নীরব প্রেমের অন্ধ

আমি আমার অসুস্থ বাবাকে বাঁচানোর জন্য একজন বয়স্ক মানুষকে বিয়ে করেছিলাম একটা শর্তে। প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে আমাকে একটা অদ্ভুত ওষুধ খেতে হবে। আর তখন আমি জানতামই না, এটা আমার সাথে কী করছিল। 
কিন্তু একদিন আমি একটা লুকানো ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত নিলাম, আর যা দেখলাম, তাতে আমি সম্পূর্ণভাবে কেঁপে উঠেছিলাম। 
আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম কারণ আমার আর কোনো উপায় ছিল না। সবকিছু বদলে গিয়েছিল এক রাতেই। 
আমি বিন্তী, কুষ্টিয়ার এক ছোট গ্রামের মেয়ে। আমার বাবা আব্দুল হালিম সবসময়ই শক্ত মানুষ ছিলেন। 
কিন্তু হঠাৎ একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার বললেন, তার জরুরি অপারেশন দরকার। 
খরচ এত বেশি ছিল যে আমি যেন দিশেহারা হয়ে গেলাম। 
কোনো টাকা ছিল না, সাহায্য করার মতো আত্মীয়ও ছিল না। আমি পুরোপুরি একা হয়ে পড়েছিলাম।
ঠিক তখনই সে আমাদের জীবনে এলো।
সে ছিল আমার বাবার পুরনো বন্ধু মিস্টার ইয়াসিন। 
বহু বছর পর তিনি হঠাৎ করেই আমাদের বাড়িতে আসেন। 
আমি তার সম্পর্কে শুধু এতটুকুই জানতাম তিনি নাকি ছোটবেলায় একটু অদ্ভুত ছিলেন, মানুষের থেকে দূরে থাকতেন। কিন্তু এখন তিনি অনেক বড় ব্যবসায়ী, প্রচুর টাকা, প্রভাব সবকিছু আছে।
তিনি যেন হঠাৎ করেই আমাদের এই দুর্দশার মুহূর্তে উপস্থিত হলেন, যেন আগে থেকেই জানতেন এই সময়টা আসবে।
তিনি আমার কথা খুব শান্তভাবে শুনলেন, কোনো আবেগ ছাড়াই। তারপর বললেন তিনি আমার বাবার অপারেশনের পুরো খরচ দেবেন। পুরোটা।
কিন্তু বিনামূল্যে নয়।
তার শর্ত ছিল আমাকে তাকে বিয়ে করতে হবে।
আর আমাকে এমন কাগজে সই করতে হবে যেখানে লেখা থাকবে, আমি তার বাড়ির ভেতরে কী হয়, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারব না। আমার কোনো উপায় ছিল না।
তাই আমি রাজি হয়ে গেলাম।
কোনো আসল বিয়ের আয়োজন ছিল না। 
শুধু কিছু কাগজে সই, ঠান্ডা দৃষ্টি, আর এক অদ্ভুত নীরবতা যা কথার চেয়েও ভারী ছিল। প্রথম রাত থেকেই কিছু একটা অস্বাভাবিক লাগতে শুরু করল।
রাতে দরজাটা ধীরে ধীরে খুলল। 
আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। মিস্টার ইয়াসিন দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাতে একটা ছোট সাদা ওষুধ।
“এটা খেতে হবে,” তিনি শান্তভাবে বললেন। “তাহলেই তোমার বাবার অপারেশনের টাকা যাবে।”
আমি কিছু বলতে চাইলাম, কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন।
তাই আমি ওষুধটা খেলাম।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীর ভারী হয়ে গেল, চোখ বন্ধ হয়ে এলো, আর আমি গভীর ঘুমে চলে গেলাম।
পরের সকালে কিছুই মনে থাকত না।
কিছুই না।লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
আর এভাবেই প্রতিরাতে চলতে থাকল।
তিনি আসতেন। ওষুধ দিতেন। আমি ঘুমিয়ে পড়তাম।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল আমি জানতামই না, আমি ঘুমিয়ে থাকলে কী হয়। তিনি খুব কম কথা বলতেন। 
দিনের বেলায় তাকে প্রায় দেখাই যেত না। শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকতেন।
তবুও আমার ভেতরে এক অজানা ভয় জমে উঠছিল।
আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না এই অজানা জীবন।
তাই একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি সত্য জানবই।
আমি লুকিয়ে একটা ক্যামেরা বসালাম।
আমার হাত কাঁপছিল। যদি তিনি বুঝে যান, কী হবে আমি জানতাম না। তবুও আমাকে জানতে হতো।
সেই রাতেও সব আগের মতোই হলো। তিনি এলেন।
আমি ওষুধ খেলাম। আর সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
পরের দিন তিনি চলে গেলে আমি দরজা বন্ধ করে ভিডিওটা চালালাম। প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক ছিল না। 
আমি শুধু ঘুমিয়ে ছিলাম। কয়েক মিনিট পর দরজা খুলল।
মিস্টার ইয়াসিন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন। বিছানার পাশে এসে বসলেন। আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে জমে গেলাম।
তিনি একটু ঝুঁকলেন… আর আলতো করে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে, খুব শান্তভাবে। 
কিন্তু তবুও কিছু একটা অস্বস্তিকর ছিল। তার মুখের অভিব্যক্তি…
স্থিরতা…নীরবতা…
আমি ভিডিওটা বন্ধ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারলাম না।
তিনি সেখানে বসে রইলেন, শুধু তাকিয়ে… যেন আমি কোনো অজানা রহস্যের অংশ। 
আর তখনই আমার মনে হলো এটা শুধু আমার বাবাকে বাঁচানোর চুক্তি নয়।
এটা অন্য কিছু। ভয়ংকর কিছু।
আর আমি এখনই মাত্র তার শুরুটা বুঝতে পারছি। সেই ভিডিওটা শেষ হওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসে ছিলাম। ল্যাপটপের স্ক্রিন বন্ধ, ঘরটা নিস্তব্ধ, কিন্তু আমার মাথার ভেতরে তখন একটা ঝড় চলছে। 
বারবার একই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছিল—মিস্টার ইয়াসিন বিছানার পাশে বসে আছেন, আর আমি গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে আছি।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল, তিনি আমাকে কোনো ক্ষতি করেননি। কোনো অশোভন আচরণ নয়, কোনো ভয়ংকর কাজ নয়। শুধু বসে থাকা, তাকিয়ে থাকা, আর মাঝে মাঝে আমার চুলে আলতো করে হাত বুলানো।
কিন্তু এই “শান্ত” আচরণটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল।
কারণ একজন মানুষ যদি কিছু খারাপ করতে চায়, সেটা বোঝা যায়। কিন্তু যখন কেউ কিছুই করে না, শুধু নীরবে দেখে যায়, তখন সেই নীরবতার পেছনে লুকানো উদ্দেশ্যটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি আর এভাবে থাকতে পারব না। সত্য জানতে হবে।
পরের দিন সকালে আমি আগের মতো স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। মিস্টার ইয়াসিন সাধারণত সকালে আমার সামনে আসতেন না। 
তিনি দিনের বেশিরভাগ সময় বাড়ির ভেতরের একাংশে থাকতেন, যেখানে আমি কখনো যেতাম না।
বাড়িটা বিশাল ছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ফাঁকা। 
অনেকগুলো বন্ধ দরজা, লম্বা করিডোর, আর এমন কিছু ঘর ছিল যেগুলোর দিকে তাকালেই মনে হতো সেখানে প্রবেশ নিষেধ, না বললেও বুঝে নিতে হয়।
সেদিন আমি ঠিক করলাম, আমি সেই নিষিদ্ধ জায়গাগুলোর দিকেই যাব।
বিকেলের দিকে, যখন বাড়িতে কোনো শব্দ ছিল না, 
আমি ধীরে ধীরে করিডোর দিয়ে এগোতে শুরু করলাম। 
প্রতিটা পা ফেলছিলাম খুব সাবধানে, যেন কেউ আমার উপস্থিতি টের না পায়। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
একটা ঘরের সামনে এসে থামলাম। দরজাটা একটু পুরনো, কিন্তু তালা দেওয়া ছিল না। হাত কাঁপতে কাঁপতে আমি দরজাটা খুললাম। ভেতরে ঢুকেই আমি থমকে গেলাম।
এটা কোনো সাধারণ ঘর ছিল না। পুরো ঘরজুড়ে দেয়ালে ছবি, নোট, কাগজ, আর কিছু পুরনো ফাইল ছড়িয়ে ছিল। 
মাঝখানে একটা বড় টেবিল, তার ওপর কয়েকটা ওষুধের বোতল, আর কিছু যন্ত্রপাতি।
আমি ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে তাকালাম।
আর তখনই আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
দেয়ালে আমার ছবি।
না, শুধু আমারই না—আমার শৈশবের ছবি, গ্রামের ছবি, স্কুলের ছবি, এমনকি আমি যেখানে কাজ করতাম সেই জায়গার ছবিও।
সবকিছু সাজানো, পর্যবেক্ষণ করা, যেন কেউ অনেক বছর ধরে আমাকে অনুসরণ করছে।
আমি এক পা পিছিয়ে এলাম।
হঠাৎ পেছন থেকে দরজার শব্দ হলো।
আমি ঘুরে তাকাতেই দেখলাম মিস্টার ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো ভয়ও নেই। 
শুধু সেই একই শান্ত, স্থির চোখ।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, তুমি এখানে আসবে আমি জানতাম। আমার গলা শুকিয়ে গেল। 
আমি বললাম, আপনি আমাকে কেন অনুসরণ করছেন? এই সব কী? তিনি একটু চুপ থাকলেন। 
তারপর ধীরে বললেন, আমি তোমাকে অনুসরণ করিনি বিন্তী। আমি তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি।
এই কথাটা আমার মাথায় ঢুকল না। বাঁচানোর চেষ্টা? এভাবে?
