেকে।”
রায়হানা হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠলেন। “তানহা, তুই বুঝতে পারছিস না। এই মানুষটা বিপজ্জনক।”
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
“কি?”
ইয়াসিন হালকা হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না।
“মজার ব্যাপার কি জানেন? সব অপরাধীই সত্যি বলা মানুষকে বিপজ্জনক ভাবে।”
রায়হানা দাঁড়িয়ে গেলেন। “তুই ওর কাছ থেকে দূরে থাক।”
আমি ধীরে বললাম, “যেমন আপনি নীলের কাছ থেকে দূরে ছিলেন?”
তিনি থেমে গেলেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন, “তুই যা ভাবছিস, সব তত সহজ না।”
“তাহলে সত্যিটা বলুন।”
রায়হানা চোখ বন্ধ করলেন। যেন ভেতরে ভেতরে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
তারপর আস্তে বললেন, “নীল শুধু টাকার জন্য এসব করেনি।”
আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
“মানে?”
তিনি ধীরে বললেন, “তোর দাদুর মৃত্যুর পেছনেও একটা রহস্য আছে।”
আমি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
“কি বলছেন আপনি?”
রায়হানার চোখে পানি এসে গেল। “তোর দাদু মারা যাননি… তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল।”
আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“না…”
“আর সেই ঘটনার সঙ্গে নীলের পরিবার জড়িত ছিল।”
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল মাটিটা সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে।
ইয়াসিন এবার ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার মুখ গম্ভীর।
“আমি তানহাকে এখনই এসব বলতে চাইনি।”
রায়হানা কাঁপা গলায় বললেন, “কিন্তু এখন আর লুকিয়ে লাভ নেই। কারণ ওরা আবার সব শুরু করেছে।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আপনি এতদিন কিছু বলেননি কেন?” রায়হানা মাথা নিচু করলেন। “কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“তাহলে নীলকে বিয়ে করলেন কেন?”
তিনি চোখ বন্ধ করে বললেন, “কারণ আমি ভেবেছিলাম এতে সব থেমে যাবে।” আমি অবিশ্বাস নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। একজন মা নিজের মেয়ের স্বামীকে বিয়ে করে সব থামাতে চেয়েছে?
কথাটা শুনতেই অসুস্থ লাগছিল। ঠিক তখনই বাইরে হঠাৎ ব্রেক কষার শব্দ হলো।
ইয়াসিন সঙ্গে সঙ্গে জানালার দিকে তাকাল। তার চোখ মুহূর্তেই বদলে গেল। “তানহা, নিচু হও!” আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচণ্ড শব্দে জানালার কাঁচ ভেঙে গেল।
একটা গুলি এসে দেয়ালে লাগল। আমি চিৎকার করে নিচে পড়ে গেলাম। রায়হানা আতঙ্কে কাঁদতে শুরু করলেন।
ইয়াসিন দ্রুত আমাকে নিজের দিকে টেনে মেঝেতে শুইয়ে দিল। বাইরে আবার গাড়ির শব্দ। তারপর আরও একটা গুলি। আমার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ এত জোরে হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল সবাই শুনতে পাচ্ছে।
ইয়াসিন নিচু গলায় বলল, “ওরা শুরু করে দিয়েছে…”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “কে?” সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “যারা তোমার দাদুকে মেরেছিল। জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ার শব্দটা এখনো কানে বাজছিল। আমি মেঝেতে শুয়ে আছি, শরীর ঠান্ডা, কিন্তু বুকের ভেতর ধকধক শব্দ এত জোরে যে মনে হচ্ছিল পুরো ঘরটা কাঁপছে। বাইরে আবার গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার শব্দ, তারপর দ্রুত দূরে সরে যাওয়ার আওয়াজ। সব মিলিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যা ঘটল, সেটা বাস্তব নাকি দুঃস্বপ্ন—আমি বুঝতেই পারছিলাম না।
ইয়াসিন আমার সামনে বসে ছিল, এক হাত দিয়ে আমাকে আড়াল করে রেখেছে। তার চোখ জানালার দিকে স্থির, পুরো শরীর টানটান সতর্ক অবস্থায়। রায়হানা পাশে মেঝেতে বসে কাঁপছে, তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, চোখে আতঙ্ক আর অনুশোচনার মিশ্রণ।
ঘরটা কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো মেঝেতে পড়ার টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
আমি ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। আমার গলা শুকিয়ে গেছে। “এটা… কারা?”
ইয়াসিন এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল, “এটা এখন আর শুধু পারিবারিক বিষয় না।”
রায়হানা কাঁপা গলায় বললেন, “ওরা আবার শুরু করেছে…”
আমি তার দিকে তাকালাম। “ওরা মানে কে?”
তিনি চোখ নামিয়ে ফেললেন, যেন উত্তর দিতে ভয় পাচ্ছেন।
ইয়াসিন ধীরে উঠে দাঁড়াল, জানালার ভাঙা অংশটা ভালোভাবে দেখল। বাইরে অন্ধকার, কোনো গাড়ির চিহ্ন নেই। তারপর সে ঘুরে বলল, “আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।”
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, “এখন?”
“হ্যাঁ। এখানেই থাকলে ওরা আবার আসবে।”
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই ফোনটা আবার বেজে উঠল।
স্ক্রিনে এবার অচেনা নাম্বার না—নীল।
আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে রিসিভ করলাম।
ওপাশে নীলের কণ্ঠ, ঠান্ডা কিন্তু চাপা উত্তেজনায় ভরা।
“ভেবেছিলে তুমি জিতে গেছো?”
আমি কিছু বললাম না।
সে হেসে উঠল। “তুমি শুধু একটা পার্ট খুলেছো, পুরো বইটা না।”
ইয়াসিন আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে স্পিকার অন করল।
নীল সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ইয়াসিন, তুমিও আছো?”
ইয়াসিন শান্তভাবে বলল, “তুমি এখনো বেঁচে আছো, এটাই অবাক লাগছে।”
নীল হালকা হেসে বলল, “তোমাদের দুজনের জন্যই শেষটা খুব সুন্দর হবে না।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি আবার গুলি করিয়েছো?”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর নীল বলল, “সেটা শুধু সতর্কবার্তা ছিল।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তুমি কি চাও?”
