ভয়ের বেড়াজালে বন্দী সম্পর্ক

রাইশার বিয়ের পর তিন মাস কেটে গেছে। ঢাকার উত্তরায় ফারিসের ফ্ল্যাটটা এখন তাদের নতুন সংসার। বিয়ের দিন যে ফুলের মালা আর আনন্দের কোলাহল ছিল, সেসব এখন শুধু স্মৃতি। রাইশা প্রতিদিন সকালে উঠে নাস্তা বানায়, চায়ের কাপ সাজায়, ফারিসের শার্ট ইস্ত্রি করে রাখে। কিন্তু ফারিস যেন একটা দেয়ালের আড়ালে থেকে যায়।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

ফারিস সকাল সকাল অফিসে চলে যায়। রাতে ফিরে এসে খাবার খায়, টিভি দেখে, তারপর ঘুমাতে চলে যায়। রাইশা যখন তার কাছে যায়, সে শরীর সরিয়ে নেয়। একদিন রাতে রাইশা তার হাত ধরতে গিয়েছিল। ফারিস চোখ বন্ধ করে শুধু বলেছিল, “ক্লান্ত লাগছে।”

রাইশা বুঝতে পারে না কেন। বিয়ের আগে ফারিস এত নরম ছিল। ফোন করে গল্প করত, হাসি মুখে কথা বলত। এখন সে যেন অন্য মানুষ। রাইশা একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি কি আমাকে চাও না?” ফারিস তাকিয়েছিল তার দিকে, চোখে কোনো অনুভূতি নেই। “সব ঠিক আছে,” বলেছিল শুধু।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

রাইশা রাতে একা বিছানায় শুয়ে ভাবত। তার শরীর ফারিসের স্পর্শ চায়। বিয়ের পর প্রথম কয়েকদিন তারা কাছাকাছি এসেছিল। ফারিসের হাত তার কোমরে, ঠোঁট তার গলায়। কিন্তু সেই আগুনটা খুব তাড়াতাড়ি নিভে গেছে। এখন রাইশা যখন তার বুকের ওপর মাথা রাখতে চায়, ফারিস শরীর শক্ত করে ফেলে।

এক সপ্তাহ পর রাইশা সিদ্ধান্ত নিল সে চেষ্টা চালিয়ে যাবে। সে সন্ধ্যায় ফারিসের প্রিয় খাবার বানাল। মাছের ঝোল, ভাত, সবজি। টেবিল সাজাল মোমবাতি দিয়ে। ফারিস এসে দেখে থমকে গেল।

“এসব কী?” জিজ্ঞেস করল সে।

“আমাদের জন্য,” রাইশা হাসল। “একটু সময় দাও না।”

ফারিস বসে খেল। কথা কম। রাইশা তার পাশে বসে তার হাত ধরল। ফারিসের হাতটা প্রথমে শক্ত ছিল, তারপর ধীরে ধীরে আলগা হয়ে এল। রাইশা তার আঙুলগুলো নিজের আঙুলের ফাঁকে ঢোকাল। ফারিসের চোখ তার চোখের দিকে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য সেখানে কিছু দেখা গেল। কোনো ব্যথা, কোনো ভয়।

রাতের খাবার শেষে রাইশা ফারিসের হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল। আলো নিভিয়ে দিল। ফারিস দাঁড়িয়ে রইল। রাইশা তার সামনে গিয়ে শার্টের বোতাম খুলতে লাগল। ফারিসের শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। রাইশা তার বুকের ওপর হাত রাখল। গরম চামড়া। হৃদস্পন্দন দ্রুত।

“আমাকে ছুঁতে দাও,” রাইশা ফিসফিস করে বলল।

ফারিস তার কোমর ধরল। শক্ত করে। রাইশাকে নিজের দিকে টেনে নিল। তাদের ঠোঁট মিলল। প্রথমে ধীরে, তারপর গভীর। ফারিসের জিভ রাইশার মুখে ঢুকে গেল। রাইশা তার পিঠে নখ বসাল। ফারিসের হাত তার পোশাকের ভেতর ঢুকে গেল। গরম হাত তার ত্বকে।

