একজন সিইও একজন কাজের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন, যার তিনটি সন্তান ছিল ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের… কিন্তু যখন সে তাদের বিয়ের রাতে পোশাক খুলল, তখন পুরুষটি যা দেখল তাতে সে হতবাক হয়ে গেল!
ঢাকার এক অভিজাত ও বিশাল বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে কাজ করত সুহাসিনী। বয়স পঁচিশ বছর।
শান্ত, বিনয়ী এবং অত্যন্ত পরিশ্রমী একটি মেয়ে সে।
ওই বাড়ির মালিক ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও বহুজাতিক কোম্পানির সিইও মিস্টার ইয়াসিন।
তিনি কঠোর হলেও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন এবং কর্মচারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন।
বাড়ির ভেতরে সুহাসিনীকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকেই বলত, সে নাকি গ্রামের জীবনে তিন ভিন্ন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তিনটি সন্তান জন্ম দিয়েছে। এই গুজবের কারণে প্রায় সবাই তাকে সন্দেহের চোখে দেখত। কেউ কেউ আড়ালে কটাক্ষ করত, আবার কেউ কেউ সরাসরি অপমানও করত।
কিন্তু সুহাসিনী সবকিছু নীরবে সহ্য করত।
সে প্রতিমাসে তার প্রায় পুরো বেতন বাড়িতে পাঠিয়ে দিত।
কেউ জিজ্ঞেস করলে সে শুধু বলত “হামিম, রাফি আর লায়নার জন্য।” এই তিনটি নামই চারপাশের মানুষের কাছে রহস্য হয়ে উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে মিস্টার ইয়াসিন ধীরে ধীরে সুহাসিনীর প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেন।
কারণ তিনি লক্ষ্য করেন সে শুধু কাজের মেয়ে নয়, বরং অত্যন্ত দায়িত্বশীল, সৎ এবং নিঃস্বার্থ একজন মানুষ।
একদিন ইয়াসিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
তখন সুহাসিনী দিনরাত তার পাশে থেকে সেবা করে খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া, দেখাশোনা করা সবকিছু সে নিজের হাতে করে।
তার এই নিঃস্বার্থ সেবা দেখে ইয়াসিনের মন বদলে যায়।
তিনি বুঝতে পারেন, মানুষের সম্পর্কে গুজব সবসময় সত্য হয় না। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন “তার অতীত যাই হোক, আমি তাকেই বিয়ে করব।”
এরপর তিনি সুহাসিনীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
কিন্তু সুহাসিনী প্রথমে রাজি হয়নি। সে মাথা নিচু করে বলেছিল “স্যার, আপনি অনেক বড় মানুষ।
আমি আপনার যোগ্য নই… আর আমার কিছু দায়িত্ব আছে।” কিন্তু মিস্টার ইয়াসিন হাল ছাড়েন না। তিনি তাকে বোঝান, তিনি তার সব দায়িত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত।
ধীরে ধীরে সুহাসিনীও তার কথা বিশ্বাস করতে শুরু করে।
কিন্তু এই সম্পর্ক প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হন ইয়াসিনের মা রাহিমা খাতুন। তিনি রেগে বলেন “তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?
একটা কাজের মেয়েকে বিয়ে করবে, যার তিনটি সন্তান আছে! আমাদের পরিবারের মান-সম্মান কোথায় যাবে?”
আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুরাও ইয়াসিনকে নিয়ে হাসাহাসি করতে থাকে। কিন্তু ইয়াসিন কারও কথায় কান দেন না।
তিনি সুহাসিনীর পাশেই অটল থাকেন।
অবশেষে এক সাধারণ অনুষ্ঠানে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বিয়ের সময় সুহাসিনী কাঁদতে কাঁদতে বলে “আপনি কি সত্যিই নিশ্চিত? পরে যদি আফসোস করেন?”
ইয়াসিন শান্তভাবে উত্তর দেন “আমি কখনোই আফসোস করব না। আমি তোমাকে এবং তোমার সন্তানদের গ্রহণ করেছি।” বিয়ের রাত। পুরো ঘর ছিল নিস্তব্ধ।
বাইরে শহরের আলো জ্বলজ্বল করলেও ভেতরে নেমে এসেছে অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা। সুহাসিনী ভীষণ নার্ভাস ছিল। মিস্টার ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার কাছে এসে বলেন “ভয় পেও না, এখন তুমি আমার স্ত্রী।”
তিনি তার কাঁধে হাত রাখেন।
সুহাসিনী ধীরে ধীরে নিজের ভয় ও দ্বিধা কাটিয়ে ওঠে।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন সে নিজের দীর্ঘদিনের চাপা সত্য প্রকাশ করার সাহস জোগায়…মিস্টার ইয়াসিন যা দেখেন, তিনি এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যান।
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। কারণ যেটা তিনি ভাবতেন, বাস্তবতা তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
আর সেই রাতেই ভেঙে যায় সব গুজব…এবং সামনে আসে সেই সত্য, যা পুরো গল্পটাকেই অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ঘরের ভেতরে তখন শুধু মৃদু বাতির আলো। জানালার পর্দা হালকা বাতাসে দুলছিল। সুহাসিনীর বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন পুরো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। সে কাঁপা হাতে নিজের ওড়নাটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্যদিকে মিস্টার ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলেন। তার চোখে কোনো লোভ ছিল না, ছিল শুধু শান্ত এক মমতা।
ইয়াসিন নরম গলায় বললেন, “এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো তোমার স্বামী।”
সুহাসিনী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার ঠোঁট কাঁপছিল। চোখের কোণে জমে থাকা পানি বারবার গড়িয়ে পড়ছিল। অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর সে হঠাৎ বলল, “আজকে আপনাকে একটা সত্য জানাতেই হবে। কারণ এই সত্য না জানলে আপনি আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন না।”
ইয়াসিন অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো মেয়েটি অতীত নিয়ে অপরাধবোধে ভুগছে। তাই তিনি শান্তভাবে বললেন, “তোমার অতীত নিয়ে আমি কখনো বিচার করিনি। আজও করব না।”
সুহাসিনী ধীরে ধীরে নিজের হাতের চুড়িগুলো খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর কাঁপা হাতে নিজের গলার ওড়নাটা সরিয়ে দিল। ঠিক তখনই ইয়াসিনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল পুরনো নির্যাতনের অসংখ্য দাগ। কাঁধ, পিঠ আর হাতজুড়ে পোড়া দাগ, বেতের আঘাতের চিহ্ন, আর কিছু গভীর ক্ষতের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠল।
ইয়াসিন হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “এসব কী?”
সুহাসিনী মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল। তার কান্না যেন বহু বছরের জমে থাকা যন্ত্রণার বিস্ফোরণ। সে ভাঙা গলায় বলল, “এই দাগগুলোই আমার আসল পরিচয় স্যার… না, এখন তো আপনাকে স্যার বলা উচিত না… কিন্তু অভ্যাস চলে যায় না।”
ইয়াসিন তার হাত ধরে বিছানায় বসালেন। তারপর খুব শান্তভাবে বললেন, “সব খুলে বলো।”
সুহাসিনী চোখ মুছে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
“আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার বাবা মারা যায়। মা খুব অসুস্থ ছিলেন। সংসারে কোনো উপার্জন ছিল না। গ্রামের এক আত্মীয় আমাদের সাহায্য করার কথা বলে আমাকে শহরে নিয়ে আসে। কিন্তু তারা আমাকে একটা ধনী বাড়িতে কাজের মেয়ের মতো বিক্রি করে দেয়।”
ইয়াসিন স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন।
“ওই বাড়ির মালিক আর তার ছেলেরা আমাকে মানুষ মনে করত না। দিনের পর দিন আমাকে মারধর করত। একটু ভুল হলেই গরম খুন্তি দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দিত। অনেক রাত না খেয়ে থাকতে হতো। আমি পালাতে চেয়েছিলাম… কিন্তু পারিনি।”
সুহাসিনীর কণ্ঠ আরও কাঁপতে লাগল।
“একদিন ওই বাড়ির ছোট ছেলে আমাকে জোর করে অপমান করার চেষ্টা করে। আমি প্রতিরোধ করি। তখন তারা সবাই মিলে আমার নামে গুজব ছড়িয়ে দেয় যে আমি নষ্ট মেয়ে। গ্রামের মানুষও সেটা বিশ্বাস করে নেয়।”
ইয়াসিনের মুঠো শক্ত হয়ে উঠল।
তিনি রাগে দাঁত চেপে বললেন, “মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে?”
সুহাসিনী তিক্ত হেসে বলল, “গরিব মেয়েদের জন্য পৃথিবীটা এমনই।”
তারপর সে আবার বলল, “আর হামিম, রাফি আর লায়না…”
ইয়াসিন চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সুহাসিনী এবার হালকা কেঁদে বলল, “ওরা আমার সন্তান না।”
ইয়াসিন বিস্ময়ে বললেন, “কি?”
“ওরা আমার ছোট তিন ভাইবোন। মা মারা যাওয়ার আগে আমার হাতে ওদের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সমাজের মানুষ কখনো সত্য জানার চেষ্টা করেনি। সবাই ধরে নিয়েছিল ওরা আমার অবৈধ সন্তান।”
কথাগুলো শুনে ইয়াসিন যেন ভিতর থেকে কেঁপে উঠলেন।
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে রাতের শহর ঝলমল করছিল। অথচ তার ভেতরে তখন প্রবল ঝড় বইছে। তিনি ভাবতেই পারছিলেন না, একটা মেয়েকে সমাজ কতটা ভুল বুঝতে পারে।
কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে এসে সুহাসিনীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন।
সুহাসিনী অবাক হয়ে তাকাল।
ইয়াসিন তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন, “তুমি এতদিন একা এত কষ্ট সহ্য করেছ?”
