ভাঙা বাড়িতে নতুন ভালোবাসার

আমার নতুন স্ত্রী খাদিজার সাত বছরের মেয়েটি, আয়রা, আমরা একা থাকলেই কাঁদতে শুরু করত। আমি যতবার জিজ্ঞেস করতাম কী হয়েছে, সে শুধু মাথা নিচু করে থাকত। খাদিজা তখন হালকা হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলত, ও তোমাকে এখনো আপন করে নিতে পারেনি।

kxz

কিন্তু একদিন, খাদিজা ব্যবসার কাজে বাইরে থাকার সময়, ছোট্ট আয়রা তার ব্যাগের ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে ফিসফিস করে বলল, “বাবা… এটা দেখো।”

সেই মুহূর্তে আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।

kx/춺'

আমার নাম মিস্টার ইয়াসিন। আমি ঢাকার একটি বড় হাসপাতালে জরুরি বিভাগের নার্স হিসেবে রাতের শিফটে কাজ করি। গভীর রাতের হাসপাতালের করিডোর, জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ, রোগীদের চাপা আর্তনাদ এসব আমার বহু বছরের পরিচিত। আমি খুব ভালো করেই জানি, মানুষের কষ্টেরও একটা ভাষা আছে।

ভয়েরও একটা আলাদা ছায়া থাকে। আর সেই কারণেই, খাদিজার বাড়িটা প্রথম দিন থেকেই আমাকে অদ্ভুত অস্বস্তি দিচ্ছিল। গাজীপুরের নিরিবিলি এলাকায় তাদের দোতলা বাড়িটা বাইরে থেকে খুব শান্ত আর সুন্দর দেখাত।

বারান্দায় টবে সাজানো ফুল, ড্রইংরুমে পরিপাটি সোফা, বাতাসে লেবুর সুগন্ধি সবকিছু যেন নিখুঁত।

খাদিজা এমনভাবে সব সামলে রাখত, যেন তার জীবনে কোনো অশান্তি নেই। কিন্তু আয়রার চোখ অন্য কথা বলত।

মেয়েটা ছিল খুব চুপচাপ। চিকন হাত-পা, ফ্যাকাসে মুখ, আর সবসময় বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখা তার প্রিয় খেলনা শিয়াল স্কুটি। আমি যখন প্রথম দিন নিজের ব্যাগ নিয়ে সেই বাড়িতে উঠলাম, আয়রা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি কি সত্যি এখানেই থাকবেন?”

আমি হেসে বলেছিলাম, “হ্যাঁ। আমি এখন তোমার বাবা।”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তারপর ধীরে মাথা নেড়েছিল। যেন আমার কথাটা সে মনে গেঁথে রাখল। কিন্তু বিয়ের পরের কয়েক সপ্তাহে আমি একটা বিষয় খেয়াল করলাম আমি আর আয়রা একা থাকলেই সে অকারণে ভয় পেয়ে যেত।

কখনো চুপচাপ কাঁদত, কখনো হঠাৎ শরীর শক্ত করে ফেলত। আর প্রতিবারই খাদিজা একই কথা বলত,
ও একটু বেশি আবেগপ্রবণ। অথবা, ও তোমাকে এখনো ভয় পায়।” আমি চেষ্টা করতাম বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিতে। কিন্তু কোথাও যেন একটা অস্বস্তি থেকেই যেত।

এক মঙ্গলবার রাতে খাদিজা ব্যবসার কাজে চট্টগ্রাম গেল। যাওয়ার আগে আমাকে মেসেজ করে লিখল,
“বাড়িটার খেয়াল রেখো।” সেদিন রাতে আমি আর আয়রা ড্রইংরুমে বসে একসাথে গ্রিল স্যান্ডউইচ আর স্যুপ খাচ্ছিলাম। টিভিতে একটা পুরোনো বাংলা সিনেমা চলছিল, যদিও আমাদের কারও মন সেদিকে ছিল না।

হঠাৎ খুব ক্ষীণ একটা শব্দ শুনলাম। কান্না নয়… যেন কেউ জোর করে কান্না চেপে রাখছে। আমি তাকিয়ে দেখি, আয়রার চোখ বেয়ে নীরবে পানি পড়ছে।

অথচ সে একদম স্থির হয়ে বসে আছে। আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, মা, কী হয়েছে?” সে টিভির দিকেই তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল, মা বলেছে… আমি যদি বেশি ঝামেলা করি, তাহলে সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যায়।

কথাটা শুনে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
আমি শান্ত গলায় বললাম, শোনো, তুমি কাঁদলে আমি কোথাও চলে যাব না। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে অদ্ভুত এক আশার আলো ফুটে উঠল।

কিন্তু পরক্ষণেই সেটা মিলিয়ে গেল। সেদিন গভীর রাতে হঠাৎ চাপা কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। আমি উঠে আয়রার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

সে কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। স্কুটিকে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল যে খেলনাটার মুখটাই বেঁকে গিয়েছিল। আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে বললাম, “আয়রা… কোথাও ব্যথা করছে?”

সে কেঁপে উঠল। “আমি বলতে পারব না” “কেন?”
সে ভয়ে দরজার দিকে তাকাল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “মা বলেছে কাউকে বললে আগুন নেমে আসবে”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। হাসপাতালে কাজ করতে করতে আমি অনেক মিথ্যা গল্প শুনেছি।

মানুষ নিজের আঘাত লুকাতে কত অজুহাত দেয়, আমি জানি। তাই আয়রার কণ্ঠে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম এই ভয়টা বানানো নয়। এর দুদিন পর খাদিজা ফিরে এলো।

হাতে কফির কাপ, মুখে স্বাভাবিক হাসি। রাতের খাবারের টেবিলে সে হঠাৎ আয়রার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সব ঠিকঠাক ছিল তো? কোনো নাটক করোনি তো?”

আয়রার হাত থেমে গেল। সে মাথা নিচু করে বলল,
“না মা…” আমি চুপচাপ বসে রইলাম। কিন্তু সেদিন থেকেই আমি আরও সতর্ক হয়ে গেলাম।
পরদিন সকালে আয়রা স্কুলের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।

তার ব্যাগটা চেয়ারের উপর খোলা ছিল।

আমি লক্ষ্য করলাম, তার জামার হাতা উল্টে গিয়ে কব্জির কাছে আটকে আছে। আমি স্বাভাবিকভাবে বললাম, “এদিকে আসো, আমি ঠিক করে দিচ্ছি।”

আমার হাত তার হাতার কাছে যেতেই সে ভয়ে এমনভাবে সরে গেল যে চেয়ারটা মেঝেতে ঘষা খেল।

আমি থমকে গেলাম। “আয়রা… আমি তো রাগ করিনি।”
সে প্রথমে হলওয়ের দিকে তাকাল। তারপর মূল দরজার দিকে। শেষে কাঁপতে কাঁপতে ব্যাগের ভেতর থেকে একটা নীল সোয়েটার বের করল। তারপর খুব আস্তে বলল,
“বাবা… এটা দেখো।”
আমি ধীরে ধীরে তার হাতার কাপড়টা ওপরে তুললাম।

আর সঙ্গে সঙ্গে আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল। তার ছোট্ট হাতে একটার পর একটা কালচে দাগ।

পুরোনো আঘাতের চিহ্ন। আর কনুইয়ের ওপরে যে বড় দাগটা ছিল, সেটার আকৃতি দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল!
সেদিন সকালে আয়রার হাতের দাগগুলো দেখার পর আমার মাথার ভেতর যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কাজ করতে করতে আমি বহু নির্যাতিত শিশুকে দেখেছি।

কারও শরীরে বেল্টের দাগ, কারও হাতে সিগারেটের ছ্যাঁকা, কারও চোখে সেই ভয়, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

আর আজ ঠিক সেই একই ভয় আমি দেখলাম ছোট্ট আয়রার চোখে। আমি খুব আস্তে তার হাতটা নিজের হাতে নিলাম। যেন একটু জোরে ধরলেই সে ভেঙে যাবে।

আয়রা কাঁপছিল।

আমি শান্ত স্বরে বললাম, “এগুলো কীভাবে হয়েছে মা?”
সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। তার ঠোঁট কাঁপছিল।

“আমি বললে মা রাগ করবে।”

“আমি আছি। কেউ তোমাকে কিছু করবে না।”

সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি একদিন গ্লাস ভেঙে ফেলেছিলাম।” আমার বুক ধক করে উঠল।

“তারপর?”

আয়রার চোখে পানি চলে এলো। “মা বলেছিল আমি নাকি সবকিছু নষ্ট করে ফেলি। তারপর… তারপর মা খুব রাগ করেছিল।” সে বাকিটা বলতে পারল না।

কিন্তু তার চোখের ভাষাই সব বলে দিচ্ছিল।

আমি অনুভব করলাম, আমার হাতের আঙুল শক্ত হয়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে একটা প্রচণ্ড রাগ জমতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে রাগ দেখালে চলবে না।

আয়রাকে নিরাপদ অনুভব করানোই সবচেয়ে জরুরি।

আমি ধীরে তার হাতার কাপড় নামিয়ে দিলাম। “স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। তুমি ভয় পেয়ো না, ঠিক আছে?”

সে দ্বিধাভরা চোখে তাকাল। “তুমি কি চলে যাবে না?”

এই প্রশ্নটা যেন আমার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধল।

আমি হাঁটু গেড়ে তার সমান হয়ে বললাম, “না।

আমি কোথাও যাচ্ছি না।” প্রথমবারের মতো সে খুব আস্তে আমার শার্টের হাতা ধরে ফেলল। এত ছোট্ট একটা স্পর্শ, অথচ সেই স্পর্শে কত অসহায় ভয় লুকিয়ে ছিল!

