নিজের ভয় পরাজিত করে

জানালার কাচে আটকে থাকা দুপুরের ক্লান্ত রোদ্দুরটা এসে পড়েছিল মাহিরের চোখের ওপর। অফিসের ভারী ফাইলের স্তূপ থেকে মাথা তুলতেই বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে এল। টেবিলের কোণায় রাখা কাচের গ্লাসে জলটা থমকে আছে, ঠিক যেমন মাহিরের ভেতরটা থমকে আছে গত আড়াই বছর ধরে। আগের সম্পর্কের সেই তিক্ত স্মৃতি, প্রিয়াঙ্কার হঠাৎ করে সব শেষ করে অন্য কারও হাত ধরে চলে যাওয়ার দৃশ্যটা আজও ওর মনের পর্দায় সিনেমার মতো ঘুরে বেড়ায়। সেই গভীর ক্ষত আজও শুকায়নি। তাই তো সামিহা জীবনে আসার পরও মাহির নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিতে পারেনি। সামিহার চোখের সরলতা, তার নিখাদ ভালোবাসার উষ্ণতা—সবকিছু জেনেও মাহির ভেতর থেকে এক অদৃশ্য ভয়ে কুঁকড়ে থাকে। যদি সামিধাও একদিন বিশ্বাস ভেঙে চলে যায়? যদি এই সাজানো সংসারটা এক নিমিষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে? এই আশঙ্কা ওকে কুড়ে কুড়ে খায়।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মাহির দেখল, ডাইনিং টেবিলে সামিহা নিজের হাতে রান্না করে খাবার সাজিয়ে বসে আছে। পরনে হালকা নীল রঙের একটা সালোয়ার, চুলগুলো আলগা করে খোপা করা। মাহিরকে দেখেই সামিহার মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

"এত দেরি হলো যে? আজ অফিসে কি খুব চাপ ছিল?" সামিহা এগিয়ে এসে মাহিরের কোটটা হাতে নিতে গেল।

 

ঠিক তখনই মাহিরের পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। সামিহা কৌতূহলবশত স্ক্রিনের দিকে একটু তাকাতেই মাহির কেমন যেন খেপে উঠল। হাত থেকে এক ঝটকায় ফোনটা কেড়ে নিয়ে কঠোর গলায় বলে উঠল, "আমার ফোনে নজর রাখার কোনো দরকার নেই তোমার! কে ফোন করেছে, কেন করেছে, তার হিসাব তোমাকে দিতে হবে নাকি?"

 

সামিহা চমকে গেল। তার মুখের হাসিটা পলকে মিলিয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত মলিনতা নেমে এল। সে তো কেবল একটু জানতে চেয়েছিল, এতে অপরাধের কী ছিল? কিন্তু মাহিরের এই আকস্মিক খাপছাড়া রাগ আর সন্দেহের দৃষ্টি সামিহার বুকে গভীর আঘাত হানল।

 

সামিহা শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, "মাহির, আমি তোমার ফোন চেক করছিলাম না। আর তাছাড়া, বারবার আমাকে কেন প্রিয়াঙ্কার ভুলের শাস্তি ভোগ করতে হবে? আমি তো প্রিয়াঙ্কা নই, মাহির। আমার ওপর এই অন্ধ বিশ্বাসের অভাব কি তোমার সারাজীবন চলবে?"

 

সামিহার এই সত্য কথাগুলো মাহিরের অহংকারে এবং গভীর ভয়ে সরাসরি আঘাত করল। সে আরও বেশি রেগে গিয়ে কড়া স্বরে বলে উঠল, "বিশ্বাস? বিশ্বাস মুখের কথায় হয় না, সামিহা! মানুষের ভেতরটা বড় অদ্ভুত, বাইরে থেকে যা দেখা যায় ভেতরে তার পুরো উল্টোটা থাকে। কে কখন কার পিঠে ছুরি মারে বলা যায় না!"

