বিশ্বাসহীনতার চরম পরিণতি

বিকেলের সোনাঝরা রোদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের বারান্দাটা সবসময়ই একটু অন্যরকম লাগতো। চারদিকে ছাত্রছাত্রীদের কোলাহল, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ আর আড্ডার রেশ। কিন্তু এই কোলাহলের মাঝখানেও রিদওয়ান আর নীরার দুনিয়াটা যেন একদম আলাদা। দুজনে ক্যাম্পাসের একটি পরিচিত বেঞ্চে পাশাপাশি বসে আছে। রিদওয়ানের দৃষ্টি স্থির নীরার মুখের ওপর, আর নীরা আনমনে তার নোটবুকের পাতায় আঙুল বোলাচ্ছে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

তাদের এই ভালোবাসার বয়স খুব বেশিদিন হয়নি, কিন্তু অনুভূতিগুলোর গভীরতা আকাশছোঁয়া। রিদওয়ান বরাবরই একটু বেশি অধিকারবোধসম্পন্ন। নীরাকে সে নিজের জীবনের সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে, কিন্তু এই অতিরিক্ত ভালোবাসাটাই মাঝে মাঝে এক ধরণের অন্ধ ঈর্ষায় রূপ নেয়। নীরা হাসিমুখে কারো সাথে কথা বললেও রিদওয়ানের বুকের ভেতর কেমন যেন এক অস্থিরতা শুরু হয়।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

"নীরা, সেদিন ডিপার্টমেন্টের নোটিশ বোর্ডে সামিরের সাথে কি এত হাসাহাসি করছিলে?" রিদওয়ানের গলায় এক ধরণের চাপা অসন্তুষ্টি ঝরে পড়ল। সে তার কফি কাপে চুমুক দিয়ে নীরার দিকে তাকাল।

 

নীরা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ভালো করেই জানে রিদওয়ানের এই স্বভাবের পেছনের কারণ। কিন্তু বারবার একই কথা বুঝিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। "রিদওয়ান, আবার সেই একই কথা? সামির আমার ক্লাসমেট। সে শুধু অ্যাসাইনমেন্টের একটা নোট বুঝতে চেয়েছিল। এর বেশি কিছু তো নয়।"

 

"নোটে কি এমন ছিল যা শুধু হাসাহাসি করে বোঝাতে হতো?" রিদওয়ানের কণ্ঠস্বর এবার একটু উঁচুতে উঠল। তার চোখের চাউনিতে জমে থাকা অবিশ্বাস আর সন্দেহ স্পষ্ট হয়ে উঠল। "আমি তোমাকে পছন্দ করি, এর মানে এই নয় যে তুমি অন্য কারোর সাথে এভাবে মিশবে। আমার ভালো লাগে না, নীরা।"

 

নীরার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। রিদওয়ানের এই অবুঝ জেদ আর সন্দেহ মাঝে মাঝে ভালোবাসার চেয়ে অনেক বেশি কষ্টের মনে হয়। সে কফি কাপটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল। তার চোখে জমে উঠল অভিমানের জল, কিন্তু সে শক্ত থাকার চেষ্টা করল।

 

"রিদওয়ান, বিশ্বাসটাই তো সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তুমি যদি আমাকেই বিশ্বাস না করো, তবে আমাদের এই সম্পর্কের মানে কী?" নীরার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, তবুও সে স্পষ্ট শোনাল। "সামির আমার শুধু একজন বন্ধু এবং সহপাঠী। এর বাইরে বিন্দুমাত্র কিছু নেই। তুমি কেন এটা বুঝতে চাও না?"

 

রিদওয়ান কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে দেখল নীরার চোখে জল চিকচিক করছে। তার ভেতরের তীব্র অধিকারবোধ মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে হাত বাড়িয়ে নীরার হাত ধরতে চাইল, কিন্তু নীরা আলতো করে হাত সরিয়ে নিল। সেই দূরত্বটুকু রিদওয়ানের বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে দিল।

 

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ক্যাম্পাসের আকাশটা হালকা কমলা রঙে রাঙা হয়ে উঠল। বাতাসে তখনো হালকা উষ্ণতা। রিদওয়ান আর নীরা রিকশায় করে ফিরছিল। দুজনেই চুপচাপ। মাঝেমধ্যে গাড়ির হর্ন আর ব্যস্ত রাস্তার কোলাহল ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। রিদওয়ানের মনটা অপরাধবোধে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, নিজের অজান্তেই সে মানুষটাকে কষ্ট দিচ্ছে যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসে ফেলতে পেরেছে।

