শূন্যতা থেকে পূর্ণতা খোঁজা

ঢাকার তেজগাঁও এলাকার একটি বহুতল অফিসের কাঁচঘেরা ক্যাফেটেরিয়া। বাইরের তীব্র রোদে ট্রাফিকের হর্ন আর মানুষের ব্যস্ততা মিলে এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে ভেতরে এসি-র ঠান্ডায় চারপাশ বেশ শান্ত। আরশি নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা টাইপ করছিল। ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়াল দীর্ঘদেহী এক যুবক। পরনে হালকা নীল শার্ট, চোখে ক্লান্তি আর চোখে পড়ার মতো এক অজানা সংকোচ।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

লোকটিকে দেখেই আরশির আঙুলগুলো কীবোর্ডের ওপর থেমে গেল। বুকটা যেন একবারের জন্য কেঁপে উঠে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। তামিম। অবিকল সেই মানুষটা, যাকে সে আজ থেকে চার বছর আগে নিজের জীবন থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

তামিম মৃদু হেসে অত্যন্ত নরম গলায় বলল, "কেমন আছো, আরশি?"

 

আরশি এক পলক তার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের পলক নামিয়ে নিল। মুখে কোনো অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বা বিস্ময় নেই, বরং এক বরফশীতল উদাসীনতা। সে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে শান্ত গলায় উত্তর দিল, "ভালো আছি, তামিম। বলো, হঠাৎ এখানে?"

 

তামিম ঠিক সামনে রাখা চেয়ারটাতে বসার অনুমতি না নিয়েই বসে পড়ল। তার চোখে বহুদিনের জমে থাকা অপরাধবোধ আর না বলা কথাগুলোর আর্তনাদ। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "জানি না হঠাৎ বলা চলে কি না। তবে অনেক দিন ধরে তোমাকে খুঁজছিলাম। অবশেষে আজ দেখা মিলল। তোমার অফিসে আসতেই হতো, কারণ ফোনে তো তুমি আমার নম্বর ব্লক করে রেখেছো।"

 

আরশি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মাথা তুলল। তার চোখে এখন আর কোনো অভিযোগ নেই, আছে এক অদ্ভুত পরিপক্বতা। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, "নম্বর ব্লক করার একটা সঠিক কারণ তো ছিল, তামিম। যে অধ্যায় আমি চার বছর আগে নিজেই বন্ধ করে দিয়েছি, সেটার পাতা আবার উল্টানোর কোনো মানে হয় না।"

 

তামিমের গলাটা একটু কেঁপে উঠল। সে টেবিলের ওপর রাখা আরশির হাতটা ছুঁতে গেল, কিন্তু আরশি নিপুণ দক্ষতায় হাতটা সরিয়ে কফি কাপের হাতল শক্ত করে ধরে রাখল। তামিম বলল, "আমি জানি সেদিন আমার তরফ থেকে অনেক বড় ভুল হয়েছিল। আমার অন্ধ অহংকার আর একটা ভুল বোঝাবুঝি আমাদের চার বছরের সুন্দর সম্পর্কটা এক নিমিষে শেষ করে দিয়েছিল। আমি তখন তোমার কথা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আরশি... এই চার বছর একটা দিনের জন্যও আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি। প্রতিদিন অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছি। আজ আমি সব গুছিয়ে নিয়ে এসেছি শুধু তোমায় ফেরত পাওয়ার জন্য।"

 

আরশির ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে সোজা হয়ে বসে তামিমের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো রাগ নেই, আছে শুধুই ক্লান্তি। আরশি বলল, "তুমি ক্ষমা চাইতে চেয়েছো, চেয়েছ। তোমার অনুশোচনা দেখে হয়তো আমার রাগ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আজ আমার ভেতর কিচ্ছু নেই, তামিম। শূন্যতা ছাড়া আর কিছু না। তুমি যখন আমাকে তীব্র অপমান করে সেদিন চলে গিয়েছিলে, তখন এই শূন্যতাটারই জন্ম হয়েছিল। আমি তিল তিল করে নিজের জীবনটাকে আবার গড়ে তুলেছি। আজ আমার একটা গোছানো ক্যারিয়ার আছে, নিজের পরিচয় আছে, নিজের শান্তি আছে।"

 

"কিন্তু আমি তো তোমার সেই আগের তামিমই আছি, আরশি! একটু সুযোগ দাও, আমি সব আগের মতো সুন্দর করে দেব," তামিমের কণ্ঠে আকুলতা ঝরে পড়ল।

 

