লুকানো সত্যের ফাঁস

বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধে নামছে। ঢাকার বারিধারার একটি অভিজাত ক্যাফের এক কোণের টেবিলে বসে আছে রাশেদ। তার হাতের কফি কাপটা অনেকক্ষণ ধরে ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। তার পুরো মনোযোগটা প্রবেশদ্বারের দিকে। একটু পরেই এলিনার আসার কথা। এই সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল এক অদ্ভুত মানসিক দ্বিধা থেকে, আর আজ সেই দ্বিধাই যেন পাহাড় হয়ে চেপে বসেছে তার বুকের ওপর।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

রাশেদ আর এলিনার পরিচয় হয়েছিল প্রায় দেড় বছর আগে, একটি করপোরেট ইভেন্টে। প্রথম দেখাতেই এলিনার ব্যক্তিত্ব, তার আত্মবিশ্বাসী চাহনি এবং চোখের গভীরতা রাশেদকে মোহিত করেছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। রাশেদ তখন জীবনের এমন এক পর্যায়ে ছিল, যেখানে তার কেরিয়ার এবং আর্থিক স্থিতি নিয়ে বেশ কিছু ধোঁয়াশা ছিল। সে ভয় পেয়েছিল—যদি এলিনা তার সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড এবং অতীতের কিছু পারিবারিক জটিলতার কথা এক নিশ্বাসে জেনে যায়, তবে হয়তো সে এক মুহূর্তও পাশে থাকবে না।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

সেই ভয় থেকেই রাশেদ জীবনের প্রথম বড় ভুলটি করেছিল। সে নিজের সম্পর্কে সামান্য একটু বাড়িয়ে বলেছিল, নিজের পারিবারিক অবস্থাকে একটু উজ্জ্বল করে উপস্থাপন করেছিল এবং ভেবেছিল, সম্পর্কটা একটু পোক্ত হলে আস্তে আস্তে সত্যিটা সহজ করে বলে দেবে। কিন্তু সময় কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে না। মিথ্যা যখন একবার শিকড় গাড়তে শুরু করে, তখন একটা মিথ্যাকে ঢাকার জন্য আরও দশটা মিথ্যার জন্ম দিতে হয়। রাশেদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল।

 

"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করালাম, রাশেদ?"

 

এলিনার মিষ্টি অথচ গম্ভীর গলার আওয়াজে রাশেদের চিন্তা ভাঙল। সে দ্রুত নিজের মনের ভেতর জমে থাকা ঝড়টাকে লুকিয়ে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল মুখে।

 

"না, এই তো মাত্র এলাম। তোমার পছন্দের কোল্ড কফিটা অর্ডার করে রেখেছি," রাশেদ শান্ত গলায় বলল।

 

এলিনা টেবিলে তার হ্যান্ডব্যাগটা রেখে বসল। তার পরনে ছিল একটি হালকা নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ, আর কানে ছোট্ট রূপর দুল। ক্যাফের নরম হলুদ আলোয় তাকে অসাধারণ সুন্দর লাগছে। রাশেদের বুকটা অদ্ভুত এক ভালো লাগায় কেঁপে উঠল। এই মানুষটাকে সে সত্যি বড্ড ভালোবাসে। কিন্তু এই ভালোবাসার মাঝেই কোথায় যেন একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়ে আছে, যা সে নিজেই তিল তিল করে গড়ে তুলেছে।

 

"আজ অফিসে বেশ ঝামেলা গেল," কফি কাপে চুমুক দিয়ে এলিনা বলল, তার কপালে সামান্য চিন্তার রেখা। "যাহোক, তোমার ওই প্রজেক্টটার কী খবর? যেটার জন্য তুমি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এত ব্যস্ত ছিলে? শেষ পর্যন্ত কি চুক্তিটা ফাইনাল হলো?"