নীল এবার সরাসরি আমার দিকে বলল, “তোমার কাছে এখনও দুটো অপশন আছে। চুপ হয়ে যাও, না হলে সব হারাবে।”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “আমি ইতিমধ্যে সব হারিয়ে ফেলেছি।”
সে ধীরে বলল, “না তানহা, তুমি এখনো বুঝতে পারোনি তুমি আসলে কী হারাতে যাচ্ছো।”
কল কেটে গেল।
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমি ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম। “এখন?”
ইয়াসিন কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল, “এখন আমরা সরে যাবো।”
রায়হানা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। “না, তানহা কোথাও যাবে না।”
আমি তার দিকে তাকালাম। এতদিন পর তার কণ্ঠে আবার সেই কর্তৃত্ব ফিরে এসেছে।
“আপনি কি এখনো ভাবছেন আপনি আমাকে থামাতে পারবেন?”
তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “তুই বুঝতে পারছিস না, এরা শুধু ভয় দেখাচ্ছে না। এরা সত্যিই শেষ করে দিতে পারে।”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “তাই তো আমরা এখনই বের হচ্ছি।”
রায়হানা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমি উঠে দাঁড়ালাম।
“আমি আর পালিয়ে যাবো না।”
এই কথাটা বলার সাথে সাথে ঘরটা যেন আরও ভারী হয়ে গেল।
ইয়াসিন আমার দিকে তাকাল। “এটা পালানো না। এটা বাঁচার পরিকল্পনা।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “আমি আর বাঁচার চেষ্টা করছি না ইয়াসিন। আমি শেষ করতে চাই।”
সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
রায়হানা ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন। যেন পুরো শক্তি শেষ হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই বাইরে আবার গাড়ির শব্দ শোনা গেল। এবার একটার বেশি।
ইয়াসিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “এরা ফিরে এসেছে।”
আমি জানালার দিকে তাকালাম। এবার আর ভয় লাগছিল না, শুধু একটা সিদ্ধান্ত মাথায় ঘুরছিল।
আমি ধীরে বললাম, “তাহলে এবার আমি ওদের সামনে যাবো।”
ইয়াসিন অবাক হয়ে বলল, “এটা পাগলামি।”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “না। এটা শেষ ধাপ।”
রায়হানা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তানহা, না…”
আমি তার দিকে তাকালাম না।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “তুমি যদি এখন বের হও, তাহলে আর ফিরে আসা সহজ হবে না।”
আমি হালকা হাসলাম। “আমি ফিরতেও চাই না।”
এরপর আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড পরে আমার পেছনে এলো।
বাইরে বের হতেই অন্ধকার রাস্তায় তিনটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। হেডলাইট জ্বলে আছে। গাড়ির দরজা খোলা।
মাঝখানের গাড়ি থেকে ধীরে নীল নামল।
তার মুখে কোনো ভয় নেই। শুধু ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস।
আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “তুমি সত্যিই এসেছো।”
আমি সামনে এগিয়ে গেলাম। “তুমি আমাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলে।”
সে হালকা হাসল। “আমি তোমাকে শেষ করতে চেয়েছিলাম।”
চারপাশের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে গেল।
ইয়াসিন আমার পাশে দাঁড়াল।
নীল তাকে দেখে বলল, “তুমি এখনো তার পাশে?”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বলল, “আমি সবসময় সত্যের পাশে থাকি।”
নীল ধীরে হাত তালি দিল। “সত্য? মজার শব্দ।”
তারপর হঠাৎ সে আমার দিকে তাকাল। “তুমি কি জানো তোমার দাদু আসলে কী করেছিল?”
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
ইয়াসিন একধাপ সামনে এগিয়ে গেল। “চুপ করো।”
নীল হেসে বলল, “না, এখন তো সব বলার সময়।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আমার দাদুর কথা কেন টানছো?”
নীল ধীরে বলল, “কারণ পুরো গল্পটা ওখান থেকেই শুরু।”
তারপর সে গাড়ির দিকে ইশারা করল।
“তোমার দাদু ছিল এই সব কিছুর মূল চাবি। আর ইয়াসিন… তার খুব কাছের মানুষ ছিল।”
আমি ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
সে একদম চুপ। মুখ শক্ত। চোখ স্থির।
এই নীরবতা আমাকে সবথেকে বেশি ভয় পাইয়ে দিল।
নীল ধীরে বলল, “তুমি যাকে বিশ্বাস করছো, সে তোমার জীবন বাঁচাতে আসেনি তানহা… সে এসেছে তার নিজের হিসাব শেষ করতে।”
আমি কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারলাম না।
রাতের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
ইয়াসিন ধীরে আমার দিকে ঘুরল।
তার চোখে প্রথমবার আমি কিছু দেখলাম—অতীতের একটা ভারী ছায়া।
সে নিচু গলায় বলল,
“নীল সত্য বলছে না… পুরো সত্য না।”
কিন্তু তার কণ্ঠে এবার সেই আগের আত্মবিশ্বাস ছিল না।
আর ঠিক সেখানেই আমার মনে হলো—
এই যুদ্ধ এখন আর শুধু প্রতিশোধের না,
এটা আসলে সত্য আর মিথ্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলা। নীলের কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইল, যেন পুরো রাতটা হঠাৎ থেমে গেছে। গাড়ির হেডলাইটের আলোতে রাস্তার ধুলো কণা ভাসছিল, আর সেই আলো-অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আমরা সবাই যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধের ভেতর আটকে গেছি।
আমি ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম। তার মুখ শক্ত, চোখ স্থির, কিন্তু কোথাও একটা অস্বাভাবিক চাপা উত্তেজনা লুকিয়ে আছে। নীল আবার হাসল, সেই একই ঠান্ডা হাসি যেটা আমি বহুদিন ধরে ঘৃণা করতে শিখেছি।
“চুপ হয়ে গেল সবাই?” নীল ধীরে বলল। “এতদিন ধরে যে মানুষটা তোমাকে বাঁচানোর ভান করে আসছিল, তার মুখটা এখন দেখো তানহা।”
আমি কিছু বলার আগেই ইয়াসিন এক ধাপ সামনে এগিয়ে গেল। “তুমি এখনো অতীত নিয়ে খেলা বন্ধ করোনি।”
নীল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “অতীত না, সত্য। পার্থক্যটা বোঝো।”
তারপর সে আমার দিকে তাকাল। “তুমি কি জানো তোমার দাদু আসলে কী করেছিল?”
