খালি কারাগারে একা

ফারহান আর মিশুর পরিচয় হয়েছিল একটা সাধারণ দুপুরে, ঢাকার উত্তরায় একটা কফি শপের সামনে। দুজনেই সেদিন একই বাসে চড়েছিল। বাস ভিড়ের কারণে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছিল। ফারহান মিশুর হাতের ব্যাগটা দেখে হাসল। ব্যাগের উপর একটা ছোট্ট সবুজ ফিতা বাঁধা ছিল। মিশু তাকে তাকিয়ে দেখল। চোখে চোখ পড়তেই দুজনেই একটু বিব্রত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

কয়েকদিন পর আবার দেখা হলো। এবার উত্তরার একটা বইয়ের দোকানে। মিশু বাংলা উপন্যাস খুঁজছিল। ফারহান তার পাশে এসে দাঁড়াল। “এই লেখকের বই পড়েছেন?” সে জিজ্ঞেস করল। মিশু মাথা নাড়ল। কথা বাড়ল। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ফারহান ব্যবসায় প্রশাসন পড়ে, মিশু ইংরেজি সাহিত্য। সেদিন তারা প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলল। ফারহান মিশুর নম্বর নিল। মিশু দিল।

প্রথম কয়েক সপ্তাহ সবকিছু সহজ ছিল। ফারহান নিয়মিত ফোন করত। সকালে শুভেচ্ছা, রাতে দিনের খবর। মিশুও উত্তর দিত। তারা মাঝে মাঝে উত্তরার লেকের পাশে হাঁটত। ফারহান মিশুর কথা মন দিয়ে শুনত। মিশুর পরিবার উত্তরার বাসিন্দা। বাবা সরকারি চাকরিজীবী, মা গৃহিণী। এক ভাই আছে, ছোট। ফারহানের বাড়ি মিরপুরে। বাবা ব্যবসায়ী, মা বাড়িতেই থাকেন। দুই বোন আছে, দুজনেই বিয়ে করে অন্যত্র।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

ধীরে ধীরে ফারহানের আচরণ বদলাতে শুরু করল। প্রথমে ছোটখাটো বিষয় দিয়ে। মিশু যখন বন্ধুদের সাথে বেরোত, ফারহান জিজ্ঞেস করত কোথায় যাচ্ছে, কখন ফিরবে। মিশু বলত। ফারহান খুশি হতো। তারপর সে বলতে শুরু করল, “রাত আটটার পর বাইরে থেকো না। ঢাকায় নিরাপদ না।” মিশু রাজি হয়ে গেল। তারপর এল পোশাকের বিষয়। মিশু সাধারণত শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ পরত। একদিন ফারহান বলল, “এই রঙটা তোমার গায়ে ভালো লাগে না। হালকা রঙ পরো।” মিশু হাসল। পরের দিন হালকা রঙের জামা পরল।

ফারহান মিশুর পড়াশোনার সময়ও নজর রাখত। “রাত বারোটা বাজে পড়ছো কেন? ঘুমাও। স্বাস্থ্য খারাপ হবে।” মিশু বলত, “পরীক্ষা আসছে।” ফারহান জোর দিত। মিশু একসময় তার কথা মেনে নিত। সম্পর্কটা যেন একটা ছকের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল। ফারহান ঠিক করে দিত তারা কোথায় যাবে, কখন দেখা করবে, কী নিয়ে কথা বলবে। মিশু যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিত, ফারহান বলত, “আগে আমাকে জিজ্ঞেস করলেই পারতে।”

মিশুর বন্ধুরা লক্ষ্য করল। একদিন তার সহপাঠী রুমানা বলল, “তুমি এখন আর আগের মতো নেই। সবকিছুতেই ফারহানের অনুমতি নিচ্ছ।” মিশু চুপ করে থাকল। সে নিজেও বুঝতে পারছিল, কিন্তু ফারহানের যত্নকে ভালোবাসা বলে মনে হচ্ছিল। ফারহান তাকে নিয়মিত উপহার দিত। ছোটখাটো জিনিস। বই, চকলেট, মাঝে মাঝে ফুল। মিশু খুশি হতো।

একদিন মিশু তার মায়ের সাথে বাজারে গিয়েছিল। ফিরতে একটু দেরি হলো। ফারহান ফোন করে রেগে গেল। “কোথায় ছিলে? কেন ফোন ধরলে না?” মিশু ব্যাখ্যা দিল। ফারহান শান্ত হলো না। “আমাকে সবকিছু জানাতে হবে। আমি তোমার জন্য চিন্তা করি।” মিশু সেদিন রাতে ঘুমাতে পারল না। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন একটা খাঁচার মধ্যে আছে। কিন্তু সে ভাবল, হয়তো এটাই ভালোবাসা। মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার জন্য চিন্তা করে।

