অহংকার ভেঙে এক হওয়া

বিকেলের নরম রোদের আলোটা জানলার কাঁচ ভেদ করে ঘরের মধ্যে এসে পড়েছে। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে সাবিত কড়া চোখে তাকিয়ে আছে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে, কিন্তু তার মনোযোগ পুরোপুরি অন্য জায়গায়। পাশের সোফায় বসে নওশিন একটা কিতাবের পাতা ওল্টাচ্ছে, তবে তার পাতার ওপরে থাকা আঙুলগুলোর কম্পন বলে দিচ্ছে তার মনের অবস্থাও শান্ত নয়। দুজনের মাঝে সাকুল্যে তিন ফুটের দূরত্ব, কিন্তু এই দূরত্বটুকু যেন একটা অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সিদ্ধান্তে মাস তিনেক আগে তাদের এই বিয়েটা হয়েছিল। সাবিত করপোরেট দুনিয়ার একজন ঠান্ডা মাথার এবং উচ্চাভিলাষী মানুষ, যার কাছে সময় আর নিয়মই শেষ কথা। আর নওশিন একটু স্বাধীনচেতা, নিজের মত নিয়ে চলতে ভালোবাসে। প্রথম থেকেই দুজনের অহংকার আর না-মেনে নেওয়ার জেদ তাদের সম্পর্কটাকে একটা যুদ্ধ বানিয়ে তুলেছে। সকালের চা থেকে শুরু করে রাতের ডিনার টেবিল—সবকিছুতেই একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে। কে কার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, কে কার চেয়ে বেশি শক্তিশালী, এই প্রমাণ করার লড়াই যেন তাদের রোজকার রুটিন।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দুজনেরই ঘোর কাটল। কাজের বুয়া এসে একটা খাম টেবিলের ওপর রেখে গেল। সাবিত ভ্রু কুঁচকে খামটা তুলে নিল। ভেতরে কিছু ছবি আর একটা বেনামী চিঠি। ছবিগুলো দেখেই সাবিতের মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। ছবিগুলোতে নওশিনকে নিয়ে কিছু অপমানজনক ও ভিত্তিহীন কথা লেখা রয়েছে, যা সাবিতের অফিসের এক প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর চাল। বাইরে থেকে তাদের দাম্পত্য জীবনের ফাটলটাকেই নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে চাইছে কেউ, যাতে সাবিতের পারিবারিক সুনাম নষ্ট হয় এবং সে প্রমোশন হারায়।

 

সাবিত শক্ত হাতে কাগজটা মুচড়ে ফেলল। তার চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। সে কোনো কথা না বলে ছবিগুলো নওশিনের দিকে ছুঁড়ে দিল। নওশিন ছবিগুলো হাতে নিয়ে দেখেই শিউরে উঠল। তার গলার স্বর কেঁপে গেল, "এগুলো... এগুলো কে পাঠিয়েছে? এটা তো সম্পূর্ণ মিথ্যা!"

 

সাবিত শীতল গলায় বলল, "মিথ্যা কি সত্য, সেটা এই মুহূর্তে অফিসে আমার পজিশন আর আমাদের ইমেজের জন্য কোনো ব্যাপার না। বাইরে থেকে কেউ আমাদের দুজনকে টার্গেট করেছে। আর এর পেছনের মূল মাথাটা কে, তা বুঝতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হচ্ছে না। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী রহমান সাহেব আমাদের এই ঠুনকো ঝগড়ার সুযোগটাই নিয়েছেন।"

 

নওশিন এবার আর চুপ থাকতে পারল না। তার চোখে জল এসে গেল, কিন্তু সে তা আটকে শক্ত গলায় জবাব দিল, "তো তুমি কি মনে করো আমি এসবের মধ্যে জড়িত? নাকি তুমি আমাকেই দোষ দিচ্ছো? আমাদের নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগটাই তো এরা বাইরে ছড়িয়ে দিচ্ছে!"

