পুরোনো ঢাকার সরু গলি পেরিয়ে বারিধারার এই অ্যাপার্টমেন্টে যখন মায়ার পা পড়েছিল, তখন তার চোখে ছিল এক বুক রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু বিয়ের দেড়টা বছর কেটে গেলেও সেই স্বপ্নের রঙে কেবল শেওলার দাগ পড়েছে। ড্রয়িংরুমের কাঁচের টেবিলে চায়ের কাপটা একটু জোরে নামতেই মায়ার হাত কেঁপে উঠল। রুদ্র সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে, তার চোখের চাউনি বরাবরের মতোই তীক্ষ্ণ।
— "কফিটা ঠান্ডা কেন, মায়া? বলা হয়েছিল না ঠিক সময়ে সবকিছু টেবিলে চাই?" রুদ্রর গলার স্বরটা ঘরের থমথমে বাতাসে একটা চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল।
মায়া মৃদুস্বরে বলল, — "রান্নাঘরে তিতলির দুধ গরম করতে গিয়ে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল..."
— "তিতলির দেখাশোনার জন্য কাজের লোক আছে। তোমার কাজ ঘরের বাকি দিকগুলো নিখুঁত রাখা। অজুহাত দিও না," রুদ্রর কণ্ঠের কাঠিন্য এক মুহূর্তের জন্যও কমল না।
বিয়ের পর থেকেই রুদ্রর এই রূপটাই দেখে আসছে মায়া। প্রতিটি ছোটখাটো ভুল, একটু দেরিতে গোছানো আলমারি, কিংবা টেবিলে নুনের পাত্রটা ঠিক জায়গায় না থাকা—সব কিছুতেই তার কড়া নজর। কথায় কথায় ঠান্ডা ধমক, চোখের পলকে মেজাজ হারানো—এটাই যেন রুদ্রর দৈনন্দিন রুটিন। অথচ এই মানুষটাই আবার অন্যরকম। গত মাসে যখন মায়ার হঠাৎ তীব্র জ্বর এল, মাঝরাতে যখন জ্বর ১০৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেল, তখন এই রুদ্রই পাগল হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার ডেকে আনা, নিজে সারা রাত জেগে কপালে জলপট্টি দেওয়া—সবকিছু সে নিজের হাতে করেছিল। কিংবা অফিসে মায়ার নামে কেউ সামান্য অন্যায় কথা বললে রুদ্র বাঘের মতো তার ওপর গিয়ে পড়েছিল। এই দ্বৈত আচরণ মায়ার মনকে প্রতিনিয়ত দহন করে। মানুষটা কি ভালোবাসে, নাকি কেবল শাসন করতে ভালোবাসে?
রাত তখন গভীর। ছাদের ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে, কিন্তু বাতাসে একটুও বৃষ্টির ছোঁয়া নেই—পুরো আকাশ পরিষ্কার, কেবল তারার মেলা। মায়া বারান্দার গ্রিল ধরে একা দাঁড়িয়ে ছিল। এমন সময় একটা ভারী সুবাসিত উষ্ণতা তার পিঠ ছুঁয়ে গেল। রুদ্র পেছন থেকে এসে তাকে নিজের শক্ত বাহুডোরে জড়িয়ে ধরল। তার চওড়া বুকের ওম মায়ার পিঠের সাথে লেপ্টে গেল।
— "এভাবে একা দাঁড়িয়ে ঠান্ডা লাগাচ্ছ কেন?" রুদ্রর গলাটা এখন অনেক নরম, দিনের সেই কঠোরতার লেশমাত্র নেই তাতে।
মায়া নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে অভিমানের সুরে বলল, — "ঠান্ডা লাগলে আপনার কী? আপনার তো কেবল নিয়ম আর ভুল ধরা নিয়ে কথা।"
রুদ্র এক টানে মায়াকে আরও কাছে টেনে নিল, তার চিবুকটা মায়ার কাঁধে রাখল। তার নিশ্বাসের গরম ছোঁয়া মায়ার গলার সংবেদনশীল চামড়ায় লাগতেই মায়ার সারা শরীর কেঁপে উঠল।
— "সবকিছুর মধ্যেও তোমার ওপর আমার অধিকারটা তোমায় একটুও ছাড়তে দিই না, মায়া," ফিসফিস করে বলল রুদ্র।
তার ডান হাতটা ধীরে ধীরে মায়ার কামিজের ওড়না সরিয়ে কোমর ছুঁল। আঙুলগুলোর পরিচিত উষ্ণ ছোঁয়ায় মায়ার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত অভিমান মুহূর্তে গলে জল হতে শুরু করল। রুদ্রর ঠোঁট মায়ার ঘাড়ের সংবেদনশীল অংশে আলতো ছোঁয়া দিতেই মায়ার মুখ থেকে অজান্তেই একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
— "রুদ্র... এভাবে কষ্ট দিয়ে আবার কেন কাছে টানেন?" মায়ার গলাটা কাঁপছিল।
রুদ্র তার মুখ ঘুরিয়ে মায়ার ঠোঁটের ঠিক কাছে নিজের মুখ নিয়ে এল। চোখে অদ্ভুত এক তীব্র চাওয়া, যা কেবল শারীরিক নয়, আত্মার ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
— "কারণ তুমি আমার অক্সিজেন, মায়া। তোমায় হারানোর ভয়টাই আমাকে এমন করে তোলে," বলতে বলতেই রুদ্রর ঠোঁট আচ্ছন্ন করে ফেলল মায়ার ঠোঁটকে।