 

রাশেদের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। এই প্রজেক্টটা নিয়ে সে এলিনার কাছে অনেক বড় একটা গল্প ফেঁদেছিল। বলেছিল সে ওই কোম্পানির অন্যতম প্রধান অংশীদার বা বড় কোনো সিদ্ধান্তের দায়িত্বে আছে, অথচ সত্যিটা হলো সে সেখানে একজন সাধারণ কনসালট্যান্ট মাত্র। এই ছোটখাটো বাড়িয়ে বলাগুলোই আজ তার গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে।

 

"হ্যাঁ... সবকিছু ঠিকঠাক এগোচ্ছে," রাশেদ নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক সুরে উত্তর দিল। "আরেকটু সময় লাগবে ফাইনাল হতে। তবে চিন্তা কোরো না, সব নিয়ন্ত্রণে আছে।"

 

এলিনা এক দৃষ্টিতে রাশেদের চোখের দিকে তাকাল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন রাশেদের মনের গভীরে উঁকি দিতে চাইছে। এলিনার স্বভাবটাই এমন—সে মানুষের কথা শোনার চেয়ে চোখের ভাষা পড়তে বেশি ভালোবাসে।

 

"রাশেদ, একটা কথা প্রায়ই আমার মনে হয়," এলিনা মৃদু অথচ ভারী গলায় বলল। "আমরা তো একে অপরকে বেশ কিছুদিন ধরে জানছি। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমার জীবনের একটা বড় অংশ এখনো আমার চোখের আড়ালে থেকে গেছে। তুমি কি আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করো না?"

 

এই প্রশ্নটা শোনার পর রাশেদের গলা শুকিয়ে এল। সে কফি কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে এলিনার হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। এলিনার হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা।

 

"এমন কথা কেন বলছ, এলিনা?" রাশেদের কণ্ঠে গভীর আবেগ আর আকুতি মিশে ছিল। সে এলিনার হাতের ওপর আলতো করে নিজের অপর হাতটি রাখল, তারপর আস্তে আস্তে আঙুলগুলো এলিনার আঙুলের ফাঁকে গলিয়ে দিল। এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল তাদের স্পর্শে। "তোমাকে ছাড়া আমার জীবনে কি আর কেউ আছে নাকি? তুমি আমার কাছে সবকিছুর চেয়েও বেশি কিছু। শুধু... কিছু সময় নিজের কিছু লড়াই একা লড়তে হয়, তাই সব কথা সব সময় বলা হয়ে ওঠে না।"

 

এলিনা হাতটা ছাড়িয়ে নিল না, বরং রাশেদের হাতের সেই উষ্ণ স্পর্শ যেন তার মনের জমে থাকা বরফ কিছুটা হলেও গলাতে শুরু করল। সে রাশেদের চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, "আমি শুধু চাই আমাদের মাঝখানে কোনো দেয়াল না থাকুক, রাশেদ। বিশ্বাস এমন একটা জিনিস, যা একবার ভেঙে গেলে হাজার চেষ্টা করলেও আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। আমি তোমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করি, বিনিময়ে শুধু একটু সততা চাই।"

 

সেই মুহূর্তে ক্যাফের ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব মৃদু কোনো যন্ত্রসংগীত বাজছিল। রাশেদ এলিনার আরও একটু কাছে ঝুঁকে বসল। ক্যাফের এই কোণটায় আলো কিছুটা কম, আর তাদের দুজনের দূরত্ব এতই কমে এসেছিল যে এলিনার পারফিউমের হালকা সুবাস রাশেদের নাকে এসে লাগল। রাশেদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এলিনার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে তার মুখটা একটু ওপরে তুলল।

 

"আমাকে বিশ্বাস করো, এলিনা," রাশেদের ফিসফিসানি স্বর এলিনার কানের কাছে এসে পৌঁছাল। "আমার সব ভুলত্রুটি আর অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও আমি কেবল তোমাকেই আমার জীবনের সবচেয়ে সত্যি অংশ বলে মনে করি। তোমাকে হারানোর ভয়ে যদি আমি কখনো কোনো ভুল করে থাকি, তার জন্য আমি লজ্জিত। কিন্তু আমার এই ভালোবাসার মধ্যে কোনো মিথ্যে নেই।"