 

কথাগুলো বলেই মাহির আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। ড্রইংরুমের দরজা সজোরে বন্ধ করে সে নিজের শোবার ঘরে চলে গেল।

 

শোবার ঘরের নিস্তব্ধ অন্ধকারে একা একা বসে মাহিরের বুকটা হু হু করে কেঁদে উঠল। সে তো চায় না সামিহাকে কষ্ট দিতে, কিন্তু তার অবচেতন মন তাকে এমন এক খাঁচায় বন্দি করে রেখেছে যেখান থেকে সে বের হতে পারছে না। অতীতের সেই গভীর বিশ্বাসঘাতকতা তার বর্তমানের সমস্ত সুখকে গ্রাস করে নিচ্ছে।

 

অন্যদিকে, বসার ঘরের সোফায় বসে সামিহার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা মুক্তোর মতো জল। সে আজ বুঝতে পারল, মাহিরের এই মানসিক ক্ষত কোনো সাধারণ আঘাত নয়, এ এক গভীর মানসিক ব্যাধি। যতক্ষণ পর্যন্ত মাহির নিজের ভেতরের এই ভূতগুলোকে তাড়াতে না পারছে, ততক্ষণ তাদের এই পবিত্র সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সামিহা মনে মনে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। সে আর প্রতিদিন এই বিনা অপরাধের শাস্তি সহ্য করবে না। মাহিরকে তার নিজের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।

 

পরের দিন সকালের আলো ফোটার আগেই সামিহা তার ছোট একটা ট্রাংক গোছাতে শুরু করল। ঘরের প্রতিটি কোণায় জড়িয়ে আছে মাহিরের সাথে কাটানো কিছু সুন্দর মুহূর্ত, আবার তার পাশেই রয়েছে এই সম্পর্কের অবহেলার তীব্র যন্ত্রণা। টেবিলে একটা ছোট্ট চিরকুট লিখে সে রেখে দিল—"মাহির, ভালোবাসায় কোনো শর্ত বা ভয়ের পাহারা থাকে না। তোমার অতীতের ক্ষত সারানোর দায়িত্ব তোমার নিজেরই। আমি তোমাকে মুক্ত করে দিলাম, যাতে তুমি তোমার নিজের ভেতরকার ভগুলোকে একাই জয় করতে পারো।"

 

ঘুম থেকে উঠে মাহির যখন ড্রইংরুমে এসে দেখল চারপাশটা কেমন যেন ফাঁকা, আর টেবিলে পড়ে আছে ওই ছোট্ট কাগজটা, তখন তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে দ্রুত সামিহার ঘরে গিয়ে দেখল আলমারিটা অর্ধেক খালি। সামিহা সত্যি সত্যিই চলে গেছে।

 

ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে মাহিরের গলা থেকে বেরিয়ে এল এক আর্তনাদ। সে বুঝতে পারল, নিজের অতিরিক্ত সন্দেহ আর অতীতের ভয়ের বশে সে নিজেই তার জীবনের সবচেয়ে precious মানুষটাকে চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলল। এখন এই বিশাল শূন্য ঘরে নিজের পুরোনো ক্ষতগুলোকে একা হাতে সামলানোর এক কঠিন লড়াই ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা রইল না।

সামিহার চলে যাওয়ার পর থেকে মাহিরের অ্যাপার্টমেন্টটা যেন এক বিশাল শূন্য খাঁচায় পরিণত হয়েছে। ড্রইংরুমের সোফা, ডাইনিং টেবিল—প্রতিটি কোণায় আজও সামিহার উপস্থিতি যেন নিঃশব্দে কথা বলে। প্রথম দু-তিন দিন মাহিরের মাথার ভেতরটা একদম ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। সে অফিসের কাজে মন দিতে পারেনি, এমনকি নিজের ঘরের আলোটুকুও জ্বালাতে ইচ্ছে করত না। সারাদিন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাইরে রোদহীন বিবর্ণ আকাশের দিকে তাকিয়ে কেটে যেত। সামিহার রেখে যাওয়া সেই ছোট্ট চিরকুটটা—"তোমার অতীতের ক্ষত সারানোর দায়িত্ব তোমার নিজেরই"—প্রতিটি মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠত। প্রিয়াঙ্কার সেই বহু পুরোনো বিশ্বাসঘাতকতার বিষাক্ত স্মৃতিগুলো আজও তাকে তাড়া করে বেড়াত বটে, কিন্তু এবার সেই অন্ধ আক্রোশের জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছিল এক অদ্ভুত অপরাধবোধ। সে বুঝতে পেরেছিল, সামিহা কোনো ভুল করেনি; সে কেবল নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে দূরে সরে গেছে। নিজের ভেতরের এই অন্ধ অবিশ্বাস আর ভয়ের ভূতগুলোকে যদি সে নিজে হাতে না তাড়ায়, তবে সে চিরকালের মতো একা হয়ে যাবে।

