দূরত্ব ভাঙার ধীর চেষ্টা

জায়ান আহমেদের চোখে সবসময় একটা শীতল দৃষ্টি থাকত। বিয়ের পর থেকেই সেই দৃষ্টি নাবিলার দিকে পড়ত। নাবিলা হোসেন জানত না কেন তার স্বামী তাকে এভাবে দেখে। ঢাকার মিরপুরের একটা ছোট ফ্ল্যাটে তাদের নতুন সংসার শুরু হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে একটা অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে ছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

নাবিলার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। মা গৃহিণী। তারা সিলেটে থাকতেন। জায়ানের পরিবার ঢাকার পুরান অংশে। বিয়ের প্রস্তাব আসার সময় দুই পরিবারই খুশি হয়েছিল। নাবিলার বাবা-মা ভেবেছিলেন তাদের মেয়ে ভালো ঘরে যাচ্ছে। জায়ানের বাবা-মা ভেবেছিলেন ছেলের জন্য ভদ্র পরিবারের মেয়ে পাওয়া গেছে। কিন্তু জায়ানের মনে অন্য কথা ছিল।

পাঁচ বছর আগের একটা ঘটনা জায়ানের মনে গেঁথে আছে। তার ছোট বোন সায়মা তখন কলেজে পড়ত। একদিন সায়মা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল। কেউ তাকে বাজারের মাঝখানে অপমান করেছে বলে। জায়ান জিজ্ঞেস করেছিল কে করেছে। সায়মা নাম বলেছিল নাবিলার। জায়ান তখন বিশ্বাস করেনি। পরে আরও কিছু লোকের মুখে শুনেছে যে নাবিলা তার বোনকে খারাপ কথা বলেছে এবং পরিবারকেও ছেড়ে যায়নি। সেই থেকে জায়ানের মনে নাবিলার নামটা বিষের মতো কাজ করতে থাকে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

বিয়ের প্রস্তাব যখন আসে, জায়ান প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু পরিবারের চাপে রাজি হতে হয়। বিয়ের রাতে সে নাবিলাকে বলেছিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসার জন্য বিয়ে করিনি। পরিবারের জন্য করেছি। তুমি আমার স্ত্রী, কিন্তু আমার কাছে তুমি শুধু একটা দায়িত্ব।”

নাবিলা সেদিন চুপ করে ছিল। তার চোখে জল এসেছিল কিন্তু সে ফেলেনি। পরের দিন থেকেই জায়ানের আচরণ কঠোর হয়ে ওঠে। সকালে নাবিলা চা বানিয়ে দেয়, জায়ান নিয়ে নেয় কিন্তু ধন্যবাদ বলে না। রাতে খাবার টেবিলে সে চুপচাপ খায়। নাবিলা কিছু বললে সে এক কথায় জবাব দেয়। কখনো কখনো বলে, “তোমার কথা শোনার সময় নেই আমার।”

নাবিলা চেষ্টা করে কথা বলার। একদিন সে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি কিছু ভুল করেছি? তুমি কেন এমন করো আমার সাথে?”

জায়ান তাকিয়ে দেখে এবং বলে, “তুমি জানো না কেন। জানার দরকারও নেই।”

নাবিলার বুকে ব্যথা লাগে। সে তার মাকে ফোন করে। মা বলে, “সময় লাগবে মেয়ে। ছেলেরা প্রথমে একটু অন্য রকম হয়। ধৈর্য ধরো।”

নাবিলা ধৈর্য ধরে। সে ঘর গুছিয়ে রাখে। জায়ানের কাপড় ইস্ত্রি করে। তার পছন্দের খাবার রান্না করে। কিন্তু জায়ানের মুখে কোনো প্রশংসা আসে না। বরং কখনো কখনো সে বলে, “এটা তো সবাই করে। নতুন কিছু না।”

জায়ানের বোন সায়মা কখনো তাদের বাড়িতে আসে না। জায়ানও সায়মার কথা নাবিলার সামনে বলে না। নাবিলা জানে সায়মা আছে কিন্তু কখনো দেখেনি। সে ভাবে হয়তো তারা দূরে থাকে।

একদিন জায়ানের মা ফোন করে। নাবিলা রিসিভ করে। শাশুড়ি বলে, “জায়ান কেমন আছে? তুমি তো তাকে ঠিকমতো দেখছো তো?”

