আমার স্বামী মিস্টার ইয়াসিন আমার একমাত্র ভালো শাড়িটা পুড়িয়ে দিয়েছিল, যাতে আমি তার প্রমোশন পার্টিতে যেতে না পারি। সে আমাকে ‘লজ্জার কারণ’ বলেছিল। কিন্তু যখন সেই রিসোর্টের দরজা খুলল।
আমি এমনভাবে উপস্থিত হলাম যা আমার স্বামী কখনো কল্পনাও করেনি…কিন্তু সেই রাতটাই তার পুরো দুনিয়াকে ধ্বংস করে দিল।
ইয়াসিন আর আমি সাত বছর ধরে বিবাহিত। এই সাত বছরে আমিই আমাদের সংসারটা টেনে নিয়েছি।
আমি একাধিক টিউশনি করেছি, নিজের গয়না বিক্রি করেছি, সবকিছু ত্যাগ করেছি শুধু যাতে সে তার পড়াশোনা শেষ করতে পারে এবং চট্টগ্রামের বড় কোম্পানি “ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশন”-এ একটা ভালো পদ পায়।
আজকের রাতটা ছিল তার জন্য বিশেষ। সে সদ্য অপারেশনস ডিপার্টমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছে।
আমি কয়েক মাস ধরে টাকা জমিয়ে একটা সাধারণ নীল শাড়ি কিনেছিলাম, যেন আমি গর্বের সঙ্গে তার পাশে দাঁড়াতে পারি।
কিন্তু বের হওয়ার ঠিক এক ঘণ্টা আগে, আমি পেছনের উঠান থেকে পোড়া গন্ধ পেলাম।
আমি দৌড়ে বাইরে গেলাম আর থমকে দাঁড়ালাম।
ইয়াসিন তার কালো স্যুট পরে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে কেরোসিন। আমার শাড়িটা একটা লোহার চুলার ওপর, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
“ইয়াসিন?! তুমি কী করছো?!”
আমি চিৎকার করে সামনে এগোতেই, সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
“কিছু করার নেই,” সে ঠান্ডা গলায় বলল। “এটা আবর্জনা। ঠিক তোমার মতোই।”
আমার হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। “তুমি এটা করলে কেন? আমি এখন কীভাবে তোমার সঙ্গে যাব?”
সে আমাকে অবজ্ঞার চোখে দেখল। “ঠিক সেটাই তো চাই। তুমি যাচ্ছ না। নিজের দিকে তাকাও এই হাত, এই অবস্থা, এই পোশাক। আমি এখন কোম্পানির ম্যানেজা।
আমার একটা স্ট্যাটাস আছে। তোমাকে আর আমার সঙ্গে মানায় না।”
আমি কাঁপছিলাম, চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল।
“আমি তোমাকে এখানে পৌঁছাতে সাহায্য করেছি… যখন তোমার কিছুই ছিল না, আমি তোমার পাশে ছিলাম…”
সে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“আমি কি তোমাকে খাওয়াই না? বাসায় রাখি না? এটাই অনেক। আজকের পার্টিতে আমি সাদিয়া খানকে নিয়ে যাচ্ছি এমডি স্যারের মেয়ে।
সে আমার লেভেলের।” আমার বুক কেঁপে উঠল।
“তুমি… অন্য কাউকে নিয়ে যাচ্ছ?”
“হ্যাঁ,” সে নির্লজ্জভাবে বলল।
“আর তুমি যদি সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করো, সিকিউরিটি তোমাকে বের করে দেবে।”
এই বলে সে আমাকে সেখানেই রেখে চলে গেল…আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, আমার শাড়িটা ধীরে ধীরে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তখন আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেল।
দুঃখটা মিলিয়ে গেল। তার জায়গায় এল এক ঠান্ডা, কঠোর অনুভূতি। ইয়াসিন ভাবত, আমি কিছুই না।
সে জানতই না…
যে “ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশন”—যে সাম্রাজ্যকে সে নিজের গর্ব মনে করে—সেটা আসলে আমার পরিবারের।
আমার নাম তামান্না রহমান। আমি সেই কোম্পানির একমাত্র উত্তরাধিকারী… এবং গোপন চেয়ারম্যান।
সাত বছর আগে, আমি সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজতে সবকিছু ছেড়ে দিয়েছিলাম।
আমি সাধারণ জীবন বেছে নিয়েছিলাম, তাকে সমর্থন করেছিলাম দেখতে চেয়েছিলাম, সে কি আমাকে আমার সত্যিকারের পরিচয়ের জন্য ভালোবাসবে।
সে ব্যর্থ হয়েছে। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম, চোখের পানি মুছে ফেললাম, আর ফোনটা হাতে নিলাম।
“আরিফ চৌধুরী।” ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল
“ম্যাডাম… আপনি কি আজ রাতের অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত?” “হ্যাঁ,” আমি ঠান্ডা গলায় বললাম।
“টিমকে পাঠান। আমার ডিজাইনার শাড়ি আর ডায়মন্ড সেট প্রস্তুত করুন।
আজ রাতে সেই পার্টিতে … আমি একজন রানীর মতো প্রবেশ করব। ইয়াসিন যখন রিসোর্টের দিকে রওনা দিল, তখন সে ভাবছিল আজকের রাতটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের রাত হতে যাচ্ছে।
তার চোখে ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষার নেশা, আর পাশে বসে থাকা সাদিয়া খান ছিল সেই নেশারই একটি “স্ট্যাটাস সিম্বল”।
সে বারবার আয়নায় নিজের স্যুট ঠিক করছিল, নিজের ফোনে সহকর্মীদের মেসেজ দেখছিল, আর মনে মনে নিজেকে অভিনন্দন দিচ্ছিল।
কিন্তু সে জানত না, এই একই রাত তার জীবনের সবচেয়ে বড় পতনের শুরু হতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, তামান্না রহমান নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে ছিল নিঃশব্দে। পোড়া শাড়িটার ছাই এখনো তার চোখে ভাসছিল, কিন্তু সেই চোখে আর কোনো দুর্বলতা ছিল না।
যে নারী কয়েক মিনিট আগেও ভেঙে পড়েছিল, সে এখন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ। তার ভেতরের দীর্ঘ সাত বছরের কষ্ট যেন এক মুহূর্তে বরফে পরিণত হয়েছে।
একজন সহকারী তার জন্য প্রস্তুত করা গাড়ি নিয়ে দরজার সামনে অপেক্ষা করছিল।
কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি, কিন্তু আজ সেটাও যেন তার ব্যক্তিত্বের সামনে সাধারণ লাগছিল।
সে ধীরে ধীরে নিচে নামল। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে তার অতীতের স্মৃতি ভেসে উঠছিল।
এই একই সিঁড়ি বেয়ে সে কত রাত ইয়াসিনের জন্য অপেক্ষা করেছে, কতবার নিজের খাবার কম খেয়ে তাকে খাইয়েছে, কত স্বপ্ন একসাথে বুনেছিল।
কিন্তু এখন সেই স্বপ্নের কোনো অস্তিত্ব নেই, শুধু বাস্তব আছে। গাড়িতে বসার আগে সে একবার আকাশের দিকে তাকাল। চোখে কোনো কান্না ছিল না, শুধু স্থিরতা।
গাড়ি যখন চলতে শুরু করল, তার ফোনে আরিফ চৌধুরীর কল আবার এল।
“ম্যাডাম, সব প্রস্তুত। পুরো বোর্ড মিটিং, ভিআইপি অতিথি, মিডিয়া সবাই উপস্থিত। আজ আপনি আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে সামনে আসবেন।”
তামান্না শান্ত গলায় বলল, “কেউ যেন আগে থেকে টের না পায় আমি কে।” “জি ম্যাডাম।” ফোন কেটে গেল।
রিসোর্টের দিকে যেতে যেতে শহরের আলোগুলো জানালার বাইরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু তামান্নার ভেতরের পৃথিবী একদম পরিষ্কার ছিল। সে জানত আজ শুধু নিজের পরিচয় প্রকাশ নয়, বরং একটা মানুষকে তার আসল মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।
যে মানুষ তাকে “লজ্জা” বলেছিল, আজ সেই মানুষই তার সামনে মাথা নিচু করবে।
রিসোর্টে পৌঁছে তখন বিশাল আয়োজন চলছে। লাল কার্পেট, ঝলমলে আলো, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, মিডিয়া প্রতিনিধি—সবাই সেখানে উপস্থিত।
“ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশন”-এর এই প্রমোশন পার্টি ছিল বছরের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান।
ইয়াসিন ভেতরে দাঁড়িয়ে হাসছিল। তার হাতের গ্লাসে দামি পানীয়, পাশে সাদিয়া খান, আর চারপাশে প্রশংসার ভিড়।
“ভাইস প্রেসিডেন্ট সাহেব, অভিনন্দন!” সবাই একে একে এসে বলছিল। ইয়াসিন হাসি মুখে সেগুলো গ্রহণ করছিল, কিন্তু তার চোখ বারবার দরজার দিকে যাচ্ছিল।
কোথাও তার স্ত্রীকে সে দেখতে পাচ্ছিল না, আর সেটাতে তার ভেতরে এক ধরনের বিরক্তি কাজ করছিল।
সে মনে মনে ভাবছিল, “ভালোই হয়েছে। ও এলে শুধু আমাকে লজ্জায় ফেলত।”
ঠিক তখনই হঠাৎ মেইন হলের দরজা খুলে গেল। একটা নীরবতা যেন পুরো রুমে নেমে এল।
প্রথমে কেউ খেয়াল করল না। তারপর ধীরে ধীরে সব চোখ সেদিকে গেল।
একজন নারী প্রবেশ করল। তার পরনে ছিল সাদা ও সোনালি কারুকাজ করা ডিজাইনার শাড়ি, গলায় হালকা ঝলমলে ডায়মন্ড, চুল খোলা কিন্তু পরিপাটি, আর তার হাঁটার ভঙ্গিতে ছিল এমন এক আত্মবিশ্বাস যা পুরো রুমের বাতাস বদলে দিল। ইয়াসিন প্রথমে বুঝতেই পারল না।
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্তি। এই নারী কে?
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার শরীর জমে গেল।
এটা… তামান্না।
তার স্ত্রী।
না, শুধু স্ত্রী না—একজন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ।
সাদিয়া খানও বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
ইয়াসিন দ্রুত এগিয়ে এল, মুখে জোর করে হাসি এনে বলল, “তুমি এখানে কীভাবে এলে? আমি তো বলেছিলাম”
তামান্না তাকে থামিয়ে দিল। একটা শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
“তুমি বলেছিলে আমি লজ্জার কারণ?” তার কণ্ঠ এতটাই স্থির ছিল যে আশেপাশের মানুষও চুপ হয়ে গেল।
ইয়াসিন একটু হেসে বলল, “তুমি ভুল জায়গায় চলে এসেছ। এটা প্রাইভেট পার্টি।”
তামান্না ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। “প্রাইভেট?” সে হালকা হাসল।
“ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের ইভেন্টকে তুমি প্রাইভেট বলছ?”
ইয়াসিন থমকে গেল। “তুমি… তুমি কীভাবে নাম জানো?”
ঠিক তখনই আরিফ চৌধুরী সামনে এগিয়ে এলেন।
পুরো হল নীরব। তিনি বললেন, “ম্যাডাম, সবাই অপেক্ষা করছে।” ইয়াসিন অবাক হয়ে তাকাল।
“ম্যাডাম? কোন ম্যাডাম?”