এই প্রশ্নটা শুনে আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এলো। এতদিন ধরে আমি শুধু বর্তমানের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে লড়ছি, কিন্তু এখন হঠাৎ মনে হচ্ছে অতীতটা আসলে আরও ভয়ংকর কিছু লুকিয়ে রেখেছে।
আমি ধীরে বললাম, “আমার দাদুর নাম কেন টানছো তুমি?”
নীল গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে বলল, “কারণ সেই মানুষটাই আমাদের সবার জীবন শুরুতে বদলে দিয়েছে।”
ইয়াসিন হঠাৎ কঠিন গলায় বলল, “চুপ করো নীল।”
নীল হেসে উঠল। “দেখো, এটাই তো সমস্যা। তুমি সবসময় সত্য লুকাতে চেয়েছো।”
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম। তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, কিন্তু তার হাত মুঠো করা।
নীল আবার বলল, “তোমার দাদু একটা বড় ব্যবসায়িক চুক্তি করেছিলেন। যেখানে কোটি কোটি টাকার হিসাব ছিল না শুধু, ছিল ক্ষমতার খেলা।”
আমি ধীরে ধীরে তার কথাগুলো বুঝতে চেষ্টা করছিলাম।
“আর সেই চুক্তির মাঝখানে তোমার দাদু এমন কিছু দেখেছিলেন, যেটা দেখা উচিত ছিল না।”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “এটা মিথ্যা গল্প।”
নীল তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “মিথ্যা হলে তুমি এত চুপ কেন?”
এই প্রশ্নের পর বাতাসটা আরও ভারী হয়ে গেল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এখানে শুধু সম্পর্কের প্রতিশোধ নেই, এখানে অনেক বড় কিছু লুকানো আছে।
ঠিক তখনই রায়হানার গাড়ি এসে থামল পেছনে। তিনি দ্রুত নামলেন। তার মুখে আতঙ্ক, চোখে ভয়।
“তোমরা কি করছো এখানে?” তিনি চিৎকার করে বললেন।
আমি তার দিকে তাকালাম। “সত্য শুনছি।”
তিনি থেমে গেলেন। তারপর কাঁপা গলায় বললেন, “তোমরা কেউ জানো না এখানে কত বড় বিপদ আছে।”
নীল হালকা হাসল। “অবশেষে তুমি সত্য বলার সাহস পাচ্ছো।”
রায়হানা নীলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “চুপ করো!”
তারপর তিনি আমার দিকে ঘুরে বললেন, “তানহা, তুই বুঝতে পারছিস না, এরা সবাই খেলছে।”
আমি ধীরে বললাম, “আমি এখনো খেলায় আছি?”
তিনি চুপ হয়ে গেলেন।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “এখন এখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে বিপদ বাড়ানো। আমাদের যেতে হবে।”
নীল সঙ্গে সঙ্গে বলল, “যাবে কোথায়? পুরো শহরই এখন এই খেলায় ঢুকে গেছে।”
তারপর সে ফোন বের করল। স্ক্রিনে একটা ভিডিও চালু করল।
ভিডিওতে আমি আর ইয়াসিন, লেকের পাশে।
নীল বলল, “এটা এখন লাইভ ছড়াচ্ছে। মানুষ ভাবছে তোমরা দুজন মিলে কিছু লুকাচ্ছো।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। “তুমি এত নিচে নামতে পারলে?”
নীল শান্তভাবে বলল, “ব্যবসা আর যুদ্ধ আলাদা না তানহা।”
ইয়াসিন হঠাৎ বলল, “তুমি ভয় পাচ্ছো তাই এসব করছো।”
নীল তার দিকে তাকাল। “না। আমি শেষ করতে চাই।”
এই কথার পর হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামল। কালো গাড়ি।
গাড়ি থেকে নেমে এল দুজন মানুষ।
তাদের একজনকে আমি চিনি না, কিন্তু দ্বিতীয়জনকে দেখে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
তিনি ছিলেন আমাদের কোম্পানির বোর্ড মেম্বার, যাকে আমি সবসময় নিরপেক্ষ ভেবেছিলাম।
তিনি ধীরে এগিয়ে এসে বললেন, “সবাই থামো।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “আপনি এখানে কেন?”
তিনি আমার দিকে না তাকিয়ে বললেন, “কারণ এই পুরো বিষয় এখন আর পারিবারিক না।”
তারপর তিনি নীলের দিকে তাকালেন। “তুমি অনেক দূর চলে গেছো।”
নীল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি শুধু শুরু করেছি।”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
আমি ধীরে বললাম, “আসলে আমরা সবাই অনেক আগেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি।”
হঠাৎ সেই বোর্ড মেম্বার আমার দিকে তাকালেন।
“তানহা, তুমি জানো না তোমার দাদু আসলে কোন ফাইলটা লুকিয়ে রেখেছিলেন?”
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
“কোন ফাইল?”
তিনি ধীরে বললেন, “যেটা বের হলে পুরো কোম্পানি এক রাতে শেষ হয়ে যেতে পারে।”
নীল হেসে উঠল। “অবশেষে সত্যটা বললে।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, এটা আর শুধু সম্পর্ক বা প্রতিশোধ না। এখানে এমন কিছু আছে যেটা আমার পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
ইয়াসিন আমার দিকে তাকাল। তার চোখে প্রথমবার দ্বিধা।
আমি ধীরে বললাম, “তুমি কিছু লুকাচ্ছো।”
সে কিছু বলল না।
এই নীরবতাই সবথেকে ভয়ংকর উত্তর ছিল।
আমি কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম।
“তাহলে সত্যটা কী?”