নাবিলা বলে, “জি আন্টি। সব ঠিক আছে।”

কিন্তু তার গলায় কোনো আনন্দ নেই। শাশুড়ি বোঝে কিছু একটা গড়বড় আছে কিন্তু কিছু বলে না।

রাতে জায়ান অফিস থেকে ফিরে দেখে নাবিলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকার আকাশ তখন অন্ধকার। নিচে রাস্তায় গাড়ির আলো জ্বলছে। নাবিলা জায়ানের দিকে তাকায়। জায়ান চোখ ফিরিয়ে নেয়।

“খাবার তৈরি,” নাবিলা বলে।

জায়ান মাথা নাড়ে। খাবার টেবিলে বসে সে খায়। নাবিলা তার সামনে বসে। দুজনেই চুপ। হঠাৎ জায়ান বলে, “কাল আমার একটা মিটিং আছে। সকালে আগে উঠতে হবে।”

নাবিলা বলে, “আমি জাগিয়ে দেব।”

জায়ান মাথা নেড়ে উঠে যায়। ঘুমানোর ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে। নাবিলা একা টেবিলে বসে থাকে। তার চোখে জল আসে কিন্তু সে মুছে ফেলে। সে ভাবে, কেন এমন হয়? আমি কি এত খারাপ যে সে আমাকে সহ্য করতে পারে না?

পরের কয়েক সপ্তাহ একই রকম কাটে। জায়ান অফিসে যায়, ফিরে আসে, খায়, ঘুমায়। নাবিলা চেষ্টা করে কথা বলার কিন্তু জায়ান দূরে সরে যায়। একদিন নাবিলা জায়ানের পুরোনো ছবির অ্যালবাম দেখে। সেখানে সায়মার ছবি আছে। সায়মা হাসছে। নাবিলা ভাবে, এই মেয়েটা কেন কখনো আসে না?

এক সন্ধ্যায় জায়ান বাসায় এসে দেখে নাবিলা রান্নাঘরে ব্যস্ত। সে হঠাৎ বলে, “আজকে কিছু কিনে এনেছি।”

নাবিলা ঘুরে তাকায়। জায়ান একটা বক্স এগিয়ে দেয়। ভেতরে একজোড়া কানের দুল। নাবিলা অবাক হয়। জায়ান বলে, “শাশুড়ি পাঠিয়েছে। তোমাকে দিতে বলেছে।”

নাবিলা নেয়। বলে, “থ্যাংক ইউ।”

জায়ান মাথা নেড়ে চলে যায়। নাবিলার মনে হয়, এটাও হয়তো দায়িত্ব পালন। ভালোবাসার কোনো চিহ্ন নেই।

রাত গভীর হয়। নাবিলা বিছানায় শোয়। জায়ান অন্যদিকে মুখ করে শোয়। নাবিলা তার পিঠের দিকে তাকায়। সে ভাবে, কখনো কি এই মানুষটা আমার দিকে তাকাবে স্নেহের চোখে? কখনো কি আমাকে বলবে যে সে আমাকে চায়?

বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ আসে। ফ্ল্যাটের দেয়ালে ছায়া নাচে। নাবিলার চোখ বন্ধ হয়। সে স্বপ্ন দেখে তার বাবার বাড়ির। সিলেটের সবুজ মাঠ। কিন্তু স্বপ্নেও জায়ান থাকে না।

সকালে জায়ান উঠে চা খায়। নাবিলা তাকে জাগায়নি। সে নিজেই উঠেছে। জায়ান বেরোনোর আগে বলে, “আজ দেরি করে ফিরব। অপেক্ষা করো না।”

নাবিলা মাথা নাড়ে। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। নাবিলা একা বসে পড়ে। তার মনে প্রশ্ন ঘোরে। কেন জায়ান তাকে এতটা অপছন্দ করে? সে কি কিছু জানে না? নাকি সে জানে কিন্তু বলছে না?

দিনের বেলা নাবিলা ঘর গোছায়। দুপুরে সে তার বান্ধবী রুমিকে ফোন করে। রুমি বলে, “তুমি কি তাকে জিজ্ঞেস করেছো সরাসরি?”

নাবিলা বলে, “করেছি। বলে শোনার সময় নেই।”

রুমি বলে, “তাহলে ধৈর্য ধরো। হয়তো কোনো ভুল বোঝাবুঝি আছে।”

নাবিলা ফোন রেখে দেয়। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। মিরপুরের রাস্তায় মানুষ চলছে। কেউ হাসছে, কেউ ব্যস্ত। তার জীবন যেন এক জায়গায় আটকে আছে।

সন্ধ্যায় জায়ান ফিরে আসে। নাবিলা খাবার পরিবেশন করে। জায়ান খায়। হঠাৎ সে বলে, “তুমি কি আজকে বাইরে গিয়েছিলে?”

