প্রতিদিনের গোপন খোঁজ

আদ্রিজার জীবন ছিল একঘেয়ে অফিসের রুটিনে বাঁধা। ধানমন্ডির একটা বেসরকারি কোম্পানিতে সে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করত। সকাল সাড়ে নয়টায় অফিসে ঢোকা, সন্ধ্যে সাতটায় বের হওয়া। বাসায় ফিরে রান্না, একটু টিভি, তারপর ঘুম। বয়স সাতাশ। বিয়ে হয়নি। মা-বাবা গ্রামে থাকেন, ফরিদপুরে। শহরে একা।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

চিঠি আসা শুরু হলো সেই মার্চের প্রথম সপ্তাহে।

প্রথম চিঠিটা এসেছিল অফিসের রিসেপশনে। সাদা খামে, নাম লেখা শুধু ‘আদ্রিজা’। ভিতরে এক পাতার হাতে লেখা চিঠি।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

“তুমি আজ সকালে বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে চা খেয়েছ। লাল রঙের গামছাটা মাথায় দিয়ে। গতকাল রাতে তুমি কেঁদেছিলে। কেউ জানে না। আমি জানি।”

আদ্রিজার হাত কাঁপল। কেউ তার ছাদের কথা জানে কী করে? কেউ জানে কী করে সে রাতে কেঁদেছে? সে রাতে মায়ের ফোন এসেছিল। বাবার শরীর খারাপ। সে কথা বলে কেঁদেছিল। দরজা বন্ধ করে।

পরের দিন আবার চিঠি। এবার বাসার মেইলবক্সে।

“তোমার ডান হাতের কনুইয়ে ছোট একটা দাগ আছে। শৈশবে পড়ে যাওয়ার। তুমি সেটা লুকোতে চাও। অফিসে কেউ দেখেনি। আমি দেখেছি।”

আদ্রিজা আয়নায় নিজের হাত দেখল। দাগটা আছে। ছোটবেলায় গ্রামের উঠোনে পড়ে যাওয়ার দাগ। কেউ জানে না।

তৃতীয় দিন, চতুর্থ দিন—প্রতিদিন একটা করে চিঠি। কখনো অফিসে, কখনো বাসায়। চিঠিগুলোতে তার জীবনের ছোট ছোট কথা। যেগুলো সে কারো সাথে শেয়ার করেনি। তার পছন্দের গান, রাতে ঘুমাতে না পারার কথা, অফিসের বসের অসহ্য হাসি, এমনকি তার নিজের শরীরের গোপন অংশের কথাও।

“তুমি যখন একা থাকো, তোমার বাম কাঁধের নিচে আঙুল দিয়ে আলতো করে ঘষো। অভ্যাস। কেউ দেখেনি। আমি জানি।”

আদ্রিজার শরীর গরম হয়ে উঠত চিঠি পড়তে পড়তে। কে এই মানুষ? কীভাবে জানে? সে কি তাকে দেখে? কাছে থাকে?

অফিসে নীরব থাকত। মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের আরেকজন। চুপচাপ মানুষ। কথা কম বলে। লম্বা, গাঢ় চোখ, সবসময় সাদা শার্ট। আদ্রিজা দেখেছে, নীরব তাকে দূর থেকে দেখে। মিটিংয়ে তার পাশে বসে। কফি নিয়ে এসে দেয় কখনো কখনো, কোনো কথা না বলে। একবার সে অফিসের পার্কিং লটে দেরি করে বেরিয়েছিল। নীরবও সেখানে দাঁড়িয়েছিল। কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।

আদ্রিজা ভাবত, চিঠির মানুষটি নিশ্চয়ই অন্য কেউ। নীরব তো এত কাছে। চিঠিতে যেসব কথা লেখা, সেগুলো নীরব জানার কথা নয়। নীরব তো তার বাসায় যায় না। ছাদে দাঁড়ানোর কথা জানে না।

এক সন্ধ্যায় আদ্রিজা অফিস থেকে বেরিয়ে বাসায় ফিরছিল। রাস্তায় ভিড়। সে হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাল। নীরব দূরে দাঁড়িয়ে। চোখের দেখাদেখি হলো। নীরব সরে গেল।

সেই রাতে চিঠি এসেছিল।

“তুমি আজ রাস্তায় পেছন ফিরে তাকিয়েছিলে। ভয় পেয়েছিলে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তোমাকে দেখি। কিন্তু ক্ষতি করব না। শুধু জানি।”

আদ্রিজার বুক ধড়ফড় করছিল। চিঠির মানুষটি কি তাকে ফলো করে? নাকি সে নিজেই কাছে আছে?

