বিয়ের মঞ্চে সাদা-লাল রঙের ফুলের মালা ঝুলছিল। নাভিদের হাতে সবুজ রেশমি রুমাল, চোখে একটু উদ্বেগ। ঘড়িতে সময় চলছিল। কনে আসার কথা ছিল সন্ধ্যা সাতটায়। এখন প্রায় আটটা বাজে। আত্মীয়-স্বজনেরা ফিসফিস করছে। কেউ বলছে, “হয়তো ট্রাফিক জ্যাম।” কেউ বলছে, “মেয়েপক্ষের কেউ অসুস্থ হয়েছে হয়তো।”
নাভিদ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। মোবাইলে একটা কল এসেছিল। সে দ্রুত মঞ্চের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ থামাতে পারল না। আধঘণ্টা পর তার ফোনও বন্ধ।
রুহির বাবা-মায়ের মুখ শুকিয়ে গেল। কনের সাজসজ্জা সম্পূর্ণ। রুহি আয়নার সামনে বসে আছে। তার চোখে কোনো অশ্রু নেই, শুধু একটা শীতল অপেক্ষা। মা বললেন, “মেয়ে, ধৈর্য ধর। ছেলেটা ফিরবে।”
কিন্তু ফিরল না। রাত সাড়ে নয়টা বাজল। আত্মীয়েরা বলতে শুরু করল, “পালিয়েছে।” কেউ কেউ রুহির দিকে করুণার চোখে তাকাল। রুহি মাথা নুইয়ে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল, আজকের এই অপমান সে কোনোদিন ভুলবে না।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। হঠাৎ গেটের বাইরে গাড়ির শব্দ। নাভিদ নেমে এল। তার পাঞ্জাবির হাতায় মাটির দাগ, কপালে ঘাম, চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি। কেউ প্রশ্ন করার আগেই সে মঞ্চে উঠে বসল।
“শুরু করুন,” সে শুধু এটুকু বলল।
কেউ আর কিছু জানতে চাইল না। নিকাহ সম্পন্ন হল। রুহি তার দিকে তাকাল একবার। নাভিদের চোখে কোনো অপরাধবোধ নেই, কোনো ব্যাখ্যাও নেই। শুধু একটা নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা।
বিয়ের পরের রাত। নতুন ঘরে দুজন। রুহি বিছানার একপাশে বসে আছে। নাভিদ অন্য পাশে। সে কোনো কথা বলেনি। শুধু এক গ্লাস পানি এনে রুহির হাতে দিয়েছে।
“ঘুমাও,” সে বলল।
রুহি জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গিয়েছিলে?”
নাভিদ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “প্রয়োজন ছিল।”
রুহির ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে বিশ্বাস করতে পারল না। যে মানুষ বিয়ের মঞ্চ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, সে কীভাবে তার স্বামী হতে পারে?
পরের কয়েকদিন চলল নীরবতায়। নাভিদ সকালে অফিসে যায়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে। রুহির জন্য খাবার আনে, তার ওষুধের সময় মনে করিয়ে দেয়, রাতে দরজায় তালা লাগায় দুবার করে। কিন্তু কখনো তার হাত ধরে না, কখনো চোখে চোখ রাখে না বেশিক্ষণ।
এক রাতে রুহি ঘুম থেকে উঠে দেখল, নাভিদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ফোন হাতে। কেউ কল করেছে। সে খুব আস্তে কথা বলছে। রুহি দরজার ফাঁক দিয়ে শুনল শুধু একটা কথা—“সে নিরাপদ আছে।”
রুহির মনে হল, এই মানুষটা কোনো গোপন জীবন নিয়ে চলছে। সে বিশ্বাস করতে পারছে না। অথচ প্রতি রাতে যখন সে বিছানায় শোয়, নাভিদের শরীরের উষ্ণতা পাশ থেকে অনুভব করে। কখনো কখনো নাভিদের হাত তার কাঁধে পড়ে যায় ঘুমের ঘোরে। সেই স্পর্শটা এত নরম, এত নিরাপদ যে রুহির চোখ জলে ভরে যায়।