সুহাসিনী উত্তর দিতে পারল না। শুধু কান্নায় ভেঙে পড়ল।
ইয়াসিন তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলেন।
“আজ থেকে তুমি আর একা নও। তোমার সব কষ্টের ভাগ এখন আমারও।”
সেই মুহূর্তে সুহাসিনীর বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করল। জীবনে প্রথমবার সে অনুভব করল কেউ তাকে সত্যিকারের সম্মান করছে।
কিন্তু ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও উপস্থিতি টের পাওয়া গেল।
দুজনেই চমকে উঠল।
ইয়াসিন দরজা খুলতেই দেখলেন তার মা রাহিমা খাতুন দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ কঠিন হয়ে আছে।
তিনি ভেতরে ঢুকেই বললেন, “আমি জানতাম এই মেয়ের কোনো না কোনো নাটক আছে।”
সুহাসিনী সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
রাহিমা খাতুন তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন আবার কী গল্প শোনালে আমার ছেলেকে?”
ইয়াসিন বিরক্ত হয়ে বললেন, “মা, যথেষ্ট হয়েছে।”
কিন্তু রাহিমা খাতুন থামলেন না।
“তুমি জানো না ইয়াসিন, এই ধরনের মেয়েরা খুব চালাক হয়। কান্নাকাটি করে পুরুষদের ফাঁদে ফেলে।”
সুহাসিনীর চোখ আবার ভিজে উঠল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
ইয়াসিন এবার কঠিন গলায় বললেন, “মা, আপনি যা ভাবছেন সব ভুল।”
“ভুল?” রাহিমা খাতুন রেগে উঠলেন। “পুরো সমাজ যেটা জানে সেটা ভুল আর শুধু এই মেয়েটাই সত্যি?”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বললেন, “হ্যাঁ। কারণ সমাজ কখনো সত্য জানার চেষ্টা করেনি।”
তারপর তিনি সুহাসিনীর শরীরের দাগগুলোর কথা মাকে বললেন। সবকিছু খুলে বললেন।
কথাগুলো শুনে রাহিমা খাতুনের মুখের রাগ ধীরে ধীরে স্তব্ধতায় বদলে যেতে লাগল। কিন্তু তিনি সহজে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “প্রমাণ আছে?”
এই প্রশ্ন শুনে সুহাসিনীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে কাঁপা গলায় বলল, “গরিব মানুষের কষ্টের আবার প্রমাণ লাগে নাকি?”
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।
রাহিমা খাতুন কিছু না বলে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু যাওয়ার সময় তার চোখে এক অদ্ভুত দ্বিধা দেখা গেল।
সেই রাতের পর থেকে ইয়াসিনের আচরণ আরও বদলে যায়। তিনি আগের চেয়ে বেশি যত্ন নিতে থাকেন সুহাসিনীর। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে তার খোঁজ নেন, একসঙ্গে খেতে বসেন, এমনকি বাড়ির সবাইকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে সুহাসিনী এখন এই বাড়ির সম্মানিত বউ।
কিন্তু সমাজ এত সহজে বদলায় না।
পরদিনই কয়েকজন আত্মীয় বাড়িতে এসে নানা কথা বলতে শুরু করে।
এক খালা সরাসরি বলে বসেন, “ইয়াসিন, তুমি এত শিক্ষিত ছেলে হয়ে একটা কাজের মেয়েকে বিয়ে করলে?”
আরেকজন নিচু গলায় বলে, “টাকার লোভেই করেছে। এসব মেয়েদের আমি ভালো করেই চিনি।”
সুহাসিনী পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। প্রতিটা কথা তার হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধছিল।
কিন্তু এবার ইয়াসিন চুপ থাকলেন না।
তিনি সবার সামনে দৃঢ় গলায় বললেন, “আপনারা শিক্ষিত হতে পারেন, কিন্তু মানুষ হতে পারেননি।”
ঘরে নীরবতা নেমে এলো।
ইয়াসিন আবার বললেন, “একজন মানুষের সম্মান তার জন্ম বা পেশায় না, তার চরিত্রে।”
আত্মীয়রা অপমানিত হয়ে সেখান থেকে চলে যায়। কিন্তু এই ঘটনার পর সুহাসিনী আরও অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সে বারবার ভাবতে থাকে, তার কারণে ইয়াসিন তার নিজের পরিবার ও সমাজের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে।
সেদিন রাতে সে ধীরে ধীরে বলল, “আপনার জীবনটা আমি নষ্ট করে দিচ্ছি না তো?”
ইয়াসিন অবাক হয়ে তাকালেন।
“এমন কথা কেন বলছ?”
সুহাসিনী চোখ নামিয়ে বলল, “আপনার মতো মানুষের স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।”
ইয়াসিন তার থুতনিতে হাত রেখে মুখটা উপরে তুললেন।
“তোমার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো তুমি একজন ভালো মানুষ। আর সেটা অনেক বড় পরিচয়।”
সুহাসিনীর চোখ আবার ভিজে উঠল।
ঠিক তখনই ইয়াসিনের ফোনে একটি কল আসে।
তিনি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে আসে।
“স্যার, অফিসে বড় সমস্যা হয়েছে। কেউ কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে।”
ইয়াসিনের মুখ মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে গেল।
তিনি দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন।
কিন্তু তিনি তখনও জানতেন না, এই সমস্যার পেছনে এমন একজন জড়িত, যে খুব শিগগিরই সুহাসিনীর অতীতের সঙ্গে ভয়ংকর এক সম্পর্ক সামনে আনবে। রাত তখন প্রায় আড়াইটা। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। কিন্তু মিস্টার ইয়াসিনের মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে। ফোন কানে নিয়ে তিনি দ্রুত বারান্দার দিকে হাঁটছিলেন। ওপাশ থেকে তার কোম্পানির ম্যানেজার বারবার আতঙ্কিত কণ্ঠে বলছিল,
“স্যার, আমাদের নতুন প্রজেক্টের সব কনফিডেনশিয়াল ডকুমেন্ট প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির হাতে চলে গেছে। মিডিয়াতে খবর ছড়িয়ে পড়ার আগেই কিছু করতে হবে।”
ইয়াসিন চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা ভেতরের কেউ ছাড়া সম্ভব নয়।
তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,
“কেউ অফিস থেকে বের হবে না। আমি এখনই আসছি।”
ফোন কেটে তিনি ঘরের দিকে ফিরে তাকালেন। সুহাসিনী দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে ভয় স্পষ্ট।
সে আস্তে করে বলল, “কিছু হয়েছে?”
ইয়াসিন জোর করে হালকা হাসলেন।
“অফিসে একটু সমস্যা হয়েছে। তুমি চিন্তা করো না।”
সুহাসিনী কাছে এসে বলল,
“এত রাতে যাবেন?” “যেতেই হবে।”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সুহাসিনী ধীরে ধীরে বলল,
“আপনি সাবধানে থাকবেন।”
এই ছোট্ট কথাটুকু শুনে ইয়াসিনের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এলো। জীবনে অনেক মানুষ তার পাশে থেকেছে স্বার্থের জন্য। কিন্তু এই মেয়েটার চোখে তিনি প্রথমবার নিঃস্বার্থ ভয় দেখলেন।
তিনি বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার সুহাসিনীর মাথায় হাত রেখে বললেন, “ঘুমিয়ে পড়ো। আমি ফিরে আসব।”
বাড়ির বিশাল গেট পেরিয়ে গাড়ি যখন রাস্তায় উঠল, তখন ঢাকার রাত প্রায় ফাঁকা। রাস্তার আলো গাড়ির কাঁচে পড়ে বারবার ঝলসে উঠছিল। ইয়াসিনের মাথায় তখন শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল— কে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল?
অন্যদিকে সুহাসিনী বিছানায় বসে ছিল স্থির হয়ে। এত বড় বাড়িতে থেকেও তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা কাজ করছিল। আজকের রাতের পর তার জীবন পুরো বদলে গেছে। সে আর শুধু কাজের মেয়ে নয়। কিন্তু সমাজ কি কখনো তাকে সেই সম্মান দেবে?
ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
সুহাসিনী চমকে উঠে দরজা খুলতেই দেখল রাহিমা খাতুন দাঁড়িয়ে আছেন।
তার মুখে আগের মতো কঠোরতা নেই। বরং অদ্ভুত এক দ্বিধা।
তিনি ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে বললেন,
“ঘুমাওনি?”
সুহাসিনী মাথা নিচু করে বলল,
“না।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রাহিমা খাতুন বিছানার পাশে বসে ধীরে ধীরে বললেন,
“তোমার শরীরের দাগগুলো… সত্যি?”
সুহাসিনীর বুকটা ধক করে উঠল।
সে আস্তে করে বলল,
“জি।”
“তুমি এতদিন কাউকে বলোনি কেন?”
সুহাসিনী হালকা তিক্ত হাসল।
“গরিব মেয়েদের কথা কেউ বিশ্বাস করে না।”
রাহিমা খাতুন কিছু বললেন না। শুধু চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। জীবনে প্রথমবার তিনি মেয়েটাকে অন্য চোখে দেখার চেষ্টা করছিলেন।
হঠাৎ তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার ভাইবোনেরা কোথায় থাকে?”
“গ্রামে।”
“তাদের খরচ তুমি একাই চালাও?”