"তুমি আগের মতো আছো, কিন্তু আমি তো আগের সেই আরশি নেই, তামিম!" আরশির কণ্ঠস্বর এবার একটু ভারী হলো, তবে তাতে দৃঢ়তার অভাব ছিল না। সে টেবিলের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাইরে রোদে পোড়া শহরের দিকে তাকাল। "মানুষের জীবনে চার বছর মানে অনেক লম্বা সময়। এই সময়ে মানুষ অনেক বদলায়। যে মানুষটা তোমার জন্য কেঁদে বুক ভাসাত, সে আজ একা বাঁচতে শিখে গেছে। যে ক্ষত তুমি দিয়েছিলে, সময়ের সাথে সাথে সেখানে শক্ত চামড়া গজিয়েছে। এখন আর সেখানে নতুন করে দাগ লাগানোর কোনো জায়গা নেই।"

 

তামিম যেন কথাটা মানতে পারল না। সে আরও একটু ঝুঁکے এসে বলল, "তুমি কি একটুও ভালোবাসো না আমাকে? একটুও কি মনে পড়ে না আমাদের সেই দিনগুলো? বর্ষার বিকেলে একসাথে চা খাওয়া, কিংবা রিকশায় ঘুরে বেড়ানো?"

 

"কোনাো বৃষ্টি বা রোদের স্মৃতি দিয়ে আজ বর্তমানকে মাপা যায় না, তামিম," আরশি তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কঠোর অথচ শান্ত গলায় বলল। "ভালোবাসা একসময় ছিল, প্রবলভাবে ছিল। কিন্তু বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঘরটা যখন একদিনে ধসে পড়েছিল, তখন ভালোবাসা থেকেও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল আত্মসম্মান। আমি আমার আত্মসম্মানকে বিসর্জন দিয়ে অতীতে ফিরে যেতে পারব না।"

 

ক্যাফেটেরিয়ার মৃদু আলোয় দুজনে মুখোমুখি বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু এসি-র ঠান্ডা বাতাস আর দূরের জানলার কাঁচের ওপারে রোদের তীব্রতা যেন ঘরের নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলল।

 

তামিম প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করল, সে এত দিন শুধু নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার কথা ভেবেছিল, কিন্তু সে একটা বিশাল সত্য বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। নিজের ভুল বুঝতে পারা এবং ক্ষমা চাওয়ার একটা আলাদা অধিকার মানুষের থাকে বটে, কিন্তু অন্য একজন মানুষকে জোর করে নিজের অতীতে ফিরিয়ে আনার বা তার বর্তমান জীবনকে ওলটপালট করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। আরশির এই কঠিন সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে তামিমের গলার সমস্ত জোরালো যুক্তি যেন থমকে গেল।

 

আরশি এবার নিজের হ্যান্ডব্যাগটা কাঁধে তুলে চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে তামিমের চোখের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে সে খুব নরম অথচ স্পষ্ট স্বরে বলল, "তুমি ক্ষমা চেয়েছো, আমি ক্ষমা করে দিলাম, তামিম। মন থেকে ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু আমাদের গল্পের ওই পাতাটা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। আর নতুন করে কোনো অধ্যায় লেখা সম্ভব নয়। নিজের ভালো থেকো।"

 

তামিম আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে শুধু স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল আরশির আত্মবিশ্বাসী প্রস্থান দেখার জন্য। বাইরে তখন রোদ আরও চড়া হয়েছে, কিন্তু তামিমের বুকের ভেতরটা জমাট বাঁধা বরফের মতো হিম হয়ে আসছে।

গুলশানের অভিজাত একটি অ্যাপার্টমেন্ট। বাইরে দুপুরের তীব্র গরম আর রোদের ঝলকানি ভেদ করে ফ্ল্যাটের ভেতরটা অদ্ভুত এক শীতল ছায়ায় ঢাকা। ব্যালকনির ভারী পর্দাগুলো টানা থাকায় ঘরের আলো বেশ মায়াবী ও আছন্ন। এই ফ্ল্যাটটি আরশির নিজের পরিশ্রমে গড়ে তোলা শান্তির ঠিকানা। কিন্তু আজ এই শান্ত পরিবেশেও একটা অব্যক্ত অস্থিরতা কাজ করছে।

 

দরজায় বেল বাজার শব্দ হতেই আরশি কিছুটা ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই দেখল, তামিম দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনের শার্টের কলারটা একটু খোলা, কপালে ক্লান্তির সামান্য ঘাম। অফিসে হঠাৎ দেখা হওয়ার পর তামিম কোনো না কোনোভাবে তার এই ঠিকানা জোগাড় করে নিয়েছে।

 

আরশি দরজা পুরোপুরি খুলে না দিয়ে ফ্রেমের আড়ালে দাঁড়িয়ে শীতল গলায় বলল, "তুমি এখানে কীভাবে এলে, তামিম? আর আমার প্রাইভেসি এভাবে নষ্ট করার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?"