রাত গভীর হলে আদ্রিজা বিছানায় শুয়ে চিঠিগুলো বারবার পড়ত। প্রতিটা শব্দ তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিত। কেউ তাকে এত গভীরভাবে জানে। কেউ তার একাকীত্বের কথা জানে। কেউ তার শরীরের গোপন অভ্যাস জানে। সেই অজানা মানুষটির প্রতি এক অদ্ভুত টান তৈরি হচ্ছিল। সে কল্পনা করত সেই মানুষটির হাত। চিঠি লেখার হাত। তার গায়ে হাত রাখার হাত।

এক রাতে সে নিজেকে ছুঁয়েছিল চিঠি পড়তে পড়তে। চোখ বন্ধ করে ভেবেছিল সেই অচেনা মানুষটির কথা। তার শ্বাস, তার গন্ধ, তার কণ্ঠস্বর। কেমন হবে সেই মানুষ? গম্ভীর? নাকি নরম? চিঠির ভাষা থেকে মনে হয় সে খুব কাছের। খুব গভীর।

পরের দিন অফিসে নীরব এসে দাঁড়াল তার ডেস্কের পাশে।

“তুমি অসুস্থ মনে হচ্ছে,” নীরব বলল। কণ্ঠস্বর কম।

আদ্রিজা তাকাল। নীরবের চোখে কিছু একটা ছিল। যেন সে সব জানে।

“না, কিছু না,” আদ্রিজা বলল।

নীরব একটা কাগজের কাপ কফি রেখে দিল। “খাও।”

তারপর চলে গেল।

আদ্রিজা কফি হাতে নিয়ে ভাবল। নীরব কি জানে চিঠির কথা? নাকি সে নিজেই?

সেই সপ্তাহে চিঠিগুলো আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল।

“তুমি রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবো আমাকে। আমি জানি। তোমার শরীর গরম হয়। আমিও ভাবি। তোমার কথা। তোমার চোখ। তোমার ঠোঁট।”

আদ্রিজার হাত কাঁপল। সে চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল। কেউ তাকে এভাবে দেখে। কেউ তার ইচ্ছা জানে।

সে ঠিক করল, পরের চিঠিতে সে উত্তর লিখবে। কিন্তু কীভাবে? চিঠি আসে, যায় কোথায়?

একদিন সে চিঠির খামের পেছনে ছোট করে লিখল, “কে তুমি?”

পরের দিন চিঠি এল।

“আমি সেই মানুষ, যে তোমাকে চেনে। তোমার চেয়েও বেশি। তুমি জানবে। সময় হলে।”

আদ্রিজার বুকের ভিতরটা উত্তপ্ত হয়ে উঠল। সে জানত, এই খেলা আরও গভীরে যাবে। নীরব দূর থেকে তাকিয়ে থাকবে। আর চিঠির মানুষটি আরও কাছে আসবে।

সেই রাতে আদ্রিজা ঘুমাতে পারল না। চোখ বন্ধ করলেই চিঠির শব্দগুলো ভেসে ওঠে। তার শরীর চায় সেই অচেনা স্পর্শ। সে চায় জানতে, কে এই মানুষ। কেন তাকে এত গভীরভাবে জানে। আর কেন তার অতীতের সব গোপন কথা এই চিঠিতে এসে মেশে।

চিঠিগুলো এখন প্রতিদিন আসত। আর প্রতিটা চিঠি আরও গভীর, আরও উত্তপ্ত।

“তুমি আজ অফিসে নীল শাড়ি পরেছ। গলায় ছোট সোনার চেইন। আমি দেখেছি। তোমার ঘাড়ের রেখা। তোমার কাঁধ। আমি চাই সেখানে হাত রাখতে।”

আদ্রিজা অফিসে বসে চিঠি পড়ছিল। হাত কাঁপছিল। নীরব দূরে তার ডেস্কে বসে কাজ করছিল। মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাত। আদ্রিজা অনুভব করত সেই চাহনি। যেন নীরব সব জানে। যেন সে নিজেই চিঠি লেখে। কিন্তু আদ্রিজা বিশ্বাস করতে পারত না। নীরব তো এত নীরব। চিঠির ভাষা এত সাহসী, এত কাছের।

একদিন দুপুরে অফিসের ক্যাফেটেরিয়ায় আদ্রিজা একা বসে চা খাচ্ছিল। নীরব এসে পাশে বসল।

“তুমি গত কয়েকদিন ধরে অন্যরকম,” নীরব বলল।

আদ্রিজা তাকাল। “কী বলতে চাও?”