 

এলিনা রাশেদের চোখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার হৃদস্পন্দন তখন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছিল। রাশেদের এই স্পর্শ, তার চোখের কোণের সেই গভীর আকুলতা—সবমিলিয়ে এলিনা যেন আর কোনো প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না। সে নিজের অজান্তেই রাশেদের আরও কিছুটা কাছে সরে এল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি।

 

রাশেদ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আলতো করে তার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল এলিনার কপালে। এক গভীর ভালোবাসার উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল সেই ছোঁয়ায়। এলিনা তার চোখ দুটো বন্ধ করে রাশেদের শার্টের কলার খামচে ধরে নিজের সমস্ত অভিমান আর সংশয় যেন সাময়িকীভাবে ভুলে গেল। ক্যাফের রঙিন আলো-আঁধারির মাঝে তাদের এই নিবিড় রোমান্টিক মুহূর্তটা যেন থমে গেল কিছুক্ষণের জন্য।

 

কিন্তু এই সুন্দর মুহূর্তের আড়ালেই রাশেদের মনের গভীরে একটা কাটা বিঁধে রইল। সে জানত, এই সাময়িক প্রশান্তি বেশি দিন টিকবে না। সে যে মিথ্যেগুলোর ওপর তাদের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছে, একদিন না একদিন সেই ভিত্তি ধসে পড়বেই। আর সেদিন এলিনার এই বিশ্বাসের হাতগুলো কি আর তার হাতে থাকবে? নাকি সব শেষ হয়ে যাবে চিরতরে?

 

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রাশেদের ফোনে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে মেসেজ এল। মেসেজটা খুলেই তার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সেখানে লেখা ছিল, "তোমার আসল পরিচয় আর অতীতের সব ঘটনা কি এলিনাকে নিজে জানাবে, নাকি আমি প্রমাণসহ তার সামনে তুলে ধরব?"

 

রাশেদের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে বুঝতে পারল, তার লুকিয়ে রাখা অন্ধকার অধ্যায়গুলো আর বেশিক্ষণ ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে রাখা যাবে না। ধ্বংসের ঝড়টা ধীরগতিতে হলেও তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।

সকালের সেই মেসেজটা পাওয়ার পর থেকেই রাশেদের মাথাটা কেমন যেন ঘুরছিল। অফিসে বসে কোনো কাজেই সে মন দিতে পারছিল না। বারবার ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাচ্ছিল আর ভাবছিল, কে হতে পারে এই মানুষটা? কে তার অতীতের এমন সব খুঁটিনাটি তথ্য জানে, যা সে শুধু নিজের ডায়েরিতে বা মনের গহিনেই লুকিয়ে রেখেছিল? কিন্তু যতই সে উত্তর খুঁজতে গেল, ততই তার চারপাশে জালের মতো জটিলতা বাড়তে লাগল।

 

সন্ধের দিকে গুলশানের একটি নিরিবিলি রেস্তোরাঁয় এলিনার সাথে দেখা করার কথা ছিল। রাশেদ যখন রেস্তোরাঁয় পৌঁছাল, তখন এলিনা ইতিমধ্যে টেবিল বুক করে বসে আছে। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে রাশেদের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এল। এলিনা আজ কোনো সাধারণ পোশাক পরে আসেনি, তার চোখে মুখে এক অদ্ভুত কাঠিন্য আর থমথমে ভাব স্পষ্ট। রাশেদ বুঝতে পারল, অলক্ষ্যে যা ঘটার ভয়ে সে তটস্থ ছিল, সেটাই হয়তো ঘটে গেছে।

 

"বসো, রাশেদ," এলিনা অত্যন্ত শান্ত অথচ বরফশীতল গলায় বলল। সে মেনু কার্ডের দিকে না তাকিয়ে সরাসরি রাশেদের চোখের দিকে তাকাল।

 

রাশেদ কোনো কথা না বলে কাঁপতে কাঁপতে তার সামনের চেয়ারটাতে বসল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে ফিসফিস করে বলল, "কী হয়েছে, এলিনা? এভাবে তাকাচ্ছ কেন?"

