ঢাকার গুলশানের একটি অভিজাত ক্যাফে। জানধারের কাঁচের ওপাশে তখন ঝিরিঝিরি বাতাসে ঝরা পাতার ওড়াউড়ি। বাইরে মৃদু আলো-আঁধারি, কিন্তু ভেতরে কড়া কফির সুবাস আর হালকা জ্যাজ মিউজিক। এই শহরেই রায়ান আর সেহরিশের জীবন একসময় একই সুতোয় বাঁধা ছিল। আজ, দীর্ঘ তিন বছর পর, ঠিক একই শহরে অথচ সম্পূর্ণ দুটি আলাদা মেরুতে দাঁড়িয়ে তারা মুখোমুখি।
টেবিলের ওপর রাখা কফির পেয়ালা থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু দুজনের মাঝখানের দূরত্বটুকু যেন কয়েক আলোকবর্ষ। সেহরিশ পরে আছে একটি গাঢ় নীল রঙের সালোয়ার কামিজ, কপালে ছোট একটি কালো টিপ, আর চুলগুলো হালকা করে একপাশে টানা। চোখে তার সেই পুরনো তীব্র জেদ, যা আজও একটুও ম্লান হয়নি। আর রায়ান পরে আছে কালো শার্ট, যার ওপরের দুটি বোতাম খোলা, চোখে মুখে এক অদ্ভুত ক্লান্তির ছাপ কিন্তু দৃষ্টিতে সেই আগের মতোই অনমনীয় আত্মসম্মান।
রায়ান নিজের কফিতে চুমুক দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "সেহরিশ, তুমি আজও আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়ে গেলে। একটুও বদলালে না।"
সেহরিশ ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে ব্যাঙ্গাত্মক হাসি টেনে উত্তর দিল, "আর তুমিও সেই আগের মতোই রয়ে গেছ, রায়ান। নিজের ভুলটা স্বীকার করার সাহস কোনোদিনই তোমার হলো না। আজও না, তিন বছর আগেও না।"
রায়ানের চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। সে টেবিলে হাত রেখে একটু ঝুঁকে এল, "ভুল? আমি ভুল কী করেছিলাম? আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি আমার কথা একটু শোনো। কিন্তু তোমার ওই একগুঁয়েমি—'আমি কেন আগে কথা বলব?'—সব শেষ করে দিল।"
"সব শেষ আমি করিনি, রায়ান!" সেহরিশের গলাটাও এবার একটু চড়ল, যদিও সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। "সম্পর্কটা তো একতরফা ছিল না। তুমি যদি সেদিন একটু পিছু হটতে, একটু ক্ষমা চাইতে, তবে হয়তো আজ আমাদের এই অচেনা শহরের মাঝখানে বসে এভাবে কথা বলতে হতো না। কিন্তু না, তোমার ইগো সবসময় আমাদের ভালোবাসার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।"
তিন বছর আগের সেই দিনটার কথা দুজনেই একযোগে মনে করতে লাগল। সেদিন ধানমন্ডির লেকের ধারের সেই তুমুল ঝগড়া। কোনো বড় কারণ ছিল না—তুচ্ছ এক ভুল বোঝাবুঝি, রায়ানের অতিরিক্ত ব্যস্ততা আর সেহরিশের অবহেলার অনুভূতি। কেউ কাউকে এক চুল ছাড় দিতে রাজি ছিল না। রায়ান চেয়েছিল সেহরিশ এসে সব ঠিক করে বলুক, আর সেহরিশ মনে করেছিল রায়ানেরই উচিত তার হাত ধরে সব মানিয়ে নেওয়া। সেই না বলা কথাগুলো জমে জমে একসময় এমন এক পাহাড় তৈরি করেছিল, যার চূড়ায় দাঁড়িয়ে তারা দুজনেই বিচ্ছেদের চিরতরে সিলমোহর মেরে দিয়েছিল।
কিন্তু আজ, বহু দিন পর এই আকস্মিক দেখায় পরিস্থিতি অন্যরকম। আজ আর শুধু অভিযোগের পালা নয়; ভেতরে ভেতরে দুজনেই বুঝতে পেরেছে, তাদের সমস্যাটা ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না, সমস্যা ছিল একে অপরের সঙ্গে কথা না বলার ওই দীর্ঘস্থায়ী অভ্যাসে।
রায়ান গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠস্বর একটু নরম হলো, যা সেহরিশের বুকের ভেতর অচেনা এক কাঁপন ধরিয়ে দিল। সে খুব ধীরেসুস্থে বলল, "জানো সেহরিশ, এই তিন বছর প্রতিটা দিন নিজেকে বুঝিয়েছি যে আমি তোমায় ছাড়া ভালো আছি। কিন্তু আজও যখন ক্যাফের এই কোণটায় তোমার কফি কাপে চুমুক দেওয়ার ধরণটা দেখি, তখন মনে হয় সময় যেন ওই তিন বছর আগের দিনটাতেই আটকে আছে।"