 

তামিম দরজার ফ্রেমে হাত রেখে মিনতির সুরে বলল, "আমায় পাঁচটা মিনিট সময় দাও, আরশি। ক্যাফেটেরিয়াতে আমরা ঠিকমতো কথা শেষ করতে পারিনি। শুধু শেষবারের মতো আমার কথাগুলো শোনো, তারপর তুমি যা বলবে আমি তাই করব।"

 

আরশি এক মুহূর্ত তামিমের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা ছেড়ে একপাশে সরে গেল। "ঠিক আছে, পাঁচ মিনিট। এর বেশি এক সেকেন্ডও নয়।"

 

তামিম ঘরে ঢুকে বসার ঘরের সোফায় না বসে সরাসরি ব্যালকনির কাঁচের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ভেতরের তীব্র মানসিক চাপ আর না পাওয়ার যন্ত্রণা যেন ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। আরশি রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা জল এনে টেবিলের ওপর রেখে দূরে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "জল খাও, আর বলো কী বলার আছে।"

 

তামিম জল না ছুঁয়ে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত নেশা আর তীব্র আবেশ। সে ধীর পায়ে হেঁটে আরশির খুব কাছে এসে দাঁড়াল। চার বছরের দূরত্ব, না পাওয়ার বেদনা আর পুরোনো স্মৃতিগুলো যেন এই মুহূর্তে সব সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। তামিম নিচু ও ভারী গলায় বলল, "তুমি বলছ আমি বদলে গেছি, আরশি? আমার এই বুকটার ভেতর কি জমে আছে জানো? প্রতি রাতে তোমার জন্য তিল তিল করে মরে যাওয়ার হিসাব রাখোনি তুমি।"

 

আরশি একটু পেছাতে চাইল, কিন্তু তামিম তার হাত শক্ত করে নিজের মুঠোয় বন্দি করে ফেলল। সেই স্পর্শে আরশির অবশ হয়ে যাওয়া রক্তস্রোত যেন হঠাৎ সচল হয়ে উঠল। চার বছর আগের সেই পরিচিত সুবাস, সেই উষ্ণ হাতের স্পর্শ—সবকিছু এক নিমিষে চেনা ভুবনে ফিরিয়ে নিয়ে গেল তাকে।

 

তামিম আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে নিজের মুখটা আরশির ঠিক কানের কাছে নামিয়ে আনল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আরশির ঘাড়ের সংবেদনশীল ত্বকে লাগতেই আরশির শরীর কেঁপে উঠল। তামিম ফিসফিস করে বলল, "তুমি যতই বলো না কেন যে আমি আগের মতো নেই, তুমিও তো পাথর হয়ে যাওনি, আরশি। আজ এই ছায়ার আলোয় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো যে আমার ছোঁয়া তোমার শরীরে একটুও কাঁপুনি ধরায় না!"

 

আরশি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার একটা দুর্বল চেষ্টা করল, কিন্তু তামিমের বাহুডোর তাকে এমন এক তীব্র আবেশে জড়িয়ে ধরেছে যে তার সমস্ত প্রতিরোধ গুলিয়ে গেল। তামিম তার চিবুকটা আলতো করে ধরে মুখের ওপর ঝুঁকিয়ে পড়ল। বহুদিনের না পাওয়া আর তীব্র আকুলতার এক চরম প্রকাশ ঘটে গেল তাদের প্রথম ছোঁয়াটুকুর মাঝে।

 

বাইরের রোদে পোড়া দুনিয়ার কথা ভুলে গিয়ে সেই ঠান্ডা ঘেরা ঘরে দুজনে যেন এক অচেনা ঘোরে হারিয়ে গেল। তামিমের হাত ধীরে ধীরে আরশির কোমরের খাঁজে গিয়ে মিশল, আর আরশির আঙুলগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবেই খামচে ধরল তামিমের শার্টের কলার। সেই গভীর আলিঙ্গন আর উত্তপ্ত স্পর্শের মাঝে চার বছরের সমস্ত দূরত্ব, রাগ আর অভিমান একনিমেষে বরফের মতো গলে জল হয়ে গেল। তামিম তার ঠোঁট নামিয়ে আনল আরশির চোখের পাতায়, গালের নিখুঁত রেখায়, আর তারপর সরাসরি তার উষ্ণ ঠোঁটের গভীরতায়।