আমি কাঁপা কণ্ঠে বললাম, প্রতিরাতে ওষুধ কেন দেন আমাকে? আমি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কিছুই মনে করতে পারি না কেন? তিনি একটু এগিয়ে এলেন। 
তার চোখ আমার দিকে স্থির।
তিনি বললেন, ওই ওষুধ তোমাকে ঘুম পাড়ায় না বিন্তী। 
সেটা তোমার স্মৃতি আংশিকভাবে ব্লক করে দেয়।
আমি এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
তিনি আবার বললেন, কারণ তুমি যদি পুরোটা মনে রাখতে, তুমি বাঁচতে পারতে না।
আমি চিৎকার করে উঠলাম, কী বলছেন এসব? আমি কীসের মধ্যে আছি?
তিনি এবার চোখ নামালেন। তার কণ্ঠ একটু ভারী হয়ে এলো।
তোমার বাবা যেই অসুখে পড়েছেন, সেটা সাধারণ কোনো অসুখ না। এটা একটা দীর্ঘদিনের জটিল বিষক্রিয়া। 
আর এই বিষক্রিয়া এসেছে তোমারই চারপাশের কিছু মানুষের কাছ থেকে।
আমি থমকে গেলাম।
তিনি বললেন, আমি তোমার বাবার বন্ধু ছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি এখন একজন গবেষক। 
আমি বহু বছর ধরে এই বিষ নিয়ে কাজ করছি। তোমার পরিবার একটা বড় ষড়যন্ত্রের শিকার।
আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছিল।
আমি বললাম, তাহলে আমাকে বিয়ে কেন করলেন?
তিনি একটু থেমে বললেন, কারণ এই বিষের প্রভাব তোমার রক্তেও আছে। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
তুমি আমার পর্যবেক্ষণে না থাকলে তুমি অনেক আগেই মারা যেতে। আমি পেছনে হেঁটে গেলাম।
সবকিছু অযৌক্তিক লাগছিল। ভয়, সন্দেহ, আর বাস্তবতার মাঝখানে আমি আটকে গিয়েছিলাম।
আমি বললাম, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না।
তিনি কোনো জোর করলেন না। শুধু বললেন, বিশ্বাস না করলে আজ রাতের পরের পর্ব দেখো না।
এরপর তিনি চলে গেলেন।
আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি।
মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—আমি কি সত্যিই বাঁচার জন্য এখানে আছি, নাকি এটা আরও বড় কোনো খেলার অংশ?
সেই রাতেই আমি আবার ক্যামেরা চেক করলাম।
আর এবার আমি ঠিক করলাম, শুধু দেখা নয়, আমি সবকিছু রেকর্ড করব… শেষ পর্যন্ত।
কারণ এখন আমার ভয় শুধু অজানা নয়।
আমার ভয় সত্যটা। সেই রাতটা আমার জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘ রাত হয়ে উঠেছিল। বাড়িটা তখন যেন আগের চেয়েও বেশি নীরব লাগছিল। প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা দরজা, এমনকি বাতাস পর্যন্ত কেমন যেন ভারী হয়ে ছিল। 
আমি বিছানায় শুয়ে থাকলেও ঘুম আসছিল না। চোখ বন্ধ করলেই শুধু আগের দিনের সেই ঘরের দৃশ্য আর মিস্টার ইয়াসিনের কথাগুলো মাথায় ঘুরছিল।
“ওষুধ তোমাকে ঘুম পাড়ায় না… এটা তোমার স্মৃতি ব্লক করে।”লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল! 
এই একটা বাক্যই আমাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।
আমি যদি সত্যিই প্রতিরাতে কিছু ভুলে যাই, তাহলে আমার জীবনের কতটা অংশ আমার নিজের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে? আর কেনই বা হারাচ্ছে?
সেদিন রাতে আমি ঠিক করলাম, আর কোনোভাবেই আমি সেই ওষুধ খাব না।
যতই ভয় হোক, যতই শর্ত থাকুক, এবার আমি জেগে থাকব। রাত গভীর হতে থাকল। 
জানালার বাইরে শুধু অন্ধকার, আর মাঝে মাঝে দূরের কোনো কুকুরের ডাক। বাড়ির ভেতরেও কোনো শব্দ নেই। 
মিস্টার ইয়াসিন সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ে আসতেন, আর সেই সময়টা যত এগোচ্ছিল, আমার বুকের ধুকধুকানি ততই বাড়ছিল।
ঠিক আগের মতোই দরজাটা ধীরে খুলল।
তিনি ভেতরে এলেন। হাতে সেই ছোট সাদা ওষুধের বোতল।
তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। সেই একই শান্ত, স্থির, প্রায় অনুভূতিহীন চোখ।
তিনি বললেন, সময় হয়েছে। আমি বিছানায় উঠে বসলাম না। শুধু তাকিয়ে রইলাম। আজ আমি খাচ্ছি না।
এই কথা বলার সাথে সাথেই ঘরের বাতাস যেন থেমে গেল। তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
তার কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে একটু বেশি নিচু।
খাবে না মানে?
আমি বললাম, আমি আর কিছুই মনে রাখতে পারি না। আমার জীবন আমার নিজের মনে হচ্ছে না। 
আমি জানি না আপনি সত্যি বলছেন নাকি আমাকে ধোঁকা দিচ্ছেন। আমি আর এটা খাব না।
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর তিনি বললেন, তুমি যদি না খাও, তাহলে তুমি আজ রাতটা পার করতে পারবে না।
এই কথাটা ভয় দেখানোর মতো শোনাল না, বরং যেন একটা বাস্তব সতর্কবার্তা। আমি বললাম, কেন?
তিনি ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে গেলেন, তারপর বললেন, কারণ আজ রাতটা আগের সব রাতের মতো না।
তার এই কথাটা আমার শরীর ঠান্ডা করে দিল।
আমি বললাম, মানে কী?
তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, আজ তুমি জেগে থাকলে কিছু জিনিস দেখবে যা তোমার জন্য প্রস্তুত না।
আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আমি সব জানি চাই। তিনি এবার ঘুরে তাকালেন।
তার চোখে প্রথমবারের মতো একটু পরিবর্তন দেখা গেল। খুব সামান্য, কিন্তু সেটা ছিল যেন দুঃখ আর ক্লান্তির মিশ্রণ।
তিনি বললেন, তাহলে জেনে রাখো, আজ রাতেই তোমার স্মৃতির কিছু অংশ ফিরতে শুরু করবে।
আমি থমকে গেলাম। তিনি ওষুধটা টেবিলে রেখে দিলেন, কিন্তু জোর করলেন না। এবার তুমি ঠিক করো।
এরপর তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আমি দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। 
ভেতরে ভয় ছিল, কিন্তু তার থেকেও বড় ছিল অজানা সত্য জানার তীব্র ইচ্ছা। আমি ওষুধটা নিলাম না।
সময়ের সাথে সাথে রাত আরও গভীর হলো।
প্রথমে কিছুই ঘটছিল না। আমি বিছানায় বসে ছিলাম, আলো বন্ধ, শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হালকা চাঁদের আলো ঘরের মেঝেতে পড়ছিল।
হঠাৎ আমার মাথায় একটা অদ্ভুত চাপ অনুভব হলো।
যেন কেউ ভেতর থেকে কিছু খুলে দিচ্ছে।
আমি চোখ বন্ধ করলাম, আর তখনই শুরু হলো।
ছবি।
একটার পর একটা ছবি আমার মাথার ভেতরে ভেসে উঠতে লাগল।
আমি ছোটবেলায়… কিন্তু কিছু দৃশ্য আমার অচেনা।
একটা ঘর, যেখানে আমি ছিলাম না… কিন্তু আমি দেখছি।
আমার বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন, কিন্তু তিনি শুধু অসুস্থ নন… তিনি ভয় পাচ্ছেন।
কিছু মানুষ তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
আর মিস্টার ইয়াসিন সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন… কিন্তু অন্যরকমভাবে।
তিনি তখন বয়সে তরুণ, কিন্তু তার চোখ আজকের মতোই।
হঠাৎ দৃশ্য বদলে গেল।
আমি দেখলাম একটা কাগজে স্বাক্ষর হচ্ছে। আমার বাবার হাত কাঁপছে।
আর পাশে কেউ বলছে, এটা গোপন রাখতে হবে।
আমার মাথা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছিল।
আমি চিৎকার করতে চেয়েও পারছিলাম না।
হঠাৎ সব থেমে গেল।
আমি বিছানায় পড়ে আছি, ঘাম দিয়ে শরীর ভিজে গেছে।
কিন্তু এখন আমি কিছু জিনিস জানি।
আমি জানি, আমার বাবা শুধু অসুস্থ হননি।
তাকে অসুস্থ করা হয়েছে। 
পরবর্তী অংশ সবার আগে পড়তে, মিস্টার ইয়াসিন নীল লিখে সার্চ করুন তাহলে লেখকের পেইজ পেয়ে যাবেন।
আর আমি জানি, মিস্টার ইয়াসিন শুধু একজন সাধারণ ব্যবসায়ী বা বন্ধু নন।
তিনি এই পুরো ঘটনার অংশ।
কিন্তু কোন অংশ?
