লুকানো প্রেমের সত্য

আমি আমার বিয়ের রাতে আমার প্রতিবন্ধী স্বামীকে বিছানায় নিয়ে গিয়েছিলাম তারপর আমরা পড়ে গেলাম, আর তখনই বুঝতে পারলাম সে এমন এক সত্য লুকিয়ে রেখেছিল যা তার সম্পর্কে আমার সমস্ত বিশ্বাস বদলে দেবে…
আমার নাম জৌতি, আর আমার বয়স ২৪ বছর।
শৈশব থেকেই আমি আমার সৎমা রাশেদা বেগম, যিনি একজন শীতল ও ব্যবহারিক মহিলা, তার সাথেই বাস করেছি। তিনি সবসময় আমাকে একই কথাই বলেছেন "কখনও গরিব ছেলেকে বিয়ে করো না, জৌতি। 
তোমার ভালোবাসা দরকার নেই তোমার দরকার একটা স্থিতিশীল, আরামদায়ক জীবন।"
আমি ভাবতাম তিনি শুধু কষ্টের ছাঁচে গড়া একজন নারী, যিনি তার নিজের মতো করে আমাকে রক্ষা করতে চাইছেন।
যতক্ষণ না তিনি আমাকে একজন প্রতিবন্ধী ছেলেকে বিয়ে করতে বাধ্য করলেন।
তার নাম মিস্টার ইয়াসিন চট্টগ্রামের অন্যতম প্রভাবশালী ও ধনী পরিবারের একমাত্র ছেলে।
পাঁচ বছর আগে সে এক ভয়ানক গাড়ি দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছিল, যার ফলে কোমর থেকে নিচে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। 
তারপর থেকে সে জনসমক্ষে খুব কমই আসে, একাকীত্বের মধ্যেই বসবাস করে।
গুজব ছিল মিস্টার ইয়াসিন ঠান্ডা মেজাজের, সহজে রেগে যায় এবং নারীদের ঘৃণা করে। 
কিন্তু আমার সৎমা এসবের কোনো তোয়াক্কা করতেন না।
 আমার বাবা কামরুল হাসান ঋণের চাপে ভেঙে পড়েছিলেন, আর তিনি এই বিয়েকেই একমাত্র মুক্তিপথ হিসেবে দেখছিলেন। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
"যদি তুমি মিস্টার ইয়াসিনের সাথে বিয়ে করতে রাজি হও, তাহলে ব্যাংক আর বাড়িটি দাবি করবে না," তিনি বললেন।
"প্লিজ, জৌতি… পরিবারের জন্য এটা করো।"
আমি ঠোঁট কামড়ে ধরে হ্যাঁ বললাম। কিন্তু অন্তরে, আমি জীবনে কখনো এত অপমানিত বোধ করিনি।
বিয়েটি চট্টগ্রাম শহরের এক বিশাল মালহোত্রা (ইয়াসিন) হাভেলি-তুল্য প্রাসাদে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে গাঁদা ফুলের মালা আর জ্বলন্ত তেলের প্রদীপ দিয়ে সাজানো ছিল। 
উজ্জ্বল রেশমের শাড়ি পরা অতিথিরা উঠোন ভরে ফেলেছিল, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সুর।
আমি পরেছিলাম সোনালি সূচিকর্মে সজ্জিত ভারী লাল বধূর শাড়ি, তবুও আমার হৃদয় সম্পূর্ণ ফাঁকা অনুভব করছিল। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
আমার বর হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন, তার মুখ পাথরের মতো অটল।
তিনি হাসলেন না। তিনি কথা বললেন না। কিন্তু তার চোখ গভীর এবং অগম্য পুরো সময় আমাকে অনুসরণ করছিল।
সেই রাত।
আমি উদ্বিগ্নভাবে শয়নকক্ষে ঢুকলাম।
সে তখনো হুইলচেয়ারেই বসে ছিল, তেলের বাতির মৃদু আলো তার তীক্ষ্ণ, সুন্দর মুখে ছায়া ফেলে দিচ্ছিল।
"আমি তোমাকে বিছানায় উঠতে সাহায্য করব," আমি ফিসফিস করে বললাম, আমার গলা কেঁপে যাচ্ছিল।
সে ঠোঁট দুটো হালকা করে চেপে ধরল।
"তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই পারব।"
আমি এক ধাপ পিছনে সরে এলাম, কিন্তু পরের মুহূর্তেই দেখলাম সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল।
স্বতঃস্ফূর্তভাবে, আমি তাকে ধরতে ছুটে এগিয়ে গেলাম।
"সাবধান—!"
কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
আমরা দুজনেই এক ভারী শব্দ করে মেঝেতে পড়ে গেলাম, সেই শব্দ নীরব ঘরে প্রতিধ্বনিত হল।
আমি তার ওপর পড়ে গেলাম, লজ্জায় আমার মুখ জ্বলে উঠল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, আমি এমন কিছু উপলব্ধি করলাম যা আমাকে সম্পূর্ণভাবে হতবাক করে দিল।
চলবে, পরবর্তী অংশ পড়তে চাইলে কমেন্ট করে জানাও তাহলে পরবর্তী অংশ খুব দ্রুত লিখব।
মেঝেতে পড়ে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড যেন সময় থমকে ছিল। আমার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা এত জোরে হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল পুরো ঘর শুনতে পাচ্ছে। 
কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি যে বিষয়টা অনুভব করলাম, সেটাই আমাকে স্তব্ধ করে দিল।
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম—সে আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
এটা কোনো অসহায়, ভারসাম্য হারানো মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল না। বরং তার হাতের চাপ ছিল দৃঢ়, নিয়ন্ত্রিত, এমনকি সচেতনও। আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম। 
তার চোখের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। ওই চোখে অসহায়ত্বের কোনো ছাপ নেই।
বরং সেখানে ছিল তীক্ষ্ণ, সতর্ক, এবং যেন অনেক কিছু লুকিয়ে রাখা এক গভীরতা।
আমি তাড়াতাড়ি সরে যেতে চাইলাম, কিন্তু সে আমার কব্জিটা ধরে ফেলল।লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
"একটু দাঁড়াও," সে নিচু গলায় বলল।
তার কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তাতে এক ধরনের দৃঢ়তা ছিল যা আমার শরীরের রক্তপ্রবাহ যেন থামিয়ে দিল।
"তুমি ঠিক আছো?" আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
সে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"তোমার কি মনে হয় আমি একদমই অসহায়?"
প্রশ্নটা অদ্ভুত ছিল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
"আমি… আমি জানি না," আমি সত্যিটাই বললাম।
সে হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর এমন কিছু করল যা আমার মাথায় ঝড় তুলে দিল।
সে ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা একটু উঁচু করল… এবং কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও—তার কোমরের নিচের অংশে সামান্য নড়াচড়া হলো। খুব অল্প। খুব সূক্ষ্ম।
কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখেছি। আমার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। "তুমি… তুমি নড়লে!"
সে সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল, যেন ধরা পড়ে গেছে।
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
"সবকিছু এত সহজ না, জৌতি," সে ফিসফিস করে বলল।
আমার মাথা ঘুরে উঠছিল। পাঁচ বছর ধরে পঙ্গু—এই কথাটা তো সবাই জানে। তাহলে এই মুহূর্তে আমি কী দেখলাম?
"তুমি… পুরোপুরি পঙ্গু নও?" সে কোনো উত্তর দিল না।
এই নীরবতাই আমার সন্দেহকে আরও গাঢ় করে তুলল।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম, তারপর তাকে হাত বাড়িয়ে বললাম, "চলো, আমি তোমাকে বিছানায় উঠতে সাহায্য করি।" সে কিছুক্ষণ দ্বিধা করল, তারপর আমার হাত ধরল।
আমরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। সে নিজের শরীরের ভর কিছুটা আমার ওপর দিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পুরোটা নয়।
যেন সে নিজেও চেষ্টা করছে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমরা বিছানায় পৌঁছালাম। আমি তাকে বসতে সাহায্য করলাম।
ঘরে তখন শুধু আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দ। "এই ব্যাপারটা… কেউ জানে?" আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম।
সে মাথা নাড়ল।
"না।"
"কেন?"
সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে এবার এক ধরনের ক্লান্তি দেখা গেল।
"কারণ সবাই যা বিশ্বাস করে, সেটাই তাদের জন্য সুবিধাজনক।"
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
"মানে?"
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
"আমার দুর্ঘটনার পর সবাই ভেবেছিল আমি শেষ। 
ব্যবসা, সম্পত্তি—সবকিছু নিয়ে লড়াই শুরু হয়ে যায়। যারা আমার কাছের ছিল, তারাই প্রথম আমাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।"
আমার গা শিউরে উঠল।
"তোমার পরিবার?"
সে ঠোঁট চেপে ধরল।
"সবাই না। কিন্তু যারা বিশ্বাসঘাতক, তারা খুব কাছেই থাকে।"
আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম—এটা শুধু একটা বিয়ে না। এর পেছনে আরও অনেক বড় কিছু লুকিয়ে আছে।
"তাহলে তুমি ইচ্ছা করে…"
"হ্যাঁ," সে আমার কথা কেটে দিয়ে বলল,
"আমি ইচ্ছা করেই সবাইকে বিশ্বাস করতে দিয়েছি যে আমি আর কখনো হাঁটতে পারব না।"
ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
আমি বিছানার এক কোণে বসে পড়লাম।
"তাহলে আমাকে বিয়ে করলে কেন?"
প্রশ্নটা বেরিয়ে গেল, কিন্তু এর উত্তর শুনতে আমার ভয় লাগছিল। সে আমার দিকে তাকাল।
"তোমাকে আমি বেছে নিইনি।"
এই কথাটা আমার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল।
কিন্তু সে থামল না।
"তোমাকে বেছে নিয়েছে তারা—যারা ভাবে আমি দুর্বল। 
তারা ভেবেছে তুমি আমার ওপর নজর রাখবে, আমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে… অথবা আমার কাছ থেকে কিছু বের করবে।" আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
"তুমি বলতে চাও… আমার পরিবার?"
সে সরাসরি উত্তর দিল না।
"তুমি কি নিশ্চিত, তোমার পরিবার তোমাকে এই বিয়েতে বাধ্য করেছে শুধু তোমার ভালোর জন্য?"