নাবিলা বলে, “না। কোথাও যাইনি।”

জায়ান মাথা নেড়ে বলে, “ভালো। বাইরে অনেক খারাপ লোক থাকে।”

নাবিলা অবাক হয়। জায়ানের কণ্ঠে একটু চিন্তার ছাপ ছিল। কিন্তু পরক্ষণেই সে আবার শীতল হয়ে যায়।

রাতের বেলা নাবিলা ঘুমাতে পারে না। সে জায়ানের শ্বাস-প্রশ্বাস শোনে। সে ভাবে, এই মানুষটার মনে কী আছে? কেন সে আমাকে এভাবে দূরে রাখে? আমি কি তার পরিবারের সাথে কোনো সম্পর্ক রেখেছি যা সে জানে না?

পরের দিন জায়ানের অফিস থেকে একটা কল আসে। নাবিলা রিসিভ করে। একজন সহকর্মী জায়ানের খোঁজ নেয়। নাবিলা বলে সে বাইরে আছে। সহকর্মী বলে, “বলবেন যে ফাইলটা জরুরি।”

নাবিলা জায়ানকে মেসেজ করে। জায়ান রিপ্লাই দেয় এক কথায়। “ঠিক আছে।”

নাবিলার মনে হয়, এমনকি মেসেজেও সে দূরত্ব রাখে।

সপ্তাহ শেষে জায়ানের বাবা ফোন করে। নাবিলা কথা বলে। শ্বশুর বলে, “জায়ানকে বলো শনিবার বাড়িতে আসতে। মা তোমার জন্য কিছু রান্না করেছে।”

নাবিলা বলে, “জি আঙ্কেল।”

জায়ানকে বললে সে মাথা নাড়ে। শনিবার তারা যায়। জায়ানের বাবা-মা খুশি হয়। কিন্তু সায়মা নেই। নাবিলা জিজ্ঞেস করতে চায় কিন্তু সাহস পায় না।

ফিরে আসার পথে জায়ান চুপ থাকে। নাবিলা বলে, “তোমার বোন কেমন আছে?”

জায়ান হঠাৎ তাকিয়ে বলে, “তুমি কেন জানতে চাও?”

নাবিলা চুপ হয়ে যায়। জায়ানের চোখে রাগের ছাপ ছিল। নাবিলা বুঝতে পারে এই নামটাই তার জন্য নিষিদ্ধ।

বাসায় ফিরে নাবিলা রান্না করে। জায়ান খেয়ে ঘুমাতে যায়। নাবিলা একা বসে থাকে। তার মনে একটা সিদ্ধান্ত নেয়। সে জানবে কেন জায়ান তাকে এতটা অপছন্দ করে। সে জানবে সেই পুরোনো গল্পটা। কিন্তু কীভাবে?

রাত গভীর হয়। নাবিলা বিছানায় শোয়। জায়ান ঘুমাচ্ছে। নাবিলা তার মুখের দিকে তাকায়। ঘুমের মধ্যে তার মুখ শান্ত দেখায়। নাবিলা ভাবে, যদি সে জানত আমি কীভাবে তার জন্য অপেক্ষা করি, তাহলে কি সে এমন করত?

কিন্তু জায়ান জানে না। সে শুধু জানে যে নাবিলা তার পরিবারকে অপমান করেছিল। সেই বিশ্বাস তাকে শক্ত করে রেখেছে। নাবিলা জানে না সেই বিশ্বাসের কথা। দুজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। কিন্তু অজান্তেই একটা টানও তৈরি হয়। যখন জায়ান অসুস্থ হয়, নাবিলা তার পাশে বসে থাকে। যখন নাবিলা কাঁদে, জায়ান দূর থেকে দেখে কিন্তু কাছে আসে না।

এভাবেই তাদের সংসার চলতে থাকে। একদিকে কঠোরতা, অন্যদিকে এক অজানা আকর্ষণ। নাবিলা অপেক্ষা করে সেই দিনের জন্য যখন সত্য বের হবে। কিন্তু সে জানে না সেই সত্য কতটা দেরিতে আসবে এবং ততদিনে তার মনে কতটা ক্ষত তৈরি হবে।