এটা আমি এখনো পুরো বুঝতে পারিনি।
সেই রাতের পর আমার জীবন আরও অস্থির হয়ে গেল।
পরের দিন সকালে আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। 
কিন্তু আমার চোখের ভেতরে এখন আর আগের মতো অন্ধকার নেই। এখন সেখানে সন্দেহ, প্রশ্ন আর কিছু টুকরো স্মৃতি জেগে উঠছে।
মিস্টার ইয়াসিন আমাকে আগের মতোই দেখছিলেন। 
কিন্তু এবার আমি তাকে অন্যভাবে দেখছিলাম।
তার প্রতিটা নীরবতা এখন অর্থবহ মনে হচ্ছিল।
তার প্রতিটা দৃষ্টি এখন সন্দেহজনক লাগছিল।
সেদিন দুপুরে আমি আবার সেই নিষিদ্ধ ঘরে ঢুকলাম।
কিন্তু এবার আমি একা ছিলাম না।
আমি জানতাম, আমাকে দ্রুত সবকিছু বুঝতে হবে।
ঘরে ঢুকেই আমি টেবিলের ড্রয়ার খুললাম।
ভেতরে কিছু পুরনো কাগজ।
আমি একটা ফাইল খুলতেই দেখি, সেখানে লেখা কিছু মেডিকেল রিপোর্ট।
আমার বাবার নাম।
তার পাশে একটি রাসায়নিক বিষের নাম লেখা।
আর নিচে লেখা—দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে স্মৃতি দুর্বলতা, মানসিক বিভ্রান্তি এবং ধীরে ধীরে মৃত্যু।
আমি কাগজটা হাত থেকে পড়ে গেল।
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। তাহলে কি মিস্টার ইয়াসিন সত্যি আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন?
নাকি তিনি এই বিষের সাথেই যুক্ত?
হঠাৎ দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আমি দ্রুত কাগজগুলো লুকানোর চেষ্টা করলাম।
দরজা খুলল। 
মিস্টার ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছেন।
তার চোখ এবার আগের চেয়ে বেশি গভীর।
তিনি শুধু বললেন, তুমি ওষুধ খাওনি।
আমি কিছু বললাম না।
তিনি ভেতরে এসে ফাইলগুলোর দিকে তাকালেন, তারপর ধীরে বললেন, তুমি এখন অনেক দূরে চলে গেছ।
আমি বললাম, সত্যি কী?
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, সত্যি জানলে তুমি আর ফিরে আসতে পারবে না।
আমি বললাম, আমি আর ফিরতে চাই না।
এই কথার পর ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, তাহলে তোমাকে একটা শেষ জিনিস দেখাতে হবে।
আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম…
এই গল্প এখন আর শুধু আমার বাবাকে বাঁচানোর গল্প না।
এটা এখন একটা সত্য উন্মোচনের শুরু… যেখানে শেষটা হয়তো আমার জীবনকেও বদলে দেবে। “এটা এখন একটা সত্য উন্মোচনের শুরু… যেখানে শেষটা হয়তো আমার জীবনকেও বদলে দেবে।”
মিস্টার ইয়াসিন এই কথাটা বলার পর ঘরের ভেতর এমন একটা নীরবতা নেমে এলো, যা যেন বাতাসকেও ভারী করে দিল। আমি দাঁড়িয়ে আছি, হাতে সেই ফাইল, আর মনে হচ্ছে আমার চারপাশের সবকিছু ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে দেয়াল, আলো, এমনকি মানুষটাকেও আমি আর আগের মতো দেখতে পারছি না।
তিনি ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। কিন্তু এবার তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়া নেই, কোনো ভয় দেখানোর চেষ্টা নেই। বরং একটা অদ্ভুত ক্লান্তি ছিল, যেন অনেক বছর ধরে একটা ভারী বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
তিনি বললেন, তুমি যা দেখেছো, সেটা শুধু কাগজের এক অংশ। পুরো সত্য এখনো তুমি জানো না।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, তাহলে আমাকে বলুন। আর কত লুকাবেন? তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। 
তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই গল্পটা তোমার জন্মের আগেই শুরু হয়েছে।
এই কথাটা শুনে আমার শরীর শিউরে উঠল।
আমার জন্মের আগে? তিনি মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ। 
তোমার বাবা, আমি, আর আরও কিছু মানুষ… আমরা সবাই একটা পরীক্ষার অংশ ছিলাম।
আমি থমকে গেলাম। পরীক্ষা?
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, একটা বিশেষ রাসায়নিক যৌগ নিয়ে কাজ হচ্ছিল। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিনা সেটা দেখা। মানে মানুষ চাইলে কিছু মনে রাখতে পারবে, আর চাইলে কিছু ভুলে যেতে পারবে।
আমি অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকালাম।
এটা কোনো সিনেমার গল্প না, এটা বাস্তব।
তিনি বললেন, প্রথমে এটা শুধু মেডিকেল রিসার্চ ছিল। কিন্তু পরে কিছু মানুষ এটাকে অন্যভাবে ব্যবহার করতে চায়।
আমি বললাম, কারা? তিনি এবার আমার দিকে সরাসরি তাকালেন। যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা সবসময় নিয়ন্ত্রণ চায়। এমনকি মানুষের স্মৃতিও।
এই কথাটা আমার মাথায় আঘাত করল।
আমি বললাম, আমার বাবা কীভাবে এতে জড়ালেন?
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তোমার বাবা একজন সাধারণ মানুষ ছিল না, বিন্তী। তিনি ছিলেন এই প্রজেক্টের একজন টেকনিক্যাল অংশীদার। 
কিন্তু যখন তিনি বুঝতে পারেন এটা ভুল পথে যাচ্ছে, তখন তিনি সরে আসতে চেয়েছিলেন। আমি চুপ হয়ে গেলাম।
তিনি আবার বললেন, কিন্তু কেউ সহজে সরে যেতে পারে না। কারণ একবার তুমি ভিতরে ঢুকে গেলে, তুমি আর শুধু একজন মানুষ থাকো না। তুমি হয়ে যাও একটা প্রমাণ।
আমি বললাম, আর তারপর? তার চোখ একটু ভারী হয়ে এলো। তারপরই তোমার বাবাকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করা হয়। যাতে কেউ সন্দেহ না করে। 
এটা ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা। আমার মাথা ঘুরে গেল।
আমি বললাম, আর আমি? তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, তুমি ছিলে সেফটি লেয়ার।
আমি বুঝতে পারলাম না। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, যদি তোমার বাবার কিছু হয়, তাহলে তোমার মাধ্যমেই কিছু তথ্য রক্ষা করা যাবে। তাই তোমাকে নজরে রাখা দরকার ছিল। 
কিন্তু সমস্যা হলো তুমি সবকিছু জানলে ভেঙে পড়তে পারতে।
তাই তোমার স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল।
আমি চিৎকার করে উঠলাম, আমি কোনো পরীক্ষার অংশ না! আমি একজন মানুষ!
তিনি কোনো রাগ দেখালেন না। শুধু বললেন, আমি জানি।
এই দুই শব্দে আমার ভেতরের রাগটা আরও বেড়ে গেল।
আমি বললাম, তাহলে আপনি কেন আমাকে বিয়ে করলেন? কেন আমাকে এই ঘরে আটকে রাখলেন?
তিনি এবার একটু নরম স্বরে বললেন, কারণ তোমাকে বাঁচাতে হলে তোমাকে আমার কাছে রাখতে হতো।
এই কথা শুনে আমি থমকে গেলাম।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, যারা এই প্রজেক্ট চালাচ্ছে, তারা জানে তুমি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওনি। 
তাই তারা আবার চেষ্টা করবে। আমি বললাম, কে তারা?
তিনি কিছু বললেন না।
শুধু ঘরের একটা কোণার দিকে তাকালেন।
আমি সেই দিকটা দেখলাম, কিন্তু কিছুই ছিল না।
হঠাৎ তিনি বললেন, আজ রাতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আমি বললাম, কেন?
তিনি বললেন, আজ যদি তুমি ওষুধ না খাও, তাহলে তোমার স্মৃতি পুরোপুরি ফিরে আসবে।
আমি বললাম, তাহলে তো সেটাই ভালো।
তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন, না।
তার কণ্ঠ এবার ভারী হয়ে গেল।
কারণ পুরো স্মৃতি ফিরে এলে তুমি শুধু সত্য জানবে না… তুমি সেই সত্যের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে।
আমি বললাম, আমি ভয় পাই না।
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে এবার প্রথমবারের মতো একটা স্পষ্ট অনুভূতি দেখা গেল—ভয় না, দুঃখ।
তিনি বললেন, তুমি এখনো জানো না তুমি কী হারাতে যাচ্ছ।
সেই রাত আবার এলো।
এইবার আমি প্রস্তুত ছিলাম। আমি বিছানায় শুয়ে থাকলাম না। আমি বসে রইলাম, আলো জ্বালিয়ে।
মিস্টার ইয়াসিন এলেন ঠিক আগের মতোই। হাতে সেই সাদা ওষুধ।
তিনি বললেন, শেষ সুযোগ।
আমি বললাম, না।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ।
তারপর ধীরে ধীরে ওষুধটা টেবিলে রাখলেন।
এবং বললেন, তাহলে শুরু হচ্ছে। আমি বললাম, কী শুরু?