আমার মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল। বাবার ঋণ, সৎমার চাপ… সবকিছু হঠাৎ করে অন্য রকম লাগতে শুরু করল। "না… এটা হতে পারে না…" আমি নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করলাম। সে ধীরে বলল,
"আমি তোমাকে সন্দেহ করছি না, জৌতি। 
কিন্তু আমি কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করি না।"
কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হলো—রাগ, অপমান, আর একই সঙ্গে এক অজানা ভয়।লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
"তাহলে এখন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে একটু এগিয়ে এসে বলল,
"এখন তুমি একটা সিদ্ধান্ত নেবে।"
"কী সিদ্ধান্ত?"
"তুমি কি তাদের মতোই আমার বিরুদ্ধে থাকবে… নাকি আমার পাশে?"
ঘরের বাতাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে কোনো অনুরোধ নেই, কোনো চাপ নেই—শুধু এক ধরনের অপেক্ষা।
আমার জীবনের সবকিছু হঠাৎ করে বদলে গেছে। 
এই মানুষটা, যাকে আমি অসহায় ভেবেছিলাম, সে আসলে অনেক শক্তিশালী—এবং বিপদের মধ্যেও আছে।
আমি ধীরে বললাম,
"আমি সত্যটা জানতে চাই। পুরোটা।"
সে হালকা একটা মাথা নাড়ল।
"তাহলে প্রস্তুত হও," সে বলল,
"কারণ এই বাড়িতে যা চলছে, সেটা শুধু শুরু।"
তার কথার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে কোথাও একটা দরজা জোরে বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। আমি চমকে উঠলাম।
সে আমার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,
"দেখলে? আমরা একা নই।" আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম—এই বিয়ে শুধু একটা সম্পর্ক নয়, এটা একটা খেলা।
আর আমি অজান্তেই সেই খেলায় পা রেখে ফেলেছি। “আমরা একা নই।” ইয়াসিনের কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল। আমার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। 
বাইরে যে শব্দটা হলো ওটা কি সত্যিই কাকতালীয়? নাকি কেউ আমাদের ঘরের আশেপাশেই ছিল?
আমি অজান্তেই দরজার দিকে তাকালাম। 
দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ, কিন্তু এই বিশাল প্রাসাদের দেয়ালগুলো যেন নিজেই গোপন কথা লুকিয়ে রাখে।
“তুমি এখানে বসে থাকো,” ইয়াসিন ফিসফিস করে বলল।
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
“তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
সে সরাসরি উত্তর দিল না। বরং ধীরে ধীরে বিছানার পাশে রাখা হুইলচেয়ারের দিকে হাত বাড়াল।
তার প্রতিটা নড়াচড়া আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করছিলাম।
এখন আর আমার চোখে সে অসহায় না—বরং সে যেন নিজেকে লুকিয়ে রাখা একজন খেলোয়াড়।
সে হুইলচেয়ারে বসল, কিন্তু বসার আগের সেই এক মুহূর্তে—আমি আবার দেখলাম, সে নিজের পায়ে ভর দেওয়ার চেষ্টা করছে। খুব সামান্য হলেও।
আমার শ্বাস আটকে গেল।
সে হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে দরজার কাছে গেল। 
তারপর থেমে, একবার পেছনে তাকাল।
“যদি কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে, তুমি কিছুই জানো না। ঠিক আছে?” আমি মাথা নাড়লাম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা বেড়েই চলছিল।
সে দরজাটা আস্তে খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমি বিছানার কিনারায় বসে রইলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল দেয়ালগুলো যেন আমাকে চেপে ধরছে।
কয়েক মিনিট… হয়তো তারও বেশি সময় কেটে গেল।
হঠাৎ করেই করিডোর থেকে মৃদু কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
আমি কান খাড়া করলাম।
“তুমি নিশ্চিত সে কিছু বুঝতে পারেনি?”
একজন নারীর কণ্ঠ। ঠান্ডা, হিসেবি। আমার শরীর কেঁপে উঠল। তারপর ইয়াসিনের গলা
“তোমার কি মনে হয় আমি এতটা অসতর্ক?”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
আমি ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলাম। পা টিপে টিপে দরজার কাছে গেলাম।
দরজার ফাঁক দিয়ে কিছু দেখা যায় না, কিন্তু শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। “তবুও সাবধান হও,” সেই নারী বলল,
“এই মেয়েটা আমাদের পরিকল্পনার জন্য ঝুঁকি হতে পারে।”
আমার মাথা ঘুরে উঠল। “এই মেয়েটা”—মানে আমি?
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল,
“সে এখনো কিছু জানে না।” “আর যদি জেনে যায়?”
“তাহলে…” সে থেমে গেল। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। “তাহলে আমি নিজেই সামলাবো।”
এই কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
আমি দ্রুত বিছানায় ফিরে এলাম, যেন কিছুই শুনিনি।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজাটা খুলল।
আমি তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। তার হুইলচেয়ারের চাকার শব্দটা স্পষ্ট। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আমি অনুভব করতে পারছিলাম—সে আমাকে দেখছে।
তারপর সে আস্তে করে বলল,
“ঘুমিয়ে পড়েছ?”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। সে আর কিছু বলল না।
কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও আমি বুঝতে পারছিলাম আমাদের দুজনের মাঝখানে এখন এক বিশাল গোপন দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে।
সেই রাতটা আমি একফোঁটা ঘুমাতে পারিনি।
সকালের আলো যখন পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকল, আমি ধীরে ধীরে চোখ খুললাম।
ইয়াসিন তখন জানালার পাশে বসে আছে। তার মুখে এক অদ্ভুত কঠোরতা।লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
“তুমি জেগে গেছো,” সে বলল। আমি উঠে বসলাম। “হ্যাঁ।”
কিছুক্ষণ আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম।
তারপর আমি আর নিজেকে থামাতে পারলাম না।
“গত রাতে… তুমি কার সাথে কথা বলছিলে?”
সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই। যেন সে আগেই এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল।
“তুমি শুনেছ?” আমি একটু থেমে বললাম,
“হ্যাঁ।” ঘরের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল।
সে ধীরে বলল,
“তাহলে তুমি এখন খেলাটার একটা অংশ।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“কী খেলা?”
সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল আর এবার, আমি স্পষ্ট দেখলাম… সে দাঁড়াল।
পুরোপুরি না হলেও—সে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
“তুমি…!”
সে হাত তুলে আমাকে থামাল। “শোনো,” তার গলা নিচু কিন্তু দৃঢ়, “এই বাড়িতে সবাই মুখে যা বলে, ভেতরে তা না। 
এখানে বিশ্বাস মানে দুর্বলতা।” আমি নিঃশ্বাস আটকে তার কথা শুনছিলাম। “আমার দুর্ঘটনা ছিল না শুধুই দুর্ঘটনা,” সে বলল,লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
“এটা ছিল একটা চেষ্টা… আমাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।”
আমার গা শিউরে উঠল। “আর যারা এটা করেছে… তারা এখনো এখানেই আছে।” আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“আর আমি?”
সে আমার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“তুমি একটা প্রশ্ন,” সে বলল, “যার উত্তর এখনো আমি পাইনি।” আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“মানে?“মানে তুমি শত্রু না মিত্র—এটা এখনো পরিষ্কার না।”
আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। “তুমি আমাকে সন্দেহ করছ?”
সে শান্ত গলায় বলল, “আমি সবাইকে করি।”
এই কথাটা শুনে আমার ভেতরে রাগ জমতে শুরু করল।
“তাহলে আমাকে কেন এই সব বলছ?”
সে ধীরে ধীরে আমার কাছে এগিয়ে এলো—এই প্রথম, হুইলচেয়ার ছাড়া। তার চোখ আমার চোখে স্থির।
“কারণ তুমি সত্য জানার পরও যদি পাশে থাকো… তাহলে তুমি আমার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে।”
আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। এই মানুষটা বিপজ্জনক।
কিন্তু একই সঙ্গে—অদ্ভুতভাবে সত্যবাদী।
“আর যদি না থাকি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে হালকা হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই।
“তাহলে তুমি আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে যাবে।”
ঘরের বাতাস থমকে গেল।
আমি বুঝতে পারছিলাম—এখান থেকে আর পেছনে ফেরার পথ নেই।
ঠিক তখনই দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম। “মিস্টার ইয়াসিন,” বাইরে থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ম্যাডাম আপনাকে এখনই নিচে যেতে বলেছে।”
ইয়াসিনের মুখ হঠাৎ কঠোর হয়ে গেল।
সে দ্রুত হুইলচেয়ারে বসে পড়ল—এক নিমিষেই যেন আবার আগের সেই অসহায় মানুষটা হয়ে গেল।
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।
সে আমার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,
“নাটকটা শুরু হলো।”
আমার শরীর কেঁপে উঠল।
আমি জানি না নিচে কী অপেক্ষা করছে…কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত এই বাড়ির প্রতিটা হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর সত্য। “নাটকটা শুরু হলো।” ইয়াসিনের কণ্ঠে এমন এক ঠান্ডা দৃঢ়তা ছিল, যা আমার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল। 
কয়েক সেকেন্ড আগেও যে মানুষটা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সে এখন মুহূর্তের মধ্যে আবার সেই অসহায়, নীরব, হুইলচেয়ারে বসা মানুষে পরিণত হয়েছে। 
যেন এই দুই রূপই তার একটা সবার জন্য, আর একটা লুকানো সত্য। আমি দরজার দিকে তাকালাম। 
কড়া নাড়ার শব্দ থেমে গেছে, কিন্তু বাইরে যে অপেক্ষা করছে, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “মনে রেখো, তুমি কিছুই জানো না। তুমি শুধু এই বাড়ির নতুন বউ—ভীত, চুপচাপ, কিছু না বোঝা এক মেয়ে।”
তার কথাগুলো আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করল। আমি কি সত্যিই এতটাই দুর্বল? 
নাকি সে আমাকে এমনটাই ভাবতে চায়?