আমি তাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে সোজা হাসপাতালে চলে গেলাম। কিন্তু সেদিন পুরো শিফটজুড়ে আমার মাথায় শুধু আয়রার মুখটাই ঘুরছিল। রোগীদের স্যালাইন চেক করছি, রিপোর্ট লিখছি, স্ট্রেচার ঠেলছি কিন্তু মাঝেমাঝেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই কালচে দাগগুলো।

রাত তিনটার দিকে এক বৃদ্ধ রোগীর প্রেসার মাপতে মাপতে হঠাৎ আমার সহকর্মী সুমাইয়া বলল, “ইয়াসিন ভাই, আপনি ঠিক আছেন? আজকে খুব অস্থির লাগছে আপনাকে।”

আমি জোর করে হালকা হাসলাম। “ঘুম কম হয়েছে।”
কিন্তু আসল সত্যিটা আমি কাউকে বলতে পারলাম না।

সকালে বাসায় ফিরতেই দেখি খাদিজা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কফি বানাচ্ছে। পরিপাটি পোশাক, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, মুখে সেই স্বাভাবিক হাসি।

যেন পৃথিবীর সবকিছু ঠিকঠাক আছে।

সে আমাকে দেখে বলল, “এত সকালে এমন মুখ গম্ভীর কেন?” আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর শান্ত স্বরে বললাম, “আয়রার হাতে দাগ কেন?” খাদিজার হাত থেমে গেল।

মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য।

তারপর সে খুব স্বাভাবিক গলায় হেসে বলল, “ওহ, ওইটা? ও তো খুব অসাবধান। পড়ে গিয়েছিল।”

আমি ধীরে বললাম, “একটা দাগ না। অনেকগুলো।”

খাদিজার চোখে খুব ক্ষণিকের জন্য বিরক্তি ফুটে উঠল।

“তুমি কি বলতে চাচ্ছো আমি নিজের মেয়েকে মারি?”

আমি সরাসরি উত্তর দিলাম না। শুধু তাকিয়ে রইলাম।

খাদিজা এবার কফির মগটা টেবিলে একটু জোরে রাখল।

“দেখো ইয়াসিন, তুমি হাসপাতালের কাজ করতে করতে সবকিছু নিয়ে অতিরিক্ত ভাবো।

বাচ্চারা পড়ে যায়, আঘাত পায়। এটা স্বাভাবিক।”

তার কণ্ঠস্বর শান্ত ছিল। কিন্তু সেই শান্ত স্বরের নিচে চাপা রাগ আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম।

সেদিন দুপুরে আয়রা স্কুল থেকে ফিরল খুব চুপচাপ হয়ে।

আমি লক্ষ্য করলাম, সে বাসায় ঢুকেই প্রথমে খাদিজার মুখের দিকে তাকাল। যেন বুঝতে চাইছে আজ মায়ের মেজাজ কেমন।
খাদিজা সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছিল।

হঠাৎ সে ঠান্ডা গলায় বলল, “আজকে স্কুলে কোনো অভিযোগ আসেনি তো?” আয়রা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।

“না মা।” “হোমওয়ার্ক ঠিকমতো করেছ?”

“জি মা।”

“মিথ্যা বলছ না তো?” মেয়েটা কেঁপে উঠল।

আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। “খাদিজা, তুমি ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলছ কেন?”

সে আমার দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম হাসল। “কারণ আমি ওকে শাসন করি। সব মা-ই করে।”

তারপর সে আয়রার দিকে তাকিয়ে বলল, “যাও, নিজের ঘরে যাও।” আয়রা এক মুহূর্তও দেরি করল না।

দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

সেই রাতেই প্রথমবার আমি খাদিজাকে অন্য রূপে দেখলাম।
রাত প্রায় আড়াইটার দিকে আমার ঘুম ভেঙে যায়।

করিডোর থেকে চাপা শব্দ আসছিল। আমি দরজা খুলে বাইরে বের হলাম। ড্রইংরুমের অন্ধকারে শুধু রান্নাঘরের হালকা আলো জ্বলছিল। সেই আলোয় আমি দেখলাম খাদিজা আয়রার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

আয়রার হাত কাঁপছে। তার চোখ কান্নায় ভেজা।

খাদিজা নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলছিল, “তুমি কি আবার ওর কাছে কিছু বলেছ?”

আয়রা কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল। “না মা…”
“মিথ্যা বলো না।” “আমি কিছু বলিনি…”
খাদিজা হঠাৎ তার বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।

আমার শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তে গরম হয়ে উঠল। “খাদিজা!” সে চমকে ঘুরে দাঁড়াল।

আমাকে দেখে এক সেকেন্ডের জন্য তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। তারপর আবার সেই স্বাভাবিক ভাব এনে বলল, “ও দুঃস্বপ্ন দেখে কাঁদছিল।

আমি শুধু শান্ত করছিলাম।”

আমি আয়রার দিকে তাকালাম। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার ছোট্ট হাত দুটো ভয়ে কাঁপছে।

আমি ধীরে বললাম, “তুমি ঘরে যাও মা।”

আয়রা দৌড়ে চলে গেল। খাদিজা এবার বিরক্ত গলায় বলল, “তুমি আমাকে এমনভাবে দেখছ কেন?”

আমি ঠান্ডা স্বরে বললাম, “কারণ ও তোমাকে ভয় পায়।”

এক মুহূর্তে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

খাদিজার চোখ সরু হয়ে এলো। “তুমি জানো না একটা বাচ্চাকে একা বড় করা কত কঠিন।”

“তাই বলে মারবে?”
সে হঠাৎ হেসে উঠল। কিন্তু সেই হাসির ভেতর উষ্ণতা ছিল না। “তুমি এখন নিজেকে হিরো ভাবছ, তাই না?”

আমি কিছু বললাম না। খাদিজা ধীরে ধীরে আমার কাছে এগিয়ে এলো। “শোনো ইয়াসিন… সব বাচ্চাই একটু শাসন পায়। তুমি হাসপাতালে আহত মানুষ দেখো বলে এখন সবকিছু নির্যাতন মনে হচ্ছে।”

আমি তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল। খাদিজা কিছু লুকাচ্ছে।

আর আয়রার ভয় শুধু সাধারণ ভয় না।

পরদিন দুপুরে আমি ছুটি নিয়ে বাসায় ছিলাম। খাদিজা বাইরে গিয়েছিল। আয়রা নিজের রুমে চুপচাপ ছবি আঁকছিল। আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বললাম, “কি আঁকছ?” সে একটু চমকে তাকাল।

তারপর কাগজটা আড়াল করতে গেল।
আমি হেসে বললাম, “আমি দেখব না?”
কিছুক্ষণ দ্বিধা করে সে কাগজটা এগিয়ে দিল।
ছবিটা দেখে আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

ছবিতে একটা ছোট মেয়ে কোণায় বসে কাঁদছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা চুলওয়ালা একটা মহিলা। মহিলার হাতে আগুনের মতো লাল রঙ করা।

আর ছবির এক পাশে বড় বড় অক্ষরে লেখা
“খারাপ মেয়েদের আগুন নিয়ে যায়।”
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কে বলেছে?”
আয়রা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল।

আমি তার পাশে বসে নরম গলায় বললাম, “তুমি আমাকে সত্যি বলতে পারো।” সে চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “মা বলে… আমি যদি কারও কাছে কথা বলি, তাহলে আগুন এসে আমাকে নিয়ে যাবে। আর তুমি-ও চলে যাবে।”

আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

একটা সাত বছরের শিশুকে এভাবে ভয় দেখানো…
এটা শুধু শাসন না। এটা মানসিক নির্যাতন।

আমি বুঝতে পারছিলাম, বিষয়টা আমার ধারণার চেয়েও গভীর। ঠিক তখনই হঠাৎ মূল দরজার লক খোলার শব্দ হলো। খাদিজা ফিরে এসেছে।
আয়রা মুহূর্তের মধ্যে সাদা হয়ে গেল।

সে তাড়াতাড়ি ছবিটা ভাঁজ করে লুকিয়ে ফেলল।

আমি প্রথমবার পরিষ্কার বুঝলাম এই বাড়িতে কেউ একজন সবসময় ভয়ে বেঁচে আছে।
আর সেই মানুষটা একটা ছোট্ট শিশু। মূল দরজার লক খোলার সেই শব্দটা পুরো বাড়ির বাতাসই যেন বদলে দিল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগেও আয়রা আমার পাশে বসে কাঁপা গলায় কথা বলছিল।

কিন্তু দরজা খোলার শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সে যেন অন্য মানুষ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ছবিটা ভাঁজ করে খাতার ভেতর গুঁজে দিল, তারপর মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। আমি দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

খাদিজা ভেতরে ঢুকল ধীর পায়ে। তার হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ। মুখে সেই পরিচিত হাসি। বাইরে থেকে দেখলে কেউ কখনো বিশ্বাসই করবে না এই শান্ত, পরিপাটি মহিলার উপস্থিতিতেই একটা সাত বছরের বাচ্চা এত ভয় পায়।

খাদিজা আমাদের দুজনকে একসাথে বসে থাকতে দেখে থেমে গেল। তার চোখ একবার আয়রার দিকে গেল, তারপর আমার দিকে। “কি করছ তোমরা?”

আমি শান্ত স্বরে বললাম, “আয়রা ছবি আঁকছিল।”

খাদিজা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেসে বলল, “ও তো সারাদিন এসবই করে।”
তারপর সে আয়রার দিকে তাকাল। “হোমওয়ার্ক শেষ?”
আয়রা মাথা নিচু রেখেই বলল, “না মা… এখন করব।”

“এখন না। এই মুহূর্তে।” কথাটা খুব জোরে বলা হয়নি।

কিন্তু সেই স্বরের ভেতরে এমন একটা চাপা কঠোরতা ছিল যে আয়রা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

আমি খেয়াল করলাম, মেয়েটার ছোট্ট আঙুলগুলো কাঁপছে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একবার আমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে সাহায্যের জন্য এক ধরনের নীরব আকুতি ছিল।
আমি ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি চাপা দিলাম।

সেদিন রাতে ডিনার টেবিলে অদ্ভুত নীরবতা ছিল। শুধু চামচের শব্দ, প্লেটের শব্দ। কেউ তেমন কথা বলছিল না।

খাদিজা মাঝেমধ্যে ফোনে মেসেজ দেখছিল।

আয়রা চুপচাপ ভাত নাড়ছিল। মনে হচ্ছিল সে যতটা সম্ভব নিজেকে অদৃশ্য করে রাখতে চাইছে।

হঠাৎ খাদিজা বলল, “আজকে আয়রা স্কুলে আবার ড্রইং করেছে।” আমি তাকালাম। “তাতে সমস্যা কী?”