তিনি কিছু বললেন না। তিনি শুধু দরজাটা খুলে দিলেন।
আর সেই মুহূর্তে পুরো বাড়িতে একটা অদ্ভুত কম্পন শুরু হলো। বাতাস বদলে গেল। আলো কাঁপতে লাগল।
আমি বুঝতে পারলাম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
হঠাৎ আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো।
আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম।
চারপাশে ছবি ভেসে উঠতে লাগল।
এইবার শুধু টুকরো নয়… পুরো দৃশ্য।
আমি একটা ল্যাবরেটরি দেখলাম।
অনেক মানুষ, কম্পিউটার, ওষুধ, পরীক্ষার টেবিল।
আর মাঝখানে আমি। না, বর্তমান আমি না।
ছোটবেলার আমি।
আমি সেখানে শুয়ে আছি, আর আমার পাশে মিস্টার ইয়াসিন দাঁড়িয়ে।
কিন্তু তিনি তখন এই বয়সের নন। তিনি তখন অন্যরকম।
আর আমার বাবা… তিনি সেখানে ছিলেন।
তিনি কাঁদছিলেন। তিনি চিৎকার করছিলেন, এটা বন্ধ করুন! আমি মাথা ধরে চিৎকার করে উঠলাম।
সবকিছু একসাথে ভেঙে পড়ছিল। হঠাৎ সব থেমে গেল।
আমি বিছানার পাশে পড়ে আছি।
মিস্টার ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ধীরে বললেন, এখন তুমি জানো।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, আমি কি… পরীক্ষার শিশু?
তিনি মাথা নেড়ে বললেন, না।
আমি থমকে গেলাম। তিনি বললেন, তুমি ছিলে সেই প্রজেক্টের প্রথম সফল ফলাফল। আমি অবাক হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, কিন্তু সফল মানেই ভালো না।
কারণ তুমি স্মৃতি মুছে ফেলতে পারো, কিন্তু অনুভূতি না।
আর সেই অনুভূতিই এখন তোমাকে শেষ করে দিতে পারে।
আমি বললাম, তাহলে এখন কী হবে?
তিনি দরজার দিকে তাকালেন। আর বললেন, তারা এসে গেছে। আমি বললাম, কারা?
তিনি বললেন, যারা এই সত্য চায় না।
সেই মুহূর্তে বাড়ির বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। একটার পর একটা। আমি ভয় পেয়ে গেলাম।
মিস্টার ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এখন তোমার সিদ্ধান্ত। আমার কাছে দুইটা পথ।
একটা হলো এই সত্য ভুলে যাওয়া, আবার আগের জীবন।
আর অন্যটা হলো… এই সত্য নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া।
আমি তার দিকে তাকালাম। আর প্রথমবার আমি বুঝলাম…
এই গল্প শুধু আমার না। এই গল্প অনেক মানুষের।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। আর বললাম, আমি আর পালাব না। এই কথার সাথে সাথেই দরজায় ধাক্কা পড়ল।
আর মিস্টার ইয়াসিন বললেন, তাহলে এখন থেকে তুমি একা নও।
কারণ সত্য একবার শুরু হলে, সেটা আর থামে না। “কারণ সত্য একবার শুরু হলে, সেটা আর থামে না।”
মিস্টার ইয়াসিনের এই কথাটা শেষ হতেই দরজায় আবার জোরে ধাক্কা পড়ল। এবার শুধু ধাক্কা না, ধাতব কিছু দিয়ে আঘাত করার শব্দও শোনা গেল। 
পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, বাইরের মানুষগুলো শুধু এসেছে না, তারা ভিতরে ঢোকার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।
আমার বুকের ভেতরটা ধপধপ করছিল। 
কিন্তু আশ্চর্যভাবে ভয় আর কৌতূহল একসাথে কাজ করছিল। এই প্রথম আমি আর পালাতে চাইছিলাম না। 
বরং জানতে চাইছিলাম, শেষ পর্যন্ত সত্যটা কতটা গভীর।
মিস্টার ইয়াসিন দ্রুত ঘরের ভেতর চারপাশে তাকালেন। 
তার চোখে এবার সেই আগের শান্ত ভাবটা নেই। সেখানে ছিল হিসাব, সিদ্ধান্ত আর চাপা উত্তেজনা।
তিনি বললেন, তারা সময় নষ্ট করবে না। আমাদের এখনই বের হতে হবে। আমি বললাম, কোথায় যাব?
তিনি কিছু না বলে ঘরের এক কোণে এগিয়ে গেলেন। 
সেখানে একটা বড় বুকশেলফ ছিল, যেটা এতদিন শুধু সাধারণ বইয়ের তাক মনে হয়েছিল। 
কিন্তু এবার তিনি শেলফটা একটু চাপ দিলেন।
একটা মৃদু শব্দ হলো।
তারপর পুরো শেলফটা ধীরে ধীরে এক পাশে সরে গেল।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
তার পেছনে একটা গোপন দরজা।
তিনি বললেন, এটা নিচে নিয়ে যাবে। এখানে থাকা এখন নিরাপদ না। আমি কিছু বললাম না। শুধু তার পেছনে হাঁটতে শুরু করলাম।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা ভয়ংকর শব্দ হলো। 
মনে হলো দরজা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
আমরা দ্রুত সেই গোপন দরজা দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। সিঁড়িটা খুব সরু আর অন্ধকার। 
শুধু দেয়ালের ছোট লাইটগুলো মিটমিট করে জ্বলছিল।
নিচে নামতে নামতে আমি অনুভব করছিলাম, আমার মাথার ভেতর আবার সেই পুরনো স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছে।
ল্যাবরেটরি… আমি… আমার বাবা… মিস্টার ইয়াসিন…
সবকিছু আবার একসাথে মিশে যাচ্ছিল।
নিচে নেমে এসে আমি থমকে গেলাম।
এটা একটা বড় আন্ডারগ্রাউন্ড রুম। 
অনেকগুলো মনিটর, সার্ভার, আর মেডিকেল যন্ত্রপাতি। পুরো জায়গাটা একটা গোপন কন্ট্রোল সেন্টারের মতো।
আমি বললাম, এটা কী?
মিস্টার ইয়াসিন বললেন, এটা সেই জায়গা, যেখানে সত্য লুকানো হয়নি… বরং নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
আমি তার দিকে তাকালাম। তিনি বললেন, তোমার স্মৃতির কিছু অংশ এখানে সংরক্ষিত আছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, আমার স্মৃতি?
তিনি মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ। কারণ তোমার মস্তিষ্ক ছিল প্রজেক্টের সবচেয়ে সফল প্রোটোটাইপ।
আমি চুপ হয়ে গেলাম। তিনি একটা মনিটর অন করলেন।
স্ক্রিনে একটা ভিডিও চালু হলো। আমি নিজেকে দেখলাম।
কিন্তু আমি ছোট নই… আমি একটু বড়। সম্ভবত ৮-১০ বছর বয়স। আমি একটা মেডিকেল চেয়ারে বসে আছি। 
চারপাশে বিজ্ঞানীরা।
আর আমার বাবা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
তার চোখে ভয়, কিন্তু কিছু করতে পারছেন না।
আমি ভিডিওটা দেখে কাঁপতে শুরু করলাম।
আমি বললাম, এটা সত্য না…
মিস্টার ইয়াসিন বললেন, সত্য সবসময় বিশ্বাসযোগ্য হয় না।
আমি ভিডিওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
একজন বিজ্ঞানী বলছে, সাবজেক্ট রেসপন্স ভালো। 
মেমোরি ডিলিট সফল। আমি চিৎকার করে বললাম, থামান এটা! ভিডিও থেমে গেল। আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম।
আমার মাথা ধরে ছিলাম। সবকিছু ভেঙে যাচ্ছিল আমার ভেতরে। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
আমি বললাম, আমি কি মানুষ না কিছু পরীক্ষার বস্তু?
মিস্টার ইয়াসিন আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
তিনি ধীরে বললেন, তুমি মানুষ।
কিন্তু তারা তোমাকে মানুষ হিসেবে দেখেনি।
এই কথাটা আমার বুকের ভেতর আঘাত করল।
হঠাৎ ওপর থেকে আবার শব্দ শোনা গেল।
কেউ নিচে নামছে। দ্রুত পায়ের শব্দ। মিস্টার ইয়াসিন বললেন, তারা এখানে পৌঁছে গেছে। আমি বললাম, এখন কী করব? তিনি আমার দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন, এখন তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তুমি যদি এখানেই থাকো, তারা তোমাকে আবার নিয়ে যাবে। আর যদি বের হও… তাহলে সত্য প্রকাশ করতে হবে।
আমি বললাম, আমি কেন?