আরিফ তার দিকে একবার তাকালেন, তারপর শান্তভাবে বললেন, “ইনট্রোডিউসিং… মিস তামান্না রহমান।
ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের একমাত্র উত্তরাধিকারী এবং বর্তমান চেয়ারম্যান।”
পুরো হল যেন হঠাৎ থমকে গেল। গ্লাসের শব্দ বন্ধ, হাসি থেমে গেল, এমনকি সঙ্গীতও যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল।
ইয়াসিনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। “না… এটা মিথ্যা… তুমি মিথ্যা বলছো।” তামান্না ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।
প্রতিটা পদক্ষেপ যেন তার অতীতের প্রতিশোধের শব্দ।
“মিথ্যা?” সে নরম গলায় বলল।
“তুমি আমাকে আবর্জনা বলেছিলে, তাই না?”
ইয়াসিন পিছিয়ে গেল।
“তুমি… তুমি আগে বলোনি কেন?”
তামান্না তার সামনে থেমে গেল। তার চোখে এবার কোনো আবেগ নেই।
“আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে ভালোবাসো… নাকি আমার পরিচয়কে।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর সে আবার বলল, “আর তুমি তোমার উত্তরটা আমাকে আগেই দিয়ে দিয়েছো।”
ইয়াসিনের গলা শুকিয়ে গেল। সাদিয়া খান ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল। পুরো রুমে এখন শুধু একটা সত্য ভাসছে একজন মানুষ নিজের লোভে, নিজের অহংকারে, নিজের অন্ধত্বে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে।
তামান্না পেছনে ঘুরে বোর্ড সদস্যদের দিকে তাকাল।
“আজ থেকে কিছু পরিবর্তন হবে।” তার কণ্ঠে কোনো কাঁপন নেই। শুধু সিদ্ধান্ত আছে।
আর সেই সিদ্ধান্তই ইয়াসিনের পুরো পৃথিবী ভেঙে দিতে শুরু করল। তামান্নার কথাটা শেষ হতেই পুরো হলরুমে যেন একটা অদৃশ্য ভার নেমে এল। বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল, মানুষগুলোর মুখে যে হাসি ছিল তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিল বিস্ময় আর অস্বস্তি।
ইয়াসিন এখনো বিশ্বাস করতে পারছিল না সে কী শুনেছে। তার মাথার ভেতর শুধু একটা বাক্য ঘুরছিল ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের একমাত্র উত্তরাধিকারী এবং বর্তমান চেয়ারম্যান। এই কথাটা যেন তার বোধশক্তিকে বারবার আঘাত করছিল।
যে নারীকে সে এতক্ষণ নিজের থেকে ছোট, সাধারণ, এবং তুচ্ছ ভেবেছিল, সেই নারীই আসলে তার পুরো ক্যারিয়ারের মালিক। ইয়াসিন ধীরে ধীরে এক ধাপ পিছিয়ে গেল। তার মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখে ঘাম জমে উঠছে।
তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস, যেটা কয়েক মিনিট আগেও তাকে আকাশে ভাসাচ্ছিল, সেটা এখন মাটিতে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।
সে কাঁপা কণ্ঠে বলল, তুমি মজা করছো না তো?
এটা কোনো নাটক? তুমি এত বড় কিছু হলে আমি জানতাম না কেন? তামান্না তার দিকে সরাসরি তাকাল।
তার চোখে এখন কোনো আবেগ নেই, শুধু স্থিরতা আর এক ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ছায়া।
তুমি জানার দরকার ছিল না, সে শান্ত গলায় বলল। কারণ আমি তোমাকে আমার পরিচয় দিয়ে ভালোবাসা পরীক্ষা করিনি। আমি তোমাকে আমার মানুষ হিসেবে পরীক্ষা করেছি। এই কথাটা ইয়াসিনের বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করল। তার মনে পড়ল সেই সাত বছর।
সেই সময়গুলো যখন তামান্না নিজের গয়না বিক্রি করেছিল, টিউশনি করে তার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছিল, যখন সে নতুন চাকরি পাওয়ার পরও নিজের বেতন দিয়ে সংসার চালিয়েছিল। তখন সে কখনো জানতে পারেনি, এই সবকিছুর পেছনে থাকা মানুষটা আসলে কে।
কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, সে শুধু একজন স্ত্রীকে না, পুরো একটা সাম্রাজ্যকে অপমান করেছে।
সাদিয়া খান একটু পিছিয়ে গেল। তার মুখেও এখন আর আগের সেই আত্মবিশ্বাস নেই।
সে ধীরে ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকাল, যেন বুঝতে চাইছে সে সত্যিই ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছে কিনা।
ইয়াসিনের গলা শুকিয়ে আসছিল। সে তাড়াহুড়ো করে বলল, তুমি যদি সত্যিই চেয়ারম্যান হও, তাহলে তুমি আমাকে আগে বললে পারতে।
আমি তো তোমার স্বামী। তামান্না একটু হেসে ফেলল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না।
স্বামী? সে ধীরে ধীরে বলল। তুমি যেদিন আমার শাড়িটা পুড়িয়ে দিলে, সেদিন তুমি শুধু একটা শাড়ি পোড়াওনি।
তুমি আমার প্রতি তোমার সম্মান পুড়িয়ে দিয়েছো।
তার কণ্ঠে এবার একটু কঠোরতা যোগ হলো।
আর তুমি যেদিন আমাকে ‘লজ্জার কারণ’ বলেছিলে, সেদিন তুমি নিজের ভবিষ্যৎকেই লজ্জার মধ্যে ফেলেছিলে।
পুরো হলরুমে কেউ কিছু বলছে না।
সবাই যেন শ্বাস ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় ব্যবসায়ী, বোর্ড মেম্বার, মিডিয়া—সবাই এখন এই মুহূর্তের সাক্ষী।
ইয়াসিনের হাত কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে, তার ক্যারিয়ার, তার পদ, তার এই রাতের সাফল্য সবকিছু এখন এক কথায় ভেঙে যেতে পারে।
সে তাড়াহুড়ো করে সামনে এগিয়ে এল।
তামান্নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি এটা করতে পারো না। আমি কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট।
আমি এত বছর পরিশ্রম করেছি।
তামান্না তার দিকে তাকিয়ে বলল, পরিশ্রম তুমি করেছো, সেটা আমি অস্বীকার করছি না।
কিন্তু তুমি যেটা ভুলে গেছো, সেটা হলো এই জায়গা তৈরি হওয়ার পেছনে তুমি একা নও।
সে একটু থামল। আর সবচেয়ে বড় কথা, তুমি যেটা ভুলে গেছো সেটা হলো, তুমি যাকে অপমান করছিলে, সে তোমার বস ছিল। এই কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরিফ চৌধুরী সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার হাতে একটি ফাইল ছিল।
ম্যাডাম, বোর্ডের অনুমোদনের কাগজ প্রস্তুত।
আজ থেকেই নতুন পরিবর্তন কার্যকর হবে।
ইয়াসিন দ্রুত তার দিকে তাকাল। তার ভেতরে ভয় ঢুকে গেছে। কোন পরিবর্তন? সে কাঁপা গলায় বলল। আরিফ শান্তভাবে বললেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তন।
এই কথাটা শুনে ইয়াসিনের পা প্রায় কেঁপে উঠল।
তামান্না এবার ধীরে ধীরে বলল, তুমি আজ থেকে এই পদে থাকবে না। এক মুহূর্তে পুরো দুনিয়া থেমে গেল যেন।
ইয়াসিন অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল। তুমি আমাকে বরখাস্ত করতে পারো না। আমি কোম্পানির জন্য এত কিছু করেছি।
তামান্না একটু মাথা নেড়ে বলল, তুমি কোম্পানির জন্য কাজ করেছো, এটা সত্য।
কিন্তু তুমি কোম্পানির মূল্যবোধের জন্য কাজ করোনি।
সে একটু এগিয়ে এসে বলল, তুমি একজন কর্মী হিসেবে ভালো হতে পারো, কিন্তু একজন নেতা হিসেবে তুমি ব্যর্থ।
কারণ তুমি মানুষ চিনতে পারো না, আর মানুষকে সম্মান দিতে পারো না। এই কথাটা যেন শেষ পেরেক ঠুকে দিল।
ইয়াসিনের চোখে পানি এসে গেছে, কিন্তু সেটা দুর্বলতার পানি, অনুতাপের পানি।
সে হঠাৎ নরম হয়ে বলল, তামান্না, প্লিজ এটা করো না।
আমি ভুল করেছি। আমি বুঝতে পারিনি তুমি কে। আমি শুধু রাগের মাথায়… তামান্না তাকে থামিয়ে দিল।
তুমি রাগের মাথায় আমার শাড়ি পোড়াওনি, তুমি তোমার আসল চরিত্র দেখিয়েছো। তার কণ্ঠ এখন আরও শান্ত, আরও নির্দয়।
আর আমি সেই চরিত্রের সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না।
এই কথাটা বলার পর সে পাশ ঘুরে বোর্ড মেম্বারদের দিকে তাকাল।
আজ থেকে কোম্পানির নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেওয়া হবে। আর ইন্টারনাল রিভিউ শুরু হবে।
পুরো হল আবার নীরব। ইয়াসিন যেন বুঝে গেল তার জীবনের সবচেয়ে বড় পতন শুরু হয়ে গেছে। সে যেটা কখনো ভাবেনি, সেটাই এখন বাস্তব।
সে পিছিয়ে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। তার চোখে এখন শূন্যতা। তার পাশে থাকা সাদিয়া খান ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, যেন সে কখনো ছিলই না।
এদিকে তামান্না ধীরে ধীরে হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারপাশে আলো, ক্যামেরা, মানুষ—সব আছে, কিন্তু তার ভেতরে এখন কোনো উচ্ছ্বাস নেই।
সে শুধু একটা সত্য বুঝে গেছে। শক্তি মানুষকে বদলায় না, মানুষই নিজের আসল রূপ দেখায়।
রাত গভীর হচ্ছে। কিন্তু এই রাতের শেষ নেই।
কারণ এখান থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন যুদ্ধ। ইয়াসিনের পতন, তামান্নার সিদ্ধান্ত, আর এই কোম্পানির ভেতরের লুকানো রাজনীতি—সবকিছু এখন এক নতুন অধ্যায়ে ঢুকে যাচ্ছে। রাতের সেই রিসোর্টের হলরুমে নেমে আসা নীরবতা যেন এখনো কাটেনি। আলো জ্বলছে, মানুষ আছে, ক্যামেরা চলছে, কিন্তু পরিবেশটা আর আগের মতো নেই।
যে জায়গাটা কয়েক মিনিট আগে ছিল এক ধরনের উদযাপন, সেটাই এখন হয়ে গেছে এক ধরনের আদালত যেখানে একজন মানুষ তার নিজের অহংকারের বিচার নিজের চোখে দেখছে।
ইয়াসিন এখনো চেয়ারে বসে আছে। তার শরীর স্থির, কিন্তু ভেতরে ভাঙচুর চলছে। তার মনে হচ্ছে সে যেন একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকে গেছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই।
কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মানুষটা নিজের সাফল্যে ভাসছিল, এখন সে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্ন করছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তামান্না।
সেই নারী, যাকে সে এতদিন অবহেলা করেছে, ছোট করে দেখেছে, অপমান করেছে।
কিন্তু এখন সে শুধু একজন স্ত্রী নয়, একজন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি, একজন শাসক।
আর এই পরিবর্তনটাই ইয়াসিন সহ্য করতে পারছে না।
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখ লাল, কণ্ঠ শুকনো।
সে কাঁপা গলায় বলল, তামান্না… তুমি যা করছো, এটা ঠিক হচ্ছে না। তুমি আমাকে এভাবে শেষ করতে পারো না।
তার কণ্ঠে এবার আগের সেই অহংকার নেই, আছে অনুরোধ। ভাঙা একটা মানুষের অনুনয়।
কিন্তু তামান্না নড়ল না। সে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন তার ভেতরের সব আবেগ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
সে ধীরে ধীরে বলল, আমি তোমাকে শেষ করছি না, ইয়াসিন। তুমি নিজেই নিজেকে শেষ করেছো।
আমি শুধু সত্যটা সামনে এনেছি। ইয়াসিন এক মুহূর্ত চুপ হয়ে গেল। তার মাথার ভেতর পুরনো স্মৃতিগুলো ভাসতে লাগল। সেই দিনগুলো যখন তামান্না তার জন্য রাত জেগ,
অপেক্ষা করত, যখন সে অসুস্থ থাকলে তামান্না নিজের ঘুম হারিয়ে তার পাশে বসে থাকত, যখন সে নতুন চাকরি পাওয়ার পর তামান্না সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল।
সেই মানুষটাই কি এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে?