তারা বিছানায় পড়ল। রাইশা ফারিসের শার্ট খুলে ফেলল। তার বুকের ওপর চুমু দিল। ফারিস চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। রাইশা তার প্যান্টের বোতাম খুলল। ফারিসের শরীর সাড়া দিচ্ছিল। কিন্তু যখন রাইশা তার গভীরে যেতে চাইল, ফারিস হঠাৎ থেমে গেল।

“না,” সে বলল। কণ্ঠস্বর শক্ত। “আজ না।”

রাইশা থমকে গেল। “কেন?”

ফারিস উঠে বসল। তার চোখে আবার সেই দেয়াল। “আমি ক্লান্ত।”

রাইশা বিছানায় বসে রইল। তার শরীর এখনো গরম। চাওয়াটা পূরণ হয়নি। ফারিস বাথরুমে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে দিল।

রাইশা জানালা দিয়ে বাইরের আলো দেখছিল। ঢাকার রাত। গাড়ির আওয়াজ। সে বুঝতে পারছিল না ফারিসের ভেতরে কী ঘটছে। সে শুধু জানত যে ফারিস তাকে তার জীবনে জায়গা দিতে চাইছে না। না শরীরে, না মনে।

পরের দিন সকালে রাইশা ফারিসের মোবাইলে একটা মেসেজ দেখতে পেল। পুরনো মেসেজ। কোনো নাম নেই। শুধু লেখা, “আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারব না।” ফারিস সেটা দ্রুত মুছে ফেলল যখন রাইশা কাছে এল।

রাইশা আর জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু তার মনে সন্দেহ জন্ম নিল। ফারিসের অতীতে কিছু আছে। কিছু ভয়ংকর। যা তাকে অনুভূতি থেকে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য করছে।

সেদিন রাতে রাইশা আবার চেষ্টা করল। সে ফারিসের পাশে শুয়ে তার বুকে হাত রাখল। ফারিস নড়ল না। রাইশা তার কানে ফিসফিস করে বলল, “আমি এখানে আছি। তুমি একা নও।”

ফারিসের হাত তার হাতের ওপর এসে পড়ল। শক্ত চাপ। তারপর আলগা। সে কিছু বলল না। কিন্তু সেই রাতে প্রথমবারের মতো সে রাইশাকে সরিয়ে দেয়নি।

রাইশা চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। তার শরীর ফারিসের শরীরের উষ্ণতা অনুভব করছিল। সে জানত এটা সহজ হবে না। ফারিসের দেয়ালটা মোটা। কিন্তু সে ভাঙবে। ধীরে ধীরে।

সপ্তাহখানেক পর একদিন ফারিস অফিস থেকে আগে ফিরল। রাইশা রান্নাঘরে ছিল। ফারিস পেছন থেকে এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। রাইশা চমকে গেল। ফারিসের ঠোঁট তার ঘাড়ে পড়ল। গরম নিঃশ্বাস।

“তুমি কি চাও?” রাইশা জিজ্ঞেস করল।

ফারিস উত্তর দিল না। শুধু তার শরীর ঘুরিয়ে নিল। তাদের চুমু গভীর হয়ে উঠল। ফারিসের হাত তার পোশাক তুলে দিল। রাইশার ত্বকে তার আঙুলগুলো ঘুরছিল। রাইশা তার চুল আঁকড়ে ধরল। তাদের শরীর একে অপরের কাছে চেপে গেল।

তারা রান্নাঘরের টেবিলের ওপর পৌঁছাল। ফারিস রাইশাকে তুলে ধরল। রাইশা তার কোমর জড়িয়ে ধরল। তাদের শ্বাস মিশে যাচ্ছিল। ফারিসের হাত তার অন্তর্বাসের ভেতর ঢুকে গেল। রাইশা আর্তনাদ করল। গরম, ভেজা অনুভূতি।