তিনি বললেন, কারণ তুমি শুধু ভুক্তভোগী না… তুমি প্রমাণ।
এই কথাটা শুনে আমি থমকে গেলাম।
তিনি আমার হাতে একটা ছোট ডিভাইস দিলেন।
বললেন, এটা সব ডেটা সংরক্ষণ করে। তুমি যদি বাইরে যেতে পারো, এটা ব্যবহার করো।
আমি বললাম, আর আপনি?
তিনি একটু থেমে বললেন, আমি তাদের দৃষ্টি অন্যদিকে নিয়ে যাব। আমি বললাম, আপনি মারা যাবেন?
তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন, সত্য কখনো একা আসে না।
এরপর তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন। আমি চিৎকার করে বললাম, আপনি আমার সব কিছু জানেন, কিন্তু আমাকে একা রেখে যাবেন? তিনি পিছনে না তাকিয়েই বললেন, আমি তোমাকে একা রেখে যাচ্ছি না… আমি তোমাকে সত্য দিচ্ছি। এই কথার পর তিনি একটা দরজা খুলে অন্যদিকে চলে গেলেন। আর আমি একা থেকে গেলাম।
উপরে বিশৃঙ্খলার শব্দ বাড়ছে। আমি জানতাম সময় কম।
আমি দ্রুত একটা অন্য পথ খুঁজে পেলাম।
একটা ছোট সুরঙ্গের মতো রাস্তা। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। অন্ধকার, ঠান্ডা আর ভেজা দেয়াল।
মাথার ভেতর শুধু একটা চিন্তা।
আমি কে?
আমি কি শুধু একটা পরীক্ষার ফলাফল?
নাকি আমি সত্যিই বাঁচার অধিকার রাখি?
হঠাৎ সামনে আলো দেখা গেল।
আমি সেখান থেকে বের হয়ে এলাম। বাইরে রাত। বৃষ্টি পড়ছে। আমি একটা নির্জন জায়গায় এসে দাঁড়ালাম।
পেছনে সেই বিশাল বাড়ি।
যেখান থেকে আমি বের হলাম… কিন্তু জানি না আমি আসলেই মুক্ত নাকি এখন আরও বড় বিপদের মধ্যে পড়লাম। আমি হাতে সেই ডিভাইসটা শক্ত করে ধরলাম।
ভিতরে অনেক ডেটা। ভিডিও, রিপোর্ট, নাম, তারিখ।
সব সত্য। আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম… 
এটা শুধু আমার গল্প না। এটা এমন একটা সত্য, যা যদি প্রকাশ পায়… পুরো শহর কেঁপে উঠবে। আর ঠিক তখনই আমার ফোনটা বেজে উঠল। একটা অচেনা নম্বর।
আমি কাঁপা হাতে ফোন ধরলাম। ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ বলল
“তুমি পালাতে পারবে না বিন্তী। তুমি আমাদেরই অংশ।”
লাইনটা কেটে গেল। আমি জমে গেলাম। কারণ এখন আমি জানি… সত্য শুধু মুক্তি দেয় না।
সত্য নতুন শৃঙ্খলও তৈরি করে। রাতের বৃষ্টি তখনও থামেনি। আমি নির্জন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি, হাতে সেই ডিভাইসটা শক্ত করে ধরা। 
ভেজা শরীর, কাঁপা হাত, আর মাথার ভেতর অগোছালো চিন্তা। কিছুক্ষণ আগেই যে নম্বর থেকে কল এসেছিল, সেটা এখন আর ট্রেস করা যাচ্ছে না। 
ফোনের স্ক্রিনে শুধু “No Caller ID” লেখা জ্বলজ্বল করছে।
“তুমি পালাতে পারবে না বিন্তী। তুমি আমাদেরই অংশ।”
এই একটা বাক্য বারবার মাথায় বাজছে। 
কে বলল এটা? মিস্টার ইয়াসিন না অন্য কেউ? নাকি পুরো ব্যাপারটাই একের বেশি মানুষের নিয়ন্ত্রণে?
আমি চারপাশে তাকালাম। রাস্তা ফাঁকা। দূরে শুধু একটা পুরোনো বাসস্টপ আর কিছু ঝাপসা আলো। 
মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো শহরের ভেতরে না, বরং শহরের বাইরে কোথাও হারিয়ে গেছি।
আমি হাঁটা শুরু করলাম। কোথায় যাচ্ছি জানি না, 
কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাও এখন নিরাপদ না।
ডিভাইসটা বারবার চেক করছিলাম। এতে অনেক ফাইল আছে—ভিডিও, অডিও, রিপোর্ট, কিছু এনক্রিপ্টেড ডেটা। 
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কিছু ফাইল এখনও লক করা। আমি একটা ফাইল ওপেন করার চেষ্টা করলাম। 
স্ক্রিনে লেখা উঠল “ACCESS LEVEL REQUIRED: LEVEL 3 KEY” আমি থেমে গেলাম।
এই ডিভাইসটা যদি মিস্টার ইয়াসিন আমাকে দিয়ে থাকে, তাহলে তিনি জানেন আমি সব দেখতে পারব না এখনই। 
তাহলে কেন দিলেন? আমাকে কি ইচ্ছাকৃতভাবে এই পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? হঠাৎ পেছনে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল। আমি দ্রুত একটা গলির ভেতর ঢুকে গেলাম।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। গাড়িটা থামল। দরজা খোলার শব্দ। আমি দেয়ালের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে আছি, নিঃশ্বাস আটকে। দুইজন মানুষের পায়ের শব্দ।
একজন বলল, “সে এখানেই আছে। ট্র্যাকিং সিগন্যাল ক্লিয়ার।” অন্যজন বলল, “লাইভ ধরতে হবে। কোনো ভুল করা যাবে না।” আমি বুঝে গেলাম—তারা আমাকে খুঁজে পেয়েছে। আমি ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে যেতে লাগলাম। গলিটা আরও অন্ধকার, সরু। 
বৃষ্টি পানি জমে গেছে। পায়ের নিচে ছপছপ শব্দ হচ্ছে।
হঠাৎ একটা হাত আমার কাঁধে এসে পড়ল। আমি ঘুরে চিৎকার করতে যাব, কিন্তু তখনই একটা কণ্ঠ ফিসফিস করে বলল  “চুপ… আমি তোমার শত্রু না।”
আমি তাকালাম। একজন মাঝবয়সী মহিলা। ভেজা চুল, পুরনো কোট, চোখে ভয় আর তাড়াহুড়া।
তিনি বললেন, “তুমি বিন্তী, তাই না?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “আপনি আমাকে চেনেন?”
তিনি বললেন, “চিনতাম বললেই ভালো হয়। তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমি অনেকদিন অপেক্ষা করছি।”
আমি বুঝতে পারছিলাম না—এটা আরেকটা ফাঁদ কিনা।
তিনি বললেন, “ওরা কাছাকাছি চলে এসেছে। 
তুমি এখানে থাকলে ধরা পড়বে। আমার সাথে আসো।”
আমার কাছে আর কোনো অপশন ছিল না।
আমি তার পেছনে হাঁটতে শুরু করলাম।
আমরা একটা পুরোনো ভবনের ভেতরে ঢুকলাম। বাইরে থেকে ভাঙাচোরা, কিন্তু ভেতরে ঢুকে আমি অবাক হলাম—এটা একটা ছোট আন্ডারগ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুম।
মনিটর, সার্ভার, ক্যামেরা ফিড সব চলছে।
আমি বললাম, “এটা কী জায়গা?”
তিনি বললেন, “এটা সেই নেটওয়ার্কের বাইরের একটা অংশ। আমি এখানে কাজ করতাম… একসময়।”
আমি বললাম, “আপনি কে?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, “আমি ছিলাম এই প্রজেক্টের একজন ডাটা অ্যানালিস্ট। 
মিস্টার ইয়াসিনের সাথে একসময় কাজ করেছি।”
এই নামটা শুনতেই আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি পিছিয়ে গেলাম। তিনি বললেন, “ভয় পেও না। আমি এখন আর তাদের সাথে নেই।” আমি বললাম, “তাহলে আপনি আমাকে কেন সাহায্য করছেন?”
তিনি একটা ফাইল খুললেন। স্ক্রিনে আমার ছবি।
আর লেখা-লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল। 
“SUBJECT V-07: STABLE MEMORY RECOVERY PHASE”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
তিনি বললেন, “তুমি শুধু পরীক্ষার অংশ না, বিন্তী। তুমি ছিলে প্রথম সফল ‘রিভার্স মেমোরি কেস’।”
আমি বললাম, “মানে কী?”
তিনি বললেন, “সাধারণভাবে তারা স্মৃতি মুছে দেয়। 
কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে উল্টো হয়েছে। তারা চেয়েছিল, তুমি ভুলে যাবে… কিন্তু তুমি আস্তে আস্তে সব মনে করতে শুরু করেছো।” আমার মাথা ঘুরে গেল।
আমি বললাম, “তাহলে মিস্টার ইয়াসিন আমাকে বাঁচাচ্ছেন না?” তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, “আমি নিশ্চিত না তিনি এখন কোন পক্ষে।”
এই কথাটা আমার ভেতর কাঁপন ধরাল। তিনি বললেন, “তুমি যদি পুরো ডেটা আনলক করতে পারো, তাহলে সব সত্য পাবে। কিন্তু সমস্যা হলো… Level 3 key শুধু একজনের কাছে থাকে।” আমি বললাম, “কার কাছে?”
