দূরত্বের পর আবার কাছে

ইরহামের জীবন ছিল একটা নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। ঢাকার মিরপুরে ছোট একটা ফ্ল্যাটে একা থাকত সে। সকালে উঠে অফিসে যাওয়া, সন্ধ্যায় ফিরে রান্না করা, তারপর বই পড়া বা ল্যাপটপে কাজ। কেউ তার দরজায় কড়া নাড়লে সে সহজে সাড়া দিত না। বন্ধুরা বলত, “তুই যেন একটা দেয়াল।” ইরহাম হাসত শুধু। ভেতরে ভেতরে জানত, দেয়ালটা দরকারি। কারণ অতীতের কিছু কথা এখনো তার বুকে পাথর হয়ে বসে আছে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

মেহরিন এসেছিল অফিসের নতুন প্রজেক্টে। মার্কেটিং টিমের সিনিয়র। প্রথম দেখায় ইরহাম তাকে খেয়াল করেনি। মিটিং রুমে সবাই বসে আছে, মেহরিন ফাইল নিয়ে ঢুকে বলল, “সবাইকে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দিলাম। কোনো প্রশ্ন থাকলে বলো।” তার গলার স্বর ছিল পরিষ্কার, চোখ দুটো স্থির। ইরহাম মাথা তুলে তাকাল। কালো চুলে হালকা ঢেউ, সাদা শার্ট, নীল জিন্স। কোনো অতিরিক্ত সাজ নেই। শুধু একটা ছোট সিলভার চেইন গলায়।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারা কথা বলতে শুরু করল। মেহরিন জানতে চাইত প্রজেক্টের ডিটেইলস। ইরহাম উত্তর দিত সংক্ষেপে। কিন্তু মেহরিন হাল ছাড়ত না। একদিন অফিসের ক্যাফেতে দুজনে চা খেতে বসল। মেহরিন হাসল, “তুমি কথা কম বলো কেন?” ইরহাম চায়ের কাপ ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “অভ্যাস।” মেহরিন মাথা নাড়ল, “অভ্যাস বদলানো যায়।”

¦Ëk¢x/춺'ƒú

সেই কথাটা ইরহামের মনে গেঁথে গেল। ধীরে ধীরে মেহরিন তার রুটিনে ঢুকে পড়ল। দুপুরে একসাথে লাঞ্চ, সন্ধ্যায় প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা, কখনো কখনো অফিসের ছাদে গিয়ে হাওয়া খাওয়া। মেহরিনের হাসির শব্দ ইরহামের কানে বাজত। রাতে ফ্ল্যাটে ফিরে সে আয়নায় নিজের মুখ দেখত। চোখের নিচে কালো ছায়া কমে গেছে। সে আর আগের মতো একা থাকতে পারছিল না।

এক শুক্রবার সন্ধ্যায় মেহরিন বলল, “চলো, আজ বাইরে খাই।” ইরহাম প্রথমে না বলতে চেয়েছিল। কিন্তু মেহরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে রাজি হয়ে গেল। গুলশানের একটা ছোট রেস্তোরাঁয় বসল তারা। টেবিলের ওপর নরম আলো। মেহরিন অর্ডার দিল, তারপর হঠাৎ বলল, “তুমি কখনো কাউকে কাছে আসতে দাও না। আমি লক্ষ্য করেছি।” ইরহাম চুপ করে রইল। মেহরিন হাত বাড়িয়ে তার হাতের ওপর রাখল। আঙুলের স্পর্শ গরম। ইরহামের শরীর শক্ত হয়ে গেল। সে হাত সরিয়ে নিল না।

সেই রাতে ফিরে ইরহাম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবল। মেহরিনের উপস্থিতি তার সব অভ্যাস বদলে দিচ্ছে। সকালে উঠে সে এখন মেহরিনের মেসেজ চেক করে। অফিসে গিয়ে প্রথমে তার ডেস্কের দিকে তাকায়। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তার কণ্ঠস্বর মনে পড়ে। ইরহাম জানত, এটা বিপজ্জনক। তার অতীতে এমন একটা সত্য লুকানো আছে যেটা সে কাউকে জানাতে পারে না। সেই সত্যের জন্যই সে কাউকে খুব কাছে আসতে দেয়নি। মেহরিনকেও দূরে সরিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু পারছিল না।