খাদিজা ঠান্ডা হাসল। “সমস্যা না। কিন্তু ওর টিচার বলেছে ও নাকি খুব অদ্ভুত ছবি আঁকে।” আয়রার হাত থেমে গেল।

খাদিজা এবার সরাসরি মেয়ের দিকে তাকাল। “তুমি কি আবার বাজে ছবি এঁকেছ?”

আয়রা কাঁপা গলায় বলল, না মা “মিথ্যা বলো না।”

আমি ধীরে বললাম, “খাদিজা, একটা বাচ্চা ছবি আঁকতেই পারে।” সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, কিন্তু চোখে হাসি ছিল না। “তুমি বুঝবে না ইয়াসিন। ও ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা।” “আলাদা মানে?”
খাদিজা পানি খেল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ও কল্পনায় অনেক কিছু বানিয়ে বলে।

আমি কিছু বললাম না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কথাটা গেঁথে গেল। খাদিজা কি ইচ্ছা করেই আয়রাকে অবিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করছে?
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার অস্বস্তিও বাড়তে লাগল।

সেদিন আমার নাইট শিফট ছিল না। তাই আমি বাসায়ই ছিলাম। রাত প্রায় একটা নাগাদ পানি খেতে উঠে দেখি আয়রার ঘরের দরজা অল্প ফাঁকানো।

ভেতর থেকে খুব আস্তে কান্নার শব্দ আসছে।
আমি ধীরে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

আয়রা বিছানার কোণায় বসে আছে। তার হাতে সেই পুরোনো খেলনা শিয়াল স্কুটি। ছোট্ট শরীরটা কাঁপছে।

আমি আস্তে বললাম, “ঘুমাওনি এখনো?”

সে চমকে উঠল। মনে হলো ভয়ে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। আমি ভেতরে ঢুকে বিছানার পাশে বসলাম। “ভয় পেয়েছ?” সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব আস্তে বলল, “তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?”

আমার বুক মোচড় দিয়ে উঠল। “আমি কেন রাগ করব?”
“কারণ আমি অনেক ঝামেলা করি।”

আমি বুঝতে পারছিলাম, এই কথাগুলো তার নিজের না। কেউ তাকে বারবার এসব বলেছে।

আমি নরম গলায় বললাম, “শোনো, তুমি কোনো ঝামেলা না।” আয়রার চোখ ভিজে উঠল।

সে হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, “আমার আসল বাবাও একদিন এটাই বলেছিল।” আমি থমকে গেলাম।

এই প্রথম সে তার বাবার কথা বলল।
“তোমার বাবা কোথায়?”
আয়রা নিচের দিকে তাকাল। “মা বলে উনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। তুমি কি তাকে মনে করতে পারো?

সে আস্তে মাথা নাড়ল। অল্প অল্প। কেমন ছিলেন উনি?

আয়রার ঠোঁটে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল। উনি আমাকে রাতে গল্প শোনাত। আমার বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারপর?

হাসিটা মিলিয়ে গেল। তারপর একদিন উনি আর আসেনি। কেন? সে কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখে এমন এক শূন্যতা ছিল, যেটা সাত বছরের একটা বাচ্চার চোখে থাকার কথা না।

ঠিক তখনই করিডোরে কারও পায়ের শব্দ হলো।

আয়রা মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল। দরজায় খাদিজা দাঁড়িয়ে।
তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
সে ধীরে বলল, “এত রাতে এখানে কী হচ্ছে?”

আমি উঠে দাঁড়ালাম। আয়রার ঘুম আসছিল না।

খাদিজা মেয়ের দিকে তাকাল। “আমি কি তোমাকে বলিনি রাত জাগা শরীরের জন্য খারাপ?”

আয়রা মাথা নিচু করল। সরি মা সরি বললেই সব ঠিক হয় না। আমি এবার স্পষ্ট বিরক্ত হলাম।

খাদিজা, ও শুধু কথা বলছিল। সে আমার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।

তারপর খাদিজা ঠান্ডা গলায় বলল, “ইয়াসিন, তুমি ওকে খুব বেশি আদর দিচ্ছ।

আমি অবাক হলাম। “একটা বাচ্চার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করাই কি বেশি আদর?”

সে মৃদু হেসে বলল, “তুমি বুঝবে না। বাচ্চারা সুযোগ নিতে শিখে যায়।” আমি উত্তর দিলাম না।

কারণ সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম, এই মহিলাকে আমি এখনো ঠিকভাবে চিনতেই পারিনি।
পরদিন সকালে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমি আয়রার স্কুলে যাব।

খাদিজা তখনও ঘুমাচ্ছিল। আমি আয়রাকে নিয়ে স্কুলে গেলাম। পুরো রাস্তা সে চুপচাপ ছিল।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। স্কুলে পৌঁছে আমি তাকে ক্লাসে পাঠিয়ে অফিস রুমে গেলাম।

আয়রার ক্লাস টিচার, নুসরাত ম্যাডাম, খুব ভদ্র মহিলা। আমি নিজের পরিচয় দিলাম।

তিনি হালকা অবাক হয়ে বললেন, “ওহ, আপনি আয়রার বাবা?” এক সেকেন্ডের জন্য তার মুখে অদ্ভুত একটা ভাব ফুটে উঠল। আমি সেটা খেয়াল করলাম।

“আসলে আমি ওর সৎ বাবা।”

নুসরাত ম্যাডাম ধীরে মাথা নাড়লেন। “বসুন।”

আমি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললাম, “আমি আসলে আয়রাকে নিয়ে একটু চিন্তিত।”

তিনি চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর নিচু গলায় বললেন, “আমরাও।”

আমার বুক ধক করে উঠল। “মানে?”
তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটা ফাইল খুললেন।

ভেতরে আয়রার আঁকা কয়েকটা ছবি।

প্রতিটা ছবিতেই একই জিনিস।

একটা ছোট মেয়ে। একটা অন্ধকার ঘর। আর আগুনের মতো লাল রঙ। আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

নুসরাত ম্যাডাম বললেন, “আয়রা খুব ভয় পায়। কেউ হঠাৎ জোরে কথা বললে ও কেঁপে ওঠে।

অনেক সময় ক্লাসে বসে বসে কাঁদে।”

আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, “ও কি কিছু বলেছে?”

তিনি দ্বিধা করলেন। তারপর বললেন, “একদিন ও বলেছিল যদি সে খারাপ মেয়ে হয়, তাহলে আগুন এসে তাকে নিয়ে যাবে।” আমার হাত মুঠো হয়ে গেল। ঠিক একই কথা।

নুসরাত ম্যাডাম এবার খুব সাবধানে বললেন, “মিস্টার ইয়াসিন… আমি ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাই না।

কিন্তু একটা শিশুর আচরণ অনেক কিছু বলে দেয়।”

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। “আমি বুঝতে পারছি।”

তিনি আরও নিচু গলায় বললেন, “আরেকটা বিষয় আছে।

কি?
একদিন আয়রা হঠাৎ বলেছিল, তার বাবা নাকি হারিয়ে যায়নি। আমার বুকের ভেতর কেমন থেমে গেল।

মানে?

নুসরাত ম্যাডাম ধীরে বললেন, “ও বলেছিল… তার মা সবাইকে মিথ্যা কথা বলে।”

আমি কিছুক্ষণ পুরো নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম।

মাথার ভেতর যেন হাজারটা শব্দ একসাথে বাজতে লাগল।
আয়রার আসল বাবা কোথায়?
তিনি কি সত্যিই পরিবার ছেড়ে চলে গেছেন?

নাকি…

আমার চিন্তা হঠাৎ থেমে গেল।

কারণ সেই মুহূর্তে একটা ভয়ংকর সম্ভাবনা প্রথমবারের মতো মাথায় এলো। স্কুল থেকে বেরিয়ে আমি গাড়িতে বসে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে রইলাম।

হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে।

আমার মনে হচ্ছিল, আমি ধীরে ধীরে এমন একটা সত্যের দিকে এগোচ্ছি যেটা হয়তো জানার জন্য আমি প্রস্তুত না।

বাড়িতে ফিরতেই দেখি খাদিজা ড্রইংরুমে বসে আছে।
সে আমাকে দেখেই বুঝে গেল কিছু একটা হয়েছে।

“তুমি কোথায় গিয়েছিলে?”

আমি জুতা খুলতে খুলতে বললাম, “আয়রার স্কুলে।”
তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

হঠাৎ?

আমি সরাসরি তার দিকে তাকালাম। তোমার আগের স্বামীর কী হয়েছিল?

পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। খাদিজার চোখ ধীরে ধীরে সরু হয়ে এলো। তারপর সে খুব আস্তে বলল, “তুমি এসব কেন জানতে চাইছ?” আমি উত্তর দিলাম না। সে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে সেই ঠান্ডা, অচেনা অভিব্যক্তি।

“আয়রা কি তোমাকে কিছু বলেছে?”

আমার বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি শুরু হলো।

কারণ এই প্রথমবার আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম
এই বাড়ির দেয়ালের ভেতর শুধু ভয় না। আরও অনেক অন্ধকার লুকিয়ে আছে। আয়রা কি তোমাকে কিছু বলেছে? খাদিজার প্রশ্নটা ঘরের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলল। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেই চোখে এবার আর আগের মতো নরম ভাব নেই। বরং একটা অদ্ভুত সতর্কতা কাজ করছে। যেন সে বুঝে গেছে, আমি ধীরে ধীরে এমন কিছু জানতে শুরু করেছি যেটা সে বহুদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছে। আমি ধীরে সোফার পাশে দাঁড়ালাম।

“আমি শুধু জানতে চেয়েছি তোমার আগের স্বামীর কী হয়েছিল।”
খাদিজা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর খুব আস্তে হেসে বলল, “এতদিন পর হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?” কারণ আয়রা এখনো তাকে মনে করে।

আমার কথায় তার মুখের পেশি শক্ত হয়ে উঠল।

“বাচ্চারা অনেক কিছুই মনে করে।”

আমি এবার সরাসরি বললাম, “স্কুলের টিচারও চিন্তিত।”
এক মুহূর্তে তার চোখ পাল্টে গেল।

“তুমি স্কুলে গিয়ে এসব আলোচনা করেছ?”