ফারহান মিশুর সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টও দেখত। কোনো পুরুষ বন্ধু কমেন্ট করলে জিজ্ঞেস করত। মিশু একসময় তার কিছু পুরনো বন্ধুর সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিল। ফারহান খুশি হলো। “এখন তুমি শুধু আমার।” মিশু হাসল, কিন্তু হাসির পেছনে একটা অস্বস্তি জমে উঠছিল।

তারা প্রায় ছয় মাস একসাথে কাটাল। ফারহান মিশুর পরিবারের সাথে দেখা করতে চাইল। মিশুর বাবা-মা রাজি হলো। ফারহান ভদ্র আচরণ করল। মিশুর মা তাকে পছন্দ করল। বাবাও বলল, “ছেলেটা ভালো।” ফারহান মিশুর কাছে এসে বলল, “দেখলে? তোমার পরিবারও আমাকে মেনে নিয়েছে। এখন আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।” মিশু মাথা নাড়ল। কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন জাগল—এই সম্পর্কে তার নিজের জায়গা কোথায়?

একদিন মিশু তার পছন্দের একটা অনুষ্ঠানে যেতে চাইল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য সভা। ফারহান বলল, “ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। সময় নষ্ট। বরং আমার সাথে কোথাও ঘুরতে যাও।” মিশু রাজি হয়ে গেল। সেদিন রাতে সে একা বসে ভাবল। তার জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো আর তার হাতে নেই। ফারহান সব ঠিক করে দিচ্ছে। ভালোবাসার নামে।

ফারহান মিশুর প্রতিদিনের রুটিন জানত। কখন উঠে, কখন পড়ে, কখন খায়। মিশু যদি কোনোদিন রুটিন ভাঙত, ফারহান জিজ্ঞেস করত। মিশু একসময় নিজে থেকেই সব জানাতে শুরু করল। যেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাতের বেলা যখন একা থাকত, তখন তার মনে হতো সে নিজেকে হারাচ্ছে।

ফারহান কখনো জোর করে কিছু করত না। সবকিছুই যত্নের আড়ালে আসত। “আমি তোমাকে রক্ষা করতে চাই।” “আমি তোমার ভালো চাই।” মিশু এগুলো শুনে চুপ করে যেত। সে ভাবত, হয়তো সে অতিরিক্ত চিন্তা করছে। সম্পর্ক মানেই কিছু ছাড় দিতে হয়। কিন্তু ছাড়টা শুধু তার দিক থেকেই যাচ্ছিল।

এক সন্ধ্যায় তারা উত্তরার একটা পার্কে বসেছিল। ফারহান মিশুর হাত ধরে বলল, “তুমি আমার সবকিছু। আমি চাই তুমি সুখে থাকো। আমার নিয়ম মেনে চললেই তুমি নিরাপদ থাকবে।” মিশু তার দিকে তাকাল। ফারহানের চোখে আন্তরিকতা ছিল। কিন্তু মিশুর মনে হলো, সে যেন একটা নিয়মের বই পড়ছে। নিজের জীবন নয়।

সেদিন বাড়ি ফিরে মিশু তার ডায়েরিতে লিখল—আমি কি সত্যিই ভালোবাসি, নাকি শুধু অভ্যস্ত হয়ে গেছি? প্রশ্নটা তার মনে ঘুরপাক খেতে লাগল। ফারহান তখনও জানত না, মিশুর ভেতরে একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে। সম্পর্কের শুরুতে যে অদ্ভুত টান ছিল, সেটা এখন একটা অদৃশ্য দেয়ালে পরিণত হচ্ছিল। মিশু তখনও দূরে সরে যায়নি। কিন্তু দূরত্বটা ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শুধু ফারহান তা দেখতে পায়নি।

মাসখানেক পর মিশুর ভেতরের অস্বস্তি আরও বাড়ল। ফারহান এখন তার পোশাক থেকে শুরু করে বন্ধুদের তালিকা পর্যন্ত সবকিছুতে মতামত দিত। মিশু একদিন তার পুরনো সহপাঠী সাদিকে মেসেজ করেছিল। শুধু পরীক্ষার নোট চাইতে। ফারহান সেটা দেখে ফোন করল। “কেন তাকে মেসেজ করলে? আমাকে বললেই পারতে।” মিশু ব্যাখ্যা দিল। ফারহান শান্ত হলো না। “পুরুষ বন্ধুদের সাথে কথা বলার দরকার নেই। আমি আছি।”