পরের সপ্তাহে প্রজেক্টের কাজ বাড়ল। দুজনে রাত পর্যন্ত অফিসে থাকত। এক রাতে সবাই চলে গেলে শুধু তারা দুজন বাকি। কম্পিউটারের স্ক্রিনের আলোতে মেহরিনের মুখ নরম লাগছিল। ইরহাম তার কাছে গিয়ে বসল। মেহরিন মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। চোখের ভেতর একটা প্রশ্ন। ইরহাম হাত বাড়িয়ে তার চুলের একটা কুঁকড়ানো অংশ সরিয়ে দিল। আঙুল চামড়ায় লাগল। মেহরিনের শ্বাস ভারী হয়ে উঠল।

“ইরহাম…” সে ফিসফিস করে বলল।

ইরহাম তার মুখের কাছে এগিয়ে গেল। ঠোঁটের দূরত্ব কমে এল। মেহরিন চোখ বন্ধ করল। ইরহাম চুমু খেল। প্রথমে হালকা, তারপর গভীর। মেহরিনের হাত তার কাঁধে উঠে এল। শরীর কাছাকাছি। ইরহামের বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত। মেহরিনের গলার গরম শ্বাস তার গালে লাগল। তারা আলাদা হল। মেহরিনের চোখ ভিজে। “তুমি আমাকে কাছে আসতে দিচ্ছ,” সে বলল।

ইরহাম কিছু বলল না। শুধু তার হাত চেপে ধরল। সেই রাতে তারা আরও কিছুক্ষণ কথা বলল। মেহরিন তার শৈশবের কথা বলল, পরিবারের কথা। ইরহাম শুনল। নিজের কথা বলল না। মেহরিন জিজ্ঞেস করল, “তোমার অতীত নিয়ে কখনো বলবে?” ইরহাম মাথা নাড়ল। “হয়তো একদিন।”

কিন্তু সে জানত, সেই দিন আসবে না। কারণ তার অতীতের সত্যটা এমন যেটা জানলে মেহরিন তাকে ছেড়ে চলে যাবে। অথবা আরও খারাপ কিছু ঘটবে। তাই ইরহাম ইচ্ছা করেই দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করল। পরের দিন থেকে সে মেহরিনের মেসেজের জবাব দিতে দেরি করত। লাঞ্চে একসাথে না বসে অন্যদের সঙ্গে বসত। মেহরিন বুঝতে পারছিল। তার চোখে প্রশ্ন জমছিল।

একদিন অফিসের পার্কিং লটে মেহরিন তাকে থামাল। “কী হয়েছে তোমার?” তার গলায় রাগ মেশানো কষ্ট। ইরহাম চোখ সরিয়ে বলল, “কিছু না। কাজের চাপ।” মেহরিন হাসল, কিন্তু হাসিটা মিথ্যে। “তুমি আমাকে দূরে ঠেলছ। কেন?” ইরহাম উত্তর দিল না। মেহরিন তার হাত ধরতে চাইল। ইরহাম সরিয়ে নিল। “যাও, মেহরিন। এখন নয়।”

মেহরিন দাঁড়িয়ে রইল। চোখে জল। ইরহাম গাড়িতে উঠে চলে গেল। পথে সে স্টিয়ারিং চেপে ধরল শক্ত করে। বুকের ভেতর ব্যথা। সে মেহরিনকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই ভালোবাসা তাকে ধ্বংস করে দেবে। তাই তাকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে। যত কষ্টই হোক।

রাতের আঁধারে ফ্ল্যাটে ফিরে ইরহাম জানালার বাইরে তাকাল। শহরের আলো জ্বলছিল। মেহরিনের মুখ মনে পড়ল। তার ঠোঁটের স্বাদ এখনো রয়ে গেছে। ইরহাম চোখ বন্ধ করল। সে জানত, এভাবে চলতে থাকলে একদিন মেহরিন চলে যাবে। আর সেটাই হবে ভালো। কারণ তার অতীতের সত্যটা এখনো তার পিছু নিয়ে ঘুরছে। সেই সত্যের নাম সে কাউকে বলেনি। বলবেও না।

