আদনান আর মায়া পাঁচ বছরের সম্পর্কে। ঢাকার মিরপুরে একটা ছোট ফ্ল্যাটে তারা থাকে। আদনানের চাকরি বেসরকারি একটা প্রতিষ্ঠানে, মায়া ঘরে বসে অনলাইন টিউশন দেয়। সকালে উঠে চা বানায় মায়া, আদনান খবরের কাগজ পড়ে। সন্ধ্যায় একসঙ্গে সিরিয়াল দেখে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সব ঠিকঠাক। কিন্তু ভিতরে একটা জিনিস লুকিয়ে থাকে—আদনানের রাগ।
রাগ হলে আদনান কথা বলে না। একেবারেই না। ফোনও ধরে না, চোখেও তাকায় না। ঘরে ঢুকে সোজা ঘুমানোর ঘরে চলে যায়। দরজা বন্ধ করে দেয়। মায়া প্রথমে ভাবত এটা তার স্বভাব। ছোটবেলা থেকেই সে এমন। বাবা-মায়ের বাড়িতেও রাগ হলে ঘরে বসে থাকত। মায়া মেনে নিয়েছিল। ভেবেছিল সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে।
সেদিন সকালে ছোট একটা ঘটনা ঘটল। আদনানের অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটা ফাইল মায়া ভুল করে টেবিলের উপর রাখা কাগজের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছিল। আদনান খুঁজে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল। মায়া বলল, “আমি তো দেখিনি।” কিন্তু পরে খুঁজে বের করে দিল। আদনান কিছু বলল না। শুধু চোখ তুলে তাকাল একবার। তারপর চায়ের কাপ রেখে উঠে গেল ঘরে। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
মায়া ভেবেছিল দুই-এক ঘণ্টা পরে বের হবে। কিন্তু দুপুর গেল, বিকেল গেল। সন্ধ্যায় মায়া দরজায় কড়া নাড়ল। ভিতর থেকে কোনো সাড়া নেই। রাত আটটায় আবার নাড়ল। তখন দরজা খুলল। আদনান বেরিয়ে এসে রান্নাঘরে গিয়ে পানি খেল। মায়া জিজ্ঞেস করল, “খেয়েছ?” আদনান কোনো উত্তর দিল না। প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। মায়া বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
রাত জোরে ঘুম এল না মায়ার। সে ভাবল, হয়তো কাল সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কাল সকালেও একই অবস্থা। আদনান উঠে নাস্তা করল নিজে নিজে। মায়াকে এড়িয়ে চলল। অফিসে যাওয়ার সময় দরজা বন্ধ করে চলে গেল কোনো কথা না বলে।
মায়া সেদিন অনেকক্ষণ চেয়ারে বসে রইল। মনে মনে বলল, “এটা তো ছোট ভুল। ফাইল তো পেয়ে গেছে।” কিন্তু আদনানের নীরবতা চলতে থাকল। দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় দিন। ঘরে দুজন মানুষ থাকলেও কথা নেই। টেবিলে দুইটা প্লেট। একটায় মায়া খায়, আরেকটায় আদনান। চোখাচোখি হয় না।
মায়া প্রথমে নিজেকে দোষ দিতে লাগল। ভাবল হয়তো সে আরও সাবধান হতে পারত। কিন্তু ধীরে ধীরে অন্য কথা মাথায় আসতে লাগল। এই নীরবতা কি শুধু রাগ? নাকি শাস্তি? আদনান জানে মায়া কথা বলতে চায়। জানে মায়া অস্বস্তিতে আছে। তবুও সে চুপ। এটা কি ইচ্ছা করে করা?