“তোমার চোখে কিছু আছে। যেন কেউ তোমাকে দেখছে। সবসময়।”

আদ্রিজার গলা শুকিয়ে গেল। “তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ?”

নীরব চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “সতর্ক থেকো। শহরে অনেক মানুষ আছে।”

সে উঠে চলে গেল। আদ্রিজা তার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল। নীরবের কথাগুলো মনে গেঁথে গেল। সে কি জানে চিঠির কথা? নাকি শুধু সতর্ক করছে?

সেই রাতে চিঠি এল।

“সে তোমাকে সতর্ক করেছে। আমি জানি। সে তোমাকে দূর থেকে দেখে। আমিও দেখি। কিন্তু আমি তোমাকে শুধু দেখি না। আমি তোমাকে অনুভব করি। তোমার শ্বাস। তোমার গন্ধ। তোমার রাতের একা একা থাকা।”

আদ্রিজা চিঠিটা পড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। শরীর জ্বলে উঠছিল। সে হাত বাড়িয়ে নিজের গলায় হাত রাখল। চিঠিতে লেখা ঘাড়ের কথা মনে পড়ল। সে কল্পনা করল সেই অচেনা হাত তার ঘাড়ে। আঙুলগুলো ধীরে ধীরে নিচে নামছে।

সেই রাতে সে নিজেকে আরও গভীরভাবে ছুঁয়েছিল। চোখ বন্ধ করে ভেবেছিল চিঠির মানুষটির মুখ। কেমন হবে? নীরবের মতো গম্ভীর? নাকি অন্য কেউ?

পরের কয়েকদিন চিঠিগুলো আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠল।

“তুমি ছোটবেলায় ফরিদপুরে থাকতে। তোমার বাবার একটা পুরনো সাইকেল ছিল। তুমি সেটাতে চড়তে চেয়েছিলে। পড়ে গিয়ে হাত কেটেছিল। সেই দাগ এখনো আছে। আমি জানি।”

আদ্রিজার চোখ জলে ভরে গেল। কেউ জানে তার শৈশবের কথা। কেউ জানে সেই সাইকেলের কথা। সে তো কারো কাছে বলেনি।

আরেকটা চিঠিতে লেখা ছিল, “তোমার প্রথম প্রেম ছিল কলেজে। সে তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তুমি কেঁদেছিলে রাতভর। আমি জানি। তুমি এখনো সেই ব্যথাকে বয়ে বেড়াও।”

আদ্রিজা চিঠিটা মুঠো করে ধরল। কে এই মানুষ? কীভাবে তার অতীতের সব কথা জানে?

অফিসে নীরব আরও কাছে এসেছিল। একদিন সে আদ্রিজার ডেস্কে একটা ফাইল রেখে বলল, “তুমি যদি কখনো কথা বলতে চাও, আমি আছি।”

আদ্রিজা তাকাল। নীরবের চোখে গভীর কিছু একটা ছিল। যেন সে অপেক্ষা করছে।

সেই সন্ধ্যায় আদ্রিজা অফিস থেকে বেরিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিল। পেছনে কেউ আছে বলে মনে হলো। সে থেমে তাকাল। নীরব দূরে দাঁড়িয়ে। চোখের দেখাদেখি হলো। নীরব এগিয়ে এল।

“আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই,” নীরব বলল।

আদ্রিজা মাথা নাড়ল। তারা একসাথে হেঁটে চলল। কথা কম। নীরব মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাত। আদ্রিজা অনুভব করত সেই চাহনি তার গায়ে।

বাসার সামনে এসে নীরব থামল। “সতর্ক থেকো।”

আদ্রিজা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী জানো?”

