ভুল ধারণার তিক্ত সত্য

তাসনিম আর আযানের গল্প শুরু হয়েছিল ঢাকার এক ব্যস্ত সন্ধ্যার পর। তারা দুজনেই একই অফিসে কাজ করত। তাসনিম ছিল মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের, আযান ফাইন্যান্স। প্রথম দেখায় আযান তাকে স্যুট পরা অবস্থায় দেখেছিল। চোখে চশমা, কপালে সামান্য ভাঁজ, কিন্তু হাসিটা এমন যে তাসনিমের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

একদিন লিফটে দুজন আটকে যায়। বিদ্যুৎ চলে যায়। অন্ধকারে আযানের গলা শোনা যায়, “ভয় পাচ্ছেন?”

 

¦Ëk¢x/춺'ƒú

তাসনিম বলে, “না।” কিন্তু আওয়াজটা কাঁপছিল।

 

আযান হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরে। গরম হাত। শক্ত আঙুল। সেই স্পর্শই তাদের শুরু।

তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু বদলে যায়। অফিসের পর তারা কফি খায়। তারপর রাতের খাবার। তারপর আযানের ফ্ল্যাটে। প্রথমবার যখন আযান তাকে চুমু খায়, তাসনিমের চোখ বন্ধ হয়ে যায়। আযানের ঠোঁট নরম, কিন্তু চাপটা জোরালো। সে তার কোমর ধরে টেনে নেয়। তাসনিমের শরীর জ্বলে ওঠে। আযানের হাত তার পিঠে ঘোরে, তারপর নিচে নামে। সেই রাতে তারা প্রথমবার একসাথে ঘুমায়। শরীর শরীরে লেগে থাকে। আযান তাকে আস্তে আস্তে খোলে, প্রতিটা স্পর্শে তাসনিম কেঁপে ওঠে। গভীর রাতে আযান তার কানে বলে, “তোমাকে হারাতে চাই না।” তাসনিম বিশ্বাস করে। পুরোপুরি।

মাসখানেক পর তারা একসাথে থাকতে শুরু করে। আযানের ফ্ল্যাটটা ছোট, কিন্তু উষ্ণ। সকালে আযান তাকে জাগায় চুমু দিয়ে। রাতে তাসনিম তার বুকে মাথা রেখে শোয়। তারা একে অপরের শরীর জানে। আযান জানে কোথায় স্পর্শ করলে তাসনিম আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। তাসনিম জানে আযানের ঘাড়ে চুমু খেলে সে কেমন হয়ে যায়। তাদের রাতগুলো লম্বা হয়। শরীরের ঘাম, শ্বাস, আর নিঃশব্দ আর্তনাদে ঘর ভরে যায়। আযান তাকে এমনভাবে ধরে রাখে যেন পৃথিবী থেমে গেছে। তাসনিম চোখ বন্ধ করে বলে, “আমি তোমার।” আযান উত্তর দেয়, “আমিও তোমার।”

বিশ্বাসটা এত গভীর হয় যে তাসনিম আযানের ফোন দেখে না, মেসেজ পড়ে না। সে জানে আযান তাকে কখনো ঠকাবে না। আযানও তাসনিমের প্রতিটা সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তারা বিয়ের কথা বলে। আযান বলে, “আমার বাবা-মাকে নিয়ে আসব। তোমার পরিবারকেও।” তাসনিম হাসে। সবকিছু নিখুঁত মনে হয়।

তারপর সেই ঘটনা। এক শুক্রবার সন্ধ্যা। তাসনিম অফিস থেকে আগে ফিরে আসে। ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। ভেতরে আওয়াজ। মেয়ের আওয়াজ। তাসনিম ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে। বেডরুমের দরজা হাফ খোলা। আযান বিছানায়। তার পাশে এক মেয়ে। কাপড় ছাড়া। আযানের হাত তার কোমরে। তাসনিম দাঁড়িয়ে থাকে। শব্দ করতে পারে না। মেয়েটা তাকে দেখে চমকে ওঠে। আযানও তাকায়। তার চোখে আতঙ্ক। তাসনিম কিছু বলে না। শুধু ঘুরে দাঁড়ায়। তার ব্যাগ হাতে নেয়। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়।