পরের কয়েক সপ্তাহে ইরহাম আরও দূরে সরে গেল। মেহরিন চেষ্টা করল কথা বলার। ইরহাম এড়িয়ে গেল। অফিসের করিডোরে দেখা হলে চোখ সরিয়ে নিত। মেহরিনের চোখে হতাশা জমতে লাগল। একদিন সে ইরহামের ডেস্কে একটা নোট রেখে গেল। “আমি বুঝতে পারছি না। তুমি যদি চাও, আমাকে বলো। আমি থাকব। না চাইলেও বলো।” ইরহাম নোটটা পড়ল। ছিঁড়ে ফেলল। কারণ সে চায়, কিন্তু পারবে না।

মেহরিন আর অপেক্ষা করল না। এক সকালে অফিসে এসে সে তার জিনিসপত্র গুছোতে লাগল। ইরহাম দূর থেকে দেখল। মেহরিন তার দিকে তাকাল একবার। চোখে কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা শূন্যতা। তারপর সে চলে গেল। ইরহাম চেয়ারে বসে রইল। হাত কাঁপছিল। সে জানত, এবার সত্যিই দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। আর এই দূরত্ব কখনো কমবে না। কারণ হারিয়ে ফেলা সময় আর না বলা কথাগুলো এখন মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে।

কিন্তু সেই রাতে ইরহাম ঘুমাতে পারল না। মেহরিনের হাসির শব্দ কানে বাজছিল। তার শরীরের উষ্ণতা মনে পড়ছিল। ইরহাম বুঝল, সে নিজেকে শাস্তি দিচ্ছে। অথচ মেহরিন কোনো দোষ করেনি। শুধু ভালোবেসেছিল। আর ইরহাম সেই ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিয়েছে ভয়ের কারণে। অতীতের সেই সত্য এখনো তার গলা চেপে ধরে আছে। সে জানে না, কতদিন এভাবে চলবে। শুধু জানে, মেহরিন চলে গেছে। আর তার জীবন আবার সেই পুরনো ছকে ফিরে গেছে। শূন্য, ঠান্ডা, আর একা।

মেহরিন চলে যাওয়ার পর ইরহামের দিনগুলো একঘেয়ে হয়ে গেল। অফিসে সে আগের মতো কাজ করত। কিন্তু ডেস্কের পাশের খালি চেয়ারটা চোখে লাগত। দুপুরে ক্যাফেতে গিয়ে সে একা বসত। কেউ তার পাশে এলে সে সরে যেত। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করত, “মেহরিন কোথায়?” ইরহাম শুধু মাথা নাড়ত। “অন্য প্রজেক্টে গেছে।” সত্যি কথা বলত না। কারণ সত্যি কথা বললে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যাবে।

রাতগুলো আরও কঠিন ছিল। ফ্ল্যাটে ফিরে সে রান্না করত, কিন্তু খেত না। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকাত। মেহরিনের নম্বর এখনো ফোনে সেভ করা। কখনো কখনো আঙুল নম্বরের ওপর রাখত। কিন্তু কল করত না। কারণ সে জানত, কল করলে মেহরিন প্রশ্ন করবে। আর ইরহামের কাছে কোনো উত্তর নেই।

মাস চলে গেল। প্রজেক্ট শেষ হল। নতুন কাজ এল। ইরহাম ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করল। কিন্তু রাতে ঘুমের ভেতর মেহরিনের মুখ দেখত। তার ঠোঁটের স্বাদ মনে পড়ত। সেই রাতের চুমু। শরীরের কাছাকাছি আসা। ইরহাম ঘুম থেকে উঠে বসত। ঘামে ভিজে যেত শরীর। সে নিজেকে বলত, “ভুলে যা। এটাই ভালো।” কিন্তু ভুলতে পারত না।