সেহরিশ চোখ তুলে রায়ানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চাউনিতে লুকানো ছিল এক সমুদ্র না বলা আকুলতা, যা সে শত চেষ্টা করেও এড়িয়ে যেতে পারছে না। তার বুকটা হু হু করে উঠল। সে নিজের কফি চামচটা আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল, "তাহলে কেন আটকালে, রায়ান? সেদিন তো তুমিই দরজাটা বন্ধ করে বেরিয়ে গিয়েছিলে।"
"কারণ আমার অহংকার আমার অহংকারকে পাহারা দিচ্ছিল," রায়ান সরাসরি স্বীকার করল, যা তার মতো মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। "কিন্তু আজ আর সেই অহংকার টিকিয়ে রাখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। আজ আমি এখানে ঝগড়া করতে আসিনি, সেহরিশ। আজ আমি সত্যিটাকে গুরুত্ব দিতে এসেছি। আমাদের জেদগুলো আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, আর নয়।"
সেহরিশের চোখদুটো হঠাৎ আর্দ্র হয়ে উঠল। সে পলক ফেলতে ভুলে গেল। রায়ানের এই খোলা স্বীকারোক্তি তার ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। সে আস্তে করে নিজের হাতটা টেবিলের ওপর রাখল, ঠিক রায়ানের হাতের পাশেই।
রায়ান আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে তার শক্ত উষ্ণ হাত দিয়ে সেহরিশের ঠান্ডা আঙুলগুলো নিজের মুঠোয় পুরে নিল। তিন বছর পর ছোঁয়া লাগার সঙ্গে সঙ্গে দুজনের শরীরেই এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ খেলে গেল। ক্যাফের মৃদু আলোয় তাদের চোখাচোখি হলো, আর সেই দৃষ্টির গভীরতাতেই তৈরি হলো এক তীব্র, অবরুদ্ধ রোমান্টিক আবহ।
রায়ান ফিসফিস করে বলল, "আর কোনো অজুহাত নয়, সেহরিশ। এবার শুধু তুমি আর আমি।"
সেহরিশ কোনো কথা বলল না, শুধু তার ভেজা চোখের পলক ফেলল, যার অর্থ রায়ান নির্ভুল বুঝতে পারল। দূরত্ব ঘুচে আসার এই প্রথম পদক্ষেপে তারা দুজনই হারিয়ে গেল অতীতের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে বর্তমানের এই তীব্র আবেগের গভীরে।
গুলশানের সেই ক্যাফে থেকে বেরিয়ে রায়ান আর সেহরিশ গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় যানবাহনের লাল-নীল হেডলাইটের আলো কাঁচের ওপর প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। রায়ান নিজেই ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে দিল। সেহরিশ গাড়িতে উঠে বসার পর মৃদু বাতাসে তার কানের দুলটা সামান্য কেঁপে উঠল। রায়ান ড্রাইভিং সিটে বসে এক মুহূর্তের জন্য সেহরিশের দিকে তাকাল—তিন বছর আগের সেই পুরোনো অভ্যাসবশত সেহরিশ সিটবেল্টটা ঠিকমতো লাগাতে পারছিল না।
আগে রায়ান নিজেই আলতো করে তা ঠিক করে দিত। আজকেও অবচেতনভাবেই রায়ান ঝুঁকে এল। তার শরীরের উষ্ণতা আর তার পারফিউমের পরিচিত ঘ্রাণ সেহরিশের চারপাশে একটা অদৃশ্য চাদর বুনে দিল। রায়ানের আঙুলগুলো যখন সেহরিশের ঠিক বুকের কাছে সিটবেল্টের বাকলটা আটকে দিচ্ছিল, তখন তাদের নিশ্বাসের দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক ইঞ্চি। সেহরিশের বুকটা অসম্ভব দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল। সে রায়ানের শার্টের কলারের স্পর্শ অনুভব করল।
রায়ান মুখটা একটু ওপরে তুলতেই তাদের চোখাচোখি হয়ে গেল। এত কাছে, অথচ কত বছর পর! রায়ানের দৃষ্টিতে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত লোভনীয় ব্যাকুলতা। সে খুব ধীরস্থির কিন্তু দৃঢ় গলায় ফিসফিস করে বলল, "জানো সেহরিশ, এই তিন বছরে বহুবার তোমায় ছোঁয়ার ইচ্ছে হয়েছে, কিন্তু এই ডান হাতটা বারবার ওই মিথ্যে অহংকার দিয়ে আটকে রেখেছি। আজ আর আটকাতে ইচ্ছে করছে না।"
সেহরিশের গাল দুটো লজ্জায় আর আবেগে লালচে হয়ে উঠল। সে দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বলল, "এত দেরি করলে কেন, রায়ান? এই তিনটে বছর প্রতিটা রাত আমার জন্য কী ভীষণ নিঃসঙ্গ ছিল, তা কি তুমি জানো?"