 

এদিকে সামিহা গুলশানে তার এক পুরোনো বান্ধবীর ছোট ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে। প্রথম কদিন কাজের ব্যস্ততায় নিজেকে জড়িয়ে রাখার চেষ্টা করলেও মনের ভেতর একটা চাপা কষ্ট তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। সে মাহিরকে ভালোবাসত, আর ঠিক সেই কারণেই সে এই কঠোর সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল। সে জানত, মাহিরের ছায়ায় থেকে তার প্রতিদিন তিলে তিলে মরার চেয়ে দূরে চলে আসাটা ভালো। মাহির যদি নিজের ক্ষত নিজে না সারায়, তবে এই সম্পর্ক কোনোদিন সুস্থ হয়ে উঠবে না। প্রতিদিন রাতে বিছানায় শুয়ে সামিহার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। সে মনে মনে প্রার্থনা করত, মাহির যেন তার ভেতরের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দেখা পায়।

 

ঠিক এমন এক গুমোট বৃষ্টির দিনে—যদিও বাইরে এক ফোঁটাও জল ঝরেনি, কেবল আকাশটা থমথমে মেঘে ঢাকা ছিল—মাহির এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিল। সে সামিহার কর্মক্ষেত্র তথা একটি স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থায় সরাসরি হাজির হলো। গত দশ দিন ধরে সে নিজেকে তিল তিল করে বিশ্লেষণ করেছে। থেরাপিস্টের সাথে কথা বলেছে, ডায়েরির পাতায় নিজের ভীতিগুলোকে লিখে লিখে টুকরো করেছে। সে বুঝেছে, প্রিয়াঙ্কার করা ভুলের দায় সামিহা নিতে পারে না।

 

অফিসের অভ্যর্থনা কক্ষে সামিহাকে দেখতে পেয়ে মাহিরের বুকটা কেঁপে উঠল। সামিহা একটি হালকা মেরুন রঙের কামিজ পরে ডেস্কে কিছু ফাইলে মন দিয়েছিল। মাহির যখন তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, সামিহা চমকে মুখ তুলল। তার চোখে সেই আগের মতো রাগ বা ক্ষোভ ছিল না, বরং এক গভীর ক্লান্তি আর অবাক হওয়ার ভাব।

 

"সামিহা..." মাহিরের গলাটা কাঁপছিল। সে একটু সামনে ঝুঁকে রুদ্ধশ্বাসে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি জানি আমার ভুলের কোনো ক্ষমা হয় না, কিন্তু আমি নিজেকে বদলে ফেলার এই কঠিন লড়াইটা শুরু করেছি। আমি থেরাপিস্টের কাছে যাওয়া শুরু করেছি, নিজের ভেতরের সমস্ত ভয়কে চিনতে শিখেছি। প্রিয়াঙ্কা আমাকে ধোঁকা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুমিও তাই করবে। তোমাকে হারানোর পর আমি বুঝেছি, আমার জীবনের আসল আলো কে। দয়া করে আমাকে একটা সুযোগ দাও, নিজের ভেতরকার এই ক্ষতগুলো তোমার ভালোবাসায় সারিয়ে তোলার নয়, বরং নিজের হাতে মুছে ফেলার।"

 

সামিহা পলকহীন চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেখতে পেল মাহিরের চোখের নিচে জমে থাকা কালচে দাগগুলো, তার চেহারার ওপর বয়ে যাওয়া মানসিক ঝড়ের স্পষ্ট ছাপ। সে বুঝতে পারল, মাহির অভিনয় করছে না; সত্যি সত্যিই সে ভেতরে ভেতরে এক কঠিন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিজেকে বদলাতে শুরু করেছে।

 

সামিহা দীর্ঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম অথচ স্পষ্ট গলায় বলল, "মাহির, মানুষের ক্ষত কেউ অন্য কেউ সারিয়ে দিতে পারে না, তা নিজেরই সারাতে হয়। তুমি যদি সত্যিই তোমার অতীতকে পেছনে ফেলে আসতে পেরে থাকো, তবেই পথ চলা সম্ভব।"