এক বছর পর ইরহাম শহর বদলাল। চাকরির সুযোগে চট্টগ্রামে চলে গেল। নতুন ফ্ল্যাট, নতুন অফিস। ভাবল, দূরত্ব বাড়ালে হয়তো মন থেকে মুছে যাবে। কিন্তু যায়নি। চট্টগ্রামের সমুদ্রের গন্ধ তাকে আরও একা করে তুলল। সন্ধ্যায় সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসত। ঢেউয়ের শব্দ শুনত। মেহরিনের কণ্ঠস্বর মনে পড়ত। “অভ্যাস বদলানো যায়।” সেই কথাটা এখনো তার কানে বাজে।

দুই বছর, তিন বছর কেটে গেল। ইরহাম প্রমোশন পেল। কাজের চাপ বাড়ল। সে আরও বেশি সময় অফিসে কাটাত। কেউ তাকে ডেটে ডাকলে সে না বলত। একবার এক সহকর্মী জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?” ইরহাম হাসল। “না।” মিথ্যে কথা। সে ভালোবেসেছে। আর সেই ভালোবাসা এখনো তার বুকে জ্বলছে।

মেহরিনের কথা সে খোঁজ নিত না। সামাজিক মাধ্যমে তাকে ব্লক করে রেখেছিল। কিন্তু মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখত। মেহরিন হাসছে, তার হাত ধরে আছে। তারপর হঠাৎ চলে যাচ্ছে। ইরহাম চিৎকার করে উঠত। ঘুম ভেঙে যেত। সে জানত, মেহরিন হয়তো অন্য কাউকে পেয়েছে। বিয়ে করেছে হয়তো। সন্তান হয়েছে হয়তো। সেই চিন্তাটা তার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধত।

পাঁচ বছর পর ইরহাম আবার ঢাকায় ফিরল। হেড অফিসে বদলি। পুরনো ফ্ল্যাটটা আর নেই। নতুন জায়গায় উঠল। অফিসে নতুন মুখ। কিন্তু পুরনো করিডোরগুলো চিনত। যেখানে মেহরিনের সঙ্গে হাঁটত, যেখানে চুমু খেয়েছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে সে চোখ বন্ধ করত। সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু অনুভূতি একই আছে।

একদিন অফিসের লাইব্রেরিতে বসে কাজ করছিল। হঠাৎ দরজা খুলল। কেউ ঢুকল। ইরহাম মাথা তুলে তাকাল। মেহরিন। চুলে এখন একটু সাদা মিশেছে। মুখে পরিপক্কতা। কিন্তু চোখ দুটো একই। স্থির, গভীর। ইরহামের হাত থেকে কলম পড়ে গেল। মেহরিনও থেমে গেল। দুজনের চোখাচোখি। মাঝখানে পাঁচ বছরের নীরবতা।

মেহরিন প্রথমে কিছু বলল না। শুধু একটা ফাইল নিয়ে টেবিলের কাছে এল। “এটা তোমার দরকার,” সে বলল। গলার স্বর পরিচিত। ইরহাম ফাইল নিল। আঙুল ছুঁয়ে গেল মেহরিনের আঙুল। বিদ্যুৎ খেলল। মেহরিন হাত সরিয়ে নিল দ্রুত। “কীভাবে আছ?” ইরহাম জিজ্ঞেস করল। কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। মেহরিন হাসল। ছোট একটা হাসি। “ভালো। তুমি?” ইরহাম মাথা নাড়ল। “ভালো।” মিথ্যে।

মেহরিন চলে যেতে উদ্যত হল। ইরহাম উঠে দাঁড়াল। “থামো।” মেহরিন থামল। পিছন ফিরে তাকাল। চোখে প্রশ্ন। ইরহাম বলল, “কথা বলতে পারি?” মেহরিন চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “এখন নয়। পরে।” সে চলে গেল। ইরহাম চেয়ারে বসে পড়ল। হাত কাঁপছে। পাঁচ বছর পরও একই অনুভূতি। চোখে একই আগুন। কিন্তু মাঝখানে হারিয়ে ফেলা সময় আর না বলা কথাগুলো পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