তিনি মনিটরের দিকে তাকালেন। স্ক্রিনে একটা লাইভ সিগন্যাল। আর সেখানে… মিস্টার ইয়াসিন।
তিনি কোনো অফিসে বসে আছেন। সামনে অনেক মনিটর। 
তিনি যেন আমাদেরই দেখছেন। আমি জমে গেলাম।
তিনি বললেন, “ওই দেখো… তিনি সব সময় তোমাকে ট্র্যাক করছিলেন।” হঠাৎ মনিটরের দিকে তাকিয়ে মিস্টার ইয়াসিন সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকালেন। যেন তিনি জানতেন আমি এখানে আছি। তার ঠোঁটে কোনো হাসি নেই।
শুধু একটা ঠান্ডা দৃষ্টি। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “তুমি এখন সত্যের কাছাকাছি চলে গেছো।” আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি, আর মনে হচ্ছে তিনি আমার ভেতরটা পড়তে পারছেন। হঠাৎ মনিটর অফ হয়ে গেল।
সব অন্ধকার। মহিলা বললেন, “তিনি আমাদের লোকেশন বুঝে গেছে। এখনই বের হতে হবে।”
আমি বললাম, “আমি কোথায় যাব?”
তিনি বললেন, “একটাই জায়গা আছে… যেখানে তুমি পুরো ডেটা আনলক করতে পারবে।” আমি বললাম, “কোথায়?”
তিনি বললেন, “প্রথম ল্যাব।” এই নামটা শুনেই আমার মাথায় একটা ঝলকানি লাগল।
ল্যাবরেটরি। যেখানে আমার স্মৃতি প্রথম বদলানো হয়েছিল।
আমি বললাম, “ওটা তো ধ্বংস হয়ে গেছে।”
তিনি বললেন, “না। তারা ধ্বংস দেখিয়েছে। আসলটা এখনো নিচে আছে।” বাইরে গাড়ির শব্দ আবার শোনা গেল।
তিনি বললেন, “সময় নেই।” আমরা দ্রুত বের হলাম।
বৃষ্টি আরও বেড়েছে। রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছি। পেছনে আলো দেখা যাচ্ছে। তারা আসছে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে বুঝতে পারলাম—এটা শুধু পালানো না।
এটা একটা শুরু। যেখানে আমি শুধু নিজেকে নয়, পুরো সত্যকে খুঁজে বের করছি। আর সেই সত্যের কেন্দ্রে আছে মিস্টার ইয়াসিন। কিন্তু তিনি কি শত্রু?
না কি আমার একমাত্র সত্য জানার চাবি? দূরে একটা পুরোনো ভবন দেখা গেল। মহিলা বললেন, “ওটাই প্রথম ল্যাব।” আমি থেমে গেলাম। ভেতরে অন্ধকার।
কিন্তু আমি জানি, এবার আর পিছনে ফেরার রাস্তা নেই।
আমি ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোলাম। 
আর মনে মনে বললাম  যাই হোক, এবার আমি সব জানব।
শেষ সত্যটা এখন আমার সামনে। “যাই হোক, এবার আমি সব জানব। শেষ সত্যটা এখন আমার সামনে।” এই কথাটা মাথায় ঘুরতে ঘুরতে আমি সেই পুরোনো ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাইরে থেকে এটা একটা পরিত্যক্ত গুদামঘর মনে হচ্ছে, দেয়াল ভাঙা, রং উঠে গেছে, চারপাশে আগাছা আর ভেজা মাটি। 
কিন্তু ভেতর থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসই বলে দিচ্ছিল এটা সাধারণ কোনো জায়গা না।
মহিলা আমাকে ইশারা করলেন, নাম তার এখনো আমি পুরোপুরি জানি না, শুধু তিনি বললেন, “ভেতরে গেলে আর পিছনে ফেরা সহজ হবে না।”
আমি কিছু বললাম না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।
হাত রাখতেই দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকতেই একটা তীব্র গন্ধ নাকে এলো। পুরনো ধাতু, রাসায়নিক আর ভেজা কংক্রিটের মিশ্রণ। 
আলো খুব কম, শুধু কিছু জরুরি লাইট জ্বলছে।
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম।
এটা একটা বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাব।
চারদিকে কাঁচের চেম্বার, পুরনো কম্পিউটার, কিছু ভাঙা মেশিন। সবকিছু যেন অনেক বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে, কিন্তু হঠাৎ আবার চালু করা হয়েছে।
মহিলা বললেন, “এটাই প্রথম ইউনিট। এখানেই সব শুরু হয়েছিল।” আমি বললাম, “আমার সাথে?”
তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “না শুধু তোমার সাথে না। 
তোমার মতো আরও কয়েকজনের সাথে।”
এই কথাটা আমার বুকের ভেতর চাপ সৃষ্টি করল।
আমি ধীরে ধীরে একটা কাঁচের চেম্বারের সামনে গেলাম।
ভেতরে পুরনো কিছু ফাইল, একটা মেডিকেল বেড, আর দেয়ালে লেখা কিছু কোড নাম।
V-01, V-03, V-07…
V-07 আমার দিকে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে।
আমি বললাম, “এই V-07 মানে আমি?”
মহিলা বললেন, “হ্যাঁ। তুমি ছিলে শেষ সফল প্রজেক্ট।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
হঠাৎ পেছনে একটা দরজা খুলে গেল।
আমি ঘুরে তাকালাম।
মিস্টার ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছেন। ভেজা চুল, শান্ত মুখ, কিন্তু চোখে এবার সেই আগের মতো ঠান্ডা স্থিরতা নেই।
তিনি ধীরে ধীরে ভিতরে এলেন। মহিলা সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে গেলেন। আমি বললাম, “আপনি এখানে?”
তিনি বললেন, “আমি সবসময়ই এখানে ছিলাম।”
এই কথাটা আমাকে আরও বিভ্রান্ত করল।
আমি বললাম, “আপনি মিথ্যা বলেছিলেন?”
তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন, “না। আমি সত্যের কিছু অংশ লুকিয়েছিলাম।” আমি চিৎকার করে বললাম, “কেন? কেন আমার জীবন নিয়ে খেলছেন?” তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “কারণ তুমি যদি প্রথম দিনেই সব জানতে, তুমি বাঁচতে পারতে না।”
আমি বললাম, “আমি এখনো বাঁচতে চাই না জেনে বাঁচার মতো জীবন।” তিনি আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে এবার একটা অদ্ভুত আবেগ দেখা গেল।
তিনি বললেন, “তুমি শুধু একজন সাবজেক্ট না বিন্তী। তুমি আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা… আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”
এই কথাটা শুনে আমি থমকে গেলাম। তিনি ধীরে ধীরে একটা মনিটর চালু করলেন। স্ক্রিনে একটা ভিডিও।
আমি আবার নিজেকে দেখলাম।
কিন্তু এবার ছোটবেলা না… আমি একটু বড়।
আর আমি একটা ঘরের মধ্যে বসে আছি, চারদিকে মেশিন।
একজন ডাক্তার বলছে, “মেমোরি সাপ্রেশন রেডি।”
আমি চিৎকার করে বললাম, “বন্ধ করুন!”
কিন্তু ভিডিও চলতে থাকল।
হঠাৎ আমার বাবা স্ক্রিনে এলেন।
তিনি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, কাঁদছেন।
আমি থমকে গেলাম। মিস্টার ইয়াসিন বললেন, “তোমার বাবা তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভুল পথে গিয়ে ফেলেছিলেন।” আমি বললাম, “কী মানে?”
তিনি বললেন, “তুমি শুধু পরীক্ষার অংশ ছিলে না। তুমি ছিলে তোমার বাবার শেষ আশা।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
তিনি বললেন, “তোমার বাবাকে বলা হয়েছিল, যদি তুমি এই প্রজেক্টে অংশ না নাও, তাহলে তোমাকে এবং তোমার পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হবে।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম। সবকিছু একসাথে ভেঙে পড়ছিল।
আমি বললাম, “তাহলে আপনি কী?”
তিনি একটু থেমে বললেন, “আমি ছিলাম এই প্রজেক্টের ফেসিলিটেটর। কিন্তু পরে বুঝেছি, আমরা যা করছি সেটা মানুষ তৈরি করছে না… মানুষ ভাঙছে।”
এই কথাটা আমার ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি করল।
হঠাৎ এলার্ম বেজে উঠল।
লাল আলো জ্বলতে শুরু করল।
মহিলা চিৎকার করে বললেন, “তারা ঢুকে গেছে!”
আমি বললাম, “কারা?” মিস্টার ইয়াসিন বললেন, “যারা এই প্রজেক্ট চালায়, তারা কখনো হার মানে না।”
হঠাৎ চারদিকে গুলির শব্দ।
কাঁচ ভেঙে পড়ছে। আমি ভয় পেয়ে পেছনে সরে গেলাম।
মিস্টার ইয়াসিন আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন।
তিনি বললেন, “তুমি এখন এখান থেকে বের হবে।”
আমি বললাম, “আপনি?”