রায়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সিটবেল্ট আটকে এক হাত সেহরিশের চিবুকের নিচে রাখল, আলতো করে তার মুখটা ওপরে তুলে ধরল। তার হাতের ছোঁয়ায় সেহরিশের চোখদুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এল। রায়ানের বুড়ো আঙুলটা সেহরিশের নরম ঠোঁটের কোণায় আলতো করে ছুঁয়ে গেল। এক তীব্র, অবরুদ্ধ রোমান্টিক উত্তেজনায় দুজনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। গাড়ির নিঃশব্দ কোণে তাদের হৃদস্পন্দনের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। রায়ান ঝুঁকে এসে সেহরিশের কানের ঠিক পাশে মুখ রেখে নরম অথচ ভারী গলায় বলল, "সব ভুলের মাশুল আমি এক নিমেষে শোধ করে দেব, সেহরিশ। শুধু আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও সব ঠিক করার।"
গাড়িটা চলতে শুরু করল গুলশানের রাস্তা ধরে। গন্তব্য সুনির্দিষ্ট নয়, কেবল একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করার এক অন্তহীন পথ। কাঁচের জানালার বাইরে ঢাকার কোলাহলময় অলিগলি পেছিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গাড়ির ভেতরের জগতটা যেন সম্পূর্ণ স্তব্ধ। ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়িটা থামতেই রায়ান আর সামনের দিকে তাকাল না। সে এক হাত দিয়ে সেহরিশের হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল এবং তার আঙুলের প্রতিটি খাঁজে নিজের আঙুলগুলো ইন্টারলক করে দিল।
সেহরিশ মুখ ফিরিয়ে রায়ানের দিকে তাকাল। রাস্তার হলুদ ল্যাম্পপোস্টের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে রায়ানের মুখের ওপর এসে পড়েছে। তার চোখের তারায় এখন আর কোনো জেদ নেই, আছে কেবল এক নিবিড় আত্মোপলব্ধি আর ভালোবাসার গাঢ় চাদর।
সেহরিশ আস্তে করে আঙুলগুলো আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "আমাদের মাঝখানে যে দেওয়ালটা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছিলাম, আজ তা ভাঙতে গিয়ে বুঝছি রায়ান—কতটা বোকামি করেছি আমরা।"
"বোকামি শুধু তুমি বা আমি একা করিনি, আমরা দুজন মিলে করেছি," রায়ান মৃদু হেসে তার হাতের ওপর ঠোঁট ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বলল। "কিন্তু আজ থেকে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি আর হবে না। আজ আমরা আমাদের না বলা কথাগুলোকে মুক্তি দেব।"
গাড়িটা যখন বনানীর একটি নিরিবিলি লেক সাইডের রাস্তায় এসে থামল, তখন চারপাশ একদম শান্ত। রায়ান ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল। গাড়ির ভেতরের মৃদু আলো জ্বেলে সে সেহরিশের সম্পূর্ণ কাছাকাছি চলে এল। সেহরিশের মুখের ওপর ঝুলে থাকা এক গোছা অবাধ্য চুল রায়ান তার আঙুল দিয়ে কানের পেছনে গুজে দিল। সেই ছোঁয়ায় সেহরিশের সর্বাঙ্গে এক মিষ্টি কাঁপন বয়ে গেল। রায়ান আর দূরত্ব বজায় রাখল না; সে তার হাত সেহরিশের কোমরের পেছনে রেখে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
সেহরিশের হৃদস্পন্দন তখন তার নিজের কানের পর্দায় আছড়ে পড়ছে। সে তার দুই হাত রায়ানের চওড়া কাঁধের ওপর রাখল। রায়ানের দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে সেহরিশের চোখের গভীরতায়। তারা দুজনেই বুঝতে পারছিল, এই নৈকট্য কোনো সাধারণ দেখাসাক্ষাৎ নয়—এটি তাদের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়কে নতুন করে লেখার এক তীব্র আকুতি। রায়ানের উষ্ণ নিঃশ্বাস সেহরিশের কপাল ছুঁয়ে গেল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে দুজনের ঠোঁট একে অপরের আরও কাছাকাছি চলে এল, ঝরে পড়তে চাইল বহুদিনের জমানো সব অভিমান আর না বলা ভালোবাসার বানে।