বিয়ের তিন মাস পার হয়ে যায়। জায়ান এবং নাবিলার মধ্যে দূরত্ব এখনো আছে কিন্তু কিছু পরিবর্তনও শুরু হয়। জায়ান আগের মতো কঠোর নয় সবসময়। কখনো কখনো সে নাবিলার দিকে তাকায় এবং চোখ ফিরিয়ে নেয় দ্রুত। নাবিলা লক্ষ করে যে জায়ান তার রান্না করা খাবার বেশি খায় যদিও বলে না। একদিন সে নাবিলার হাত থেকে গ্লাস নিয়ে নেয় যখন সে পানি ঢালছিল এবং তাদের আঙুল স্পর্শ হয়। জায়ান হাত সরিয়ে নেয় কিন্তু নাবিলা দেখে তার কান লাল হয়ে গেছে।

নাবিলা প্রতিদিন চেষ্টা করে। সে জায়ানের অফিসের জামা ঠিক করে রাখে। তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে। একদিন জায়ান অফিস থেকে ফিরে বলে, “আজকে আমার হেড অফিস থেকে প্রশংসা পেয়েছি। প্রজেক্টটা ভালো হয়েছে।”

নাবিলা হাসে। বলে, “অনেক ভালো লাগল।”

জায়ান একটু অবাক হয়। সে আশা করেনি নাবিলা এত খুশি হবে। সে বলে, “তুমি... খাবার রেডি?”

নাবিলা মাথা নাড়ে। তারা একসাথে খায়। এই প্রথম জায়ান নাবিলাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কেমন আছো?”

নাবিলা বলে, “ভালো। তুমি?”

জায়ান বলে, “ঠিক আছে।”

কিন্তু কথোপকথন সেখানেই থেমে যায়। নাবিলা চায় আরও কথা বলতে কিন্তু জায়ান উঠে চলে যায়।

এক সপ্তাহ পর জায়ান অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বর আসে। নাবিলা তার পাশে বসে থাকে। ঠান্ডা পানি দিয়ে মাথা মুছে দেয়। ওষুধ খাওয়ায়। জায়ান জ্বরে আধো ঘুমে বলে, “কেন এত যত্ন করছো?”

নাবিলা বলে, “কারণ আমি তোমার স্ত্রী।”

জায়ান চোখ খোলে। তার চোখে কিছু একটা পরিবর্তন আসে। সে বলে, “তুমি... চলে যাও। আমি একা থাকতে পারি।”

নাবিলা যায় না। সে বলে, “না। আমি থাকব।”

জায়ান আর কিছু বলে না। পরের দিন জ্বর কমে। জায়ান উঠে বসে। নাবিলা তার জন্য স্যুপ এনে দেয়। জায়ান খায় এবং বলে, “ধন্যবাদ।”

নাবিলা অবাক হয়। জায়ান প্রথমবার তাকে ধন্যবাদ দিল। তার চোখে জল আসে কিন্তু সে লুকিয়ে ফেলে।

সেই রাতে জায়ান নাবিলার দিকে মুখ করে শোয়। নাবিলা জেগে থাকে। হঠাৎ জায়ান বলে, “তুমি কি সবসময় এত ধৈর্যশীল?”

নাবিলা বলে, “চেষ্টা করি।”

জায়ান চুপ থাকে। তার মনে পুরোনো কথা ঘোরে। সায়মার কান্না। নাবিলার নাম। সে ভাবে, এই মেয়েটা কি সত্যিই সেই মেয়ে? যে তার বোনকে অপমান করেছিল?

পরের দিন জায়ান অফিসে যায়। ফিরে এসে নাবিলাকে একটা বই উপহার দেয়। নাবিলা অবাক হয়। জায়ান বলে, “দেখেছি তুমি পড়তে পছন্দ করো। এটা ভালো বলেছে কেউ।”

নাবিলা নেয়। বলে, “অনেক ধন্যবাদ।”

জায়ান মাথা নাড়ে এবং চলে যায়। নাবিলার মনে আশা জাগে। হয়তো সবকিছু বদলাচ্ছে।

কিন্তু আবারও দূরত্ব ফিরে আসে। একদিন নাবিলা জায়ানের ফোন দেখে ফেলে যখন সে চার্জে দিয়েছিল। সেখানে সায়মার মেসেজ আছে। “ভাইয়া, তুমি কেমন আছো? ওই মেয়ের সাথে কেমন কাটছে?”

জায়ান রিপ্লাই দিয়েছে, “ঠিক আছে। কথা বলো না ওই বিষয়ে।”

নাবিলার বুক ভারী হয়ে যায়। সে বোঝে সায়মা তাকে পছন্দ করে না। কিন্তু কেন?