এক সপ্তাহ পর একদিন নাভিদ হঠাৎ বলল, “আজ রাতে বাইরে খাব।”
রুহি অবাক হয়ে তাকাল। নাভিদ তার হাত ধরল প্রথমবার। আঙুলগুলো শক্ত, কিন্তু স্পর্শটা সাবধানে। গাড়িতে বসে রুহি দেখল, নাভিদের চোখে একটা অদ্ভুত উদ্বেগ। রেস্টুরেন্টে বসেও সে মাঝে মাঝে মোবাইল দেখছে।
খাবার শেষে ফেরার পথে নাভিদ হঠাৎ গাড়ি থামাল। রাস্তার ধারে একটা পুরনো বাড়ি। সে নেমে গেল পাঁচ মিনিটের জন্য। ফিরে এসে রুহির দিকে তাকাল।
“কিছু জিজ্ঞেস করো না আজ,” সে বলল।
রুহি চুপ করে রইল। কিন্তু তার মনে একটা আগুন জ্বলছিল। সে জানত, এই মানুষটা তাকে নিরাপদ রাখছে। কিন্তু কেন? এবং কেন তার ভালোবাসা প্রকাশ করে না?
রাত গভীর। দুজন বিছানায়। রুহি হঠাৎ ঘুরে শুয়ে নাভিদের দিকে তাকাল। নাভিদের চোখ খোলা। দুজনের চোখ মিলল। নাভিদ আস্তে আস্তে তার চুল সরিয়ে দিল। আঙুলের ডগা রুহির গালে ছুঁয়ে গেল।
রুহির শ্বাস ভারী হয়ে উঠল। সে জানত সে বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু শরীরটা সাড়া দিচ্ছিল। নাভিদ আর কাছে এল। তার ঠোঁট রুহির কপালে ছুঁয়ে গেল। তারপর গালে। রুহি চোখ বন্ধ করে দিল। নাভিদের হাত তার কোমরে গেল। আস্তে আস্তে, যেন ভেঙে যাবে।
“রুহি…” নাভিদ ফিসফিস করে বলল।
রুহি কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার হাত নাভিদের বুকে রাখল। নাভিদের হৃদস্পন্দন দ্রুত। সে রুহিকে আরও কাছে টানল। দুজনের শরীর মিলল। নাভিদের চুম্বন গভীর হয়ে উঠল। রুহির আঙুল তার চুলে গিয়ে জড়িয়ে গেল। রাতের অন্ধকারে তাদের শ্বাস মিশে গেল। নাভিদ তার গলায়, কাঁধে চুমু খেল। রুহির শরীর কেঁপে উঠল।
কিন্তু যখন নাভিদ আরও এগোতে চাইল, রুহি হঠাৎ সরে গেল।
“না,” সে ফিসফিস করে বলল। “আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।”
নাভিদ থেমে গেল। তার চোখে ব্যথা। সে রুহির হাত ছেড়ে দিল। মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে শুয়ে রইল।
রুহি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কাঁদল নীরবে। তার শরীর এখনও উত্তপ্ত। নাভিদের স্পর্শের স্মৃতি তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু বিশ্বাসের অভাব তার বুকের ভেতর পাথর হয়ে বসে ছিল।
পরের সকালে নাভিদ চলে গেল অফিসে। টেবিলে একটা চিরকুট রেখে। “খাবার তৈরি আছে। সময়মতো খাও।”
রুহি চিরকুটটা হাতে নিয়ে দেখল। হাতের লেখা পরিষ্কার। সে জানত, এই মানুষটা তাকে রক্ষা করছে প্রতিদিন। কিন্তু কেন সে নিজের ভালোবাসা লুকিয়ে রাখে, সে বুঝতে পারছিল না।
দুপুরে রুহির ফোনে একটা অজানা নম্বর থেকে মেসেজ এল। “তোমার স্বামীকে জিজ্ঞেস করো, সে বিয়ের রাতে কোথায় ছিল।”
রুহির হাত কেঁপে উঠল। সে মেসেজটা মুছে ফেলল। কিন্তু মনে একটা নতুন সন্দেহ জন্ম নিল।
সন্ধ্যায় নাভিদ ফিরল। রুহি তাকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে গেল। নাভিদ তার দিকে তাকাল। চোখে একটা ক্লান্তি।
“কিছু হয়েছে?” সে জিজ্ঞেস করল।
রুহি মাথা নাড়ল। নাভিদ কাছে এসে তার চুল সরিয়ে দিল। আঙুল দিয়ে তার গাল ছুঁল।
“তুমি নিরাপদ আছো,” সে বলল। “এটাই যথেষ্ট আপাতত।”