“আমি ওর অভিভাবক। সেটা করার অধিকার আমার আছে।” খাদিজা এবার ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলো। তার ঠোঁটে হালকা হাসি, কিন্তু সেই হাসির নিচে চাপা রাগ ফুটে উঠছে। “ইয়াসিন… তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ?” আমি উত্তর দিলাম না।

ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা ঝুলে রইল।

তারপর খাদিজা ঠান্ডা গলায় বলল, “আমার আগের স্বামী আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এইটাই সত্যি।”

কোথায় গেছে? জানি না। তুমি খুঁজোনি?
সে এবার বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। “সব সম্পর্ক সিনেমার মতো না। কিছু মানুষ একদিন হঠাৎ চলে যায়।

আমি লক্ষ্য করলাম, কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো কষ্ট নেই।
বরং যেন আগেই মুখস্থ করা একটা উত্তর বলছে।

আমি আর কিছু বললাম না।

কারণ বুঝতে পারছিলাম, এখন চাপ দিলে সে আরও গুটিয়ে যাবে। সেদিন রাতটা অদ্ভুতভাবে কেটে গেল।

খাদিজা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল। টিভি দেখল, ফোনে কথা বলল, এমনকি মাঝেমধ্যে হেসেও উঠল।

কিন্তু আমি খেয়াল করলাম, সে বারবার আয়রার দিকে নজর রাখছে। আর আয়রা?
সে যেন পুরোপুরি চুপ হয়ে গেছে।
রাতের খাবারের সময় একবারও চোখ তুলে তাকায়নি।

আমি বুঝলাম, আজ বাড়ির ভেতর কোনো অদৃশ্য উত্তেজনা ছড়িয়ে আছে। রাত দুইটার দিকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। হাসপাতালে বহু বছর নাইট শিফটে কাজ করার কারণে খুব হালকা শব্দেও আমার ঘুম ভাঙে।

প্রথমে মনে হলো রান্নাঘরে কিছু পড়ে গেছে।
তারপর আবার শব্দটা হলো। খুব আস্তে।

টক…
টক…
টক…

আমি বিছানা থেকে উঠে দরজা খুললাম। পুরো করিডোর অন্ধকার। শুধু নিচতলার সিঁড়ির পাশে হালকা হলুদ আলো জ্বলছে। আমি ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগলাম।

আর তখনই দেখলাম আয়রা রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে ছোট্ট গোলাপি নাইটড্রেস। হাতে স্কুটি।

মেয়েটা কাঁপছে। আমি দ্রুত এগিয়ে গেলাম। “আয়রা?”
সে চমকে উঠল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “আমি শব্দ শুনেছি।” কীসের শব্দ?
সে রান্নাঘরের স্টোররুমের দিকে আঙুল তুলল।

আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম।

স্টোররুমটা বাড়ির এক কোণায়। দরজাটা সবসময় বন্ধ থাকে। আমি কখনো ওখানে যাইনি।

আমি শান্ত স্বরে বললাম, “সম্ভবত ইঁদুর।”
আয়রা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না।”

“তাহলে?”

সে ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর খুব আস্তে বলল, ওই ঘরটা মা খুলতে দেয় না।
আমার ভেতরে কেমন অস্বস্তি জেগে উঠল।

কেন? আয়রা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর ফিসফিস করে বলল, কারণ ওখানে খারাপ জিনিস আছে। ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে খাদিজার গলা ভেসে এলো। আয়রা! মেয়েটা এমনভাবে কেঁপে উঠল যেন বিদ্যুৎ লেগেছে। খাদিজা সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ অন্ধকারে পুরো বোঝা যাচ্ছে না।

“তুমি নিচে কী করছ?”

আয়রা তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করল। “আমি পানি খেতে এসেছিলাম।”
খাদিজা ধীরে ধীরে নিচে নামল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ও রাতে ঘুমের মধ্যে হাঁটে।”

আমি অবাক হলাম। ও আগে কখনো “অনেক কিছুই তুমি এখনো জানো না।”
কথাটা বলে সে আয়রার হাত ধরে ওপরে নিয়ে গেল।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

কিন্তু আমার মাথায় বারবার ঘুরতে লাগল স্টোররুমটার কথা। পরদিন সকাল। খাদিজা বাজারে গেছে।

আয়রা নিজের ঘরে বসে ছিল। আমি নিচে নেমে স্টোররুমের সামনে এসে দাঁড়ালাম।

দরজায় তালা নেই।

কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে যেন আটকে আছে।
আমি ধীরে হাত রাখলাম।

দরজাটা কিঞ্চিৎ শব্দ করে খুলে গেল।
ভেতরে ধুলোমাখা গন্ধ।

ছোট্ট একটা ঘর। পুরোনো বাক্স, ভাঙা চেয়ার, কিছু কার্টন।
প্রথম দেখায় খুব সাধারণ লাগল।
আমি ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকালাম।

হঠাৎ চোখ পড়ল দেয়ালের দিকে।
দেয়ালের নিচের অংশে অদ্ভুত কালচে দাগ।
যেন কোনো সময় সেখানে কিছু পুড়েছিল।

আমার বুকের ভেতর হালকা চাপ অনুভব হলো।
আমি আরও এগিয়ে গেলাম।
এক কোণায় একটা পুরোনো কাঠের আলমারি।

আলমারির দরজা আধখোলা।
আমি খুলতেই ভেতর থেকে একটা ছোট্ট বাক্স পড়ে গেল।
মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল কিছু কাগজ আর কয়েকটা ছবি।

আমি নিচু হয়ে একটা ছবি হাতে নিলাম।
ছবিতে খাদিজা। তার পাশে এক লোক দাঁড়িয়ে।

লোকটার মুখে হাসি। কোলে ছোট্ট আয়রা।
আমার ধারণা এটাই তার আগের স্বামী।

ছবিটার পেছনে লেখা আমাদের প্রথম ঈদ। রাফিন, খাদিজা আর আয়রা। রাফিন।
প্রথমবার আমি নামটা জানলাম।
আমি আরও কিছু ছবি দেখলাম।
সবগুলোতেই রাফিন আর আয়রা খুব কাছাকাছি।

কিন্তু একটা জিনিস অদ্ভুত লাগল। শেষের দিকের ছবিগুলোতে রাফিনের মুখ ক্রমশ ক্লান্ত আর চিন্তিত দেখাচ্ছে। যেন সে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল।

আমি বাক্সটা আবার দেখতে গিয়ে একটা কাগজ পেলাম।
ভাঁজ করা। হালকা হলদেটে হয়ে গেছে।

আমি খুললাম। এটা একটা হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন।
রোগীর নাম খাদিজা রহমান।

ডাক্তারের নোটে লেখা উচ্চ মাত্রার রাগ নিয়ন্ত্রণ সমস্যা, আচরণগত অস্থিরতা, আবেগজনিত বিস্ফোরণ।

আমার বুক ধক করে উঠল।

আরও নিচে লেখা চিকিৎসা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া জরুরি। আমি স্থির হয়ে গেলাম।
ঠিক তখনই পেছনে দরজার শব্দ হলো।

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। দরজায় খাদিজা দাঁড়িয়ে।
তার হাতে বাজারের ব্যাগ।

কিন্তু তার চোখ…সেই চোখে এবার এমন কিছু ছিল যা আমি আগে কখনো দেখিনি। ঠান্ডা। ভয়ংকর ঠান্ডা।

সে ধীরে বলল, “তুমি এখানে কী করছ?”

আমার হাতে তখনো প্রেসক্রিপশনটা।

কয়েক সেকেন্ড কেউ নড়ল না। তারপর খাদিজা দরজা বন্ধ করে দিল। খট করে লকের শব্দ হলো।

আমার বুকের ভেতর কেমন শক্ত হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলো।

“তুমি আমার জিনিসপত্রে হাত দিয়েছ?”
আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করলাম। “আমি শুধু ”
“শুধু কী?”
তার কণ্ঠ এবার বদলে গেছে।
আগের সেই নরম, নিয়ন্ত্রিত স্বর নেই।

আমি বুঝলাম, এই প্রথমবার আমি তার আসল রূপের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

খাদিজা আমার হাত থেকে প্রেসক্রিপশনটা টেনে নিল।
তারপর কয়েক সেকেন্ড সেটা দেখে হেসে উঠল।

কিন্তু সেই হাসি স্বাভাবিক না।
তুমি ভাবছ আমি পাগল?
আমি ধীরে বললাম, “আমি সেটা বলিনি।

সে আরও কাছে এলো। “রাফিনও এটাই ভাবত।”
আমার বুক কেঁপে উঠল। “রাফিন কোথায়?”
খাদিজার চোখে অদ্ভুত ঝিলিক ফুটে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ফিসফিস করে বলল, “মানুষ যখন বেশি প্রশ্ন করে, তখন একসময় হারিয়ে যায়।”

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে আয়রার কণ্ঠ ভেসে এলো।
“বাবা…?”
খাদিজার মুখ মুহূর্তে বদলে গেল। আবার সেই স্বাভাবিক শান্ত চেহারা। সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে।