 

"দোষ দেওয়ার সময় এটা নয়, নওশিন!" সাবিত এবার টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল, তার গলার স্বর কঠোর হলেও তাতে একটা নতুন দায়িত্বের সুর ছিল। "তুমি বুঝতে পারছ না, এই আঘাতটা শুধু আমার ক্যারিয়ারের ওপর নয়, আমাদের পুরো পরিবারের সম্মানের ওপর। এতদিন আমরা নিজেদের ভেতরে ঝগড়া করে নিজেদের শক্তি ক্ষয় করেছি, আর বাইরের লোক সেই সুযোগ নিয়েছে। এখন যদি আমরা এক হয়ে লড়তে না পারি, তবে টিকতে পারব না।"

 

নওশিন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ক্ষোভের চেয়ে অনেক বেশি ছিল জেদ আর আত্মসম্মানবোধ। সে সাবিতের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল, দুজনের চোখের দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চি। নওশিনের বুকের ওঠানামা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "আমি নওশিন চৌধুরী। বাইরের কোনো লোকের সাধ্য নেই আমাকে বা আমার পরিবারকে আঙুল তোলে। তোমার সাথে আমার যতই অমিল থাক না কেন, বাইরের শত্রুর সামনে আমি মাথা নোয়াবো না।"

 

সাবিতের বুকটা একটা অচেনা ভালোলাগায় কেঁপে উঠল। এই প্রথমবার সে নওশিনের চোখের ভেতর এক অসম্ভব শক্তি আর সততা দেখতে পেল। এতদিন সে ভেবেছিল নওশিন কেবলই জেদি আর অহংকারী, কিন্তু আজ এই বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটির ভেতর একটা সিংহীর তেজ লুকিয়ে আছে।

 

পরিস্থিতির গম্ভীরতা বুঝতে পেরে সাবিত এক পা এগিয়ে এসে নওশিনের আরও কাছে দাঁড়াল। ঘরের বাতাসটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। বাইরের বিকেলের রোদের আলো এখন ঘরের ভেতরে এসে দুজনের ওপর এক সোনালী আভা ফেলছে। সাবিতের দীর্ঘদেহী শরীরের উষ্ণতা নওশিনের গায়ে এসে লাগতেই নওশিন একটু পিছানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সাবিত তার হাত বাড়িয়ে তার কব্জিটা শক্ত করে ধরে ফেলল।

 

কব্জির সেই স্পর্শে নওশিনের সারা শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে শ্বাস আটকে সাবিতের দিকে তাকিয়ে রইল। সাবিতের চোখ দুটো তখন আর আগের মতো শীতল ছিল না, তাতে জ্বলছিল এক তীব্র আগুন—যে আগুনে রাগ নেই, আছে এক গভীর অধিকারবোধ।

 

সাবিত খুব কাছাকাছি এসে ফিসফিস করে বলল, "তুমি ঠিক বলেছ, নওশিন। আমাদের ঝগড়াগুলো সব ভুয়ো ছিল। আসল শত্রু বাইরে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আমার ওপর অধিকার শুধু আমার নিজের, কিংবা আমার পরিবারের। বাইরের কেউ যদি তোমার দিকে আঙুল তোলে, তার হাত ভেঙে দেওয়া আমার কাজ। আর তার আগে... আমাদের এই অভিনয়টা খুব নিখুঁত করতে হবে।"

 

নওশিনের হৃদস্পন্দন তখন পাগলের মতো ছুটছে। সাবিতের মুখের সুবাস আর তার শরীরের জোরালো উপস্থিতি নওশিনের চারপাশের সব চিন্তা গুলিয়ে দিল। সে সাবিতের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "কী করতে হবে তোমাকে?"