মিশু সেদিন প্রথমবার স্পষ্ট করে বলল, “আমার নিজের কিছু বন্ধু থাকতে পারে।” ফারহান অবাক হয়ে তাকাল। “তুমি কি আমার উপর বিশ্বাস রাখো না?” মিশু চুপ করে গেল। কথাটা সে আর বাড়াল না। কিন্তু সেদিন থেকে সে কিছু বিষয়ে নীরব প্রতিরোধ শুরু করল। ফারহান যখন রাতের বেলা ফোন করতে বলত, মিশু মাঝে মাঝে ফোন ধরত না। ফারহান রেগে যেত। মিশু বলত, “ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।”

ফারহানের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ল। সে মিশুর ক্লাসের সময় জানত। ক্লাস শেষ হলেই ফোন করত। মিশু যদি দেরি করত, প্রশ্ন করত। একদিন মিশু তার খালার বাড়িতে গিয়েছিল। ফিরতে দেরি হলো। ফারহান সারা সন্ধ্যা ফোন করেছিল। মিশু যখন ফোন ধরল, ফারহান বলল, “তুমি আমাকে উপেক্ষা করছ। এটা ভালোবাসা নয়।” মিশু প্রথমবার রেগে গিয়ে বলল, “ভালোবাসা মানে কি শুধু নিয়ম মানানো?”

ফারহান সেদিন চুপ করে গেল। পরের দিন সে আবার নরম হয়ে এল। উপহার দিল। মিশুকে বলল, “আমি শুধু চিন্তা করি। তুমি আমার একমাত্র।” মিশু আবার নরম হয়ে গেল। কিন্তু তার মনে গিঁট পাকিয়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, এই সম্পর্কে সে নিজের মতো করে বাঁচতে পারছে না। তার পছন্দ, তার সিদ্ধান্ত, তার সময়—সবকিছুই ফারহানের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল।

মিশুর বন্ধু রুমানা একদিন সরাসরি বলল, “তুমি এখন আর মিশু নেই। তুমি ফারহানের তৈরি একটা সংস্করণ।” কথাটা মিশুর গায়ে লাগল। সে রাতে ঘুমাতে পারল না। পরের দিন সে ফারহানকে বলল, সে কিছুদিন একা থাকতে চায়। ফারহান রাজি হলো না। “একা থাকলে তুমি ভুল সিদ্ধান্ত নেবে। আমি আছি বলেই তুমি ঠিক পথে আছ।”

মিশু তখন সিদ্ধান্ত নিল। সে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাবে। প্রথমে ফোনের উত্তর দিতে দেরি করতে লাগল। তারপর দেখা করার সময় কমিয়ে দিল। ফারহান বুঝতে পারল। সে আরও জোরালোভাবে মিশুর কাছে আসতে লাগল। প্রতিদিন উপহার, প্রতিদিন ফোন, প্রতিদিন আশ্বাস। মিশু একসময় স্পষ্ট করে বলল, “আমি এই সম্পর্কে নিজেকে হারাচ্ছি। আমাকে নিজের মতো করে বাঁচতে দাও।”

ফারহান সেদিন রেগে গিয়েছিল। “তুমি কি ভেবেছ আমি তোমাকে বন্দী করে রেখেছি? আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই এসব করি।” মিশু শান্তভাবে বলল, “ভালোবাসার নামে শর্ত তৈরি করলে সেটা আর ভালোবাসা থাকে না।” ফারহান চুপ করে গেল। মিশু উঠে চলে গেল।

পরের কয়েক সপ্তাহ মিশু ফারহানের ফোন ধরেনি। ফারহান মিশুর বাড়িতে এসেছিল। মিশুর মা তাকে দেখে অবাক হয়েছিল। মিশু বাইরে এসে বলল, “আমাদের মধ্যে আর কিছু নেই। আমাকে আমার জায়গায় ফিরে যেতে দাও।” ফারহান অনুরোধ করল। মিশু অনড় থাকল। সেদিন ফারহান চলে গেল। মিশুর চোখে জল এসেছিল, কিন্তু সে পেছনে ফিরে তাকায়নি।

মিশু তার জীবন আবার সাজাতে শুরু করল। বন্ধুদের সাথে সময় কাটাত। পড়াশোনায় মন দিত। তার পরিবার লক্ষ্য করল সে আগের মতো হাসছে। রুমানা বলল, “এখন তুমি আবার তুমি।” মিশু মাথা নাড়ল। কিন্তু রাতের বেলা মাঝে মাঝে ফারহানের কথা মনে পড়ত। সে ভাবত, সম্পর্কটা কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে, নাকি শুধু একটা বিরতি।