 

রিকশাটা নীরার বাসার গলির মুখে থামল। নীরা ভাড়া মিটিয়ে নামার উপক্রম করতেই রিদওয়ান তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। এবার আর সে ছাড়ল না।

 

"নীরা, ক্ষমা করো আমাকে," রিদওয়ানের গলায় তীব্র আকুতি ঝরে পড়ল। সে নীরার চোখের দিকে তাকাল, যেখানে রাগ নয়, বরং গভীর ক্লান্তি আর হতাশা জমা হয়েছিল। "আমি আসলে তোমাকে হারানোর ভয়ে পাগল হয়ে যাই। আমার এই রাগটা নিজের ওপরই হয়, তোমার ওপর নয়।"

 

নীরা রিদওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য নরম হলো। সেই চোখের গভীরে যে ভালোবাসা আর হাহাকার ছিল, তা এড়ানো যায় না। রিদওয়ান ধীরে ধীরে নীরার আরও কাছাকাছি এগিয়ে এল। গলিটার মৃদু হলুদ রাস্তার আলোর নিচে দুজনের দূরত্বটুকু ফুরিয়ে এল। রিদওয়ানের উষ্ণ নিঃশ্বাস এসে লাগল নীরার চুলে।

 

সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রিদওয়ানের হাত দুটো নীরার কোমর জড়িয়ে ধরল, আর নীরা নিজের অজান্তেই তার মাথাটা এলিয়ে দিল রিদওয়ানের প্রশস্ত বুকের ওপর। সেই মুহূর্তে সমস্ত অভিমান, সমস্ত সন্দেহ বাতাসে মিলিয়ে গেল। রিদওয়ানের ঠোঁট ছুঁয়ে গেল নীরার কপাল, এক আলতো ছোঁয়ায় যেন সমস্ত ক্ষতের ওপর প্রলেপ পড়ে গেল। তাদের এই নিবিড় সান্নিধ্যের উষ্ণতায় চারপাশের পৃথিবীর সব কোলাহল যেন হারিয়ে গেল। শুধু রয়ে গেল দুটি হৃদয়ের স্পন্দন, যা একে অপরকে ছাড়া অচল।

 

কিন্তু এই গভীর মুহূর্তের রেশ কাটতে না কাটতেই নীরার মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে উঠল। সে জানে, এই সাময়িক উষ্ণতা হয়তো সাময়িক, কিন্তু বিশ্বাসের ভিত শক্ত না হলে এই ভালোবাসা বেশিদূর এগোতে পারবে না।

পরদিন দুপুরের দিকে ধানমন্ডির লেকপারে ছায়াঘেরা এক ক্যাফেতে বসল রিদওয়ান আর নীরা। দুপুরের মৃদু আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে টেবিলের ওপর এসে পড়েছে। চারপাশের পরিবেশ বেশ শান্ত, কিন্তু রিদওয়ান আর নীরার মাঝের বাতাসে এক ধরণের অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছে। আগের দিনের রিকশার সেই নিবিড় মুহূর্তের রেশ আজও রয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু রিদওয়ানের মনের সেই পুরোনো স্বভাব পুরোপুরি দূর হয়নি।

 

টেবিলে দুটি কফি কাপ রাখা, কিন্তু কেউ তাতে হাত দিচ্ছে না। রিদওয়ান বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে নীরার ফোনের দিকে। নীরা লক্ষ্য করল বিষয়টি। তার বুকের ভেতর একটা তীব্র দীর্ঘশ্বাস জমে উঠল। মানুষটা একটুও বদলায়নি। কালকের এত বড় অনুতাপের পরেও রিদওয়ানের সেই সন্দেহপ্রবণ মন আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।

 

"তুমি কি এখনো ভাবছ আমি সামিরের সাথে কথা বলছি?" নীরা সোজা রিদওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটি করল। তার কণ্ঠে আর রাগ নেই, কেবল এক ধরণের চরম ক্লান্তি।

 

রিদওয়ান একটু নড়েচড়ে বসল। সে দৃষ্টি সরিয়ে কফি কাপের হাতলে আঙুল চালাল। "না, তা বলছি না... তবে কাল রাতে যখন তোমাকে অনলাইন দেখলাম অত রাতে, তখন একটু তো মনে হতেই পারে। কার সাথে চ্যাট করছ এত রাতে?"