সুহাসিনী মাথা নেড়ে বলল,
“জি। হামিম এবার কলেজে উঠেছে। রাফি স্কুলে পড়ে। আর লায়না এখনও ছোট।”
রাহিমা খাতুনের চোখে মুহূর্তের জন্য মায়া ফুটে উঠল। কিন্তু তিনি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন।
“ঘুমিয়ে পড়ো।”
এইটুকু বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
সুহাসিনী অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। আজ প্রথমবার সেই মহিলার কণ্ঠে ঘৃণার বদলে মানুষত্বের আভাস পেল সে।
অন্যদিকে ইয়াসিন পৌঁছে গেলেন তার কোম্পানির প্রধান অফিসে।
পুরো ভবন তখনও আলোয় ভরা। কর্মচারীরা আতঙ্কিত মুখে এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে।
বোর্ডরুমে ঢুকতেই সবাই দাঁড়িয়ে গেল।
ইয়াসিন টেবিলের মাথায় বসে ঠান্ডা গলায় বললেন,
“কে করেছে?”
কেউ উত্তর দিল না।
তিনি আবার বললেন,
“আমার কোম্পানিতে বিশ্বাসঘাতকদের জায়গা নেই।”
ঠিক তখন কোম্পানির আইটি হেড কাঁপা গলায় বলল,
“স্যার… ফাইলগুলো আপনার ব্যক্তিগত সার্ভার থেকেই ট্রান্সফার হয়েছে।”
ইয়াসিনের চোখ সরু হয়ে এলো।
“মানে?”
“কেউ আপনার ব্যক্তিগত এক্সেস ব্যবহার করেছে।”
ঘরের ভেতর থমথমে নীরবতা নেমে এলো।
হঠাৎ পেছন থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
“হয়তো আপনার খুব কাছের কেউ।”
সবাই ঘুরে তাকাল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কোম্পানির ডিরেক্টর তানভীর রহমান।
চল্লিশ বছরের স্মার্ট, চতুর একজন মানুষ। বহু বছর ধরে ইয়াসিনের সঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু তার চোখের গভীরে সবসময় অদ্ভুত এক হিসাবি দৃষ্টি ছিল।
তানভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
“স্যার, বাইরে অনেক গুজব চলছে।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“কী গুজব?”
তানভীর কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“মানুষ বলছে আপনি বিয়ের পর থেকে আগের মতো মনোযোগী নেই। একটা কাজের মেয়ের কারণে আপনার সিদ্ধান্ত নাকি দুর্বল হয়ে গেছে।”
কথাটা শুনে ইয়াসিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“পার্সোনাল বিষয় নিয়ে একটা শব্দও শুনতে চাই না।”
তানভীর মাথা নিচু করল।
“স্যরি স্যার। কিন্তু বোর্ড মেম্বাররা প্রশ্ন তুলছে।”
ইয়াসিন বুঝতে পারছিলেন, এটা শুধু ব্যবসার সংকট নয়। কেউ ইচ্ছা করে তার ব্যক্তিগত জীবনকে টার্গেট করছে।
মিটিং শেষ হওয়ার পর তিনি একা নিজের কেবিনে বসে ছিলেন। হঠাৎ তার চোখ পড়ল ডেস্কের ওপর রাখা একটি খামে।
খামের ওপরে কোনো নাম নেই।
তিনি খুলতেই ভেতর থেকে কয়েকটি পুরনো ছবি বেরিয়ে এলো।
ছবিগুলো দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
সেখানে দেখা যাচ্ছে বহু বছর আগের সুহাসিনী। তার মুখে ভয়, চোখে কান্না। আর পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন ভয়ংকর চেহারার পুরুষ।
একটি ছবিতে সুহাসিনীর হাত শক্ত করে ধরে আছে এক লোক।
ছবির পেছনে লাল কালিতে লেখা—
“তোমার স্ত্রীর অতীত তুমি জানো না।”
ইয়াসিনের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নাম্বার।
তিনি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কর্কশ হাসি।
“মিস্টার ইয়াসিন… সত্য জানার জন্য প্রস্তুত তো?”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“কে আপনি?”
লোকটা হেসে বলল,
“যে মেয়েকে আপনি বিয়ে করেছেন, তাকে আমি খুব ভালো করে চিনি।”
“কী বলতে চান?”
“সুহাসিনী এত নির্দোষ না, যতটা আপনি ভাবছেন।”
ইয়াসিন দাঁত চেপে বললেন,
“একটা কথাও বেশি বলবেন না।”
লোকটা এবার ধীরে ধীরে বলল,
“গ্রামের নাম শুনেছেন? কালিগঞ্জের পাশের ছোট্ট এলাকা শালবনপুর? সেখানে গিয়ে খোঁজ নিন। আপনার স্ত্রীর অতীত পুরো বদলে যাবে।”
ফোন কেটে গেল।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইলেন।
তার মাথার ভেতর সন্দেহ আর বিশ্বাসের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি মনে মনে জানেন, সুহাসিনীর চোখের কান্না মিথ্যা ছিল না।
ভোরের দিকে তিনি বাড়ি ফিরলেন।
ঘরে ঢুকতেই দেখলেন সুহাসিনী সোফায় বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো তার অপেক্ষা করতে করতে রাত কেটে গেছে।
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে একটি কম্বল গায়ে জড়িয়ে দিলেন।
ঠিক তখন সুহাসিনীর হাত থেকে একটি পুরনো ছবি মেঝেতে পড়ে গেল।
ইয়াসিন নিচু হয়ে ছবিটা তুলে নিলেন।
ছবিতে ছোট্ট তিনটি বাচ্চা হাসছে। মাঝখানে তরুণী সুহাসিনী।
কিন্তু ছবির এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে দেখে ইয়াসিনের চোখ থেমে গেল।
এই লোকটাকেই তিনি কিছুক্ষণ আগে ছবিতে দেখেছেন।
একই মানুষ।
একই ভয়ংকর দৃষ্টি।
ইয়াসিনের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন ঠান্ডা অনুভূতি নেমে এলো।
লোকটা কে?
আর কেন সে সুহাসিনীর অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে?
ঠিক তখন ঘুমের ঘোরে সুহাসিনী অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠল,
“না… আমাকে মারবেন না… প্লিজ…”
তার পুরো শরীর কাঁপছিল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার হাত ধরে ফেললেন।
কিন্তু সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতেই পারলেন না— এই মেয়েটার অতীত শুধু কষ্টের না, ভয়ংকর এক অন্ধকার রহস্যে ভরা… যার ছায়া এখন তার জীবনেও নেমে আসতে শুরু করেছে। ভোরের ম্লান আলো তখন ধীরে ধীরে জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকছিল। বাইরে পাখির ডাক শোনা গেলেও ঘরের পরিবেশ ছিল অদ্ভুত ভারী। মিস্টার ইয়াসিন বিছানার পাশে বসে গভীর দৃষ্টিতে সুহাসিনীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মেয়েটা ঘুমের মাঝেও কাঁপছিল। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, কপালে ঘাম জমে আছে। যেন ঘুমের মধ্যেও কোনো ভয়ংকর স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
হঠাৎ সুহাসিনী কেঁপে উঠে চোখ খুলে ফেলল।
কয়েক সেকেন্ড সে বুঝতেই পারল না কোথায় আছে। তারপর ইয়াসিনকে সামনে বসে থাকতে দেখে ধীরে ধীরে শান্ত হলো।
ইয়াসিন নরম গলায় বললেন,
“খারাপ স্বপ্ন দেখছিলে?”
সুহাসিনী চোখ নামিয়ে নিল।
“জি… মাঝে মাঝে এমন হয়।”
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাতে ধরা ছবিটা তার সামনে ধরলেন।
“এই লোকটা কে?”
ছবিটা দেখেই সুহাসিনীর মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তার চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
“এই ছবি আপনি কোথায় পেলেন?”
“তোমার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল।”
সুহাসিনী তড়িঘড়ি করে ছবিটা নিজের হাতে নিয়ে ফেলল। তার পুরো শরীর কাঁপছিল।
ইয়াসিন এবার গম্ভীর স্বরে বললেন,
“লোকটা কে?”
সুহাসিনী কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে বসে রইল।
“আমি উত্তর চাই।”
দীর্ঘ নীরবতার পর সে ধীরে ধীরে বলল,
“ওর নাম জালাল মিয়া।”
“তোমার কী হয়?”
সুহাসিনী চোখ বন্ধ করল। যেন পুরনো কোনো ভয়ংকর স্মৃতি আবার সামনে ভেসে উঠেছে।
“ও আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলে ছিল।”
ইয়াসিন শান্তভাবে শুনছিলেন।
সুহাসিনী ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
“ছোটবেলায় আমরা খুব গরিব ছিলাম। মা অসুস্থ ছিলেন। আমি গ্রামের মানুষের বাসায় কাজ করতাম। তখন থেকেই জালাল আমার দিকে খারাপ নজরে তাকাত।”
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
“আমি সবসময় ওকে এড়িয়ে চলতাম। কিন্তু ও আমাকে ছাড়েনি।”
ইয়াসিনের ভেতরে রাগ জমতে লাগল।
“তারপর?”
সুহাসিনী কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“একদিন রাতে ও তার বন্ধুদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসে।”
কথাটা বলতে গিয়েই তার গলা কেঁপে উঠল।
“ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।”
ইয়াসিনের হাত মুঠো হয়ে গেল।
“তারপর কী হয়েছিল?”
সুহাসিনীর চোখ ভিজে উঠল।
“মা ওদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে ওরা মাকে ধাক্কা দেয়। মা মাটিতে পড়ে মাথায় আঘাত পান।”
ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
“সেদিনের পর থেকেই মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর জালাল পুরো গ্রামে আমার নামে মিথ্যা কথা ছড়িয়ে দেয়।”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বললেন,
“তাহলে সব গুজবের শুরু ওই লোকটার কাছ থেকে?”