চতুর্থ দিন সন্ধ্যায় মায়া চেষ্টা করল। আদনান ঘরে ঢোকার পর বলল, “আদনান, একটু কথা বলো। আমি জানি ভুল হয়েছে। কিন্তু এভাবে কতদিন?” আদনান তাকাল না। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। মায়া দাঁড়িয়ে রইল করিডোরে। বুকের ভিতরটা খালি খালি লাগল।
রাত্রে মায়া নিজের ফোন নিয়ে বারান্দায় বসল। নিচে রাস্তায় গাড়ি চলছে। দূরে মসজিদের আজান ভেসে আসছে। সে ভাবল তার জীবনের সব সম্পর্ক। ছোটবেলায় ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া হলেও পরদিন কথা হত। বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্য হলেও কেউ এভাবে দিনের পর দিন চুপ থাকত না। শুধু আদনান। আর এই চুপ থাকাটা এখন শাস্তির মতো মনে হচ্ছে।
পঞ্চম দিন সকালে মায়া সিদ্ধান্ত নিল কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাবে। প্রতিবেশী রুমানার বাড়িতে গেল। রুমানা চা দিল। মায়া সব বলল না, শুধু বলল বাড়িতে একটু সমস্যা। রুমানা বলল, “কথা বলে মিটিয়ে নাও।” মায়া হাসল। কিন্তু ভিতরে জানত কথা বলার সুযোগই নেই। আদনান দিচ্ছে না।
বাড়ি ফিরে দেখল আদনান অফিস থেকে ফিরেছে। টেবিলে বসে ল্যাপটপ খুলেছে। মায়া রান্না করল। খেতে ডাকল না। আদনান নিজে এসে নিল। কোনো নজর বিনিময় হল না। মায়া রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবল, এই নীরবতা যদি আরও কয়েকদিন চলে তাহলে কী হবে? সে কি এভাবেই থাকবে? নাকি একদিন হঠাৎ সব ঠিক হয়ে যাবে আদনানের ইচ্ছায়?
সে রাতে মায়া প্রথমবার ভাবল অন্য কথা। সে কি সবসময় অপেক্ষা করবে? আদনানের রাগের সময়সীমা কি তার নির্ধারণ করবে? ছোট একটা ভুলের জন্য এত বড় শাস্তি। আর এই শাস্তি চলতে থাকলে সম্পর্কের ভিতরটা কি ধীরে ধীরে ফাঁপা হয়ে যাবে না?
ষষ্ঠ দিন মায়া সকালে উঠে চা বানাল না। নিজে নাস্তা করে অনলাইন ক্লাস নিল। আদনান বেরোনোর সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার তাকাল। মায়া তাকাল না। আদনান চলে গেল। মায়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল, “আমিও পারি।”
সেদিন দুপুরে মায়া তার বোনের সঙ্গে কথা বলল ফোনে। বোন বলল, “তুমি এত সহ্য করো কেন?” মায়া উত্তর দিল না। কিন্তু প্রশ্নটা মাথায় ঘুরতে থাকল। সহ্য করা আর মেনে নেওয়া কি একই জিনিস? সে কি মেনে নিচ্ছে নাকি ভয় পাচ্ছে একা হয়ে যাওয়ার?
সন্ধ্যায় আদনান ফিরল। মায়া রান্না করে টেবিলে রাখল। নিজে আলাদা ঘরে গিয়ে খেল। আদনান প্রথমবার কিছুক্ষণ থেমে গেল। তারপর নিজে খেয়ে নিল। মায়া লক্ষ করল আদনানের মুখটা একটু অন্যরকম। কিন্তু কথা বলল না কেউ।
রাত জোরে মায়া ঘুমাতে গেল আলাদা বিছানায়। আগে কখনো এমন করেনি। আদনান তার ঘরে। মায়া অন্য ঘরে। দরজা খোলা রেখেছিল দুজনেই, কিন্তু কেউ অন্যের কাছে যায়নি। মায়া চোখ বন্ধ করে ভাবল, এই দূরত্ব কি শুধু রাগের? নাকি এখন এটা অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে আদনানের জন্য?