তিনি বললেন, “আমি তাদের থামাব।” আমি বললাম, “না, আমি যাব না।” তিনি আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে এবার প্রথমবারের মতো কোমলতা।
তিনি বললেন, “তুমি যদি এখানে থাকো, তাহলে সত্য কখনো বাইরে যাবে না।”
হঠাৎ দরজা ভেঙে কয়েকজন মানুষ ঢুকে পড়ল।
কালো পোশাক, মুখ ঢাকা।
তাদের একজন বলল, “Subject V-07 locate confirmed.” আমি জমে গেলাম। তারা আমার দিকে এগোতে লাগল। মিস্টার ইয়াসিন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “এখানেই থামো।” একটা গুলি ছুটল।
আমি চিৎকার করে উঠলাম। মহিলা আমাকে টেনে নিয়ে একটা পেছনের করিডোরে ঢুকালেন। দৌড়াচ্ছি।
পেছনে গুলির শব্দ। সবকিছু বিশৃঙ্খলা।
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, “তিনি মারা যাবেন?”
মহিলা বললেন, “তিনি জানতেন এই দিন আসবে।”
আমরা একটা লিফটের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
তিনি বললেন, “এই লিফট তোমাকে উপরে নিয়ে যাবে। বাইরে যা ঘটছে, সেটা এখন তোমার নিয়ন্ত্রণে না।”
আমি বললাম, “আর মিস্টার ইয়াসিন?”
তিনি কিছু বললেন না। লিফট বন্ধ হয়ে গেল। আমি উপরে উঠছি। নীচে অন্ধকার, আগুন, গুলির শব্দ।
আর আমি বুঝতে পারছি না আমি কী হারিয়ে ফেলছি।
লিফট ওপেন হলো। আমি বাইরে এলাম। বৃষ্টি থেমে গেছে। রাতের আকাশ নিঃশব্দ। আমি একা দাঁড়িয়ে আছি।
ডিভাইসটা হাতে। ভেতরে সব সত্য আছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন একটাই। আমি কি এটা প্রকাশ করব?
না কি এর জন্য আবারও আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে?
হঠাৎ ডিভাইসে একটা নতুন ফাইল আনলক হলো।
নামস “FINAL TRUTH: ORIGIN”
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। আর বুঝলাম… এটা এখনো শেষ না। এটা শুধু মাঝপথ। শেষ সত্য এখনো বাকি।
রাতের বাতাসটা এখন আর আগের মতো ভারী লাগছে না, বরং কেমন যেন শূন্য। আমি একা দাঁড়িয়ে আছি একটা খোলা জায়গায়, সামনে সেই পুরোনো ল্যাব বিল্ডিং, পেছনে অন্ধকার রাস্তা। বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু চারপাশে পানির গন্ধ আর ভেজা মাটির স্পর্শ যেন এখনও বলে দিচ্ছে কিছু একটা বড় ঘটনা ঘটে গেছে, যেটার শেষ আমি এখনও দেখিনি।
আমার হাতে সেই ডিভাইস। স্ক্রিনে এখনো একটা ফাইল ঝলমল করছে।
“FINAL TRUTH: ORIGIN”
এই নামটা দেখেই আমার বুক কেঁপে উঠল। কারণ এতদিন যা দেখেছি, যা শুনেছি, যা অনুভব করেছি—সবকিছু যেন এই এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আমি কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে থাকলাম।
আঙুল কাঁপছে।
খুলব কি খুলব না—এই প্রশ্ন আর কাজ করছে না। কারণ আমি এখন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে না জানাও আর কোনো অপশন না।
আমি ধীরে ধীরে ফাইলটা ওপেন করলাম।
স্ক্রিনটা প্রথমে কালো হয়ে গেল।
তারপর একটা ভিডিও শুরু হলো।
একটা ঘর। অনেক বড়। চারদিকে স্ক্রিন, ক্যামেরা, মেডিকেল যন্ত্রপাতি। মাঝখানে একটা কাঁচের চেম্বার।
আর সেখানে… ছোট একটা বাচ্চা।
আমি।
আমার চোখ আটকে গেল।
আমি নিজের ছোটবেলার সেই চেহারাটা দেখছি, কিন্তু এবার আগের মতো অস্পষ্ট না—একেবারে পরিষ্কার।
ভিডিওতে একজন বিজ্ঞানী বলছে, “Subject is stable. Memory imprint successful.”
আমি পিছিয়ে গেলাম।
এটা শুধু দেখা না… এটা অনুভব করা যাচ্ছে।
ভিডিওতে আমার মাথায় কিছু সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। আমি কাঁদছি, কিন্তু আমার মুখে কোনো শব্দ নেই।
হঠাৎ পর্দায় আরেকজন মানুষ এল।
মিস্টার ইয়াসিন।
কিন্তু এবার তিনি আগের মতো না।
তরুণ, ক্লান্ত, কিন্তু চোখে ভয় না—রাগ।
তিনি বললেন, “এটা বন্ধ করতে হবে।”
একজন বিজ্ঞানী বলল, “না, এখনই না। আমরা প্রায় শেষ পর্যায়ে আছি।”
মিস্টার ইয়াসিন বললেন, “তোমরা মানুষ তৈরি করছ না… তোমরা মানুষ ভাঙছ।”
ভিডিও থেমে গেল।
স্ক্রিন আবার কালো।
আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম।
আমার মাথা ঘুরছে।
আমি আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করছি… আমি শুধু পরীক্ষার অংশ না।
আমি সেই পরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।
হঠাৎ ডিভাইসে আরেকটা ফাইল নিজে থেকেই খুলে গেল।
“CONFIDENTIAL AUDIO LOG – YASIN”
আমি প্লে করলাম।
তার কণ্ঠ।
কিন্তু এবার লাইভ না… রেকর্ডেড।
তিনি বলছেন, “যদি কেউ এটা শুনে, তাহলে বুঝবে সত্যটা কতটা ভয়ংকর।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনতে লাগলাম।
তিনি বলছেন, “এই প্রজেক্ট শুরু হয়েছিল মানুষের স্মৃতি রক্ষা করার জন্য। কিন্তু পরে এটা হয়ে গেল স্মৃতি নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
তিনি বললেন, “বিন্তী ছিল প্রথম সফল কেস। কিন্তু সমস্যা হলো… সে শুধু স্মৃতি হারায়নি, সে নিজেকে প্রশ্ন করতে শিখেছে।”
আমি থমকে গেলাম।
তিনি বললেন, “এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ।”
হঠাৎ পেছনে একটা শব্দ।
আমি ঘুরে তাকালাম।
কেউ নেই।
কিন্তু অনুভব করলাম আমি একা না।
আবার অডিও চলতে লাগল।
তিনি বললেন, “যদি তুমি এটা শুনো বিন্তী, তাহলে জানো—তুমি শুধু শিকার না।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
তারপর তিনি বললেন, “তুমি হচ্ছো সেই একমাত্র মানুষ, যার ভেতরে পুরো সিস্টেমের কোড আছে।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
কোড?
তিনি বললেন, “তোমার মস্তিষ্কে এমন ডেটা ইনবিল্ট করা হয়েছে, যা পুরো প্রজেক্ট ধ্বংস করতে পারে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
আমার হাত কাঁপতে শুরু করল।
আমি কি মানুষ?
না কি একটা চাবি?
হঠাৎ একটা মেসেজ এল।
Unknown Number:
“তুমি এখনো বাইরে আছো। ভুল করছো না তো?”
আমি দ্রুত চারপাশে তাকালাম।
কে?
ডিভাইসে আবার মেসেজ:
“তুমি যদি ফাইলটা পুরো ওপেন করো, তাহলে তুমি আর বিন্তী থাকবে না।”
আমি থমকে গেলাম।
এই সময় পিছন থেকে পায়ের শব্দ।
আমি ঘুরে তাকালাম।
মহিলা।
তিনি হাঁপাচ্ছেন।
বললেন, “তোমাকে এখনই যেতে হবে।”
আমি বললাম, “এই সব কী হচ্ছে?”
তিনি বললেন, “তারা আবার আসছে। আর এবার শুধু তোমাকে নিতে না… মুছে ফেলতে।”
আমি বললাম, “মুছে ফেলতে মানে?”
তিনি বললেন, “তোমাকে পুরো সিস্টেম থেকে ডিলিট করবে।”
এই কথাটা আমার মাথায় আঘাত করল।
আমি বললাম, “মিস্টার ইয়াসিন?”
তিনি চুপ।
তার চোখ নিচে।
আমি বুঝে গেলাম।
আমি বললাম, “তিনি…?”
তিনি কিছু বললেন না।
এই নীরবতাই উত্তর।
আমি চিৎকার করে বললাম, “না! তিনি আমাকে বাঁচানোর জন্য ছিল!”