সুহাসিনী মাথা নেড়ে বলল,
“জি।”
“তুমি থানায় যাওনি?”
সে তিক্ত হেসে বলল,
“ওদের বিরুদ্ধে কে কথা বলবে? পুরো গ্রাম চেয়ারম্যানের ভয়ে চুপ ছিল।”
ইয়াসিনের চোখে তখন আগুন জ্বলছিল।
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে গেলেন। তার মাথার ভেতর একটা কথাই ঘুরছিল— এতদিন একটা নির্দোষ মেয়েকে সমাজ নষ্ট চরিত্রের তকমা দিয়ে বিচার করেছে।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে তানভীরের নাম ভেসে উঠল।
ইয়াসিন কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ এলো,
“স্যার, মিডিয়াতে খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।”
“কী খবর?”
“কোম্পানির তথ্য ফাঁসের সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত জীবনও টেনে আনা হচ্ছে।”
ইয়াসিনের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
“আমি অফিসে আসছি।”
ফোন কেটে তিনি সুহাসিনীর দিকে তাকালেন।
“তুমি কোথাও যাবে না। বাড়িতেই থাকবে।”
সুহাসিনী ধীরে ধীরে বলল,
“আমি কি আপনার সমস্যার কারণ হয়ে যাচ্ছি?”
ইয়াসিন কাছে এসে দৃঢ় গলায় বললেন,
“তুমি আমার স্ত্রী। এই কথাটা ভুলে যেও না।”
কিছুক্ষণ পর তিনি বেরিয়ে গেলেন।
বাড়ির বিশাল গেট বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনে সুহাসিনী নিঃশব্দে বসে পড়ল। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত ভয় কাজ করছিল। অতীত কি আবার ফিরে আসছে?
ঠিক তখন রান্নাঘরের কাজের মহিলা সালমা এসে নিচু গলায় বলল,
“ভাবি… বাইরে কিছু সাংবাদিক এসেছে।”
সুহাসিনী চমকে উঠল।
“সাংবাদিক?”
“জি। তারা আপনার ছবি তুলতে চাইছে।”
সুহাসিনীর বুক ধক করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
বাড়ির সামনে কয়েকজন রিপোর্টার দাঁড়িয়ে আছে। ক্যামেরা হাতে তারা বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছে।
কারও কণ্ঠ ভেসে এলো,
“শুনেছি সিইও একটা কাজের মেয়েকে বিয়ে করেছে।”
আরেকজন বলল,
“মেয়েটার নাকি তিনটা সন্তানও আছে।”
এই কথাগুলো শুনে সুহাসিনীর চোখ ভিজে উঠল। এতদিন পরও মানুষ তাকে একই চোখে দেখছে।
অন্যদিকে ইয়াসিন অফিসে পৌঁছেই বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর।
বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে খবর ছড়িয়ে পড়েছে—
“খ্যাতনামা সিইওর জীবনে রহস্যময় নারী”
“তিন সন্তানের মাকে বিয়ে করলেন ব্যবসায়ী ইয়াসিন”
“ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির মাঝেই কোম্পানির গোপন তথ্য ফাঁস”
কোম্পানির বোর্ড মেম্বাররা জরুরি মিটিং ডাকলেন।
বোর্ডরুমে ঢুকতেই সবাই গম্ভীর মুখে বসে ছিল।
একজন বয়স্ক পরিচালক সরাসরি বললেন,
“মিস্টার ইয়াসিন, আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এখন কোম্পানির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”
আরেকজন বলল,
“শেয়ার মার্কেটে প্রভাব পড়ছে।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“আমার ব্যক্তিগত জীবন কোম্পানির পারফরম্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত না।”
তানভীর তখন ধীরে ধীরে বলল,
“কিন্তু মিডিয়া সেটা অন্যভাবে দেখছে।”
ইয়াসিন তার দিকে তাকালেন।
তানভীরের চোখে অদ্ভুত এক হাসি লুকানো।
ঠিক তখন একজন কর্মচারী দৌড়ে এসে বলল,
“স্যার, বাইরে একজন লোক এসেছে। সে বলছে সুহাসিনী ম্যাডামের অতীত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানে।”
ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
ইয়াসিন গম্ভীর মুখে বললেন,
“ভেতরে পাঠান।”
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে মাঝবয়সী এক লোক ভেতরে ঢুকল।
ময়লা শার্ট, মুখভর্তি দাড়ি, চোখে ধূর্ততা।
লোকটাকে দেখেই ইয়াসিন চিনে ফেললেন।
ছবির সেই মানুষ।
জালাল।
লোকটা ভেতরে ঢুকেই কৃত্রিম হাসি দিল।
“আসসালামু আলাইকুম, স্যার।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“কি চান?”
জালাল চেয়ার টেনে বসে বলল,
“আমি শুধু সত্য বলতে এসেছি।”
“কোন সত্য?”
জালাল মুচকি হাসল।
“আপনার স্ত্রী সম্পর্কে।”
ঘরের সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
জালাল ধীরে ধীরে বলল,
“আপনি যাকে এত ভালো মানুষ ভাবছেন, সে আসলে—”
“একটা শব্দও ভেবে বলবেন।”
ইয়াসিনের কণ্ঠ এত ঠান্ডা ছিল যে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু জালাল থামল না।
“সুহাসিনী গ্রামের খুব চালাক মেয়ে ছিল। একাধিক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তার।”
তানভীর নিচু গলায় বলল,
“প্রমাণ আছে?”
জালাল পকেট থেকে কিছু পুরনো ছবি বের করল।
ছবিগুলোতে দূর থেকে সুহাসিনীকে কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
জালাল বলল,
“এইগুলোই প্রমাণ।”
ঘরের অনেকেই ফিসফিস শুরু করল।
কিন্তু ইয়াসিন ছবিগুলো হাতে নিয়ে গভীরভাবে দেখলেন। তারপর হঠাৎ তার চোখ সরু হয়ে এলো।
কারণ ছবিগুলো খুব হিসেব করে তোলা।
মুহূর্তগুলো এমনভাবে কাটা হয়েছে যেন সত্য আড়াল থাকে।
তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
“এই ছবিগুলো কে তুলেছে?”
জালাল থমকে গেল।
“মানে?”
“আমি প্রশ্ন করেছি।”
লোকটা জড়তা নিয়ে বলল,
“আমার এক বন্ধু।”
ইয়াসিন ঠান্ডা হাসলেন।
“মজার ব্যাপার কী জানেন? এই ছবিগুলোতে শুধু সুহাসিনীকে দেখানো হয়েছে। কিন্তু পুরো ঘটনা দেখানো হয়নি।”
জালাল চুপ।
ইয়াসিন এবার দাঁড়িয়ে গেলেন।
“আপনি কি জানেন, মিথ্যা অপবাদ দেওয়াও অপরাধ?”
জালালের চোখে অস্থিরতা দেখা দিল।
কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে বিশ্বাস না করলেও পুরো গ্রাম আমাকে বিশ্বাস করবে।”
এই কথা বলেই সে উঠে চলে গেল।
কিন্তু যাওয়ার সময় তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ছিল।
মিটিং শেষ হওয়ার পর ইয়াসিন নিজের কেবিনে একা বসে রইলেন।
তার মাথার ভেতর এখন অনেক প্রশ্ন।
জালাল হঠাৎ এখন কেন ফিরে এলো?
আর তানভীর কেন বারবার বিষয়টাকে উসকে দিচ্ছে?
ঠিক তখন তার সহকারী এসে বলল,
“স্যার, একটা তথ্য পেয়েছি।”
“কী তথ্য?”
“গত এক মাসে তানভীর স্যার কয়েকবার শালবনপুরে গিয়েছিলেন।”
ইয়াসিনের চোখ মুহূর্তে গাঢ় হয়ে উঠল।
“শালবনপুর?”
“জি স্যার। সুহাসিনী ম্যাডামের গ্রাম।”
এক মুহূর্তে সবকিছু যেন নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করল।
ইয়াসিন বুঝতে পারলেন— এই পুরো খেলাটা শুধু সুহাসিনীকে অপমান করার জন্য না।
এর পেছনে আরও বড় কোনো উদ্দেশ্য আছে।
আর সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তানভীর… এবং সুহাসিনীর অতীতের ভয়ংকর অন্ধকার। অফিসের কেবিনের ভেতর তখন গাঢ় নীরবতা। বিশাল কাঁচের জানালার বাইরে ঢাকা শহর ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, কিন্তু মিস্টার ইয়াসিনের মাথার ভেতরে যেন আরও বড় ঝড় বইছে। তার চোখ স্থির হয়ে আছে ডেস্কের ওপর রাখা ফাইলগুলোর দিকে। সহকারীর বলা কথাটা বারবার কানে বাজছে “গত এক মাসে তানভীর স্যার কয়েকবার শালবনপুরে গিয়েছিলেন।”
শালবনপুর। সুহাসিনীর সেই গ্রাম।
যে গ্রামের নাম শুনলেই মেয়েটার চোখে ভয় নেমে আসে।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তার ভেতরে এখন সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এতদিন তিনি তানভীরকে নিজের বিশ্বস্ত সহকর্মী মনে করতেন। কোম্পানির শুরু থেকেই লোকটা তার পাশে ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এই মানুষটার ভেতরে অন্য এক মুখ লুকিয়ে আছে।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
“তানভীর এখন কোথায়?”