কিন্তু এখন প্রশ্ন করার সময় না।
আমি ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম।
ইয়াসিন তখন দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটি খুলে দিল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল মাঝবয়সী একজন লোক সাদা পাঞ্জাবি, চোখে কৌতূহল আর ঠোঁটে কৃত্রিম ভদ্রতার হাসি।
“ম্যাডাম নিচে অপেক্ষা করছেন,” লোকটি বলল। 
ইয়াসিন কোনো উত্তর দিল না, শুধু মাথা ঝুঁকিয়ে হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে দিল।
আমি কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলাম, তারপর ধীরে ধীরে তার পেছনে হাঁটতে শুরু করলাম।
করিডোরে পা রাখতেই মনে হলো আমি যেন অন্য এক জগতে ঢুকে পড়েছি। রাতের সেই নিস্তব্ধতা আর নেই—এখন চারপাশে মানুষের চলাফেরা, নিচতলা থেকে ভেসে আসা কথাবার্তা, আর কোথাও কোথাও হাসির শব্দ।
কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও একটা অদ্ভুত কৃত্রিমতা আছে।
আমরা সিঁড়ির দিকে এগোলাম।
আমি লক্ষ্য করলাম—ইয়াসিন নিজে নিজেই হুইলচেয়ার চালাচ্ছে, কিন্তু তার হাতের গতিতে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ আছে, যা একেবারেই দুর্বল মানুষের মতো না।
নিচে নামতেই আমার চোখ আটকে গেল।
বিশাল ড্রয়িংরুমটা ঝলমলে আলোয় ভরা। 
বড় বড় ঝাড়বাতি, দামি কার্পেট, দেয়ালে পুরনো ছবির ফ্রেম—সবকিছু মিলিয়ে একটা রাজকীয় পরিবেশ।
আর সেই ঘরের মাঝখানে বসে আছেন একজন নারী—তার উপস্থিতিই যেন পুরো ঘরকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
তিনি—মালহোত্রা পরিবারের প্রধান, ইয়াসিনের মা।
আমি তাকে আগেও দেখেছি, কিন্তু এত কাছ থেকে না।
তার চোখে এমন এক তীক্ষ্ণতা, যেন তিনি এক নজরে মানুষকে ভেদ করে দেখতে পারেন।
তিনি আমাদের দিকে তাকালেন।
“এসেছো?”
তার কণ্ঠ ঠান্ডা, পরিমিত।
ইয়াসিন হালকা মাথা নত করল।
আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম, কী বলা উচিত বুঝতে পারছিলাম না।
“এটাই তোমার স্ত্রী?” তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন।
আমি ধীরে বললাম, “জি…”
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। 
সেই দৃষ্টি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল।
“দেখতে সাধারণ,” তিনি বললেন, যেন নিজের মনেই মন্তব্য করছেন, “কিন্তু সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।” আমার বুক কেঁপে উঠল।
এটা কি ইঙ্গিত? নাকি শুধু একটা মন্তব্য?
আমি চুপ করে রইলাম। তিনি আবার বললেন, “তুমি জানো তো, এই বাড়ির নিয়ম?”।আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না…”
তিনি ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি আনলেন, কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই।
“তাহলে শোনো—এই বাড়িতে বিশ্বাস শব্দটা খুব সস্তা না। এখানে সবাই নিজের জায়গা ধরে রাখতে লড়াই করে। আর ভুল করলে… তার মূল্য দিতে হয়।”
আমার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি এক মুহূর্তের জন্য ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
সে একদম চুপ, যেন এসব কথার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
“তুমি এখন এই পরিবারের অংশ,” তিনি বললেন, “কিন্তু সেটা প্রমাণ করতে হবে।”
“কীভাবে?” আমি না ভেবেই জিজ্ঞেস করে ফেললাম।
ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখ সরাসরি আমার চোখে।
“সময় এলে বুঝে যাবে।”
তারপর তিনি পাশের একজনকে ইশারা করলেন।
“ওকে ঘরগুলো দেখিয়ে দাও।” আমি কিছুটা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ইয়াসিনের দিকে তাকাতে গিয়েও থেমে গেলাম—সে এখনো সেই একই নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে।
যেন কিছুই হয়নি। আমি ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম, সেই লোকটির পেছনে।
কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
এই বাড়িতে আসলে কী চলছে?
কয়েকটা ঘর ঘুরে দেখানোর পর লোকটি আমাকে আবার করিডোরে ছেড়ে দিল। “আপনার কোনো কিছু দরকার হলে বলবেন,” বলে সে চলে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম।
চারপাশটা অদ্ভুত নিরব লাগছিল। হঠাৎ করেই মনে হলো আমাকে কেউ দেখছে। আমি পেছনে ঘুরে তাকালাম।
করিডোরের এক কোণে একটা দরজা আধখোলা।
ভেতর থেকে মৃদু আলো বের হচ্ছে।
আর সেই আলোয়… আমি একটা ছায়া দেখতে পেলাম।
কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। “কে?” আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম।
কোনো উত্তর নেই। আমি কয়েক পা এগোলাম।
দরজাটা আস্তে ঠেলে খুললাম।
ঘরটা অন্ধকার, শুধু একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে।
আর সেখানে… একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ সরাসরি আমার দিকে। “তুমি নতুন বউ?” সে হালকা হেসে বলল। তার হাসিটা অদ্ভুত।
আমি ধীরে বললাম, “হ্যাঁ… আপনি?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর এগিয়ে এলো।
“আমি এই বাড়ির আরেকটা গোপন সত্য,” সে ফিসফিস করে বলল। আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“মানে?”
সে হালকা মাথা কাত করল।
“তুমি কি জানো, এই বাড়িতে যারা আসে… সবাই থাকতে পারে না?” আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“তুমি কী বলতে চাচ্ছ?” সে আমার কাছে এসে খুব নিচু গলায় বলল। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
“যদি বাঁচতে চাও… তাহলে কাউকে বিশ্বাস করো না। 
এমনকি তোমার স্বামীকেও না।”
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধাক্কা খেল।
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই করিডোরে কারো পায়ের শব্দ ভেসে এলো। মেয়েটা হঠাৎ থেমে গেল।
তার চোখে ভয়। “ওরা আসছে,” সে ফিসফিস করে বলল।
“কে?” কিন্তু সে আর কিছু বলল না।
এক মুহূর্তের মধ্যে সে ঘরের ভেতরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজার সামনে কেউ এসে দাঁড়াল।
আমি ধীরে ঘুরে তাকালাম।
ইয়াসিন।
তার চোখ সরাসরি আমার দিকে।
“তুমি এখানে কী করছ?” তার গলায় এবার সেই পরিচিত ঠান্ডা ভাবটা নেই—বরং সেখানে একটা তীব্র সতর্কতা।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, “এই ঘরে… একজন মেয়ে ছিল।” ইয়াসিনের মুখ হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল।
কোন মেয়ে?” “আমি জানি না… কিন্তু সে বলল—এই বাড়িতে সবাই থাকতে পারে না।
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সে হুইলচেয়ারটা দ্রুত ঘুরিয়ে ঘরের ভেতরে তাকাল। কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
পুরো ঘর ফাঁকা। সে ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল।
“তুমি নিশ্চিত তুমি কাউকে দেখেছ?”
তার প্রশ্নে একটা অদ্ভুত সুর ছিল—সন্দেহ, নাকি ভয়, আমি বুঝতে পারলাম না। আমি নিঃশ্বাস নিলাম।
“হ্যাঁ। আর সে আমাকে একটা কথা বলেছে…”
“কী?”
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললাম 
“কাউকে বিশ্বাস করতে নেই… এমনকি তোমাকেও না।”
ঘরের বাতাস মুহূর্তে জমে গেল।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল “তাহলে সে তোমার সাথে দেখা করেছে…”আমার বুক কেঁপে উঠল।
“মানে তুমি তাকে চেনো?” সে উত্তর দিল না।
কিন্তু তার নীরবতাই সব বলে দিল।
এই বাড়ির গোপন রহস্য আরও গভীর…
আর আমি ধীরে ধীরে সেই অন্ধকারের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছি। তাহলে সে তোমার সাথে দেখা করেছে…” ইয়াসিনের কথাটা আমার কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। 
তার গলার স্বর বদলে গেছে এই প্রথমবার আমি তার মধ্যে স্পষ্ট উদ্বেগ টের পেলাম। 
এমন একজন মানুষ, যে এতক্ষণ সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখছিল, হঠাৎ যেন ভেতর থেকে নড়ে উঠেছে।
আমি এক পা এগিয়ে গেলাম, চোখ সরাসরি তার চোখে রেখে বললাম, “সে কে?”
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। 
তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, যেন ভেতরে ভেতরে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—বলবে, না লুকাবে।
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।
“তুমি ওকে কোথায় দেখলে?” সে অবশেষে জিজ্ঞেস করল।
আমি চারপাশে তাকালাম, তারপর বললাম, “এই ঘরেই… এই আলোটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। সে আমাকে সাবধান করল। বলল—এই বাড়িতে কেউ নিরাপদ না।”
ইয়াসিন চোখ নামিয়ে নিল। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।
তারপর সে খুব ধীরে বলল, “ওর নাম আয়েশা।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“সে কে?” লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
ইয়াসিন মাথা তুলল না, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর আরও নিচু হয়ে গেল, “সে একসময় এই বাড়িরই বউ ছিল।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“ছিল… মানে?”
সে এবার আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে এমন কিছু ছিল—যা আমি আগে দেখিনি।
“সে হঠাৎ করে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায়।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“অদৃশ্য মানে?”
“মানে কেউ জানে না সে কোথায় গেছে… কিংবা আদৌ বেঁচে আছে কিনা।”
ঘরের দেয়ালগুলো যেন আরও কাছে চলে আসছিল।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “কিন্তু আমি তো তাকে দেখেছি… সে আমার সাথে কথা বলেছে…”
ইয়াসিন চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
“তাহলে ব্যাপারটা আমাদের ধারণার চেয়েও খারাপ,” সে ফিসফিস করে বলল।
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ জোরে ধাক্কা খেল।
“তুমি কি বলতে চাও… সে এখনো এই বাড়িতেই আছে?”