সেই রাতে ইরহাম ঘুমাতে পারল না। মেহরিনের মুখ মনে পড়ছিল। তার শরীরের গঠন এখনো মনে আছে। সেই রাতের চুমুর উত্তাপ। ইরহাম জানত, এবার আর দূরে সরিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ সময় পার হয়ে গেছে। অতীতের সত্যটা এখনো আছে। কিন্তু মেহরিনকে হারানোর যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। সে সিদ্ধান্ত নিল, এবার কথা বলবে। সব খুলে বলবে। হোক না ফল যাই হোক।

পরের দিন অফিসে মেহরিনকে খুঁজল। সে মিটিংয়ে ব্যস্ত। ইরহাম অপেক্ষা করল। সন্ধ্যায় মেহরিন বেরোল। ইরহাম তার পেছন পেছন গেল। পার্কিং লটে থামাল। “আজ কথা বলো।” মেহরিন তাকাল। চোখে ক্লান্তি। “কী বলবে?” ইরহাম বলল, “সব। যেটা তখন বলিনি।” মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমার ফ্ল্যাটে চলো।”

মেহরিনের ফ্ল্যাট ছিল উত্তরার একটা বাসায়। ছোট, পরিষ্কার। ইরহাম ঢুকে বসল। মেহরিন চা বানাল। দুজনে মুখোমুখি। ইরহাম শুরু করল। “আমার অতীতে একটা ঘটনা আছে। যেটার জন্য আমি কাউকে কাছে আসতে দিইনি।” মেহরিন শুনল। ইরহাম বলল, কীভাবে একসময় তার পরিবারে একটা বড় ক্ষতি হয়েছিল। কীভাবে সে দায়িত্ব নিয়েছিল। কীভাবে সেই দায়িত্ব তাকে বেঁধে রেখেছিল। কীভাবে সে ভয় পেয়েছিল যে কাউকে কাছে আনলে আবার ক্ষতি হবে। মেহরিন চুপ করে শুনল। চোখে জল আসছিল।

“তাই তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে,” মেহরিন বলল। ইরহাম মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। ভুল করেছিলাম। কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম।” মেহরিন উঠে এল। তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। হাত দুটো ইরহামের হাতে রাখল। “পাঁচ বছর। এতদিন কেন বলোনি?” ইরহাম উত্তর দিতে পারল না। মেহরিন তার গালে হাত রাখল। “এখন বললে। এটাই যথেষ্ট।”

দুজনের চোখে জল। ইরহাম মেহরিনকে টেনে নিল। আলিঙ্গন। শরীর কাছাকাছি। পাঁচ বছরের অপেক্ষা ভেঙে গেল। মেহরিনের শ্বাস তার গলায় লাগল। ইরহাম তার চুলের গন্ধ নিল। পরিচিত। উষ্ণ। তারা আলাদা হল। চোখাচোখি। ইরহাম চুমু খেল। এবার আর হালকা নয়। গভীর, ক্ষুধার্ত। মেহরিন সাড়া দিল। হাত তার পিঠে উঠে গেল। শরীরের উত্তাপ বেড়ে গেল।

সেই রাতে তারা কথা বলল অনেক। হারিয়ে ফেলা সময়ের কথা। না বলা অনুভূতির কথা। মেহরিন বলল, সেও কাউকে কাছে আসতে দেয়নি। ইরহামের জন্য অপেক্ষা করেছে মনে মনে। ইরহাম তার কপালে চুমু খেল। “আর দূরে যাব না।” মেহরিন হাসল। “প্রতিশ্রুতি?” ইরহাম মাথা নাড়ল। “প্রতিশ্রুতি।”

কিন্তু মাঝখানের দেয়ালটা এখনো আছে। সময় পার হয়ে গেছে। দুজনেই বদলে গেছে। ইরহাম জানত, সব সহজ হবে না। অতীতের ছায়া এখনো রয়েছে। কিন্তু এবার সে লড়বে। মেহরিনকে হারাতে রাজি নয়। রাত গভীর হল। দুজনে পাশাপাশি বসে রইল। হাত ধরাধরি করে। শহরের আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসছিল। ইরহামের বুকের ভেতর শান্তি। অনেকদিন পর।

