সাফওয়ান আর নাওরিনের বিয়ে হয়েছিল শীতের শেষে। ঢাকার একটা পুরোনো বাড়ির দোতলায় তাদের নতুন জীবন শুরু। বাড়িটা সাফওয়ানের বাবার পুরোনো সম্পত্তি। ছোটখাটো একটা পরিবার। সাফওয়ান ব্যাংকে চাকরি করে। নাওরিন প্রাইভেট কলেজে ইংরেজি পড়ায়। দুজনের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। বিয়ের আগে তারা একে অপরকে চেনে দুই বছর। প্রেমটা ছিল ধীর, গভীর। কিন্তু বিয়ের পর ঘরের ভেতর একটা অদৃশ্য দেয়াল উঠে আসতে শুরু করে।
সেই দেয়ালের নাম একটা পুরোনো ফ্রেম। সাফওয়ানের পড়ার টেবিলের পাশে দেয়ালে ঝোলানো। কালো-সাদা ছবি। একটা মেয়ে। বয়স বিশের কাছাকাছি মনে হয়। চোখ দুটো গভীর, হাসি মুখে কিন্তু চোখে একটা বিষণ্ণতা। চুল কাঁধ পর্যন্ত। সাদা শাড়ি পরা। ছবিটা পুরোনো। কাগজের রং হালকা হলুদ হয়ে গেছে।
নাওরিন প্রথমবার ঘরে ঢুকেই দেখেছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, “এ কে?”
সাফওয়ান তখন ব্যস্ত ছিল বই সাজাতে। মাথা তুলে একবার তাকিয়ে বলেছিল, “পুরোনো। থাক।”
নাওরিন আর কিছু বলেনি। কিন্তু মনে রেখেছে।
বিয়ের এক মাস পর এক রাতে নাওরিন বিছানায় শুয়ে সাফওয়ানের বুকের ওপর হাত রেখেছিল। সাফওয়ান তার চুল আঙুল দিয়ে সরিয়ে চুমু খেয়েছিল কপালে। তারপর ঠোঁটে। ধীরে ধীরে গভীর চুমু। নাওরিনের শরীর গরম হয়ে উঠছিল। সাফওয়ানের হাত তার কোমর ঘিরে ধরে টানছিল। দুজনের শ্বাস এক হয়ে যাচ্ছিল। নাওরিন তার স্বামীর গলার কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলেছিল, “সেই ছবিটা সরাবে না?”
সাফওয়ানের হাত থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সে নাওরিনকে জড়িয়ে ধরে বলল, “পরে। এখন তোমাকে চাই।”
নাওরিন আর জিজ্ঞেস করেনি। সে রাতটা তারা গভীর ভালোবাসায় কাটিয়েছিল। সাফওয়ানের হাত নাওরিনের শরীরে ঘুরে বেড়িয়েছিল। নাওরিন তার স্বামীর নাম ফিসফিস করে ডেকেছিল অন্ধকারে। দুজনের শরীর মিলে এক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সকালে উঠে নাওরিন আবার সেই ছবির দিকে তাকিয়েছিল। ছবিটা এখনো সেখানে।
দুই মাস কেটে গেল। নাওরিন কয়েকবার চেষ্টা করেছিল। একদিন সকালে চা বানাতে বানাতে বলেছিল, “ছবিটা সরিয়ে ফেল না। জায়গাটা খালি লাগে।”
সাফওয়ান খবরের কাগজ থেকে চোখ তুলেছিল। “কেন?”
“আমি চাই না অন্য কোনো মেয়ের ছবি আমাদের ঘরে থাকুক।”
সাফওয়ান হেসেছিল। কিন্তু হাসিটা পুরোপুরি পৌঁছায়নি চোখে। “সে অন্য কেউ না। পুরোনো স্মৃতি। থাক।”
নাওরিন আর কথা বাড়ায়নি। কিন্তু মনে মনে একটা কষ্ট জমতে শুরু করেছিল। রাতে যখন সাফওয়ান তাকে জড়িয়ে ধরত, তার শরীর সাড়া দিত, কিন্তু মনটা দূরে চলে যেত। সাফওয়ান লক্ষ্য করেছিল। এক রাতে সে নাওরিনের মুখ দুহাতে ধরে বলেছিল, “তুমি দূরে সরে যাচ্ছ। কেন?”