সে কোনো উত্তর দিল না।
এই নীরবতাই আমার ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিল।
ঠিক তখনই করিডোরে আবার পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ইয়াসিন তৎক্ষণাৎ স্বাভাবিক হয়ে গেল।
সে দ্রুত হুইলচেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল—এক নিমিষেই আবার সেই দুর্বল, অসহায় চেহারা। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজায় একজন কাজের লোক এসে দাঁড়াল। “স্যার, ম্যাডাম আপনাকে আবার ডাকছেন,” সে বলল। ইয়াসিন মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
লোকটা চলে যেতেই সে আমার দিকে ঝুঁকে খুব নিচু গলায় বলল, “এই বিষয়টা নিয়ে কারো সামনে একটা কথাও বলবে না। বুঝেছ?” আমি দ্বিধা করলাম।
“কিন্তু—”
“কোনো কিন্তু না,” সে কড়া গলায় বলল, “এখানে ভুল মানে বিপদ।”
তার চোখে এবার সেই পরিচিত কঠোরতা ফিরে এসেছে।
আমি ধীরে মাথা নেড়ে বললাম, “ঠিক আছে…”
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন আমার ভেতরটা পড়তে চাইছে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম। মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে। আয়েশা… এই বাড়ির পুরনো বউ…
যে নাকি অদৃশ্য হয়ে গেছে…
কিন্তু সে এখনো এখানে?
নাকি আমি কোনো ফাঁদে পড়ছি?
আমি ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলাম, কিন্তু বসতে পারলাম না।
মনে হচ্ছিল—এই ঘরটাও নিরাপদ না।
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল আলমারির দিকে।
দরজাটা একটু ফাঁক ছিল।
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সেটি খুললাম।
ভেতরে ঝোলানো কাপড়গুলো খুব সুন্দরভাবে গুছানো।
সবকিছু নিখুঁত।লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
কিন্তু নিচে, এক কোণে একটা ছোট বাক্স রাখা।
আমি কৌতূহল চাপতে পারলাম না।
বাক্সটা বের করে খুললাম।
ভেতরে কিছু পুরনো ছবি।
আমি একটা ছবি তুলে নিলাম।
ছবিটা দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল।
ছবিতে ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছে—পুরোপুরি সুস্থ, হাসছে।
আর তার পাশে… একজন মেয়ে। তার চোখ, তার মুখ 
এটাই সেই মেয়ে… আয়েশা। আমি শিউরে উঠলাম।
ছবিটার পেছনে কিছু লেখা—
“চিরদিনের জন্য—Y & A”
আমার হাত কাঁপতে লাগল।
এর মানে… আয়েশা শুধু এই বাড়ির বউই না… সে ইয়াসিনের খুব কাছের কেউ ছিল। হয়তো তার স্ত্রী।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
“তুমি কী খুঁজছ?”
আমি চমকে উঠে পেছনে তাকালাম।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই একই নারী—ইয়াসিনের মা।
তার চোখ সরাসরি আমার হাতে থাকা ছবির দিকে।
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“আমি… কিছু না…”
তিনি ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন।
তার পদক্ষেপ খুব ধীর, কিন্তু প্রতিটা পা যেন হিসেব করে ফেলা। “ওই ছবিটা কোথায় পেলে?” তার গলায় ঠান্ডা সুর।
আমি উত্তর দিতে পারছিলাম না।
তিনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“তুমি কি জানো, এই বাড়িতে কিছু জিনিস আছে… যেগুলো না দেখাই ভালো?” আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“আমি জানতাম না…”
তিনি হালকা করে হাসলেন।
“অবশ্যই জানো না। তুমি তো নতুন।”
তার চোখে এক অদ্ভুত ঝিলিক।
“কিন্তু কৌতূহল অনেক সময় মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনে।” আমার হাতের ছবি তিনি ধীরে নিয়ে নিলেন।
একবার তাকালেন।
তারপর… ছবিটা মাঝখান থেকে ছিঁড়ে ফেললেন।
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। “আপনি এটা কেন—”
তিনি আমার কথা শেষ করতে দিলেন না।
“পুরনো জিনিস ধরে রাখলে নতুন জীবন শুরু করা যায় না,” তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন।
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“তুমি এখন এই বাড়ির নতুন বউ,” তিনি আবার বললেন,
“পুরনো ছায়াগুলো থেকে দূরে থাকাই তোমার জন্য ভালো।”
আমি কিছু বললাম না।
কিন্তু আমার ভেতরে তখন একটাই সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছিল
আমি সত্যটা জানব। যে কোনো মূল্যে।
তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা আস্তে বন্ধ হলো।
আমি ধীরে ধীরে মেঝেতে পড়ে থাকা ছেঁড়া ছবির টুকরোগুলো তুললাম। দুটো অংশ… একটাতে ইয়াসিন।
আরেকটাতে আয়েশা। আমি দুটো একসাথে মিলিয়ে ধরলাম। মনে হলো এই গল্পটা এখানেই শেষ হয়নি।
এটা শুধু শুরু।
আর আমি এখন সেই গল্পের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। ছেঁড়া ছবির দুটো অংশ আমার হাতে কাঁপছিল, কিন্তু তার থেকেও বেশি কাঁপছিল আমার ভেতরের বিশ্বাসগুলো। 
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমার জীবন যেন সম্পূর্ণ বদলে গেছে যে মানুষটাকে আমি অসহায় ভেবেছিলাম।
সে আসলে অনেক কিছু লুকিয়ে রেখেছে; যে পরিবারকে আমি নিরাপদ ভেবেছিলাম, তারা আসলে ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে; আর যে বাড়িতে আমি নতুন বউ হয়ে এসেছি, সেটি যেন এক বিশাল গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিটা দরজার পেছনে অন্য কোনো সত্য লুকিয়ে আছে। 
আমি ধীরে ধীরে ছবির টুকরোগুলো আবার বাক্সে রেখে দিলাম, কিন্তু এবার আর আগের মতো গুছিয়ে না যেন ইচ্ছে করেই এলোমেলো করে রাখলাম! 
কারণ আমি জানি, এই এলোমেলো সত্যগুলোই আমাকে সামনে এগোতে সাহায্য করবে।
আমি বিছানায় বসে পড়লাম, কিন্তু বসেই বুঝলাম এভাবে বসে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব। 
আমার মাথার ভেতর একই প্রশ্ন ঘুরছে আয়েশা কোথায়? যদি সে সত্যিই ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায়, তাহলে আমি কাকে দেখলাম? আর যদি সে এখনো এই বাড়িতেই থাকে, তাহলে কেন লুকিয়ে আছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ইয়াসিন সত্যিই আমার পাশে আছে, নাকি সেও এই খেলার অংশ?
আমি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালাম। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটি আস্তে খুললাম। করিডোরটা ফাঁকা, কিন্তু সেই ফাঁকায়ও যেন একটা অদৃশ্য নজরদারি আছে যেন কেউ না থাকলেও কেউ সবসময় দেখছে। 
আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলাম। কোথায় যাচ্ছি, জানি না—শুধু মনে হচ্ছিল, কিছু একটা আমাকে ডাকছে।
কয়েকটা মোড় ঘুরতেই আমি একটা সিঁড়ি দেখতে পেলাম, যেটা নিচে না গিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। 
অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই সিঁড়িটা আগেরবার আমাকে কেউ দেখায়নি। যেন ইচ্ছে করেই এই অংশটা আড়ালে রাখা হয়েছে। আমার কৌতূহল আবার মাথা চাড়া দিল।
আমি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। প্রতিটা ধাপে পা রাখার সময় একটা চাপা শব্দ হচ্ছিল,
আর সেই শব্দগুলো আমার নিজের হৃদস্পন্দনের সাথে মিশে যাচ্ছিল। ওপরে উঠতেই একটা লম্বা করিডোর অনেকগুলো বন্ধ দরজা, আর বাতাসে পুরনো কাঠ আর ধুলোর গন্ধ। এই অংশটা বাড়ির বাকি জায়গার মতো ঝকঝকে না, বরং যেন অনেকদিন কেউ এখানে আসেনি।
আমি একটা দরজার সামনে থামলাম। হাত বাড়িয়ে ধরলাম, কিন্তু খুললাম না। মনে হচ্ছিল দরজার ওপাশে যা আছে, সেটা জানলে আর ফিরে আসা যাবে না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা ফিসফিসে কণ্ঠ
“তুমি আবার চলে এসেছো…”আমার পুরো শরীর জমে গেল। আমি ধীরে ধীরে পেছনে তাকালাম।
সে—আয়েশা। ঠিক আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এবার তার চোখে এক ধরনের ক্লান্তি, যেন বহুদিন ধরে লুকিয়ে থাকার ভার তাকে চেপে ধরেছে।
আমি এক পা এগোলাম, “তুমি… সত্যিই এখানে আছো?”
সে হালকা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই।
“আমি কখনো যাইনি,” সে বলল, “আমাকে শুধু সবাই ভুলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।”
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“কিন্তু কেন? তোমার সাথে কী হয়েছে?” সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে বলল, “কারণ আমি এমন কিছু জেনে গিয়েছিলাম, যা আমার জানা উচিত ছিল না।”
আমার শ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
“কী জিনিস?”
সে সরাসরি উত্তর দিল না। বরং আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, “তুমি কি জানো, ইয়াসিনের দুর্ঘটনা আসলে দুর্ঘটনা ছিল না?” আমার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
“সে নিজেই আমাকে বলেছে…“সে তোমাকে সব বলেনি,” আয়েশা আমার কথা কেটে দিল, “সে কখনোই পুরো সত্য বলে না।” আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“তাহলে সত্যটা কী?” সে আমার চোখের দিকে তাকাল গভীর, স্থির, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে আমি প্রস্তুত কিনা।
“সেই রাতে, যখন দুর্ঘটনাটা হয়, আমি ওর সাথে ছিলাম,” সে ধীরে ধীরে বলল, “আমরা একা ছিলাম না… গাড়িতে আরেকজন ছিল।” আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিলাম।
“কে?”
সে একটু থামল।
তার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু শব্দ বের হলো না।
ঠিক তখনই নিচ থেকে একটা জোরে শব্দ ভেসে এলো—কেউ যেন চিৎকার করছে। আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম।
আয়েশার মুখ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “ওরা বুঝে গেছে তুমি এখানে এসেছো,” সে তাড়াহুড়ো করে বলল, “তুমি এখনই নিচে চলে যাও।” “না, তুমি আমাকে সত্যটা বলো,” আমি জেদ করে বললাম, “গাড়িতে কে ছিল?”
সে আমার হাত শক্ত করে ধরল। “যাকে তুমি সবচেয়ে কম সন্দেহ করছো…” আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“মানে?”