সপ্তম দিন সকালে মায়া সিদ্ধান্ত নিল। সে আর অপেক্ষা করবে না। ছোট ভুলকে কেন্দ্র করে এই নীরবতা যদি আদনানের শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে থাকে, তাহলে সে এই শাস্তি আর নেবে না। সে প্রথমবার নিজের জীবনে আদনানকে ছাড়া এগোনোর কথা ভাবল। ভয় পেল। কিন্তু ভয়ের চেয়ে বেশি লাগল এই অসহায়ত্ব।
মায়া সেদিন বাজার করতে গেল। বাড়ি ফিরে দেখল আদনান আগেভাগে ফিরেছে। ল্যাপটপ বন্ধ করে বসে আছে। মায়া কোনো কথা বলল না। জিনিসপত্র সাজাতে লাগল। আদনান উঠে এসে কাছে এল। মুখ খুলল না। মায়াও তাকাল না। আদনান আবার চলে গেল ঘরে।
মায়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ভাবল, সে কি সত্যিই পারবে? পাঁচ বছরের সম্পর্ক। কত স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতির চেয়ে বড় হয়ে উঠছে এই নীরবতার বোঝা। সে জানে আদনান খারাপ মানুষ নয়। কিন্তু এই অভ্যাসটা খারাপ। আর এই অভ্যাস যদি না ছাড়ে, তাহলে সম্পর্ক টিকবে কীভাবে?
রাতে মায়া তার সিদ্ধান্তটা আরও পরিষ্কার করল মনে মনে। সে কাল সকালে কথা বলবে না। অপেক্ষা করবে না। নিজের কাজ করবে। যদি আদনান কথা বলে, ভালো। না বললেও সে থামবে না। প্রথমবার জীবনে সে একা এগোনোর পথ দেখতে চাইল।
ঘুমানোর আগে মায়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। শহরের আলো জ্বলছে। দূরে গাড়ির শব্দ। কোনো বৃষ্টি নেই, আকাশ পরিষ্কার। মায়া মনে মনে বলল, “আমি থাকব। কিন্তু আর শাস্তি নেব না।”
আদনান অন্য ঘরে শুয়েছিল। চোখ বন্ধ করেও ঘুম আসছিল না। সে জানত মায়া কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু রাগটা এখনও যায়নি। ছোট ভুল হলেও সে মেনে নিতে পারেনি। আর নীরবতা তার একমাত্র অস্ত্র। সে ভাবল কাল হয়তো কথা বলবে। কিন্তু আজকের মতো আরও একদিন চুপ থাকবে। সে জানত না মায়ার মনে কী পরিবর্তন আসছে।
এভাবেই সপ্তম দিন শেষ হল। ঘরে দুজন মানুষ। দুজনেরই মনে অনেক কথা। কিন্তু কথা বেরোচ্ছে না। মায়া প্রথমবার অনুভব করল এই নীরবতা আর তার মেনে নেওয়ার জিনিস নয়। এটা শাস্তি। আর শাস্তি সে আর নেবে না।
অষ্টম দিন সকালে মায়া উঠল আগে। চা বানাল না আদনানের জন্য। নিজে খেয়ে নিল। ল্যাপটপ খুলে ক্লাস শুরু করল। আদনান ঘর থেকে বেরিয়ে এল। চায়ের কেটলি দেখে থেমে গেল। মায়া তাকাল না। আদনান নিজে চা বানিয়ে নিল। কোনো কথা হল না।
অফিসে যাওয়ার সময় আদনান দরজার কাছে দাঁড়াল একটু। মায়া কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখেছিল। আদনান চলে গেল। মায়া তখন জানালা দিয়ে দেখল তাকে। গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে। মনে হল দূরত্বটা এখন শুধু ঘরের ভিতরে নয়, বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে।
সেদিন মায়া অনেক কাজ করল। ছাত্রদের ক্লাস শেষ করে ঘর পরিষ্কার করল। কাপড় কাচল। রান্না করল নিজের জন্য। আদনানের জন্য আলাদা করে কিছু রাখল না। আগে সবসময় তার পছন্দের খাবার বানাত। আজ বানাল না। টেবিলে একটা প্লেট। নিজের।