নাওরিন চুপ করেছিল। তারপর বলেছিল, “তুমি কি এখনো তাকে ভুলতে পারোনি?”
সাফওয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিল, “কে?”
“ছবির মেয়ে।”
সাফওয়ান উঠে বসেছিল। আলো জ্বালেনি। অন্ধকারে তার গলার স্বর শোনা গিয়েছিল। “নাওরিন, এটা নিয়ে আর কথা বলো না।”
নাওরিন তার স্বামীর হাত ধরে টানছিল। “বলো তো কে সে? তোমার প্রেমিকা ছিল?”
সাফওয়ান তার হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল। “না। এখন ঘুমাও।”
সে রাতে তারা পাশাপাশি শুয়েছিল কিন্তু স্পর্শ করেনি। নাওরিনের বুক ভারী হয়ে উঠেছিল। সে ভেবেছিল, সাফওয়ান হয়তো এখনো সেই মেয়েকে মনে রাখে। হয়তো বিয়ের পরও সেই স্মৃতি তাকে টেনে রাখে।
দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। সাফওয়ান অফিস থেকে ফিরে এলে নাওরিন চা দিত। দুজন একসঙ্গে বসত। কিন্তু কথা কম। রাতে যখন তারা একে অপরের কাছে আসত, শরীরের ক্ষুধা মেটাত, কিন্তু মনের দূরত্ব বাড়ত। নাওরিন কখনো কখনো সাফওয়ানের বুকের ওপর মাথা রেখে শুনত তার হৃদয়ের স্পন্দন। ভাবত, এই স্পন্দনের ভেতরে কি সেই মেয়ের নাম আছে?
এক সন্ধ্যায় নাওরিন ছবিটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আঙুল দিয়ে ফ্রেমের কাঁচ স্পর্শ করেছিল। মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়েছিল। চোখ দুটো যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। নাওরিনের শরীর একটু কেঁপে উঠেছিল। সে ফিসফিস করে বলেছিল, “তুমি কে?”
সাফওয়ান পেছন থেকে এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরেছিল। গরম শ্বাস নাওরিনের ঘাড়ে পড়েছিল। “কী করছ?”
নাওরিন ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। সাফওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আমি জানতে চাই।”
সাফওয়ান তাকে চুমু খেয়েছিল। গভীর, ক্ষুধার্ত চুমু। নাওরিনের ঠোঁট কেঁপে উঠেছিল। সাফওয়ানের হাত তার পিঠে নেমে গিয়েছিল। নাওরিন তার স্বামীর শার্টের বোতাম খুলে দিয়েছিল। দুজনের শরীর একে অপরের কাছে লেগে গিয়েছিল। সাফওয়ান তাকে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। সে রাতে তাদের ভালোবাসা ছিল উত্তপ্ত, প্রায় হিংস্র। নাওরিন তার স্বামীর নাম চিৎকার করে ডেকেছিল। সাফওয়ান তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছিল, “শুধু তুমি। শুধু তোমাকে চাই।”
কিন্তু সকালে উঠে নাওরিন আবার সেই ছবির দিকে তাকিয়েছিল। ছবিটা এখনো সেখানে। এবং নাওরিনের মনে হয়েছিল, ছবির মেয়েটা যেন হাসছে।
নাওরিন ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে সাফওয়ানের হৃদয়ে এখনো সেই মেয়ে আছে। সে আর সরাসরি জিজ্ঞেস করত না। কিন্তু চোখে চোখে প্রশ্ন রাখত। সাফওয়ান এড়িয়ে যেত। কখনো ব্যস্ততার অজুহাত দিত, কখনো নাওরিনকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বিষয়টা সরিয়ে দিত।
তাদের শারীরিক সম্পর্ক কিন্তু কমতনি। বরং আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। যেন দুজনেই দূরত্ব মেটাতে চায় শরীর দিয়ে। এক রাতে সাফওয়ান অফিস থেকে দেরিতে ফিরেছিল। নাওরিন অপেক্ষা করছিল। টেবিলে রাতের খাবার সাজানো। সাফওয়ান এসেই নাওরিনকে জড়িয়ে ধরেছিল। তার গায়ে গরম শরীরের গন্ধ। নাওরিন তার স্বামীর গলায় মুখ রেখে বলেছিল, “ক্ষুধা পেয়েছে?”