নীল ধীরে বলল, “সত্যটা খুব সহজ। তোমার দাদু মারা যায়নি শুধু, তাকে সরানো হয়েছিল কারণ সে এমন কিছু জেনে গিয়েছিল যেটা জানলে এই শহরের বড় বড় মানুষ ধ্বংস হয়ে যেত।”
রায়হানা ফিসফিস করে বললেন, “চুপ করো…”
কিন্তু কেউ আর থামল না।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “তুমি পুরো সত্য বলছো না।”
নীল হেসে বলল, “তুমি জানো আমি মিথ্যা বলছি না।”
তারপর সে আমার দিকে তাকাল।
“আর তুমিও জানো, তুমি যাকে বিশ্বাস করছো সে পুরো সত্য বলছে না।”
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
এবার তার চোখ নরম হয়নি, বরং আরও কঠিন হয়ে গেছে।
সে ধীরে বলল,
“তানহা… এখন সময় এসেছে তুমি সিদ্ধান্ত নাও তুমি কাকে বিশ্বাস করবে।”
এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে এমন একটা চাপ ছিল, যেটা আমাকে থামিয়ে দিল।
বাতাস হঠাৎ আরও ভারী হয়ে গেল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এখন যে সিদ্ধান্ত নেব, সেটা শুধু সম্পর্ক না—পুরো জীবন বদলে দেবে।
নীল ধীরে হাসল। “গেম শুরু।”
আর ইয়াসিন ফিসফিস করে বলল, “না… গেমটা অনেক আগেই শুরু হয়েছে। রাতের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে। যেন পুরো শহরটা একটা অদৃশ্য চাপে থেমে আছে। নীলের শেষ কথাটা “গেম শুরু” এখনো আমার কানে বাজছে। আর ইয়াসিনের চুপ থাকা, সেটাই সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি তৈরি করছে। কারণ যে মানুষ সবসময় সব প্রশ্নের উত্তর জানে, সে যখন নীরব হয়ে যায়, তখন বুঝে নিতে হয় সত্যটা হয়তো আমরা কেউই পুরোটা জানি না।
আমি ধীরে এক পা পিছিয়ে এলাম। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো এখনো আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে—নীল, রায়হানা, বোর্ড মেম্বার, আর সেই অচেনা দুইজন লোক। সবাই যেন এক একটা আলাদা সত্যের টুকরো, কিন্তু পুরো ছবিটা এখনো অন্ধকারে ঢাকা।
আমি আস্তে বললাম, “আমি আর কিছু বুঝতে চাই না… আমি শুধু সত্যটা চাই।”
নীল ঠান্ডা হাসল। “সত্য তোমার কাছে কখনোই ছিল না তানহা।”
ইয়াসিন এবার হঠাৎ বলল, “থামো নীল।”
তার কণ্ঠে এবার কোনো শান্তভাব নেই। প্রথমবার আমি তার মধ্যে চাপা রাগ দেখতে পেলাম।
নীল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “কেন? এখনো কি তুমি ভাবছো তুমি তাকে বাঁচাতে পারবে?”
এই কথার পর হঠাৎ বোর্ড মেম্বার ধীরে এগিয়ে এলেন। তার মুখে কঠিন ভাব।
“এখানে এখনই থামতে হবে। এই জায়গায় আর কোনো ব্যক্তিগত লড়াই চলবে না।”
নীল তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি অনেক দেরি করে এসেছেন।”
তিনি ধীরে বললেন, “তোমরা বুঝতে পারছো না, এই ঝামেলা এখন বাইরে চলে গেছে। মিডিয়া, ইনভেস্টর, সবাই জানে।”
আমি থমকে গেলাম। “মানে?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন। “তোমার দাদুর ফাইলের কথা সবাই জেনে গেছে।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “এটা অসম্ভব।”
বোর্ড মেম্বার মাথা নেড়ে বললেন, “না, এটা বাস্তব। কেউ ইচ্ছা করে ফাঁস করেছে।”
নীল ধীরে হাত তালি দিল। “অবশেষে খেলা সমান হলো।”
আমি রাগে কাঁপতে লাগলাম। “তুমি এটা করেছো?”
নীল হেসে বলল, “আমি শুধু সত্যটা বের করেছি।”
ইয়াসিন এক ধাপ সামনে এগিয়ে গেল। এবার তার চোখে আগের সেই শান্ততা নেই।
“তুমি যদি এই লেভেলে খেলতে চাও, তাহলে তোমাকে থামাতে হবে।”
নীলও এক পা এগিয়ে এলো। “থামাবে তুমি?”
দুইজনের মাঝে বাতাস যেন কেটে যাচ্ছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এখন যেকোনো মুহূর্তে কিছু ভয়ংকর ঘটতে পারে।
ঠিক তখনই রায়হানা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “থামো সবাই!”
সবাই চুপ হয়ে গেল।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “তোমরা কেউ জানো না এই ফাইলের আসল মানে।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। “তাহলে বলুন!”
তিনি ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। চোখে পানি।
“তোর দাদু শুধু ব্যবসা করতেন না… তিনি কিছু মানুষকে সাহায্য করতেন যারা পরে খুব বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।”
আমি ভ্রু কুঁচকালাম।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “তুমি এখনো পুরোটা বলছো না।”
রায়হানা তার দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “কারণ আমি ভয় পাই।”
নীল হেসে বলল, “সবাই ভয় পায়, কারণ সত্য ভয়ংকর।”
আমি চিৎকার করে বললাম, “আমি আর কোনো রহস্য শুনতে চাই না! আমি জানতে চাই কেন আমার জীবনটা ধ্বংস হলো!”
হঠাৎ সেই বোর্ড মেম্বার এগিয়ে এসে বললেন, “কারণ তোমার দাদু এমন একটা ডিলের মাঝখানে ছিল যেটা এই দেশের অনেক ক্ষমতাশালী মানুষকে ধ্বংস করতে পারত।”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “এই নামটা আগে কখনো বলা হয়নি…”
বোর্ড মেম্বার তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কারণ তুমি তখন ছিলে বাইরে।”
এই কথাটা বলার সাথে সাথে ইয়াসিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
নীল হঠাৎ হেসে উঠল। “দেখলে? এখন ধীরে ধীরে সব বের হচ্ছে।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তাহলে আমি এই সবের মধ্যে কোথায়?”
সবাই চুপ।
এই নীরবতাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করল।
আমি আবার বললাম, “আমার দাদু কেন মারা গেল?”