কিন্তু সে আর কিছু বলল না।
“যাও,” সে ফিসফিস করে বলল, “যদি বাঁচতে চাও, এখনই যাও… আর কাউকে বিশ্বাস কোরো না।”
আমি কিছু বলার আগেই সে পিছিয়ে গেল ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিশে গেল।
আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম।
মাথার ভেতর ঝড় বইছে যাকে আমি সবচেয়ে কম সন্দেহ করি? সেটা কে হতে পারে?
ইয়াসিন?
না কি… আমার নিজের পরিবার?
আমি দ্রুত নিচে নেমে এলাম। ড্রয়িংরুমে পৌঁছাতেই দেখলাম সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। 
পরিবেশটা অদ্ভুতভাবে টানটান।
ইয়াসিন মাঝখানে বসে আছে, তার মুখ কঠিন।
তার মা পাশে দাঁড়িয়ে। আর মেঝেতে—একজন কাজের লোক পড়ে আছে, আহত। আমার বুক ধক করে উঠল।
“কী হয়েছে?” আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম।
কেউ উত্তর দিল না।
ইয়াসিন ধীরে আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে এবার এক অন্যরকম দৃষ্টি—সন্দেহ আর সতর্কতার মিশ্রণ। “তুমি কোথায় ছিলে?” সে জিজ্ঞেস করল।
আমার গলা শুকিয়ে গেল। এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে আমি এই খেলায় কোন পাশে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি এক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করলাম…
তারপর ধীরে বললাম, “আমি… পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম।
ঘরের বাতাস থমকে গেল।
ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে রইল—একদম নড়ল না।
কয়েক সেকেন্ড… হয়তো তারও বেশি সময় কেটে গেল।
তারপর সে খুব ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“সাবধানে চলবে… এই বাড়িতে পথ হারানো খুব সহজ।”
তার কথার ভেতর লুকানো ইঙ্গিতটা আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম। আমি সত্যের খুব কাছাকাছি চলে গেছি।
আর এখন থেকে প্রতিটা পদক্ষেপই বিপজ্জনক। ড্রয়িংরুমের সেই অস্বস্তিকর নীরবতাটা যেন ধীরে ধীরে আরও ভারী হয়ে উঠছিল, আর আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম দরজার পাশে, কিন্তু মনে হচ্ছিল। 
আমি যেন এই দৃশ্যের অংশ না বরং দূর থেকে সবকিছু দেখছি; মেঝেতে পড়ে থাকা কাজের লোকটার নিস্তেজ শরীর, চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের আতঙ্কিত মুখ, 
আর মাঝখানে বসে থাকা ইয়াসিন যার চোখে কোনো ভয় নেই, বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা, যেন সে এই পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। 
সে ধীরে ধীরে চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল কে প্রথম এই অবস্থায় লোকটাকে দেখেছে, আর একজন কাজের মহিলা কাঁপা গলায় উত্তর দিল সে পানি দিতে এসে দেখেছে, 
কিন্তু তার কথার ভেতরেও একটা লুকানো ভয় ছিল যেন সে পুরো সত্যটা বলছে না; ইয়াসিন আবার জিজ্ঞেস করল কেউ কিছু শুনেছে কিনা, 
কিন্তু সবাই মাথা নাড়িয়ে না বলল, আর সেই মুহূর্তেই আমি বুঝতে পারলাম এই বাড়িতে সত্যটা কেউ সহজে বলে না। 
ঠিক তখনই ইয়াসিনের মা সামনে এসে শান্ত গলায় বললেন এটা হয়তো একটা দুর্ঘটনা, পা পিছলে পড়ে গেছে, কিন্তু তার কণ্ঠ যতই স্বাভাবিক শোনাক না কেন, তার চোখে যে কঠোরতা ছিল, সেটা আমাকে বিশ্বাস করতে দিল না।
ইয়াসিন কিছু বলল না, শুধু একবার লোকটার দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল তাকে ঘরে নিয়ে যেতে আর ডাক্তার ডাকতে, তারপর যখন সবাই চলে গেল আর ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেল, তখন সেই ফাঁকা জায়গাটাই যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। 
আমি ধীরে ইয়াসিনের কাছে এগিয়ে গিয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলাম সে কি সত্যিই এটাকে দুর্ঘটনা মনে করে, আর সে হালকা হাসল একটা ঠান্ডা, হিসেবি হাসি এবং বলল এটা একটা সতর্কবার্তা, কথাটা শুনে আমার বুক ধক করে উঠল, কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম এই সতর্কবার্তাটা কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম কাকে, আর সে বলল আমাদের, তার গলার স্বর এতটাই স্থির ছিল যে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি কিছু বলার আগেই তার ফোন বেজে উঠল, সে স্ক্রিনের দিকে তাকাল আর তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল, যেন এই কলটার ভেতরে এমন কিছু আছে যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে; সে কল রিসিভ করে কিছুক্ষণ কথা বলল, খুব কম শব্দে, কিন্তু তার প্রতিটা প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে দিচ্ছিল সে যা শুনছে, তা গুরুত্বপূর্ণ; কল কেটে দেওয়ার পর আমি আর নিজেকে থামাতে পারলাম না, জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে, কিন্তু সে সরাসরি উত্তর না দিয়ে হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করল।
আমি কি আজ উপরের ফ্লোরে গিয়েছিলাম, প্রশ্নটা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল, কারণ আমি জানি আমি সেখানে গিয়েছিলাম, আমি আয়েশার সাথে কথা বলেছি, কিন্তু আমি সত্যটা বলার সাহস পেলাম না।
 এক সেকেন্ড থেমে মিথ্যা বললাম না, যাইনি; ইয়াসিন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, গভীরভাবে, যেন আমার ভেতরটা পড়ে ফেলতে চাইছে, কয়েক সেকেন্ড পর সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল অদ্ভুত, কারণ কেউ বলেছে সেখানে একজন মহিলার ছায়া দেখা গেছে, কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, কারণ আমি জানি সেই ছায়াটা কে, কিন্তু আমি কিছু বললাম না, আমার নীরবতাই যেন আমাকে আরও সন্দেহজনক করে তুলছিল। 
ঠিক তখনই আমার ফোন কেঁপে উঠল, অজানা নাম্বার, আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম আর অনুভব করলাম ইয়াসিনও তাকিয়ে আছে, সে আমাকে বলল কলটা রিসিভ করতে, আমি ধীরে ফোনটা কানে নিলাম, “হ্যালো” বলতেই ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ এল না, 
শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ, আর তারপর একটা পরিচিত কণ্ঠ আয়েশা, সে জিজ্ঞেস করল আমি কি ওদের বিশ্বাস করছি, আমার শরীর জমে গেল, আমি ফিসফিস করে তার নাম বললাম, সে তাড়াহুড়ো করে বলল সময় নেই, আমাকে এখনই ওই ঘর থেকে বের হয়ে যেতে হবে, 
আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন, সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল কারণ আমার পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে যতটা দেখাচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক; আমি ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম, সে তখনও স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার গলা শুকিয়ে গেল, 
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম সে কী বলতে চাইছে, তখন আয়েশা খুব নিচু গলায় বলল সেই রাতের সত্য শুধু সে না, ইয়াসিনও জানে; আমার বুক কেঁপে উঠল, আমি কিছু বলার আগেই কলটা কেটে গেল। 
আমি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর ফোনটা নামিয়ে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম, এবার আমার চোখে ভয় না—বরং সন্দেহ, আর সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল কি বলল, আমি ধীরে উত্তর দিলাম সে বলল কিছু প্রশ্ন না করাই ভালো, কথাটা বলার সাথে সাথেই আমি অনুভব করলাম ঘরের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠছে,
 আর এবার আমি নিশ্চিত এই খেলার ভেতরে আমি শুধু একজন দর্শক না, আমি নিজেই এখন একটা অংশ… এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো আমি জানি না আমি কার ওপর ভরসা করব। ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও আমি কিছুক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম, যেন শব্দটা এখনো কানে বাজছে “কিছু প্রশ্ন না করাই ভালো।” কথাটা সাধারণ শোনালেও এর ভেতরে এমন এক ঠান্ডা হুমকি ছিল, যা আমার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে জমে বরফ হয়ে যাচ্ছিল।
 আমার আঙুলগুলো ফোনের ওপর শক্ত হয়ে আছে, কিন্তু আমি যেন অনুভবই করতে পারছি না মনে হচ্ছে আমি নিজের শরীরের ভেতর থেকেও একটু দূরে সরে গেছি। 
চারপাশের সবকিছু—ঝাড়বাতির আলো, কার্পেটের নরম স্পর্শ, দেয়ালের ছবি—সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
ইয়াসিনের গলা আমাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। “কি বলল?”
আমি ধীরে তার দিকে তাকালাম। 
কিছুক্ষণ আগেও যার প্রতি আমার মনে শুধু ভয় আর সন্দেহ ছিল, এখন তার মাঝেও যেন একমাত্র ভরসার ছায়া খুঁজতে চাইছি এটা বুঝেই আমার ভেতরটা আরও অস্থির হয়ে উঠল।
“সে বলল… কিছু প্রশ্ন না করাই ভালো,” আমি ফিসফিস করে বললাম।
ইয়াসিন হালকা করে হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই—বরং যেন এক ধরনের নিশ্চিততা। “অবশেষে সে নিজের আসল রূপটা দেখাতে শুরু করেছে।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না… তুমি ভুল বুঝছো। সে এমন না… সে আমাকে বড় করেছে…” কিন্তু কথাগুলো মুখ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে আমি নিজেই বুঝতে পারলাম—আমি নিজের মনকেই বোঝানোর চেষ্টা করছি। কারণ এখন প্রতিটা স্মৃতি, প্রতিটা আচরণ নতুন করে সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “মানুষকে চেনা সবচেয়ে কঠিন কাজ, জৌতি। যারা আমাদের সবচেয়ে কাছের, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি লুকিয়ে রাখে।”
আমি কিছু বললাম না। শুধু মনে হচ্ছিল—আমি যেন একটা ফাঁদের ভেতরে আটকে গেছি, আর চারদিক থেকে দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
“তুমি কি জানো,” ইয়াসিন আবার বলল, “তোমার সৎমা সেই রাতে শুধু গাড়িতে ছিল না… সে-ই পুরো পরিকল্পনার একটা অংশ ছিল।”
আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। “কেন? সে কেন তোমাকে মারতে চাইবে?”