নাকি সে কখনোই তাকে ঠিকভাবে চিনতে পারেনি?
হঠাৎ তার ভেতরে একটা ভয় ঢুকে গেল।
ভয় না, বরং বাস্তবতার আঘাত। সে উঠে দাঁড়াল। একটু এগিয়ে এসে বলল, আমি জানি আমি ভুল করেছি। আমি স্বীকার করছি। আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি।
কিন্তু মানুষ বদলায়, তামান্না। আমাকে একটা সুযোগ দাও। আমি সব ঠিক করে দেব।
এই কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ কাঁপছিল, চোখে পানি জমে উঠেছিল। সে সত্যিই ভেঙে পড়েছিল।
কিন্তু তামান্নার চোখে কোনো নরমতা এল না। সে একটু মাথা নেড়ে বলল, তুমি বদলাওনি, ইয়াসিন। তুমি শুধু ধরা পড়েছো। এই কথাটা যেন সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল।
ইয়াসিন থমকে গেল। তামান্না ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো আবেগ নেই। প্রতিটা পদক্ষেপ যেন সিদ্ধান্তের প্রতিধ্বনি।
সে বলল, তুমি যখন আমাকে শাড়ি পোড়াতে দেখেছিলে, তুমি একবারও ভাবোনি আমি কষ্ট পাবো কিনা।
তুমি শুধু ভেবেছিলে তোমার ইগো ঠিক আছে কিনা।
সে একটু থামল।
আর যখন তুমি আমাকে লজ্জা বলেছিলে, তখন তুমি একবারও ভাবোনি আমি কে ছিলাম তোমার জীবনে।
ইয়াসিন চোখ নামিয়ে ফেলল। তার ভেতরের সব শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। হলরুমের মানুষগুলো এখন ফিসফিস করছে। কেউ কেউ ভিডিও করছে, কেউ কেউ চুপচাপ দেখছে। কিন্তু কেউই আর আগের মতো নেই।
তামান্না আবার বলল, তুমি বলেছিলে আমি তোমার স্ট্যাটাসের সাথে মানাই না। তুমি ভুল ছিলে।
আমি কখনোই তোমার স্ট্যাটাসের অংশ ছিলাম না। তুমি ছিলে আমার জীবনের একটা পরীক্ষা।
এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে এক ধরনের ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যে শক্তি লুকানো ছিল।
ইয়াসিন হঠাৎ আবার বলল, তাহলে কি সব শেষ? সাত বছর? সব কিছু? তুমি কি এত সহজে সব মুছে ফেলবে?
তামান্না তার দিকে তাকাল।
এবার তার চোখে একটু নরমতা ছিল, কিন্তু সেটা করুণা না, সেটা বাস্তবতা। আমি কিছু মুছছি না, সে শান্তভাবে বলল। আমি শুধু সামনে এগোচ্ছি।
এই কথাটা বলার পর সে পিছন ঘুরে বোর্ড মেম্বারদের দিকে তাকাল। আজ থেকে ইন্টারনাল অডিট শুরু হবে। কোম্পানির সব ডিপার্টমেন্ট রিভিউ করা হবে। কোনো দুর্নীতি, অবহেলা বা ব্যক্তিগত প্রভাব থাকলে তা শূন্য সহ্যশীলতায় দেখা হবে। তার কণ্ঠে এখন পুরো কক্ষের নিয়ন্ত্রণ। বোর্ড মেম্বাররা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ইয়াসিন অবাক হয়ে দেখল, মানুষগুলো তাকে আর দেখছে না। তারা এখন তামান্নার দিকে তাকিয়ে আছে।
এই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, ক্ষমতা কখনো পদে থাকে না, থাকে মানুষের হাতে।
আর সেই ক্ষমতা এখন তামান্নার হাতে। সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার শরীর যেন ভারী হয়ে গেছে।
সে একটা টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার পাশে সাদিয়া খান এখন আর নেই। সে অনেক আগেই সরে গেছে। কারণ ক্ষমতা হারানো মানুষকে কেউ ধরে রাখে না।
এই দৃশ্যটা ইয়াসিনকে আরও একা করে দিল। রাতের বাইরে বাতাসে একটা ঠান্ডা ঝাপটা এসে লাগল।
জানালা দিয়ে শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ইয়াসিনের চোখে সেই আলো এখন অন্ধকারের মতো লাগছে।
তার মনে পড়ল সে কত সহজে তামান্নাকে অপমান করেছিল। কত সহজে ভেবেছিল সে ছাড়া তার জীবন ভালো হবে। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, সে যেটাকে তুচ্ছ ভেবেছিল, সেটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
তামান্না আবার হলের মাঝখানে ফিরে এল। এবার সে একটু থামল। চারপাশে তাকাল।
সবাই চুপ। সে ধীরে ধীরে বলল, আজকের রাত এখানেই শেষ না। এটা শুরু।
এই কথাটা যেন নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে দিল।
ইয়াসিনের পতন এখন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটা পেশাগত, সামাজিক, এবং মানসিক।
সে ধীরে ধীরে হল থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করল। কেউ তাকে থামাল না। কেউ কিছু বলল না।
কারণ সে আর ভাইস প্রেসিডেন্ট না। সে এখন শুধু একজন মানুষ, যে নিজের ভুলের সাথে একা দাঁড়িয়ে আছে।
তামান্না তার চলে যাওয়া দেখল। তার চোখে কোনো আনন্দ নেই। কারণ প্রতিশোধ কখনো আনন্দ দেয় না।
এটা শুধু সত্যকে সামনে আনে। গাড়িতে উঠে সে জানালার বাইরে তাকাল। শহরটা ধীরে ধীরে পেছনে যাচ্ছে।
তার ফোনে আরিফ চৌধুরীর মেসেজ এল। ম্যাডাম, সব শুরু হয়ে গেছে। মিডিয়া এই খবর পাচ্ছে। আগামীকাল থেকে বড় পরিবর্তন আসবে।
তামান্না শুধু একটা ছোট উত্তর দিল। ঠিক আছে। তারপর ফোনটা পাশে রেখে দিল। তার চোখে এখন একটাই ভাবনা।
এটা শুরু মাত্র।
ইয়াসিন ভেবেছিল সে একটা সাধারণ নারীকে হারিয়েছে।
কিন্তু আসলে সে হারিয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎ এখন অন্য কারো হাতে লেখা। রাত শেষ হলেও সেই রাতের প্রভাব শেষ হয়নি। শহরের আকাশে ভোরের আলো উঠছে, কিন্তু সেই আলো কারও জন্য স্বস্তি আনছে না। কারণ ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের ভেতরে এখন শুধু একটি নাম ঘুরছে—তামান্না রহমান।
আর সেই নামের সাথে জড়িয়ে আছে এক ধরনের ভয়, বিস্ময় এবং অস্থিরতা।
গত রাতের ঘটনা যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। রিসোর্ট থেকে বের হওয়ার পর থেকেই মিডিয়া, বোর্ড মেম্বার, এমনকি সাধারণ কর্মচারীরাও জানতে শুরু করেছে যে কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্টকে হঠাৎ করে পদচ্যুত করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমক ছিল না এটা সবচেয়ে বড় চমক ছিল আসল মালিকের পরিচয় প্রকাশ পাওয়া।
তামান্না রহমান যাকে এতদিন কেউ সাধারণ একজন “স্টাফের স্ত্রী” হিসেবে চিনত, সে আসলে কোম্পানির মূল উত্তরাধিকারী এবং চেয়ারম্যান।
এই তথ্যটা যত দ্রুত ছড়াচ্ছে, তত দ্রুত পুরো কর্পোরেট জগতে ভূমিকম্প শুরু হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইয়াসিন এখন নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বসে আছে। সেই অ্যাপার্টমেন্ট যেটা কয়েক মাস আগেও সে গর্ব করে দেখাত, এখন সেটা তার কাছে একটা খাঁচার মতো লাগছে। জানালার বাইরে শহরের শব্দ, গাড়ির হর্ন, মানুষের চলাফেরা—সবকিছু স্বাভাবিক, কিন্তু তার ভেতরে কিছুই স্বাভাবিক নেই।
তার হাতে মোবাইল। স্ক্রিনে একের পর এক নোটিফিকেশন।
ইস্টার্ন গ্রুপ ভাইস প্রেসিডেন্ট অপসারণ গোপন চেয়ারম্যান প্রকাশ কর্পোরেট শকিং নিউজ প্রতিটা শিরোনাম তার বুকের ভেতর আঘাত করছে।
সে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায়, কিন্তু পারে না। কারণ এখন সে জানে, এই ফোনটাই তার শেষ যোগাযোগের মাধ্যম। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ে।
ইয়াসিন চমকে ওঠে। ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দরজা খোলে।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের কোম্পানির এক সিনিয়র ম্যানেজার। তার মুখ গম্ভীর।
সে কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলল, ভাইস প্রেসিডেন্ট সাহেব… না, এখন তো আপনি আর সে পদে নেই।
এই কথাটা শুনে ইয়াসিনের চোখে রাগ জ্বলে উঠলেও সে কিছু বলতে পারে না।
ম্যানেজার একটা ফাইল তার হাতে ধরিয়ে দিল। এটা HR-এর নোটিশ। আপনার সাসপেনশন লেটার। আজ থেকেই আপনি অফিসে প্রবেশ করতে পারবেন না।
ইয়াসিনের হাত কেঁপে উঠল। তুমি জানো আমি কে? আমি সাত বছর ধরে এখানে আছি! আমি ম্যানেজার তাকে থামিয়ে দিল। আপনি কে ছিলেন সেটা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি কী করেছেন। এই কথাটা বলেই সে চলে গেল।
ইয়াসিন দরজাটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। সে ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করল।
ভেতরে ফিরে এসে সে সোফায় বসে পড়ল। তার মনে পড়ল তামান্নার শেষ কথা—আমি শুধু সামনে এগোচ্ছি।
এই কথাটা এখন তার মাথার ভেতর বারবার বাজছে।
অন্যদিকে, ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের হেড অফিসে সকাল থেকেই ব্যস্ততা। বড় বড় বোর্ড মেম্বার, লিগ্যাল টিম, ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট—সবাই একত্রিত হয়েছে।
তামান্না যখন অফিসে প্রবেশ করল, তখন পুরো বিল্ডিংয়ে নীরবতা নেমে এল। তার পরনে আজ সাধারণ নয়, বরং একদম রাজকীয় অফিসিয়াল পোশাক। তার চেহারায় কোনো দ্বিধা নেই। সে লিফট থেকে নামার পর সবাই মাথা নিচু করল। কেউ তাকে আগে কখনো এইভাবে দেখেনি।
সে সরাসরি বোর্ডরুমে প্রবেশ করল। ভেতরে সবাই অপেক্ষা করছিল। আরিফ চৌধুরী দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি বললেন, ম্যাডাম, মিডিয়া কন্ট্রোল করা হচ্ছে। কিন্তু কিছু লিক হয়ে গেছে।
কিছু সাংবাদিক আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তামান্না শান্তভাবে বলল, তাদের কাজ কথা বলা।
আমাদের কাজ সত্য দেখানো। তারপর সে টেবিলের সামনে বসে পড়ল। আজকের মিটিংয়ে তিনটা বিষয়—সে বলল।
প্রথম, ভাইস প্রেসিডেন্ট অপসারণের পর নতুন কাঠামো।
দ্বিতীয়, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি তদন্ত।
তৃতীয়, যারা গতকাল রাতের ঘটনার সাথে জড়িত বা জানত, তাদের রিভিউ। পুরো রুমে নীরবতা।
একজন বোর্ড মেম্বার সাহস করে বলল, ম্যাডাম, ইয়াসিন সাহেব… উনি তো তামান্না তার দিকে তাকাল।
উনি এখন কোম্পানির কেউ না। এই একটা বাক্যেই আলোচনা শেষ হয়ে গেল। অন্যদিকে, ইয়াসিন এখন শহরের রাস্তায় হাঁটছে। তার মনে হচ্ছে সে যেন কোনো পরিচিত পৃথিবী থেকে ছিটকে পড়েছে।
যে মানুষটা একসময় অফিসে ঢুকলেই সবাই দাঁড়িয়ে যেত, এখন সে নিজের পরিচয় খুঁজে পাচ্ছে না। তার ফোনে হঠাৎ একটা কল আসে। অচেনা নাম।
সে ফোন ধরে। অন্য পাশ থেকে একটা ঠান্ডা কণ্ঠ, ইয়াসিন সাহেব? আপনি কি জানেন আপনার বিরুদ্ধে ইন্টারনাল তদন্ত শুরু হয়েছে? আপনার কিছু ফাইল রিভিউ হচ্ছে।
ইয়াসিন চমকে যায়।
কী ফাইল?