সেই সন্ধ্যায় নাবিলা জায়ানকে জিজ্ঞেস করে, “তোমার বোন কেন কখনো আসে না?”

জায়ান শক্ত হয়ে যায়। বলে, “তুমি জানতে চাও কেন? কারণ সে তোমাকে দেখতে চায় না। আর আমিও চাই না সে আসুক।”

নাবিলা বলে, “কেন? আমি কি কিছু করেছি?”

জায়ান চোখ তুলে তাকায়। তার চোখে রাগ এবং ব্যথা দুটোই আছে। সে বলে, “তুমি জানো। ভুলে গেছো হয়তো। কিন্তু আমি ভুলিনি।”

নাবিলা বলে, “আমি কিছু জানি না। বলো আমাকে।”

জায়ান উঠে দাঁড়ায়। বলে, “না। বলার দরকার নেই। শুধু এটুকু জানো যে তুমি আমার পরিবারকে অপমান করেছিলে। সেই জন্যই আমি তোমাকে কখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারব না।”

নাবিলা হতবাক হয়ে যায়। সে বলে, “আমি? কখন? কী করেছি?”

জায়ান বলে, “পাঁচ বছর আগে। আমার বোনকে বাজারে অপমান করেছিলে। পরিবারের নাম নিয়ে খারাপ কথা বলেছিলে। আমি সব জানি।”

নাবিলা মাথা নেড়ে বলে, “না। আমি এমন কিছু করিনি। তুমি ভুল জানো।”

জায়ান হাসে শীতলভাবে। বলে, “সবাই মিথ্যা বলে। তুমিও বলো।”

সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। নাবিলা বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদে। তার মনে হয় পৃথিবীটা ভেঙে যাচ্ছে। সে কখনো এমন কিছু করেনি। কিন্তু জায়ান বিশ্বাস করে সে করেছে।

পরের কয়েকদিন জায়ান আরও কঠোর হয়ে ওঠে। নাবিলা চেষ্টা করে বোঝাতে কিন্তু জায়ান শোনে না। একদিন নাবিলা তার বাবাকে ফোন করে। বাবা বলে, “মেয়ে, তুমি কি সত্যিই কিছু করেছিলে?”

নাবিলা বলে, “না বাবা। আমি কিছু জানি না।”

বাবা বলে, “তাহলে ধৈর্য ধরো। সত্য একদিন বের হবে।”

নাবিলা ধৈর্য ধরে। কিন্তু তার মনে ক্ষত তৈরি হতে থাকে। প্রতিদিন জায়ানের শীতল আচরণ তার হৃদয়ে দাগ কাটে।

একদিন জায়ান অফিস থেকে দেরি করে ফিরে। নাবিলা অপেক্ষা করছিল। জায়ান এসে দেখে নাবিলা ঘুমিয়ে পড়েছে সোফায়। তার চোখে জলের দাগ। জায়ান কাছে যায়। হাত বাড়িয়ে নাবিলার চুল সরায়। তার মনে একটা টান অনুভব করে। সে নিজেকে থামায়। উঠে চলে যায়।

নাবিলা জেগে উঠে দেখে কম্বল চাপা দেওয়া আছে। জায়ান দিয়েছে। তার মনে একটু উষ্ণতা আসে কিন্তু সাথে সাথে সেই কথা মনে পড়ে। জায়ান তাকে দোষী মনে করে।

ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত টান তৈরি হয়। যখন জায়ান কাছে আসে, নাবিলার হৃদয় দ্রুত বাজে। যখন নাবিলা হাসতে চেষ্টা করে, জায়ান দূরে সরে যায় কিন্তু পরে আবার তাকায়। একদিন বৃষ্টি ছাড়াই আকাশ মেঘলা ছিল। জায়ান নাবিলাকে নিয়ে বাজারে যায়। নাবিলা অবাক হয়। জায়ান বলে, “কিছু কেনার দরকার।”

বাজারে তারা একসাথে হাঁটে। জায়ান নাবিলার হাত ধরে রাখে যাতে সে হারিয়ে না যায়। নাবিলার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। জায়ানও অনুভব করে কিন্তু ছেড়ে দেয় না।

বাসায় ফিরে জায়ান বলে, “তুমি... ভালো আছো তো?”