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, যেন ঠিক করছে কতটুকু বলবে। তারপর ধীরে বলল, “কারণ আমার পরিবার আর তোমার পরিবারের মধ্যে একটা পুরনো চুক্তি ছিল—যা ভেঙে গেলে অনেক কিছু ধ্বংস হয়ে যেত।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। “কোন চুক্তি?”
সে সরাসরি উত্তর দিল না। বরং বলল, “তুমি কি কখনো ভেবেছো—তোমার বাবার হঠাৎ এত ঋণ হলো কীভাবে?”
প্রশ্নটা আমার মাথায় যেন হাতুড়ির মতো আঘাত করল। আমি কখনো গভীরভাবে ভাবিনি। সবসময় ধরে নিয়েছিলাম—ব্যবসার ক্ষতি, ভুল সিদ্ধান্ত… এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু এখন…
“তুমি বলতে চাচ্ছো—এটা ইচ্ছাকৃত?”
ইয়াসিন আমার চোখে চোখ রেখে বলল, “হ্যাঁ। কেউ তোমার বাবাকে ওই অবস্থায় নিয়ে গেছে… যেন তাকে বাধ্য করা যায়।”
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। “কিসের জন্য?”
সে ধীরে বলল, “এই বিয়ের জন্য।”
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
আমি পেছনে সরে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। মাথা ঘুরছে। সবকিছু একসাথে মিলতে শুরু করেছে—সৎমার চাপ, বাবার অসহায়তা, এই হঠাৎ বিয়ে…
“না… এটা হতে পারে না…” আমি নিজের মাথা নাড়িয়ে বললাম, কিন্তু আমার কণ্ঠে বিশ্বাস নেই।
ঠিক তখনই বাইরে আবার শব্দ হলো—এইবার তাড়াহুড়োর পদশব্দ।
একজন কাজের লোক দৌড়ে এসে বলল, “স্যার… উপরের স্টোররুমে কেউ ঢুকেছে!”
আমার বুক ধক করে উঠল।
ইয়াসিনের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে গেল। “কেউ?”
লোকটা মাথা নেড়ে বলল, “জানি না… কিন্তু দরজাটা খোলা।”
ইয়াসিন এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল।
আমি তার পেছনে ছুটলাম।
আমরা আবার সেই সিঁড়ির দিকে উঠতে লাগলাম—যেটা আমি কিছুক্ষণ আগেই ব্যবহার করেছি। আমার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা এত জোরে হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল সবাই শুনতে পাচ্ছে।
ওপরে পৌঁছে দেখি করিডোরটা আগের মতোই ফাঁকা, কিন্তু এবার বাতাসে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা। যেন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
স্টোররুমের দরজাটা সত্যিই খোলা।
ইয়াসিন থামল। তার চোখ দরজার দিকে স্থির।
“পেছনে থাকো,” সে নিচু গলায় বলল।
আমি থেমে গেলাম, কিন্তু চোখ সরাতে পারলাম না।
সে ধীরে ধীরে দরজার ভেতরে ঢুকল।
আমি কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলাম… তারপর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে আমিও ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
ঘরটা অন্ধকার, ধুলোমাখা, চারদিকে পুরনো আসবাব আর বাক্স।
কিন্তু ঘরের মাঝখানে—
কিছু একটা পড়ে আছে।
আমি এগিয়ে গেলাম… আর যা দেখলাম, তাতে আমার শরীর জমে গেল।
মেঝেতে একটা পুরনো ডায়েরি।
তার ওপর তাজা রক্তের দাগ।
আমার হাত কাঁপতে লাগল।
“এটা…”
ইয়াসিন ধীরে ডায়েরিটা তুলে নিল।
তার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে গেল।
“এটা আয়েশার…” সে ফিসফিস করে বলল।
আমার বুক ধক করে উঠল।
“তাহলে সে এখানে ছিল…”
ঠিক তখনই পেছনে দরজা জোরে বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
আমরা দুজনেই ঘুরে তাকালাম।
দরজা বন্ধ।
আর বাইরে থেকে তালা লাগানোর শব্দ।
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“আমরা… আটকে গেছি…”
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না।
তারপর ধীরে বলল—
“না… আমাদের আটকে রাখা হয়েছে।”
ঘরের অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
আমার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে।
এই বাড়ির প্রতিটা পদক্ষেপ এখন ফাঁদ…
আর আমরা সেই ফাঁদের ভেতরেই আটকা পড়েছি।
দরজার ওপাশে তালা লাগার ধাতব শব্দটা থেমে যাওয়ার পর যে নিস্তব্ধতা নেমে এলো, সেটাই যেন আরও ভয়ংকর। 
মনে হচ্ছিল এই অন্ধকার ঘরের ভেতর আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দও কারো কানে পৌঁছে যাচ্ছে। আমি দরজার দিকে ছুটে গিয়ে হাত দিয়ে ঠেলে দেখলাম, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। 
দরজাটা শক্ত, ভারী, আর বাইরে থেকে তালা লাগানো এটা ভাঙা সহজ না।
“খুলুন! কেউ আছেন?” আমি চিৎকার করে উঠলাম, কিন্তু আমার কণ্ঠ ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। বাইরে কোনো সাড়া নেই।
ইয়াসিন আমাকে থামাল। তার গলা নিচু, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত—যেন সে ভয়কে জায়গা দিতে চায় না। “চিৎকার করে লাভ হবে না। যারা আমাদের এখানে আটকে রেখেছে, তারা চাইছে আমরা ভয় পাই।”
আমি ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেলাম, কিন্তু বুকের ভেতরটা এখনো কাঁপছে।
“তাহলে আমরা কী করব?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ডায়েরিটার দিকে তাকাল। “প্রথমে বুঝতে হবে—এটা এখানে কেন রাখা হয়েছে।”
আমি তাকালাম তার হাতে ধরা ডায়েরির দিকে। পুরনো, চামড়ার কভার, কিন্তু রক্তের দাগটা একেবারেই নতুন।
“তুমি কি মনে করো এটা ফাঁদ?” আমি ধীরে বললাম।
সে হালকা মাথা নাড়ল। “সম্ভবত… কিন্তু একই সাথে এটা একটা ক্লুও হতে পারে।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে ডায়েরিটা খুলল। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, কিন্তু লেখা স্পষ্ট।
প্রথম পাতায় শুধু একটা তারিখ—পাঁচ বছর আগের।
ইয়াসিন পড়তে শুরু করল, আর আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিটা শব্দ শুনতে লাগলাম—
“আজ আমি বুঝতে পারলাম, এই বাড়িতে যা দেখা যায়, তার বাইরে আরও কিছু আছে… ইয়াসিন কিছু লুকাচ্ছে না, বরং তাকে লুকাতে বাধ্য করা হচ্ছে…”
আমার গা শিউরে উঠল।
“এর মানে…”
ইয়াসিন আমার কথা শেষ করতে দিল না। সে পড়তে থাকল—
“আমি তাকে বিশ্বাস করি, কিন্তু এই বাড়ির অন্যদের না… বিশেষ করে—”
হঠাৎ করেই লেখা থেমে গেছে।
পাতাটা ছেঁড়া।
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“বিশেষ করে কে?”
ইয়াসিন দাঁত চেপে ধরল।
“ওরা ইচ্ছে করেই এই অংশটা কেটে ফেলেছে…”
আমি চারপাশে তাকালাম।
এই ঘরটা শুধু একটা স্টোররুম না—এটা যেন লুকানো সত্যের একটা ভাণ্ডার।
“আরও পাতা দেখো,” আমি বললাম।
সে দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।
হঠাৎ এক জায়গায় থামল।
তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
“কি হয়েছে?”
সে ধীরে পড়ল—
“আজ আমি সব দেখেছি… সেই রাতে গাড়িতে শুধু আমরা তিনজন ছিলাম না… আরেকজন ছিল, যে পুরো ঘটনাটা নিয়ন্ত্রণ করছিল… আমি বিশ্বাস করতে পারছি না—”
আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
“কে?”
সে আরেকটা পাতা উল্টাল।
কিন্তু এই পাতাটাও ছেঁড়া।
আমি হতাশ হয়ে বললাম, “সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোই কেটে ফেলা!”
ইয়াসিন চুপ করে রইল।
তারপর হঠাৎ বলল, “না… সব না।”
সে ডায়েরির একদম শেষ পাতাটা খুলল।
সেখানে শুধু একটা লাইন লেখা—
“যদি আমি কিছু হয়ে যাই… তাহলে সত্যটা খুঁজে পেতে হলে নিচের ঘরের আয়নাটা দেখো।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“নিচের ঘর?”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “এই বাড়িতে অনেক নিচতলা আছে… কিন্তু কোনটা?”
আমি কিছু বলার আগেই—
হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে একটা শব্দ এলো।
খসখস…
আমরা দুজনেই চমকে তাকালাম।
অন্ধকারের ভেতর… কিছু একটা নড়ছে।
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“কে ওখানে?”
কোনো উত্তর নেই।
কিন্তু শব্দটা আবার হলো—
আরও কাছে।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
আমি তার হাত চেপে ধরলাম।
“না… যেও না…”
সে আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে ভয় নেই—বরং প্রস্তুতি।
“আমাদের জানতেই হবে,” সে বলল।
সে এক পা এগোল…
ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে কেউ বেরিয়ে এলো—
আমি চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে থামালাম।
সে—আয়েশা।
কিন্তু এবার সে আগের মতো না।
তার চেহারায় ক্লান্তি, চোখে আতঙ্ক, আর শ্বাস দ্রুত।
“তোমরা এখানে কেন?” সে ফিসফিস করে বলল।
আমি হতবাক হয়ে বললাম, “আমাদের এখানে আটকে রাখা হয়েছে!”
সে চোখ বড় করে তাকাল।
“না… তোমাদের এখানে রাখা হয়েছে কারণ তোমরা সত্যের খুব কাছে চলে গেছো।”
আমার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তুমি জানো কে করেছে এটা?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ… আর তোমাদের এখনই এখান থেকে বের হতে হবে।”
“কিভাবে?”