বিকেলের দিকে রুমানা এল। মায়া দরজা খুলে বলল, “আসো।” রুমানা চা চাইল। মায়া বানাল। রুমানা জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু গন্ডগোল।” মায়া একটু চুপ থেকে বলল, “আদনান কথা বলে না কয়েকদিন ধরে।” রুমানা অবাক হয়ে বলল, “কেন?” মায়া ছোট ঘটনাটা বলল। রুমানা বলল, “এত ছোট জিনিস নিয়ে?” মায়া মাথা নাড়ল। “আর এখন আমিও কথা বলছি না।”
রুমানা বলল, “তুমি ঠিক করছ। কেউ যদি শাস্তি দেয়, তুমি কেন নেবে?” মায়া চুপ করে রইল। রুমানা চলে যাওয়ার পর মায়া আবার একা হল। মনে মনে বলল, “হ্যাঁ, আমি নেব না।”
সন্ধ্যায় আদনান ফিরল। টেবিলে দেখল একটা প্লেট। তার জন্য কিছু নেই। সে রান্নাঘরে গিয়ে দেখল ফ্রিজে কিছু আছে। নিজে গরম করে খেল। মায়া অন্য ঘরে বসেছিল। আদনান খেয়ে শেষ করে একবার মায়ার ঘরের দিকে তাকাল। দরজা আধখোলা। মায়া বই পড়ছিল। আদনান কিছু বলল না। চলে গেল নিজের ঘরে।
মায়া বইয়ের পৃষ্ঠায় চোখ রেখেও পড়তে পারছিল না। মনে হচ্ছিল সে প্রথমবার কিছু একটা করছে। আগে সবসময় সেই প্রথমে ভাঙত নীরবতা। আজ সে ভাঙছে না। এটা কি ঠিক? নাকি সম্পর্ক আরও খারাপ হবে? কিন্তু তারপর ভাবল, সম্পর্ক যদি শুধু একজনের নীরবতায় টিকে থাকে, তাহলে সে সম্পর্ক কি আদৌ সম্পর্ক?
নবম দিন মায়া বাইরে গেল। কয়েকজন ছাত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। ফিরে এসে দেখল আদনান বাড়িতে। ল্যাপটপ খোলা। মায়া তাকে উপেক্ষা করে নিজের কাজে লাগল। আদনান উঠে এসে কাছে দাঁড়াল। মায়া তাকাল না। আদনান ফিরে গেল।
সেদিন রাতে মায়া প্রথমবার ঘুমাতে গেল আগে। আদনান পরে এল তার ঘরে। দরজায় দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। মায়া ঘুমের ভান করল। আদনান চলে গেল। মায়া চোখ খুলে তাকাল সিলিংয়ের দিকে। মনে হল বুকটা একটু হালকা। শাস্তি নেওয়ার বোঝাটা কমছে।
দশম দিন সকালে আদনান প্রথমবার মুখ খুলল। “চা আছে?” মায়া উত্তর দিল না। নিজে চা বানিয়ে নিয়ে গেল অন্য ঘরে। আদনান কেটলির কাছে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজে বানিয়ে নিল। অফিসে যাওয়ার আগে একবার বলল, “কথা বলো।” মায়া তাকাল। চোখে চোখ পড়ল। মায়া বলল, “তুমি যখন রাগ করে চুপ থাকো, তখন আমি কথা বলব কেন?” আদনান কিছু বলল না। চলে গেল।
মায়া সেদিন অনেকক্ষণ চেয়ারে বসে রইল। প্রথমবার সে জবাব দিয়েছে। ভয় পেয়েছিল। কিন্তু বলেছে। মনে হল সে আর আগের মায়া নেই। যে মায়া সবসময় অপেক্ষা করত, সে মায়া পাল্টে যাচ্ছে।
দুপুরে মায়া তার মায়ের সঙ্গে কথা বলল ফোনে। মাকে সব বলল না। শুধু বলল বাড়িতে একটু সমস্যা। মা বলল, “ধৈর্য ধরো।” মায়া বলল, “ধৈর্যেরও একটা সীমা আছে মা।” কথা শেষ করে ফোন রাখল। মনে হল মায়ের কথা আর তার মনের কথা মিলছে না।