 

সাবিত এক হাত দিয়ে নওশিনের কোমরটা একটু টেনে নিজের আরও কাছে নিয়ে এল। এতদিনের সমস্ত দূরত্ব নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নওশিনের নিঃশ্বাস মিশে গেল সাবিতের নিঃশ্বাসের সাথে। ঘরের সেই ক্ষুদ্র পরিসরে কেবল দুজনের হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সাবিত তার অন্য হাতটা বাড়িয়ে নওশিনের চিবুকটা সামান্য উঁচুতে তুলে ধরল। তার দৃষ্টি সরাসরি নওশিনের ঠোঁটের দিকে নামল, তারপর আবার চোখে ফিরে এল।

 

"শত্রুকে ধোঁকা দিতে হলে আমাদের এমনভাবে অভিনয় করতে হবে, যেন আমরা বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দম্পতি। আর তার শুরুটা এখনই করতে হবে," সাবিতের গলাটা আরও গভীর ও উষ্ণ হয়ে উঠল।

 

নওশিন আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। সে সাবিতের চোখের সেই তীব্র রোমাঞ্চকর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার গলার ওপর নিজের হাত রাখল। সাবিত আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে তার ঠোঁট নামিয়ে দিল নওশিনের ঠোঁটের ওপর। সেই চুম্বনে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অবদমিত আবেগ, রাগ আর গভীর এক আকর্ষণের বিস্ফোরণ। নওশিন প্রথমে একটু চমকে গিয়ে শক্ত হয়ে থাকলেও পরমুহূর্তেই সে সাবিতের কাঁধের শার্ট খামচে ধরে সেই চুম্বনের উত্তাপে নিজেকে সমর্পণ করে দিল।

বাইরের আকাশটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে। ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় সাবিত আর নওশিনের ঠোঁটের দূরত্ব তখনও খুব সামান্য। কিছু সময় আগের সেই তীব্র আবেগঘন চুম্বনের রেশ এখনও ঘরের বাতাসে রয়ে গেছে। নওশিনের দুই গাল লজ্জায় ও উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে, কিন্তু তার চোখে সেই আগের মতো জেদ বা বিরক্তি নেই; বরং একটা অদ্ভুত ঘোর কাজ করছে। সাবিত তার হাতটা নওশিনের কোমর থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিল, তবে তার দৃষ্টি এখনও নওশিনের মুখের ওপর স্থির।

 

সাবিত গলাটা একটু পরিষ্কার করে গম্ভীর গলায় বলল, "শুরুটা মন্দ হলো না। শত্রুকে বিশ্বাস করাতে হলে এই রসায়নটাই আমাদের জনসমক্ষে ফুটিয়ে তুলতে হবে।"

 

নওশিন দ্রুত নিজের সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিল। বুক তখনো উথালপাথাল করছে, কিন্তু সে তার স্বভাবসুলভ অহংকার বজায় রাখার চেষ্টা করে ঝাঁঝালো গলায় বলল, "এর মানে এই নয় যে তুমি সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে, সাবিত চৌধুরী! অভিনয় আর বাস্তবের ফার্দটা যেন গুলিয়ে ফেলো না।"

 

সাবিত মৃদু হাসল। সেই হাসিতে একটা হালকা ব্যঙ্গের ছোঁয়া থাকলেও চোখের কোণে এক ধরনের কৌতূহল ও উষ্ণতা স্পষ্ট ছিল। সে সোফায় বসে ল্যাপটপটা বন্ধ করতে করতে বলল, "বাস্তব আর অভিনয় কোথায় আলাদা, সেটা সময় বলে দেবে, নওশিন। তবে রহমান সাহেবকে যদি ঘায়েল করতে হয়, তবে আগামীকালের অফিস পার্টিতে আমাদের একসঙ্গেই এন্ট্রি নিতে হবে। আর সেখানে এই রোমান্টিক কাপল ইমেজটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।"

 

পরদিন সন্ধ্যায় শহরের অভিজাত এক ক্লাবে আয়োজিত হয়েছে এক বড় করপোরেট পার্টি। রহমান সাহেব এই পার্টির মূল হোস্ট। হলের উজ্জ্বল আলোর নিচে বড় বড় ব্যবসায়ীরা জটলা পাকাচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মূল দরজায় লাইটগুলো যেন একটু কেঁপে উঠল। সবার নজর চলে গেল প্রবেশদ্বারের দিকে।

 