অন্য পাশে কণ্ঠ বলে, আপনার কিছু ডিল, কিছু অনুমোদন, আর কিছু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত… সব চেক করা হচ্ছে।
কল কেটে যায়। ইয়াসিন থমকে দাঁড়িয়ে যায়। তার মাথায় ধীরে ধীরে একটা ভয় ঢুকে যাচ্ছে।
সে বুঝতে পারছে, এটা শুধু চাকরি হারানো না। এটা পুরো ধ্বংসের শুরু। অফিসে তামান্না এখন একের পর এক ফাইল দেখছে। তার সামনে কোম্পানির পুরো ইতিহাস খোলা।
তার চোখে কোনো আবেগ নেই, শুধু বিশ্লেষণ।
হঠাৎ আরিফ চৌধুরী বললেন, ম্যাডাম, একটা বিষয় আছে।
তামান্না মাথা না তুলেই বলল, বলো।
ইয়াসিন সাহেবের নামে কিছু অভ্যন্তরীণ লেনদেন পাওয়া গেছে। কিছু সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এই কথাটা শুনে তামান্না ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখ একটু সংকুচিত হলো। তার মানে?
আরিফ বললেন, আমরা নিশ্চিত না, কিন্তু যদি এটা প্রমাণিত হয়… তাহলে বিষয়টা শুধু চাকরি হারানোর মধ্যে থাকবে না।
তামান্না কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তার ভেতরে এবার এক নতুন অনুভূতি জন্ম নিল। প্রতিশোধ না, এবার তদন্ত।
সে ধীরে ধীরে বলল, সবকিছু খুঁজে বের করো। একটা ভুলও যেন বাদ না পড়ে। এই কথাটা বলার পর তার ভেতরের পৃথিবী আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
অন্যদিকে ইয়াসিন এখন নিজের অতীতের সব সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছে। সে বুঝতে পারছে, সে শুধু একজন নারীকে হারায়নি। সে হারিয়েছে সেই মানুষটাকেও, যে তাকে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করেছিল।
কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সন্ধ্যার দিকে মিডিয়ায় বড় খবর আসে। ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনে বড় পরিবর্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট অপসারণের পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু সাবেক কর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সন্দেহ ইয়াসিন ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে এখন আর রাগ নেই, অহংকার নেই।
শুধু ভয় আছে। এবং সেই ভয় ধীরে ধীরে বাস্তব হয়ে উঠছে।
অফিসে তামান্না জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
শহরের আলো জ্বলছে। তার ফোনে আবার আরিফের মেসেজ আসে। ম্যাডাম, তদন্ত গভীর হচ্ছে।
কিছু বড় নাম উঠে আসতে পারে। তামান্না শুধু একটা লাইন লিখে পাঠায়। সত্য লুকিয়ে থাকলে তা বিপজ্জনক হয়।
এখন সব বের হোক। ফোনটা রেখে সে উঠে দাঁড়ায়। তার সামনে এখন শুধু একটা পথ। আর সেই পথটা হলো সত্যের। সন্ধ্যা নামতেই শহরের আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠছে, কিন্তু ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের ভেতরের পরিবেশটা আগের মতো আর উজ্জ্বল নেই।
সেখানে এখন একটা চাপা অস্থিরতা, নীরব আতঙ্ক আর অজানা অপেক্ষা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
যে কোম্পানি এতদিন বাইরে থেকে শুধু সাফল্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন সেটাই ধীরে ধীরে ভেতর থেকে উলঙ্গ হয়ে যাচ্ছে।
তামান্না রহমান তার কেবিনে বসে আছে।
বড় কাঁচের জানালা দিয়ে পুরো শহর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সে শহর দেখছে না, সে দেখছে ফাইল, রিপোর্ট আর মানুষের আচরণ। তার সামনে টেবিল ভর্তি নথি, একটার পর একটা ডকুমেন্ট খোলা হচ্ছে, আর প্রতিটা পাতায় লুকানো আছে কারও না কারও ভুল, লোভ বা অসততা।
তার চোখ শান্ত, কিন্তু মন এখন আর আবেগের জায়গায় নেই। গত কয়েকদিনে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা শুধু তার অবস্থানে না, তার মানসিকতায়ও।
যে নারী একসময় কাউকে ভালোবেসে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিল, সে এখন ধীরে ধীরে বুঝে গেছে, আবেগ কখনোই ক্ষমতার জায়গায় টিকে থাকতে পারে না।
আরিফ চৌধুরী দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকলেন। তার মুখে একটা গুরুতর ভাব।
ম্যাডাম, তিনি বললেন, আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেনদেন ট্র্যাক করেছি।
কিছু সিদ্ধান্ত এমন ছিল যেগুলো সরাসরি কোম্পানির ক্ষতি করেছে। তামান্না মাথা না তুলে বলল, নামগুলো বলো।
আরিফ একটু থেমে বললেন, কয়েকজন ডিপার্টমেন্ট হেড, কিছু সাব-কন্ট্রাক্টর এবং… ইয়াসিন সাহেবের সাইন করা কিছু অনুমোদন।
এই নামটা শুনে বাতাসটা যেন একটু ভারী হয়ে গেল।
তামান্না ধীরে ধীরে কলমটা নামিয়ে রাখল। তার মুখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু একটা ঠান্ডা স্থিরতা।
সবকিছু যাচাই করো, সে বলল। কোনো অনুমান নয়, শুধু প্রমাণ। আরিফ মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
তামান্না একা হয়ে গেল কেবিনে। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ জানালার বাইরে গেল। শহরের আলো ঝলমল করছে, মানুষ নিজের জীবনে ব্যস্ত।
কিন্তু তার ভেতরের পৃথিবী এখন একটাই জায়গায় আটকে আছে—সত্য। অন্যদিকে, ইয়াসিন এখন নিজের জীবনের সবচেয়ে অস্থির অবস্থায় আছে।
সে একটি ছোট ভাড়া করা রুমে বসে আছে। আগের সেই বিলাসবহুল জীবন নেই, নেই অফিসের চাপ, নেই সহকর্মীদের সম্মান। শুধু আছে একটা ফোন, কিছু নোটিফিকেশন আর অজস্র ভয়। তার মোবাইলে একের পর এক মেসেজ আসছে।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে অফিসে প্রবেশ নিষিদ্ধ অভ্যন্তরীণ লেনদেন যাচাই
প্রতিটা লাইন যেন তার গলার ভেতর আটকে যাচ্ছে।
সে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের চারপাশে হাঁটতে শুরু করে। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন—এটা কি সত্যিই তার শেষ?
সে বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি, কিছুদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু তার ভেতরের একটা অংশ জানে, এটা আর আগের মতো নেই। হঠাৎ দরজায় আবার নক পড়ে।
এইবার সে একটু ভয় পায়। ধীরে ধীরে দরজা খোলে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন আইনজীবী।
আপনি ইয়াসিন রহমান?
ইয়াসিন মাথা নাড়ল।
আইনজীবী একটা খাম তার হাতে দিল।
এটা ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশন থেকে এসেছে। আপনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।
আপনাকে সহযোগিতা করতে হবে। ইয়াসিনের হাত কেঁপে ওঠে। তুমি জানো আমি ওই কোম্পানিতে কতদিন কাজ করেছি? আইনজীবী শান্তভাবে বলল, এখন সেটা বিষয় না।
বিষয় হলো আপনার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ এসেছে।
এই কথাটা বলে সে চলে গেল।
ইয়াসিন দরজাটা বন্ধ করে দেয়। তার বুকের ভেতর এখন ভয় আর অপমান মিশে গেছে। অন্যদিকে, কোম্পানির বোর্ডরুমে আরেকটি জরুরি মিটিং চলছে।
তামান্না এখনো একই পোশাকে, কিন্তু তার উপস্থিতি এখন আগের চেয়ে আরও দৃঢ়। তার সামনে বোর্ড মেম্বাররা বসে আছে, কেউ সরাসরি চোখে চোখ রাখার সাহস পাচ্ছে না।
সে বলল, আমরা কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করছি না। আমরা সিস্টেম পরিষ্কার করছি।
একজন বোর্ড মেম্বার ধীরে ধীরে বলল, ম্যাডাম, ইয়াসিন সাহেব… উনি তো দীর্ঘদিন কোম্পানিতে কাজ করেছেন।
উনার কিছু সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে, কিন্তু উনি তামান্না তাকে থামিয়ে দিল। ভুল আর অবহেলা আলাদা বিষয়, সে বলল।
আর ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত আর অনিচ্ছাকৃত ভুলও আলাদা।
তার কণ্ঠ এবার একটু কঠিন।
আমরা এখন সেই জায়গায় আছি, যেখানে আবেগ নয়, প্রমাণ কথা বলবে। পুরো রুমে নীরবতা নেমে এল।
একজন সিনিয়র ডিরেক্টর ধীরে ধীরে বলল, তাহলে যদি প্রমাণ পাওয়া যায়… আপনি কী করবেন?
তামান্না এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর বলল, আমি পদক্ষেপ নেব। এই কথাটা যেন সবার জন্য একটা সতর্ক সংকেত হয়ে গেল।
অন্যদিকে ইয়াসিন এখন নিজের অতীতের সিদ্ধান্তগুলো বারবার মনে করতে শুরু করেছে।
সে বুঝতে পারছে, কিছু জায়গায় সে সত্যিই ভুল করেছে। কিছু অনুমোদন, কিছু স্বাক্ষর, কিছু সিদ্ধান্ত হয়তো সে যথেষ্ট যাচাই না করেই দিয়েছে।
তখন তার মনে হয়েছিল, এগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ না। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, প্রতিটা ছোট সিদ্ধান্তই এখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরে একটা ভয় বাড়ছে।
সে ফোন তুলে এক পুরনো সহকর্মীকে কল করে।
তুই সত্যি বল, আমার বিরুদ্ধে কিছু আছে?