বাইরে এসে সে হাঁটতে থাকে। পা কাঁপছে। চোখ জ্বলে। কিন্তু সে কাঁদে না। ফোনে আযানের কল আসে। সে কাটে। আবার আসে। সে আবার কাটে। তৃতীয়বার সে ফোনটা বন্ধ করে দেয়। রাতে হোটেলে থাকে। পরের দিন অফিস যায় না। আযান মেসেজ পাঠায়—অসংখ্য। সে পড়ে না। তৃতীয় দিন সে চাকরি ছেড়ে দেয়। শহর ছাড়ে। ঢাকা থেকে চলে যায় চট্টগ্রাম। আযান তাকে থামায় না। কোনো কল করে না। কোনো খোঁজ নেয় না। তাসনিম ভাবে, হয়তো আযানও চেয়েছে সে চলে যাক।

চট্টগ্রামে সে নতুন জীবন শুরু করে। নতুন চাকরি। নতুন ফ্ল্যাট। কিন্তু রাতে ঘুম আসে না। আযানের স্পর্শ মনে পড়ে। তার গরম শ্বাস। তার কণ্ঠস্বর। তাসনিম নিজেকে বোঝায়—সে মিথ্যা ছিল। পুরো সম্পর্কটা মিথ্যা। কিন্তু শরীর ভোলে না। রাতের পর রাত সে জেগে থাকে। আযানকে ঘৃণা করে। যেদিন সে আযানকে বিছানায় অন্য মেয়ের সাথে দেখেছিল, সেদিন থেকেই ঘৃণাটা পোড়াতে থাকে।

চ বছর কেটে যায়। তাসনিম এখন চট্টগ্রামের এক বড় কোম্পানির মার্কেটিং হেড। সফল। একা। মাঝে মাঝে কেউ প্রপোজ করে। সে হাসে আর না বলে। কেউ তার শরীর স্পর্শ করতে চাইলে সে সরে যায়। আযানের পর আর কেউ তার কাছে আসেনি।

একদিন অফিসের মিটিংয়ে একজন নতুন ক্লায়েন্ট আসে। নাম জানার পর তাসনিমের হাত কেঁপে ওঠে। আযান। সে এখন এক বড় ফার্মের সিএফও। ঢাকা থেকে এসেছে। মিটিং রুমে ঢোকার সাথে সাথে তাদের চোখ মিলে যায়। আযানের চোখে ক্লান্তি। তাসনিমের চোখে শীতলতা। মিটিং চলে। দুজনেই পেশাদার। শেষে আযান তাকে একা পেয়ে বলে, “কথা বলতে পারি?”

 

তাসনিম বলে, “না।”

 

আযান দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু বলে না। চলে যায়।

কিন্তু ভাগ্য যেন খেলা করে। পরের সপ্তাহে আবার মিটিং। তারপর ডিনার। তাসনিম যায় না। আযান মেসেজ পাঠায়। সে রিপ্লাই করে না। একদিন অফিসের পার্কিং লটে আযান তাকে থামায়।

 

“একবার শোনো।”

 

তাসনিম তাকায়। “কী শুনব? তুমি বিছানায় অন্য মেয়েকে নিয়ে শুয়েছিলে। আমি দেখেছি।”

 

আযানের চোখ নামে। “সেটা… সেটা যা মনে হয়েছে, সেটা না।”

 

তাসনিম হাসে। তিক্ত হাসি। “তাহলে কী? তুমি তাকে জোর করে ধরেছিলে?”

 

আযান চুপ করে। তাসনিম চলে যায়।

রাতগুলো আবার কঠিন হয়ে ওঠে। তাসনিম মনে করে সেই সব রাতের কথা। আযান যখন তার শরীর চুমু খেত। যখন তার পেটের ওপর হাত রেখে বলত, “এখানে আমার সন্তান হবে একদিন।” যখন তারা ঘামে ভিজে একসাথে শুয়ে থাকত। সেই উষ্ণতা। সেই গভীরতা। এখন আর কেউ নেই। তাসনিম নিজেকে শক্ত করে। ঘৃণাটা আঁকড়ে ধরে রাখে।

দুই মাস পর আবার দেখা। এক কনফারেন্সে। রাতের অনুষ্ঠানে আযান তাকে খুঁজে পায়। বাইরে নিয়ে যায়। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আযান বলে, “আমি তোমাকে হারাতে চাইনি।”

 

তাসনিম বলে, “তবু হারিয়েছ।”

 

আযান কাছে আসে। তাসনিম সরে না। আযানের হাত তার গালে ওঠে। উষ্ণ। পরিচিত। তাসনিমের চোখ বন্ধ হয়ে যায়। আযান চুমু খায়। প্রথমে আস্তে। তারপর গভীর। তাসনিমের শরীর সাড়া দেয়। সে আযানের জামার কলার ধরে টেনে নেয়। আযান তাকে দেয়ালে চেপে ধরে। হাত তার কোমরে। তাসনিমের শ্বাস দ্রুত হয়। তারা হোটেলে যায়। এক রাত। শুধু এক রাত।