সাবিত প্রবেশ করেছে, আর তার ডান হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে নওশিন। সাবিতের পরনে নিখفت কাটছাঁটের কালো স্যুট, আর নওশিন পরেছে জমকালো লাল রঙের একটি শাড়ি, যা তার রূপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দুজনের মুখেই এক মিষ্টি কিন্তু রহস্যময় হাসি। দেখতে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ও আদর্শ দম্পতি। রহমান সাহেব দূর থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে চোখের মণি ছোট করে ফেললেন। তার মনে সন্দেহ তৈরি হলো—যে ছবি আর চিঠি তিনি ফাঁস করেছিলেন, তার প্রভাব তো এদের সম্পর্কের ওপর পড়ার কথা ছিল! উল্টো এদের ভেতরের বন্ডিং তো আরও বেশি গভীর দেখাচ্ছে।

 

সাবিত নওশিনের কোমরটা অত্যন্ত যত্নের সাথে হালকা করে জড়িয়ে ধরে ভিড়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল। নওশিন সাবিতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "দেখো, রহমান সাহেবের মুখের রঙটা কেমন চুনকালি হয়ে গেছে। তোমার এই চালটা সত্যিই দারুণ ছিল।"

 

সাবিত তার মুখের খুব কাছে মুখ এনে নিচু গলায় জবাব দিল, "বলেছিলাম না, আমার সাথে লড়তে হলে অনেক বুদ্ধি নিয়ে নামতে হবে। তবে খেয়াল রেখো, আমাদের দিকে রহমান সাহেবের লোকজনের নজর আছে। এখন আমাদের অভিনয়টা আরেকটু নিখুঁত করতে হবে।"

 

ঠিক তখনই রহমান সাহেব নিজেই এক গ্লাস ড্রিংক হাতে তাদের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। মুখে এক কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন, "আরে সাবিত বাবু! আপনাদের তো একসাথে দেখে খুব ভালো লাগছে। শুনলাম আপনাদের নাকি ব্যক্তিগত জীবনে কিছু ঝামেলা চলছিল? দেখে তো মনে হচ্ছে আপনারা হানিমুন পিরিয়ডে আছেন!"

 

সাবিত বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে নওশিনকে নিজের আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, "ব্যক্তিগত জীবন আর প্রফেশনাল জীবনকে গুলিয়ে ফেলা আমাদের অভ্যেস নয়, রহমান সাহেব। আর আমাদের সম্পর্কের গভীরতা কতটা, সেটা বাইরে থেকে সবাই বুঝতে পারে না। বিশেষ করে যারা আমাদের দুর্বল করার জন্য ছোটখাটো নোংরা চক্রান্ত করে, তারা তো ভুলেই যায় যে আমাদের ভিত্তিটা কত শক্ত।"

 

রহমান সাহেবের মুখটা সামান্য শক্ত হয়ে গেল। তিনি জোর করে হেসে বললেন, "চক্রান্ত? কে আবার চক্রান্ত করবে? আমি তো শুধু এমনিই বললাম।"

 

নওশিন এবার মৃদু হেসে রহমান সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, "চক্রান্ত কে করেছে বা কারা পর্দার আড় থেকে কাগজ বিলি করেছে, তার সব প্রমাণ আমাদের হাতে চলে এসেছে, রহমান সাহেব। আমরা শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছি। আজ রাতে পার্টিটা উপভোগ করুন, কাল সকালে হয়তো আপনাদের কোম্পানির বোর্ডরুমে আমাদের আসল খেলাটা দেখতে পাবেন।"

 

নওশিনের এই তীক্ষ্ণ ও নির্ভীক জবাব শুনে রহমান সাহেব ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলেন। তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারলেন না, অজুহাত দেখিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

 

পার্টির একটা কোণায় এসে সাবিত আর নওশিন হাফ ছেড়ে বাঁচল। চারপাশের কোলাহল থেকে একটু দূরে এই নিভৃত কোণটায় আলো কিছুটা কম। সাবিত দেয়ালে একটু ভর দিয়ে দাঁড়াল এবং এক হাত বাড়িয়ে নওশিনকে নিজের মুখোমুখি করে দাঁড় করাল। তাদের দুজনের শরীরের দূরত্ব এতই কম যে নওশিনের নাকে সাবিতের কলোনির মিষ্টি গন্ধ এসে লাগল।

 