অন্য পাশের কণ্ঠ একটু থেমে বলে, ভাই… আমি কিছু বলবো না। শুধু সাবধানে থাক। কল কেটে যায়।
এই নীরবতাটাই ইয়াসিনের জন্য সবচেয়ে বড় উত্তর।
সেদিন রাতেই মিডিয়ায় আরেকটা খবর আসে।
ইস্টার্ন গ্রুপে আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট তদন্তের মুখে শেয়ার বাজারে প্রভাব পড়তে পারে
ইয়াসিন মোবাইলটা বন্ধ করে দেয়।
তার মাথা নিচু। তার মনে হচ্ছে, পৃথিবী ধীরে ধীরে তার চারপাশ থেকে সরে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে অফিসে তামান্না আবার উপস্থিত হয়।
কিন্তু এবার পরিবেশ আরও ভিন্ন।
সবাই তাকে আরও সাবধানে দেখছে। কেউ আর আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে না।
সে সরাসরি ইনভেস্টিগেশন টিমের রিপোর্ট দেখতে চায়।
আরিফ ফাইল খুলে বললেন, ম্যাডাম, কিছু ট্রানজেকশনে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কিছু কন্ট্রাক্ট যেগুলোতে ইয়াসিন সাহেবের অনুমোদন ছিল। তামান্না ফাইলটা নিয়ে কিছুক্ষণ দেখে।
তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। তারপর ধীরে ধীরে বলল, এগুলো কোর্টে যাবে। আরিফ একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
ম্যাডাম… আপনি কি নিশ্চিত?
তামান্না মাথা নাড়ল। আমি কাউকে শাস্তি দিতে চাই না। আমি চাই সত্য প্রকাশ হোক। এই কথাটা বলার পর সে উঠে দাঁড়াল। তার ভেতরের সিদ্ধান্ত এখন চূড়ান্ত।
অন্যদিকে ইয়াসিন এখন বুঝতে পারছে, এটা শুধু চাকরি হারানো না। এটা এখন আইনি লড়াই। তার বিরুদ্ধে কেস তৈরি হচ্ছে। তার ফোনে একটা শেষ মেসেজ আসে।
ইস্টার্ন গ্রুপ লিগ্যাল নোটিশ, সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে। তার ভেতরে এখন আর আত্মবিশ্বাস নেই।
শুধু একটা প্রশ্ন আছে। আমি কীভাবে এখানে এসে পড়লাম? কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর সে জানে। সে নিজেই নিজের পথ তৈরি করেছে। অফিসে তামান্না জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে এবার কোনো অস্থিরতা নেই।
শুধু একটাই অনুভূতি।
সত্য যত গভীরেই লুকানো থাকুক, একদিন তা সামনে আসবেই। আর সেই সত্য এখন সামনে আসছে।
ধীরে ধীরে।
নির্দয়ভাবে। ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের পাঠানো লিগ্যাল নোটিশ হাতে নিয়ে ইয়াসিন অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসে রইল।
কাগজটার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার চোখ যেন সেটা দেখছে না। তার মাথার ভেতর সবকিছু ঘুরছে—অফিস, মানুষ, সম্মান, আর সবচেয়ে বেশি ঘুরছে,
তামান্নার সেই স্থির চোখ। যে চোখে কোনো রাগ ছিল না, কোনো আবেগ ছিল না, শুধু সিদ্ধান্ত ছিল।
সে ধীরে ধীরে কাগজটা টেবিলে রাখল। তার হাত এখন আর কাঁপছে না, কারণ ভয় একটা পর্যায়ে গেলে শরীর ক্লান্ত হয়ে স্থির হয়ে যায়। তার ভেতরে এখন আর প্রতিবাদ নেই, শুধু বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ধাক্কা।
এই প্রথম সে বুঝতে পারছে, সে শুধু চাকরি হারায়নি, সে এখন একটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে।
আর সেই সিস্টেমের মাথায় আছে সেই মানুষটা, যাকে সে নিজের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ভেবেছিল।
বাইরে শহরটা স্বাভাবিক। মানুষ কাজে যাচ্ছে, গাড়ি চলছে, দোকান খোলা। কিন্তু ইয়াসিনের পৃথিবী এখন আর সেই পৃথিবীর সাথে মেলে না। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গিয়ে নিজের মুখ দেখল।
সেই মুখে এখন আর আত্মবিশ্বাস নেই, নেই সেই অহংকার, নেই সেই বিজয়ের হাসি। শুধু ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তা।
হঠাৎ তার ফোন বাজল। একটা অচেনা নম্বর। সে একটু দেরি করে কলটা ধরে। অন্য পাশ থেকে একজন বলে, আপনি ইয়াসিন রহমান? হ্যাঁ, সে ধীরে বলল।
আমি কোর্ট রেজিস্ট্রার অফিস থেকে বলছি। আপনার বিরুদ্ধে ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশন আনুষ্ঠানিক মামলা ফাইল করেছে। আগামী সপ্তাহে প্রাথমিক শুনানি।
এই কথাটা শোনার পর ইয়াসিনের মনে হলো তার বুকের ভেতর কিছু একটা ধসে পড়ল।
মামলা? সে ফিসফিস করে বলল। হ্যাঁ, আর আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে হাজির থাকতে হবে।
কল কেটে গেল। ফোনটা তার হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে কোনোভাবে ধরে রাখল।
এখন সে বুঝতে পারছে, এটা আর কোম্পানির ভিতরের বিষয় না। এটা এখন পুরোপুরি আইনি যুদ্ধ।
অন্যদিকে, ইস্টার্ন গ্রুপের হেড অফিসে তামান্না রহমান একটি বড় বোর্ড মিটিং করছে। পুরো কনফারেন্স রুমে আজ ভিন্ন পরিবেশ। আগে যেখানে সিদ্ধান্তগুলো আলোচনা করে নেওয়া হতো, এখন সেখানে প্রতিটা শব্দ হিসাব করে বলা হচ্ছে।
তামান্না টেবিলের মাথায় বসে আছে। তার সামনে ফাইল, রিপোর্ট, আর ডিজিটাল স্ক্রিনে গ্রাফ।
সে বলল, আমরা কেবল তদন্ত করছি না। আমরা কোম্পানির ভিত্তি পরিষ্কার করছি।
একজন বোর্ড মেম্বার একটু দ্বিধা নিয়ে বলল, ম্যাডাম, মিডিয়ায় বিষয়টা খুব বড় হয়ে গেছে। কিছু ইনভেস্টর উদ্বিগ্ন।
তামান্না শান্তভাবে বলল, সত্যকে ভয় পেলে ব্যবসা টেকে না।
তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা নেই, শুধু দৃঢ়তা।
আরিফ চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট দেখাচ্ছেন। তিনি বললেন, ম্যাডাম, কিছু গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রাক্ট এখন কোর্টে যাবে। ইয়াসিন সাহেবের স্বাক্ষরিত কয়েকটি ফাইল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তামান্না ফাইলটা হাতে নিল। একটু সময় নিয়ে দেখল।
তারপর বলল, এগুলো কেবল কাগজ না। এগুলো সিদ্ধান্ত।
সে একটু থামল। আর সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয়।
এই কথাটা বলার সময় তার চোখ একবারও কাঁপল না।
অন্যদিকে, ইয়াসিন এখন নিজের অতীত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। সে পুরনো ফাইল, ইমেইল, মেসেজ খুঁজছে।
কোথায় সে ভুল করেছে, কোথায় সে সাইন করেছে, কোন জায়গায় সে অসতর্ক ছিল।
তার মনে পড়ছে, অনেক সময় সে ফাইল না পড়ে সাইন করেছে। অনেক সময় সে সিনিয়রদের উপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তখন তার মনে হয়েছিল, সব ঠিক আছে।
কিন্তু এখন বুঝছে, সেই ছোট ছোট অবহেলাই এখন তার বিরুদ্ধে বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করছে, আমি কি সত্যিই অপরাধ করেছি? কিন্তু তার ভেতরের আরেকটা অংশ বলছে, তুমি অবহেলা করেছো। আর ক্ষমতার জায়গায় অবহেলাও অপরাধ।bহঠাৎ তার ফোন আবার বাজে।
এইবার কলটা তার এক পুরনো সহকর্মীর।
ইয়াসিন, তুই কোথায় আছিস? অফিসে এখন খুব চাপ। সবাই তোর নাম নিচ্ছে।
কেন?
তোর নাম এখন ইনভেস্টিগেশন ফাইলের সাথে যুক্ত। সাবধানে থাক।
কল কেটে যায়।
ইয়াসিন ফোনটা নিচে নামিয়ে রাখে।
তার বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়।
সে বুঝতে পারছে, মানুষ এখন তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
অফিসে তামান্না এখন আর শুধু রিপোর্ট দেখছে না, সে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছে।
তার সামনে বড় স্ক্রিনে কোম্পানির পুরো কাঠামো।
সে বলল, আমরা রিস্ট্রাকচার করব।
শুধু মানুষ না, সিস্টেমও। আরিফ মাথা নেড়ে বললেন, ম্যাডাম, আপনি কি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নতুন কাউকে ভাবছেন? তামান্না কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল, এখন না।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো সত্য। এই কথাটা বলে সে উঠে দাঁড়াল। তার ভেতরের সিদ্ধান্ত এখন আর শুধু প্রতিশোধ না, এটা নিয়ন্ত্রণ। রাত নামছে।
ইয়াসিন এখন ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। শহরের আলো নিচে ঝলমল করছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছে সে আলোর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তার ফোনে আবার নোটিফিকেশন আসে।
মিডিয়া রিপোর্ট সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্ট ফাঁস সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার মাথায় শুধু একটা মুখ ভাসছে—তামান্না।
সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে, তুমি কি আমাকে ধ্বংস করতে চাও? কিন্তু তার ভেতর থেকে কোনো উত্তর আসে না।
কারণ তামান্না এখন আবেগে নেই। সে এখন সিদ্ধান্তে আছে। পরদিন সকালে কোর্টের প্রথম শুনানির দিন।
বাইরে মিডিয়া ভিড় করে আছে। ক্যামেরা ফ্ল্যাশ, রিপোর্টারদের চিৎকার, মানুষের কৌতূহল। ইয়াসিন ধীরে ধীরে কোর্টের দিকে হাঁটে। তার মুখে কোনো আত্মবিশ্বাস নেই। ভেতরে ঢুকতেই সে দেখে, একপাশে ইস্টার্ন গ্রুপের লিগ্যাল টিম, আরিফ চৌধুরী, এবং কিছু সিনিয়র এক্সিকিউটিভ বসে আছে। আর অন্য পাশে সে একা।
তার পাশে কেউ নেই।
কিছুক্ষণ পর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তামান্না রহমান।
আজ সে আর অফিসের চেয়ারম্যান না। আজ সে একজন শক্তিশালী সাক্ষী এবং সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।
তার হাঁটা থেমে নেই, তার চোখ স্থির। ইয়াসিন তাকিয়ে থাকে। তার মনে এক মুহূর্তের জন্য পুরনো স্মৃতি ভেসে ওঠে।
সেই মেয়েটা, যে তার জন্য সব ছেড়ে দিয়েছিল।
আর এখন সেই মেয়েটাই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে।
বিচার শুরু হয়। জাজ আসেন। কাগজপত্র উপস্থাপন শুরু হয়। ইয়াসিনের নাম, স্বাক্ষর, অনুমোদন, সবকিছু একে একে উঠে আসে। প্রতিটা ডকুমেন্ট যেন তার অতীতকে টেনে আনছে। শেষে জাজ বলেন, প্রাথমিক প্রমাণ যথেষ্ট। তদন্ত চলবে। এই কথাটা ইয়াসিনের ভেতর ভেঙে দেয়।
সে বুঝতে পারে, এটা এখন আর থামবে না।
কোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় সে তামান্নার দিকে তাকায়।
তামান্না তার দিকে একবারও ফিরে তাকায় না।
সে সামনে হাঁটে। তার চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু সে একা।