পরের সপ্তাহগুলোতে ইরহাম আর মেহরিন আবার কাছাকাছি এল। অফিসে দেখা হলে চোখে চোখ রাখত। সন্ধ্যায় একসাথে সময় কাটাত। কখনো পার্কে হাঁটত, কখনো বাসায় বসে কথা বলত। শরীরের টান বাড়ছিল। এক রাতে মেহরিনের ফ্ল্যাটে তারা সিনেমা দেখছিল। আলো মৃদু। মেহরিন ইরহামের কাঁধে মাথা রাখল। ইরহাম তার হাত ধরল। আঙুল গুলো জড়িয়ে গেল।

মেহরিন মাথা তুলে তাকাল। “তুমি কি এখনো ভয় পাও?” ইরহাম চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “ভয় আছে। কিন্তু তোমাকে হারানোর ভয় আরও বেশি।” মেহরিন উঠে বসল। তার কোলে উঠে বসল। মুখ কাছাকাছি। “তাহলে আর ভয় পেয়ো না।” ইরহাম তার কোমর জড়িয়ে ধরল। চুমু খেল। এবার আর থামল না। ঠোঁট থেকে গলায় নামল। মেহরিনের শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। হাত ইরহামের চুলের ভেতর ঢুকে গেল।

তারা বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। কাপড় সরতে লাগল। শরীরের উত্তাপ মিশে গেল। ইরহাম মেহরিনের শরীর ছুঁল ধীরে ধীরে। প্রতিটা স্পর্শে মেহরিন কেঁপে উঠল। “ইরহাম…” সে ফিসফিস করল। ইরহাম তার কানে বলল, “আমি এখানে। আর যাব না।” তারা এক হয়ে গেল। গভীর, উত্তপ্ত। পাঁচ বছরের অপেক্ষা এক রাতে মিটে গেল। মেহরিনের নখ তার পিঠে বিঁধল। ইরহামের শ্বাস ভারী। দুজনেই শেষ পর্যন্ত কাঁপতে কাঁপতে থেমে গেল। পাশাপাশি শুয়ে রইল। ঘামে ভেজা শরীর। হাত ধরাধরি।

সকালে ইরহাম মেহরিনের মুখ দেখল। শান্ত। সুন্দর। সে চুমু খেল কপালে। মেহরিন চোখ খুলল। হাসল। “আবার?” ইরহাম হাসল। “আবার।” তারা আবার কাছাকাছি এল। এবার আরও ধীরে। আরও গভীরে। শরীরের প্রতিটা অংশ চেনা হয়ে গেল। ইরহাম মেহরিনের চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” মেহরিনের চোখে জল। “আমিও।”

দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। দুজনে একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। ইরহাম তার ফ্ল্যাটে মেহরিনকে নিয়ে এল। ঘর সাজাল একসাথে। রান্না করল একসাথে। রাতে বিছানায় শুয়ে কথা বলল। অতীতের কথা আর ভয়ের কথা। মেহরিন বলল, “তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে। কিন্তু আমি ফিরে এসেছি। এবার আর ছাড়ব না।” ইরহাম তাকে জড়িয়ে ধরল। “ছাড়ব না।”

কিন্তু সব সময় সহজ ছিল না। মাঝে মাঝে ইরহামের মনে পুরনো ভয় ফিরে আসত। একদিন অফিসে খারাপ খবর এল। পুরনো একটা বিষয় নিয়ে। ইরহাম চুপ করে গেল। মেহরিন বুঝতে পারল। সন্ধ্যায় বাসায় এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। “বলো। আমি আছি।” ইরহাম সব খুলে বলল। মেহরিন শুনল। তারপর বলল, “আমরা একসাথে মোকাবিলা করব।” ইরহাম তার চোখে তাকাল। বিশ্বাস ফিরে পেল।