বিকেলে মায়া হাঁটতে গেল পাশের পার্কে। গাছের নিচে বসল। চারপাশে শিশুরা খেলছে। দম্পতি হাঁটছে। মায়া ভাবল, সম্পর্ক মানে কি শুধু একসঙ্গে থাকা? নাকি একে অপরকে বোঝা? আদনান তাকে বোঝে না। রাগ হলে শাস্তি দেয় নীরবতা দিয়ে। আর সে শাস্তি নেয়। এতদিন নিয়েছে। আজ আর না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখল আদনান রান্না করছে। প্রথমবার। মায়া অবাক হল। কিন্তু কাছে গেল না। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। আদনান দরজায় এসে কড়া নাড়ল। মায়া খুলল না। আদনান বলল, “খেয়ে নাও।” মায়া উত্তর দিল না। আদনান চলে গেল।
রাতে মায়া খেল না। ক্ষুধাও পেল না। বিছানায় শুয়ে ভাবল আদনান হয়তো বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু বোঝা আর পরিবর্তন এক নয়। সে যদি আবার রাগ করে একই কাজ করে, তাহলে? মায়া সিদ্ধান্ত নিল, সে আর ফিরে যাবে না পুরনো জায়গায়। যেখানে সে অপেক্ষা করে, শাস্তি নেয়, নিজেকে ছোট করে।
একাদশ দিন মায়া সকালে উঠে বেরিয়ে গেল। সারাদিন বাইরে কাটাল। একটা কফির দোকানে বসে কাজ করল। ফোনে আদনানের কল এল দুবার। ধরল না। মেসেজ এল, “বাড়িতে কখন আসবে?” উত্তর দিল না। সন্ধ্যায় ফিরে এল। আদনান দরজায় দাঁড়িয়েছিল। মায়া তাকে এড়িয়ে ভিতরে ঢুকল।
আদনান বলল, “মায়া, কথা বলো।” মায়া থেমে গেল। পিছন ফিরে তাকাল। বলল, “তুমি যখন চেয়েছিলে তখন আমি বলেছি। এখন আমার পালা।” আদনান চুপ করে গেল। মায়া ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
সে রাতে আদনান প্রথমবার অনুভব করল দূরত্বটা। আগে সে নিজে তৈরি করত নীরবতা। এখন মায়া তৈরি করছে। আর এটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। সে ঘরে বসে ভাবল ছোট ভুলটা। ফাইলের ব্যাপার। এত বড় করে তোলার দরকার ছিল কি? কিন্তু রাগটা তখন নিয়ন্ত্রণে ছিল না। আর নীরবতা তার অভ্যাস।
মায়া অন্য ঘরে শুয়েছিল। চোখে ঘুম আসছিল না। মনে হচ্ছিল সে একটা দেয়াল তুলেছে। দেয়ালটা প্রয়োজন ছিল। কারণ আগের দেয়ালটা আদনান তুলেছিল, আর সেই দেয়ালের আড়ালে সে কষ্ট পেত। এখন তার নিজের দেয়াল। ভিতরে সে নিরাপদ।
দ্বাদশ দিন সকালে আদনান অফিসে গেল না। বাড়িতেই রইল। মায়া দেখেও কিছু বলল না। নিজের কাজ সারল। দুপুরে আদনান এসে বলল, “আমরা কথা বলি।” মায়া বলল, “বলো।” আদনান বলল, “আমি রাগ করেছিলাম। কিন্তু এখন আর না।” মায়া তাকাল। বলল, “তুমি রাগ করলে চুপ থাকো। এটা তোমার অভ্যাস। আর আমি এতদিন মেনে নিয়েছি। এখন আর পারছি না।”
আদনান বলল, “আমি বদলাব।” মায়া মাথা নাড়ল। “কথায় নয়। কাজে। আর আমি এখন নিজের জন্য জায়গা করে নিচ্ছি। তুমি যদি থাকতে চাও, থাকো। কিন্তু শাস্তি দিয়ে নয়।” আদনান চুপ করে গেল। মায়া উঠে চলে গেল।
সেদিন বিকেলে মায়া আবার বাইরে গেল। রুমানার সঙ্গে দেখা করল। রুমানা বলল, “তুমি শক্ত হচ্ছ।” মায়া বলল, “প্রয়োজন ছিল।” ফিরে এসে দেখল আদনান রান্না করে রেখেছে। টেবিলে দুইটা প্লেট। মায়া একটা নিয়ে নিজের ঘরে গেল। আদনান একা খেল।