সহকারী উত্তর দিল,
“স্যার, উনি বোর্ডরুমে।”
ইয়াসিন আর কিছু না বলে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
বোর্ডরুমের সামনে এসে তিনি কয়েক সেকেন্ড থামলেন। ভেতর থেকে চাপা কণ্ঠ ভেসে আসছে। দরজা সামান্য ফাঁক ছিল। ইয়াসিন অজান্তেই দাঁড়িয়ে শুনতে পেলেন—
তানভীর বলছে,
“চিন্তার কিছু নেই। মিডিয়াকে আরেকটু চাপ দিলেই ইয়াসিন নিজে থেকেই দুর্বল হয়ে যাবে।”
অপর প্রান্ত থেকে কেউ বলল,
“কিন্তু যদি সে সত্য জেনে যায়?”
তানভীর হালকা হেসে বলল,
“সত্য জানার আগেই আমি সব শেষ করে দেব।”
ইয়াসিনের চোখ মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠল।
তিনি জোরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন।
সবাই চমকে তাকাল।
তানভীর কয়েক সেকেন্ড থমকে গেলেও দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
“স্যার… আপনি?”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“শালবনপুরে কেন গিয়েছিলে?”
প্রশ্নটা শুনে তানভীরের মুখের রঙ বদলে গেল।
“মানে?”
“আমি আবার জিজ্ঞেস করব না।”
বোর্ডরুম নিস্তব্ধ।
তানভীর জোর করে হাসল।
“ব্যক্তিগত কাজে গিয়েছিলাম।”
“কী ব্যক্তিগত কাজ?”
“স্যার, আপনি কি আমাকে জেরা করছেন?”
ইয়াসিন এবার ঠান্ডা গলায় বললেন,
“যতক্ষণ না সত্য বলছ, হ্যাঁ।”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“আমি শুনেছিলাম আপনার স্ত্রীর অতীত নিয়ে অনেক কথা আছে। তাই একটু খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম।”
“আমার অনুমতি ছাড়া?”
“আমি শুধু কোম্পানির ভবিষ্যতের কথা ভেবেছি।”
ইয়াসিনের চোখে তখন স্পষ্ট ঘৃণা।
“আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তদন্ত করার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”
তানভীর এবার কণ্ঠ নিচু করল।
“স্যার, আপনি বুঝতে পারছেন না। ওই মেয়েটা আপনার জন্য বিপদ।”
এই কথা শুনে ইয়াসিন টেবিলে জোরে হাত মারলেন।
“Enough!”
পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
তিনি গর্জে উঠলেন,
“আর একবার আমার স্ত্রী সম্পর্কে অসম্মানজনক কথা বললে আমি ভুলে যাব তুমি আমার কোম্পানির ডিরেক্টর!”
তানভীর চুপ হয়ে গেল। কিন্তু তার চোখের গভীরে অদ্ভুত এক বিদ্বেষ জ্বলছিল।
ইয়াসিন সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন।
তার মাথায় এখন পরিষ্কার— তানভীর শুধু অফিসের ষড়যন্ত্রে জড়িত না, সুহাসিনীর অতীত নিয়েও কিছু লুকাচ্ছে।
অন্যদিকে বাড়িতে সুহাসিনী সকাল থেকে অস্বস্তিতে ছিল। সাংবাদিকরা চলে গেলেও তার বুকের ভেতরের ভয় কাটছিল না। রান্নাঘরে কাজ করতে করতেও সে বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছিল।
ঠিক তখন রাহিমা খাতুন ভেতরে এলেন।
তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বললেন,
“তুমি কি রান্না জানো?”
সুহাসিনী অবাক হয়ে তাকাল।
“জি… একটু।”
“আজ দুপুরের রান্না তুমি করবে।”
সুহাসিনী কয়েক সেকেন্ড বুঝতে পারল না কী বলবে।
এই বাড়িতে এতদিন সে কাজের মেয়ে হিসেবে রান্না করেছে ঠিকই, কিন্তু বউ হওয়ার পর এই প্রথম রাহিমা খাতুন তাকে পরিবারের সদস্যের মতো কোনো দায়িত্ব দিলেন।
সে আস্তে করে বলল,
“ঠিক আছে।”
দুপুরের রান্না করতে করতে তার ভেতরে অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। হয়তো ধীরে ধীরে সব বদলাতে শুরু করেছে।
কিন্তু ঠিক তখনই গেটের বাইরে হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল।
“ওই মেয়ে কোথায়?”
“ওকে বাইরে আনো!”
সুহাসিনী ভয় পেয়ে দৌড়ে জানালার কাছে গেল।
বাইরে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে জালাল।
তার চোখে আগের সেই ভয়ংকর দৃষ্টি।
সুহাসিনীর পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল,
“না… ও এখানে কেন এসেছে…”
রাহিমা খাতুনও বাইরে তাকিয়ে অবাক হলেন।
জালাল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে,
“গ্রামের চরিত্রহীন মেয়েকে লুকিয়ে রেখে লাভ হবে না!”
বাড়ির কর্মচারীরা হতভম্ব।
সুহাসিনী ভয়ে পেছনে সরে গেল।
তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে।
রাহিমা খাতুন প্রথমবার মেয়েটার চোখে এমন আতঙ্ক দেখলেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন?”
সুহাসিনী কাঁপা গলায় বলল,
“ও মানুষ না…”
ঠিক তখন জালাল আবার চিৎকার করে উঠল,
“সুহাসিনী! বের হও!”
তার কণ্ঠে এমন হিংস্রতা ছিল যে বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।
রাহিমা খাতুন এবার বিরক্ত হয়ে বললেন,
“এই লোককে পুলিশে দাও।”
কিন্তু সুহাসিনী হঠাৎ তার হাত চেপে ধরল।
“না!”
“কেন?”
“ও খুব ভয়ংকর মানুষ।”
রাহিমা খাতুন কিছু বুঝে ওঠার আগেই জালাল গেট ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল।
ঠিক তখন একটি কালো গাড়ি দ্রুত এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন ইয়াসিন।
তার চোখে রাগ স্পষ্ট।
তিনি সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই জালাল হেসে বলল,
“ওহ, সিইও সাহেব এসে গেছেন।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“এখান থেকে চলে যান।”
জালাল তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“আপনি জানেন না আপনি কাকে বিয়ে করেছেন।”
“আমি খুব ভালো করেই জানি।”
“না, জানেন না।”
জালাল ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“সুহাসিনী শুধু মিথ্যাবাদী না… সে একটা বিপদ।”
ইয়াসিন এবার তার কলার চেপে ধরলেন।
চারপাশের সবাই স্তব্ধ।
তিনি দাঁত চেপে বললেন,
“আর একবার আমার স্ত্রীর নাম নিয়ে বাজে কথা বললে আমি নিজেকে সামলাতে পারব না।”
জালাল হঠাৎ হেসে উঠল।
“আপনি কি জানেন, আপনার স্ত্রী একটা খুনের সাক্ষী?”
কথাটা শুনে সবাই থমকে গেল।
সুহাসিনীর মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দিলেন।
“কী বললেন?”
জালাল এবার নিচু গলায় বলল,
“অনেক বছর আগে শালবনপুরে একটা খুন হয়েছিল। আর সেই ঘটনার একমাত্র সাক্ষী ছিল সুহাসিনী।”
সুহাসিনীর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
তার চোখে আতঙ্ক জমে উঠল।
ইয়াসিন পেছনে ফিরে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
তিনি বুঝলেন— মেয়েটা কিছু লুকাচ্ছে।
জালাল আবার বলল,
“আপনার স্ত্রী সব জানে। কিন্তু এতদিন মুখ বন্ধ রেখেছে।”
এই বলে সে হেসে ধীরে ধীরে সরে গেল।
যাওয়ার সময় বলল,
“সত্য একদিন বের হবেই, সিইও সাহেব।”
গাড়ি চলে যাওয়ার পর পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে সুহাসিনীর দিকে এগিয়ে এলেন।
“খুনের ঘটনা?”
সুহাসিনীর ঠোঁট কাঁপছিল।
সে কিছু বলতে পারছিল না।
“তুমি আমাকে কিছু লুকাচ্ছ?”
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল তার।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর সে ধীরে ধীরে বলল,
“আমি কাউকে মারিনি…”
“তাহলে?”
সুহাসিনী হঠাৎ বসে পড়ল মেঝেতে।
“সেদিন… আমি সব দেখেছিলাম…”
তার শরীর কাঁপছিল।
ইয়াসিন নিচে বসে বললেন,
“কী দেখেছিলে?”
সুহাসিনী কান্না করতে করতে বলল,
“জালাল একটা মানুষকে মেরে ফেলেছিল।”
ঘরের সবাই স্তব্ধ।
রাহিমা খাতুন পর্যন্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন।
সুহাসিনী কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
“আমি ঘটনাটা দেখে ফেলেছিলাম। তারপর থেকেই ও আমাকে ভয় দেখাতে শুরু করে।”
ইয়াসিনের চোখ গাঢ় হয়ে উঠল।
“কাকে খুন করেছিল?”
সুহাসিনী কাঁপা গলায় বলল,
“একজন সাংবাদিককে…”
“সাংবাদিক?”
“তিনি গ্রামের চেয়ারম্যানের দুর্নীতির প্রমাণ সংগ্রহ করছিলেন। জালাল তাকে ধরে নিয়ে যায়… তারপর…”
কথা শেষ করতে পারল না সে।
ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।
ইয়াসিন বুঝতে পারলেন— এই ঘটনা শুধু অতীতের কোনো গুজব না।
এটার সঙ্গে ভয়ংকর অপরাধ জড়িয়ে আছে।
আর সেই কারণেই জালাল এতদিন ধরে সুহাসিনীকে চুপ করিয়ে রাখতে চাইছে।
ঠিক তখন ইয়াসিনের ফোনে আবার কল এলো।
তিনি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সহকারী আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল,
“স্যার, বড় সমস্যা হয়েছে!” “কী হয়েছে?”
“কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকা ট্রান্সফার হয়ে গেছে!” ইয়াসিন দাঁড়িয়ে গেলেন। “কি?!”
“সব প্রমাণ আপনার আইডি ব্যবহার করে করা হয়েছে।”
এক মুহূর্তে ইয়াসিন বুঝে গেলেন
কেউ তাকে ধ্বংস করার জন্য পুরো পরিকল্পনা সাজিয়েছে।
আর এই খেলার পেছনে শুধু জালাল না…
আরও বড় কেউ আছে। “সব প্রমাণ আপনার আইডি ব্যবহার করে করা হয়েছে।”
ফোনের ওপাশ থেকে সহকারীর আতঙ্কিত কণ্ঠ বারবার কানে বাজছিল। মিস্টার ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। যেন পুরো পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেছে। তার চারপাশে সবাই তাকিয়ে আছে, কিন্তু তিনি কিছু শুনতে পাচ্ছিলেন না।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল
কেউ তাকে ধ্বংস করার জন্য ধাপে ধাপে ফাঁদ পেতেছে।
প্রথমে কোম্পানির গোপন তথ্য ফাঁস।
তারপর মিডিয়ায় কেলেঙ্কারি।
এখন কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ।
সবকিছু এত নিখুঁতভাবে সাজানো যে বাইরে থেকে তাকালে মনে হবে তিনিই অপরাধী।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে ফোন নামালেন।
রাহিমা খাতুন উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
“কি হয়েছে?”
ইয়াসিন শান্ত থাকার চেষ্টা করলেন।
“অফিসে সমস্যা হয়েছে।”
কিন্তু তার চোখের ভেতরের ঝড় লুকানো যাচ্ছিল না।
অন্যদিকে সুহাসিনী তখনও মেঝেতে বসে কাঁদছিল। জালালের নাম শুনলেই তার শরীর কেঁপে উঠছে। বহু বছরের জমে থাকা ভয় যেন আবার জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে।
ইয়াসিন একবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন।
“তুমি ভয় পেয়ো না।”
সুহাসিনী ভাঙা গলায় বলল,
“ওরা খুব শক্তিশালী “আমি আছি।”
“আপনি বুঝতে পারছেন না। জালাল মানুষ মারতে পারে।”
ইয়াসিনের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
“এইবার ও ভুল মানুষকে ভয় দেখাতে এসেছে।”
তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
“আমি অফিসে যাচ্ছি। দরজা বন্ধ করে থাকবে।”
সুহাসিনী হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল।
“যাবেন না… আমার খুব ভয় করছে।”
এই প্রথম মেয়েটা এত অসহায়ের মতো তাকে থামানোর চেষ্টা করল।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত রাখলেন।
“আমি ফিরে আসব। তোমাকে একা ফেলে কোথাও যাব না।”
তিনি বেরিয়ে গেলেন।
গাড়িতে উঠে তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের বিশ্বস্ত আইনজীবী আরিফকে ফোন করলেন।
“অফিসে আসুন। জরুরি।”
ঢাকার রাস্তা তখন দুপুরের ভিড়ে আটকে আছে। কিন্তু ইয়াসিনের মনে হচ্ছিল সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছে।
অফিসে পৌঁছাতেই তিনি দেখলেন পুরো পরিবেশ অস্থির।
কর্মচারীরা ফিসফিস করছে। কেউ সরাসরি চোখে তাকাচ্ছে না।
বোর্ডরুমে ঢুকতেই কয়েকজন পরিচালক গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন।
তানভীরও সেখানে।
তার ঠোঁটের কোণে হালকা অদ্ভুত হাসি।
একজন পরিচালক কড়া গলায় বললেন,
“মিস্টার ইয়াসিন, কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় পঁচিশ কোটি টাকা গায়েব হয়েছে।”
আরেকজন বললেন,
“সব লেনদেন আপনার আইডি থেকে হয়েছে।”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন,
“আমি এই ট্রান্সফারের সঙ্গে জড়িত না।”
তানভীর ধীরে ধীরে বলল,
“কিন্তু প্রমাণ তো অন্য কথা বলছে।”
ইয়াসিন এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।
“তুমি কি বলতে চাইছ?”
তানভীর ভান করা দুঃখের সুরে বলল,
“স্যার, আমি শুধু কোম্পানিকে বাঁচাতে চাই।”
“নাকি নিজেকে?”
ঘরের ভেতর মুহূর্তে নীরবতা নেমে এলো।
তানভীরের চোখ সরু হয়ে উঠল।
“আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?”
ইয়াসিন উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখন আইটি বিভাগের প্রধান ভেতরে এসে বলল,
“স্যার, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে গত রাতে কেউ আপনার কেবিনে ঢুকেছিল।”
“কে?”
লোকটা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
“ভিডিওর কিছু অংশ ডিলিট করা হয়েছে।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“যেটুকু আছে দেখান।”
স্ক্রিনে ফুটেজ চালু হলো।
রাত প্রায় একটা।
ভিডিওতে দেখা গেল কালো হুডি পরা একজন মানুষ ইয়াসিনের কেবিনে ঢুকছে।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরে লোকটা হাত তুলে দরজা বন্ধ করতে গেলে তার কব্জির ঘড়ি স্পষ্ট দেখা গেল।
ইয়াসিনের চোখ হঠাৎ থেমে গেল।
এই ঘড়িটা তিনি আগে দেখেছেন।
খুব কাছ থেকে।
তিনি ধীরে ধীরে তানভীরের দিকে তাকালেন।
তানভীরের হাতে ঠিক একই ঘড়ি।
তানভীর মুহূর্তে হাত নিচে নামিয়ে ফেলল।
ইয়াসিন ঠান্ডা হাসলেন।
“মজার ব্যাপার।”
তানভীর জোর করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
“স্যার, এটা কাকতালীয়ও হতে পারে।”
ইয়াসিন কিছু বললেন না।
কিন্তু তার মনে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে— তানভীরই সবকিছুর পেছনে।
অন্যদিকে বাড়িতে সুহাসিনী একা বসে ছিল। তার মাথার ভেতর পুরনো স্মৃতিগুলো ঘুরছে।
শালবনপুর গ্রামের সেই রাত।
অন্ধকার মাঠ।
সাংবাদিকের আতঙ্কিত চিৎকার।
আর জালালের হাতে রক্তমাখা ছুরি।
সুহাসিনী দুহাতে কান চেপে ধরল।
“না… না…”
ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নাম্বার।
সে দ্বিধায় পড়ে গেল। তারপর ধীরে কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কর্কশ কণ্ঠ।
জালাল।
“কেমন আছো সুহাসিনী?”
সুহাসিনীর বুক কেঁপে উঠল।
“কি চান?”
জালাল হেসে বলল,
“অনেক বড়লোক হয়ে গেছো দেখছি।”
“আমাকে আর ফোন দিবেন না।”
“দেব। কারণ খেলা এখনও শেষ হয়নি।”
সুহাসিনীর হাত কাঁপছিল।
“আপনি আমার জীবনটা কেন শেষ করতে চান?”
জালালের কণ্ঠ হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কারণ তুমি বেঁচে আছো।”
“মানে?”
“সেদিন তোকে মেরেও ফেলতে পারতাম। ভুল করেছি।”
সুহাসিনীর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
“আপনি… আপনি কী বলছেন?”
জালাল ধীরে ধীরে বলল,
“তুই যা দেখেছিস, সেটা যদি বাইরে যায় তাহলে শুধু আমি না… আরও অনেকের নাম বের হবে।”
“আমি কাউকে কিছু বলিনি।”
“কিন্তু এখন তুই ইয়াসিনের স্ত্রী। আর ও সত্য খুঁজতে শুরু করেছে।”
সুহাসিনী কাঁপা গলায় বলল,
“দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন।”
জালাল হেসে উঠল।
“এত সহজে?”
তারপর হঠাৎ কণ্ঠ বদলে গেল।
“তোর ভাই হামিম আজ কলেজে গেছে, তাই না?”
সুহাসিনীর শরীর জমে গেল।
“হামিমের নাম নেবেন না!”
“রাফি আজ স্কুলে যায়নি কেন?”
সুহাসিনীর চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে গেল।
“আপনি ওদের ফলো করছেন?”
জালাল ঠান্ডা গলায় বলল,
“তুই যদি মুখ খোলিস, আগে ওদের মরতে হবে।”
কল কেটে গেল।
সুহাসিনী ফোন ফেলে দিল মেঝেতে।
তার পুরো শরীর কাঁপছিল।
সে বুঝে গেল— জালাল শুধু ভয় দেখাচ্ছে না, সত্যিই কিছু করতে পারে।
হঠাৎ তার মাথায় একটাই চিন্তা এলো।
হামিম, রাফি আর লায়না বিপদে আছে।
সে দ্রুত নিজের রুমে গিয়ে আলমারি খুলল। ভেতর থেকে পুরনো একটা ব্যাগ বের করল।
তার চোখে পানি।
সে ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে ওদের কাছে যেতে হবে…”
ঠিক তখন রাহিমা খাতুন দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
“তুমি কোথাও যাচ্ছ?”
সুহাসিনী চমকে উঠল।
“আমি… আমি গ্রামে যাব।”
“এখন?”
“আমার ভাইবোনদের বিপদ।”
রাহিমা খাতুন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আজ প্রথমবার তিনি মেয়েটার ভেতরের অসহায়ত্ব স্পষ্ট দেখলেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “একলা যাবে?”
সুহাসিনী মাথা নিচু করল। “আমার যেতেই হবে।”
রাহিমা খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “ইয়াসিনকে জানিয়েছ?”