 

কথাটা শেষ করেই সামিহা তার টেবিল থেকে নোটবুকটা তুলে অন্য একটি কেবিনের দিকে পা বাড়াল। মাহির সেখানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে জানল, লড়াই সবে শুরু হয়েছে। সামিহাকে পুরোপুরি নিজের করে পেতে হলে তাকে কেবল মুখে নয়, নিজের কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে সে অতীতকে সম্পূর্ণ পেছনে ফেলে এসেছে।

 

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে মাহির সোজা তার নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এল না। সে সামিহার অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক সামনের রাস্তার ফুটপাতে গাড়ির ভেতর চুপচাপ বসে রইল। তার মন বলছিল, আজ রাতে একটা বড় পরিবর্তন আসবে। ঠিক রাত আটটার দিকে সামিহা যখন অফিস শেষ করে নিজের বাসার নিচে এসে পৌঁছাল, তখন হঠাৎ করেই মাহির গাড়ি থেকে নেমে তার পথ রোধ করল। কোনো জোরজুলুম নয়, কোনো সন্দেহ বা অহেতুক প্রশ্ন নয়—মাহির একদম শান্তভাবে সামিহার সামনে দুহাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল।

 

"সামিহা, আমি আজ সারাদিন তোমার অফিসের বাইরে অপেক্ষা করেছি। তোমাকে কোনো ডিস্টার্ব করার জন্য নয়, শুধু তোমাকে এটা বোঝাতে যে আমি বদলে গেছি। আজ আমার অ্যাপার্টমেন্টে কোনো অন্ধকার নেই, আমি সব কটা কোণা আলো দিয়ে সাজিয়েছি। কারণ আমি বিশ্বাস করতে শিখেছি।"

 

সামিহার বুকটা কেঁপে উঠল। মাহিরের এই নতুন রূপ, তার চোখের ভাষা তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। চারপাশের ব্যস্ত শহরের কোলাহল যেন হঠাৎ করে মিলিয়ে গেল। সামিহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে এসে সরাসরি মাহিরের চোখের দিকে তাকাল। মাহির আর এক মুহূর্তও দেরি করল না—সে আলতো করে সামিহার কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের বুকের খুব কাছাকাছি টেনে নিল।

 

সেই মুহূর্তে চারপাশের সমস্ত দূরত্ব নিমেষে উবে গেল। মাহিরের হাত দুটো সামিহার পিঠের ওপরে এসে আলতো করে থিতু হলো, আর সামিহা নিজের দুই হাত দিয়ে মাহিরের চওড়া কাঁধ খপ করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিল। তাদের নিঃশ্বাসগুলো একাকার হয়ে গেল। অনেকদিনের জমে থাকা সমস্ত অভিমান, দূরত্ব আর ভয় যেন এই একটিমাত্র গভীর আলিঙ্গনের উষ্ণতায় গলে জল হয়ে গেল। মাহির ঝুঁকে পড়ে সামিহার কপালে একটা দীর্ঘ, গভীর ও ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিল। সামিহা চোখ বন্ধ করে সেই উষ্ণতা নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে অনুভব করল। তারা বুঝতে পারল, দীর্ঘ কষ্টের পর তারা অবশেষে একে অপরকে সত্যি সত্যিই খুঁজে পেয়েছে।

গুলশানের সেই স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় সামিহাকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে মাহির যেন এক নতুন জন্মের স্বাদ পেল। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, ভীতি আর আত্মগ্লানির যে ভারী পাথরের নিচে তার মন চাপা পড়ে ছিল, তা যেন এক নিমিষে গুঁড়িয়ে গেল। সামিহার সুবাসিত চুলের মৃদু ঘ্রাণ আর তার বুকের ওপরে প্রতিধ্বনিত হওয়া হৃদস্পন্দন মাহিরের ভেতরকার সমস্ত অন্ধকার কোণ আলোকিত করে দিল। সামিহাও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; সে মাহিরের শার্টের কলার শক্ত করে খপ করে খামচে ধরে তার আরও কাছাকাছিঁ সেঁটে বসল। তাদের এই নিবিড় আলিঙ্গনের মাঝে কোনো দূরত্ব বা দ্বিধা অবশিষ্ট রইল না।