রুহি তার হাত সরিয়ে দিল। “যথেষ্ট নয়।”
নাভিদ চুপ করে রইল। তারপর রুহিকে জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে। রুহির মাথা তার বুকে। নাভিদের হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছিল। রুহি জানত, এই আলিঙ্গনটা ভালোবাসার নয়, সুরক্ষার। কিন্তু তার শরীর তবু সাড়া দিচ্ছিল। নাভিদের গলায় মুখ রেখে সে চোখ বন্ধ করে দিল।
রাত আবার গভীর হল। দুজন কাছাকাছি শুয়ে। নাভিদের হাত রুহির কোমরে। রুহি তার আঙুল নাভিদের হাতের ওপর রাখল। নাভিদ ঘুরে শুয়ে তার মুখোমুখি হল। দুজনের নাকের ডগা প্রায় ছুঁয়ে গেল।
নাভিদ আস্তে আস্তে চুমু খেল। এবার রুহি সরে গেল না। সে সাড়া দিল। দুজনের শ্বাস গরম হয়ে উঠল। নাভিদের হাত তার পিঠে ঘুরল। রুহির আঙুল তার শার্টের বোতাম খুলল। ত্বকের স্পর্শ। উত্তাপ।
নাভিদ থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। “তুমি চাও?”
রুহি কোনো কথা বলল না। শুধু তার ঘাড়ে মুখ রাখল। নাভিদ বুঝে গেল। সে আস্তে আস্তে এগোল। রাতের অন্ধকারে তাদের শরীর মিলল। গভীর, ধীর, উত্তপ্ত। রুহির নখ তার পিঠে আঁচড় কাটল। নাভিদের শ্বাস তার কানে।
শেষে দুজন পাশাপাশি শুয়ে রইল। নাভিদের হাত এখনও তার কোমরে। রুহি চোখ খুলে তাকাল ছাদের দিকে।
সে জানত, শরীর মিলেছে। কিন্তু বিশ্বাস এখনও মেলেনি।
এবং সেই রাতেই রুহির মনে হল, এই মানুষটার ভেতর কোনো বড় সত্য লুকিয়ে আছে। যে সত্য জানলে হয়তো সবকিছু বদলে যাবে।
বিয়ের পর তিন মাস কেটে গেল। রুহি এখন নাভিদের বাড়িতে অভ্যস্ত। সকালের চা, বিকেলের হাঁটা, রাতের নীরবতা—সবই রুটিন হয়ে গেছে। নাভিদ প্রতিদিন তাকে নিরাপদ রাখে। বাজার থেকে ফিরে এসে দরজায় তালা লাগায়, রাতে জানালার খড়খড়ি পরীক্ষা করে, রুহির মোবাইলে একটা ইমারজেন্সি নম্বর সেট করে দেয়।
কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশ করে না। কখনো “ভালোবাসি” বলে না। কখনো চোখে চোখ রেখে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে না। শুধু শরীরের ভাষায় কথা বলে। রাতে যখন দুজন কাছাকাছি আসে, নাভিদের স্পর্শ গভীর হয়, চুম্বন উত্তপ্ত হয়, কিন্তু শেষে সে সবসময় একটু দূরে সরে যায়। যেন কোনো দেয়াল আছে তার ভেতরে।
রুহি প্রতিদিন সেই দেয়াল ভাঙতে চায়। একদিন সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
নাভিদ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি তোমাকে রক্ষা করি।”
“সেটা ভালোবাসা নয়।”
নাভিদ তার দিকে তাকাল। চোখে একটা গভীর ব্যথা। “হয়তো আমার ভালোবাসা অন্যরকম।”
রুহি আর কিছু বলল না। কিন্তু তার মনে সন্দেহ বাড়তে থাকল। বিয়ের রাতের সেই অজানা কল, সেই পুরনো বাড়ি, সেই অজানা মেসেজ—সব মিলে একটা ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।
এক সন্ধ্যায় নাভিদ অফিস থেকে দেরিতে ফিরল। তার শার্টে রক্তের দাগ। সামান্য। রুহি ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
নাভিদ হাত ধুয়ে ফেলল। “কাজের সময় কেটে গেছে। কিছু না।”