রাতের পর রাত তারা কাছাকাছি থাকত। শরীরের ক্ষুধা মেটাত। কখনো উত্তপ্ত, কখনো নরম। ইরহাম মেহরিনের শরীর চিনে ফেলল। কোথায় স্পর্শ করলে সে কেঁপে ওঠে, কোথায় চুমু খেলে হাসে। মেহরিনও ইরহামের শরীর চেনে। তার বুকের ওপর মাথা রেখে শোয়। হৃদস্পন্দন শোনে। “এটা আমার,” সে বলে। ইরহাম হাসলে। “সব তোমার।”

একদিন তারা একসাথে বেড়াতে গেল। কক্সবাজারে। সমুদ্রের ধারে হাত ধরে হাঁটল। সূর্যাস্তের আলোয় মেহরিনের মুখ সোনালি লাগছিল। ইরহাম থামল। মেহরিনকে মুখোমুখি দাঁড় করাল। “বিয়ে করবে আমাকে?” মেহরিন চোখ বড় করে তাকাল। তারপর হাসল। “হ্যাঁ।” ইরহাম তাকে তুলে ঘোরাল। দুজনে হাসল। সমুদ্রের ঢেউ তাদের পায়ে আছড়ে পড়ল। কিন্তু বৃষ্টি ছিল না। শুধু আলো আর হাওয়া।

বিয়ের পর তাদের জীবন নতুন রূপ নিল। একসাথে ঘর বাঁধল। কখনো ঝগড়া হত। কখনো দূরত্ব তৈরি হত। কিন্তু তারা কথা বলত। সব খুলে বলত। ইরহাম আর কাউকে দূরে সরায়নি। মেহরিনকে সবচেয়ে কাছে রেখেছে। রাতে বিছানায় শুয়ে তারা একে অপরের শরীর জড়িয়ে থাকত। উত্তাপ মিশে যেত। গভীর চুমু। হাতের স্পর্শ। শরীরের মিলন। প্রতিটা রাত নতুন করে ভালোবাসার।

বছর কেটে গেল। তাদের সন্তান হল। একটা মেয়ে। ইরহাম তাকে কোলে নিয়ে দোলাত। মেহরিন পাশে বসে হাসত। ইরহাম মাঝে মাঝে অতীতের কথা ভাবত। যেদিন মেহরিনকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। যেদিন সে চলে গিয়েছিল। যেদিন আবার দেখা হয়েছিল। সবকিছু এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়। কিন্তু বাস্তব। কারণ হারিয়ে ফেলা সময় আর না বলা কথাগুলো এখন আর দেয়াল নয়। সেগুলো সেতু হয়ে গেছে। দুজনকে আরও শক্ত করে বেঁধেছে।

এক রাতে বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়লে ইরহাম আর মেহরিন বারান্দায় বসল। শহরের আলো জ্বলছিল। মেহরিন ইরহামের হাত ধরল। “মনে আছে প্রথম চুমু?” ইরহাম হাসল। “মনে আছে।” মেহরিন তার কাঁধে মাথা রাখল। “আর কখনো দূরে সরাবে না?” ইরহাম তার চিবুক তুলে চুমু খেল। “না। কখনো না।” তারা আলিঙ্গন করল। শরীরের উত্তাপ মিলল। রাত গভীর হল। দুজনে বিছানায় গেল। আবার কাছাকাছি। আবার এক। গভীর রোমান্স। উত্তপ্ত স্পর্শ। ভালোবাসার অঙ্গীকার।

ইরহাম এখন জানে, অতীতের সত্য তাকে আর বাঁধতে পারে না। কারণ মেহরিন আছে। তার উপস্থিতি তার সব অভ্যাস বদলে দিয়েছে। আর এবার সে সেই পরিবর্তনকে আঁকড়ে ধরেছে। হারিয়ে ফেলা সময় ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু না বলা কথাগুলো এখন বলে ফেলেছে। আর চোখে যে অনুভূতি ছিল, সেটা এখন আরও গভীর। দুজনে একসাথে। এটাই শেষ কথা।

....
👁 13