রায়হানা চোখ নামিয়ে বললেন, “কারণ তিনি কিছু ফাইল লুকিয়ে রেখেছিলেন।”
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম। “তুমি জানো?”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “আংশিক।”
এই কথাটা আমার বুকের ভেতর কেটে গেল।
“আংশিক মানে কি?”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “মানে আমি সব জানি না… আর নীলও না।”
নীল তৎক্ষণাৎ বলল, “আমি সব জানি।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বলল, “না, তুমি শুধু তোমার প্রয়োজন মতো জানো।”
এই কথার পর আবার নীরবতা নেমে এলো।
আমি মাথা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল আমার জীবনটা কারো হাতে লেখা একটা স্ক্রিপ্ট, যেখানে আমি শুধু চরিত্র।
ঠিক তখনই বোর্ড মেম্বার ধীরে বললেন, “ফাইলটা যদি একবার ওপেন হয়, তাহলে শুধু কোম্পানি না… পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে।”
আমি ধীরে বললাম, “আমি সেটা দেখতে চাই।”
সবাই একসাথে আমার দিকে তাকাল।
রায়হানা আতঙ্কিত গলায় বললেন, “না তানহা…”
নীল হঠাৎ খুব শান্তভাবে বলল, “ঠিক আছে। খুলে দাও।”
ইয়াসিন দ্রুত বলল, “এটা ভুল সিদ্ধান্ত।”
কিন্তু আমি আর কিছু শুনছিলাম না।
আমি ধীরে বললাম, “আমি জানতেই চাই আমার জীবন কেন ধ্বংস করা হলো।”
নীল আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। “শেষ পর্যন্ত তুমি খেলায় নামলে।”
ঠিক তখন বোর্ড মেম্বার তার ফোন বের করলেন।
একটা ফাইল ওপেন করলেন।
তারপর বললেন, “এটাই সেই ফাইল।”
স্ক্রিনে কিছু ডকুমেন্ট, কিছু নাম, আর কিছু ট্রানজেকশন কোড ভেসে উঠল।
আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না।
নীল ধীরে বলল, “এখন দেখো, সত্যটা কাকে শেষ করে।”
ইয়াসিন হঠাৎ আমার হাত ধরে বলল, “এটা দেখার আগে তোমাকে প্রস্তুত হতে হবে।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“আমি অনেক আগেই ভেঙে গেছি ইয়াসিন।”
সে কিছু বলল না।
আমি ধীরে বললাম, “এখন শুধু জানতে চাই।”
স্ক্রিনটা বড় করে দেখানো হলো।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমি যা দেখলাম…
আমার শরীর পুরো ঠান্ডা হয়ে গেল।
কারণ সেখানে আমার দাদুর নামের পাশে আরেকটা নাম লেখা ছিল
ইয়াসিন। আমি ধীরে তার দিকে তাকালাম। সব শব্দ যেন থেমে গেছে। ইয়াসিনের মুখে এবার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
শুধু নীরবতা। একটা ভয়ংকর নীরবতা।
আর সেই নীরবতার ভেতরেই আমি বুঝে গেলাম
এতদিন আমি যাকে আমার সবচেয়ে বড় সহায় ভেবেছি,
সে-ই হয়তো এই গল্পের সবচেয়ে বড় অজানা সত্য। স্ক্রিনে নামটা দেখার পর আমার চারপাশটা যেন থেমে গেল। শব্দ, আলো, মানুষ সবকিছু একসাথে দূরে সরে যাচ্ছে মনে হচ্ছিল। শুধু একটা নাম বারবার মাথার ভেতর ঘুরছিল ইয়াসিন। দাদুর নামের পাশে তার নাম কেন? কীভাবে? আর কেন এখন, এত বছরের পরে?
আমি ধীরে তার দিকে তাকালাম। ইয়াসিন একদম স্থির। তার চোখে কোনো আতঙ্ক নেই, কিন্তু একটা ভারী চাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যেন সে এই মুহূর্তটা অনেক আগেই জানত, শুধু সময়ের অপেক্ষা করছিল।
নীল ধীরে হাসল। “দেখলে? আমি বলেছিলাম না, সবাই এখানে একটা না একটা গল্প লুকিয়ে রাখে।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “এটা কি সত্যি?”
ইয়াসিন এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “আংশিক।”
এই একটা শব্দ আমার মাথা আরও ঘুরিয়ে দিল।
“আংশিক মানে কী?” আমি চিৎকার করে বললাম।
ইয়াসিন চোখ নামিয়ে নিল। “মানে, সবটা তুমি যেটা দেখছো, সেটা পুরো সত্য না।”
নীল হাত তালি দিল। “ক্লাসিক উত্তর। সব অপরাধীর মতো।”
রায়হানা হঠাৎ এগিয়ে এসে ইয়াসিনের দিকে তাকালেন। “তুমি আবার এই শহরে ফিরে এলে কেন?”
এই প্রশ্নটা শুনে আমি আরও বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম।
“আবার?” আমি বললাম। “তোমরা দুজন একে অপরকে চিনো?”
কেউ উত্তর দিল না।
বোর্ড মেম্বার হালকা কাশি দিয়ে বললেন, “এই মুহূর্তে আবেগ না দেখিয়ে ডকুমেন্টটা বোঝা জরুরি।”
তারপর স্ক্রিনে আরেকটা পেজ খুলল।
সেখানে একটা চুক্তির কপি। কিছু নাম, কিছু তারিখ, আর একটা সাইন।
আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না।
নীল ধীরে বলল, “এই চুক্তিটা ছিল সবকিছুর শুরু।”
ইয়াসিন বলল, “না, এটা ছিল শেষের শুরু।”
আমি মাথা ধরে বললাম, “আমাকে সরাসরি বলো… আমি এতে কোথায়?”
সবাই চুপ।
এই চুপ থাকা আমাকে ভেঙে দিচ্ছিল।
আমি আবার বললাম, “আমার দাদু… কেন মারা গেল?”
রায়হানা ধীরে বললেন, “কারণ তিনি এমন কিছু দেখেছিলেন যেটা দেখা উচিত ছিল না।”
নীল যোগ করল, “আর সেটা লুকাতে গিয়ে অনেক কিছু শেষ হয়ে গেছে।”
আমি চিৎকার করে বললাম, “থামো! আমি ধাঁধা চাই না, সত্য চাই!”
ইয়াসিন হঠাৎ সামনে এগিয়ে এল। “তুমি পুরো সত্য শুনলে আর ফিরে আসতে পারবে না।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
“মানে?”
ইয়াসিন আমার চোখে চোখ রেখে বলল, “মানে, তোমার দাদু শুধু একজন ব্যবসায়ী ছিল না। সে এমন একটা নেটওয়ার্কের সাথে জড়িত ছিল যেটা অনেক বড় মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করত।”
নীল ধীরে বলল, “আর সে সেখান থেকে বের হতে চেয়েছিল।”
আমি ধীরে বললাম, “তাহলে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে?”
কেউ উত্তর দিল না।
এই নীরবতাই উত্তর হয়ে গেল।
আমি পেছনে কয়েক পা সরে এলাম। মাথা ভার হয়ে আসছে।
“তাহলে আমি এতদিন যা দেখেছি… সব পরিকল্পনা?”