 

সে এক ঘোর লাগা মুহূর্ত—যেখানে যুক্তি কাজ করে না, শুধু শরীর আর মন এক হয়ে যায়। আরশি চোখ বন্ধ করে নিজেকে সঁপে দিল সেই পরিচিত অথচ নিষিদ্ধ উত্তাপের কাছে। তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের বরফ জমা কষ্টগুলো এই তীব্র সান্নিধ্যে যেন বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে চাইল।

 

কিন্তু চুম্বনের সেই ঘোর কাটতেই আরশি হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে তামিমকে দূরে সরিয়ে দিল। তার বুক তখন দ্রুত ওঠানামা করছে, চোখের কোণে জমে উঠেছে জল আর চরম বিব্রতকর এক ক্ষোভ। সে নিজের হাত দিয়ে ঠোঁটটা মুছে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "এটা কী করলে তুমি, তামিম? এটা ভুল! ভীষণ ভুল!"

 

তামিম কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে আসতে গিয়েও থেমে গেল। তার চোখে তখন এক তীব্র জয়ের নেশা আর ভালোবাসার আকুতি একসঙ্গে জ্বলজ্বল করছে। সে শ্বাস আটকে বলল, "ভুল তো সেদিন হয়েছিল, যেদিন তোমাকে বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু আজ যা হলো, সেটা সত্যি, আরশি! তোমার শরীরও মিথ্যা বলে না, তোমার মনও জানে আমি ছাড়া তুমি অন্য কারও হতে পারো না।"

 

আরশি নিজের মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে নিয়ে চোখ শক্ত করে বন্ধ করল। তারপর অত্যন্ত কঠিন ও রূঢ় গলায় বলল, "শরীরের ভাষা আর মনের হিসাব এক নয়, তামিম। এই উত্তাপ... এই সান্নিধ্য সাময়িক। এর আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় না আমাদের অতীতের সেই নরককুণ্ড। তুমি আমাকে শারীরিক আবেগে বাঁধতে পারবে, কিন্তু আমার জীবনকে আমার শর্তে বাঁচতে দেওয়া থেকে আটকাতে পারবে না। এখন দয়া করে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।"

 

তামিম অপলক তাকিয়ে রইল আরশির দিকে। সে বুঝতে পারল, সাময়িক এই শারীরিক উত্তাপ আরশির ভেতরের কঠিন দেয়ালটাকে এক মুহূর্তের জন্য কাঁপিয়ে দিলেও ভাঙতে পারেনি। তামিম আর কোনো বাক্য ব্যয় করল না। নিঃশব্দে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

 

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দেই আরশি ফ্লোরের ওপর বসে পড়ে নিজের মুখ লুকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল।

গুলশানের সেই ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমের মেঝেতে অনেকক্ষণ একা বসে রইল আরশি। চোখের জল শুকিয়ে যাওয়ার পর তার ভেতরের অস্থিরতা ধীরে ধীরে থিতিয়ে এল। রাগ, অভিমান কিংবা সাময়িক উত্তাপের ঘোর কাটিয়ে আজ তার মন পরিষ্কার। সে বুঝতে পারল, তামিমকে সে এত দিন যতটা না ঘৃণা করত, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় পেত অতীতের সেই স্মৃতিগুলোকে। কিন্তু আজ সেই ভয়টা আর নেই। নিজের জীবনের ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার এক অদ্ভুত প্রশান্তি এখন তার সারা শরীরে।

 

ঠিক দুদিন পর, ঢাকার উত্তরা সেক্টর ১৩-এর একটি পরিচিত কফি শপ। জানলার ধারের টেবিলে একা বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল আরশি। ঠিক তখনই তামিম এসে টেবিলে বসল। গত দুদিনে তামিম অনেকখানি যেন ভেঙে পড়েছে। তার চোখের নিচে ক্লান্তির গাঢ় কালি, পরনে ছিমছাম কিন্তু মলিন শার্ট।

 

তামিম টেবিলের ওপর হাত রেখে অত্যন্ত শান্ত ও স্থির গলায় বলল, "গত পরশু তোমার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসার পর পুরো একটা রাত আমি ঘুমাইনি, আরশি। তোমার শেষ কথাটা আমার মাথার ভেতর বারবার বেজেছে। তুমি ঠিক বলেছিলে... শরীরের উত্তাপ দিয়ে ভালোবাসা প্রমাণ করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস বা সম্মান ফিরিয়ে আনা যায় না।"

