দূরত্ব ঘুচে আবার কাছে

বিকেলের সোনাঝরা রোদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিউটের চায়ের কাপে যখন প্রথম চোখাচোখি হয়েছিল, তখন নিহালের পৃথিবীটা ছিল শুধুই রাইসাকে ঘিরে। রাইসা হাসলে নিহালের চোখেমুখে এক অদ্ভুত স্বস্তি নেমে আসত। সম্পর্কের সেই সোনালী দিনগুলোতে নিহাল ছিল অবিশ্বাস্যরকম যত্নশীল। রাইসার একটুখানি ক্লান্তিতে নিহাল ব্যস্ত হয়ে পড়ত। রিকশায় ওঠার সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়া, রাইসার পছন্দের ফুচকা খুঁজে আনা কিংবা ওর ছোট্ট একটা হাসির জন্য নিজের পুরো বিকেলটা উৎসর্গ করা—সবকিছুতেই যেন এক নিবিড় মায়া জড়িয়ে ছিল। নিহালের কাছে রাইসা মানেই ছিল সকালের প্রথম কফি আর রোদের প্রথম চিলতে আলো।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

কিন্তু সময় নদীর মতো বয়ে চলে। নদীর যেমন ভাঙন আছে, তেমনি সম্পর্কের স্রোতেও কখন যে অদৃশ্য ফাটল ধরে, তা টের পাওয়া যায় না। মাসগুলো গড়িয়ে বছর পার হতেই নিহালের মনোযোগের ধরনটা বদলে যেতে শুরু করল। যত্নশীলতা আস্তে আস্তে এক ধরনের নীরব আধিপত্যে রূপ নিতে লাগল। রাইসা কী পরবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কোন অ্যাসাইনমেন্টে কতটা সময় দেবে—সবকিছুর ওপর নিহালের অদৃশ্য নজরদারি শুরু হলো।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

রাইসা প্রথম প্রথম ভেবেছিল, এটা নিহালের অতিরিক্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু দিন যত এগোতে লাগল, নিহালের এই আচরণ এক ধরনের মানসিক চাপে পরিণত হলো। রাইসার নিজস্ব মতামত, ওর পছন্দ-অপছন্দগুলোকে নিহাল অবমূল্যায়ন করতে শুরু করল। যেকোনো ছোট-বড় সিদ্ধান্ত সে নিজের ইচ্ছামতো চাপিয়ে দিত রাইসার ওপর। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাইসা যখন বলত, "নিহাল, তুমি আমাকে একটু নিজের মতো থাকতে দাও," নিহাল তখন শীতল গলায় বলত, "তোমার ভালোর জন্যই তো বলছি, আমার চেয়ে ভালো আর কে বোঝে বলো?"

 

ধানমন্ডির লেকের ধারের সেই পরিচিত বেঞ্চে বসে সেদিন বাতাসটা ভারী হয়ে ছিল। রাইসা বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছিল তাদের মধ্যকার দূরত্ব। আজ আর সে সহ্য করতে পারল না। নিহাল তার চেনা ভঙ্গিতে আগামী সপ্তাহের একটি ট্যুরের পরিকল্পনা চাপিয়ে দিচ্ছিল রাইসার ওপর, অথচ রাইসার ওই দিন একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের জমা দেওয়ার ডেডলাইন ছিল।

 

রাইসা সোজা হয়ে বসল। তার চোখের তারায় জমে থাকা ক্লান্তি আর একরাশ ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে ঠান্ডা অথচ দৃঢ় গলায় বলল, "নিহাল, থামো। গত এক বছর ধরে তুমি শুধু তোমার সিদ্ধান্তগুলো আমার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছ। আমার নিজের একটা জীবন আছে, মতামত আছে। তুমি আমাকে ভালোবাসো না নিহাল, তুমি শুধু আমাকে তোমার ইচ্ছেমতো চালাতে চাও। এই দমবন্ধ করা সম্পর্কের মধ্যে আমি আর এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না। আমাদের এখানেই শেষ করা উচিত।"

 

নিহাল যেন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না। সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরটা এক অদ্ভুত অহংকার আর বিস্ময়ে কেঁপে উঠল। সে কঠিন গলায় জবাব দিল, "তুমি কি বুঝছ তুমি কী বলছ, রাইসা? এত সহজে সব শেষ?"

