আধিপত্যের অবসান ঘটল

কাঁচের জানালার বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। ঢাকার মগবাজারের এক অভিজাত ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে পিয়ানো ব্লু রঙের সোফায় বসে আছে নীলা। তার হাতের কফি কাপটা অনেকক্ষণ ধরে ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু তাতে চুমুক দেওয়ার কোনো আগ্রহ তার নেই। সামনে দেওয়ালে টাঙানো বড় ফ্রেমের আয়নাটায় নিজের ক্লান্ত মুখটা সে দেখছে। গত তিন বছর ধরে এই ফ্ল্যাটটাই তার পৃথিবী, অথচ এই চার দেওয়ালের মাঝে সে যেন এক বন্দি পাখি।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

দরজায় চাবি ঘোরার শব্দ হলো। নিখুঁত সময়ে অফিস থেকে ফিরেছে আরিশ। ঠিক সাতটা বাজে। আরিশ ঘড়ি ধরে জীবন চলে, আর সে চায় তার আশপাশের মানুষগুলোও একই ঘড়ির কাঁটায় মিল রেখে চলবে। দরজা খুলে জুতোটা নির্দিষ্ট তাকে রেখে আরিশ সোজা ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল। তার কপালে হালকা ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ও আধিপত্যবাদী।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

"এখনো কফি খাচ্ছো? সকালে বলেছি না ক্যাফেইন কমাতে?" আরিশের গলাটা গম্ভীর, যেন কোনো অফিসের বস তার অধস্তন কর্মীকে তিরস্কার করছে।

 

নীলা মৃদু নিঃশ্বাস ফেলল। নিজেকে শান্ত রেখে সে বলল, "সকালের কফি তো সকালেই শেষ হয়ে গেছে আরিশ। এটা তো সন্ধ্যায় বসালাম, মাথাটা ধরেছিল তাই।"

 

"মাথা ধরার অজুহাত দিও না নীলা। গত সপ্তাহেও ডার্ক চকোলেট খেয়ে তোমার মাইগ্রেন বেড়েছিল। আমি যা বলছি, তোমার ভালোর জন্যই বলছি। আমার কথাগুলো যদি একটু গুরুত্ব দিয়ে শুনতে, তাহলে এই সমস্যাগুলো হতো না।" আরিশ নিজের কোটের বোতাম খুলতে খুলতে সোফার একপাশে বসল।

 

এই যে "আমার ভালোর জন্য"—এই তিনটে শব্দ নীলার জীবনের সবচেয়ে বড় কারাগার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরিশের কাছে ভালোবাসা মানে নিয়ন্ত্রণ। নীলা কার সাথে কথা বলবে, কোন রঙের শাড়ি পরবে, অফিসের পর কার সাথে কফি শপে আড্ডা দেবে—সবকিছুর একটা অদৃশ্য রুটিন বানিয়ে দিয়েছে আরিশ। নীলার কলেজ জীবনের বন্ধু তানভীর সেদিন হঠাৎ ফেসবুকে একটা পুরোনো ছবি ট্যাগ করায় কী লঙ্কাকাণ্ডই না ঘটে গিয়েছিল! আরিশের সন্দেহ ছিল তানভীরের সাথে নীলার অতীতের কোনো সম্পর্ক ছিল। অথচ তানভীর আর তার স্ত্রীর সাথে নীলার পরিবারের বহু বছরের পারিবারিক জানাশোনা। কিন্তু আরিশের সন্দেহপ্রবণ মনের কাছে যুক্তির কোনো দাম ছিল না।

 

"তানভীরের সাথে তোমার ওই ছবিটা নিয়ে আজ অফিসে যাওয়ার আগেও মাথা ঘামাচ্ছিলে কেন? বলেছি তো, ওটা নিছকই একটা পুরোনো গ্রুপ ছবি," নীলার গলায় এবার একটু জমে থাকা অভিমান আর বিরক্তি বেরিয়ে এল।

 