সাফওয়ান হেসেছিল। “তোমাকে।”
সে নাওরিনকে উঠিয়ে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। জামা খুলে দিয়েছিল ধীরে ধীরে। নাওরিনের ত্বক স্পর্শ করেছিল ঠোঁট দিয়ে। নাওরিনের শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছিল। সাফওয়ানের হাত তার উরু বেয়ে উঠেছিল। দুজনের শরীর মিলে গিয়েছিল। নাওরিন তার স্বামীর পিঠে নখ বসিয়েছিল। সাফওয়ান তার কানের কাছে নাম ধরে ডেকেছিল বারবার। সে রাতটা ছিল দীর্ঘ। শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি তারা একে অপরকে দিয়েছিল। শেষে নাওরিন সাফওয়ানের বুকের ওপর শুয়ে শুনছিল তার হৃদয়ের শব্দ।
কিন্তু মনে মনে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল। সেই মেয়ে কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ছবিটা সরানো যায় না?
একদিন নাওরিন ছুটি নিয়ে বাড়িতে ছিল। সাফওয়ান অফিসে। নাওরিন ছবিটার কাছে গিয়ে ফ্রেম নামিয়ে নিয়েছিল। কাঁচের ওপর আঙুল বুলিয়েছিল। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। চোখের আকৃতি, ঠোঁটের রেখা—কিছু একটা পরিচিত লাগছিল। নাওরিন নিজের মুখের দিকে আয়নায় তাকিয়েছিল। তারপর আবার ছবির দিকে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি। যেন ছবির মেয়েটা তারই কোনো ছায়া।
নাওরিন ফ্রেম উল্টে দেখেছিল। পেছনে কিছু লেখা আছে কি না। কিন্তু কিছু দেখেনি তখন। ফ্রেমটা আবার ঝুলিয়ে দিয়েছিল।
সন্ধ্যায় সাফওয়ান ফিরে এলে নাওরিন তার জন্য চা বানিয়ে দিয়েছিল। দুজন বারান্দায় বসেছিল। নিচে রাস্তায় মানুষ চলাচল করছে। সাফওয়ান নাওরিনের হাত ধরে বলেছিল, “তুমি আজ চুপচাপ।”
নাওরিন হেসেছিল। “ক্লান্ত।”
সাফওয়ান তার হাত চুমু খেয়েছিল। তারপর টেনে নিয়ে নিজের কোলে বসিয়েছিল। নাওরিন তার স্বামীর গলায় হাত রেখেছিল। সাফওয়ানের চুমু নেমে এসেছিল তার ঘাড়ে। নাওরিন চোখ বন্ধ করে দিয়েছিল। শরীর সাড়া দিচ্ছিল। সাফওয়ান তাকে তুলে নিয়ে ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। দুজনের কাপড় খুলে গিয়েছিল একটু একটু করে। সাফওয়ানের হাত নাওরিনের স্তন স্পর্শ করেছিল। নাওরিন আর্তনাদ করে উঠেছিল। সে রাতে তাদের ভালোবাসা ছিল ধীর, গভীর, প্রায় উপাসনার মতো। সাফওয়ান নাওরিনের প্রতিটি অংশ চুমু খেয়েছিল। নাওরিন তার স্বামীর নাম ফিসফিস করে বলেছিল বারবার। শেষে দুজন ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে পাশাপাশি শুয়েছিল।
নাওরিন সাফওয়ানের বুকের ওপর হাত রেখে বলেছিল, “তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
সাফওয়ান তার চুল সরিয়ে বলেছিল, “তোমাকে ছাড়া বাঁচি না।”
নাওরিন চুপ করেছিল। মনে মনে ভেবেছিল, তাহলে ছবিটা কেন?