সাবিতের চোখ দুটো চকচক করছিল। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে নওশিনের দিকে তাকিয়ে বলল, "মানতেই হবে, নওশিন। তোমার এই কথা বলার ধরণ আর সাহসিকতা যেকোনো শক্তিশালী শত্রুকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। এতদিন আমি ভেবেছি তুমি শুধু ঝগড়া করতে পারো, আজ দেখলাম তুমি সত্যিকারের পাশে দাঁড়াতে জানো।"

 

নওশিনের হৃদস্পন্দন আবার সেই আগের মতো বেড়ে গেল। সে সাবিতের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আমি কারোর করুণা চাই না, সাবিত। তোমার সম্মান মানেই আমার সম্মান। শত্রুর সামনে আমি মাথা নোয়াবো না—সেটা আগেই বলেছিলাম।"

 

সাবিত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তার এক হাত নওশিনের পিঠে রাখল, অন্য হাত দিয়ে তার চিবুকটা ধরে নিজের মুখের কাছে টেনে আনল। চারপাশের হাজারও মানুষের কোলাহল যেন তাদের কাছে তখন সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেছে। সাবিত খুব নিচু ও ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল, "এই অভিনয়ের আড়ালে আমরা যা বলছি, তার একটা শব্দও কি মিথ্যে ছিল, নওশিন?"

 

নওশিনের গলা দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। সে শুধু তার চোখের পলক ফেলে নিজের সম্মতি জানাল। সাবিত আর কোনো সময় নষ্ট করল না। সে সরাসরি তার ঠোঁট নামিয়ে দিল নওশিনের ঠোঁটের ওপর। এই চুম্বনে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল এক গভীর অধিকার, উষ্ণতা আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝি মুছে যাওয়ার এক পরম শান্তি। নওশিন তার দুই হাত সাবিতের কাঁধে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সেই গভীর চুম্বনে নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিল।

পরদিন সকালের আলো ফোটার সাথে সাথেই সাবিত আর নওশিনের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। গত রাতের পার্টিতে রহমান সাহেবের দুর্নীতির সমস্ত পাকা প্রমাণ সাবিত সরাসরি তাদের কোম্পানির প্রধান বোর্ড অব ডিরেক্টরসদের হাতে তুলে দিয়েছিল। রহমান সাহেব আর কোনো রক্ষা পাননি; দুপুরের মধ্যেই তাকে সাসপেন্ড করা হয় এবং তার সমস্ত অবৈধ কারবার সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। যে ঝড় সাবিত আর নওশিনের সংসার ভেঙে দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে আনা হয়েছিল, সেই ঝড়েই রহমান সাহেবের পুরো কেরিয়ার ছারখার হয়ে গেল।

 

সাবিত যখন অফিস থেকে দুপুরের দিকে ঘরে ফিরল, তখন বাড়ির পরিবেশটা একেবারেই অন্যরকম লাগছিল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সে খেয়াল করল, কোথাও কোনো উত্তেজনার রেশ নেই, আছে এক অদ্ভুত শান্ত ও মধুর সুবাস। নওশিন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার পরনে হালকা রঙের একটি সুতির শাড়ি, চুলে খোপা করা, কপালে ছোট একটা টিপ। তার এই ঘরোয়া অথচ মোহময় রূপ দেখে সাবিতের বুকটা এক অজানা ভালোলাগায় ভরে গেল।

 

সাবিত ব্রিফকেসটা সোফার ওপর রেখে এক পা এগিয়ে এসে নওশিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এলাম। কারণ জানো তো? একটা যুদ্ধ জয়ের পর বিজয়ী বীরের একটু বিশ্রামের দরকার হয়।"

 

নওশিন সাবিতের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল, তবে তার চোখের কোণে সামান্য অভিমানের ঝিলিক খেলা করে গেল। সে সোফার একপাশে দাঁড়িয়ে বলল, "যুদ্ধ তো জয় করলে, রহমান সাহেবও কুপোকাত। কিন্তু এতদিনের এই ঝগড়াঝাঁটি আর রাগের আড়ালে যে আমাদের নিজেদের ভুলগুলো জমছিল, তার কী হবে?"