রায়হানা নিচু গলায় বললেন, “সব না। কিন্তু অনেক কিছু।”
আমি তার দিকে তাকালাম। “আপনি কোথায় ছিলেন তখন?”
তিনি চুপ হয়ে গেলেন।
নীল হঠাৎ বলল, “তিনি মাঝখানে ছিলেন।”
আমি চোখ সরু করে তাকালাম।
“মানে?”
নীল ধীরে বলল, “তোমার মা শুধু দর্শক ছিল না তানহা। সে অনেক সিদ্ধান্তের অংশ ছিল।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর যেন আগুন লেগে গেল।
আমি চিৎকার করে বললাম, “মিথ্যে!”
রায়হানা কেঁপে উঠলেন। “না তানহা, আমি…”
ইয়াসিন হঠাৎ বলল, “এখানে আর মিথ্যে-সত্য আলাদা করা যাবে না।”
তার কণ্ঠ খুব শান্ত, কিন্তু ভেতরে একটা ভয়ংকর চাপ ছিল।
আমি ধীরে তার দিকে তাকালাম। “তুমি কেন এখানে?”
এই প্রশ্নে ইয়াসিন থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর বলল, “কারণ আমি শেষ করতে এসেছি।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কাকে?”
সে আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, “এই পুরো চক্রকে।”
নীল হেসে উঠল। “চক্র? তুমি এখনো সেই পুরোনো ভাষা ব্যবহার করছো?”
ইয়াসিন এবার নীলের দিকে তাকাল। “তুমি এখনো সেই একই ভুলে আছো।”
দুইজনের মধ্যে আবার সেই টানটান নীরবতা।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এদের লড়াই অনেক আগের। আর আমি শুধু মাঝখানে পড়ে গেছি।
ঠিক তখন বোর্ড মেম্বার ধীরে বললেন, “ফাইলটা যদি লিক হয়, তাহলে শুধু কোম্পানি না… পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়বে।”
আমি ধীরে বললাম, “আমি সেটা চাই।”
সবাই আমার দিকে তাকাল।
ইয়াসিন কড়া গলায় বলল, “তুমি জানো না তুমি কী চাইছো।”
আমি চিৎকার করে বললাম, “আমি জানি আমি কী হারিয়েছি!”
এই কথার পর সবাই চুপ হয়ে গেল।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আমার জীবন… আমার পরিবার… সব।”
নীল ধীরে বলল, “না তানহা, তুমি এখনো অনেক কিছু হারাওনি।”
তারপর সে ফোন বের করল।
একটা অডিও চালু করল।
ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
“যদি ফাইলটা বের হয়, তাহলে মেয়েটাকে সরিয়ে দিতে হবে।”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
এটা কার ভয়েস?
নীল ধীরে বলল, “এটা প্ল্যানের আসল অংশ।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তুমি আমাকে মারতে চেয়েছিলে?”
নীল কিছু বলল না।
ইয়াসিন হঠাৎ খুব দ্রুত সামনে এগিয়ে এলো। “এই অডিওটা ফেক।”
নীল হেসে বলল, “তুমি সবকিছু ফেক বলতে পারো না ইয়াসিন।”
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
তার চোখে এবার অদ্ভুত একটা দ্বন্দ্ব।
আমি ধীরে বললাম, “তুমি কি কিছু লুকাচ্ছো?”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “আমি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছি।”
এই কথাটা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল।
“কিন্তু?” আমি বললাম।
ইয়াসিন থেমে গেল।
এই থেমে যাওয়াটাই আমাকে সবথেকে বেশি ভয় পাইয়ে দিল।
নীল ধীরে বলল, “এবার তুমি বুঝতে পারছো না?”
আমি ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেলাম।
সবকিছু কেমন যেন ভেঙে যাচ্ছে।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “তাহলে আমি কাকে বিশ্বাস করব?”
কেউ উত্তর দিল না।
শুধু বাতাস।
আর সেই বাতাসের ভেতরেই প্রথমবার আমি বুঝতে পারলাম
এই গল্পে কেউই পুরোপুরি সত্যের মানুষ না।
সবাই কোনো না কোনোভাবে অপরাধী।
আর আমি…
আমি শুধু মাঝখানে আটকে থাকা সত্য। অডিওটা শেষ হতেই চারপাশ যেন আবারও ভারী হয়ে গেল। বাতাসে কোনো শব্দ নেই, শুধু দূরের রাস্তার গাড়ির হালকা গুঞ্জন। কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখন যেন হাজারটা শব্দ একসাথে চিৎকার করছে। “মেয়েটাকে সরিয়ে দিতে হবে”—এই একটা লাইন বারবার ভেঙে ভেঙে ফিরে আসছিল।
আমি ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম। সে এখনো ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার মুখে আগের সেই স্থিরতা নেই। এই প্রথম আমি তাকে অস্থির দেখলাম।
নীল ধীরে হাসল। “এবার বুঝতে পারছো? তুমি যাকে বাঁচাতে চাও, সে-ই তোমার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।”
ইয়াসিন এক ঝটকায় মাথা তুলল। “তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো।”
নীল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “সীমা তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।”
আমি কয়েক পা পিছিয়ে এলাম। মাথার ভেতর সবকিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। একদিকে ইয়াসিন, অন্যদিকে নীল, মাঝখানে আমি—আর আমার জীবন যেন কারও পরিকল্পনার ভেতর আটকে থাকা একটা খেলা।
আমি ধীরে বললাম, “আমি আর কিছু শুনতে চাই না।”
রায়হানা এগিয়ে এসে আমার হাত ধরতে চাইলেন। “তানহা…”
আমি তার হাত সরিয়ে দিলাম। “না। এখন আর কেউ আমাকে ছুঁবে না।”
এই কথাটা বলার পর তিনি থেমে গেলেন। তার চোখে পানি।
ইয়াসিন ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এল। “তুমি এখনই এখান থেকে বের হবে।”
আমি তাকালাম তার দিকে। “আর তুমি?”
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি পরে আসব।”
এই উত্তরটা আমার ভালো লাগল না।
নীল হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল। “তুমি ভাবছো ও তোমাকে সত্য বলবে?”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বলল, “চুপ করো।”
নীল হেসে বলল, “না। এখন আর চুপ থাকার সময় নেই।”
তারপর সে আমার দিকে তাকাল।
“তুমি কি জানো, তোমার দাদু মারা যাওয়ার দিন আসলে কী হয়েছিল?”