রাতে মায়া ভাবল, সে কি অতিরিক্ত করছে? নাকি ঠিক করছে? পাঁচ বছরের সম্পর্ক সহজে ভাঙে না। কিন্তু সহজেও টেকে না যদি একজন অন্যজনকে শাস্তি দেয়। সে সিদ্ধান্তে অটল থাকল। আদনানকে ছাড়া এগোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। মানসিকভাবে। যদি প্রয়োজন হয় বাস্তবেও।
আদনান সে রাতে ঘুমাতে পারেনি। ছাদে উঠে বসল। শহরের আলো দেখল। কোনো বৃষ্টি নেই। আকাশ পরিষ্কার। সে ভাবল মায়ার কথা। শাস্তি। হ্যাঁ, সে শাস্তি দিয়েছিল। জানত মায়া কষ্ট পাবে। তবুও দিয়েছিল। কারণ রাগের সময় সে অন্য কিছু ভাবতে পারে না। এখন মায়াও একই কাজ করছে। আর এটা তার সহ্য হচ্ছে না।
সে বুঝতে শুরু করল দূরত্বটা। যে দূরত্ব সে তৈরি করেছিল, এখন সেটা আরও বড় হচ্ছে মায়ার ইচ্ছায়। আর এই দূরত্ব সহজে কমবে বলে মনে হচ্ছে না।
অষ্টম দিন সকালে মায়া উঠল আগে। চা বানাল না আদনানের জন্য। নিজে খেয়ে নিল। ল্যাপটপ খুলে ক্লাস শুরু করল। আদনান ঘর থেকে বেরিয়ে এল। চায়ের কেটলি দেখে থেমে গেল। মায়া তাকাল না। আদনান নিজে চা বানিয়ে নিল। কোনো কথা হল না।
অফিসে যাওয়ার সময় আদনান দরজার কাছে দাঁড়াল একটু। মায়া কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখেছিল। আদনান চলে গেল। মায়া তখন জানালা দিয়ে দেখল তাকে। গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে। মনে হল দূরত্বটা এখন শুধু ঘরের ভিতরে নয়, বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে।
সেদিন মায়া অনেক কাজ করল। ছাত্রদের ক্লাস শেষ করে ঘর পরিষ্কার করল। কাপড় কাচল। রান্না করল নিজের জন্য। আদনানের জন্য আলাদা করে কিছু রাখল না। আগে সবসময় তার পছন্দের খাবার বানাত। আজ বানাল না। টেবিলে একটা প্লেট। নিজের।
বিকেলের দিকে রুমানা এল। মায়া দরজা খুলে বলল, “আসো।” রুমানা চা চাইল। মায়া বানাল। রুমানা জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু গন্ডগোল।” মায়া একটু চুপ থেকে বলল, “আদনান কথা বলে না কয়েকদিন ধরে।” রুমানা অবাক হয়ে বলল, “কেন?” মায়া ছোট ঘটনাটা বলল। রুমানা বলল, “এত ছোট জিনিস নিয়ে?” মায়া মাথা নাড়ল। “আর এখন আমিও কথা বলছি না।”
রুমানা বলল, “তুমি ঠিক করছ। কেউ যদি শাস্তি দেয়, তুমি কেন নেবে?” মায়া চুপ করে রইল। রুমানা চলে যাওয়ার পর মায়া আবার একা হল। মনে মনে বলল, “হ্যাঁ, আমি নেব না।”
সন্ধ্যায় আদনান ফিরল। টেবিলে দেখল একটা প্লেট। তার জন্য কিছু নেই। সে রান্নাঘরে গিয়ে দেখল ফ্রিজে কিছু আছে। নিজে গরম করে খেল। মায়া অন্য ঘরে বসেছিল। আদনান খেয়ে শেষ করে একবার মায়ার ঘরের দিকে তাকাল। দরজা আধখোলা। মায়া বই পড়ছিল। আদনান কিছু বলল না। চলে গেল নিজের ঘরে।
মায়া বইয়ের পৃষ্ঠায় চোখ রেখেও পড়তে পারছিল না। মনে হচ্ছিল সে প্রথমবার কিছু একটা করছে। আগে সবসময় সেই প্রথমে ভাঙত নীরবতা। আজ সে ভাঙছে না। এটা কি ঠিক? নাকি সম্পর্ক আরও খারাপ হবে? কিন্তু তারপর ভাবল, সম্পর্ক যদি শুধু একজনের নীরবতায় টিকে থাকে, তাহলে সে সম্পর্ক কি আদৌ সম্পর্ক?