কারণ তার লড়াই এখন আর ব্যক্তিগত না। এটা সত্যের লড়াই। আর সেই লড়াই শুরু হয়ে গেছে। কোর্টরুমের ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার পর ভেতরের পরিবেশটা আরও গম্ভীর হয়ে গেল।
বাইরের কোলাহল, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, সাংবাদিকদের ভিড় সবকিছু যেন কাচের দেয়ালের বাইরে আটকে গেছে।
ভেতরে এখন শুধু আইন, প্রমাণ আর মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের কঠিন নীরবতা।
ইয়াসিন একদিকে বসে আছে, আর অন্যদিকে ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের লিগ্যাল টিম।
মাঝখানে বিশাল ফাঁকা জায়গা, যেন দুইটা আলাদা দুনিয়া। একদিকে ক্ষমতা, সংগঠন, শৃঙ্খলা। অন্যদিকে ভাঙা একজন মানুষ, যে একসময় এই দুনিয়ারই অংশ ছিল।
তার চোখ এখনো দরজার দিকে বারবার যাচ্ছে। সে জানে না কেন, কিন্তু সে চায় তামান্না।
এখনো আগের মতো কোনো সাধারণ মানুষ হিসেবে থাকুক, যাকে সে বুঝতে পারে, যার সামনে সে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে।
কিন্তু প্রতিবার যখন সে তাকাচ্ছে, বাস্তবতা তাকে আঘাত করছে। কারণ তামান্না এখন আর সেই মানুষ নেই।
সে কোর্টরুমে প্রবেশ করল ঠিক নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে। তার হাঁটার মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অস্থিরতা নেই। তার উপস্থিতি যেন পুরো ঘরটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সাংবাদিকরা বাইরে, কিন্তু ভেতরের বাতাসেও তার প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। ইয়াসিন তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম তার মনে হলো, তামান্না তাকে দেখে না।
যেমন সে একজন অপরিচিত মানুষকে দেখে।
তামান্না বসার পর কোনো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি সামনে দৃষ্টি স্থির রাখল। তার সামনে রাখা আছে ফাইল, ডকুমেন্ট, এবং ডিজিটাল প্রজেকশন রিপোর্ট।
বিচার শুরু হলো।
প্রথমে কোম্পানির আইনজীবী উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ পরিষ্কার, নিরপেক্ষ, কিন্তু প্রতিটি শব্দ ভারী।
এই কেসটি আর শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার বিষয় নয়।
এটি একটি আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের তদন্ত, যেখানে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াসিন রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে।
ইয়াসিনের বুক ধক করে উঠল। “সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট”—এই শব্দটা যেন তার পরিচয় থেকে শেষ টুকরো সম্মানটাও কেড়ে নিচ্ছে।
তার হাত টেবিলের নিচে শক্ত হয়ে গেছে। এরপর একে একে প্রমাণ উপস্থাপন শুরু হলো। ডিজিটাল স্ক্রিনে ফাইল আসছে।
কন্ট্রাক্ট, অনুমোদন, সাইন করা ডকুমেন্ট, ট্রানজেকশন হিস্ট্রি। প্রতিটা ডকুমেন্টে ইয়াসিনের নাম।
কখনো সরাসরি, কখনো অনুমোদনের মাধ্যমে। প্রতিটা প্রেজেন্টেশন তার অতীতকে টেনে এনে সামনে দাঁড় করাচ্ছে। সে মনে মনে বলছে,
আমি তো শুধু সাইন করেছি… আমি তো সব বুঝে করিনি… কিন্তু কোর্ট সেই “না বুঝে করা”কে গ্রহণ করছে না।
কারণ এখানে দায়িত্বের প্রশ্ন আছে। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিটি স্বাক্ষরের দায় তার।
তামান্না এখনো চুপ করে আছে।
সে কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না। সে শুধু শুনছে। তার চোখ মাঝে মাঝে স্ক্রিনের দিকে যাচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে ফাইলের দিকে। কিন্তু কোথাও কোনো আবেগ নেই।
যেন এটা কোনো ব্যক্তিগত লড়াই না, বরং একটা কাঠামোগত সত্য যাচাই।
হঠাৎ ইয়াসিনের আইনজীবী দাঁড়াল। সে বলল, মাননীয় বিচারক, আমার মক্কেল দীর্ঘদিন কোম্পানিতে কাজ করেছেন। কিছু সিদ্ধান্ত হয়তো ভুল ছিল, কিন্তু ইচ্ছাকৃত দুর্নীতি প্রমাণ হয়নি।
এই কথাটা বলার পর ইয়াসিন একটু আশা খুঁজে পেল।
সে তামান্নার দিকে তাকাল। যদি তুমি চাও, আমি সব ঠিক করতে পারি—তার চোখে এই অনুরোধ ছিল।
কিন্তু তামান্না তাকাল না। সে শুধু সামনে দেখছিল।
এরপর কোম্পানির পক্ষ থেকে নতুন একটি ডকুমেন্ট উপস্থাপন করা হলো।
আর সেই মুহূর্তে কোর্টরুমে একটা নতুন নীরবতা নেমে এল।
একটি অডিও রেকর্ডিং। ইয়াসিনের কণ্ঠ।
একটি পুরনো মিটিং থেকে নেওয়া।
যেখানে সে একটি কন্ট্রাক্ট দ্রুত অনুমোদন করতে বলছে, ডিটেইলস না দেখে।
তার নিজের কণ্ঠ এখন তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইয়াসিনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেলল। এটা কখন রেকর্ড হলো… আমি জানতাম না…
কিন্তু কোর্ট জানে, অজানা মানেই দায়মুক্তি না।
তামান্না প্রথমবারের মতো একটু নড়ল। সে হালকা করে শ্বাস নিল। তার ভেতরে কোনো আনন্দ নেই।
শুধু সত্য সামনে আসার একটা স্বাভাবিক প্রবাহ। বিচারক ফাইলগুলো দেখে বললেন, প্রাথমিক প্রমাণ যথেষ্ট গুরুতর। তদন্ত চলবে, এবং পরবর্তী শুনানিতে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট উপস্থাপন করতে হবে।
এই কথাটা ইয়াসিনের মাথায় যেন আঘাত করল। এখন সে জানে, এটা শেষ না।
এটা শুরু।
কোর্টের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর সবাই উঠে দাঁড়াল।
তামান্না তার ফাইল গুছিয়ে নিল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে এখন কোনো অহংকার নেই।
শুধু একটা মানুষ, যে বুঝতে পারছে সে হারিয়ে গেছে।
তামান্না… সে নরম গলায় বলল।
তুমি কি একবারও ভাবছো না, আমি বদলাতে পারি?
তামান্না এবার তার দিকে তাকাল। প্রথমবারের মতো সরাসরি। তার চোখে কোনো ঘৃণা নেই, কোনো ভালোবাসাও নেই। শুধু বাস্তবতা।
তুমি বদলাতে পারতে, সে শান্তভাবে বলল। কিন্তু তুমি তখন বদলাওনি, যখন কেউ তোমাকে থামায়নি।
এই কথাটা ইয়াসিনের বুক ভেঙে দিল। সে চুপ হয়ে গেল।
তামান্না আবার বলল, আমি তোমাকে ধ্বংস করতে আসিনি। আমি সত্যকে সামনে আনতে এসেছি।
তারপর সে পাশ ঘুরে হাঁটা শুরু করল। ইয়াসিন পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, সে যেন নিজের জীবনের একটা বড় অংশ কোর্টরুমে ফেলে এসেছে।
কিন্তু কেউ তাকে ফেরত দেবে না। বাইরে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্ল্যাশ, প্রশ্ন, চিৎকার।
ইয়াসিন মাথা নিচু করে দ্রুত হাঁটছে। তার পাশে কেউ নেই।
ঠিক তখনই সে দূর থেকে তামান্নাকে দেখতে পেল।
সে গাড়িতে উঠছে। তার চারপাশে লোকজন, নিরাপত্তা, সহকারী। একটা আলাদা পৃথিবী।
ইয়াসিন এক মুহূর্ত থেমে গেল। তার মনে হলো, এই মানুষটা একসময় তার জন্যই ছিল।
কিন্তু এখন সে শুধু নিজের জন্য আছে। গাড়ি চলে গেল।
ইয়াসিন দাঁড়িয়ে রইল। তার চারপাশে ভিড় কমে যাচ্ছে।
সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আর তার ভেতরের আলোও।
অফিসে ফিরে তামান্না জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে কোর্টের রিপোর্ট।
আরিফ চৌধুরী পাশে এসে বললেন, ম্যাডাম, কেসটা আরও বড় হতে পারে। মিডিয়া এখন পুরোপুরি জড়িয়ে গেছে।
তামান্না ধীরে বলল, সত্য বড় হলে শব্দও বড় হয়।
তারপর একটু থেমে যোগ করল, আমরা থামব না।
এই কথাটা যেন পরবর্তী ধাপের ঘোষণা। অন্যদিকে ইয়াসিন এখন নিজের রুমে বসে আছে। তার ফোন বন্ধ।
তার চারপাশে নীরবতা। কিন্তু তার মাথার ভেতরে শব্দ।
অনুশোচনা, ভয়, আর হারানোর বোধ।
সে বুঝতে পারছে, সে শুধু একজন নারী হারায়নি। সে হারিয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের পরিচয়, নিজের অবস্থান। আর এখন সেই সবকিছু অন্য কারও হাতে।
তামান্নার হাতে। রাত গভীর হচ্ছে। দুইটা জীবন দুইদিকে যাচ্ছে। একদিকে উত্থান।
অন্যদিকে পতন। কিন্তু গল্প এখনো শেষ হয়নি।
কারণ সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত এখনো বাকি। রাত যত গভীর হচ্ছে, শহর ততই নীরব হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে দুটো ভিন্ন পৃথিবী ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। একদিকে ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের বিশাল কাচের ভবনে আলো জ্বলছে, যেখানে এখনো কাজ চলছে।
রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে, ফাইল যাচাই হচ্ছে। অন্যদিকে শহরের এক অন্ধকার, ছোট রুমে বসে আছে ইয়াসিন, যার জীবন এখন আর আগের মতো কোনো কাঠামোর মধ্যে নেই।
তার ফোন এখনো বন্ধ। সে ইচ্ছে করেই বন্ধ রেখেছে। কারণ প্রতিটা অন করা স্ক্রিন তাকে নতুন কোনো ধাক্কা দিচ্ছে কোনো নিউজ, কোনো মেসেজ, কোনো অচেনা কল।
সে আর কিছু শুনতে চায় না। কিন্তু সমস্যা হলো, সত্যকে এভাবে বন্ধ করা যায় না।
ইয়াসিন সোফার কোণে বসে আছে, দুই হাত মাথার ওপর।
তার চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি শূন্য। তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে কিছু কাগজ, পুরনো ফাইল কপি, আর তার নিজের করা নোট। এগুলো এখন তার কাছে প্রমাণ না, এগুলো এখন তার অপরাধের স্মৃতি।
তার মনে বারবার সেই কোর্টরুমের দৃশ্য ফিরে আসছে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠা তার নিজের স্বাক্ষর, তার নিজের কণ্ঠের রেকর্ডিং, আর তামান্নার সেই স্থির চোখ।
সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তামান্নার চাহনি না, সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তার নির্লিপ্ততা।
কারণ ঘৃণা থাকলে সম্পর্ক থাকে, কিন্তু নির্লিপ্ততা মানে সম্পর্কের শেষ। ইয়াসিন হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
সে রুমের ভেতর হাঁটতে শুরু করল। দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে দাঁড়াল, আবার হাঁটল। তার মনে হচ্ছে এই ছোট রুমটা ধীরে ধীরে তার ওপর চেপে বসছে।
সে নিজের সাথে কথা বলছে, আমি তো ইচ্ছা করে কিছু করিনি। আমি শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েছি সবাই তো এমনই করে কিন্তু তার ভেতরের আরেকটা কণ্ঠ তাকে থামিয়ে দেয়।
সিদ্ধান্ত আর অবহেলা এক না। এই লড়াই এখন তার ভেতরেই চলছে। ঠিক তখনই দরজায় আবার নক পড়ে।
ইয়াসিন থমকে যায়। এই রাতে আবার কে?