কারণ এখন আমি নিশ্চিত এই বাড়িতে শুধু নির্যাতন না…
আরও ভয়ংকর কিছু লুকিয়ে আছে। ই বাড়িতে শুধু নির্যাতন না আরও ভয়ংকর কিছু লুকিয়ে আছে। স্টোররুমের ভেতর দাঁড়িয়ে আমি কয়েক সেকেন্ড নিঃশ্বাস নিতেই পারছিলাম না। খাদিজার শেষ কথাটা মাথার ভেতর ঘুরছিল।
“মানুষ যখন বেশি প্রশ্ন করে, তখন একসময় হারিয়ে যায়।”
কথাটা সে এমনভাবে বলেছিল, যেন এটা কোনো হুমকি না। বরং খুব সাধারণ একটা সত্য।
আমি ধীরে ধীরে স্টোররুম থেকে বের হলাম। ওপরে আয়রার রুম থেকে হালকা শব্দ আসছে। খাদিজা আবার স্বাভাবিক ভান করে কথা বলছে।
যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু এখন আমি জানি, এই বাড়ির দেয়ালের নিচে বহুদিনের অন্ধকার জমে আছে।
আমি সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করলাম। মাথার ভেতর একটার পর একটা চিন্তা ঘুরছে।
রাফিন। খাদিজার আগের স্বামী।
তিনি সত্যিই কি পরিবার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন?
নাকি… আমার চিন্তা থেমে গেল।
কারণ হঠাৎ একটা বিষয় মনে পড়ল।
স্টোররুমের দেয়ালের পোড়া দাগ।
কেন ওখানে আগুনের চিহ্ন থাকবে?
আর আয়রা বারবার আগুনের কথা কেন বলে?
আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ অনুভব হলো।
আমি বিছানায় বসে ফোন বের করলাম। অনেক খুঁজে অবশেষে হাসপাতালের এক পুরোনো পরিচিত লোকের নম্বর পেলাম। নাম সাইফুল। আগে পুলিশের সঙ্গে মেডিকেল কো-অর্ডিনেশনে কাজ করত।
ফোন ধরতেই সে হাসল। “ইয়াসিন ভাই! অনেকদিন পর!”
আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। “তোকে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করব।”
“বলো।”
“চার-পাঁচ বছর আগে গাজীপুরে রাফিন নামে কারও নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট হয়েছিল কি?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ।
তারপর সে বলল, “পুরো নাম জানো?”
“না।”
“গাজীপুরে এমন কেস অনেক হয় ভাই। একটু সময় লাগবে।”
“খুঁজে দেখতে পারবি?”
“চেষ্টা করব।”
ফোন কেটে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
ঠিক তখন দরজায় নক পড়ল।
আমার বুক ধক করে উঠল।
দরজা খুলতেই আয়রা।
সে খুব আস্তে বলল, “তুমি রাগ করেছ?”
আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। “না মা।”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “মা যখন রাগ করে… তখন তার চোখ অন্যরকম হয়ে যায়।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কেমন?”
আয়রা ফিসফিস করে বলল, “খুব ভয়ংকর।”
আমি কিছু বললাম না।
সে আরও কাছে এসে খুব আস্তে বলল, “তুমি রাতে দরজা লক করে ঘুমিও।”
আমার বুকের ভেতর যেন কাঁটা বিঁধল।
“কেন?”
আয়রা ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর মাথা নাড়ল। “আমি বলতে পারব না।”
“মা নিষেধ করেছে?”
সে ধীরে মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই করিডোরে খাদিজার পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আয়রা সঙ্গে সঙ্গে সরে দাঁড়াল।
খাদিজা দরজার সামনে এসে হালকা হাসল। “মা, তুমি এখানে কী করছ?”
“আমি শুধু—”
“ঘুমানোর সময় হয়ে গেছে।”
আয়রা মাথা নিচু করে চলে গেল।
খাদিজা এবার আমার দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না।
তারপর সে হেসে বলল, “তুমি আজকাল খুব চুপচাপ হয়ে গেছ।”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “কাজের চাপ।”
“নাকি অন্য কিছু?”
আমি বুঝলাম, সে আমাকে লক্ষ্য করছে।
আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম, “তুমি কি এখনও ডাক্তার দেখাও?”
খাদিজার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে বদলে গেল।
“মানে?”
“স্টোররুমে প্রেসক্রিপশনটা দেখেছি।”
কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।
তারপর সে ধীরে দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকল।
“তুমি জানো সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার কী?”
আমি চুপ করে রইলাম।
সে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। “মানুষ যখন অর্ধেক সত্য জানে, তখন সে পুরো গল্পটা নিজের মতো বানিয়ে নেয়।”
“তাহলে পুরো সত্য বলো।”
খাদিজা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর ধীরে বলল, “হ্যাঁ, আমি চিকিৎসা নিয়েছিলাম। রাফিনের সময়।”
“কেন?”
সে তিক্ত হেসে উঠল। “কারণ আমার স্বামী আমাকে পাগল প্রমাণ করতে চাইত।”
আমি ভ্রু কুঁচকালাম।
খাদিজা এবার জানালার দিকে তাকাল। “রাফিন বাইরে থেকে খুব ভালো মানুষ ছিল। সবাই তাকে পছন্দ করত। কিন্তু বাসার ভেতরে সে অন্যরকম ছিল।”
“কী করত?”
“রেগে গেলে জিনিসপত্র ভাঙত। চিৎকার করত।”
আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম।
সে নিচু গলায় বলল, “একদিন তো আয়রার সামনেই গ্লাস ছুড়ে মেরেছিল।”
আমার বুক ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।
“তারপর?”
“তারপর আমি তাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছিলাম।”
“আর সে চলে গেল?”
খাদিজা এবার সরাসরি আমার দিকে তাকাল। “হ্যাঁ।”
তার চোখে পানি চিকচিক করছে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই কান্নাটাও যেন পুরোপুরি সত্যি মনে হলো না।
সে ধীরে বলল, “তুমি কি জানো কেমন লাগে যখন একজন মানুষ হঠাৎ সব দোষ তোমার ওপর চাপিয়ে চলে যায়?”
আমি উত্তর দিলাম না।
কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম না কোনটা সত্যি আর কোনটা অভিনয়।
সেই রাতটা আমি প্রায় জেগেই কাটালাম।
ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙল।
সাইফুল।
আমি দ্রুত ফোন ধরলাম। “হ্যালো?”
ওপাশে কণ্ঠটা এবার আগের মতো হালকা নেই।
“ইয়াসিন ভাই… একটা বিষয় পেয়েছি।”
আমার বুক ধক করে উঠল। “কি?”
“চার বছর আগে রাফিন রহমান নামে একজনের নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছিল।”
আমি উঠে বসলাম। “তারপর?”
“কেসটা অদ্ভুত ছিল।”
“কেন?”
সাইফুল নিচু গলায় বলল, “লোকটা হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। গাড়ি পাওয়া গিয়েছিল রাস্তার পাশে। কিন্তু মানুষটা আর মেলেনি।”
আমার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“পুলিশ কী বলেছিল?”
“প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল সে নিজে থেকেই চলে গেছে।”
“তারপর?”
সাইফুল থামল।
“তারপর কিছু প্রতিবেশী বলেছিল, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে বাসা থেকে প্রচণ্ড ঝগড়ার শব্দ এসেছিল।”
আমার বুকের ভেতর কেমন শক্ত হয়ে গেল।
“খাদিজার নাম উঠেছিল?”
“হ্যাঁ। কিন্তু প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”
আমি ধীরে বললাম, “আর কিছু?”
সাইফুল এবার ফিসফিস করে বলল, “একটা আনঅফিশিয়াল কথা ছিল।”
“কি কথা?”
“লোকজন বলত, রাফিন নাকি মেয়েকে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিল।”
আমার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো।
ঠিক তখনই পেছনে দরজার শব্দ হলো।
আমি ঘুরে তাকালাম।
খাদিজা দাঁড়িয়ে।
আমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
সে ধীরে জিজ্ঞেস করল, “কার সঙ্গে কথা বলছিলে?”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলাম। “হাসপাতালের একজন।”
“এত সকালে?”
তার চোখ এবার সরাসরি আমার মুখে।
আমি বুঝলাম, সে সন্দেহ করছে।
খাদিজা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকল। তারপর বিছানার পাশে বসে পড়ল।
“ইয়াসিন…”
তার কণ্ঠ হঠাৎ নরম হয়ে গেল।
“তুমি কি আমাকে ভয় পাও?”
প্রশ্নটা অদ্ভুত।
আমি বললাম, “না।”
সে আমার দিকে ঝুঁকে এলো। “কিন্তু তোমার চোখ অন্য কথা বলছে।”
আমার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো।
কারণ এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম না—
সে আমাকে ভালোবাসার অভিনয় করছে…
নাকি আমার মাথার ভেতর কী চলছে সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।
সেদিন দুপুরে আমি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হলাম। কিন্তু মন পুরোপুরি অস্থির।
শিফটের মাঝখানে বারবার ফোন চেক করছি।
আয়রার কথা মনে পড়ছে।
খাদিজার কথাও।
রাত আটটার দিকে হঠাৎ আমার ফোনে একটা মেসেজ এলো।
নাম্বার অচেনা।
মেসেজে শুধু লেখা—
“স্টোররুমের নিচে দেখুন।”
আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে কল দিলাম।
নাম্বার বন্ধ।
পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
শিফট শেষ হতেই আমি দ্রুত বাসায় ফিরলাম।
বাড়ি অদ্ভুত নীরব।
খাদিজা ড্রইংরুমে নেই।
আয়রার রুমের দরজা বন্ধ।
আমি সোজা স্টোররুমের সামনে গেলাম।
দরজাটা অল্প খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই সেই পুরোনো ধুলোর গন্ধ।
আমি হাঁটু গেড়ে মেঝের দিকে তাকালাম।
স্টোররুমের এক কোণায় পুরোনো কার্পেট বিছানো।
আমি সেটা সরালাম।
নিচে কাঠের একটা অংশ আলাদা মনে হচ্ছে।
হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল।
আমি হাত দিয়ে চাপ দিলাম।
কাঠের অংশটা কিঞ্চিৎ নড়ে উঠল।
তার নিচে ছোট্ট গোপন খোপ।
আমার হাত কাঁপছিল।
আমি ধীরে সেটা খুললাম।
ভেতরে একটা পুরোনো মোবাইল ফোন।
আর একটা ছোট্ট ডায়েরি।
আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি আমার কিছু হয়, তাহলে কেউ যেন আয়রাকে বাঁচায়।”
নিচে নাম। রাফিন রহমান। আমার হাত কাঁপছিল। স্টোররুমের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আমি কিছুক্ষণ ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি হচ্ছে।
বাইরে তখন গভীর রাত। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।

আমি ধীরে ডায়েরির প্রথম পাতা উল্টালাম।

পাতাগুলো পুরোনো। কিছু জায়গায় কালি ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু লেখা এখনো পরিষ্কার।

“আমি জানি না কেউ কখনো এটা খুঁজে পাবে কিনা। যদি পায়, তাহলে বুঝবে আমি পাগল ছিলাম না।”

আমার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।
আমি আরও পড়তে লাগলাম।

“খাদিজা আগের মতো নেই। ছোট ছোট বিষয়েও ওর আচরণ বদলে যায়। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্বাভাবিক থাকে, আবার হঠাৎ এমন রেগে যায় যেন অন্য মানুষ।”