নবম দিন মায়া বাইরে গেল। কয়েকজন ছাত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। ফিরে এসে দেখল আদনান বাড়িতে। ল্যাপটপ খোলা। মায়া তাকে উপেক্ষা করে নিজের কাজে লাগল। আদনান উঠে এসে কাছে দাঁড়াল। মায়া তাকাল না। আদনান ফিরে গেল।
সেদিন রাতে মায়া প্রথমবার ঘুমাতে গেল আগে। আদনান পরে এল তার ঘরে। দরজায় দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। মায়া ঘুমের ভান করল। আদনান চলে গেল। মায়া চোখ খুলে তাকাল সিলিংয়ের দিকে। মনে হল বুকটা একটু হালকা। শাস্তি নেওয়ার বোঝাটা কমছে।
দশম দিন সকালে আদনান প্রথমবার মুখ খুলল। “চা আছে?” মায়া উত্তর দিল না। নিজে চা বানিয়ে নিয়ে গেল অন্য ঘরে। আদনান কেটলির কাছে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজে বানিয়ে নিল। অফিসে যাওয়ার আগে একবার বলল, “কথা বলো।” মায়া তাকাল। চোখে চোখ পড়ল। মায়া বলল, “তুমি যখন রাগ করে চুপ থাকো, তখন আমি কথা বলব কেন?” আদনান কিছু বলল না। চলে গেল।
মায়া সেদিন অনেকক্ষণ চেয়ারে বসে রইল। প্রথমবার সে জবাব দিয়েছে। ভয় পেয়েছিল। কিন্তু বলেছে। মনে হল সে আর আগের মায়া নেই। যে মায়া সবসময় অপেক্ষা করত, সে মায়া পাল্টে যাচ্ছে।
দুপুরে মায়া তার মায়ের সঙ্গে কথা বলল ফোনে। মাকে সব বলল না। শুধু বলল বাড়িতে একটু সমস্যা। মা বলল, “ধৈর্য ধরো।” মায়া বলল, “ধৈর্যেরও একটা সীমা আছে মা।” কথা শেষ করে ফোন রাখল। মনে হল মায়ের কথা আর তার মনের কথা মিলছে না।
বিকেলে মায়া হাঁটতে গেল পাশের পার্কে। গাছের নিচে বসল। চারপাশে শিশুরা খেলছে। দম্পতি হাঁটছে। মায়া ভাবল, সম্পর্ক মানে কি শুধু একসঙ্গে থাকা? নাকি একে অপরকে বোঝা? আদনান তাকে বোঝে না। রাগ হলে শাস্তি দেয় নীরবতা দিয়ে। আর সে শাস্তি নেয়। এতদিন নিয়েছে। আজ আর না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখল আদনান রান্না করছে। প্রথমবার। মায়া অবাক হল। কিন্তু কাছে গেল না। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। আদনান দরজায় এসে কড়া নাড়ল। মায়া খুলল না। আদনান বলল, “খেয়ে নাও।” মায়া উত্তর দিল না। আদনান চলে গেল।
রাতে মায়া খেল না। ক্ষুধাও পেল না। বিছানায় শুয়ে ভাবল আদনান হয়তো বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু বোঝা আর পরিবর্তন এক নয়। সে যদি আবার রাগ করে একই কাজ করে, তাহলে? মায়া সিদ্ধান্ত নিল, সে আর ফিরে যাবে না পুরনো জায়গায়। যেখানে সে অপেক্ষা করে, শাস্তি নেয়, নিজেকে ছোট করে।
একাদশ দিন মায়া সকালে উঠে বেরিয়ে গেল। সারাদিন বাইরে কাটাল। একটা কফির দোকানে বসে কাজ করল। ফোনে আদনানের কল এল দুবার। ধরল না। মেসেজ এল, “বাড়িতে কখন আসবে?” উত্তর দিল না। সন্ধ্যায় ফিরে এল। আদনান দরজায় দাঁড়িয়েছিল। মায়া তাকে এড়িয়ে ভিতরে ঢুকল।