বনানীর লেকের ধারের সেই নিরিবিলি রাস্তায় রায়ানের গাড়িটা তখন সম্পূর্ণ স্থির। চারপাশের আলো-আঁধারি পরিবেশ আর দূরের পথচারীদের মৃদু গুঞ্জন ছাপিয়ে কেবল দুজনের ভারী দীর্ঘশ্বাস আর দ্রুত হৃদস্পন্দনের শব্দ ভেসে আসছে। সেহরিশের কোমরে রায়ানের শক্ত হাতের আলতো চাপ আর কাঁধে সেহরিশের আঙুলের উষ্ণ স্পর্শ—দুজনের মাঝের সমস্ত দূরত্বকে এক নিমেষে চিরতরে মুছে দিয়েছে।
রায়ান আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে তার অন্য হাতটি দিয়ে সেহরিশের চিবুকটা আস্তে করে ওপরে তুলে ধরল। তাদের চোখের দৃষ্টি যখন একে অপরের গভীরে মিশে গেল, তখন আর কোনো শব্দের প্রয়োজন রইল না। তিন বছরের জমে থাকা বরফ, সব অভিমান, সব জেদ আর না বলা হাজারটা অভিযোগ যেন ওই এক পলকে বাষ্প হয়ে উবে গেল। রায়ান ঝুঁকে এসে তার উষ্ণ ঠোঁট রাখল সেহরিশের ঠোঁটে।
সে এক গভীর, তীব্র আবেগের স্পর্শ—যেখানে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল কেবল বহুদিনের বঞ্চনা আর আকুলতার চিরতরে অবসান ঘটার এক পরম শান্তি। সেহরিশের চোখদুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এল এবং সে রায়ানের শার্টের কলারটা খামচে ধরে সেই নিবিড় চুম্বনে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিল। তাদের বহুদিনের তুষারাবৃত দূরত্ব সেদিন ওই ছোট্ট গাড়ির ভেতরে এক নিমিষে গলে জল হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পর যখন তারা একটু দূরত্ব তৈরি করল, দুজনেরই বুক তখন উত্তেজনার চোটে দ্রুত ওঠানামা করছে। সেহরিশের গাল দুটো লজ্জায় আর ভালোবাসার আভায় টকটকে লাল। সে তার হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল, "তুমি না সত্যি খুব পাজি, রায়ান। আজও তোমার জেদটা ঠিক আমার ওপরই খাটল।"
রায়ান এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং হুইলে আলতো ভর দিয়ে হাসিমুখে সেহরিশের দিকে ঝুঁকে রইল। তার চোখে তখন এক দুষ্টু মিষ্টি উজ্জ্বলতা আর অসীম স্বস্তি। সে হাসতে হাসতে জবাব দিল, "জেদটা তোমার ওপর না খাটলে কার ওপর খাটত বলো? তবে হ্যাঁ, আজকের পর থেকে ওই ভুল জেদ আর অহংকারকে আমাদের জীবনে আর কোনোদিন ঢুকতে দেব না—এটা আমার কথা।"
সেহরিশ তার ডান হাতটি রায়ানের হাতের ওপর রাখল, এবার আর কোনো দূরত্ব বা দ্বিধা ছিল না। সে খুব নরম গলায় বলল, "আমারও কথা রইল, রায়ান। আর কখনো কোনো কথা পেটে জমিয়ে রাখব না। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে সেটা সাথে সাথে দুজনে মিলে মিটিয়ে নেব, কাউকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নয়।"
রায়ান সেহরিশের হাতের আঙুলের ওপর নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে এক চিলতে চুমু খেল। এরপর সে ইগনিশন চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। বনানীর লেক পার হয়ে গাড়িটি যখন আবার ঢাকার মূল সড়কের চওড়া রাস্তায় এসে পড়ল, তখন রাতের আকাশ পরিষ্কার, অনেকগুলো তারা মিটিমিটি করে হাসছে।
তাদের এই নতুন পথচলায় অতীত আর কোনো ছায়া ফেলতে পারবে না। যে দূরত্ব তাদের আলাদা করেছিল, আজ সেই দূরত্বই তাদের শিখিয়ে দিয়েছে ভালোবাসার আসল মানে—যেখানে ইগো বা জেদের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে সত্যকে এবং সম্পর্ককে সবার ওপরে স্থান দেওয়ার unwavering commitment। গাড়িটা ছুটে চলল এক নতুন ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে শুধু তারা দুজন আর তাদের অটুট ভালোবাসা।
....