আমার মাথায় একে একে গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনা ভেসে উঠতে লাগল। আয়রার ভয়। রাতের ফিসফিস।

খাদিজার চোখের সেই অদ্ভুত পরিবর্তন।

আমি দ্রুত পরের পাতা উল্টালাম।

“প্রথমে আমি ভেবেছিলাম ও শুধু মানসিক চাপে আছে। কিন্তু এখন আমি ভয় পাচ্ছি। বিশেষ করে আয়রার জন্য।”

আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।

ডায়েরির একটা পাতায় কালি ছোপ ছোপ হয়ে গেছে। যেন লেখার সময় হাত কাঁপছিল।

“আজ আয়রার হাতে দাগ দেখলাম। খাদিজা বলল ও পড়ে গেছে। কিন্তু আমি বুঝেছি এটা মিথ্যা।”

আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
রাফিনও একই জিনিস দেখেছিল।

আমি পড়তে লাগলাম। “আমি আয়রাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু খাদিজা বলেছে আমি যদি ওকে ছেড়ে যাই, তাহলে সে নিজেকে শেষ করে দেবে।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম। এখন সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। খাদিজা শুধু আয়রাকে মানসিকভাবে ভয় দেখায় না… সে মানুষকে নিজের চারপাশে আটকে রাখে।

ডায়েরির শেষের দিকের পাতাগুলো আরও অস্থির।
“আজ রাতে ও আবার স্টোররুমে আগুন জ্বালিয়েছিল।”

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আগুন।
আবার সেই আগুন।
“ও বলে আগুন সব পাপ মুছে দেয়।”
আমার হাতের তালু ঘামে ভিজে গেল।
ঠিক তখনই ওপরে খুব আস্তে মেঝে চাপার শব্দ হলো।

আমি জমে গেলাম। কেউ হাঁটছে। স্টোররুমের দরজার বাইরে করিডোরে খুব ধীরে পায়ের শব্দ এগিয়ে এলো।

আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

আমি তাড়াতাড়ি ডায়েরি আর ফোনটা জ্যাকেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিলাম। পায়ের শব্দ দরজার সামনে এসে থামল।
কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।
তারপর খুব আস্তে দরজাটা খুলল। খাদিজা।

অন্ধকারে তার মুখ পুরো দেখা যাচ্ছে না। শুধু চোখ দুটো।
সে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

“তুমি এখানে কী করছ?”

আমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলাম। “একটা শব্দ শুনেছিলাম।” সে ভেতরে ঢুকল।

আমার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো। কারণ ডায়েরিটা এখনো আমার জ্যাকেটের ভেতর।

খাদিজা চারদিকে তাকাল। তারপর ধীরে বলল, “এই ঘরটা তোমার খুব পছন্দ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।”

আমি হালকা হাসার চেষ্টা করলাম। “পুরোনো জিনিস দেখতে ভালো লাগে।”
সে কয়েক সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর হঠাৎ বলল, “তুমি কি কখনো ভেবেছ… মানুষ সবসময় সত্যি বলে না?”
আমার গলা শুকিয়ে গেল। “মানে?”

“রাফিনও সবাইকে গল্প বলত।” আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে কি বুঝে গেছে আমি ডায়েরি পেয়েছি?

খাদিজা এবার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। “তুমি কি জানো, ও আমাকে মারত?” আমি স্থির হয়ে গেলাম। “কি?”

তার চোখে পানি চলে এলো। “ও বাইরে খুব ভালো মানুষ সেজে থাকত। কিন্তু বাসায় এসে বদলে যেত।”

আমি বুঝতে পারছিলাম না কী বিশ্বাস করব।

কারণ তার অভিনয় এত নিখুঁত যে সত্যি-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন। সে নিচু গলায় বলল, “একদিন তো আয়রার সামনেই আমার গলা চেপে ধরেছিল।”

আমি চুপ করে রইলাম।

খাদিজা এবার আমার হাত ধরল। “তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?” তার হাত ঠান্ডা। অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

আমি ধীরে হাত সরিয়ে নিলাম। “আমি শুধু পুরো সত্যটা জানতে চাই।” সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর মৃদু হাসল। “সব সত্য জানলে মানুষ সুখে থাকতে পারে না, ইয়াসিন।” কথাটা বলে সে বেরিয়ে গেল।

আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর দ্রুত নিজের ঘরে চলে এলাম।

দরজা লক করেই ডায়েরিটা আবার বের করলাম।
শেষের পাতাগুলো আরও ভয়ংকর।

“আজ আমি পুলিশের কাছে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রমাণ নেই।” আরেকটা পাতায় লেখা
“যদি আমি হারিয়ে যাই, তাহলে বুঝবে এটা দুর্ঘটনা না।”

আমার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা ভার জমে উঠল।
তারপর শেষ পাতা। কালি কাঁপা কাঁপা।

“আমি আয়রাকে নিয়ে পালানোর পরিকল্পনা করছি। যদি পারি, আমরা ঢাকা ছেড়ে চলে যাব।”

তার নিচে আরেকটা লাইন।

“খাদিজা আজ আমাকে বলেছে আগুন সবকিছু পরিষ্কার করে দেয়।” আমার হাত কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই হঠাৎ দরজায় ধাক্কার শব্দ হলো।

ধপ!

আমি চমকে উঠলাম। আবার ধপ! তারপর আয়রার কাঁপা গলা। “বাবা… দরজা খোলো…” আমি দ্রুত দরজা খুললাম।

আয়রা হাঁপাচ্ছে। চোখে আতঙ্ক। আমি নিচু হয়ে বললাম, “কি হয়েছে?” সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “মা আবার ওই ঘরে গেছে…” আমার বুক ধক করে উঠল।

“কোন ঘরে?” “স্টোররুমে।” আমি দ্রুত করিডোরে তাকালাম। নিচতলা থেকে হালকা আলোর আভা আসছে।

তার সঙ্গে একটা অদ্ভুত গন্ধ। ধোঁয়ার। আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি আয়রার হাত ধরে নিচে নামলাম।

সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে দেখি স্টোররুমের দরজার নিচ দিয়ে কমলা রঙের আলো বের হচ্ছে।

খাদিজা ভেতরে। আর সত্যিই ধোঁয়ার গন্ধ আসছে।
আয়রা আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। “আমি বলেছিলাম না” আমার বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো।

আমি ধীরে দরজার কাছে গেলাম। ভেতর থেকে খুব আস্তে ফিসফিস শব্দ আসছে। খাদিজা যেন কারও সঙ্গে কথা বলছে। আমি দরজাটা সামান্য ফাঁক করে তাকালাম।

আর সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর জমে গেল। স্টোররুমের মাঝখানে মেঝের ওপর ছোট আগুন জ্বলছে।

খাদিজা আগুনের সামনে বসে। তার হাতে কয়েকটা পুরোনো ছবি। রাফিনের ছবি। সে একটার পর একটা ছবি আগুনে ফেলছে। আর খুব আস্তে বলছে, “সব শেষ হয়ে গেছে… সব পাপ শেষ হয়ে গেছে” আমার বুকের ভেতর বরফের মতো ঠান্ডা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।

ঠিক তখন খাদিজা থেমে গেল। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। আমাদের চোখে চোখ পড়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পুরো পৃথিবী থেমে গেল যেন। তারপর সে দাঁড়িয়ে উঠল। তার মুখে অদ্ভুত শান্ত হাসি।

“তোমরা এখানে কী করছ?”

আমি আয়রাকে পেছনে সরালাম। “এখানে আগুন কেন?”
খাদিজা খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “পুরোনো জিনিস পোড়াচ্ছি।” “রাত তিনটায়?” সে হেসে উঠল। “রাত শান্ত থাকে।” আমি বুঝতে পারছিলাম, আয়রা কাঁপছে।

খাদিজা সেটা দেখল। তারপর ধীরে বলল, “আয়রা, তুমি আবার বাবাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছ?”

মেয়েটা আমার পেছনে লুকিয়ে গেল। খাদিজার চোখের ভেতর মুহূর্তের জন্য রাগের ঝলক ফুটে উঠল।

খুব ক্ষণিকের জন্য। কিন্তু আমি দেখে ফেলেছি।

সে এবার ঠান্ডা গলায় বলল, “ওকে আমার বিরুদ্ধে কিছু বলেছ?” আমি উত্তর দিলাম না।
খাদিজা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। “ইয়াসিন… তুমি কি জানো সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার কী?”

আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

“যখন তুমি কাউকে এত ভালোবাসো… অথচ সে তোমাকেই দানব ভাবতে শুরু করে।” তার চোখে পানি জমেছে।

কিন্তু সেই চোখের গভীরে অন্য কিছু আছে। অস্থিরতা। রাগ।
আর ভয়ংকর এক ধরনের শূন্যতা।
ঠিক তখন আয়রা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল।

“মা প্লিজ রাগ করো না”

খাদিজা মুহূর্তে তার দিকে তাকাল। “চুপ করো।”
কণ্ঠটা এত ধারালো ছিল যে আমি নিজেও কেঁপে উঠলাম।

আয়রা কান্না থামানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আরও কাঁপতে লাগল। আমি এবার দৃঢ় গলায় বললাম, “Enough.”

খাদিজা ধীরে আমার দিকে তাকাল। আমাদের মাঝে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।
তারপর সে খুব আস্তে বলল, “তুমি এখন ওর পক্ষ নিচ্ছ?”