পরের দিনগুলোতে নাওরিন আরও লক্ষ্য করতে শুরু করেছিল। সাফওয়ান কখনো কখনো ছবিটার দিকে তাকাত। দীর্ঘক্ষণ নয়। শুধু একবার। তারপর চোখ সরিয়ে নিত। নাওরিনের মনে হত, সেই তাকানোর ভেতরে একটা ব্যথা আছে।
এক সন্ধ্যায় নাওরিন সিদ্ধান্ত নিল। সে ছবিটা সরাতে চায়। সাফওয়ান অফিসে। নাওরিন ফ্রেম নামিয়ে নিয়ে অন্য ঘরে রাখল। খালি দেয়ালটা দেখে তার মন একটু হালকা হল।
সাফওয়ান ফিরে এসে প্রথমে লক্ষ্য করল না। চা খেতে খেতে হঠাৎ দেয়ালের দিকে তাকাল। উঠে দাঁড়াল। “ছবিটা কোথায়?”
নাওরিন শান্ত গলায় বলল, “সরিয়ে রেখেছি।”
সাফওয়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “কোথায় রেখেছ?”
“অন্য ঘরে।”
সাফওয়ান অন্য ঘরে গিয়ে ছবিটা নিয়ে এল। আবার সেই জায়গায় ঝুলিয়ে দিল। তারপর নাওরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা সরানো যাবে না।”
নাওরিনের চোখে জল এসে গেল। “কেন? আমি তোমার স্ত্রী। আমি চাই না অন্য মেয়ের ছবি আমাদের ঘরে থাকুক।”
সাফওয়ান কাছে এসে নাওরিনের দুহাত ধরল। “সে অন্য মেয়ে না। বুঝবে একদিন। এখন বিশ্বাস করো।”
নাওরিন তার হাত ছাড়িয়ে নিল। “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।”
সে রাতে তারা আলাদা শুয়েছিল। সাফওয়ান কয়েকবার নাওরিনের কাছে এসে হাত রেখেছিল। নাওরিন সরে গিয়েছিল। কিন্তু মধ্যরাতে নাওরিন ঘুম থেকে উঠে সাফওয়ানের পাশে গিয়ে শুয়েছিল। সাফওয়ান জেগে ছিল। দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিল। কথা বলেনি। শুধু শরীর দিয়ে ক্ষমা চেয়েছিল। সাফওয়ানের হাত নাওরিনের পিঠে ঘুরে বেড়িয়েছিল। নাওরিন তার স্বামীর ঠোঁটে চুমু খেয়েছিল। ধীরে ধীরে আগুন জ্বলে উঠেছিল। দুজন আবার এক হয়ে গিয়েছিল। সে রাতের ভালোবাসায় একটা ব্যথা ছিল। যেন দুজনেই জানে কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু ধরে রাখতে চায়।
নাওরিন আর সহ্য করতে পারছিল না। একদিন সাফওয়ান অফিসে যাওয়ার পর সে আবার ছবিটা নামিয়ে নিল। এবার ফ্রেম খুলে ফেলল। ছবিটা বের করে পেছনের দিকে তাকাল। সেখানে একটা তারিখ লেখা। কালি মলিন। কিন্তু পড়া যায়।
তারিখটা দেখে নাওরিনের হাত কেঁপে গেল।
সেই তারিখ তাদের বিয়ের আগের নয়। নাওরিনের জন্মেরও কয়েক বছর আগের। নাওরিন হিসাব করল। তার জন্মের অন্তত সাত-আট বছর আগে এই ছবি তোলা।
নাওরিন ছবিটা হাতে নিয়ে নিজের মুখের দিকে তাকাল আয়নায়। তারপর ছবির মেয়ের দিকে। চোখের আকৃতি এক। ঠোঁটের রেখা এক। এমনকি ভ্রুর ভাঁজও এক। নাওরিনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সে ছবিটা টেবিলে রেখে বসল। বুকের ভেতর হৃদয় দুরুদুরু করছে।
এ কী করে সম্ভব?
সাফওয়ান কেন এই ছবি রাখে? কেন সরাতে চায় না? আর এই মিল কেন?
নাওরিন সারাদিন বাড়িতে ঘুরে বেড়াল। কিছু খেতে পারল না। সন্ধ্যায় সাফওয়ান ফিরে এলে নাওরিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে ছবিটা।
সাফওয়ান এসে দেখে থমকে গেল। “কী হয়েছে?”
নাওরিন ছবিটা তার দিকে এগিয়ে দিল। “এর পেছনে তারিখ দেখেছ?”