 

এলিনা তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটি ছোট খাম বের করে টেবিলের ওপর রাশেদের ঠিক সামনে স্লাইড করে দিল। খামের মুখটা একটু খোলা, ভেতর থেকে কিছু কাগজের প্রিন্টআউট উঁকি দিচ্ছে।

 

"এটা কী?" রাশেদের হাত দুটো সামান্য কাঁপছিল। সে খামটার দিকে হাত বাড়াল।

 

"খুলে দেখো নিজেই," এলিনা এবার চোখ সরিয়ে রেস্তোরাঁর বিশাল কাঁচের জানালার বাইরে রাস্তার ব্যস্ত আলোর দিকে তাকাল। "গতকাল রাতে আমার হোয়াটসঅ্যাপে এই ডকুমেন্টসগুলো এসেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো ফালতু প্র্যাঙ্ক বা হ্যাকারদের চক্রান্ত। কিন্তু একটা একটা করে ফাইল খোলার পর দেখলাম, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিশ্বাসটার ওপর কেউ তীব্র চাবুকের আঘাত হেনেছে।"

 

রাশেদ আর এক মুহূর্তও দেরি না করে খাম থেকে কাগজগুলো বের করল। সেগুলো তার আগের করপোরেট ব্যাকগ্রাউন্ড, তার পারিবারিক সম্পত্তির আসল হিসাব এবং তার সেই পুরোনো ঋণের কাগজপত্রের স্ক্যান কপি। সবচেয়ে বড় কথা, সে যে প্রজেক্টে নিজেকে বড় কর্তা বলে চালিয়েছিল, সেখানকার একজন সাধারণ জুনিয়র কর্মী হিসেবে তার জয়েনিং লেটারটাও সেখানে যুক্ত করা ছিল। প্রতিটি লাইনে যেন রাশেদের সমস্ত মিথ্যেগুলো বড় বড় হরফে জ্বলজ্বল করছে।

 

রাশেদের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। সে শুধু হাঁ হয়ে এলিনার দিকে তাকিয়ে রইল। তার সমস্ত রক্ত যেন শীতে জমে গেছে।

 

"কী হলো, রাশেদ? কথা বলছ না কেন?" এলিনা এবার তার মাথা ঘুরিয়ে রাশেদের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে জমে থাকা জল মোটেও দুর্বলতা নয়, বরং এক তীব্র অভিমান আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। "তুমি কি ভেবেছিলে আমি বোকা? নাকি ভেবেছিলে তোমার এই সুন্দর মিথ্যাগুলোর আড়ালে যে মানুষটা লুকিয়ে আছে, তাকে আমি কোনো দিন চিনতে পারব না?"

 

"এলিনা... প্লিজ, আমাকে একটু কথা বলতে দাও," রাশেদ কোনমতে নিজের গলাটাকে পরিষ্কার করে আকুল কণ্ঠে বলে উঠল। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এলিনার হাত দুটো ধরতে গেল, কিন্তু এলিনা দ্রুত নিজের হাত দুটো সরিয়ে নিয়ে কফির কাপের পাশে শক্ত করে মুঠো পাকাল।

 

"আজ আর কোনো সাফাই শুনতে চাই না, রাশেদ!" এলিনার গলাটা এবার কেঁপে উঠল। "আমি তোমাকে ভালোবেসেছি তোমার সমস্ত অসম্পূর্ণতা জেনেই। তুমি সাধারণ এক চাকরিজীবী হও, তোমার সাধারণ পরিবার হোক—তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি ছিল না। আমার সমস্যা তোমার পদমর্যাদা নিয়ে নয়। আমার সমস্যা হলো—তুমি আমাকে ভালোবাসার যোগ্যই মনে করোনি! তুমি ভেবেছিলে সত্যিটা জানলে আমি চলে যাব। তোমার এই মানসিকতাটাই প্রমাণ করে যে, তুমি আমাকে ভালোবাসার চেয়ে নিজের ভয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলে।"