আমি কিছু বললাম না।
সে ধীরে বলল, “সেদিন একটা ডিল ফাইনাল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তোমার দাদু সরে দাঁড়ায়।”
ইয়াসিন হঠাৎ বলল, “এটা যথেষ্ট।”
নীল আবার বলল, “না, এখনই আসল অংশ।”
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে।
নীল বলল, “তোমার দাদু সরে দাঁড়ানোর পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাকে সরিয়ে দিতে হবে।”
আমি ধীরে বললাম, “কে সিদ্ধান্ত নেয়?”
নীল হেসে বলল, “এই শহরের সবচেয়ে শক্তিশালী কিছু মানুষ।”
আমি ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
“তুমি তখন কোথায় ছিলে?”
ইয়াসিন কিছু বলল না।
এই নীরবতা আবারও আমার ভেতর ভেঙে দিল।
নীল বলল, “দেখলে?”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তুমি কি এতে ছিলে?”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “না।”
কিন্তু তার চোখ সেই কথার সাথে পুরোপুরি মিলছিল না।
আমি পিছিয়ে এলাম। “আমি আর কিছু শুনতে চাই না।”
নীল ধীরে বলল, “তুমি শুনতে না চাইলেও সত্য থেমে থাকবে না।”
ঠিক তখন বোর্ড মেম্বার এগিয়ে এসে বললেন, “এই আলোচনা এখন বন্ধ করতে হবে।”
নীল তার দিকে তাকাল। “আপনিও এতে আছেন।”
বোর্ড মেম্বার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আমি ছিলাম। এখন নেই।”
এই কথাটা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল।
আমি ধীরে বললাম, “আমি বাড়ি যেতে চাই।”
ইয়াসিন মাথা নেড়ে বলল, “চলো।”
কিন্তু নীল সামনে দাঁড়িয়ে গেল। “তুমি যেতে পারবে না তানহা।”
আমি চোখ সরু করে তাকালাম। “কেন?”
নীল ধীরে বলল, “কারণ তুমি এখন শুধু একজন মানুষ না। তুমি একটা প্রমাণ।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার বুক ধক করে উঠল।
ইয়াসিন হঠাৎ বলল, “তুমি তাকে ব্যবহার করতে পারবে না।”
নীল শান্ত গলায় বলল, “আমি করছি না। আমি শুধু সত্যটা বলছি।”
আমি ধীরে বললাম, “কিসের প্রমাণ?”
নীল আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার দাদুর শেষ ডকুমেন্টে তোমার নাম আছে।”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
“কি?”
নীল ধীরে বলল, “তোমাকে ইচ্ছাকৃতভাবে এই সবের মাঝে রাখা হয়েছে।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “না…”
ইয়াসিন ধীরে আমার দিকে তাকাল। “এটা পুরো সত্য না।”
নীল হেসে বলল, “আধা সত্যও অনেক বড় বিপদ।”
ঠিক তখন হঠাৎ দূরে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল।
সবাই একসাথে থেমে গেল।
বোর্ড মেম্বার দ্রুত বললেন, “পুলিশ আসছে।”
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। “পুলিশ?”
ইয়াসিন দ্রুত বলল, “তারা তোমাকে নিতে আসছে।”
আমি চমকে উঠলাম। “আমাকে?”
নীল হালকা হাসল। “কারণ তুমি এখন তদন্তের অংশ।”
আমি পিছিয়ে এলাম।
ইয়াসিন আমার হাত ধরল। “এটা তাদের প্ল্যান।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তাহলে এখন কি করব?”
ইয়াসিন এক মুহূর্ত থেমে বলল, “আমার সাথে আসতে হবে।”
নীল ধীরে বলল, “যাবে কোথায়?”
ইয়াসিন এবার কঠিন গলায় বলল, “যেখানে সত্য লুকানো আছে।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
“সত্য কোথায়?”
ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার দাদুর পুরোনো অফিসে।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভয় আর কৌতূহল একসাথে তৈরি হলো।
নীল হেসে বলল, “তুমি কি সত্যিই সেখানে যেতে চাও?”
আমি কিছু বললাম না।
কারণ এবার আমার ভেতরের কিছু একটা বলছিল—এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার পথ নেই।
আমি ধীরে বললাম, “আমি যাবো।”
রায়হানা চিৎকার করে উঠলেন, “না তানহা!”
কিন্তু আমি আর শুনলাম না।
ইয়াসিন আমার হাত ধরে গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে গেল।
পেছনে নীলের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“তুমি যত গভীরে যাবে, তত হারাবে নিজেকে।”
গাড়ি স্টার্ট দিল।
রাস্তায় বের হতেই আমি জানালার বাইরে তাকালাম।
শহরের আলো এখনো জ্বলছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল এই আলো আর আমার জীবনের অংশ না।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “ভয় পেয়েছো?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “না। শুধু জানি না আমি কার পাশে আছি।”
সে কিছু বলল না।
এই নীরবতা আবারও আমাকে অস্থির করে তুলল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা পুরোনো বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামল।
ইয়াসিন বলল, “এটাই।”
আমি নিচে নেমে বিল্ডিংটার দিকে তাকালাম।
পুরোনো, ভাঙা, অন্ধকার।
মনে হচ্ছিল এই জায়গাটাই সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রেখেছে।
আমি ধীরে বললাম, “এখানে?”
ইয়াসিন মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। তোমার দাদু এখানেই শেষবার কাজ করেছিল।”
আমি ভেতরে পা রাখলাম।
আর ঠিক তখনই বুঝলাম—
এই গল্পের সবচেয়ে বড় সত্য এখনো শুরুই হয়নি। পুরোনো বিল্ডিংটার ভেতরে ঢুকতেই বাতাসটা আলাদা হয়ে গেল। ধুলো আর কাগজের গন্ধ মিশে আছে চারপাশে, যেন বহু বছর ধরে এখানে কেউ আসে না। প্রতিটা পদক্ষেপে মেঝে কাঁপছে, আর সেই কাঁপন আমার বুকের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ছে।
ইয়াসিন সামনে হাঁটছে, তার হাতে টর্চলাইট। আলোটা দেয়াল বেয়ে বেয়ে সামনে যাচ্ছে, আর পুরোনো ফাইল, ভাঙা চেয়ার, আর ধুলো জমে থাকা টেবিলগুলো ধীরে ধীরে চোখে পড়ছে।
আমি আস্তে বললাম, “তুমি এখানে আগে এসেছিলে?”