আরিশের চোখ দুটো মুহুর্তের জন্য কুঁকড়ে গেল। সে সোজা হয়ে বসল। "গ্রুপ ছবি? যেখানে শুধু তোমরা দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলে? নীলা, আমার বুদ্ধিমত্তাকে কম ভেবো না। একটা মেয়ের বিয়ের পর তার পুরুষ বন্ধুদের সাথে এই ধরনের খোলামেলা মেলামেশা আমি সহ্য করব না। আমি পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, তানভীরের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ আজই বন্ধ করবে। দ্যাটস ইট।"

 

"তুমি সবসময় আমার ওপর তোমার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দাও আরিশ! আমার নিজস্ব একটা মতামত আছে, আমার একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে!" নীলা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

 

"ব্যক্তিগত জীবন? বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী বলে আলাদা কিছু হয় না নীলা, একটাই জীবন হয়—আমাদের জীবন! আর সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমার," আরিশ অত্যন্ত শীতল গলায় বলল, যেন সে এক চিরন্তন ধ্রুব সত্য উচ্চারণ করছে।

 

ছোট্ট এই কথাটার পর ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। প্রতিদিনের এই ছোটখাটো ঝগড়া, রাগ, অভিমান আর একতরফা শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে নীলার ভেতরকার প্রাণশক্তি দিন দিন ফুরিয়ে আসছিল। অথচ এই আরিশকেই সে একসময় পাগলের মতো ভালোবেসেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলগুলো, রিকশায় পাশাপাশি বসে কদম ফুলের সুবাস নেওয়া—সেদিনের সেই রোমান্টিক মানুষটা আজ কোথায় হারিয়ে গেছে? নাকি এই নিষ্ঠুর নিয়ন্ত্রণপরায়ণতাই তার আসল রূপ?

 

রাত গভীর হলো। শোবার ঘরের এসিটার মৃদু গুঞ্জন ছাড়া চারপাশ নিস্তব্ধ। বিছানার একপাশে আরিশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মুখটা ঘুমের মধ্যে বেশ শান্ত দেখাচ্ছে—কোথাও কোনো কঠোরতার লেশমাত্র নেই। নীলা আলগোছে উঠে বসল। চাঁদের আলো এসে পড়েছে জানালার কার্নিশে।

 

সে আরিশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা ঘুমন্ত অবস্থায় কী অদ্ভুত মায়াবী লাগে! নীলা আস্তে করে হাত বাড়িয়ে আরিশের কপালে জমে থাকা একগুচ্ছ চুল সরিয়ে দিল। আরিশ ঘুমের মধ্যেই মৃদু গোঙিয়ে নীলার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। অবচেতন মনেও তার অধিকারবোধ এতটুকু কমে না। সে নীলাকে নিজের বাহুডোরে এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরল, যেন বাতাসও মাঝখান দিয়ে গলতে পারবে না।

 

এই ঘনিষ্ঠতাটুকু একসময় নীলার কাছে স্বর্গীয় মনে হতো। আরিশের বুকের উত্তাপ, তার গায়ের চেনা কোল্ড কোলোনের সুবাস, আর কানের কাছে ফিসফিস করে বলা ভালোবাসার কথাগুলো—সবকিছু নীলাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। কিন্তু আজ এই গভীর স্পর্শেও নীলার ভেতরটা হিম হয়ে আসছে। এই নিবিড় আলিঙ্গন কি ভালোবাসা, নাকি কোনো অদৃশ্য শেকল?

 

আরিশ আধো-ঘুমের মধ্যেই নীলার ঘাড়ের নরম ত্বকে মুখ ডুবিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তার ঠোঁটের হালকা ছোঁয়া নীলার কাঁধে লাগতেই নীলার শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। গভীর রাতের এই অন্তরঙ্গতাগুলো সবসময়ই তাদের সম্পর্ককে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যেত। আরিশের শক্ত বাহুর বেষ্টনী আর তার উত্তাল স্পর্শ নীলার সমস্ত জেদ নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিত।

 

আরিশ এবার ফিসফিস করে বলে উঠল, "তুমি শুধু আমার নীলা... অন্য কারো দিকে তাকালেও আমার সহ্য হয় না। বুঝ কেন চেষ্টা করো না?"