 

"আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, এলিনা!" রাশেদের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল টেবিলের ওপর। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ক্যাফের এই কোনার টেবিলে তাদের চারপাশের পৃথিবী যেন থমে গেছে। রাশেদ নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এলিনার ঠিক পাশে বসল এবং দুহাতে মুখ ঢেকে ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। "বিশ্বাস করো, আমার উদ্দেশ্যে কোনো খারাপ মতলব ছিল না। আমি শুধু চেয়েছিলাম নিজেকে একটু শক্ত করে তোমার সামনে দাঁড় করাতে, যাতে তুমি গর্ব করে বলতে পারো—হ্যাঁ, রাশেদ আমার পাশে মানানসই।"

 

এলিনা রাশেদের এই কান্নার সামনে মুহূর্তের জন্য বিচলিত হলেও নিজেকে শক্ত রাখল। সে রাশেদের কাঁধের ওপর থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "ভালোবাসায় কোনো ‘মানানসই’-এর হিসাব থাকে না, রাশেদ। ভালোবাসা মানে হলো নিখাদ সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে একে অপরের হাত ধরে থাকা। আজ যখন প্রমাণ হলো যে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তিটাই একটা মিথ্যে গল্পের ওপর তৈরি, তখন আমি আর নিজেকে চিনতে পারছি না। আমি কি তবে এত দিন এক ভুলের পেছনে ছুটেছি?"

 

"না! এক বিন্দুও না!" রাশেদ এবার এলিনার হাত দুটো জোর করে নিজের মুঠোয় তুলে নিল। এলিনা ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও রাশেদ ছাড়ল না। ক্যাফের নরম আলোয় তাদের দুজনের মুখ কাছাকাছি চলে এল। রাশেদের চোখের সেই তীব্র আকুলতা আর অনুশোচনা এলিনার বুকটাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। "আমার বলা কথাগুলো মিথ্যে হতে পারে, কিন্তু তোমার প্রতি আমার এই অনুভূতিগুলো পৃথিবীর যেকোনো সত্যের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী, এলিনা।"

 

এলিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাশেদের চোখের দিকে তাকাল। রাশেদ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে আলতো করে তার হাত দিয়ে এলিনার চিবুকটা উঁচুতে তুলে ধরল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব তখন মাত্র এক ইঞ্চি। এলিনার হৃদস্পন্দন তখন এত দ্রুত বইছিল যে সে নিজের শ্বাস প্রশ্বাসও স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছিল। সমস্ত রাগ, সমস্ত অভিমান আর সংশয়কে ঝেড়ে ফেলে রাশেদ ধীরে ধীরে তার ঠোঁট এলিনার ঠোঁটের সাথে মিশিয়ে দিল।

 

সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল এক গভীর আকুতি, অনুশোচনা আর হার না মানা ভালোবাসার উষ্ণ আবেশ। এলিনা প্রথমে কিছুটা শক্ত হয়ে থাকলেও রাশেদের সেই নিখাদ আত্মসমর্পণের কাছে সে আর প্রতিরোধ ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের অজান্তেই রাশেদের শার্টের কলার শক্ত করে খামচে ধরে সেই গভীর চুম্বনে নিজেকে পুরোপুরি এলিয়ে দিল। ক্যাফের সেই কোণটা যেন পলকের জন্য বাইরের সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

 

কিন্তু চুম্বনের ঘোর কাটতেই এলিনা রাশেদের বুক থেকে আলতো করে নিজেকে সরিয়ে নিল। তার ঠোঁটে এক ক্লান্ত হাসি ভেসে উঠল।

 