ইয়াসিন থামল না। শুধু বলল, “হ্যাঁ।”
এই একটা শব্দেই আমি বুঝে গেলাম, এখানে তার অতীত লুকানো আছে।
আমরা একটা বড় কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজাটা আধভাঙা। ইয়াসিন ধীরে ঠেলে খুলল।
ভেতরে ঢুকতেই আমি থমকে গেলাম।
ঘরের মাঝখানে একটা বড় টেবিল, আর টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে পুরোনো ফাইল, ছবি, আর কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া ডকুমেন্ট। দেয়ালে একটা পুরোনো ছবি টাঙানো—আমার দাদু, কয়েকজন অচেনা মানুষ, আর… ইয়াসিন।
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
“এটা…”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “তোমার দাদুর শেষ টিম।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তুমি সত্যিই এখানে ছিলে?”
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ছিলাম।”
এই শব্দটা আমার বুকের ভেতর একটা আঘাতের মতো লাগল।
আমি ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগোলাম। একটা ফাইল খুললাম।
ভেতরে লেখা—
“প্রজেক্ট নেক্সাস”
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম। “এটা কী?”
সে ধীরে বলল, “একটা সিস্টেম, যেটা বড় বড় ব্যবসা আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করত।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তাহলে আমার দাদু…”
ইয়াসিন আমার দিকে তাকাল। “সে এটা বন্ধ করতে চেয়েছিল।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা শব্দ এল।
ধাতব দরজা ধীরে খুলছে।
আমি চমকে ঘুরে তাকালাম।
নীল দাঁড়িয়ে আছে দরজায়।
তার মুখে কোনো ভয় নেই, শুধু ঠান্ডা একটা হাসি।
“আমি বলেছিলাম, তুমি এখানে আসবে।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তুমি আমাদের ফলো করেছো?”
নীল ধীরে ভেতরে ঢুকল। “না। আমি জানতাম তোমরা এখানে আসবে।”
ইয়াসিন ধীরে সামনে এগোল। “তুমি এখান থেকে বের হও।”
নীল হেসে বলল, “না। আজকে সব শেষ হবে।”
আমি চিৎকার করে বললাম, “তুমি আসলে চাওটা কী?”
নীল আমার দিকে তাকাল। “সত্য।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি সত্যের কথা বলো না। তুমি নিয়ন্ত্রণ চাও।”
নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “হয়তো দুটোই।”
ঠিক তখনই বাইরে সাইরেনের শব্দ আবার শোনা গেল।
আমি আতঙ্কে বললাম, “পুলিশ আবার এসেছে…”
ইয়াসিন দ্রুত বলল, “না, এটা অন্য কেউ।”
নীল ধীরে বলল, “ওরা এখন সবাই আসছে।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে নেই।
ইয়াসিন আমার দিকে তাকাল। “তুমি এখন এখান থেকে বের হবে।”
আমি বললাম, “না।”
সে কঠিন গলায় বলল, “এটা শেষ করতে হবে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুমি একা কেন সব নিতে চাও?”
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “কারণ এই সব শুরু আমার থেকেই।”
এই কথাটা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল।
নীল ধীরে বলল, “অবশেষে সত্য বললে।”
ইয়াসিন তার দিকে তাকাল। “আমি ভুল করেছিলাম। কিন্তু আমি শেষ করব।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তোমরা দুজন আমাকে কি বলছো?”
নীল ধীরে বলল, “তোমার দাদু, আমি, আর ইয়াসিন—আমরা তিনজন এক সময় এই সিস্টেমে ছিলাম।”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “আমি বের হয়ে যেতে চেয়েছিলাম। তোমার দাদু আমাকে সাহায্য করেছিল।”
নীল হেসে বলল, “আর আমি থেকে গিয়েছিলাম।”
আমি ধীরে বললাম, “তাহলে তোমরা…”
ইয়াসিন বলল, “হ্যাঁ। আমরা একসাথে শুরু করেছিলাম, আলাদা পথে শেষ করেছি।”
আমি বুঝতে পারছিলাম না কাকে বিশ্বাস করব।
ঠিক তখন রায়হানা দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন।
তার চোখে পানি, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা।
“তোমরা থামো।”
সবাই চুপ।
তিনি আমার দিকে তাকালেন। “তানহা, এখন সিদ্ধান্ত তোমার।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আমি আর কিছু বুঝতে পারছি না…”
রায়হানা ধীরে বললেন, “তোমার দাদু চাইতেন এই সিস্টেম শেষ হোক। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আমরা সবাই ভেঙে গেছি।”
নীল ধীরে বলল, “আর এখন তুমি শেষ অংশ।”
আমি চিৎকার করে বললাম, “আমি কোনো অংশ না!”
ইয়াসিন আমার দিকে তাকাল। “তুমি শুধু ভুক্তভোগী না, তুমি চাবি।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “চাবি?”
সে ধীরে বলল, “তোমার দাদু শেষ ফাইলটা তোমার নামে রেখে গেছে।”
এই কথাটা শুনে আমি যেন পাথর হয়ে গেলাম।
নীল হেসে বলল, “এখন বুঝতে পারছো কেন সবাই তোমাকে ঘিরে?”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তাহলে আমি কী করব?”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “তুমি সিদ্ধান্ত নেবে—এই ফাইল ধ্বংস করবে, নাকি প্রকাশ করবে।”
সবাই চুপ।
বাইরের শব্দ আরও কাছে আসছে।
আমি টেবিলের দিকে তাকালাম। ফাইলটা সামনে রাখা।
আমার হাত কাঁপছে।
আমি জানি, এই একটা সিদ্ধান্তে সব শেষ হয়ে যাবে।
আমি ধীরে ফাইলটা তুলে নিলাম।
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
তারপর বললাম,
“এই খেলা এখানেই শেষ।”
ফাইলটা আমি টেবিলের উপর রেখে দিয়েছি—
আর লাইট অফ করে দিয়েছি।
বাইরে সাইরেন থেমে গেছে।
নীরবতা।
শুধু আমার নিঃশ্বাসের শব্দ।
আমি জানি না কে বেঁচে থাকবে, কে হারবে।
কিন্তু আমি জানি—
এখন থেকে আমার জীবন আর কারও নিয়ন্ত্রণে না।
সমাপ্ত