রুহি বিশ্বাস করল না। সে নাভিদের মোবাইল দেখার চেষ্টা করল রাতে। নাভিদ ঘুমিয়ে পড়েছে। মোবাইলে একটা মেসেজ খোলা ছিল। “সে এখন স্থিতিশীল। তুমি আর আসো না।”
রুহির হাত কাঁপল। সে মেসেজটা পড়ে ফোন রেখে দিল। মনে হল, নাভিদ কোনো গোপন সম্পর্ক লুকিয়ে রাখছে। হয়তো অন্য কেউ আছে।
পরের দিন রুহি নিজেই বেরোল। নাভিদের অফিসের কাছে গিয়ে দেখল সে বেরচ্ছে না। তারপর সেই পুরনো বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখল, ভেতরে একজন নার্স বেরিয়ে আসছে। রুহি জিজ্ঞেস করল, “এখানে কে আছে?”
নার্স বলল, “একটা মেয়ে। অনেকদিন ধরে। কেউ আসে না প্রায়। শুধু একজন পুরুষ মাঝে মাঝে আসে।”
রুহির বুক ধড়ফড় করল। সে ফিরে এল। মনে একটা ঝড় উঠল। নাভিদ কি অন্য কাউকে দেখতে যায়? বিয়ের রাতেও কি সেখানেই গিয়েছিল?
সেই রাতে রুহি মুখ খুলল। “তুমি আমাকে মিথ্যা বলছো।”
নাভিদ থেমে গেল। “কী বলছো?”
“সেই বাড়ি। সেখানে কে আছে?”
নাভিদের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তুমি গিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ। বলো, কে?”
নাভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “এখন বলব না।”
রুহি উঠে দাঁড়াল। “তাহলে আমি থাকব না।”
নাভিদ তার হাত ধরল। শক্ত করে। “থাকো। আমি অনুরোধ করছি।”
রুহি তার হাত ছাড়িয়ে নিল। “তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে দাও না। আর আমিও তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না।”
দুজন সেই রাতে আলাদা শুয়ে রইল। রুহির চোখে ঘুম নেই। নাভিদের শ্বাস অন্য ঘর থেকে শোনা যাচ্ছিল।
পরের কয়েকদিন চলল ঠান্ডা যুদ্ধে। নাভিদ আরও বেশি সতর্ক হয়ে গেল। রুহিকে কোথাও একা যেতে দিল না। গাড়িতে করে নিয়ে যায়, ফিরিয়ে আনে। রাতে দরজায় পাহারা দেয় যেন। রুহি রাগ করেও তার স্পর্শ এড়াতে পারে না। এক রাতে নাভিদ হঠাৎ তার ঘরে এল।
“আমি তোমাকে হারাতে পারি না,” সে বলল।
রুহি উঠে বসল। নাভিদ কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। তার হাত রুহির হাতে।
“আমাকে সময় দাও,” সে ফিসফিস করে বলল। “সব বলব। কিন্তু এখন নয়।”
রুহি তার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে ভয় ছিল। ভালোবাসাও ছিল। সে নাভিদের গলায় হাত রাখল। নাভিদ উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। দুজন বিছানায় পড়ল। চুম্বন গভীর হয়ে উঠল। নাভিদের হাত তার শরীরে ঘুরল। রুহির শ্বাস দ্রুত। তারা একে অপরকে টানল। কাপড় সরল। ত্বক মিলল। উত্তাপ বাড়ল। নাভিদ তার কানে বলল, “তুমি আমার।”
রুহি কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার শরীর দিয়ে সাড়া দিল। রাতটা দীর্ঘ হল। দুজন বারবার একে অপরের কাছে ফিরে গেল। শেষে ক্লান্ত হয়ে পাশাপাশি শুয়ে রইল। নাভিদের হাত তার বুকে। রুহি তার আঙুল ধরে রাখল।
কিন্তু সকালে আবার দূরত্ব। নাভিদ চলে গেল। রুহি একা বসে ভাবল। সে জানত, এই সম্পর্ক টিকবে না যদি সত্য না জানা যায়।
একদিন দুপুরে রুহির ফোনে আবার সেই অজানা নম্বর থেকে কল এল। এবার সে ধরল।
একটা মেয়ের গলা। দুর্বল। “রুহি আপু? আপনি কি নাভিদ ভাইয়ের স্ত্রী?”