সেদিনের সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল একটা গভীর আকুতি আর দীর্ঘশ্বাসের মিলন। ঘরের নিয়ন আলোর নিচে দুজন মানুষ একাকার হয়ে গেল, যেখানে রাগের সমস্ত দেয়াল নিমেষে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল।
সকালবেলা রোদের তেজ বাড়লেও বাইরের আবহাওয়া বেশ শুষ্ক ও শান্ত। ডাইনিং টেবিলে পিনপতন নীরবতা। রুদ্র অফিসে চলে যাওয়ার পর মায়া একা বসে কফি খাচ্ছিল। টেবিলের ঠিক পাশেই রাখা একটা পুরোনো কাঠের বাক্স। এটি সাধারণত রুদ্রর স্টাডি রুমের লকারেই থাকে, কিন্তু গত রাতে কাজ শেষ করে সে সম্ভবত বাক্সটি টেবিলের ওপরই ফেলে গেছে। কৌতূহলবশত মায়া বাক্সটার ঢাকনাটা একটু খুলল। ভেতরে কিছু পুরোনো ছবি, একটা চাবি আর একটা হাসপাতালের কাগজ মোড়ানো আছে।
কাগজটা খুলতেই মায়ার চোখ কপালে উঠল। এটি তেরো বছর আগের এক দুর্ঘটনার মেডিকেল রিপোর্ট। রুদ্রর বাবা একটা বড় সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিলেন, আর তখন সাথে থাকা ছোট রুদ্র অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। সেই রিপোর্টের নিচে পুলিশের একটা তদন্ত নোট ছিল—যেখানে লেখা, চালকের চরম অসাবধানতা এবং ছোটখাটো একটা ভুলের কারণে ব্রেক ফেল করে গাড়ি খাদে পড়েছিল।
ঠিক তখনই পেছনের দরজা খোলার শব্দ হলো। রুদ্র ফাইল ভুলে গেছে বলে ফিরে এসেছে। ড্রয়িংরুমে এসে মায়ার হাতে ওই পুরোনো কাগজটা দেখে রুদ্রর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাসেকা হয়ে গেল। তার চোখের জগতটা যেন নিমিষে উল্টে গেল।
— "তুমি... তুমি এটা কেন খুলেছ, মায়া?" রুদ্রর গলাটা কাঁপছিল, যা সে কঠোরতার আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।
মায়া উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে রুদ্রর সামনে এসে বসল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে মায়া শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, — "বাবাকে হারানোর সেই ট্রমাটাই কি আপনার এই অদ্ভুত রাগের কারণ, রুদ্র? প্রতিটি ছোট ভুলকে অবহেলা না করে নিখুঁত করার এই অসুস্থ জেদ... আপনি কি ভয় পান যে সামান্য ভুলেই আপনার চারপাশের প্রিয় মানুষগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে?"
রুদ্র যেন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। এতদিনের সেই দুর্ভেদ্য পাহাড়ের মতো মানুষটা হঠাৎ করেই জানালার ধারে এসে বসে নিজের মুখটা দুই হাতে ঢাকল। তার চওড়া কাঁধ দুটো থরথর করে কাঁপছে।
— "তুমি বুঝবে না, মায়া! সেদিনও আমি সামান্য একটা কথা বলে বাবাকে অন্যমনস্ক করে দিয়েছিলাম। যদি সেদিন আমি চুপ থাকতাম, হয়তো বাবা আজ বেঁচে থাকত! আমার মনে হয়, আমার সামান্য ভুলেই আমার কাছের কেউ চিরকালের মতো দূরে চলে যাবে। এই ভয়টাই আমাকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খায়," রুদ্রর গলা দিয়ে কান্নার শব্দ বেরিয়ে এল।
মায়া আর এক মুহূর্তও দূরে রইল না। সে এগিয়ে গিয়ে রুদ্রর শক্ত শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়ল এবং তার মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিল। রুদ্রর এলোমেলো চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতেই সে ছোট বাচ্চার মতো মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
— "আপনার এই ভয় আমি বুঝি, রুদ্র। কিন্তু তাই বলে প্রতি মুহূর্তে আমাকে কষ্ট দেওয়া, কথায় কথায় শাসন করা—এটা কোনো ভালোবাসার বা সুরক্ষার ভাষা হতে পারে না। এই অন্যায় আচরণ আমি আর সহ্য করব না," মায়ার কণ্ঠস্বর ছিল কঠোর কিন্তু ভেতরে ছিল সমুদ্রের মতো গভীর মায়া।
রুদ্র মায়ার মুখের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে জমে থাকা জল মায়ার চিবুক ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ল। রুদ্র হঠাৎ করেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মায়ার কোমর শক্ত করে খপ করে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। তার চোখের সেই ভীতি এখন গলে এক তীব্র কামনায় রূপ নিয়েছে।