সে ধীরে ধীরে দরজা খোলে।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন কুরিয়ার অফিসার। হাতে একটি বড় খাম। ইয়াসিন খামটা নেয়।
কোনো কথা না বলে দরজা বন্ধ করে দেয়। ভেতরে এসে সে খামটা খুলে ফেলে। ভেতরে কোর্টের অফিসিয়াল নোটিশ।
পরবর্তী শুনানিতে তার ব্যক্তিগত ব্যাংক রেকর্ড, ইনভেস্টমেন্ট এবং কিছু সন্দেহজনক লেনদেন উপস্থাপন করা হবে। এই লাইনগুলো পড়ার পর ইয়াসিনের হাত কাঁপতে শুরু করে। এটা আর শুধু চাকরির মামলা না।
এটা এখন পুরো জীবন নিয়ে প্রশ্ন। সে খামটা টেবিলে ফেলে দেয়। তার বুক ভার হয়ে আসছে।
অন্যদিকে, ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের হেড অফিসে রাতেও কাজ চলছে। তামান্না রহমান এখনো তার কেবিনে।
তার সামনে বড় স্ক্রিনে কোম্পানির আর্থিক রিপোর্ট, ট্রানজেকশন ম্যাপ, এবং কিছু ফ্ল্যাগ করা ফাইল।
আরিফ চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, ম্যাডাম, আমরা আরও কিছু অসঙ্গতি পেয়েছি।
এগুলো শুধু
একজন মানুষের সিদ্ধান্ত না, বরং একটা গ্রুপ কাজ করেছে বলে মনে হচ্ছে। তামান্না ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
গ্রুপ?
আরিফ বললেন, কিছু সিনিয়র স্টাফ, কিছু বাইরের কন্ট্রাক্টর… আর সম্ভবত কেউ ভিতর থেকে তথ্য লিক করেছে।
এই কথাটা শোনার পর তামান্নার চোখ একটু সংকুচিত হলো। তার মানে এটা শুধু ইয়াসিন না।
আরিফ মাথা নেড়ে বললেন, না ম্যাডাম। এটা বড় নেটওয়ার্ক। এই মুহূর্তে তামান্নার সামনে গল্পটা বদলে যাচ্ছে।
এটা আর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ না। এটা এখন কর্পোরেট যুদ্ধ। সে ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
জানালার দিকে এগিয়ে গেল। শহরের আলো এখন আগের মতো সুন্দর লাগছে না, বরং একটা বিশাল সিস্টেমের মতো লাগছে, যার ভেতরে অনেক অন্ধকার কোণ আছে।
সে বলল, তাহলে সব বের করতে হবে। আরিফ একটু থেমে বললেন, ম্যাডাম, লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল
এটা করলে অনেক বড় নাম জড়াতে পারে।নতামান্না পেছনে না তাকিয়েই বলল, সত্য কখনো ছোট নাম দেখে না।
তার কণ্ঠে এবার একটা নতুন স্তর যোগ হয়েছে—আরও কঠিন, আরও সিদ্ধান্তমূলক।
অন্যদিকে, ইয়াসিন এখন আর রুমে বসে থাকতে পারছে না। সে বাইরে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে।
মানুষ তাকে চেনে না, কেউ তাকায় না। কিন্তু তার ভেতরে মনে হচ্ছে সবাই তাকিয়ে আছে।
সে একটি দোকানের সামনে থামে। টিভিতে খবর চলছে।
ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের অভ্যন্তরীণ তদন্তে নতুন তথ্য সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আরও প্রমাণ বড় আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনা। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল
ইয়াসিন এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ায়। তার মনে হয় সে যেন নিজের জীবন টিভিতে দেখছে। সে পেছনে সরে আসে।
তার হাত কাঁপছে।
সে বুঝতে পারছে, এখন আর পালানোর জায়গা নেই।
অফিসে তামান্না এখন নতুন ফাইল খুলেছে। একটি নাম সামনে এসেছে। যেটা আগে রিপোর্টে ছিল না।
একজন সিনিয়র ফাইন্যান্স কনসালট্যান্ট। তার চোখ এক মুহূর্ত থেমে যায়। আরিফ বললেন, ম্যাডাম, এই নামটা আগে ছিল না। এখন ডাটা রিকভারির পর এসেছে।
তামান্না ধীরে বলল, তাহলে তদন্ত এখন আরও গভীর হবে।
তার চোখে এবার একটা নতুন আলো।
এটা শুধু ইয়াসিন না। এটা একটা সিস্টেম। এবং সেই সিস্টেম এখন খোলা হচ্ছে। রাত শেষের দিকে যাচ্ছে।
ইয়াসিন আবার তার রুমে ফিরে আসে। তার শরীর ক্লান্ত, মন ভেঙে যাচ্ছে। সে বিছানায় বসে পড়ে।
তার চোখে পানি আসে, কিন্তু সে কাঁদে না। কারণ কাঁদার শক্তিও এখন তার নেই। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল
সে শুধু ফিসফিস করে বলে, আমি কি সত্যিই এত খারাপ ছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয় না।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর বাইরের কেউ দেয় না। অন্যদিকে তামান্না জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তার ফোনে আরিফের মেসেজ আসে। ম্যাডাম, পরবর্তী শুনানির জন্য নতুন ডকুমেন্ট প্রস্তুত।
সে শুধু একটা শব্দ লিখে পাঠায়। চালিয়ে যাও। তার চোখ শহরের দিকে। তার ভেতরে এখন আর পুরনো তামান্না নেই।
সে এখন সিদ্ধান্তের নাম। পর্ব শেষের দিকে এসে গল্পটা এখন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে পতন নিশ্চিত একজন মানুষ। অন্যদিকে সত্য খুঁজে বের করা এক শক্তি। আর মাঝখানে একটা বড় সিস্টেম, যা এখনো পুরোপুরি ভাঙেনি। রাত শেষ হয়ে সকাল নামলেও শহরের ভেতরের অস্থিরতা শেষ হয়নি। বরং আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন চাপ আরও বেড়ে গেছে। ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের হেড অফিসে আজ একটা ভিন্ন ধরনের নীরবতা।
এখানে আর আগের মতো সাধারণ ব্যস্ততা নেই, এখানে এখন প্রতিটি মানুষ বুঝে গেছে—কিছু একটা বড় পরিবর্তন আসছে, আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে তামান্না রহমান।তামান্না এখন তার কেবিনে বসে আছে।
টেবিলের ওপর একটার পর একটা নতুন রিপোর্ট, নতুন ডেটা, নতুন নাম।
কিন্তু তার মুখে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো দ্বিধা নেই।
তার চোখ এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে আবেগ আর ব্যক্তিগত সম্পর্ক আলাদা হয়ে গেছে, আর বাকি আছে শুধু সিদ্ধান্ত।
তার সামনে খোলা আছে একটি নতুন ফাইল।
আরিফ চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ম্যাডাম, এই নামটা আগের কোনো রিপোর্টে ছিল না।
কিন্তু ডেটা রিকভারির পর আমরা দেখেছি, কিছু গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজেকশনে এই ব্যক্তির প্রভাব আছে।
তামান্না চোখ না তুলে বলল, নাম বলো। আরিফ একটু থেমে বললেন, সাইফুল আলম। ফাইন্যান্স কনসালট্যান্ট।
এই নামটা কেবিনে যেন বাতাস বদলে দিল। তামান্না ধীরে ধীরে কলম নামিয়ে রাখল। সে বলল, শুরুটা এখান থেকেই ছিল। তার কণ্ঠে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু নিশ্চিততা।
অন্যদিকে, ইয়াসিন এখন শহরের ভেতর উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে। তার কাছে এখন আর কোনো গন্তব্য নেই।
প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা মোড় তার কাছে একই রকম লাগছে। মানুষ তাকে চিনছে না, আর যারা চিনত, তারা এখন এড়িয়ে যাচ্ছে। তার ফোনে একের পর এক নিউজ নোটিফিকেশন। ইস্টার্ন গ্রুপ তদন্তে নতুন নাম সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ছাড়াও জড়িত আরও একাধিক ব্যক্তি অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিস্তৃতি প্রতিটা শব্দ তার মাথায় আঘাত করছে। সে একটি দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে। শ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
তার ভেতরে এখন একটা নতুন ভয় জন্ম নিচ্ছে—সে একা না। সে শুধু একটা অংশ। এটা বড় কিছু। হঠাৎ তার ফোনে একটা কল আসে। অচেনা নম্বর। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর ধরে। অন্য পাশে একজন ঠান্ডা কণ্ঠে বলে, ইয়াসিন রহমান?
হ্যাঁ।
আপনাকে জানানো হচ্ছে, পরবর্তী কোর্ট শুনানিতে আপনার বিরুদ্ধে আরও শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে।
আপনার ব্যাংকিং লেনদেন, কিছু ব্যক্তিগত ট্রান্সফার এবং কিছু অস্বাভাবিক অনুমোদন। ইয়াসিন থেমে যায়।
কে এগুলো দিচ্ছে?
অন্য পাশ থেকে উত্তর আসে, তদন্ত টিম। কল কেটে যায়।
ইয়াসিন ফোনটা নিচে নামিয়ে রাখে। তার চোখে এখন আর রাগ নেই। শুধু ভয় আছে।
কারণ সে বুঝতে পারছে, সে ধীরে ধীরে একটা জালে আটকে যাচ্ছে, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ নেই।
অফিসে তামান্না এখন দাঁড়িয়ে আছে বোর্ডরুমে।
আজ এখানে শুধু বোর্ড মেম্বার নেই, আছে লিগ্যাল টিম, অডিট টিম, আর কিছু বিশেষ তদন্তকারী।
একজন সিনিয়র অডিট অফিসার বললেন, ম্যাডাম, আমরা এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি, তাতে এটা শুধু এক ব্যক্তির কাজ না। এখানে একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক আছে।
তামান্না ধীরে ধীরে বলল, নামগুলো বের করো। অফিসার একটু থেমে বললেন, যদি পুরো নেটওয়ার্ক সামনে আসে, তাহলে কোম্পানির কিছু পুরনো সিদ্ধান্তও প্রশ্নের মুখে পড়বে। এই কথাটা কক্ষের পরিবেশ বদলে দিল।
বোর্ড মেম্বাররা একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করল।
তামান্না তাদের দিকে একবার তাকাল। তার চোখে কোনো ভয় নেই। সে বলল, আমি ভয় পাই না সত্যকে।
তারপর একটু থামল। কারণ সত্য লুকিয়ে রাখলেই সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়। এই কথাটা যেন শেষ সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে ইয়াসিন এখন নিজের অতীত খুঁজে বের করার চূড়ান্ত চেষ্টা করছে। সে তার পুরনো অফিস ফাইল, ইমেইল, চ্যাট সব ঘাঁটছে। হঠাৎ সে একটা পুরনো মেসেজ পায়।
যেটা সাইফুল আলমের সাথে তার কথোপকথন। “এই ফাইলটা দ্রুত সাইন করো, দেরি হলে প্রজেক্ট আটকে যাবে।
সে তখন সাইন করেছিল, কারণ সে বিশ্বাস করেছিল।
এখন সে বুঝতে পারছে, সেই বিশ্বাসই তাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। তার হাত কাঁপছে। সে ফিসফিস করে বলে, আমি কি শুধু ব্যবহার হয়েছি?