রুহি থমকে গেল। “কে আপনি?”
“আমি… আমি সেই মেয়ে। যাকে নাভিদ ভাই বাঁচিয়েছিল। বিয়ের দিন।”
রুহির হাত থেকে ফোন পড়ে যাওয়ার উপক্রম। “কী বলছেন?”
“আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। আসবেন? সব বলব।”
রুহি ঠিকানা নিল। সেই পুরনো বাড়ি। সে নাভিদকে না বলেই বেরিয়ে পড়ল। গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছাল। ভেতরে ঢুকল। একটা সাদা বিছানায় একজন মেয়ে শুয়ে আছে। মুখ চেনা। রুহির চোখ বড় হয়ে গেল।
সেই মেয়ে—সাবিহা। রুহির ছোটবেলার বন্ধু। যার জন্য রুহি আজও নিজেকে দোষারোপ করে।
সাবিহা দুর্বল গলায় বলল, “আপু, বসুন।”
রুহি বসল। শরীর কাঁপছে।
সাবিহা বলল, “বিয়ের দিন নাভিদ ভাই এখানে এসেছিল। আমি সেদিন মারা যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম। কেউ জানত না। সে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর এখানে রেখেছে। চিকিৎসা চালাচ্ছে।”
রুহির চোখ জলে ভরে গেল। “কেন?”
সাবিহা চোখ বন্ধ করে বলল, “কারণ আপনি আমাকে দোষ দিয়ে আসছেন বছরের পর বছর। অথচ আমি নিজেই… আমি নিজেই সেদিন ভুল করেছিলাম।”
রুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার জন্য…”
সাবিহা মাথা নাড়ল। “না। আপনি দোষী নন। নাভিদ ভাই জানত। সে আপনাকে বলতে চায়নি। কারণ আপনি নিজেকে আরও বেশি দোষ দিতেন।”
রুহি উঠে দাঁড়াল। তার মাথা ঘুরছে। সে বাইরে এল। গাড়িতে বসে কাঁদল। তারপর ফোন করল নাভিদকে।
“আমি জেনে গেছি,” সে বলল।
নাভিদ অন্য প্রান্তে চুপ করে রইল। তারপর বলল, “বাড়ি এসো।”
রুহি ফিরল। নাভিদ দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। রুহি তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুমি কেন বলোনি?”