 

আরশি কফি কাপটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল। তার চোখে এখন আর কোনো ক্ষোভ বা কাঠিন্য নেই, আছে এক পরম মায়া ও পরিপক্বতা। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, "তুমি বুঝতে পেরেছ, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া, তামিম। চার বছর আগে তুমি আমাকে যেভাবে ভুল বুঝেছিলে, তাতে আমার সমস্ত পৃথিবী ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম আমি আর কখনো একা দাঁড়াতে পারব না। কিন্তু আমি পেরেছি। নিজের ক্ষতগুলোকে নিজের হাতে সেলাই করে আজ আমি যে জায়গায় পৌঁছেছি, তা আমার নিজের অর্জন।"

 

তামিম ম্লান হেসে নিচু গলায় বলল, "আমি কি তোমাকে একটুও ভালো রাখতে পারতাম না, আরশি?"

 

"ভালো তুমি হয়তো রাখতে চেয়েছো, কিন্তু সেটা তোমার শর্তে, তোমার অধিকারে। ভালোবাসা মানে তো অধিকার ফলানো নয়, তামিম। ভালোবাসা মানে অন্য মানুষটার স্বাধীনতাকে সম্মান করা, সে যেখানেই থাকুক ভালো আছে কি না তা মেনে নেওয়া," আরশি একটু থেমে তামিমের চোখে চোখ রাখল। "তুমি চেয়েছিলে তোমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি, মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু ক্ষমা করার মানে এই নয় যে আমি আমার অতীতকে বর্তমানের ওপর চাপিয়ে দেব। আমার বর্তমানটা আজ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং সম্পূর্ণ আমার নিজের।"

 

তামিমের গলার ভেতর থেকে কথাগুলো যেন আর বের হতে চাইল না। সে বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "তাহলে কি আমাদের এই গল্পটার কোনো শেষ পরিণতি নেই?"

 

"কিছু গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার জন্যই জন্ম নেয়, তামিম। সব গল্পে মিলন থাকতে হয় না। কিছু দূরত্ব মানুষকে আলাদা করে দেয় যাতে তারা নিজেদের মতো করে পূর্ণতা পেতে পারে," আরশির কণ্ঠে এক অদ্ভুত শক্তির সুর বাজল। "আজ তুমিও তোমার ভুল বুঝতে পেরেছ, আমিও আমার জীবনের পথ খুঁজে পেয়েছি। এর চেয়ে সুন্দর পরিণতি আর কী হতে পারে বলো?"

 

কফি শপের ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন মৃদু ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক বাজছে। তামিম গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ চার বছরের পাথরটা যেন আজ অবশেষে সরে গেল। সে বুঝতে পারল, আরশিকে জোর করে নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনার যে জেদ সে এতদিন ধরে পুষে রেখেছিল, তা আসলে এক ধরনের বোকামি ছিল। প্রকৃত ভালোবাসা মানে ছেড়ে দেওয়াও বটে।

 

তামিম সোজা হয়ে বসল এবং তার ঠোঁটের কোণে এক ফালি হালকা হাসি ফুটল। সে হাত বাড়িয়ে বলল, "তাহলে কি আজ থেকে আমরা পুরোপুরি মুক্ত, আরশি?"

 

আরশি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল এবং নিজের হাতটা বাড়িয়ে তামিমের হাতের ওপর আলতো করে রাখল। এক সেকেন্ডের সেই স্পর্শে কোনো উষ্ণতা বা আবেশ ছিল না, ছিল নিখাদ বন্ধুত্বের এক গভীর মুক্তি। আরশি স্পষ্ট গলায় বলল, "হ্যাঁ, তামিম। আজ আমরা সম্পূর্ণ মুক্ত। দুজনেই দুজনের অতীত থেকে মুক্ত।"

 

কফি শপ থেকে বেরিয়ে যখন দুজনে দুই ভিন্ন রাস্তার দিকে হেঁটে গেল, তখন মাথার ওপরকার আকাশটা ছিল একদম মেঘহীন, পরিষ্কার। কোনো বৃষ্টি বা ঝড়ের পূর্বাভাস নেই—শুধু এক নতুন সকালের সোনালী আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। আরশি আর পেছনে ফিরে তাকাল না। সে জানে, তার জীবনটা এখন আর কারও ছায়ায় ঢাকা নয়, বরং তার নিজের আলোয় উজ্জ্বল।

....
👁 12