নীরব চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি শুধু জানি তুমি একা। আর একা থাকা বিপজ্জনক।”

সে চলে গেল।

আদ্রিজা বাসায় ঢুকে দেখল চিঠি অপেক্ষা করছে।

“সে তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। আমি দেখেছি। সে তোমাকে চায়। কিন্তু সে তোমাকে চেনে না। আমি চিনি। তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাস। তোমার প্রতিটা ইচ্ছা।”

আদ্রিজার শরীর কাঁপছিল। সে চিঠিটা নিয়ে বিছানায় গেল। পোশাক খুলে শুয়ে পড়ল। চিঠি পড়তে পড়তে তার হাত নিজে নিজেই শরীরে ঘুরতে লাগল। সে কল্পনা করল সেই অচেনা মানুষটি তার পাশে। তার হাত তার গায়ে। তার ঠোঁট তার গলায়।

“আমি চাই তোমাকে,” চিঠিতে লেখা ছিল। “তোমার শরীর। তোমার মন। তোমার সব।”

আদ্রিজা চোখ বন্ধ করে নিজেকে ছেড়ে দিল। সেই রাতে সে প্রথমবারের মতো চিঠির মানুষটির নাম কল্পনা করল। কিন্তু কোনো নাম মনে এল না। শুধু একটা অনুভূতি। গভীর, উত্তপ্ত, অপ্রতিরোধ্য।

পরের দিন অফিসে নীরব এসে তার পাশে দাঁড়াল।

“তুমি গত রাতে ভালো ঘুমাওনি,” নীরব বলল।

আদ্রিজা তাকাল। “তুমি কী করে জানো?”

নীরব কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তার চোখে একটা অদ্ভুত আলো।

আদ্রিজার মনে হলো, সবকিছু জট পাকিয়ে যাচ্ছে। চিঠির মানুষটি আর নীরব। দুজন আলাদা। কিন্তু দুজনই তাকে দেখে। দুজনই তাকে চায়। আর সে নিজেও চায়। সেই অচেনা স্পর্শ। সেই গভীর জানাশোনা।

সে ঠিক করল, সে উত্তর দেবে। পরের চিঠিতে সে লিখবে। “আমিও চাই তোমাকে জানতে। দেখা করো।”

চিঠি পাঠাল কীভাবে? সে জানে না। কিন্তু সে খামের পেছনে লিখে রাখল। আশা করল, চিঠির মানুষটি পাবে।

সেই রাতে সে অপেক্ষা করল। শরীর উত্তপ্ত। মন অস্থির। কেউ আসবে কি?

শেষ চিঠিটা এসেছিল এক শুক্রবার সন্ধ্যায়।

আদ্রিজা অফিস থেকে ফিরে দেখল বাসার দরজার নিচে সাদা খাম। হাতে নিয়ে কাঁপল। ভিতরে চিঠি। লম্বা। আগের চেয়ে অনেক বেশি।

“আজ শেষ চিঠি। আমি আর লিখব না। কারণ আজ তুমি সব জানবে।

তুমি আমাকে চেনো। অনেকদিন ধরে। কিন্তু ভুলে গেছ।

তোমার বয়স যখন সতেরো, তখন ফরিদপুরে একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। তোমার বাবার সাইকেল। তুমি পড়ে গিয়েছিলে। হাসপাতালে গিয়েছিলে। সেখানে একজন যুবক তোমাকে দেখেছিল। সে তোমার পাশে বসেছিল সারা রাত। তুমি অজ্ঞান ছিলে। সে তোমার হাত ধরেছিল। তোমার নাম জেনেছিল। তারপর তুমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছ। সে চলে গেছে।

কিন্তু সে তোমাকে ভোলেনি।

সে তোমার খোঁজ রেখেছে সবসময়। তোমার কলেজ, তোমার চাকরি, তোমার একা থাকা। সে তোমার কাছে এসেছে। অফিসে। নীরব নামে।

আমি নীরব।

আমি তোমাকে দেখেছি প্রতিদিন। দূর থেকে। কাছে গিয়েও। চিঠি লিখেছি কারণ আমি চাইনি তুমি ভয় পাও। আমি চাইনি তুমি ভাবো আমি পাগল। আমি শুধু চেয়েছি তুমি জানো—কেউ আছে যে তোমাকে চেনে। তোমার সব গোপন কথা। তোমার সব ব্যথা। তোমার সব ইচ্ছা।

আজ আমি আর লুকাব না।

তোমার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। যদি চাও, খোলো।”

আদ্রিজার হাত থেকে চিঠি পড়ে গেল। শরীর অবশ। নীরব? নীরবই চিঠি লিখেছে? সেই সতেরো বছরের রাত? সে মনে করার চেষ্টা করল। হাসপাতালের সেই রাত। কেউ তার পাশে বসেছিল। হাত ধরেছিল। সে অজ্ঞান ছিল। কিছু মনে নেই।

দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

আদ্রিজা ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল। চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিল। তারপর খুলল।

নীরব দাঁড়িয়ে। সাদা শার্ট। চোখে সেই গভীর চাহনি।

“আমি,” নীরব বলল। কণ্ঠস্বর কম, কাঁপা। “আমি ক্ষমা চাই। যদি ভয় পাও।”