 

তার নিশ্বাসের সাথে মিশে থাকা উষ্ণতা নীলার গলার কাছে এসে লাগল। নীলা চোখ বন্ধ করে ফেলল। আরিশ তার চুলে আঙুল চালিয়ে মুখটা নীলার মুখের আরও কাছে নিয়ে এল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব তখন মাত্র এক ইঞ্চি। ঘরের মৃদু অন্ধকারে আরিশের চোখের ভেতরের লোভ আর তীব্র আকর্ষণ স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যাচ্ছিল।

 

"আরিশ... ছাড়ো, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে," নীলা ফিসফিস করে বাধা দিতে চাইল।

 

কিন্তু আরিশ শোনার পাত্র নয়। তার দৃষ্টি তখন নীলার কম্পিত ঠোঁটের ওপর স্থির। সে এক টানে নীলাকে পুরোপুরি নিজের ওপর উঠিয়ে নিল। তাদের শরীরের এই নিখুঁত ও গভীর উষ্ণতা ঘরের শীতল বাতাসকে নিমেষে হার মানাল। আরিশের হাত দুটো নীলার পিঠ বেয়ে কোমর জড়িয়ে ধরল, আর তার ঠোঁট এসে মিশে গেল নীলার ঠোঁটে। এক গভীর, আচ্ছন্ন করা রোমান্টিক উত্তেজনায় ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল। আরিশের চুম্বনে যেমন ছিল একরোখা দখলদারিত্ব, তেমনই ছিল তীব্র ভালোবাসার আকুতি। নীলা হাজারও প্রতিবাদের পরেও এই গভীর আবেগের জোয়ারে নিজের সমস্ত প্রতিরোধ হারিয়ে ফেলল। তার আঙুলগুলো অজান্তেই খামচে ধরল আরিশের শার্টের কলার।

 

বাইরে তখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। দুই শরীরের এই নিবিড় মিলন আর গভীর উষ্ণতা সাময়িকভাবে সব দূরত্ব মুছে দিল বটে, কিন্তু নীলার মনের কোণে কোথাও একটা কাঁটা বিঁধেই রইল। সে জানত, সকালের আলো ফুটলেই এই সাময়িক মোহ কেটে যাবে এবং আবার সেই পুরনো দমবন্ধ করা নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসবে।

 

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল কিচিরমিচির পাখির ডাকে। রান্নাঘরে গিয়ে চা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল নীলা। ডাইনিং টেবিলে খবরের কাগজটা মেলা রয়েছে। আরিশ তখনো বাথরুমে। নীলার ফোনটা টেবিলে রাখা ছিল, হঠাৎ তাতে একটা মেসেজ ফ্ল্যাশ করল। অফিসের এক সহকর্মী রায়হান কাজের সুবাদে একটা ফাইল পাঠিয়ে জানতে চেয়েছে প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়েছে কি না।

 

ঠিক সেই মুহূর্তে বাথরুম থেকে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বের হলো আরিশ। তার চোখ পড়ে গেল নীলার ফোনের স্ক্রিনের দিকে। রায়হানের নামটা দেখামাত্র তার কলার জলার পেশী শক্ত হয়ে গেল।

 

"সকালের শুরুতেই এই রায়হানের মেসেজ কেন? অফিস আওয়ার ছাড়া ওর সাথে কথা বলার কী দরকার?" আরিশের গলাটা এবার তীক্ষ্ণ আর্তনাদের মতো শোনাল।

 

নীলা চা-এর কাপটা নামিয়ে রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, "অফিসের প্রজেক্ট নিয়ে জরুরি কথা ছিল আরিশ। এটা ব্যক্তিগত কিছু নয়।"

 

"সবাইকে ব্যক্তিগত সুযোগ দিও না নীলা! আমি সহ্য করব না বলেছি মানে করব না! ফোনটা আমাকে দাও।" আরিশ হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতে গেল।

 

এই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি আর সন্দেহ এবার সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেল। নীলা এক পা পিছিয়ে গিয়ে শক্ত গলায় বলল, "না, আরিশ। এবার বাড়াবাড়ি করছ তুমি। আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় এভাবে নাক গলালে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। এভাবে একটা সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে না।"

 

আরিশের চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে নীলা তার মুখের ওপর কথা বলছে। "তুমি আমাকে ব্যঙ্গ করছ? আমার কথা তোমার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে?"