কিন্তু ঠিক যখন সবকিছু গভীর হতে যাচ্ছিল, ফারিস আবার থেমে গেল। তার চোখ বন্ধ। শ্বাস দ্রুত। সে রাইশাকে নামিয়ে দিল।

“আমি পারছি না,” সে বলল। কণ্ঠস্বর ভাঙা।

রাইশা তার মুখ ধরল। “বলো কী হয়েছে।”

ফারিস মাথা নাড়ল। “কিছু না। শুধু... আমি পারছি না।”

সে ঘরের দিকে চলে গেল। রাইশা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীর এখনো কাঁপছিল। চাওয়া আর হতাশা একসঙ্গে।

সে জানত ফারিস তাকে চায়। তার শরীর বলে দিচ্ছে। কিন্তু তার মন বাধা দিচ্ছে। কোনো ভয়ংকর স্মৃতি। যা তাকে ভালোবাসা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।

রাইশা সেদিন রাতে একা বিছানায় শুয়ে ঠিক করল। সে থামবে না। সে ফারিসের দেয়াল ভাঙবে। যতদিন লাগে। কারণ সে ফারিসকে ভালোবাসে। এবং সে জানে ফারিসও তাকে ভালোবাসে। শুধু স্বীকার করতে পারছে না।

রাইশা তার পরিকল্পনা শুরু করল ধীরে ধীরে। সে আর জোর করল না। শুধু কাছে থাকল। সকালে চা বানিয়ে দিল। সন্ধ্যায় তার পাশে বসে গল্প করল। রাতে তার হাত ধরে ঘুমাল। ফারিস প্রথমে অস্বস্তি বোধ করত। কিন্তু দিন যত গেল, সে অভ্যস্ত হতে লাগল।

একদিন তারা একসঙ্গে বাজারে গেল। ফারিস রাইশার হাত ধরে হাঁটছিল। হঠাৎ একটা ছেলে সাইকেল নিয়ে তাদের দিকে এল। ফারিস দ্রুত রাইশাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। রক্ষা করার মতো করে। রাইশা তার বুকে মুখ রেখে শুনতে পেল তার হৃদস্পন্দন। দ্রুত। ভয়ের মতো।

“তুমি ভয় পেয়েছ?” রাইশা জিজ্ঞেস করল।

ফারিস মাথা নাড়ল। “না। শুধু সাবধান।”

কিন্তু রাইশা দেখেছিল তার চোখে। সেই পুরনো ব্যথা।

সেদিন রাতে রাইশা ফারিসের কাছে গেল। সে তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে রইল। ফারিসের হাত তার চুলে ঘুরছিল। ধীরে ধীরে।

“তুমি কখনো আমাকে বলবে তোমার অতীতের কথা?” রাইশা জিজ্ঞেস করল।

ফারিস থেমে গেল। “কিছু বলার মতো নেই।”

“আছে,” রাইশা বলল। “আমি দেখতে পাই। তোমার চোখে।”

ফারিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কিছু জিনিস বলা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।”

রাইশা তার বুকে চুমু দিল। “তাহলে অনুভব করতে দাও আমাকে।”

সে রাতটা ভিন্ন ছিল। ফারিস প্রথমবারের মতো পুরোপুরি সাড়া দিল। তাদের শরীর একে অপরের সঙ্গে মিশে গেল। ফারিসের হাত রাইশার প্রতিটি অংশে ঘুরছিল। তার ঠোঁট তার গলায়, বুকে, পেটে। রাইশা আর্তনাদ করছিল। ফারিসের নাম ডাকছিল।