আদ্রিজা তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভিতরটা দুরুদুরু করছিল। এতদিনের চিঠি। এতদিনের টান। এতদিনের উত্তাপ। সব নীরব।

সে কথা বলল না। শুধু দরজা আরও খুলে দিল।

নীরব ঢুকল। দরজা বন্ধ হলো।

তারা মুখোমুখি দাঁড়াল। আদ্রিজার শ্বাস দ্রুত। নীরবের চোখে আগুন।

“তুমি কেন?” আদ্রিজা ফিসফিস করে বলল।

“কারণ আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি,” নীরব বলল। “সেই রাত থেকে। তোমার হাত আমার হাতে ছিল। তোমার শ্বাস আমি শুনেছি। তারপর তোমাকে হারিয়েছি। খুঁজেছি। পেয়েছি। কিন্তু কাছে যেতে পারিনি। চিঠি লিখেছি। যাতে তুমি জানো কেউ আছে।”

আদ্রিজা এগিয়ে গেল। এক পা। দুই পা। নীরবের সামনে দাঁড়াল। তার গলায় হাত রাখল।

“তুমি আমার সব জানো,” সে বলল। “এখন আমিও জানতে চাই।”

নীরবের হাত উঠল। তার কোমরে। ধীরে ধীরে। আদ্রিজার শরীর কাঁপল। নীরব তাকে টেনে নিল কাছে। তাদের শরীর মিলল।

প্রথম চুমুটা ছিল ধীর। তারপর গভীর। নীরবের ঠোঁট তার ঠোঁটে। জিভের স্পর্শ। আদ্রিজার হাত নীরবের চুলে। নীরবের হাত তার পিঠে, তার কোমরে, তার নিতম্বে।

তারা ঘরের ভিতরে গেল। বিছানার কাছে। পোশাক খুলতে খুলতে। নীরবের হাত আদ্রিজার শরীরে ঘুরছিল। যেন সে অনেকদিন ধরে এই মানচিত্র জানে। তার ঘাড়ে চুমু। তার কাঁধে। তার বুকে। আদ্রিজা মাথা পেছনে ফেলল। নিঃশ্বাস হাঁপাচ্ছিল।

“তুমি জানো,” নীরব তার কানে ফিসফিস করল, “আমি কত রাত তোমার কথা ভেবেছি। তোমার শরীর ভেবেছি।”

আদ্রিজা তার ঠোঁট চেপে ধরল। কথা বলার সময় নয়। শুধু অনুভব করার সময়।

তারা বিছানায় শুয়ে পড়ল। নীরবের শরীর তার ওপর। গরম। ভারী। আদ্রিজার পা খুলে গেল। নীরব ঢুকল ধীরে। আদ্রিজার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। ব্যথা আর সুখ একসাথে। নীরব নড়ল। আবার। আরও গভীরে।

আদ্রিজার নখ নীরবের পিঠে বিঁধল। সে হাঁপাচ্ছিল। নীরবের শ্বাস তার গলায়। তাদের শরীর এক ছন্দে নড়ছিল। ঘাম জমছিল। আদ্রিজার ভিতরটা ভরে যাচ্ছিল। নীরব আরও জোরে। আরও গভীরে।

“আদ্রিজা,” নীরব ডাকল। তার নাম। চিঠিতে কখনো লেখেনি। এখন মুখে।

আদ্রিজা উত্তর দিল নিঃশ্বাসে। তার শরীর কাঁপছিল। চূড়ান্ত মুহূর্ত এসে গেল। সে জোরে চোখ বন্ধ করল। নীরবও। তারা একসাথে পৌঁছাল। শরীর শিথিল হয়ে গেল।

পরে তারা পাশাপাশি শুয়ে রইল। নীরবের হাত তার পেটে। আদ্রিজা তার বুকে মাথা রাখল।

“তুমি আমার অতীত বদলে দিয়েছ,” আদ্রিজা বলল।

নীরব চুমু খেল তার কপালে। “আমি শুধু তোমাকে ফিরে পেয়েছি।”

বাইরে রাত। শহর জেগে আছে। আদ্রিজার ঘরে দুজন মানুষ। চিঠির আর কোনো প্রয়োজন নেই। সব সত্য প্রকাশ পেয়েছে। আর সেই সত্যের ভিতর গভীর এক টান। উত্তপ্ত। অপ্রতিরোধ্য। চিরকালের।

....
👁 13