 

"হ্যাঁ, মনে হচ্ছে!" নীলা স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিল।

 

ঘরটার বাতাস যেন ভারী হয়ে এল। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মাঝেই দরজার বেল বেজে উঠল। নীলা গিয়ে দরজা খুলল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন আরিশের মা, মানে নীলার শাশুড়ি আম্মা। তার সাথে একটা ছোট সুটকেস।

 

"কী রে তোরা ঝগড়া করছিস নাকি আবার? আসার পর থেকেই দেখছিস তোদের মুখ ভার," শাশুড়ি মা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন।

 

কিন্তু সেই মুহূর্তে কারো পক্ষেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলো না। আরিশের মনের ভেতরে জমে থাকা জেদ আর নীলার চোখে জমে থাকা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক বিন্দুতে এসে মিলল। আরিশ গম্ভীর মুখে কোট পরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, যাওয়ার সময় দরজাটা সজোরে বন্ধ করে গেল—যাতে পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল।

 

নীলা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এই বিষাক্ত ছাদের নিচে আর এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব নয়। তার মনে তখন একটা সুপ্ত ঝড় বইছে—যে ঝড় সবকিছু ওলটপালট করে দিতে প্রস্তুত।

 

বিকেল বেলা আকাশটা হঠাৎ করেই কুচকুচে কালো মেঘে ঢেকে গেল। ঢাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, যেকোনো মুহূর্তে কালবৈশাখী ঝড় নামবে। মগবাজারের ফ্ল্যাটটার ভেতরে থমথমে পরিবেশ। শাশুড়ি আম্মা আসার পর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার চেষ্টা করলেও আরিশের গম্ভীর মুখ আর নীলার পাথরের মতো নির্বাক উপস্থিতি ঘরের বাতাসকে ভারী করে রেখেছে।

 

অফিস থেকে ফেরার কথা থাকলেও আরিশ আজ নির্দিষ্ট সময়ে ফেরেনি। ঘড়ির কাঁটা রাত আটটা ছুঁই ছুঁই, অথচ তার কোনো পাত্তা নেই। নীলার বুকটা কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠছে। সাধারণত আরিশ কাজের বাইরে এক মিনিটও দেরি করে না। ফোনটাও সে রিসিভ করছে না। শাশুড়ি মা বারবার দুশ্চিন্তায় বলছেন, "ছেলেটা আজও লাঞ্চ করেছে কি না কে জানে! রাস্তায় আবার এই দুর্যোগের মধ্যে আটকে পড়ল নাকি!"

 

ঠিক তখনই নীলার নাম্বারে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক অপরিচিত ভারী গলার আওয়াজ ভেসে এল, "আপনি কি আরিশ আহমেদের স্ত্রী বলছেন? তেজগাঁও শিল্প এলাকা রোডে একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। একটা দ্রুতগামী ট্রাক ওভারটেক করতে গিয়ে একটা প্রাইভেট কারকে পিষে দিয়েছে। গাড়ির কাগজপত্রে এই নাম্বারটা পাওয়া গেছে। আপনারা দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে আসুন।"

 

ফোনটা কান থেকে নামিয়ে নেওয়ার শক্তিটুকুও যেন নীলার পায়ে রইল না। ঘরের চারপাশটা কেমন যেন ঘুরতে শুরু করল। হাত থেকে ফোনটা ফসকে মেঝেতে পড়ে গেল। শাশুড়ি মা উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে রে নীলা? কার ফোন ছিল ওটা?"