“না।”
“ও জানলে যেতে দেবে না।” সুহাসিনী চুপ।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রাহিমা খাতুন এমন একটা কাজ করলেন, যা সুহাসিনী কখনো কল্পনাও করেনি।
তিনি আলমারি থেকে কিছু টাকা এনে তার হাতে দিলেন।
“নাও।” সুহাসিনী হতবাক হয়ে তাকাল।
“এগুলো কেন?” “পথে লাগবে।”
“আপনি… আমাকে সাহায্য করছেন?”
রাহিমা খাতুন মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
“সব মা-ই সন্তানের ভয় বোঝে।”
সুহাসিনীর চোখ আবার ভিজে উঠল।
ঠিক তখন বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
ইয়াসিন ফিরে এসেছেন।
সুহাসিনীর বুক ধক করে উঠল।
সে জানে এখন যদি ইয়াসিন সব জানতে পারেন, তাহলে তাকে যেতে দেবেন না।
কিন্তু তার ভাইবোনদের বাঁচাতে হলে আজ রাতেই শালবনপুর যেতে হবে।
আর সে জানে না… এই যাত্রা তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর যাত্রা হতে যাচ্ছে। গাড়ির শব্দ ধীরে ধীরে থেমে গেল।
মিস্টার ইয়াসিন বাড়ির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।
তার মুখে ক্লান্তি, চোখে অস্থিরতা, আর মস্তিষ্কে একের পর এক প্রশ্নের চাপ।
অফিসে ঘটে যাওয়া কেলেঙ্কারি, তানভীরের সন্দেহজনক আচরণ, জালালের হুমকি—সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন এখন এক অস্থির সমুদ্রে ভাসছে।
তিনি ভেতরে ঢুকতেই প্রথমেই চোখ গেল সুহাসিনীর দিকে।
সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে একটা ব্যাগ।
চোখে ভয় আর সিদ্ধান্তের অদ্ভুত মিশ্রণ।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বললেন,
“তুমি কোথাও যাচ্ছ?”
সুহাসিনী চমকে উঠল।
তার ঠোঁট কাঁপল।
“জি… আমি…”
ইয়াসিন একটু এগিয়ে এসে বললেন,
“কোথায়?”
সুহাসিনী চোখ নামিয়ে নিল।
“গ্রামে…”
এই শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসিনের ভেতরে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।
তিনি ধীরে গলায় বললেন,
“এখন কেন?”
সুহাসিনী কিছু বলল না।
রাহিমা খাতুন পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন।
তিনি হালকা কাশলেন।
“ওর ভাইবোনদের জন্য চিন্তা করছে।”
ইয়াসিন এবার পুরোপুরি থমকে গেলেন।
“হামিম, রাফি, লায়না?”
সুহাসিনী মাথা নেড়ে বলল,
“ওদের বিপদ হতে পারে।”
ইয়াসিনের চোখে সন্দেহ জমে উঠল।
“কে বলেছে?”
সুহাসিনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“জালাল।”
এই নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
তার চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“ও আবার তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে?”
সুহাসিনী মাথা নেড়ে বলল।
“সে বলেছে… আমি যদি মুখ খুলি তাহলে ওরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তে ভারী হয়ে গেল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে ব্যাগের দিকে তাকালেন।
“তুমি একা যাবে না।”
সুহাসিনী সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আমাকে যেতেই হবে।”
“না।”
“আপনি বুঝছেন না…”
ইয়াসিন কণ্ঠ আরও কঠিন করলেন।
“আমি সব বুঝছি।”
তিনি একটু থামলেন।
তারপর বললেন,
“তুমি কোথাও যাবে না।”
এই কথাটা এত দৃঢ় ছিল যে সুহাসিনী কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে গেল।
কিন্তু তার চোখে ভয় কমল না।
বরং আরও বাড়ল।
কারণ সে জানে, এখন দেরি করলে তার ভাইবোনদের কিছু হয়ে যেতে পারে।
ঠিক তখন রাহিমা খাতুন ধীরে ধীরে বললেন,
“মেয়েটাকে যেতে দাও।”
ইয়াসিন চমকে তাকালেন।
“মা?”
রাহিমা খাতুন শান্ত গলায় বললেন,
“যদি সত্যিই ওদের বিপদ হয়, তাহলে না যাওয়া ঠিক হবে না।”
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তার মাথার ভেতরে যুদ্ধ চলছে।
একদিকে যুক্তি বলছে এটা ফাঁদ হতে পারে।
অন্যদিকে হৃদয় বলছে— সুহাসিনীর ভয় মিথ্যা না।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি তোমার সঙ্গে যাব।”
সুহাসিনী চমকে উঠল।
“না… আপনি যাবেন না।”
“এটা আলোচনা না।”
তার কণ্ঠ এবার দৃঢ়।
“আমি যাব।”
এই সিদ্ধান্তটা যেন পুরো ঘরের পরিবেশ বদলে দিল।
অল্প সময়ের মধ্যেই ইয়াসিন প্রস্তুতি নিয়ে ফেললেন।
গাড়ি বের করা হলো।
ড্রাইভার পিছনে বসে আছে।
সুহাসিনী সামনের সিটে, চোখে অশ্রু আর উদ্বেগ।
ইয়াসিন ড্রাইভিং সিটে বসে গভীরভাবে সামনে তাকিয়ে আছেন।
গাড়ি যখন ঢাকা শহর ছাড়িয়ে গ্রামের রাস্তায় উঠল, তখন চারপাশের আলো কমতে শুরু করল।
রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
চারদিকে শুধু অন্ধকার আর বাতাসের শব্দ।
সুহাসিনী জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
তার হাত কাঁপছে।
ইয়াসিন একবার তার দিকে তাকালেন।
“ভয় পাচ্ছ?”
সে মাথা নেড়ে বলল,
“অনেক।”
“আমি আছি।”
এই কথাটা শুনে সে একটু চুপ হয়ে গেল।
কিন্তু তার ভেতরের ভয় পুরোপুরি যায়নি।
কারণ সে জানে— শালবনপুর শুধু একটা গ্রাম না।
ওখানে তার অতীত লুকিয়ে আছে।
আর সেই অতীত এবার তাকে গ্রাস করতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে শহরে, একটি অন্ধকার অফিস রুমে তানভীর বসে আছে।
তার সামনে ল্যাপটপ খোলা।
স্ক্রিনে ইয়াসিনের গাড়ির লাইভ ট্র্যাকিং।
সে হালকা হাসল।
“তুমি ঠিক জায়গায় যাচ্ছ, ইয়াসিন।”
তার পাশে একজন লোক দাঁড়িয়ে।
লোকটা বলল,
“ওরা সত্যিই সেখানে যাচ্ছে?”
তানভীর বলল,
“হ্যাঁ।”
“আর সুহাসিনী?”
তানভীর চোখ সরু করে বলল,
“সে-ই তো মূল চাবি।”
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“আজ রাতেই সব শেষ হবে।”
অন্যদিকে গাড়ি চলছে অন্ধকার রাস্তা ধরে।
বৃষ্টি শুরু হয়েছে হালকা হালকা।
গাড়ির ওয়াইপার বারবার কাঁচ পরিষ্কার করছে।
রাস্তার পাশে ঝাপসা গাছপালা দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ সুহাসিনী ফিসফিস করে বলল,
“আমরা ভুল করছি…”
ইয়াসিন তাকালেন।
“কেন?”
“জালাল কখনো একা কাজ করে না।”
এই কথাটা শুনে ইয়াসিনের চোখ একটু সরু হলো।
“মানে?”
“তার পিছনে বড় কেউ আছে।”
ইয়াসিন গভীরভাবে সামনে তাকালেন।
“কে?”
সুহাসিনী চুপ।
তার চোখে ভয় আরও গভীর।
“আমি জানি না।”
কিন্তু তার কণ্ঠে নিশ্চিত ভয় ছিল।
হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল।
ড্রাইভার বলল,
“স্যার, সামনে রাস্তা ব্লক।”
ইয়াসিন সামনে তাকালেন।
রাস্তার মাঝখানে কয়েকটা গাছ ফেলে রাখা হয়েছে।
চারদিকে অন্ধকার।
কোনো আলো নেই।
সুহাসিনী কাঁপতে শুরু করল।
“না… এটা ফাঁদ…”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে দরজা খুললেন।
তিনি নিচে নামলেন।
চারপাশে নিস্তব্ধতা।
শুধু বাতাসের শব্দ।
তিনি সামনে কয়েক কদম এগোলেন।
হঠাৎ পেছন থেকে একটি শব্দ—
“স্বাগতম, সিইও সাহেব।”
ইয়াসিন ঘুরে তাকালেন।
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো জালাল।
তার মুখে সেই ভয়ংকর হাসি।
তার হাতে কয়েকজন লোক।
সবাই অস্ত্রধারী।
সুহাসিনী গাড়ির ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠল,
“ইয়াসিন!”
ইয়াসিন হাত তুলে তাকে থামতে ইশারা করলেন।
তার চোখ স্থির।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
“তুমি চাও কী?”
জালাল হাসল।
“তোমাকে না।”
সে ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে তাকাল।
“আমি তাকে চাই।”
সুহাসিনী কেঁপে উঠল।
ইয়াসিন এক ধাপ এগোলেন।
“তার কাছে আসার আগে আমাকে পার হতে হবে।”
জালাল হেসে বলল,
“তুমি তো শুধু খেলোয়াড়, ইয়াসিন।”
“খেলা আমি শুরু করিনি।”
অন্ধকার থেকে আরেকটি গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
গাড়ি থামল।
দরজা খুলল।
আর সেই গাড়ি থেকে নামল তানভীর।
সুহাসিনী স্তব্ধ।
ইয়াসিনের চোখ সরু হয়ে গেল।
সব পরিষ্কার হয়ে গেল।
এই খেলাটা শুধু জালালের না।
এটা অনেক বড় পরিকল্পনা।
তানভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
“স্যার… আপনি অনেক দূর চলে এসেছেন।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“তুমি?”