কিন্তু উত্তর নেই।
কারণ এখন তার চারপাশে শুধু প্রশ্ন।
কোর্টের নতুন শুনানির দিন। সকাল থেকেই ভিড়।
মিডিয়া এবার আরও বেশি আগ্রহী। কারণ এবার শুধু ইয়াসিন না। নতুন নামও আসছে।
কোর্টরুমে সবাই বসে আছে। তামান্না এবার আগের মতোই স্থির। ইয়াসিন বসেছে একপাশে। তার চোখ এখন আর কাউকে খুঁজছে না। কারণ সে জানে, এবার লড়াই আর ব্যক্তিগত না। বিচার শুরু হয়।
নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
ব্যাংক ট্রানজেকশন, তৃতীয় পক্ষের লেনদেন, আর একটি অদ্ভুত সিরিজ ফাইল।
সবকিছু এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়।
আর সেই জায়গায় দেখা যায়—সাইফুল আলমের স্বাক্ষরিত কিছু অনুমোদন। ইয়াসিন তাকিয়ে থাকে।
এবার সে বুঝতে পারে, সে শুধু একা না। কিন্তু এটা তাকে স্বস্তি দেয় না। বরং আরও ভয় দেয়। কারণ নেটওয়ার্ক মানে বড় কিছু। বিচারক বলেন, তদন্ত বিস্তৃত করা হবে।
এই কথাটা কোর্টরুমে বসে থাকা সবাইকে চুপ করিয়ে দেয়।
তামান্না এবার একটু নড়ল।
তার চোখে প্রথমবারের মতো একটা নতুন দিক দেখা গেল।
এটা আর শুধু ইয়াসিন না।
এটা পুরো কাঠামো। কোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় ইয়াসিন এবার আর দৌড়ায় না। সে ধীরে হাঁটে। তার পাশে কেউ নেই।
কিন্তু তার মাথায় এখন একটা ভয়ংকর সত্য পরিষ্কার।
আমি শুধু পতনের শুরু।
অফিসে ফিরে তামান্না জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
আরিফ বললেন, ম্যাডাম, আমরা যদি পুরো নেটওয়ার্ক খুলে ফেলি, তাহলে কোম্পানির ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসবে। তামান্না ধীরে বলল, তাহলে ইতিহাস বদলাতেই হবে। তার চোখ শহরের দিকে।
এই শহর এখন আর শুধু আলো না। এটা এখন সত্যের যুদ্ধক্ষেত্র। রাত আবার নামছে। ইয়াসিন একা বসে আছে।
তার ভেতরে আর কোনো শক্তি নেই। শুধু অপেক্ষা।
কারণ এখন সে জানে, পরবর্তী শুনানিই তার শেষ সুযোগ।
আর তামান্না জানে, পরবর্তী পদক্ষেপই সবকিছু বদলে দেবে। গল্প এখন চূড়ান্ত জায়গার দিকে যাচ্ছে।
একদিকে সম্পূর্ণ ভাঙনের মুখে ইয়াসিন।
অন্যদিকে সত্য উন্মোচনের দ্বারপ্রান্তে তামান্না।
আর মাঝখানে পুরো একটা সিস্টেম, যা এখনো পুরোপুরি ধরা পড়েনি।
কোর্টরুমের ভারী নীরবতা এবার আর আগের মতো চাপা নয়, বরং এক ধরনের চূড়ান্ত মুহূর্তের অপেক্ষা।
সবাই জানে আজকের দিনটা শুধু আরেকটা শুনানি না, এটা সেই বিন্দু যেখানে পুরো গল্পটা দিক পরিবর্তন করবে।
ইয়াসিন বসে আছে একেবারে চুপচাপ। তার চোখের নিচে গভীর ক্লান্তি, চুল এলোমেলো, শার্টে আগের সেই শান নেই।
কয়েক সপ্তাহ আগেও যে মানুষটা আত্মবিশ্বাসে ভরা ছিল, সে এখন নিজের ভেতরের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে বসে আছে।
তার পাশে লিগ্যাল নোটিশ, কাগজপত্র, আর তার জীবনের সব ভুল একসাথে সাজানো।
অন্যদিকে তামান্না বসে আছে ঠিক আগের মতোই স্থির।
তার চোখে কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো উত্তেজনা নেই। যেন এই পুরো প্রক্রিয়াটা তার কাছে শুধু একটা হিসাব মেলানো। বিচার শুরু হয়।
আজকের শুনানিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—নতুন সাক্ষ্য এবং নেটওয়ার্কের মূল নাম প্রকাশ।
একজন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে বলেন, আমরা প্রমাণ পেয়েছি যে ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের কিছু আর্থিক সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াসিন রহমান দ্বারা হয়নি। এর পেছনে একটি সংগঠিত চেইন রয়েছে, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত সদস্যরা যুক্ত।
এই কথাটা কোর্টরুমে একটা ধাক্কার মতো লাগে। ইয়াসিন ধীরে ধীরে মাথা তোলে। সে জানে, এখন সে একা টার্গেট না।
কিন্তু তার জন্য এটা স্বস্তি না, বরং আরও ভয়।
কারণ বড় নেটওয়ার্ক মানে বড় শাস্তি, বড় তদন্ত, বড় সত্য।
তদন্ত কর্মকর্তা একটি নাম উচ্চারণ করেন।
সাইফুল আলম। এই নামটা শোনার সাথে সাথে কোর্টে এক ধরনের ফিসফিস শুরু হয়।
ইয়াসিন চুপ হয়ে যায়।
তার মনে পড়ে সেই পুরনো দিনগুলো, যখন সে শুধু নির্দেশ পেত, আর বিশ্বাস করে সাইন করত।
আজ সেই বিশ্বাসই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে।
তামান্না এবার একটু সামনে ঝুঁকে পড়ে।
তার চোখে প্রথমবার একটা গভীর পরিবর্তন আসে।
এটা শুধু একজন মানুষ না, সে বুঝতে পারে।
এটা একটা সিস্টেম।
বিচারক বলেন, পরবর্তী শুনানিতে এই নেটওয়ার্কের পূর্ণ তদন্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করতে হবে।
এই কথাটা যেন পুরো কেসটাকে আরও বড় করে দেয়।
কোর্ট শেষ হওয়ার পর ইয়াসিন বাইরে বের হয়।
এইবার মিডিয়ার ভিড় আগের চেয়ে বেশি।
ক্যামেরা, প্রশ্ন, চিৎকার—সবকিছু একসাথে।
কিন্তু ইয়াসিন কিছুই শুনছে না। তার চোখ শুধু সামনে।
সে একবারও তামান্নার দিকে তাকায় না।
কারণ সে জানে, এখন তাকানোর মানে আর কিছু বদলাবে না। তামান্না গাড়িতে উঠে চলে যায়।
তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
কিন্তু তার ভেতরে একটা সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে।
এই কেস আর শুধু ইয়াসিন নিয়ে না।
এটা এখন পুরো কাঠামো ভাঙার বিষয়।
পরবর্তী দিনগুলো যেন ঝড়ের মতো চলে যায়।
মিডিয়া একের পর এক খবর প্রকাশ করছে।
ইস্টার্ন গ্রুপের অভ্যন্তরীণ তদন্তে বড় নেটওয়ার্ক ফাঁস একাধিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রমাণ আর্থিক অনিয়মের বিস্তৃত চিত্র শহর এখন শুধু এই গল্প নিয়েই কথা বলছে। ইয়াসিন এখন আর কোথাও যায় না।
সে শুধু নিজের ঘরে থাকে। তার ফোন প্রায় সবসময় বন্ধ।
তার চারপাশে নীরবতা, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে তার নিজের চিন্তা তাকে প্রতিদিন ভেঙে দিচ্ছে।
সে বুঝতে পারছে, সে শুধু ভুল করেনি, সে ব্যবহার হয়েছে।
কিন্তু সেই উপলব্ধি এখন আর তাকে বাঁচাতে পারবে না।
অন্যদিকে তামান্না এখন অফিসে নেই।
সে একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করছে। এই রিপোর্ট শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে না। এটা পুরো সিস্টেমের বিরুদ্ধে।
আরিফ চৌধুরী বলেন, ম্যাডাম, যদি এই রিপোর্ট ফাইল হয়, তাহলে অনেক বড় নাম জড়াবে। রাজনৈতিক এবং কর্পোরেট দুই দিক থেকেই চাপ আসতে পারে।
তামান্না শান্তভাবে বলে, সত্য চাপ মানে বোঝে না। তার কণ্ঠ এবার চূড়ান্ত। এই রিপোর্টই ফাইনাল সাবমিশন। চূড়ান্ত কোর্ট সেশন। আজ কোর্টরুমে ভিড় আগের সব দিনের চেয়ে বেশি। সবাই জানে আজ সিদ্ধান্তের দিন।
বিচারক রায় শোনাতে শুরু করেন। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশনের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অনিয়মের সাথে একাধিক ব্যক্তি জড়িত। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াসিন রহমানের বিরুদ্ধে আংশিক দায় প্রমাণিত হলেও এটি একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ।
এই কথাটা শুনে ইয়াসিনের শরীর একটু কেঁপে ওঠে।
তার বিরুদ্ধে আংশিক দায়।
মানে সে পুরো একা না, কিন্তু সে দোষী।
বিচারক আরও বলেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলবে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে। এই রায় কোনো জয় না, কোনো পরাজয় না। এটা অপেক্ষা। কোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় ইয়াসিন ধীরে হাঁটে। তার পাশে কেউ নেই।
সে এবার তামান্নার দিকে তাকায়।
এই প্রথম।
তামান্না তার দিকে তাকায়।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলে যায়।
কিন্তু সেখানে কোনো ভালোবাসা নেই।
নেই ঘৃণাও।
শুধু অতীত।
ইয়াসিন ধীরে বলে, তুমি কি খুশি এখন?
তামান্না একটু চুপ থাকে।
তারপর বলে, আমি খুশি না।
আমি শান্ত।
এই কথাটা ইয়াসিনের সবচেয়ে বড় আঘাত।
কারণ সে বুঝে যায়, তার পতন এখন আর কারও অনুভূতির বিষয় না। এটা বাস্তব। কিছুদিন পর।
ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশন আবার স্থিতিশীল হচ্ছে।
নতুন কাঠামো, নতুন নিয়ম, নতুন স্বচ্ছতা।
তামান্না বোর্ডরুমে শেষ মিটিং করছে।
সবাই জানে এখন কোম্পানি আবার নতুনভাবে দাঁড়াচ্ছে।
আরিফ বলেন, ম্যাডাম, সব কিছু স্থিতিশীল।
তামান্না শুধু মাথা নাড়ে। তার চোখ জানালার বাইরে।
শহর আগের মতোই আছে। কিন্তু সে বদলে গেছে।
ইয়াসিন এখন একটি ছোট শহরের প্রান্তে থাকে।
তার জীবন এখন খুব সাধারণ। কোনো অফিস নেই, কোনো নাম নেই। সে এখন আর “ভাইস প্রেসিডেন্ট” না।
সে শুধু একজন মানুষ, যে নিজের ভুল বুঝতে শিখেছে।
একদিন সে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়।
তার চোখে কোনো আশা নেই, কোনো স্বপ্ন নেই। শুধু একটা উপলব্ধি। সবকিছু সে নিজের হাতে নষ্ট করেছে।
তামান্না একদিন অফিস থেকে বের হয়। গাড়িতে ওঠার আগে একবার পেছনে তাকায়। ইস্টার্ন গ্রুপ কর্পোরেশন এখন স্থির। সে জানে, যুদ্ধ শেষ।
কিন্তু ভেতরের কিছু প্রশ্ন এখনো বাকি। সে কি সত্যিই জিতে গেছে? না কি শুধু নিজের ভেতরের একটা শূন্যতা পূরণ করেছে? গাড়ি চলে যায়। শহরের আলো পেছনে হারিয়ে যায়।
গল্প শেষ। কিন্তু কিছু গল্প শেষ হলেও তার ছায়া থেকে যায়।
সমাপ্ত ----