নাভিদ তার চুল সরিয়ে দিল। “কারণ তুমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতে না। আমি চেয়েছিলাম তুমি আগে নিজেকে ভালোবাসো।”
রুহি তার মুখ তুলল। নাভিদের চোখে জল। দুজন একে অপরকে চুমু খেল। গভীর করে। এবার কোনো দেয়াল নেই। নাভিদ তাকে তুলে নিয়ে ঘরে গেল। দরজা বন্ধ করল। দুজন বিছানায় পড়ল। কাপড় সরল দ্রুত। শরীর মিলল উত্তাপে। নাভিদ তার কানে বলল, “এবার বলতে পারি। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
রুহি তার পিঠে নখ বসাল। “আর কখনো লুকাবে না।”
নাভিদ মাথা নাড়ল। তারপর তারা হারিয়ে গেল একে অপরের মধ্যে। রাতটা শুধু তাদের। গভীর, গরম, নিঃশ্বাসহীন।
সকালে রুহি নাভিদের বুকে মাথা রেখে শুয়ে রইল। সে জানত, সত্য বেরিয়েছে। কিন্তু পুরো সত্য এখনও বাকি। সাবিহার গল্প সম্পূর্ণ শোনেনি সে।
সাবিহার কথা রুহির মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে আবার সেই বাড়িতে গেল। এবার নাভিদের সাথে। সাবিহা বিছানায় বসে আছে। একটু সুস্থ।
সাবিহা বলল, “আপু, শুনুন পুরো কথা।”
রুহি হাত ধরল তার। সাবিহা বলল, “সেদিন আমরা দুজন মিলে নদীতে গিয়েছিলাম। আপনি বলেছিলেন না যেতে। আমি জোর করে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর… আমি পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম। আপনি আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমাকে তুলে এনেছিলেন। আমি বেঁচে গিয়েছিলাম। আপনি আহত হয়েছিলেন। সবাই ভেবেছিল আপনার দোষ। আমিও চুপ করেছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম। বছরের পর বছর আপনি নিজেকে দোষ দিয়েছেন। আমি কিছু বলিনি।”
রুহির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। “তুমি কেন বলোনি?”
“কারণ আমি লজ্জা পেয়েছিলাম। তারপর একদিন আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। পুরনো আঘাতের জটিলতা। কেউ জানত না। নাভিদ ভাই জানত আপনার গল্প। সে খুঁজে পেল আমাকে। বিয়ের দিন কল এল যে আমি মারা যাচ্ছি। সে দৌড়ে এল। আমাকে বাঁচাল। তারপর থেকে চিকিৎসা করাচ্ছে। আপনাকে বলতে চায়নি। কারণ আপনি আবার নিজেকে দোষ দিতেন।”
নাভিদ পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে শুনছিল। রুহি উঠে তাকে জড়িয়ে ধরল। “তুমি আমাকে বাঁচিয়েছো আমার নিজের থেকে।”
নাভিদ তার কপালে চুমু খেল। “তুমি দোষী ছিলে না কখনো।”
সাবিহা হাসল দুর্বলভাবে। “এবার আপনারা সুখী হন।”
রুহি সাবিহার হাত চেপে ধরল। “তুমিও সুস্থ হও। আমি আসব।”
বাড়ি ফিরে রুহি আর নাভিদ কথা বলল না অনেকক্ষণ। শুধু একে অপরের কাছে বসল। নাভিদ রুহির হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল, “এবার সব পরিষ্কার।”
রুহি তার দিকে তাকাল। “তুমি কেন এতদিন চুপ ছিলে?”
“কারণ আমি চেয়েছিলাম তুমি আগে নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পাও। আমি শুধু পাহারাদার হতে চেয়েছিলাম। ভালোবাসা প্রকাশ করলে তুমি ভাবতে পারতে এটা দয়ার।”
রুহি তার গলায় হাত রাখল। “এখন প্রকাশ করো।”
নাভিদ তাকে টেনে নিল। চুমু খেল গভীর করে। দুজন উঠে দাঁড়াল। নাভিদ তাকে বহন করে শোবার ঘরে নিয়ে গেল। দরজা বন্ধ। জানালা বন্ধ। শুধু দুজন।
নাভিদ রুহির কাপড় আস্তে আস্তে খুলল। প্রতিটা স্পর্শে চুমু। রুহি তার শার্ট খুলল। ত্বক উন্মুক্ত হল। নাভিদ তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজেও এল। দুজনের শরীর জড়িয়ে গেল। নাভিদের হাত তার সারা শরীরে ঘুরল। রুহির শ্বাস ভারী। নাভিদ তার কানে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্রতিদিন। প্রতি রাত। তোমাকে হারাতে পারি না।”
রুহি তার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, “আমিও। এবার বিশ্বাস করি।”
তারা একে অপরকে নিল ধীরে ধীরে। গভীরভাবে। নাভিদের প্রতিটা নড়াচড়ায় রুহির শরীর কেঁপে উঠল। রুহির নখ তার পিঠে দাগ কাটল। দুজনের শ্বাস এক হয়ে গেল। রাতটা কেটে গেল এভাবেই। বারবার। ক্লান্ত হয়েও থামল না। শেষে দুজন জড়িয়ে শুয়ে রইল। ঘামে ভেজা শরীর। হৃদস্পন্দন মিলিয়ে যাচ্ছে।
সকালে রুহি উঠে নাভিদের জন্য চা বানাল। নাভিদ এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। গলায় চুমু খেল। “আজ অফিস যাব না।”
রুহি হাসল। “তাহলে কী করবে?”