আমি স্পষ্ট গলায় বললাম, “আমি একটা ভীত বাচ্চার পাশে দাঁড়াচ্ছি।” খাদিজার চোখে সেই মুহূর্তে এমন কিছু ফুটে উঠল, যেটা দেখে আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।

ঘৃণা। খুব গভীর, চাপা ঘৃণা। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে হেসে উঠল। “ঠিক আছে।”
কথাটা বলেই সে আগুনের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।

আর আগুনের ভেতর শেষ ছবিটা ছুড়ে দিল। ছবিটায় রাফিন আর ছোট্ট আয়রা ছিল।

আগুন দ্রুত ছবিটা গিলে ফেলল।

খাদিজা আগুনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কিছু মানুষ হারিয়ে যাওয়ার জন্যই জন্মায়! “কিছু মানুষ হারিয়ে যাওয়ার জন্যই জন্মায়…”
খাদিজার কথাটা স্টোররুমের গরম ধোঁয়ার ভেতর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আগুনের ছোট শিখাগুলো তার মুখের ওপর পড়ে এক অদ্ভুত ছায়া তৈরি করছিল। সেই ছায়ায় তাকে আর স্বাভাবিক মানুষ মনে হচ্ছিল না। যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা অন্ধকার আজ একটু একটু করে বাইরে বেরিয়ে আসছে।
আমার পাশে দাঁড়িয়ে আয়রা কাঁপছিল।
আমি তার ছোট্ট হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলাম।
খাদিজা কয়েক সেকেন্ড আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ এবার সরাসরি আমার দিকে।
“তুমি আমাকে এখন ভয় পাচ্ছ, তাই না?”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “আমি শুধু চাই আয়রা নিরাপদ থাকুক।”
সে মৃদু হেসে মাথা কাত করল। “তুমি ভাবছ আমি ওর ক্ষতি করব?”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কারণ উত্তরটা আমার চোখেই স্পষ্ট ছিল।
খাদিজার মুখের হাসিটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল।
“রাফিনও একসময় এমনভাবে আমার দিকে তাকাত।”
আমার বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি বাড়তে লাগল।
সে ধীরে ধীরে আমাদের পাশ কাটিয়ে স্টোররুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় একবারও পেছনে তাকাল না।
শুধু যাওয়ার আগে থেমে খুব আস্তে বলল, “সবাই শেষ পর্যন্ত আমাকে ছেড়ে চলে যায়।”
তারপর সে ওপরে উঠে গেল।
আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম। স্টোররুমে তখনও পোড়া ছবির গন্ধ। মেঝেতে ছাই পড়ে আছে।
আয়রা খুব আস্তে বলল, “মা আবার রেগে গেছে…”
আমি নিচু হয়ে তার দিকে তাকালাম। “তুমি ভয় পেয়ো না।”
সে কাঁপা গলায় বলল, “মা রাগ করলে বাড়ি চুপচাপ হয়ে যায়।”
আমি বুঝতে পারলাম, এই ছোট্ট মেয়েটা বহুদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে বড় হচ্ছে। এমন একটা পরিবেশে, যেখানে কখন কী হবে সে জানে না।
সেই রাতেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম।
আর দেরি করা যাবে না।
আমি আয়রাকে নিয়ে এই বাড়ি থেকে বের হব।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমি এখনো নিশ্চিত না রাফিনের সঙ্গে আসলে কী হয়েছিল। আর যদি খাদিজা সত্যিই বিপজ্জনক হয়, তাহলে তাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে আমি কিছু জানি।
পরদিন সকালে সবকিছু অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক ছিল।
খাদিজা নাস্তা বানাচ্ছে। রান্নাঘরে হালকা গান বাজছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে গত রাতের কিছুই ঘটেনি।
এই বিষয়টাই সবচেয়ে ভয়ের।
একজন মানুষ এত দ্রুত নিজের আচরণ বদলে ফেলতে পারে কীভাবে?
আমি ডাইনিং টেবিলে বসতেই খাদিজা হালকা হাসল। “আজকে তোমার প্রিয় অমলেট বানিয়েছি।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ। কিন্তু মুখে সেই স্বাভাবিক কোমলতা।
আয়রা চুপচাপ বসে আছে।
সে খাওয়ার সময়ও চোখ তুলে তাকাচ্ছে না।
খাদিজা হঠাৎ বলল, “আজ রাতে আমরা বাইরে ডিনার করতে যেতে পারি।”
আমি অবাক হলাম। “হঠাৎ?”
“অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয় না।”
আমি বুঝতে পারছিলাম না এটা সত্যিই স্বাভাবিক আচরণ, নাকি আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা।
আমি শান্ত গলায় বললাম, “আজ হাসপাতালে কাজ আছে।”
খাদিজা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “ঠিক আছে।”
কিন্তু সেই হাসির ভেতরে আমি স্পষ্ট টান অনুভব করলাম।
সেদিন দুপুরে আয়রা স্কুলে গেলে আমি আবার রাফিনের পুরোনো ফোনটা বের করলাম।
ফোনটা পুরোনো মডেলের। চার্জ নেই। আমি হাসপাতালে যাওয়ার আগে একটা পুরোনো চার্জার জোগাড় করেছিলাম।
অনেক চেষ্টা করে ফোনটা চালু হলো।
স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই আমার বুক ধক করে উঠল।
ফোনে পাসওয়ার্ড নেই।
সবচেয়ে আগে চোখে পড়ল অনেকগুলো আনসেন্ট মেসেজ।
সবগুলো একই নামের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
“সোহেল।”
আমি প্রথম মেসেজটা খুললাম।
“ভাই, আমি সত্যি ভয় পাচ্ছি।”
আরেকটা।
“খাদিজার আচরণ দিন দিন খারাপ হচ্ছে।”
আরেকটা।
“যদি আমার কিছু হয়, আয়রাকে দেখে রাখিস।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
শেষ মেসেজটা কখনো পাঠানো হয়নি।
তারিখ— রাফিন নিখোঁজ হওয়ার আগের রাত।
“আজ আমি ওকে বলেছি আমি আয়রাকে নিয়ে চলে যাব। ও যেভাবে তাকিয়েছে… আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে।”
আমার হাত কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই ফোনে একটা ভিডিও ফাইল চোখে পড়ল।
ভিডিওর নাম— “record_14”
আমার বুকের ধুকপুক বেড়ে গেল।
আমি ভিডিও চালু করলাম।
স্ক্রিন কাঁপছে। মনে হচ্ছে লুকিয়ে রেকর্ড করা হয়েছে।
ভিডিওতে অন্ধকার ঘর। তারপর ধীরে ধীরে খাদিজার কণ্ঠ শোনা গেল।
খুব রাগী কণ্ঠ।
“তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না!”
তারপর রাফিনের গলা। “আয়রার দিকে তাকাও! ও তোমাকে ভয় পায়!”
ভিডিওটা আরও কাঁপতে লাগল।
হঠাৎ জিনিসপত্র পড়ে যাওয়ার শব্দ।
তারপর খাদিজার চিৎকার।
“সবাই আমাকে দোষ দেয়! সবাই!”
আমার বুকের ভেতর চাপা কাঁপুনি শুরু হলো।
ভিডিওর শেষ কয়েক সেকেন্ডে একটা ভয়ংকর জিনিস দেখা গেল।
খাদিজা হাতে কিছু ধরেছিল।
দূর থেকে পুরো বোঝা যাচ্ছে না।
কিন্তু সেটা ধারালো কিছু।
ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম।
এখন আর সন্দেহ নেই।
রাফিন সত্যিই ভয় পেত।
আর সে আয়রাকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল।
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে দরজা খোলার শব্দ এলো।
আমার বুক ধক করে উঠল।
খাদিজা!
সে আজ এত তাড়াতাড়ি ফিরল কেন?
আমি দ্রুত ফোনটা লুকিয়ে ফেললাম।
কয়েক সেকেন্ড পর সে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার মুখে হাসি।
কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির।
“তুমি আজ হাসপাতালে যাওনি?”
আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। “শিফট বদল হয়েছে।”
সে ধীরে ঘরে ঢুকল।
“তুমি খুব অদ্ভুত আচরণ করছ আজকাল।”
আমি কিছু বললাম না।
খাদিজা এবার বিছানার ওপর বসে পড়ল। “তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?”
প্রশ্নটা এত হঠাৎ যে আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম।
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। “উত্তর দাও।”
আমি ধীরে বললাম, “বিষয়টা এমন না।”
“তাহলে কেমন?”
আমি বুঝতে পারছিলাম, সে আমার প্রতিক্রিয়া যাচাই করছে।
খাদিজা হঠাৎ খুব আস্তে বলল, “তুমি কি কখনো কাউকে এত ভালোবেসেছ যে তাকে হারানোর চিন্তায় পাগল হয়ে যেতে পারো?”
আমার বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়ল।
সে আবার বলল, “মানুষ যখন কাউকে ছেড়ে চলে যায়… তখন ভেতরে সবকিছু ভেঙে যায়।”
আমি ধীরে বললাম, “তাই বলে কাউকে আটকে রাখা যায় না।”
খাদিজার চোখে মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত পরিবর্তন এলো।
“কেউ যদি তোমাকে ছেড়ে যেতে চায়, তুমি কি সহজে মেনে নেবে?”
আমি উত্তর দিলাম না।
কারণ এখন আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি—
খাদিজার সবচেয়ে বড় ভয় হলো পরিত্যক্ত হওয়া।
আর সেই ভয়ই তাকে বিপজ্জনক করে তুলেছে।
সেদিন বিকেলে আমি চুপিচুপি একটা ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম। কিছু কাপড়, দরকারি কাগজ, টাকা।
আজ রাতেই সুযোগ পেলে আয়রাকে নিয়ে বের হব।
আমি শুধু একটা নিরাপদ সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম।
রাত বাড়ল।
বাড়ি নিস্তব্ধ।
খাদিজা নিজের ঘরে।
আমি ধীরে আয়রার রুমে গেলাম।
সে জেগে ছিল।
আমাকে দেখেই উঠে বসল। “কি হয়েছে?”
আমি নিচু গলায় বললাম, “আমরা আজ রাতে বাইরে যাব।”
সে ভয় পেয়ে গেল। “মা জানে?”
“না।”
আয়রা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, “মা রাগ করবে…”
আমি তার হাত ধরলাম। “আমি আছি।”
সে ধীরে মাথা নাড়ল।
আমি তাকে জ্যাকেট পরিয়ে দিলাম। তারপর খুব আস্তে নিচে নামতে লাগলাম।
পুরো বাড়ি অন্ধকার।
আমার বুকের ধুকপুক এত জোরে হচ্ছিল যেন পুরো বাড়ি শুনতে পাচ্ছে।
আমরা মূল দরজার কাছে পৌঁছে গেছি।
আমি দরজার লক ধরলাম।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
“তোমরা কোথায় যাচ্ছ?”
আমার শরীর জমে গেল।
ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালাম।
সিঁড়ির ওপর খাদিজা দাঁড়িয়ে।
তার হাতে রান্নাঘরের বড় ছুরি।
আর তার চোখে সেই ভয়ংকর শূন্য দৃষ্টি।