নাবিলা বলে, “হ্যাঁ।”

জায়ান বলে, “আমি... ক্ষমা চাই যদি কখনো কঠিন হয়ে থাকি। কিন্তু আমি ভুলতে পারি না।”

নাবিলা বলে, “আমি কিছু করিনি জায়ান। বিশ্বাস করো।”

জায়ান মাথা নাড়ে। বলে, “আমি চেষ্টা করব।”

কিন্তু সেই চেষ্টা সহজ নয়। রাতে জায়ান নাবিলার কাছে আসে। প্রথমবার তারা কাছাকাছি থাকে। নাবিলার চোখে জল। জায়ান মুছে দেয়। বলে, “কেঁদো না।”

নাবিলা বলে, “আমি চাই তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।”

জায়ান চুপ থাকে। তার মনে দ্বন্দ্ব চলে। একদিকে পুরোনো ঘৃণা, অন্যদিকে এই মেয়েটার প্রতি টান। সে নাবিলাকে জড়িয়ে ধরে কিন্তু মনে বলে, এটা শুধু শরীরের টান। মনের না।

নাবিলা অনুভব করে জায়ানের দ্বন্দ্ব। সে জানে জায়ান তাকে চায় কিন্তু পুরোপুরি মেনে নিতে পারে না। তার মনে ক্ষত বাড়তে থাকে। প্রতিবার জায়ান যখন দূরে সরে যায়, নাবিলার হৃদয় ভেঙে যায় একটু করে।

একদিন সায়মা ফোন করে জায়ানকে। নাবিলা শোনে। সায়মা বলে, “ভাইয়া, তুমি কি এখনো ওর সাথে আছো? ভুলে যাও সে কী করেছিল।”

জায়ান বলে, “চুপ করো সায়মা। আমি জানি কী করতে হবে।”

নাবিলা আর সহ্য করতে পারে না। সে জায়ানের কাছে গিয়ে বলে, “আমাকে বলো পুরো ঘটনা। আমি জানতে চাই আমি কী করেছিলাম।”

জায়ান বলে, “তুমি আমার বোনকে বলেছিলে সে গরিব পরিবারের মেয়ে। তার বাবা-মাকে অপমান করেছিলে। বাজারে সবাই শুনেছে।”

নাবিলা মাথা নেড়ে বলে, “না। আমি কখনো এমন কথা বলিনি। কে বলেছে তোমাকে?”

জায়ান বলে, “সায়মা বলেছে। আর অন্যরাও।”

নাবিলা বলে, “তাহলে সায়মাকে ডাকো। আমি তার মুখোমুখি হতে চাই।”

জায়ান রাজি হয় না। বলে, “না। সে আসবে না।”

নাবিলা কাঁদে। বলে, “তাহলে আমি কীভাবে প্রমাণ করব আমি নির্দোষ?”

জায়ান চুপ থাকে। তার মনে সন্দেহ জাগে প্রথমবার। কিন্তু সে মেনে নিতে চায় না।

সেই রাতে তারা আলাদা শোয়। নাবিলার মনে গভীর ক্ষত তৈরি হয়। সে ভাবে, জায়ান কখনো আমাকে বিশ্বাস করবে না। আমি যতই চেষ্টা করি না কেন।

কিন্তু টানটা যায় না। জায়ান মাঝরাতে উঠে নাবিলার ঘরে আসে। দেখে সে কাঁদছে। সে পাশে বসে। হাত দিয়ে নাবিলার চুল সরায়। নাবিলা জেগে ওঠে। জায়ান বলে, “ঘুমাও।”

নাবিলা বলে, “তুমি কি কখনো আমাকে ভালোবাসবে?”

জায়ান বলে, “আমি জানি না।”

নাবিলা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তার ক্ষত আরও গভীর হয়।

দিনগুলো কাটতে থাকে এভাবেই। একদিকে আকর্ষণ, অন্যদিকে অবিশ্বাস। নাবিলা প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যায়। জায়ানও অনুভব করে কিন্তু পুরোনো বিশ্বাস তাকে আটকে রাখে। সত্য এখনো দূরে। আর নাবিলার মনে ক্ষত বাড়তেই থাকে।

ছয় মাস পার হয়ে যায়। জায়ান এবং নাবিলার সংসার এখন এক অদ্ভুত ভারসাম্যে চলে। দিনে জায়ান অফিসে যায়। নাবিলা ঘর সামলায়। রাতে তারা কাছাকাছি থাকে কিন্তু মনের দূরত্ব কাটে না। নাবিলার চোখে এখন আর আগের মতো আশা নেই। তার হাসি কমে গেছে। জায়ান লক্ষ করে কিন্তু কিছু বলে না।

একদিন জায়ানের অফিসের এক সহকর্মী আসে তাদের বাসায়। তার নাম রফিক। সে জায়ানের পুরোনো বন্ধু। কথা বলার সময় রফিক বলে, “জায়ান, তোর বোন সায়মা তো এখন বিদেশে না? কেমন আছে?”