 

এই সহজ কথাটাই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। নীরার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সে আর সহ্য করতে পারল না। টেবিলের ওপর রাখা হাত দুটো মুঠো পাকিয়ে সে শক্ত হয়ে বসল।

 

"তুমি কি আমাকে সারাক্ষণ পাহারা দিতে চাও, রিদওয়ান?" নীরার কণ্ঠস্বর এবার কেঁপে উঠল, কিন্তু তা ছিল ক্ষোভে আর অভিমানে ভরা। "আমি রাতে আমার এক কাজিনের সাথে কথা বলছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে কৈফিয়ত দিতে দিতে এখন আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। সম্পর্কের অর্থ কি এই যে, প্রতি মুহূর্তে আমাকে প্রমাণ করতে হবে আমি কার সাথে কথা বলছি আর কেন বলছি?"

 

"তুমি বুঝতে পারছ না নীরা!" রিদওয়ানও এবার কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। সে তার কণ্ঠস্বর নামিয়ে আনার চেষ্টা করলেও তার চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে। "সামির ছেলেটাকে আমি পছন্দ করি না। তার চাহনি আমার ভালো লাগে না। সে যে সবসময় তোমার আশেপাশে ঘুরঘুর করে, এটা আমার সহ্য হয় না। আমি তোমাকে কাউকে হারাতে চাই না, বুঝলে?"

 

"আমাকে হারানোর ভয় তোমার ভালোবাসার নিদর্শন নয়, রিদওয়ান! এটা তোমার অসুস্থ অসুস্থ মানসিকতা আর বিশ্বাসের অভাব!" নীরা কঠোর গলায় বলে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে পারল না। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে ক্যাফে থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।

 

"নীরা! নীরা শোন!" রিদওয়ান পেছন থেকে ডাকলেও নীরা ফিরে তাকাল না।

 

ক্যাফের বাইরে তখন বিকেলের আবছা আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। রিদওয়ান একা টেবিলে বসে রইল। তার মাথাটা যেন ঘুরছে। রাগ, অভিমান আর জেদে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। সে কেন বুঝতে পারছে না যে তার এই অতিরিক্ত অধিকারবোধই তিলে তিলে তাদের ভালোবাসার সুন্দর সম্পর্কটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে?

 

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে রিদওয়ানের মেজাজ আরও বিগড়ে গেল। সে ঠিক করল সামিরের মুখোমুখি হবে। সে কোনোভাবেই এটা সহ্য করবে না যে কেউ তার ভালোবাসার মানুষের চারপাশে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াবে। রিদওয়ান সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পরিচিত আড্ডার জায়গায় গেল। সেখানে সামির তখন একদল বন্ধুর সাথে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কথা বলছিল।

 

রিদওয়ান রাগে কাঁপতে কাঁপতে সামিরের দিকে এগিয়ে গেল। সে সামিরের কলার চেপে ধরে রূক্ষ গলায় বলে উঠল, "শোন, অনেক দিন ধরে লক্ষ্য করছি তোমাকে। নীরার থেকে দূরে থাকবি বলছি! ওর ধারেকালেও যদি আবার তোকে দেখি, ফল ভালো হবে না।"

 

চারপাশের সবাই চমকে উঠল। সামির প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও মুহূর্তের মধ্যে তার মুখে এক অদ্ভুত শান্ত হাসি ফুটে উঠল। সে রিদওয়ানের হাত দুটো খুব শক্ত করে নিজের হাত দিয়ে সরিয়ে দিল, কিন্তু কোনো রকম মারমুখী আচরণ করল না। সামিরের চোখে তখন রাগ নয়, বরং এক ধরণের সমবেদনা আর গভীর সত্য লুকানো ছিল।

 

"তুমি ভুল ভাবছ, রিদওয়ান," সামির খুব শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল। "তোমার এই অন্ধ ঈর্ষা একদিন তোমার নিজের হাত থেকেই সব কেড়ে নেবে। নীরা আমাকে নিয়ে কখনো কোনোদিন বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। আর আমি... আমি তো অন্য কারো জন্যই এখানে আসি।"

 

"ফাজলামো করবি না আমার সাথে!" রিদওয়ান চেঁচিয়ে উঠল।

 