রুম বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে আযান তাকে তুলে নিয়ে বিছানায় ফেলে। কাপড় খুলে ফেলে। তাসনিমের শরীর আগের মতোই জ্বলে। আযান তার প্রতিটা ইঞ্চি চুমু খায়। গলা থেকে শুরু করে বুক, পেট, তারপর আরও নিচে। তাসনিম আঙুল দিয়ে আযানের চুল আঁকড়ে ধরে। আর্তনাদ চেপে রাখতে পারে না। আযান উঠে এসে তাকে চোখে চোখ রেখে বলে, “আমি এখনো তোমার।” তাসনিম উত্তর দেয় না। শুধু তাকে টেনে নেয়। সেই রাত লম্বা হয়। শরীর শরীরে। ঘামে ভিজে। আযান তাকে এমনভাবে নেয় যেন পাঁচ বছরের ক্ষুধা মেটাচ্ছে। তাসনিমও। ভোর হলে তাসনিম উঠে কাপড় পরে। আযান তাকে ধরে।

 

“থাকো।”

 

তাসনিম বলে, “না।”

 

চলে যায়। আবার।

আরও দুই বছর কেটে যায়। তাসনিম এখন সিঙ্গাপুরে। নতুন চাকরি। নতুন শহর। আযানের খবর রাখে না। একদিন তার ফোনে একটি মেসেজ আসে। অজানা নম্বর। “তাসনিম আপু, আমি আযানের বোন। উনি হাসপাতালে। আপনাকে দেখতে চায়।”

 

তাসনিম প্রথমে ইগনোর করে। তারপর আবার মেসেজ। “উনি আর বেশিদিন নেই হয়তো।”

 

সে প্লেনে ওঠে। ঢাকায় নেমে সোজা হাসপাতালে যায়। আযান বিছানায় শুয়ে। শরীর শুকিয়ে গেছে। চোখ গভীর। তাসনিম দরজায় দাঁড়ায়। আযান তাকে দেখে হাসে। দুর্বল হাসি।

 

“এলে।”

 

তাসনিম কাছে যায়। চেয়ারে বসে। আযান তার হাত ধরে।

 

“শোনো। সেদিন… সেই মেয়ে।”

 

তাসনিম চুপ করে।

 

আযান বলে, “সে আমার বান্ধবী ছিল না। সে ছিল আমার মামার মেয়ে। ক্যানসার। শেষ পর্যায়। ওর বাবা-মা বিদেশে। ও একা। সেদিন ও আমার কাছে এসেছিল। কাঁদছিল। আমি ওকে শুধু জড়িয়ে ধরেছিলাম। কাপড় খুলেছিলাম না। তুমি যখন এলে, ও ভয় পেয়ে কাপড় ঠিক করতে পারেনি। আমিও।”

 

তাসনিমের চোখ ভরে ওঠে।

 

আযান বলে, “তুমি চলে গেলে। আমি থামাইনি। কারণ… সেদিনই ডাক্তার বলেছিল আমারও ক্যানসার। শেষ পর্যায়। আমি জানতাম আমি বাঁচব না। তোমাকে টেনে রাখতে চাইনি। তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। তাই চুপ করেছি। তোমাকে ঘৃণা করার সুযোগ দিয়েছি। যেন তুমি সহজে ভুলে যেতে পারো।”

তাসনিমের বুক ভেঙে যায়। সে আযানের হাত চেপে ধরে।

 

“তুমি… তুমি কেন বলোনি?”

 

আযান হাসে। “বললে তুমি থাকতে। আমি চাইনি তুমি আমার মৃত্যু দেখো।”

 

তাসনিম কাঁদে। আযান তার চুল সরায়।

 

“তুমি সুখী হও। সেটাই আমার শেষ ইচ্ছা।”

দুই দিন পর আযান চোখ বন্ধ করে। তাসনিম তার পাশে বসে থাকে। হাসপাতালের করিডোরে একা হাঁটে। সত্যিটা জেনেছে। যেদিন সে আযানকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করেছিল, সেদিনই আযান তার জন্য সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—তাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তাকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখন সব শেষ।

তাসনিম সিঙ্গাপুরে ফিরে যায়। রাতে একা শোয়। আযানের স্পর্শ মনে পড়ে। তার গরম শ্বাস। তার কণ্ঠস্বর। “আমি তোমার।” এখন আর কেউ নেই। শুধু সত্যিটা আছে। আর দেরি। অনেক দেরি।

....
👁 11