মহিলা বললেন, “তিনি তোমাকে তৈরি করেছেন।”
এই কথাটা থেমে গেল আমার পৃথিবী।
আমি বললাম, “না… না… এটা সত্য না।”
তিনি বললেন, “তুমি যদি পুরো ফাইলটা দেখো, সব বুঝবে।”
আমি আবার ডিভাইসের দিকে তাকালাম।
ফাইলের নিচে একটা লক।
“FINAL KEY REQUIRED”
হঠাৎ স্ক্রিনে আরেকটা নাম ভেসে উঠল।
“ACCESS KEY: YASIN”
আমি জমে গেলাম।
মহিলা বললেন, “ওই কারণেই তুমি তার কাছে ছিলে। সে ছাড়া এই ফাইল খুলবে না।”
আমি দাঁড়িয়ে আছি।
বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে।
হালকা না—এবার ভারী।
আমি বুঝতে পারছি না আমি কাকে বিশ্বাস করব।
মিস্টার ইয়াসিন কি আমাকে বাঁচাচ্ছেন?
না কি আমাকে ব্যবহার করছেন?
হঠাৎ দূরে গাড়ির আলো।
অনেকগুলো।
মহিলা বললেন, “সময় নেই।”
আমি ডিভাইসটা শক্ত করে ধরলাম।
আমার সামনে এখন একটাই রাস্তা।
পালানো না।
লুকানো না।
বরং সত্যের শেষ দরজা খোলা।
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“যদি আমি সত্যের অংশ হই… তাহলে আমি সত্যই শেষ করব।”
আর সেই মুহূর্তে আমি প্রথমবার বুঝলাম…
এই গল্প আর শুধু বেঁচে থাকার না।
এটা নিজের অস্তিত্ব ফেরত পাওয়ার যুদ্ধ।
বৃষ্টি তখনও পড়ছে। আকাশে কোনো চাঁদ নেই, শুধু কালো মেঘ আর দূরের গাড়ির হেডলাইটের ঝাপসা আলো। আমি দাঁড়িয়ে আছি একটা ভাঙা রাস্তার পাশে, হাতে সেই ডিভাইস, আর মাথার ভেতর ঘুরছে একটাই নাম—মিস্টার ইয়াসিন।
“ACCESS KEY: YASIN”
এই নামটা যেন এখন শুধু একজন মানুষ না, বরং একটা দরজা, একটা লক, একটা শেষ সত্যের চাবি।
মহিলা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিঃশ্বাস ভারী। বারবার চারপাশ দেখছে। যেন জানে, আমরা আর নিরাপদ না।
তিনি বললেন, “তারা খুব কাছাকাছি।”
আমি বললাম, “আমি পালাব না।”
তিনি আমার দিকে তাকালেন, “তুমি এখন পালালেও আর লাভ নেই। তুমি এখন সিস্টেমের ভিতরে।”
এই কথাটা আমার মাথায় ধাক্কা দিল।
সিস্টেমের ভিতরে মানে কী?
আমি ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। ফাইলটা এখনো খোলা।
“FINAL TRUTH: ORIGIN”
আর নিচে লক করা অংশটা জ্বলজ্বল করছে।
হঠাৎ পেছন থেকে গাড়ির শব্দ।
এইবার শুধু এক বা দুইটা না—অনেকগুলো।
মহিলা আমার হাত ধরে বললেন, “এখনই।”
আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম।
ভেজা রাস্তা, পিচ্ছিল মাটি, অন্ধকার গলি—সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল বাস্তব না, যেন কোনো শেষ না হওয়া দুঃস্বপ্ন।
পেছনে আলো আরও কাছে আসছে।
কেউ চিৎকার করছে।
“SUBJECT LOCATED!”
আমি দৌড়াতে দৌড়াতে ভাবছি—আমি কি সত্যিই একটা সাবজেক্ট?
নাকি আমি শুধু বিন্তী?
হঠাৎ সামনে একটা পুরোনো বিল্ডিং।
মহিলা বললেন, “এখানে ঢুকো।”
আমরা ভেতরে ঢুকলাম।
পুরোনো সিঁড়ি, ভাঙা দেয়াল, আর অন্ধকার।
দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা।
শুধু আমাদের নিঃশ্বাস।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আমি আর কিছুই বুঝতে পারছি না।”
মহিলা বললেন, “তুমি বুঝবে এখনই।”
তিনি আমার দিকে একটা ছোট ডিভাইস দিলেন।
বললেন, “এটা লোকাল সার্ভার। এখানে তুমি ফাইনাল অ্যাক্সেস দিতে পারবে।”
আমি বললাম, “কীভাবে?”
তিনি বললেন, “তুমি জানো।”
আমি থমকে গেলাম।
হ্যাঁ… আমি জানি।
কারণ আমার শরীরের ভেতরেই আছে সেই কোড।
আমি ডিভাইসটা নিজের কপালে স্পর্শ করলাম।
স্ক্রিনে আবার লেখা উঠল—
“AUTHENTICATING USER…”
হঠাৎ আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা।
চোখের সামনে সব ঝাপসা।
আর তখনই—
আমি সবকিছু দেখতে পেলাম।
আসল সত্য।
আমি কোনো সাধারণ শিশু ছিলাম না।
আমি ছিলাম প্রথম সফল মানব মেমোরি সিস্টেম।
একটা প্রজেক্ট, যেটা মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণ না করে… মানুষের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি হয়েছিল।
আর মিস্টার ইয়াসিন ছিল সেই টিমের প্রধান বিজ্ঞানী।
কিন্তু পরে তিনি বুঝেছিলেন—
এই প্রজেক্ট মানবতার জন্য না।
আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম।
চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, কিন্তু আমি কাঁদছি না—আমি ভেঙে যাচ্ছি।
মহিলা বললেন, “তুমি ঠিক আছো?”
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আমি ছিলাম না… আমি বানানো হয়েছিলাম।”
হঠাৎ বাইরে গুলির শব্দ।
দরজায় ধাক্কা।
তারা ভেতরে ঢুকছে।
মহিলা চিৎকার করে বললেন, “এখনই কোড দাও!”
আমি ডিভাইসটা স্ক্যান করলাম।
স্ক্রিনে শেষ প্রশ্ন—
“DO YOU WANT TO REWRITE THE SYSTEM?”
না কি—
“DELETE ALL MEMORY INCLUDING USER?”
আমি থমকে গেলাম।
এই সিদ্ধান্ত শুধু আমাকে না… পুরো প্রজেক্ট, পুরো সত্য, সবকিছু শেষ করবে।
বাইরে দরজা ভেঙে পড়ল।
পায়ের শব্দ।
কেউ আসছে।
মিস্টার ইয়াসিনের কণ্ঠ শোনা গেল—
“বিন্তী…”
আমি চমকে উঠলাম।
তিনি ভেতরে ঢুকলেন।
ভেজা, ক্লান্ত, কিন্তু জীবিত।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি এখনই সিদ্ধান্ত নেবে।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আপনি আমাকে তৈরি করেছেন?”
তিনি মাথা নিচু করলেন।
“হ্যাঁ।”
এই এক শব্দে আমার ভেতর কিছু শেষ হয়ে গেল।
তিনি বললেন, “কিন্তু আমি তোমাকে ব্যবহার করার জন্য বানাইনি… আমি তোমাকে শেষ করার জন্য বানানো সিস্টেম বন্ধ করতে চেয়েছিলাম।”
আমি বললাম, “তাহলে আপনি কেন আমাকে সব বললেন না?”
তিনি বললেন, “কারণ সত্য যদি আগেই দিতাম, তুমি বাঁচতে পারতে না।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
চারপাশে গোলাগুলি।
সময় নেই।
মহিলা চিৎকার করল, “নাও সিদ্ধান্ত!”
আমি ডিভাইসের দিকে তাকালাম।
শেষ অপশন—
“REWRITE SYSTEM”
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“আমি কোনো অস্ত্র না।”
সবাই চুপ।
আমি আবার বললাম,
“আমি কোনো প্রজেক্ট না।”
মিস্টার ইয়াসিন আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে পানি।
আমি শেষবার বললাম,
“আমি বিন্তী।”
আর আমি “REWRITE” চাপলাম।
এক মুহূর্তে পুরো সিস্টেম ঝলসে উঠল।
মনিটর, ডেটা, সার্ভার—সব কিছু ভেঙে পড়তে লাগল।
আলো ফেটে গেল।
সব শব্দ থেমে গেল।
অন্ধকার।
.
.
.
আমি ধীরে ধীরে চোখ খুললাম।
একটা হাসপাতালের ঘর।
সাদা দেয়াল।
নীরবতা।
আমি উঠে বসলাম।
একজন নার্স বলল, “আপনি জেগে উঠেছেন?”
আমি ধীরে বললাম, “আমি কোথায়?”
তিনি বললেন, “আপনি একটা দুর্ঘটনার পর এখানে আছেন।”
আমি জানালার দিকে তাকালাম।
বাইরে সূর্য উঠছে।
শান্ত আকাশ।
কিন্তু আমার মাথায় একটা প্রশ্ন—
সবকিছু কি সত্য ছিল?
নাকি সবই একটা ভাঙা স্মৃতি?
হঠাৎ পাশে টেবিলে একটা ছোট কাগজ।
লিখা—
“তুমি সত্যটা মুছে দিয়েছো। কিন্তু সত্য কি তোমাকে ছেড়ে গেছে?”
আমি কাগজটা ধরে চুপ করে রইলাম।
দূরে কোথাও যেন একটা কণ্ঠ ফিসফিস করে বলছে—
“বিন্তী…”
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
আর জানলাম—
গল্প শেষ হয়নি।
শুধু আমি আর আগের মানুষটা নেই।
সমাপ্ত। 

....
👁 571