জায়ান বলে, “ভালো।”

রফিক বলে, “মনে আছে সেই ঘটনা? পাঁচ বছর আগের? বাজারে?”

জায়ান শক্ত হয়ে যায়। নাবিলা অন্য ঘরে ছিল কিন্তু শুনতে পায়। রফিক বলে, “আসলে পরে জানতে পেরেছিলাম সেই মেয়েটা নাবিলা ছিল না। অন্য কেউ ছিল। নাম মিল ছিল বলে ভুল হয়েছিল।”

জায়ান হঠাৎ তাকায়। বলে, “কী বলছো?”

রফিক বলে, “হ্যাঁ। সায়মা নিজেই পরে বলেছিল ভুল হয়েছে। কিন্তু তখন তো তুই রেগে গিয়েছিলে। আর কেউ বলায়নি।”

জায়ানের মাথা ঘুরে যায়। সে রফিককে বিদায় করে। নাবিলার কাছে যায়। নাবিলা দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে প্রশ্ন।

জায়ান বলে, “তুমি... সত্যিই কিছু করোনি?”

নাবিলা বলে, “আমি শুরু থেকেই বলেছি।”

জায়ান বসে পড়ে। তার হাতে মাথা দেয়। বলে, “আমি কী করেছি?”

নাবিলা চুপ থাকে। জায়ান উঠে দাঁড়ায়। বলে, “আমাকে সায়মাকে ফোন করতে দাও।”

সে ফোন করে। সায়মা রিসিভ করে। জায়ান বলে, “সায়মা, সেই ঘটনাটা। সত্যি কী ছিল?”

সায়মা চুপ থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, “ভাইয়া... আমি ভুল করেছিলাম। সেই মেয়েটা অন্য কেউ ছিল। নামটা মনে হয়েছিল নাবিলা। পরে বুঝেছি ভুল। কিন্তু তখন তুমি এত রেগে গিয়েছিলে যে বলতে পারিনি।”

জায়ানের হাত কাঁপে। সে ফোন রেখে দেয়। নাবিলার দিকে তাকায়। বলে, “আমি... ক্ষমা চাই।”

নাবিলা হাসে না। বলে, “এতদিন পর?”

জায়ান কাছে যায়। বলে, “আমি ভুল করেছি। আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি অকারণে।”

নাবিলা পিছিয়ে যায়। বলে, “তুমি আমাকে বিশ্বাস করোনি। প্রতিদিন আমাকে শীতল চোখে দেখেছো। আমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি...”

জায়ান বলে, “আমি জানি। আমাকে শাস্তি দাও। কিন্তু আমাকে ছেড়ো না।”

নাবিলা কাঁদে। বলে, “আমার মনে এখন ক্ষত আছে জায়ান। তুমি যতই বলো, সেই ক্ষত সহজে যাবে না।”

জায়ান হাঁটু গেড়ে বসে। বলে, “আমি পুরো জীবন দিয়ে সেই ক্ষত সারাব। শুধু একটা সুযোগ দাও।”

নাবিলা তাকায়। তার চোখে জল। সে বলে, “আমি জানি না আমি পারব কি না।”

সেই রাতে জায়ান নাবিলার পাশে বসে থাকে। কথা বলে অনেকক্ষণ। পুরোনো সব কথা। নাবিলা শোনে কিন্তু জবাব দেয় কম। তার মনে সেই সব দিন ঘোরে যখন জায়ান তাকে অপছন্দ করত। যখন সে একা কাঁদত। যখন জায়ান তাকে বিশ্বাস করেনি।

পরের দিন জায়ান অফিস যায় না। সে নাবিলার সাথে থাকে। তার প্রিয় খাবার আনে। কথা বলে। নাবিলা চেষ্টা করে স্বাভাবিক হতে কিন্তু পারে না। জায়ান যখন কাছে আসে, নাবিলা শরীর শক্ত করে।

এক সপ্তাহ কাটে এভাবে। জায়ান প্রতিদিন ক্ষমা চায়। নাবিলা বলে, “আমি ক্ষমা করেছি। কিন্তু ভুলতে পারছি না।”

জায়ান বলে, “সময় লাগবে। আমি অপেক্ষা করব।”

ধীরে ধীরে নাবিলা আবার কথা বলা শুরু করে। কিন্তু আগের মতো খোলামেলা নয়। তার হাসি এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। জায়ান লক্ষ করে এবং নিজেকে দোষ দেয়।

একদিন জায়ান সায়মাকে বাসায় আনতে বলে। সায়মা আসে। নাবিলার সামনে ক্ষমা চায়। বলে, “আমি ভুল করেছিলাম। আমার কারণে তোমাদের এত কষ্ট।”

নাবিলা বলে, “হয়ে গেছে। আর কথা নাই।”

সায়মা চলে যায়। জায়ান নাবিলাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, “এখন কি একটু ভালো লাগছে?”