"ফাইজলামো করছি না," সামির পকেট থেকে তার ফোনটা বের করে রিদওয়ানের চোখের সামনে একটা ছবি ধরল। "এই দেখো। যাকে নিয়ে তোমার এত সন্দেহ, সে আমার দীর্ঘদিনের গার্লফ্রেন্ড। আমরা আগামী মাসে বাগদানের কথা ভাবছি। নীরা কেবল আমার খুব ভালো একজন বন্ধু, যে আমাকে এই সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে এবং কাউন্সেলিং দিচ্ছে। আর তুমি বিনা কারণে একটা পবিত্র বন্ধুত্বকে কলুষিত করছ।"

 

ছবিটায় সামির আর একটি চেনা মেয়ের হাসিমুখের ছবি দেখা গেল। রিদওয়ানের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে পলকহীন তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। তার চোখের সামনে জমে থাকা সমস্ত রাগ মুহূর্তের মধ্যে বরফের মতো গলে জল হয়ে গেল। সে কি না এত দিন ধরে একটা ভুল ধারণার বশে ভালোবাসার মানুষটাকে এত কষ্ট দিয়ে গেছে!

 

রিদওয়ানের মাথাটা ঘুরে উঠল। সে বুঝল, সে তার নিজের হাতেই নিজের ভালোবাসার স্বর্গ রাজ্যে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

সামিরের হাতের ফোনটার স্ক্রিনে ভেসে থাকা ছবিটা রিদওয়ানের চোখের সামনে একটা ধাক্কার মতো আছড়ে পড়ল। সামির আর তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সেই হাসিমুখের ছবিটা যেন রিদওয়ানের মাথার সব চিন্তাকে এক মুহূর্তে ওলটপালট করে দিল। সে এতদিন ধরে যে মানুষটাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় হুমকি ভেবে এসেছে, সেই সামির আসলে নীরার নিখাদ এক ভালো বন্ধু মাত্র। সামির নীরার কাছে পরামর্শ নিত নিজের সম্পর্কের জটিলতা কাটানোর জন্য। আর সে কি না অন্ধের মতো বিনা কারণে তাদের দুজনের দিকে সন্দেহের আঙুল তুলেছে!

 

রিদওয়ানের বুকটা কাঁপতে লাগল। অপরাধবোধের এক বিশাল পাহাড় যেন তার দুই কাঁধে এসে চেপে বসল। সে সামিরের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে শুধু বলল, "আমি... আমি সত্যিই জানতাম না... আমাকে ক্ষমা করে দিও, সামির।"

 

সামির তার কাঁধে একটা হালকা চাপড় দিয়ে শান্ত গলায় বলল, "রাগ বা ক্ষোভ জমানো সহজ, রিদওয়ান। কিন্তু বিশ্বাস করাটা কঠিন। নীরা তোমাকে কতটা ভালোবাসে, তা শুধু ওর চোখ দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু একটা মানুষের ধৈর্যেরও তো একটা সীমা থাকে। নিজের ভুলটা যত দ্রুত শুধরে নিতে পারবে, ততই মঙ্গল।"

 

সেখান থেকে যখন রিদওয়ান ফিরল, তখন তার পায়ের নিচে আর মাটি নেই। সে বুঝতে পেরেছিল, তার এই অসুস্থ ঈর্ষা আর অন্ধ সন্দেহ শুধু একটা সম্পর্ককে নষ্ট করেনি, বরং যে মেয়েটি তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করত, তার বুকটাও ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সে দ্রুত পায়ে নীরার বাসার দিকে রওয়ানা হলো। তার মনের ভেতর একটাই প্রার্থনা—নীরা যেন অন্তত একবার তার কথা শোনে।

 

রাতের নিস্তব্ধ ঢাকা শহর তখন হালকা আলোয় মোড়ানো। নীরার বাসার নিচে পৌঁছে রিদওয়ান ফোন করল। অনেকবার রিং হওয়ার পর নীরা ফোন ধরল। তার কণ্ঠস্বর ছিল ক্লান্ত এবং ভারাক্রান্ত।

 

"নীরা, নিচে একটু নামবে প্লিজ? আমার খুব জরুরি কথা আছে তোমার সাথে," রিদওয়ানের গলায় তীব্র আকুতি ঝরে পড়ল।

 

"রিদওয়ান, রাতে আর নতুন করে কোনো নাটক করার ইচ্ছে আমার নেই। যা বলার ফোনে বলো," ওপাশ থেকে নীরার ঠান্ডা জবাব এল।

 