ফারহান এদিকে মিশুর অনুপস্থিতিতে ভেঙে পড়ছিল। সে প্রতিদিন মিশুর নম্বরে মেসেজ পাঠাত। উত্তর আসত না। সে মিশুর পুরনো জায়গাগুলোতে ঘুরত। উত্তরার লেক, বইয়ের দোকান, পার্ক। সবখানে মিশুর ছায়া দেখত। তার বন্ধুরা বলত, “ভুলে যাও।” ফারহান পারত না। সে ভাবত, মিশু ফিরে আসবে। কারণ সে তো ভালোবেসেই সব করেছিল।

একদিন ফারহান মিশুর খালার বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছিল। মিশু বেরিয়ে এসে তাকে দেখে থমকে গেল। ফারহান এগিয়ে এসে বলল, “আমাকে আরেকবার সুযোগ দাও। আমি বদলে যাব।” মিশু শান্তভাবে বলল, “তুমি বদলাবে না। তুমি শুধু নিয়ম বদলাবে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকবেই।” ফারহান কিছু বলতে পারল না। মিশু চলে গেল।

সেদিন ফারহান প্রথমবার বুঝতে শুরু করল, সে যা করেছে তা ভালোবাসা নয়। কিন্তু স্বীকার করতে চাইল না। সে আরও চেষ্টা করল। মিশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অপেক্ষা করত। মিশু তাকে এড়িয়ে চলত। ফারহানের বন্ধুরা তাকে সতর্ক করল। “এভাবে চাপ দিলে সে আরও দূরে চলে যাবে।” ফারহান শুনল না।

মিশু এদিকে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকল। সে বুঝতে পেরেছিল, সম্পর্কের মধ্যে থেকেও যদি নিজের মতো করে বাঁচা না যায়, তাহলে সে সম্পর্ক রাখার কোনো মানে নেই। সে তার ডায়েরিতে লিখল—আমি চলে এসেছি, কারণ আমি নিজেকে ফিরে পেতে চেয়েছি। ফারহান হয়তো কখনো বুঝবে না। কিন্তু আমাকে বুঝতে হবে।

ফারহান তখনও মিশুর পেছনে ছুটছিল। কিন্তু মিশু আর ফিরে তাকাচ্ছিল না। সম্পর্কটা যেন একটা অদৃশ্য দেয়ালে পরিণত হয়েছিল। একদিকে ফারহানের জেদ, অন্যদিকে মিশুর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। দুইয়ের মাঝে আর কোনো সেতু ছিল না।

মিশু চলে যাওয়ার পর তিন মাস কেটে গেল। ফারহান প্রথমবার একা সময় কাটাতে বাধ্য হলো। আগে মিশুর রুটিন জানত, এখন আর কেউ জানায় না। সকালে উঠে ফোন করে, উত্তর আসে না। সন্ধ্যায় পার্কে যায়, মিশু নেই। রাতে ঘুমাতে গিয়ে মিশুর কথা মনে পড়ে। সে বুঝতে পারছিল না, এই শূন্যতা কোথা থেকে আসছে।

ফারহানের বন্ধুরা তাকে নিয়ে বেড়াতে যেত। সে যেত, কিন্তু মন থাকত না। একদিন তার বড় বোন এসে বলল, “তুমি নিজেই তোমার সম্পর্ক নষ্ট করেছ। তুমি মিশুকে ভালোবাসোনি, তুমি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছ।” ফারহান রেগে গিয়ে বলল, “তুমি কিছু বোঝো না।” কিন্তু কথাটা তার মনে গেঁথে গেল।

সে রাতে ফারহান একা বসে ভাবতে লাগল। মিশুর সাথে কাটানো দিনগুলো এক এক করে মনে পড়ল। সে যখন মিশুর পোশাক নিয়ে মতামত দিত, মিশু চুপ করে যেত। যখন বন্ধুদের সাথে কথা বলতে নিষেধ করত, মিশুর চোখে একটা বিষণ্নতা দেখা যেত। যখন সময় ঠিক করে দিত, মিশু রাজি হয়ে যেত কিন্তু হাসত না। ফারহান তখন ভেবেছিল, এটাই যত্ন। এখন বুঝতে পারছিল, এটা ছিল নিয়ন্ত্রণ।