সাফওয়ান ছবিটা নিল। পেছনের দিকে তাকাল। চুপ করে রইল।
নাওরিন বলল, “আমার জন্মের আগের তারিখ। আর এই মেয়েটার মুখ… আমার মুখের সঙ্গে মিল।”
সাফওয়ান ছবিটা টেবিলে রাখল। নাওরিনের দিকে তাকাল। তার চোখে একটা গভীর বিষণ্ণতা। “বসো।”
নাওরিন বসল। পা কাঁপছে।
সাফওয়ান তার পাশে বসে হাত ধরল। “আমি বলতে চেয়েছিলাম অনেকদিন। কিন্তু পারিনি।”
নাওরিন তার হাত চেপে ধরল। “বলো।”
সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “এই মেয়ে আমার বড় বোন। রুকাইয়া।”
নাওরিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
সাফওয়ান বলতে লাগল। “আমার যখন সাত বছর বয়স, রুকাইয়ার বিয়ে হয়। সে তখন উনিশ। বিয়ের পর সে শ্বশুরবাড়ি যায়। কিন্তু এক বছরের মধ্যে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তাররা বলেছিল জটিল রোগ। আমরা সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা করিয়েছিলাম। কিন্তু সে বাঁচেনি। মারা যাওয়ার আগে সে আমাকে বলেছিল, ‘ছোট ভাই, আমাকে মনে রেখো।’”
সাফওয়ানের গলা কেঁপে উঠল। “এই ছবিটা তার শেষ ছবি। আমি ছোটবেলা থেকে এটা রেখেছি। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এটাই আমার একমাত্র স্মৃতি। আমি সরাতে পারিনি।”
নাওরিনের চোখে জল এসে গেল। “কিন্তু মুখের মিল?”
সাফওয়ান নাওরিনের মুখের দিকে তাকাল। “তুমি যখন প্রথম দেখেছিলাম, আমার মনে হয়েছিল রুকাইয়াকে দেখছি। চোখ, হাসি, সব। আমি ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তাই কিছু বলিনি। পরে বুঝেছি এটা শুধু মিল। তুমি তুমি। কিন্তু ছবিটা সরাতে পারিনি। কারণ এটা আমার বোন।”
নাওরিন কেঁদে ফেলল। সাফওয়ান তাকে জড়িয়ে ধরল। দুজন দীর্ঘক্ষণ এভাবে বসে রইল। নাওরিন সাফওয়ানের বুকে মুখ রেখে কাঁদছিল। সাফওয়ান তার চুল স্পর্শ করছিল।
রাত গভীর হলে নাওরিন সাফওয়ানের মুখ তুলে চুমু খেল। নোনতা চুমু। তারপর আরেকটা। সাফওয়ান তাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল। দুজনের শরীর একে অপরের কাছে লেগে গেল। নাওরিন সাফওয়ানের শার্ট খুলে দিল। সাফওয়ান নাওরিনের জামা খুলল। দুজন বিছানায় শুয়ে গেল। এবার তাদের ভালোবাসায় কোনো প্রশ্ন ছিল না। শুধু ক্ষমা, শুধু ভালোবাসা। সাফওয়ান নাওরিনের শরীরের প্রতিটি অংশ চুমু খেল। নাওরিন তার স্বামীর নাম ডেকে ডেকে কাঁদল আর হাঁসফাঁস করল। দুজনের শরীর এক হয়ে গেল। দীর্ঘ সময় ধরে তারা একে অপরকে ধরে রাখল। যেন আর কখনো ছাড়বে না।
শেষে নাওরিন সাফওয়ানের বুকের ওপর শুয়ে বলল, “ছবিটা থাকুক। এখন বুঝেছি।”
সাফওয়ান তার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “তুমি আমার সব। রুকাইয়া আমার অতীত। তুমি আমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ।”
নাওরিন চোখ বন্ধ করল। বাইরে রাত। ঘরের ভেতর দুজন মানুষ। একটা পুরোনো ছবি। আর একটা নতুন বিশ্বাস। তাদের সম্পর্কের দূরত্ব মিলিয়ে গেছে। এখন শুধু গভীর ভালোবাসা। উত্তপ্ত, সত্য, অবিচ্ছেদ্য।
....