"না নীরা, ফোনে হবে না। প্লিজ, একবার নিচে এসো। আমি সামিরের সাথে কথা বলেছি। আমি সব সত্যিটা জেনেছি," রিদওয়ানের কণ্ঠ কাঁপছিল।

 

কিছুক্ষণ ওপাশে পিনপতন নীরবতা বজায় রইল। এরপর ফোনের লাইন কেটে গেল। মিনিট পাঁচেক পরে গলির অন্ধকার রাস্তা দিয়ে ম্রিয়মান পায়ে নীরা নিচে নেমে এল। তার পরনে সাধারণ একটা সালোয়ার কামিজ, চুলগুলো হালকা করে খোঁপা করে বাঁধা। চোখের নিচে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। সে রিদওয়ানের কয়েক হাত দূরে এসে দাঁড়াল, মুখের অভিব্যক্তি পাথরকঠিন।

 

"বলো, কি বলতে চাও?" নীরা সরাসরি প্রশ্ন করল।

 

রিদওয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এগিয়ে এসে নীরার দুটি হাত নিজের হাতে তুলে নিতে চাইল, কিন্তু নীরা আলতো করে হাত পেছনে সরিয়ে নিল। সেই দূরত্বটুকু রিদওয়ানের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের করে আনল।

 

"আমি সব বুঝতে পেরেছি, নীরা," রিদওয়ানের গলার স্বর ভারী হয়ে এল। তার চোখ দুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। "সামির সবকিছু খুলে বলেছে আমাকে। সে আর আমি যাকে এতদিন ভুল বুঝেছি... ওটা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। সামিরের অন্য গার্লফ্রেন্ড আছে, আর ও শুধু একটা বন্ধুর মতো তোমার সাহায্য নিচ্ছিল। আমি... আমি কতটা অন্ধ আর বোকামি করেছি, নীরা!"

 

নীরা এক মুহূর্ত রিদওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই দৃষ্টিতে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক ধরণের অন্তহীন ক্লান্তি আর চরম হতাশা। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।

 

"তুমি আজ সত্যিটা জানতে পেরেছ, রিদওয়ান। খুব ভালো কথা," নীরার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত শান্ত কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা। "কিন্তু তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছ, সত্যিটা জানার আগে তুমি আমাকে কতটা মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছ? ভালোবাসা মানে কি এই যে, সামান্য একটা অজুহাতে তুমি আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে? আমার সম্মান, আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে?"

 

"আমি ভুল করেছি, নীরা! প্লিজ আমাকে একটা সুযোগ দাও। আমি শপথ করছি, জীবনে আর কখনো তোমার ওপর এভাবে সন্দেহ করব না," রিদওয়ান প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। সে নীরার খুব কাছাকাছি এগিয়ে গেল, তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

 

নীরা এবার একটু পিছিয়ে গেল। তার চোখে জমে থাকা জল আর বাঁধ মানল না, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণের দৃঢ়তা একটুও কমল না।

 

"না, রিদওয়ান। শুধু ক্ষমা চাইলেই সব আগের মতো হয়ে যায় না," নীরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দিল। "বিশ্বাস কাঁচের আয়নার মতো। একবার তাতে ফাটল ধরলে তা যতই জোড়া লাগানোর চেষ্টা করো না কেন, সেই দাগটা থেকেই যায়। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি, আজও হয়তো বাসি। কিন্তু এই প্রতিদিনের দমবন্ধ করা সন্দেহ আর অন্ধ ঈর্ষার সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার শক্তি আমার আর নেই। আমার নিজেরও একটা আত্মসম্মান আছে।"

 

"নীরা... এমন করো না..." রিদওয়ান থরথর করে কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারল, তার নিজের হাতের বিষাক্ত সন্দেহই আজ তার ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কটাকে চিরতরে গ্রাস করে নিয়েছে।

 

"নিজের যত্ন নিয়ো, রিদওয়ান," শেষবারের মতো রিদওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে এই কথাটি বলে নীরা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে চলে গেল।

 

রিদওয়ান একা গলির রাস্তায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথার ওপর রাতের আকাশটা তখন আরো বেশি অন্ধকার হয়ে এসেছে। তার বুকের ভেতর কেবল শূন্যতা আর অনুতাপের আগুন জ্বলছে। সে বুঝল, কিছু কিছু ভুল এমন থাকে, যার কোনো ক্ষমা হয় না; শুধু সারাজীবন তার খেসারত দিয়ে যেতে হয়।

....
👁 19