"তুমি চুমু দিয়ে সব ভুলিয়ে দিতে চাও, তাই না?" এলিনা ফিসফিস করে বলল। "কিন্তু এত সহজে বিশ্বাস ফিরে আসে না, রাশেদ। বিশ্বাস এমন এক কাঁচের পাত্র, একবার ফেটে গেলে তা যতই জোড়া লাগাও না কেন, সেই দাগটা থেকেই যায়।"

 

"তাহলে আমি সেই দাগ নিয়েই প্রমাণ করব, এলিনা," রাশেদ দৃঢ় গলায় বলল। "তুমি আমাকে সময় দাও। আমি কথা দিয়ে বলছি, আমার আগামী দিনগুলোর প্রতিটা সেকেন্ড শুধু তোমায় সত্য প্রমাণ করার পেছনেই ব্যয় করব।"

 

এলিনা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ক্যাফের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সে একবার শুধু পেছন ফিরে রাশেদের দিকে তাকাল, যে দৃষ্টিতে ভালোবাসা ছিল ঠিকই, কিন্তু সাথে ছিল এক দীর্ঘ পরীক্ষার কঠিন অপেক্ষা।

এলিনার সেই চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে দীর্ঘ কয়েকটি মাস। এই সময়টা রাশেদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও পরিবর্তনের একটা অধ্যায় ছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, মানুষের মন থেকে একবার সন্দেহ বা আস্থার অভাবের বীজ রোপিত হলে তা শুধু মিষ্টি কথায় বা সাময়িক আবেগে দূর করা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, নিরলস পরিশ্রম এবং দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষিত সততা।

 

রাশেদ তার কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনে পুরোপুরি স্বচ্ছতা বজায় রাখতে শুরু করে। সে তার অফিসের সাধারণ চাকরি এবং নিজের সীমিত আয় নিয়ে কোনো রাখঢাক রাখেনি। এমনকি যে মানুষটি তার অতীতের সমস্ত গোপন তথ্য ফাঁস করে হুমকি দিয়েছিল, রাশেদ আইনি পথে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই ব্ল্যাকমেলারের জাল ছিন্ন করে। সে এলিনাকে আর কোনো অন্ধ আশ্বাসের বাণী শোনায়নি, বরং নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে সে কতটা বদলে গেছে।

 

এই কয়েকমাসে এলিনার সাথে রাশেদের সরাসরি দেখা খুব একটা হয়নি। তবে তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। এলিনা তাকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নেওয়ার এবং নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার একটা পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু রাশেদ জানত, এই নীরবতার মানে এই নয় যে এলিনা তাকে ভুলে গেছে; বরং এলিনা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল রাশেদ সত্যিই বদলাচ্ছে কি না।

 

শরতের এক পড়ন্ত বিকেলে ঢাকার ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসার জায়গাটার এক কোণে এলিনা একা দাঁড়িয়ে ছিল। লেকের শান্ত জলের ওপর তখন পড়ন্ত বিকেলের সোনাঝরা আলো এসে পড়েছে। মৃদু বাতাসে চারপাশের গাছগুলোর পাতাগুলো নড়ছিল। এলিনা নিজের মনেই লেকের জলের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, মানুষের জীবনে বিশ্বাসের মূল্য কতখানি। ঠিক তখনই তার কাঁধে কারো চেনা হাতের আলতো স্পর্শ পড়ল।

 

এলিনা চমকে ঘুরে দাঁড়াল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাশেদ। তবে আজকের রাশেদের চোখে সেই আগের ভীরুতা বা লুকোচুরি করার চঞ্চলতা নেই। তার মুখে রয়েছে এক শান্ত, পরিপক্ব এবং আত্মবিশ্বাসী হাসি। তার পরনে একটি সাধারণ সাদা শার্ট আর ফরমাল ট্রাউজার।

 

"তুমি এখানে?" এলিনার কণ্ঠে সামান্য বিস্ময় আর গভীর রেশ মিশে ছিল।

 