আয়রা কাঁপতে কাঁপতে আমার পেছনে লুকিয়ে গেল।
খাদিজা খুব আস্তে নিচে নামতে লাগল।
“তুমি-ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, ইয়াসিন?”
তার কণ্ঠে কান্না মিশে আছে।
কিন্তু সেই কান্নার ভেতর এমন কিছু আছে যা আমার বুক ঠান্ডা করে দিচ্ছে।
সে আরও এক ধাপ নিচে নামল।
ছুরিটার ধার আলোয় চিকচিক করছে।
“রাফিনও এমন করেছিল…”
আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল।
কারণ সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম আজ রাতে এই বাড়িতে ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আজ রাতে এই বাড়িতে ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে।
সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা খাদিজাকে দেখে আমার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। তার হাতে রান্নাঘরের বড় ছুরি। চোখদুটো অস্বাভাবিক স্থির। সেই চোখে কান্নাও আছে, আবার ভয়ংকর শূন্যতাও আছে।
আমার পেছনে আয়রা কাঁপছে।
আমি খুব আস্তে তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরলাম।
খাদিজা এক ধাপ নিচে নামল।
“তুমি-ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, ইয়াসিন?”
আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করলাম। “খাদিজা… ছুরিটা নামাও।”
সে হেসে উঠল।
কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই।
“সবাই প্রথমে এমনভাবেই কথা বলে। তারপর একদিন চলে যায়।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, এখন সামান্য ভুলও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
আমি ধীরে বললাম, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না। শুধু আয়রা ভয় পেয়েছে।”
খাদিজার চোখ এবার সরাসরি আয়রার দিকে গেল।
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে আমার পেছনে আরও লুকিয়ে গেল।
সেই দৃশ্যটা দেখে খাদিজার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। কষ্ট, রাগ আর অপমান একসঙ্গে ফুটে উঠল।
“দেখলে?” সে ফিসফিস করে বলল। “ও-ও এখন আমাকে দানব ভাবে।”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কারণ এই মুহূর্তে তার সঙ্গে তর্ক করার মানে নেই।
খাদিজা ধীরে নিচে নেমে এল। এখন সে আমাদের থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে।
“রাফিনও এমন করত,” সে নিচু গলায় বলল। “প্রথমে ও-ও আমাকে শান্ত করতে চাইত। তারপর একদিন আয়রাকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল।”
আমার বুকের ধুকপুক আরও বেড়ে গেল।
আমি খুব সাবধানে বললাম, “সেদিন কী হয়েছিল?”
খাদিজা থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
তারপর সে খুব আস্তে হাসল। “তুমি সত্যিটা জানতে চাও?”
আমি চুপ করে রইলাম।
সে সোফার দিকে তাকিয়ে যেন অতীতের কোনো দৃশ্য দেখছিল।
“সেদিন রাতেও অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। রাফিন বলল সে আয়রাকে নিয়ে চলে যাবে। বলল আমি নাকি অসুস্থ। বিপজ্জনক।”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে কাঁপছিল।
“আমি ওকে বলেছিলাম… আমি শুধু চাই আমার পরিবার আমাকে ছেড়ে না যাক।”
আমার বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি জমতে লাগল।
খাদিজা আবার বলল, “কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি।”
“তারপর?”
সে এবার সরাসরি আমার চোখে তাকাল।
“তারপর ও আমাকে ধাক্কা দিল।”
আমার শ্বাস আটকে গেল।
“আর তারপর সবকিছু খুব দ্রুত ঘটেছিল।”
তার হাতের ছুরিটা কেঁপে উঠল।
“ও পড়ে গেল।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কোথায় পড়ে গেল?”
খাদিজার চোখে পানি চলে এলো।
“স্টোররুমে।”
আমার মাথার ভেতর যেন বিস্ফোরণ হলো।
পোড়া দাগ।
আগুন।
রাফিনের হারিয়ে যাওয়া।
সবকিছু একসঙ্গে জোড়া লাগতে শুরু করল।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “তুমি… তাকে মেরেছিলে?”
খাদিজা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “আমি চাইনি এটা হোক!”
আয়রা কেঁপে উঠল।
খাদিজার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে।
“ও পড়ে মাথায় আঘাত পায়। অনেক রক্ত ছিল… অনেক…”
সে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল।
“আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
আমার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো।
“তারপর তুমি কী করেছিলে?”
খাদিজা কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না।
তারপর খুব আস্তে বলল, “আগুন সবকিছু মুছে দেয়।”
আমার পুরো শরীর জমে গেল।
আয়রা কাঁদতে শুরু করল। “মা প্লিজ…”
খাদিজা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে এমন অস্থিরতা ছিল যে আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে আয়রার দিকে এগোতে লাগল।
“আমি তোমার জন্যই সব করেছি…”
আমি দ্রুত আয়রাকে নিজের পেছনে সরালাম। “খাদিজা, থামো।”
সে দাঁড়িয়ে গেল।
তার চোখে এবার ভয়ংকর শূন্যতা।
“তুমি-ও এখন আমাকে ছেড়ে যাবে।”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “কেউ তোমাকে আঘাত করতে চাইছে না।”
“মিথ্যা!”
তার চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।
“সবাই মিথ্যা বলে! সবাই!”
সে হঠাৎ ছুরিটা শক্ত করে ধরল।
আমি বুঝলাম, পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে।
আমি ধীরে বললাম, “আয়রার দিকে তাকাও। ও ভয় পাচ্ছে।”
খাদিজার চোখ ধীরে মেয়ের দিকে গেল।
আয়রা কাঁদছে।
ছোট্ট শরীরটা পুরো কাঁপছে।
“মা… প্লিজ…”
এই শব্দটা যেন খাদিজাকে থামিয়ে দিল।
সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “তুইও আমাকে ভয় পাস?”
আয়রা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নিচু করল।
এই এক মুহূর্তেই যেন খাদিজার ভেতরের সব শক্তি ভেঙে পড়ল।
তার হাত থেকে ছুরিটা ধীরে মেঝেতে পড়ে গেল।
টং শব্দটা পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
খাদিজা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মেঝেতে বসে পড়ল।
তারপর ভেঙে পড়া মানুষের মতো কাঁদতে শুরু করল।
আমি জীবনে বহু মানুষের কান্না শুনেছি। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতিদিন মানুষ ভাঙে। কিন্তু সেই রাতের কান্নাটা অন্যরকম ছিল।
সেটা শুধু দুঃখের কান্না না।
সেটা বহু বছরের চাপা অন্ধকার, অপরাধবোধ আর ভয়ের কান্না।
খাদিজা ফিসফিস করে বলতে লাগল, “আমি কাউকে হারাতে চাইনি…”
আয়রা আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর ধীরে ফোন বের করলাম।
পুলিশে কল দিলাম।
খাদিজা কোনো বাধা দিল না।
সে শুধু মেঝেতে বসে কাঁদছিল।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
আকাশ হালকা ধূসর।
মনে হচ্ছিল বহুদিনের জমে থাকা দমবন্ধ অন্ধকারের পর অবশেষে কোথাও একটু আলো আসছে।
প্রায় কুড়ি মিনিট পর পুলিশের গাড়ি এসে থামল।
সবকিছু এরপর খুব দ্রুত ঘটল।
পুলিশ স্টোররুম তল্লাশি করল।
মেঝের নিচের অংশ খুলে আরও প্রমাণ পাওয়া গেল। পোড়া কাপড়ের অংশ, পুরোনো রক্তের চিহ্ন।
খাদিজা কোনো কিছু অস্বীকার করল না।
সে শুধু একটাই কথা বারবার বলছিল।
“আমি চাইনি ও চলে যাক…”
যখন পুলিশ তাকে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে একবার আয়রার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে প্রথমবার আমি সত্যিকারের অনুশোচনা দেখলাম।
সে কাঁপা গলায় বলল, “মা… আমি তোকে ভালোবাসতাম।”
আয়রা কিছু বলল না।
সে শুধু আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
খাদিজাকে গাড়িতে তোলার পর ভোরের বাতাস হালকা ঠান্ডা লাগছিল।
পুরো বাড়িটা তখন অদ্ভুত নিস্তব্ধ।
কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা আগের মতো ভয়ের না।
বরং যেন ঝড় চলে যাওয়ার পরের শূন্যতা।
সেদিন সকালে আয়রা প্রথমবার আমার হাত শক্ত করে ধরে নিজে থেকে বলেছিল, “তুমি কি এখনো যাবে না?”
আমার বুক ভরে উঠল।
আমি হাঁটু গেড়ে তার চোখের সমান হয়ে বললাম, “না মা। এবার আর কোথাও না।”
তার চোখে পানি চলে এলো।
কিন্তু সেই কান্নার ভেতরে আজ ভয়ের বদলে অন্য কিছু ছিল।
নিরাপত্তা।
পরের কয়েক মাস খুব সহজ ছিল না।
আয়রা মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠত। আগুন দেখলে ভয় পেত। জোরে দরজা বন্ধ হলে কেঁপে উঠত।
আমি ধীরে ধীরে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করলাম।
স্কুলে নিয়ে যেতাম।
রাতে গল্প পড়ে শোনাতাম।
একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম, অনেকদিন পর সে আবার ছবি আঁকছে।
আমি চুপচাপ পাশে বসে ছিলাম।
সে ছবিটা শেষ করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেলাম।
ছবিতে একটা ছোট্ট মেয়ে। তার পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
দুজনের ওপরে বড় সূর্য আঁকা।
কোনো আগুন নেই।
কোনো অন্ধকার ঘর নেই।
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কে?”
আয়রা খুব আস্তে হাসল।
“আমি আর তুমি।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।
বাইরে তখন বিকেলের নরম আলো।
জানালার পাশে রাখা টবে নতুন ফুল ফুটেছে।
আমি বুঝলাম—
সব ক্ষত হয়তো পুরোপুরি মুছে যায় না।
কিছু ভয় মানুষের ভেতরে বহুদিন থেকে যায়।
কিন্তু তারপরও…
ভালোবাসা কখনো কখনো একটা ভাঙা জীবনকে আবার নতুন করে বাঁচতে শেখায়।

সমাপ্ত 

....
👁 1321