তারা একে অপরের ভেতরে ডুবে গেল। গভীর। গরম। ফারিসের শরীর রাইশার শরীরের ওপর চাপ দিচ্ছিল। তাদের শ্বাস এক হয়ে গিয়েছিল। রাইশা তার পিঠে নখ বসাচ্ছিল। ফারিস তার কানে ফিসফিস করে বলছিল কথা। কোমল কথা। ভালোবাসার কথা। যদিও সে “ভালোবাসি” শব্দটা বলেনি।

শেষে তারা পাশাপাশি শুয়ে রইল। ঘামে ভেজা। রাইশা ফারিসের বুকে হাত রেখেছিল। ফারিসের হৃদস্পন্দন এখন শান্ত।

“এটাই কি তুমি চেয়েছিলে?” রাইশা জিজ্ঞেস করল।

ফারিস তার চুলে চুমু দিল। “আমি জানি না আমি কী চাই।”

রাইশা উঠে বসল। তার চুল কাঁধে পড়েছিল। “তুমি আমাকে চাও। আমি জানি। কিন্তু তুমি নিজেকে দিতে চাও না।”

ফারিস চুপ করে রইল। রাইশা তার মুখ ধরল। “আমি অপেক্ষা করব। কিন্তু চিরকাল না।”

পরের কয়েকদিন তারা কাছাকাছি থাকল। রাতে তারা একে অপরকে ছুঁত। গভীরভাবে। ফারিস কখনো কখনো রাইশাকে জাগিয়ে তুলত মাঝরাতে। তার হাত দিয়ে। তার ঠোঁট দিয়ে। রাইশা সাড়া দিত। তাদের শরীর যেন একে অপরকে খুঁজে পাচ্ছিল বারবার।

কিন্তু দিনের বেলায় ফারিস আবার দূরে সরে যেত। অফিসে দেরি করত। ফোন কম করত। রাইশা বুঝতে পারছিল সে ভয় পাচ্ছে। কাছাকাছি আসার ভয়।

একদিন রাইশা ফারিসের পুরনো ডায়েরি খুঁজে পেল। আলমারির নিচে লুকানো। সে খুলল। কয়েক পাতা পড়ল। সেখানে লেখা ছিল একটা দুর্ঘটনার কথা। একজন মেয়ের কথা। ফারিসের প্রথম ভালোবাসা। একটা গাড়ি দুর্ঘটনা। ফারিস বাঁচল। মেয়েটি বাঁচল না। এবং ফারিস নিজেকে দোষী ভাবছে। কারণ সেদিন সে গাড়ি চালাচ্ছিল।

রাইশার হাত কেঁপে উঠল। সে ডায়েরি রেখে দিল। এখন সব বুঝতে পারছে। ফারিস ভালোবাসার ভয় পায়। কারণ সে মনে করে যে কেউ তার কাছে এলে ক্ষতি হয়।

সেদিন রাতে রাইশা ফারিসের কাছে গেল। সে তার হাত ধরল।

“আমি জানি,” সে বলল।

ফারিসের চোখ বড় হয়ে গেল। “কী জানো?”

“তোমার অতীত। সেই মেয়েটি।”

ফারিস উঠে বসল। তার মুখ ফ্যাকাশে। “তুমি পড়েছ?”

“হ্যাঁ।”

ফারিস মাথা নিচু করল। “এখন তুমি বুঝতে পারছ কেন আমি... ”

“বুঝতে পারছি,” রাইশা বলল। “কিন্তু আমি সে নই। এবং তুমি আমাকে হারাবে না।”

ফারিস তার দিকে তাকাল। চোখে জল। “আমি পারব না আবার কেউ হারাতে।”

রাইশা তার কাছে গেল। তার কোলের ওপর বসল। তার মুখ দুই হাতে ধরল। “তাহলে হারাবে না। আমাকে ধরে রাখো।”