 

নীলার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। শুধু ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরের মুহূর্তগুলো ছিল এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন। ইমার্জেন্সির করিডোর, হ্যালোজেন লাইটের সাদা আলো, আর বারান্দায় পড়ে থাকা রক্তের দাগ—সবকিছু যেন একটা ঘোরের মধ্যে হচ্ছিল। চিকিৎসকরা যখন জানালেন যে আরিশের অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপচার চলছে এবং তার অবস্থা আশঙ্কাজনক, তখন নীলার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।

 

বাইরে তখন প্রকৃতির আসল রূপ বেরিয়ে এসেছে। প্রবল বেগে কালবৈশাখী ঝড় বইছে, জানালার কাঁচগুলো থরথর করে কাঁপছে। নীলা হাসপাতালের বারান্দার শক্ত বেঞ্চটায় পাথরের মতো বসে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে গত তিন বছরের প্রতিটি মুহূর্ত। এই তো আজ সকালে যাওয়ার আগেও সে আরিশের সাথে ঝগড়া করেছিল। তার ফোন চেক করা নিয়ে, তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা নিয়ে কত শত কটু কথা শুনিয়েছিল। আরিশের সেই রাগ, সেই অতিরিক্ত জেদ, তার সবকিছুর পেছনে একটাই কারণ ছিল—সে নীলাকে হারাতে ভয় পেত। তার তথাকথিত মালিকানা বোধ আর নিয়ন্ত্রণ হয়তো বিষাক্ত ছিল, কিন্তু তার ভেতরে নীলার জন্য যে একটা তীব্র ভালোবাসা ও নির্ভরতা ছিল, আজ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নীলা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

 

"ভগবান... আরিশকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও," বারান্দার কোণে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলল নীলা। সে বুঝতে পারল, মানুষটাকে সে যতই দোষ দিক না কেন, তার অস্তিত্বের একটা বিশাল অংশজুড়ে শুধু আরিশ জড়িয়ে আছে।

 

দীর্ঘ চার ঘণ্টার মরণপণ লড়াই শেষে ডাক্তার যখন অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে ক্লান্ত মুখে বললেন, "বিপদ কেটে গেছে, তবে ওর পুরো শরীর রিকভার করতে সময় লাগবে," তখন নীলা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। তার মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ওপর থেকে আস্ত একটা পাহাড় সরিয়ে নিয়েছে।

 

পরের দিন দুপুরের নরম রোদ এসে পড়েছে কেবিনের জানালায়। আরিশের জ্ঞান ফিরেছে। তার বাঁ হাতটা ব্যান্ডেজ করা, কপালে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাঁচের টুকরো লাগার কারণে ছোটখাটো আঘাতের চিহ্ন। সে চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পেল, তার বিছানার পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে নীলা। তার চোখের নিচে কালচে দাগ, মুখটা শুকিয়ে একাকার হয়ে গেছে। সারারাত সে এক ফোঁটাও ঘুমায়নি।

 

আরিশ শুকনো গলায় ফিসফিস করে ডাকল, "নীলা..."

 

নীলার চমকে উঠে তাকাল। তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে দ্রুত এগিয়ে এসে আরিশের ভালো হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় জড়িয়ে ধরল। "কেমন লাগছে এখন? কোথায় ব্যথা করছে খুব?"

 

আরিশ ব্যথায় মুখ কুঁচকে ফেলল, কিন্তু তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল নীলার মুখের ওপর। সে অনেকক্ষণ ধরে নীলার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় যখন তার গাড়িটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল, তার চোখের সামনে কোনো অফিসের ফাইল বা অহংকার ভেসে ওঠেনি—ভেসে উঠেছিল শুধু নীলার মুখটা। সে ভয় পেয়েছিল এই ভেবে যে, সে যদি মারা যায়, তবে এই মানুষটার কী হবে? আর ঠিক তখনই তার মনের গভীরে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে।

 