 

"হ্যাঁ, বুঝেই বলছি। আজ থেকে আমরা মুক্ত।" রাইসা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে রিকশার দিকে পা বাড়াল।

 

নিহাল স্থাণুর মতো বসে রইল। তার কানের কাছে শুধু বাজতে লাগল রাইসার বিদায়ী কথাগুলো। আশপাশের চারুকলার চায়ের দোকানের কোলাহল, রিকশার ঘণ্টি—সবকিছু মিলিয়ে একটা অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করল তাকে। সে একা হয়ে গেল, অথচ এই একাকীত্ব সে কখনো কল্পনাও করেনি।

রাইসার চলে যাওয়ার পর নিহালের অ্যাপার্টমেন্টটা যেন হঠাৎ করেই অনেক বেশি ফাঁকা হয়ে গেল। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা রাইসার কফি কাপের দাগটা, ড্রয়ারে ভুলে ফেলে যাওয়া তার একটা রূপালী কানের দুল—প্রতিটি জিনিস নিহালকে ছুঁচের মতো বিঁধতে লাগল। প্রথম কিছুদিন নিহালের ভেতর কাজ করেছিল তীব্র অভিমান। সে ভেবেছিল, রাইসা হয়তো কয়েক দিন পর নিজেই ফিরে আসবে। কিন্তু সপ্তাহ পার হয়ে মাস পেরিয়ে গেলেও রাইসার তরফ থেকে কোনো সাড়া মিলল না।

 

ধীরে ধীরে নিহালের সেই অহংকার ভেঙে পড়তে শুরু করল। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করল, কোথায় ভুল হয়েছিল? রাইসা তো কখনো তার কাছে আকাশ ছোঁয়া কিছু চায়নি। সে চেয়েছিল একটু সম্মান, একটু নিজস্বতা, আর বিন্দুমাত্র স্বাধীনতা। কিন্তু নিহাল ভালোবেসে ফেলার অর্থ বুঝেছিল নিয়ন্ত্রণ করা। সে নিজের অজান্তেই রাইসার মুক্ত ডানাগুলোকে নিজের মুঠোয় বন্দী করতে চেয়েছিল। এই উপলব্ধির কষ্টটা ছিল সমুদ্রের নোনতা জলের মতো গভীর এবং জ্বালাপোড়ায় ভরপুর।

 

এদিকে, রাইসার জীবনটাও যে খুব সহজ ছিল, তা নয়। নিহালের স্মৃতি তাকেও তাড়িয়ে বেড়াত। উত্তরাঞ্চলের এক শান্ত বিকেলে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে যখন কফিতে চুমুক দিত, রাইসার মনে পড়ে যেত নিহালের সেই উষ্ণ হাতের ছোঁয়া, পুরোনো দিনের অঝোর রোমান্স। নিহালের সেই যত্নশীল রূপটা আজও তার হৃদয়ের কোনো এক কোণে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। কিন্তু সে জানত, ভালোবাসার নামে পরাধীনতা মেনে নেওয়া মানে নিজের আত্মাকে তিল তিল করে মেরে ফেলা। তাই সে নিজেকে কঠোর করে রেখেছিল।

 

মাস ছয়েক পরের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুর। গুলশানের একটি অভিজাত আর্ট গ্যালারিতে নিহালের আঁকা ছবির একটি একক প্রদর্শনী চলছে। নিহাল এখন আগের চেয়ে অনেক পরিণত, তার চোখে মুখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। গ্যালারির মৃদু আলোয় দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে ছবি দেখছেন। ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে রাইসার উপস্থিতি টের পেল নিহাল। সে দেখল, রাইসা একটি ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছে। ছবিটি ছিল একটি খাঁচার ছবি, যার দরজাটি খোলা এবং একটা মুক্ত পাখি আকাশে উড়ে যাচ্ছে—নিহাল এটা এঁকেছিল রাইসার কথা ভেবেই, নিজের ভুল স্বীকার করার এক নীরব দলিল হিসেবে।

 

রাইসা নিহালের উপস্থিতি টের পেয়ে পিছন ফিরল। দুজনের চোখাচোখি হলো। দীর্ঘ ছয় মাসের দূরত্ব যেন চোখের পলকে গলে জল হয়ে গেল। ভিড়ের কোলাহল মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। নিহাল ধীরে ধীরে এগিয়ে এল রাইসার কাছে। তার গলায় কোনো অহংকার ছিল না, ছিল চরম অনুশোচনা আর গভীর ভালোবাসার আকুতি।

 

খুব নরম গলায় নিহাল ডাকল, "রাইসা..."