সে মিশুর পুরনো মেসেজগুলো পড়ল। মিশু প্রথমে খুশি থাকত। তারপর ধীরে ধীরে উত্তর ছোট হতে শুরু করে। শেষের দিকে শুধু “ঠিক আছে”, “হ্যাঁ”, “না”। ফারহান তখন লক্ষ্য করেনি। এখন সব স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। মিশু নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল, আর সে তা দেখতে পায়নি।

ফারহান একদিন উত্তরার লেকের পাশে গেল। যেখানে তারা প্রথম হাঁটত। সেখানে বসে সে নিজের কাছে স্বীকার করল—সে মিশুকে ভালোবাসার নামে একটা কারাগার তৈরি করেছিল। নিয়ম, শর্ত, অনুমতি—এগুলো দিয়ে সে মিশুর জীবনকে ঘিরে ফেলেছিল। মিশু সেই কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছে। আর সে এখন একা সেই খালি কারাগারে বসে আছে।

সে মিশুকে আর ফোন করেনি। মেসেজও পাঠায়নি। বরং নিজের জীবনটা সাজাতে শুরু করল। পড়াশোনায় মন দিল। বন্ধুদের সাথে সময় কাটাল। কিন্তু মিশুর অনুপস্থিতি তাকে ছাড়ত না। একদিন তার মা বলল, “তুমি বদলে গেছ। আগে এত চিন্তা করতে দেখিনি।” ফারহান হাসল। সে বলল, “আমি কিছু শিখেছি।”

মাসখানেক পর ফারহান একদিন মিশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে গিয়েছিল। দূর থেকে মিশুকে দেখল। মিশু বন্ধুদের সাথে হাসছিল। আগের মতো বিষণ্ন নয়। ফারহান সেখান থেকে চলে এল। সে বুঝতে পারল, মিশু এখন সুখে আছে। কারণ সে নিজের মতো করে বাঁচছে।

ফারহান সেদিন তার ডায়েরিতে লিখল—ভালোবাসার নামে যদি শর্ত তৈরি করা হয়, তাহলে সে সম্পর্ক আর ভালোবাসা থাকে না। সে হয়ে ওঠে একটা কারাগার। মিশু সেই কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছে। আর আমি এখন বুঝতে পেরেছি, সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে মুক্ত করে, বাঁধে না।

সময় গড়িয়ে চলল। ফারহান আর মিশুর দেখা হয়নি। কিন্তু ফারহানের ভেতরে একটা পরিবর্তন এসেছিল। সে এখন অন্যদের সাথে কথা বলার সময় সাবধান হতো। কারও উপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিত না। তার বন্ধুরা লক্ষ্য করল সে আগের মতো জেদি নয়।

একদিন ফারহান তার ছোট বোনকে বলল, “যদি কখনো কাউকে ভালোবাসো, তাকে তার মতো করে বাঁচতে দিও। নিয়ম দিয়ে বাঁধবে না।” বোন অবাক হয়ে তাকাল। ফারহান হাসল। সে জানত, এই উপলব্ধি মিশুকে হারানোর মূল্যে এসেছে।

মিশু এদিকে তার জীবন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। পড়াশোনা শেষ করে চাকরির খোঁজ করছিল। তার পরিবার খুশি। রুমানা একদিন জিজ্ঞেস করল, “ফারহানের কথা মনে পড়ে?” মিশু চুপ করে থাকল একটু। তারপর বলল, “মনে পড়ে। কিন্তু আমি ফিরে যেতে চাই না। আমি এখন নিজেকে পেয়েছি।”

ফারহান আর মিশু দুজনেই তাদের নিজের পথে হাঁটছিল। সম্পর্কটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই সম্পর্ক থেকে ফারহান একটা শিক্ষা নিয়েছিল। ভালোবাসা মানে মালিকানা নয়। ভালোবাসা মানে মুক্তি দেওয়া। যে সম্পর্কে শর্ত থাকে, সে সম্পর্ক একদিন ভেঙে যায়। আর যখন ভাঙে, তখনই মানুষ বুঝতে পারে—কারাগার কখনো ঘর হয়ে ওঠে না।

ফারহান এখন মাঝে মাঝে উত্তরার সেই পার্কে যায়। একা বসে থাকে। মিশুর কথা মনে পড়ে। কিন্তু আর অনুশোচনায় ভোগে না। সে জানে, মিশু ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর সেও এখন ঠিক পথে আছে। সম্পর্কের নামে কেউ কাউকে বাঁধতে পারে না। বাঁধলে সেটা ভালোবাসা থাকে না। থাকে শুধু একটা অদৃশ্য কারাগার। আর সেই কারাগার থেকে বেরোতে পারলেই মানুষ আবার নিজেকে ফিরে পায়।

....
👁 21