আরিশ তার ভারী গলায় খুব কষ্ট করে বলল, "আমি... আমি ভেবেছিলাম তোকে আর কখনো দেখতে পাবো না। ওই মুহূর্তে আমার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল এই যে, আমি তোকে সারাজীবন শুধু কষ্টই দিয়ে গেলাম।"

 

নীলা আরিশের মুখে হাত চাপা দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, "আর কিচ্ছু বলো না প্লিজ। চুপ করো।"

 

আরিশ মৃদু হেসে নীলার আঙুলগুলো নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে এল। তার সেই আগের মতো কঠোর ভাবটা আজ আর নেই। চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর অপরাধবোধের সাথে মিশে আছে এক গভীর অনুতাপ।

 

"না নীলা, আজ আমাকে বলতে দাও," আরিশ একটু থেমে দম নিল। "গত তিন বছর ধরে আমি অন্ধের মতো বিশ্বাস করে এসেছি যে ভালোবাসার মানে হলো আটকে রাখা, নিজের ইচ্ছেগুলো জোর করে তোমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া। আমি ভেবেছি আমার ভয়গুলোকে তোমার ওপর বসিয়ে দিলেই বুঝি আমাদের সম্পর্ক নিরাপদ থাকবে। কিন্তু আমি বুঝিনি যে এই তথাকথিত যত্ন আসলে একটা দমবন্ধ করা বিষাক্ত শেকল ছাড়া আর কিছু ছিল না। আজ এই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আমি বুঝতে পেরেছি... ভালোবাসায় কোনো কারাগার থাকে না, থাকে ভরসা।"

 

কেবিনের ভেতরের বাতাস তখন থমথমে। নীলা মুগ্ধ হয়ে শুনছে। এই কথাগুলো সে বছরের পর বছর ধরে আরিশের মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিল। আজ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষটা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।

 

আরিশ তার ডান হাতটা দিয়ে নীলার চিবুকটা আলতো করে উঁচুতে তুলে ধরল। তার চোখের গভীরতা থেকে সমস্ত অহংকার ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। সে খুব মায়াবী ও আকুল সুরে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও নীলা। তোমার বিশ্বাস ভাঙার জন্য, তোমাকে নিজের ইচ্ছের দাস বানিয়ে রাখার জন্য। আজ থেকে আমি বদলে গেলাম। তোমার স্বাধীনতা, তোমার ইচ্ছেগুলোকে আমি আমার নিজের চেয়েও বেশি মূল্য দেব। তুমি কি আমায় ক্ষমা করতে পারবে না?"

 

বাইরে তখন রোদ ঝলমলে একটা দুপুর। নীলার চোখের কোণের জল মুছে গিয়ে সেখানে এক ফোঁটা শান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে আরিশের বুকের কাছে মাথাটা এলিয়ে দিল। আরিশ তার অক্ষত হাতটা দিয়ে নীলাকে পরম যত্নে জড়িয়ে ধরল। এই আলিঙ্গনে আগের সেই জবরদস্তি বা দখলদারিত্ব ছিল না—ছিল এক গভীর, পবিত্র সমর্পণ আর নিঃশর্ত ভালোবাসা।

মগবাজারের ফ্ল্যাটটাতে এখন আর আগের মতো থমথমে বা দমবন্ধ করা পরিবেশ নেই। আজ বিকেলে বাইরের আকাশটা একদম পরিষ্কার। মেঘ কেটে গিয়ে সোনালী রোদে চারপাশটা ঝলমল করছে। আরিশ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে প্রায় দুই সপ্তাহ হয়ে গেছে। তার শরীরের ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসছে, কিন্তু তার মনের ভেতরের পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট।

 

বিকেল বেলা ড্রয়িংরুমে কফি কাপ হাতে ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে আছে নীলা। তার পরনে একটা হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি, চুলে খোপা করা। ব্যালকনির দরজা খোলা থাকায় বসন্তের মিষ্টি বাতাস ঘরে এসে নাচানাচি করছে।