 

রাইসা পলকহীন তাকিয়ে রইল নিহালের দিকে। নিহালের মুখের সেই আত্মবিশ্বাসী অথচ কঠোর ভাবটা আজ আর নেই; তার জায়গায় আজ কেবলই একজন ভুল শুধরে নেওয়া প্রেমিক। রাইসার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

 

নিহাল হাত বাড়াল না, শুধু কম্পিত কণ্ঠে বলল, "আমি বুঝতে পেরেছি রাইসা... ভালোবেসে কাউকে বেঁধে রাখতে হয় না, তাকে তার মতো আকাশ দিতে হয়। আমি তোমাকে শুধু ভালোবাসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার অহংকার সব ওলটপালট করে দিয়েছিল। আজও কি একটুও জায়গা হবে আমার জন্য তোমার ওই অবুঝ হৃদয়ে?"

 

রাইসার চোখের কোণে জল জমে উঠল। সে নিহালের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, যে হাসিতে জমাট বাঁধা সমস্ত অভিমান মুহূর্তেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।

গুলশানের সেই আর্ট গ্যালারির মৃদু আলোয় দুজনের চোখের ভাষা সব দূরত্ব মুছে দিয়েছিল। রাইসা দেখল, নিহাল সত্যি বদলে গেছে। আগের সেই একগুঁয়েমি বা নিজের সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা আজ পুরোপুরি উধাও। তার জায়গাজুড়ে রয়েছে এক গভীর শ্রদ্ধা, অনুশোচনা আর নিঃশর্ত ভালোবাসা। রাইসা আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে এসে নিহালের মুখোমুখি দাঁড়াল।

 

খুব মৃদু অথচ স্পষ্ট স্বরে রাইসা বলল, "মানুষ ভুল করে নিহাল, কিন্তু ভুল স্বীকার করে নিজেকে শুধরে নেওয়াটা সবার দ্বারা হয় না। তুমি বুঝতে পেরেছ, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।"

 

রাইসার এই কথা শোনার পর নিহালের বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা যেন এক নিমিষে গলে জল হয়ে গেল। সে আর দূরত্ব বজায় রাখতে পারল না। গ্যালারির এক কোণে, মৃদু আলোর নিচে সে রাইসার দুই হাত নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় তুলে নিল। দীর্ঘ ছয় মাসের জমে থাকা অভিমান, কষ্ট আর তীব্র আকুলতা যেন এক নিমিষে ভালোবাসার গভীর স্রোতে মিশে গেল। নিহাল যখন রাইসাকে তার বুকের খুব কাছে টেনে নিল, তখন রাইসার চুলে লেগে থাকা চেনা সুবাস নিহালের সমস্ত অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

 

সেই আলিঙ্গনটি ছিল কেবল দুটি মানুষের মিলন নয়; সেটি ছিল একটি ভুলের সংশোধন, অহংকারের পতন এবং নতুন করে ভালোবাসার এক গভীর শপথ। নিহাল রাইসার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল, "আর কখনো তোমাকে হারাতে দেবো না, রাইসা। এবার থেকে আমাদের ভালোবাসা মানে কোনো খাঁচা নয়, কেবল মুক্ত আকাশ আর নিখাদ বিশ্বাস।"

 

রাইসা নিহালের বুকের সঙ্গে লেপ্টে থেকে চোখ বন্ধ করল। তার চোখের কোণ গড়িয়ে গড়িয়ে পড়া আনন্দাশ্রু নিহালের শার্টের কলার ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সে নিহালের পিঠে হাত রেখে ফিসফিস করে জবাব দিল, "আমিও আর দূরে যেতে চাই না, নিহাল। চলো, নতুন করে সব শুরু করি।"

 

বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যার রূপালি আলো চারপাশের আকাশকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। গ্যালারির বাইরে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল তখনও চলমান, কিন্তু ভেতরের সেই নিস্তব্ধ প্রাঙ্গণে নিহাল আর রাইসার পৃথিবীটা হয়ে উঠেছিল একান্তই তাদের নিজেদের। অতীতের সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব আর অহংকার পেছনে ফেলে তারা খুঁজে পেয়েছিল এক গভীর, পরিপক্ক ও শান্ত ভালোবাসার ঠিকানা। যেখানে নিয়ন্ত্রণ নয়, ছিল শুধু একে অপরের প্রতি সম্মান আর ভালোবাসার অন্তহীন উষ্ণতা।

....
👁 69