"হ্যাঁ, এলিনা," রাশেদ শান্ত গলায় বলল। সে নিজের পকেট থেকে একটা ছোট ফাইল বের করে এলিনার হাতে বাড়িয়ে দিল। "এটা আমার গত ছয় মাসের কাজের পারফরম্যান্স রিপোর্ট, আমার আয়ের নতুন হিসেব এবং আমার জীবনের সমস্ত বর্তমান সত্যের একটা খোলা দলিল। এখানে লুকানোর মতো কোনো মিথ্যা নেই, কোনো বাড়তি বাড়িয়ে বলা কথা নেই। আমি চেয়েছি তুমি নিজে নিজের চোখে দেখে নাও।"

 

এলিনা ফাইলটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ রাশেদের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে আস্তে করে ফাইলের পাতাগুলো উল্টে দেখল। সেখানে রাশেদের সততার প্রতিটি প্রমাণ পরিষ্কার অক্ষরে লেখা রয়েছে। এলিনার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের বরফ যেন এক নিমিষে গলে জল হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, রাশেদ শুধু মুখের কথায় নয়, তার প্রতিটি কর্মের মধ্য দিয়ে নিজের ভুল সংশোধন করে নিয়েছে।

 

"এত সব প্রমাণ করার কি সত্যিই কোনো দরকার ছিল, রাশেদ?" এলিনার গলাটা এবার সামান্য কেঁপে উঠল। তার চোখের কোণে জমল জল।

 

"প্রয়োজন ছিল, কারণ আমি তোমাকে হারাতে চাইনি," রাশেদ এক পা এগিয়ে এলিনার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। লেকের পাড়ের এই নির্জন কোণে তাদের দুজনের দূরত্ব তখন ফুরিয়ে এসেছে। রাশেদ আলতো করে এলিনার দুটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। "আমি বুঝতে পেরেছি, ভালোবাসার শুরুটা যতই ছোট মিথ্যে দিয়ে হোক না কেন, তার শেষ পরিণতি তখনই সুন্দর হয় যখন তার ভিত্তিটা নিখাদ সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আমি তোমাকে আর কখনো সন্দেহের কোনো সুযোগ দেব না।"

 

এলিনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার সমস্ত অভিমান, সমস্ত দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি যেন এক পলকে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। সে রাশেদের চোখের গভীরের সেই সত্যটুকু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল। কোনো দ্বিধা না রেখে এলিনা নিজের হাত দুটো রাশেদের হাতের আঙুলের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

 

রাশেদ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আলতো করে তার হাত দিয়ে এলিনার চিবুকটা একটু উঁচুতে তুলল। বিকেলের সেই নরম আলোয় তাদের ঠোঁটের দূরত্বটুকু ঘুচে গেল। রাশেদ যখন ধীরে ধীরে তার ঠোঁট এলিনার ঠোঁটের সাথে মিশিয়ে দিল, সেই গভীর রোমান্টিক চুম্বনে শুধু ভালোবাসা ছিল না, ছিল দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার পরম শান্তি। এলিনা নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে রাশেদের শার্টের কলার খামচে ধরে সেই নিবিড় চুম্বনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল।

 

লেকের জলের মৃদু ঢেউয়ের শব্দ আর চারপাশের ছায়াঘেরা পরিবেশে তাদের এই মিলন যেন প্রমাণ করে দিল—ভালোবাসা কেবল সুন্দর কিছু মুহূর্তের নাম নয়, ভালোবাসা হলো সব ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে একসাথে পথ চলার নাম।

 

চুম্বন শেষে এলিনা মৃদু হেসে রাশেদের বুকে মাথা এলিয়ে দিল। রাশেদ তার হাত দিয়ে এলিনার পিঠ জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, "এবার কি বিশ্বাস হলো, এলিনা?"

 

এলিনা মুচকি হেসে আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে সন্ধের তারাগুলো সবেমাত্র উঁকি দিতে শুরু করেছে। সে নরম গলায় উত্তর দিল, "বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে রাশেদ, কিন্তু একবার ফিরে এলে তা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস হয়ে ওঠে।"

....
👁 196