আদনান বলল, “মায়া, কথা বলো।” মায়া থেমে গেল। পিছন ফিরে তাকাল। বলল, “তুমি যখন চেয়েছিলে তখন আমি বলেছি। এখন আমার পালা।” আদনান চুপ করে গেল। মায়া ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
সে রাতে আদনান প্রথমবার অনুভব করল দূরত্বটা। আগে সে নিজে তৈরি করত নীরবতা। এখন মায়া তৈরি করছে। আর এটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। সে ঘরে বসে ভাবল ছোট ভুলটা। ফাইলের ব্যাপার। এত বড় করে তোলার দরকার ছিল কি? কিন্তু রাগটা তখন নিয়ন্ত্রণে ছিল না। আর নীরবতা তার অভ্যাস।
মায়া অন্য ঘরে শুয়েছিল। চোখে ঘুম আসছিল না। মনে হচ্ছিল সে একটা দেয়াল তুলেছে। দেয়ালটা প্রয়োজন ছিল। কারণ আগের দেয়ালটা আদনান তুলেছিল, আর সেই দেয়ালের আড়ালে সে কষ্ট পেত। এখন তার নিজের দেয়াল। ভিতরে সে নিরাপদ।
দ্বাদশ দিন সকালে আদনান অফিসে গেল না। বাড়িতেই রইল। মায়া দেখেও কিছু বলল না। নিজের কাজ সারল। দুপুরে আদনান এসে বলল, “আমরা কথা বলি।” মায়া বলল, “বলো।” আদনান বলল, “আমি রাগ করেছিলাম। কিন্তু এখন আর না।” মায়া তাকাল। বলল, “তুমি রাগ করলে চুপ থাকো। এটা তোমার অভ্যাস। আর আমি এতদিন মেনে নিয়েছি। এখন আর পারছি না।”
আদনান বলল, “আমি বদলাব।” মায়া মাথা নাড়ল। “কথায় নয়। কাজে। আর আমি এখন নিজের জন্য জায়গা করে নিচ্ছি। তুমি যদি থাকতে চাও, থাকো। কিন্তু শাস্তি দিয়ে নয়।” আদনান চুপ করে গেল। মায়া উঠে চলে গেল।
সেদিন বিকেলে মায়া আবার বাইরে গেল। রুমানার সঙ্গে দেখা করল। রুমানা বলল, “তুমি শক্ত হচ্ছ।” মায়া বলল, “প্রয়োজন ছিল।” ফিরে এসে দেখল আদনান রান্না করে রেখেছে। টেবিলে দুইটা প্লেট। মায়া একটা নিয়ে নিজের ঘরে গেল। আদনান একা খেল।
রাতে মায়া ভাবল, সে কি অতিরিক্ত করছে? নাকি ঠিক করছে? পাঁচ বছরের সম্পর্ক সহজে ভাঙে না। কিন্তু সহজেও টেকে না যদি একজন অন্যজনকে শাস্তি দেয়। সে সিদ্ধান্তে অটল থাকল। আদনানকে ছাড়া এগোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। মানসিকভাবে। যদি প্রয়োজন হয় বাস্তবেও।
আদনান সে রাতে ঘুমাতে পারেনি। ছাদে উঠে বসল। শহরের আলো দেখল। কোনো বৃষ্টি নেই। আকাশ পরিষ্কার। সে ভাবল মায়ার কথা। শাস্তি। হ্যাঁ, সে শাস্তি দিয়েছিল। জানত মায়া কষ্ট পাবে। তবুও দিয়েছিল। কারণ রাগের সময় সে অন্য কিছু ভাবতে পারে না। এখন মায়াও একই কাজ করছে। আর এটা তার সহ্য হচ্ছে না।
সে বুঝতে শুরু করল দূরত্বটা। যে দূরত্ব সে তৈরি করেছিল, এখন সেটা আরও বড় হচ্ছে মায়ার ইচ্ছায়। আর এই দূরত্ব সহজে কমবে বলে মনে হচ্ছে না।
....