নাভিদ তাকে ঘুরিয়ে দিল। আবার চুমু খেল। “তোমাকে নিয়ে সময় কাটাব।”
দুপুর পর্যন্ত তারা ঘরেই থাকল। কথা বলল অনেক। সাবিহার কথা, বিয়ের রাতের কথা, রুহির সেই পুরনো অপরাধবোধের কথা। নাভিদ বলল, “তুমি যখন নিজেকে দোষ দিতে, আমি দেখতাম। তাই চেয়েছিলাম তোমাকে বাঁচাতে।”
রুহি তার বুকে মাথা রাখল। “এবার আমি বাঁচব তোমার সাথে।”
বিকেলে তারা সাবিহাকে দেখতে গেল। সাবিহা হাসিমুখে বলল, “আপনারা সুন্দর দেখাচ্ছে।”
রুহি তার হাত ধরল। “তুমিও সুস্থ হও। আমরা পরিবার।”
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে নাভিদ রুহিকে বারান্দায় নিয়ে গেল। শহরের আলো জ্বলছিল। নাভিদ তার হাত ধরে বলল, “বিয়ের দিন আমি পালাইনি। আমি গিয়েছিলাম তোমার অতীতের একটা অংশ বাঁচাতে। যাতে তুমি ভবিষ্যতে হাঁটতে পারো।”
রুহি তার দিকে তাকাল। চোখে জল আর হাসি মিশে আছে। “এবার আমি হাঁটব। তোমার হাত ধরে।”
নাভিদ তাকে টেনে নিল। চুমু খেল। এবার কোনো তাড়া নেই। শুধু গভীরতা। দুজন আবার ঘরে গেল। রাতটা আবার তাদের হল। এবার আরও কাছাকাছি। নাভিদ তার প্রতিটা অংশ চুমু খেল। রুহি তার নাম ধরে ডাকল। দুজন একসাথে পৌঁছাল শিখরে। তারপর জড়িয়ে রইল।
মাসের পর মাস কেটে গেল। সাবিহা সুস্থ হয়ে উঠল। রুহি আর নাভিদের জীবন ভরে উঠল। নাভিদ এখন প্রতিদিন বলে, “ভালোবাসি।” রুহিও বলে। রাতে তাদের শরীর মিলে যায় উত্তাপে। দিনে তাদের হাত মিলে থাকে বিশ্বাসে।
একদিন রুহি নাভিদের কোলে বসে বলল, “বিয়ের দিন যদি তুমি না ফিরতে…”
নাভিদ তার ঠোঁটে আঙুল রাখল। “ফিরেছি। কারণ তুমি আমার গন্তব্য।”
রুহি হাসল। তাকে চুমু খেল। বাইরে শহর জাগরূক। ভেতরে দুজনের পৃথিবী শান্ত আর উত্তপ্ত দুটোই।
গল্পের শেষে রুহি আর নাভিদ জানল, ভালোবাসা কখনো পালিয়ে যায় না। সে শুধু সময় নেয় সত্য প্রকাশের। আর যখন প্রকাশ পায়, তখন তা হয় গভীর, নিরাপদ, আর চিরকালীন।
....