নাবিলা মাথা নাড়ে। বলে, “একটু।”

কিন্তু রাতে যখন জায়ান ঘুমায়, নাবিলা জেগে থাকে। তার মনে সেই সব কথা ঘোরে। জায়ানের শীতল দৃষ্টি। তার কঠোর কথা। সেই সব ক্ষত এখনো কাঁচা।

মাস খানেক পর জায়ান একদিন বলে, “চলো ঘুরতে যাই। কোথাও।”

নাবিলা রাজি হয়। তারা কক্সবাজার যায়। সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে জায়ান নাবিলার হাত ধরে। বলে, “আমি প্রতিজ্ঞা করছি। আর কখনো তোমাকে কষ্ট দেব না।”

নাবিলা সমুদ্রের দিকে তাকায়। বলে, “আমি বিশ্বাস করতে চাই।”

জায়ান বলে, “সময় দেবে?”

নাবিলা বলে, “হ্যাঁ। কিন্তু জানো, আমার মনের ক্ষত সহজে যাবে না। তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে।”

জায়ান মাথা নাড়ে। বলে, “আমি ধৈর্য ধরব। কারণ আমি এখন বুঝি তোমাকে কতটা চাই।”

ফিরে এসে তাদের সংসার আগের চেয়ে ভালো হয়। জায়ান নাবিলার যত্ন নেয়। তার কথা শোনে। নাবিলাও চেষ্টা করে ভুলে যেতে। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন জায়ান কোনো কারণে চুপ থাকে, নাবিলার মনে সেই পুরোনো ভয় ফিরে আসে। সে ভাবে, আবার কি সে আমাকে অপছন্দ করতে শুরু করবে?

জায়ান বুঝতে পারে এবং আরও যত্নশীল হয়। একদিন সে নাবিলাকে বলে, “আমি জানি আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। সেই কষ্টের দাগ মুছতে পারব না হয়তো। কিন্তু আমি চেষ্টা করব প্রতিদিন তোমাকে দেখাতে যে আমি বদলে গেছি।”

নাবিলা তার হাত ধরে। বলে, “আমি দেখছি। আর আমিও চেষ্টা করছি।”

এভাবেই তাদের গল্প এগোয়। সত্য প্রকাশ পেয়েছে। জায়ান জেনেছে নাবিলা নির্দোষ ছিল। কিন্তু নাবিলার মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা সহজে যায়নি। জায়ান সেই ক্ষত সারাতে চায়। নাবিলাও সুযোগ দিতে চায়। তাদের মধ্যে এখন আর শুধু টান নয়, একটা নতুন শুরুর চেষ্টা আছে।

ঢাকার সেই ছোট ফ্ল্যাটে দুজন মানুষ এখন একসাথে হাঁটার চেষ্টা করছে। পুরোনো ভুলের ছায়া এখনো আছে কিন্তু নতুন আলোর দিকে তারা এগোচ্ছে। নাবিলা জানে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া সহজ নয়। জায়ান জানে ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়। কিন্তু তারা দুজনেই জানে যে এই সংসার এখন তাদের দুজনের। আর তারা এটাকে বাঁচাতে চায়।

রাতের বেলা যখন শহর শান্ত হয়, জায়ান নাবিলার পাশে শোয়। নাবিলা তার বুকে মাথা রাখে। জায়ান বলে, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

নাবিলা চুপ থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, “আমিও... চেষ্টা করছি ভালোবাসতে আগের মতো।”

জায়ান বোঝে। সে আর কিছু বলে না। শুধু নাবিলাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। বাইরে ঢাকার রাত। ভেতরে দুজন মানুষের নতুন যাত্রা। ক্ষত আছে, কিন্তু সাথে আছে সারানোর ইচ্ছাও। আর সেই ইচ্ছাই তাদের এগিয়ে নিয়ে যায়।

....
👁 20