তানভীর হালকা হাসল।
“আমি শুধু ফিনিশিং দিচ্ছি।”
সুহাসিনী গাড়ির ভেতরে কাঁপছে।
তার অতীত, তার ভয়, তার সত্য—সব একসাথে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
জালাল বলল,
“আজ রাতেই সব হিসাব শেষ।”
তানভীর যোগ করল,
“আর কোম্পানিও।”
ইয়াসিন একা দাঁড়িয়ে।
চারদিকে শত্রু।
কিন্তু তার চোখে ভয় নেই।
শুধু দৃঢ়তা।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“তোমরা ভুল জায়গায় খেলতে এসেছ।”
তানভীর হেসে বলল,
“তাহলে দেখাই না কে জেতে।”
চারদিকে অস্ত্র উঁচু হলো। রাত আরও গভীর হলো। আর সেই মুহূর্তে শুরু হলো সবচেয়ে বড় সত্যের যুদ্ধ। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তে।
বৃষ্টির ফোঁটা গাছের পাতায় পড়ছে, দূরে কোথাও কুকুরের ডাকে রাত আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে।
রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মিস্টার ইয়াসিন।
এক পাশে অস্ত্রধারী জালাল ও তার লোকজন।
আর অন্য পাশে তানভীর—যার মুখে এখন আর কোনো মুখোশ নেই।
সুহাসিনী গাড়ির ভেতর বসে কাঁপছে।
তার চোখে শুধু ভয় না, অপরাধবোধও।
কারণ তার অতীতই আজ তার বর্তমানকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে সামনে তাকালেন।
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভয়ংকর দৃঢ়।
“তানভীর… তুমি আমার কোম্পানির ডিরেক্টর ছিলে। কেন?”
তানভীর হালকা হাসল।
“কারণ তুমি সবসময় সবার ওপর ভরসা করো, ইয়াসিন।”
“আর সেই ভরসাটাই তোমার দুর্বলতা।”
জালাল পাশ থেকে হেসে উঠল।
“আমি তো শুধু কাজটা করেছি।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“তোমরা দুজন একসাথে?”
তানভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“শুধু আমি আর জালাল না… আরও অনেকে আছে।”
এই কথাটা শুনে সুহাসিনীর শরীর কেঁপে উঠল।
তার মনে একটা পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠল—
শালবনপুরের সেই রাত।
অন্ধকার ঘর।
চেয়ারম্যানের হাসি।
আর একদল লোক যারা সত্য লুকিয়ে রেখেছিল।
সে হঠাৎ গাড়ির দরজা খুলে নিচে নেমে এলো।
“থামুন!”
সবাই তাকাল।
সুহাসিনী কাঁপা গলায় বলল,
“আপনারা আমাকে নিয়ে যা খুশি করুন… কিন্তু ওকে ছেড়ে দিন।”
ইয়াসিন দ্রুত তার দিকে ফিরলেন।
“না, তুমি এখানে আসবে না।”
কিন্তু সুহাসিনী এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“সব আমার জন্য শুরু হয়েছে।”
তানভীর মুচকি হাসল।
“না সুহাসিনী… তুমি শুধু চাবি।”
“মানে?”
তানভীর ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি সেই একমাত্র সাক্ষী, যে দেখেছিল আসল খুনটা।”
জালাল ধীরে ধীরে বলল,
“আর আজ তুমি যদি কথা বলো… তাহলে চেয়ারম্যান, পুলিশ… সবাই শেষ।”
ইয়াসিন এক ধাপ এগোলেন।
“তাহলে সত্যটা কী?”
তানভীর চুপ করে গেল কয়েক সেকেন্ড।
তারপর বলল,
“সেই সাংবাদিক শুধু খুন হয়নি…”
“সে সরকারের একটা বড় দুর্নীতির ফাইল বহন করছিল।”
“আর সেই ফাইলের মধ্যে ছিল আমাদের নাম।”
বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল।
তানভীর আবার বলল,
“তাই তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। আর দায় চাপানো হয়েছিল জালালের ওপর।”
জালাল হেসে বলল,
“আমি শুধু বলির পাঁঠা।”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
“তাহলে এখন কী চাও?”
তানভীরের চোখ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তোমার সব সম্পত্তি।”
“আর সুহাসিনীকে আমাদের কাছে দিতে হবে।”
এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসিনের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“তুমি ভুল মানুষ বেছে নিয়েছ।”
তানভীর হাত তুলল।
“তাহলে শেষ করি?”
ঠিক তখন হঠাৎ পেছন থেকে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল।
সবাই থমকে গেল।
দূরে পুলিশের গাড়ি।
লাল আলো ঝলমল করছে।
জালাল চিৎকার করে উঠল,
“কে খবর দিল?!”
তানভীরের মুখে প্রথমবার অস্থিরতা দেখা গেল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি শুধু ব্যবসায়ী না… আমি প্রস্তুতও।”
গাড়ি থামল।
ডজনখানেক পুলিশ নেমে এলো।
সাথে একজন সিনিয়র অফিসার।
তিনি সামনে এসে বললেন,
“তানভীর রহমান, জালাল মিয়া… তোমরা সবাই ঘিরে আছো।”
তানভীর দাঁত চেপে বলল,
“তুমি আগে থেকে জানো?”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন,
“আমি সন্দেহ করেছিলাম।”
“তাই আইনজীবীর মাধ্যমে সব ট্র্যাক করেছি।”
জালাল পেছনে সরে যেতে লাগল।
“না… এটা হতে পারে না…”
পুলিশ এগিয়ে এলো।
হঠাৎ জালাল অস্ত্র তুলে ধরল।
“কেউ সামনে আসবে না!”
সবাই থমকে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সুহাসিনী সামনে এগিয়ে গেল।
“থামো!”
জালাল অবাক হয়ে তাকাল।
সুহাসিনী কাঁপা গলায় বলল,
“তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পারো… কিন্তু সত্য লুকাতে পারবে না।”
তার চোখে এবার ভয় নেই।
শুধু সাহস।
তানভীর চিৎকার করে বলল,
“থামাও ওকে!”
কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
কারণ পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে।
হঠাৎ গুলির শব্দ।
একটা বিশৃঙ্খলা।
সবাই ছুটে যাচ্ছে।
ধোঁয়া, বৃষ্টি, চিৎকার।
ইয়াসিন সুহাসিনীকে টেনে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেলেন।
“চোখ বন্ধ করো!”
কিছুক্ষণ পর সব থেমে গেল।
জালাল ধরা পড়েছে।
তানভীরও।
রাতের অন্ধকারে সত্য ধীরে ধীরে বের হয়ে এলো।
পরদিন সকাল।
ঢাকার বড় মিডিয়া হেডলাইন—
“বড় দুর্নীতি চক্রের পর্দা ফাঁস”
“ব্যবসায়ী সিইওর সাহসিকতায় ধরা পড়ল অপরাধীরা”
অফিসের সবাই স্তব্ধ।
যারা তাকে সন্দেহ করেছিল, তারা এখন চুপ।
অন্যদিকে বাড়িতে শান্ত পরিবেশ।
সুহাসিনী বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
সকাল সূর্যের আলো তার মুখে পড়ছে।
ইয়াসিন এসে পাশে দাঁড়ালেন।
“এখন ভয় নেই।”
সুহাসিনী ধীরে ধীরে বলল,
“আমি কখনো ভাবিনি সত্য বের হবে।”
ইয়াসিন তার দিকে তাকালেন।
“তুমি সাহস না দেখালে কিছুই সম্ভব হতো না।”
একটু নীরবতা।
তারপর সুহাসিনী বলল,
“আমি কি সত্যিই আপনার জীবনের অংশ হতে পারব?”
ইয়াসিন হালকা হাসলেন।
“তুমি তো আগেই হয়েছ।”
সে চোখ নামাল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“কিন্তু সমাজ…”
ইয়াসিন থামিয়ে দিলেন।
“সমাজ না… তুমি আর আমি ঠিক করব।”
সুহাসিনী চোখ ভিজে গেল।
কিন্তু এবার সেটা কষ্টের না।
শান্তির।
কিছুদিন পর।
বাড়িতে ছোট্ট অনুষ্ঠান।
হামিম, রাফি, লায়না এসেছে।
তাদের হাসি পুরো বাড়ি ভরে দিয়েছে।
রাহিমা খাতুন এবার নিজে এসে সুহাসিনীর পাশে দাঁড়ালেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“আমি ভুল বুঝেছিলাম।”
এই কথাটা শুনে সুহাসিনী চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নত করল।
“সব ঠিক আছে।”
ইয়াসিন দূর থেকে তাকিয়ে হাসলেন।
জীবনে প্রথমবার তার ঘর সত্যিকারের শান্ত।
শেষ দৃশ্য।
শহরের আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।
ইয়াসিন আর সুহাসিনী একসাথে দাঁড়িয়ে আছে।
বাতাসে হালকা ছোঁয়া।
কোনো ভয় নেই।
কোনো গুজব নেই।
শুধু সত্য।
ইয়াসিন ধীরে বললেন,
“জীবন কখনো সহজ ছিল না।”
সুহাসিনী তাকাল। কিন্তু এখন? তিনি হাসলেন। এখন শুরু হয়েছে। ক্যামেরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। শেষ হয় একটি গল্প গুজব দিয়ে শুরু, সত্য দিয়ে শেষ।
সমাপ্ত
....