— "আমাকে শাস্তি দাও, মায়া। যা ইচ্ছে করো, কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনো ভেবো না," ফিসফিস করে বলে রুদ্র তার জ্বলন্ত ঠোঁট নামিয়ে আনল মায়ার গলার খাঁজে।
ঘরের দরজা বন্ধ, বাইরে রোদের আলো ফিকে হয়ে আসছে। রুদ্রর হাতের ছোঁয়া এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া, অনেক বেশি গভীর। সে মায়াকে দেওয়ালের সাথে আলতো করে চেপে ধরে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দিল। সেই চুম্বনে কোনো রাগ ছিল না, ছিল নিখাদ আত্মসমর্পণ আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভয়ের এক তীব্র প্রকাশ। মায়ার হাত দুটো রুদ্রর চওড়া পিঠের শার্ট খামচে ধরে সেই উত্তাপের গভীরে হারিয়ে গেল।
বিকেলের সোনাঝরা রোদের আলো ঘরের জান্নাত কাঁচ ভেদ করে মেঝেতে এসে পড়েছে। বাইরের স্নিগ্ধ আবহাওয়ায় কোথাও কোনো মেঘ বা বৃষ্টির চিহ্ন নেই, চারপাশটা অদ্ভুত শান্ত ও পরিষ্কার। বেডরুমে বিছানার ওপর পাশাপাশি বসে আছে রুদ্র আর মায়া। সকালের সেই কান্নার ভাঙন আর উত্তেজনার পর এখন ঘরে এক গাঢ় শান্তির সুবাস। রুদ্রর মাথাটা আলতো করে মায়ার কাঁধে হেলানো, আর মায়ার আঙুলগুলো নিপুণ ছন্দে বুলিয়ে দিচ্ছে রুদ্রর চুলে।
— "তুমি সেদিন একদম ঠিক বলেছিলে, মায়া," রুদ্রর গলাটা এখন অনেক হালকা, যেন বুকের পাথরটা সরে গেছে। — "ভয়কে ঢাল বানিয়ে আমি নিজের অজান্তেই তোমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিলাম। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে তোমার সাথে অন্যায় করে ফেলছিলাম।"
মায়া একটু মৃদু হেসে রুদ্রর চিবুকটা ধরে মুখটা ওপরে তুলল। তার চোখে ভালোবাসার সাথে মেশানো এক ধরনের ধমক ছিল।
— "ভুল মানুষমাত্রই হয়, রুদ্র। অতীতের ভূতকে বর্তমানের জীবনে চেপে বসতে দিলে সুন্দর ভবিষ্যৎটাও নষ্ট হয়ে যায়। আজ থেকে তোমার ওই অন্ধ রাগের দিন শেষ," মায়ার কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত দৃঢ় ও মিষ্টি।
রুদ্র মৃদু হেসে মায়ার চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে আর কোনো ভয় বা কঠোরতা নেই, আছে কেবল নিখাদ সমর্পণ আর গভীর কৃতজ্ঞতা। সে এক টানে মায়াকে সোজা করে নিজের কোলের ওপর বসাল। মায়ার দুই হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ধরল রুদ্রর গলা। রোদের আলো তাদের ওপর এসে পড়তেই ঘরের পরিবেশটা আরও বেশি উষ্ণ হয়ে উঠল।
— "তাহলে নতুন এই যাত্রার শুরুটা কীভাবে হবে?" ফিসফিস করে বলল রুদ্র। তার চোখের ইশারায় স্পষ্ট এক তীব্র কামনার আগুন, যা এইমাত্র সমস্ত দ্বন্দ্ব কাটিয়ে আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
মায়া দুষ্টু মিষ্টি হেসে তার মুখটা রুদ্রর কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, — "আগে প্রতিজ্ঞা করুন, আর কোনো দিন বিনা কারণে রাগ করবেন না।"
— "প্রতিজ্ঞা করলাম," এই বলে রুদ্র আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করল না। সে মায়ার ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো সরিয়ে সেখানে তার গরম ঠোঁটের একটা গভীর ও দীর্ঘ ছোঁয়া আঁকল।
মায়ার গলা দিয়ে একটা সুখের শিহরণজাগানো দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। রুদ্রর হাতের আঙুলগুলো মায়ার কোমরের মিহি কাপড়ের ওপর দিয়ে খপ করে তার শরীরকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে লেপ্টে নিল। তাদের ঠোঁটের মিলনটা এবার আর কোনো উত্তেজনার বা প্রতিবাদের ছিল না; সেটা ছিল দুই দুটি প্রাণের দীর্ঘদিনের দূরত্ব ঘুচে যাওয়ার এক পরম প্রশান্তির মুহূর্ত। ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বাইরের পৃথিবীর সব কোলাহল হারিয়ে গেল, আর দুজনে মিলে এক নতুন বিশ্বাসের বন্ধনে চিরতরে আবদ্ধ হয়ে গেল।
....