সে দ্রুত ঘরের এক কোণে গেল।
পুরনো বাক্স সরিয়ে একটা ছোট লোহার দরজা দেখাল—যেটা আমি আগে খেয়ালই করিনি।
“এটা একটা গোপন পথ,” সে বলল, “এই বাড়ির পুরনো মালিকরা এটা ব্যবহার করত।”
ইয়াসিন অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি এটা জানলে কিভাবে?”
আয়েশা তার দিকে তাকাল—একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে।
“কারণ আমি এই বাড়ির শুধু বউ ছিলাম না… আমি ছিলাম ওদের পরিকল্পনার একটা অংশ।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“মানে?”
সে সরাসরি উত্তর দিল না।
বরং বলল, “সময় নেই। ওরা আসছে।”
দূরে পায়ের শব্দ ভেসে আসছে—ভারী, দ্রুত।
আমার শরীর জমে গেল।
ইয়াসিন দ্রুত সেই লোহার দরজাটা খুলতে লাগল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেটা খুলে গেল।
ভেতরে অন্ধকার সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে।
আমি একবার পেছনে তাকালাম—
দরজার বাইরে কেউ যেন দাঁড়িয়ে।
ছায়া।
আমার বুক ধড়ফড় করছে।
আয়েশা ফিসফিস করে বলল, “যাও… আমি ওদের আটকাবো।”
“না!” আমি বললাম, “তুমি আমাদের সাথে চলো!”
সে হালকা হাসল—দুঃখের হাসি।
“আমি অনেক আগেই এই বাড়ি থেকে বের হওয়ার সুযোগ হারিয়েছি…”
তার চোখে জল চিকচিক করছিল।
“কিন্তু তুমি এখনো পারো।”
ইয়াসিন আমার হাত ধরল।
“চলো!”
আমি শেষবারের মতো আয়েশার দিকে তাকালাম—
তারপর অন্ধকার সিঁড়ির ভেতরে নেমে গেলাম।
পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আর সেই সাথে—
উপরে কী ঘটছে, আমরা আর দেখতে পেলাম না। লোহার দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের অন্ধকার যেন হঠাৎ আরও ঘন হয়ে উঠল। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না শুধু অনুভব করতে পারছিলাম ইয়াসিনের হাত আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। 
সেই স্পর্শটাই এখন একমাত্র ভরসা। সিঁড়িগুলো নিচের দিকে নামছে, ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে, আর প্রতিটা ধাপে ধুলো জমে আছে—যেন বহু বছর কেউ এই পথ ব্যবহার করেনি। 
কিন্তু তবুও, এই পথটাই এখন আমাদের একমাত্র মুক্তির রাস্তা। আমার শ্বাস ভারী হয়ে আসছিল। 
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?” আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম। ইয়াসিন থামল না, শুধু নিচু গলায় বলল, “নিচের ঘর… আয়েশার ডায়েরিতে যে আয়নার কথা বলা হয়েছিল সেটা খুঁজতে হবে।”
আমি কিছু বলতে পারলাম না। মাথার ভেতর এখনো ঘুরছে আয়েশার মুখটা—তার সেই ক্লান্ত চোখ, তার ভয়, আর শেষ মুহূর্তের সেই দৃষ্টি, যেন সে জানে—আমরা চলে গেলে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ তৈরি হলো, কিন্তু এখন থামার সুযোগ নেই।
আমরা আরও নিচে নামতে লাগলাম। কয়েকটা মোড় ঘুরে হঠাৎ একটা সরু করিডোরে পৌঁছালাম। এখানে বাতাস ভারী, পুরনো কাঠ আর স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ। 
দূরে কোথাও থেকে খুব মৃদু আলো আসছে। “ওদিকে,” ইয়াসিন বলল। আমরা ধীরে ধীরে সেই আলোর দিকে এগোলাম। যতই কাছে যাচ্ছি, ততই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে—যেন এই জায়গাটা শুধু লুকানো না, বরং ইচ্ছে করেই ভুলে রাখা হয়েছে।
অবশেষে আমরা একটা ছোট ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজাটা আধখোলা।
ইয়াসিন আমাকে থামার ইশারা করল, তারপর নিজে আগে ঢুকল। আমি কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলাম… তারপর তার পেছনে ঢুকে পড়লাম। ঘরটা ছোট, কিন্তু দেয়ালজুড়ে পুরনো আসবাব, কিছু ভাঙা তাক, আর ঠিক মাঝখানে—
একটা বড় আয়না।নপুরনো, কালচে, কিন্তু এখনো পরিষ্কার।
আমার বুক ধক করে উঠল।
“এইটাই ইয়াসিন ধীরে ধীরে আয়নার সামনে এগিয়ে গেল।
আমরা দুজনেই নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখলাম ক্লান্ত, আতঙ্কিত, আর সন্দেহে ভরা। “ডায়েরিতে বলা হয়েছিল—এই আয়না,” আমি বললাম। সে আয়নাটা হাত দিয়ে স্পর্শ করল। প্রথমে কিছুই হলো না। তারপর  একটা হালকা শব্দ।
ক্লিক। আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম।
আয়নাটা ধীরে ধীরে পাশের দিকে সরে গেল। পেছনে একটা গোপন জায়গা—ছোট একটা কক্ষ, ভেতরে একটা টেবিল, আর তার ওপর ফাইলের স্তূপ। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
“এগুলো…” ইয়াসিন দ্রুত ভেতরে ঢুকল।
আমি তার পেছনে গেলাম। সে একটা ফাইল খুলল।
কাগজগুলো দেখে তার মুখের রং বদলে গেল।
“কি আছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর একটা কাগজ আমার হাতে দিল।
আমি পড়তে শুরু করলাম এগুলো ব্যাংকের কাগজ। ঋণের হিসাব… কিন্তু নাম দেখে আমার হাত কেঁপে উঠল।
“কামরুল হাসান…আমার বাবা। আমি দ্রুত চোখ বুলালাম
সব ঋণ… সব লেনদেন… আর শেষে একটা সাইন।
রাশেদা বেগম। আমার মাথা ঘুরে উঠল। “না… এটা মিথ্যে…”
কিন্তু কাগজে স্পষ্ট লেখা সে-ই এই সব লেনদেনের অংশ।
সে-ই বাবাকে এই অবস্থায় নিয়ে গেছে। আমার বুকের ভেতরটা ভেঙে গেল। আমি ধীরে ধীরে বসে পড়লাম।
“সে কেন করবে এটা  ইয়াসিন শান্ত গলায় বলল, “কারণ এই বিয়েটা দরকার ছিল… শুধু তোমার পরিবারের জন্য না, আমার পরিবারের জন্যও।” আমি তার দিকে তাকালাম।
“মানে?” সে আরেকটা ফাইল খুলল।
এইবার ছবি। আমি দেখলাম আমার সৎমা ইয়াসিনের মা
আর আরেকজন পুরুষ। তারা একসাথে দাঁড়িয়ে।
হাসছে। আমার বুক কেঁপে উঠল। “এটা… কবে?”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “অনেক আগে… যখন তারা একসাথে কাজ করত।” আমার মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল।
তারা একসাথে?” সে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ… তারা একসাথে এই সব পরিকল্পনা করেছে।” আমার গলা শুকিয়ে গেল। তাহলে… এই বিয়েটাও  “হ্যাঁ,” সে বলল, “এটা একটা চুক্তি।” আমার চোখে জল চলে এলো।
আমি বুঝতেই পারিনি আমি শুধু একটা খেলনার মতো ব্যবহার হচ্ছি। ঠিক তখনই হঠাৎ করেই বাইরে থেকে একটা শব্দ এলো। পায়ের শব্দ। ধীরে… কিন্তু স্পষ্ট।
আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম। ইয়াসিন দ্রুত ফাইলগুলো গুছাতে লাগল। “ওরা আমাদের খুঁজে পেয়েছে  আমার বুক ধড়ফড় করছে। পায়ের শব্দটা কাছে আসছে।
একদম দরজার সামনে এসে থামল। তারপর একটা কণ্ঠ।
পরিচিত। ঠান্ডা। “তোমরা ভেবেছিলে, এত সহজে সব জানতে পারবে?” আমার শরীর জমে গেল। এই কণ্ঠ আমি চিনি। আমি ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকালাম আর ঠিক তখনই দরজাটা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে রাশেদা বেগম।
আমার সৎমা।
দরজাটা খুলতেই সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। রাশেদা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন দরজার সামনে, তার মুখে সেই একই ঠান্ডা স্থিরতা যেটা আমি ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, কিন্তু আজ সেটা আর পরিচিত লাগছে না। 
আজ সেটা ভয়ংকর লাগছে। তার চোখ সরাসরি আমার দিকে, আর সেই দৃষ্টিতে কোনো মাতৃত্ব নেই, কোনো মমতা নেই—শুধু হিসেব, পরিকল্পনা আর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম, কিন্তু আমার পা যেন নিজের শরীরের ভর নিতে পারছে না। ইয়াসিন আমার পাশে এসে দাঁড়াল, হুইলচেয়ারটা একটু পেছনে সরিয়ে, যেন পরিস্থিতি বুঝতে চাইছে, আক্রমণ নয় পর্যবেক্ষণ। 
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেছে, যেন কেউ শ্বাস নেওয়ার সুযোগই দিচ্ছে না।
রাশেদা বেগম ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন। 
তার চোখ একবার ঘরের ভেতরের ফাইল, ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র, আর আয়নার পেছনের গোপন কক্ষের দিকে গেল। তারপর আবার আমাদের দিকে ফিরল।
“তোমরা এখানে পৌঁছে যাবে আমি জানতাম,” তিনি শান্ত গলায় বললেন। তার কণ্ঠ এতটাই স্বাভাবিক যে আমার গা শিউরে উঠল। ইয়াসিন ধীরে বলল, “তুমি সব জানো?”
রাশেদা বেগম হালকা হাসলেন। “সব না, কিন্তু যতটুকু জানা দরকার ছিল, ততটুকু আমি অনেক আগেই জানতাম।”
আমি হঠাৎ সাহস জড়ো করে বললাম, “আপনি আমার বাবাকে ধ্বংস করেছেন… কেন?” তার চোখ সরাসরি আমার দিকে এলো। সেই দৃষ্টি একদম স্থির, ঠান্ডা।
“ধ্বংস?” তিনি ধীরে বললেন, “না জৌতি… আমি তাকে সুযোগ দিয়েছিলাম।” আমার বুক ধক করে উঠল। 
“সুযোগ?” তিনি ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এলেন, যেন প্রতিটা শব্দ হিসেব করে বলছেন। “তোমার বাবা নিজের দুর্বলতা দিয়ে নিজের পতন ডেকে এনেছে। আমি শুধু সেই পথটা খুলে দিয়েছি।” ইয়াসিন হঠাৎ বলল, “আর এই বিয়ে?”