তারা চুমু খেল। লম্বা। গভীর। ফারিসের হাত রাইশার পিঠে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন সে সত্যিই ভয় পাচ্ছে ছেড়ে দিতে। তাদের শরীর আবার মিলল। এবার আরও গভীর। আরও আবেগময়। ফারিস রাইশার প্রতিটি অংশে চুমু দিচ্ছিল। যেন সে নিশ্চিত হতে চাইছে যে রাইশা সত্যিই আছে। জীবিত। তার কাছে।

রাইশা তার নাম ডাকছিল। ফারিসও সাড়া দিচ্ছিল। তাদের শরীর একসঙ্গে কাঁপছিল। শেষে ফারিস রাইশার কানে বলল, “আমি তোমাকে চাই। কিন্তু আমি ভয় পাই।”

রাইশা তার বুকে মাথা রাখল। “ভয় পেয়ো না। আমি এখানে।”

সেই রাতে ফারিস প্রথমবার ঘুমিয়ে পড়ল রাইশার বুকে মাথা রেখে। রাইশা তার চুল আঁচড়াচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল দেয়ালটা ভাঙতে শুরু করেছে। কিন্তু সে জানত না যে নিজের ভেতরেও একটা দেয়াল তৈরি হচ্ছে। অপেক্ষার দেয়াল। ক্লান্তির দেয়াল।

দুই মাস কেটে গেল। ফারিস ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল। সে এখন রাইশার হাত ধরে হাঁটে। রাতে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। কখনো কখনো নিজে থেকেই শুরু করে আবেগের খেলা। তাদের শরীর একে অপরকে চেনে। গভীরভাবে। রাইশা যখন চায়, ফারিস সাড়া দেয়। কখনো কখনো সে নিজেই রাইশাকে জাগায় মাঝরাতে। তার হাত দিয়ে। তার ঠোঁট দিয়ে। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয় একে অপরের শরীরে।

কিন্তু রাইশার মনে একটা শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল। ফারিস এখন তাকে ছুঁয়। কিন্তু পুরোপুরি খোলে না। সে কখনো বলে না “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” সে কখনো তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলে না। রাইশা যখন সন্তানের কথা তোলে, ফারিস চুপ করে যায়। যখন রাইশা বলে “আমরা একসঙ্গে বৃদ্ধ হব,” ফারিস অন্যদিকে তাকায়।

রাইশা বুঝতে পারছিল। ফারিস তার শরীর দিচ্ছে। কিন্তু তার মন এখনো আটকে আছে সেই পুরনো ব্যথায়। সে রাইশাকে জায়গা দিচ্ছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়। অর্ধেক।

একদিন সন্ধ্যায় ফারিস হঠাৎ এল। তার হাতে ফুল। রাইশা অবাক হয়ে গেল। ফারিস তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।

“আমি তোমাকে ভালোবাসি,” সে বলল। কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। “আমি এতদিন ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আর পারছি না লুকিয়ে রাখতে। তুমি আমার দেয়াল ভেঙেছ। আমি চাই তুমি আমার জীবনে থাকো। পুরোপুরি।”

রাইশা তাকিয়ে রইল তার দিকে। ফুলগুলো হাতে নিল। তার চোখে জল এল। এটাই সে চেয়েছিল। এতদিন ধরে। ফারিসের স্বীকারোক্তি। তার ভালোবাসা।

কিন্তু সেই মুহূর্তে তার ভেতরে অন্য কিছু জেগে উঠল। ক্লান্তি। ব্যথা। এতদিন সে একা লড়েছে। এতদিন সে অপেক্ষা করেছে। ফারিস যখন দূরে ছিল, সে কাছে গেছে। যখন ফারিস থেমে গেছে, সে এগিয়েছে। এখন ফারিস প্রস্তুত। কিন্তু রাইশা আর প্রস্তুত নয়।

সে ফুলগুলো নামিয়ে রাখল। ফারিসের হাত ধরল।

“আমিও তোমাকে ভালোবাসি,” সে বলল। “কিন্তু আমি আর থাকতে পারব না।”

ফারিসের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “কী বলছ?”