 

সাবিত আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দ্রুত এগিয়ে এসে নওশিনের দুই বাহু ধরে তাকে নিজের শরীরের সাথে একেবারে মিশিয়ে নিল। ঘরের মধ্যে তখন দুপুরবেলার নরম রোদ এসে পড়েছে। সাবিতের চোখের গভীরতা দেখে নওশিনের নিশ্বাস ভারী হয়ে এল।

 

সাবিত অত্যন্ত নিচু ও রোমাঞ্চকর গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমাদের নিজেদের ভুলগুলো ভাঙানোর জন্যই তো এই সমস্তকিছুর শুরু হয়েছিল, নওশিন। এতদিন আমরা দুজনেই আমাদের অহংকারকে বড় করে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি আমাকে দাবিয়ে রাখতে চাও, আর তুমি ভেবেছিলে আমি তোমার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাই। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো—আমি তোমা ছাড়া আর কাউকেই এভাবে চাইনি।"

 

নওশিনের বুকটা উথালপাথাল করে উঠল। সে সাবিতের প্রশস্ত বুকের ওপর নিজের ডান হাতটা রাখল এবং তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "তুমি কি সত্যি বলছ, সাবিত? নাকি এটাও আমাদের সেই অভিনয়েরই একটা অংশ?"

 

সাবিত তার অন্য হাতটা দিয়ে নওশিনের পিঠ জড়িয়ে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে আনল। তাদের দুজনের মাঝে আর এক সুতো ফাঁকও রইল না। সাবিত তার উষ্ণ নিঃশ্বাস নওশিনের কানের কাছে ফেলে গভীর গলায় বলল, "অভিনয় তখন ছিল, নওশিন। কিন্তু এখন যা অনুভব করছি, তার এক ফোঁটাও মিথ্যে নয়। তুমি আমার অহংকার ভেঙে দিয়েছ, আর তার বদলে নিজের জায়গা করে নিয়েছ আমার পুরো হৃদয়ে।"

 

কথাটা শেষ করেই সাবিত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তার মুখটা নামিয়ে সরাসরি নওশিনের ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট রাখল। সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না; ছিল এক অন্তহীন গভীরতা, অধিকারবোধ আর পরম ভালোবাসার এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস। নওশিন প্রথমে একটু কেঁপে উঠলেও পরমুহূর্তেই নিজের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সাবিতের গাঢ় চুম্বনে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব সঁপে দিল। তার হাত দুটো সাবিতের কাঁধ থেকে পিছলে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তার ঘাড়। ঘরের বাতাস যেন সেই গভীর উষ্ণতায় আরও ভারী হয়ে উঠল।

 

কিছুক্ষণ পর যখন তারা পরস্পর থেকে মুখড়াল, দুজনেরই বুক তখন দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। নওশিনের দুই গাল লজ্জায় লাল, চোখ দুটো আচ্ছন্ন। সাবিত তার হাতের আঙুল দিয়ে নওশিনের চিবুকটা ছুঁয়ে খুব যত্নে তার কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিল এবং কপালে একটা দীর্ঘ ও গভীর ভালোবাসার চুমু খেল।

 

নওশিন মৃদু হেসে সাবিতের বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তাহলে কি আমাদের এই বাধ্যবাধকতার বিয়েটা আজ থেকে সত্যিকারের বিয়ে হয়ে গেল?"

 

সাবিত নওশিনকে নিজের বাহুডোরে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে জানলার বাইরে বিকেলের মিষ্টি রোদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, "হ্যাঁ, নওশিন। আজ থেকে আমাদের এই অচিন সীমানার দূরত্ব ঘুচে গেল। আমাদের আসল ভালোবাসার গল্প তো আজ থেকেই শুরু হলো।"

 

বাইরে তখন পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলো চারপাশ রাঙিয়ে দিয়েছে, আর ঘরের ভেতরে সাবিত আর নওশিন তাদের সমস্ত অহংকার ও দূরত্ব চিরতরে মুছে ফেলে একে অপরের বাহুতে একাকার হয়ে গেল।

....
👁 17