তিনি তার দিকে তাকালেন। “এটাই মূল চুক্তি ছিল।”
আমার মাথা ঘুরে উঠল। “মানে আমি… একটা চুক্তির অংশ?” রাশেদা বেগম মাথা নাড়লেন। “তুমি শুধু অংশ না জৌতি… তুমি ছিলে চাবি।” আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কিসের চাবি?” তিনি ধীরে বললেন, “এই দুই পরিবারের সম্পত্তি, ক্ষমতা আর পুরনো শত্রুতার সমাপ্তি… সবকিছু তোমার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আসার কথা ছিল।”
ইয়াসিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি আমাকে ব্যবহার করেছো?” তিনি একদম শান্তভাবে বললেন, “আমি সবাইকে ব্যবহার করেছি, ইয়াসিন। তোমাকেও, তোমার পরিবারকেও, এমনকি আমার নিজের রক্তকেও।”
আমার চোখে জল চলে এলো, কিন্তু আমি নিজেকে থামালাম। “তাহলে আয়েশা?”
এই নামটা শুনতেই রাশেদা বেগমের চোখ একটু সরু হলো।
“ও একটা ভুল ছিল,” তিনি বললেন।
আমার গলা কেঁপে উঠল। “ভুল?” তিনি হালকা মাথা নেড়ে বললেন, “সে অনেক কিছু দেখে ফেলেছিল। তাই তাকে সরিয়ে দিতে হয়েছিল।” আমি শিউরে উঠলাম।
ইয়াসিন হঠাৎ সামনে এগিয়ে এলো। “তুমি ওকে কী করেছো?” রাশেদা বেগম একটু থামলেন। তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বললেন, “সে এখন যেখানে থাকা উচিত, সেখানেই আছে।” এই বাক্যটা আমার ভেতরে ভয়ংকর একটা অনুভূতি তৈরি করল। মানে… সে কি বেঁচে আছে? না কি
আমি আর ভাবতে পারলাম না। হঠাৎ করেই ইয়াসিন বলল, “তুমি ভেবেছিলে আমি কিছু বুঝব না?”
তার কণ্ঠ এবার বদলে গেছে আর আগের মতো শান্ত না।
রাশেদা বেগম তার দিকে তাকালেন। 
“তুমি বুঝলেও কিছু করতে পারবে না।” এই কথার পর ঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “তুমি ভুল করেছো।”
রাশেদা বেগম হালকা হাসলেন। “আমি কখনো ভুল করি না।” ঠিক তখনই হঠাৎ করেই ঘরের আলো এক মুহূর্তের জন্য টিমটিম করে উঠল। আর সেই মুহূর্তে ইয়াসিন হুইলচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। আমি চমকে উঠলাম।
রাশেদা বেগমও এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন। ইয়াসিন ধীরে, খুব স্থিরভাবে বলল, “এই খেলা এখন শেষ হবে।”
তার পায়ের নিচে যেন বহুদিনের চাপা শক্তি ফিরে এসেছে।
রাশেদা বেগম প্রথমবারের মতো চোখ সরু করলেন।
“তুমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হওনি…”
ইয়াসিন হালকা হাসল। “আমি কখনো অসুস্থ ছিলাম না।”
এই কথাটা শুনে আমার মাথা ঘুরে উঠল।
মানে… সে কি সবসময়ই নাটক করছিল?
রাশেদা বেগম কিছু বলার আগেই ইয়াসিন আবার বলল,
“তুমি আমাকে দুর্বল ভেবেছিলে… তাই ভুল করেছো।”
হঠাৎ করে সে আমার দিকে তাকাল। “জৌতি… সত্যটা শোনো।” আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
সে ধীরে বলল, “দুর্ঘটনা ছিল না। কিন্তু আমি সেটা থামাতে পারিনি… কারণ তখন আমাকে নীরব থাকতে হয়েছিল।”
রাশেদা বেগম চিৎকার করে উঠলেন, “চুপ কর!”
কিন্তু ইয়াসিন থামল না। “যারা এটা করেছে… তারা এখনো এখানে আছে।” তারপর সে ধীরে রাশেদা বেগমের দিকে আঙুল তুলল। আর সে-ই তাদের একজন।”
আমার পুরো পৃথিবীটা যেন ভেঙে পড়ল। নিজের সৎমা…
যাকে আমি মা বলে জেনেছি… তিনি সবকিছুর মূল অংশ?
রাশেদা বেগমের মুখে এবার প্রথমবারের মতো রাগ দেখা গেল। “তুমি খুব বেশি এগিয়ে গেছো, ইয়াসিন।”
তিনি ধীরে হাত তুললেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে অনেক মানুষের পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আমি বুঝতে পারলাম—আমরা ঘেরাও হয়ে গেছি। ইয়াসিন আমার দিকে তাকাল। “এটাই শেষ সুযোগ,” সে ফিসফিস করে বলল, “আমার সাথে থাকো, নাকি তাদের সাথে।”
আমি কাঁপতে থাকা হাতে তাকালাম। রাশেদা বেগম সামনে, ইয়াসিন পাশে, আর বাইরে অজানা মানুষজন।
আমি বুঝতে পারছিলাম এখন সিদ্ধান্তই আমার জীবন বদলে দেবে। আমি ধীরে বললাম, “আমি সত্যের পাশে থাকব।” ইয়াসিন চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
তারপর বলল, “তাহলে শুরু হলো শেষ।”
রাশেদা বেগম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তার পেছনে থাকা লোকজন ধীরে ধীরে ঘরটা ঘিরে ফেলছে। আগের সেই আত্মবিশ্বাসী মুখটা এখন আর আগের মতো নেই—তার চোখে প্রথমবারের মতো একটা হিসাবের ভুল ধরা পড়ার ছাপ স্পষ্ট। ইয়াসিন এক পা এগিয়ে গেল।
“সব খেলা শেষ, তুমি আর লুকাতে পারবে না।”
রাশেদা বেগম ধীরে মাথা নাড়লেন। “তুমি ভাবছো তুমি সব জেনে গেছো?” তার কণ্ঠ এখন আর আগের মতো ঠান্ডা না, বরং একটু ভাঙা।
আমি পেছনে দাঁড়িয়ে আছি, বুক ধড়ফড় করছে। আয়েশা পাশে এসে দাঁড়াল, তার চোখ দরজার বাইরে, যেন কিছু অপেক্ষা করছে।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরেকটা গাড়ি থামার শব্দ শোনা গেল। রাশেদা বেগম হঠাৎ থেমে গেলেন।
দরজার বাইরে পায়ের শব্দ আরও ভারী হলো।
ইয়াসিন নিচু গলায় বলল, “আর কারা এসেছে?”
আয়েশা ফিসফিস করে বলল, “শেষ অংশ…” দরজাটা আবার খুলে গেল। এইবার ভেতরে ঢুকল একজন বৃদ্ধ মানুষ। তার মুখ দেখে আমি চমকে উঠলাম।
রাশেদা বেগম এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেলেন। “তুমি…” তিনি ফিসফিস করলেন। ইয়াসিন তাকিয়ে রইল।
“তুমি এখনো বেঁচে আছো?” বৃদ্ধ মানুষটি ধীরে বলল, “যারা সত্য জানে, তারা সহজে মরে না।” ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। আমি বুঝতে পারলাম—এটাই সেই মানুষ, যাকে এতদিন সবাই আড়ালে রেখেছিল।
সে ধীরে বলল, “এই সব শুরু করেছিলাম আমি।” আমি শিউরে উঠলাম। ইয়াসিন ধীরে বলল, “মানে?”
বৃদ্ধ মানুষটি সামনে এগিয়ে এল। তোমাদের দুই পরিবারের লোভ, ক্ষমতার যুদ্ধ, সবকিছুকে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলাম… কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হাত থেকে বেরিয়ে গেছে।”
রাশেদা বেগম ধীরে বললেন, “তুমি আমাদের ব্যবহার করেছো…”সে মাথা নাড়ল। “না… তোমরা সবাই নিজেরাই ব্যবহার হয়েছো।” আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আর আমি?” সে আমার দিকে তাকাল।
“তুমি ছিলে সেই সূত্র, যেটা সবকিছুকে আবার একসাথে বাঁধতে পারত।” ইয়াসিন হঠাৎ বলল, “এই খেলা এখানেই শেষ হবে।” বৃদ্ধ মানুষটি হালকা হাসল। “শেষ? না ইয়াসিন… এখন শুরু।” ঠিক তখনই আয়েশা এগিয়ে এলো।
“না,” সে দৃঢ়ভাবে বলল, “এবার সত্য সত্যই শেষ হবে।”
সে টেবিলের ওপর একটা ফাইল রাখল।
“এটাই সব প্রমাণ।” রাশেদা বেগম প্রথমবার নরম গলায় বললেন, “সবকিছু শেষ হয়ে গেছে…”
বৃদ্ধ মানুষটি ধীরে পেছনে সরে গেল।
“না,” সে বলল, “এখন শুধু একটাই সিদ্ধান্ত বাকি।” সব চোখ আমার দিকে ফিরল। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমার বুকের ভেতর ভয় নেই এখন—শুধু একটা সিদ্ধান্তের ভার। ইয়াসিন ধীরে বলল, “জৌতি…” আমি তার দিকে তাকালাম। সে বলল, “তুমি বলো। আমি গভীর শ্বাস নিলাম।
“এই গল্প আর কারো নিয়ন্ত্রণে থাকবে না,” আমি বললাম, “না তোমার, না ওদের।” ঘরের ভেতর নীরবতা।
আমি ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।
“আমি এখন আমার নিজের জীবন বেছে নিচ্ছি।”
আমি বাইরে পা রাখলাম। পেছনে কোনো চিৎকার নেই।
শুধু নীরবতা। আর সেই নীরবতার ভেতরেই শেষ হলো সব চুক্তি, সব খেলা, সব মিথ্যে।
সমাপ্ত- 

....
👁 398