“তুমি যখন দূরে ছিলে, আমি কাছে গেছি। তুমি যখন ভয় পেয়েছ, আমি অপেক্ষা করেছি। এখন তুমি প্রস্তুত। কিন্তু আমি ক্লান্ত। আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি তোমার দেয়াল ভাঙতে গিয়ে। এখন আমি নিজেকে খুঁজে পেতে চাই।”

ফারিস উঠে দাঁড়াল। তার চোখে আতঙ্ক। “আমি বদলেছি। তুমি দেখোনি?”

“দেখেছি,” রাইশা বলল। “কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। আমি যখন তোমার কাছে এসেছি, তুমি আমাকে ঠেলে দিয়েছ। বারবার। এখন আমি যখন দূরে যেতে চাই, তুমি আমাকে টানছ। এটা ঠিক নয়।”

ফারিস তার হাত ধরতে গেল। রাইশা সরিয়ে নিল।

“আমাকে যেতে দাও,” সে বলল।

সেই রাতে তারা আর কথা বলল না। ফারিস বারবার কাছে এল। রাইশাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল। রাইশা সরে গেল। তার শরীর এখনো ফারিসের স্পর্শ মনে রাখে। গরম রাতগুলো। গভীর চুমু। শরীরের মিলন। কিন্তু তার মন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পরের দিন সকালে রাইশা তার জিনিসপত্র গুছোতে লাগল। ফারিস দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

“তুমি সত্যিই যাবে?” সে জিজ্ঞেস করল।

রাইশা মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”

ফারিস কাছে এল। তার হাত রাইশার গালে রাখল। “আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি লড়ব। আমি বদলাব। শুধু থেকো।”

রাইশা তার হাত সরিয়ে দিল। “তুমি ইতিমধ্যে বদলেছ। কিন্তু আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না তোমার জন্য নিজেকে হারিয়ে।”

সে ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটল। ফারিস পেছন থেকে বলল, “আমি তোমাকে ছাড়ব না।”

রাইশা থামল। পেছন ফিরে তাকাল। “তুমি আমাকে ছাড়োনি। আমি নিজেই ছাড়ছি। কারণ ভালোবাসা শুধু শরীরের মিলন নয়। এটা জায়গা দেওয়া। তুমি যখন দিতে পারোনি, আমি নিয়েছি। এখন আমি নিজেকে জায়গা দিতে চাই।”

সে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। কিন্তু সে থামল না।

ফারিস ফ্ল্যাটে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে এখনো সেই ফুলের গন্ধ। তার শরীরে রাইশার স্পর্শের স্মৃতি। সে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। রাইশা গাড়িতে উঠছে। চলে যাচ্ছে।

ফারিস দেয়ালে হাত রাখল। তার ভেতরের ব্যথা আবার জেগে উঠল। কিন্তু এবার অন্য রকম। এবার সে জানে সে কী হারিয়েছে। এবং সে জানে যে রাইশা ঠিক বলেছে। সে দেরি করেছে।

রাইশা গাড়িতে বসে ঢাকার রাস্তা দেখছিল। তার মনে ফারিসের চুমু। তার হাত। তার শরীর। গভীর রাতের সেই মুহূর্তগুলো যখন তারা একে অপরের ভেতরে হারিয়ে যেত। সে জানে সে ফারিসকে ভালোবাসে। কিন্তু সে আর অপেক্ষা করতে পারবে না। নিজেকে বাঁচাতে হলে তাকে যেতে হবে।

গল্পের শেষে দুজনই একা। একজন দেয়াল ভেঙেছে খুব দেরিতে। অন্যজন দেয়াল ভেঙে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। তাদের ভালোবাসা গভীর ছিল। গরম ছিল। কিন্তু সময়ের হিসাব মেলেনি।

....
👁 11