 

মাহির মৃদু কাঁপাকাঁপা স্বরে সামিহার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দিও, সামিহা। তোমার এই পবিত্র ভালোবাসা না পেলে আমি হয়তো সারাজীবন সন্দেহের অন্ধকূপেই হারিয়ে থাকতাম।"

 

সামিহা মুখ তুলে মাহিরের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে জমে থাকা জলের বিন্দুতে রাস্তার হলুদ ল্যাম্পপোস্টের আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল। সে মাহিরের গালের ওপর আলতো করে নিজের ডান হাতটা রাখল এবং খুব নরম অথচ দৃঢ় গলায় বলল, "অতীতকে আর টেনে এনো না, মাহির। মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু নিজের ভুল বুঝতে পেরে যে মানুষটা আবার শুদ্ধ হয়ে ফিরে আসে, সেই তো আসল জয়ী। আমি তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম, তোমার ওই অন্ধভয়গুলোকে নয়।"

 

কথাটা শেষ হওয়ামাত্র মাহির আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। সে সামিহার চিবুকটা আলতো করে উঁচুতে তুলে ধরে তার উষ্ণ ঠোঁট দুটো নামিয়ে দিল সামিহার নরম ঠোঁটের ওপর। সেই চুম্বনটায় কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর নিখাদ সমর্পণ আর তীব্র আবেগের এক গভীর প্রকাশ। সামিহা চোখ বন্ধ করে মাহিরের এই ভালোবাসাকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে গ্রহণ করল। তাদের নিঃশ্বাস একাকার হয়ে গেল, চারপাশের ব্যস্ত শহরের কোলাহল, যানবাহনের হর্ন—সবকিছু যেন নিমেষে হারিয়ে গেল এক অদ্ভুত ঘোরে। তাদের এই গভীর রোমান্টিক মুহূর্তে কেবল দুটি হৃদয়ের স্পন্দন ছাড়া আর পৃথিবীর আর কিছুরই অস্তিত্ব রইল না।

 

পরের দিন সকালেই সামিহা তার ছোট ট্রাংকটা গুছিয়ে আবার ফিরে এল মাহিরের সেই অ্যাপার্টমেন্টে। তবে এবার আর কোনো সংকোচ বা লুকোচুরি ছিল না। মাহির নিজের হাতে রান্নাঘরের চা বানাচ্ছিল। সামিহা পিছন থেকে এসে আলতো করে মাহিরের কোমর জড়িয়ে ধরল। মাহির চমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সামিহাকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা স্নিগ্ধ চুম্বন এঁকে দিল। পুরো বাড়িটা যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল লাগছে; কোথাও কোনো অন্ধকার নেই, নেই কোনো পুরনো ভয়ের চাদর।

 

সন্ধ্যায় তারা দুজনে বসার ঘরের সোফায় পাশাপাশি বসল। মাহির সামিহার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে হাসিমুখে বলল, "জানো, আজ থেরাপিস্টের সাথে আমার সেশন শেষ সেশন ছিল। সে বলেছে, আমি আমার পুরোনো ক্ষতগুলোকে পুরোপুরি জয় করতে পেরেছি। আর এর সবটুকুর পেছনে শুধু তুমি আছ, সামিহা।"

 

সামিহা মাহিরের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আমি তো শুধু তোমাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি, মাহির। নিজের আসল লড়াই তো তুমি নিজেই লড়েছ।"

 

বাইরে তখন বিকেলের নরম সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে ব্যালকনির টবে রাখা গাছগুলোর ওপর। তাদের এই নতুন জীবনের সূচনাটা প্রমাণ করে দিল যে, বিশ্বাস আর ভালোবাসা যদি খাঁটি হয়, তবে অতীতের যেকোনো গভীর অন্ধকার ক্ষতকেই একসময় আলোয় ভরাট করে দেওয়া সম্ভব। মাহির সামিহার কপালে আবার একটা লম্বা চুমু খেল, আর তাদের এই মিষ্টি ভালোবাসার হাত ধরেই শুরু হলো এক চিরন্তন সুদিনের নতুন অধ্যায়।

....
👁 160