 

ঠিক তখনই অফিসের ল্যাপটপটা বন্ধ করে টেবিল থেকে উঠে এল আরিশ। তার পরনে সাধারণ একটা শার্ট, চোখে আগের সেই কাঠিন্য বা অহংকারের লেশমাত্র নেই। সে সোজা এসে দাঁড়াল নীলার ঠিক পেছনে। আলগোছে নীলার কাঁধে হাত রাখল, তবে স্পর্শে কোনো জোরাজুরি ছিল না—ছিল এক পরম নির্ভরতা আর শ্রদ্ধার ছোঁয়া।

 

"কী ভাবছ এত গভীরভাবে?" আরিশের গলাটা আজ অনেক নরম, বেশ মায়াবী।

 

নীলা ফিরে তাকিয়ে একটু হাসল। কাপটা টিপয়ে রেখে সে বলল, "ভাবছি, মানুষ কখনো কি সত্যিই বদলে যেতে পারে?"

 

আরিশ নীলার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার হাত দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিল। তার চোখে তখন এক গভীর অনুতাপ আর ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি জ্বলজ্বল করছে। সে নীলার আঙুলগুলোতে নিজের আঙুলগুলো আলতো করে জট পাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "মানুষ বদলায় কি না জানি না নীলা, তবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পেরেছি—তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে আমি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু আর নয়। আজ থেকে তোমার স্বাধীনতা, তোমার ভালো লাগা আর তোমার নিজস্ব সত্তাই আমার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।"

 

কথাটা শেষ করেই আরিশ নীলার আরও একটু কাছে সরে এল। তাদের মাঝখানের দূরত্বটুকু তখন ফুরিয়ে এসেছে। আরিশের চোখের গভীর দৃষ্টি নীলার বুক কাঁপিয়ে দিল। সে এক হাত বাড়িয়ে আলগোছে নীলার চিবুকটা উঁচুতে ধরল, ঠিক যেভাবে হাসপাতালে বলেছিল। নীলা চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।

 

আরিশ তার উষ্ণ ঠোঁট নামিয়ে দিল নীলার কপালে। এক দীর্ঘ, পবিত্র চুম্বনে যেন সে তার সমস্ত অতীতের ভুল ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। এরপর আরিশের ঠোঁট নেমে এল নীলার চোখের পাতায়, গালে, আর সবশেষে তার কম্পিত ঠোঁটে। সেই চুম্বনে কোনো জোর জবরদস্তি বা অধিকারবোধ ছিল না—ছিল এক তীব্র, গভীর রোমান্টিক সমর্পণ। নীলা তার বাহু দুটো দিয়ে আরিশের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেকে পুরোপুরি এলিয়ে দিল তার মাঝে। বাইরের ঝিরঝিরে বাতাস আর তাদের দুই শরীরের গভীর উষ্ণতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। এই ভালোবাসা কোনো শেকল নয়, এই ভালোবাসা হলো মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার আনন্দ।

 

সন্ধ্যা নামল। ডাইনিং টেবিলে আজ আর কোনো উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় বা ভয়ের পরিবেশ নেই। শাশুড়ি মা হাসিমুখে খাবার পরিবেশন করছেন। আরিশ নিজে হাতে নীলার প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে বলল, "আজ খেয়ে দেখ তো কেমন হয়েছে, নিজে রান্না করেছি তো তাই একটু টেনশন হচ্ছে।"

 

নীলা এক চামচ মুখে দিয়ে অবাক হয়ে বলল, "দারুণ হয়েছে তো! তুমি কবে থেকে রান্না করা শিখলে?"

 

"শিখতে হয়, বিশেষ করে যখন ভালোবাসার মানুষটাকে আর কোনো কষ্ট দিতে চাও না," আরিশ মুচকি হেসে বলল।

 

শাশুড়ি মা দুজনকে এভাবে হাসিমুখে দেখে চোখের কোণের জল মুছলেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, ঝড়ের পর প্রকৃতির যেমন নতুন রূপ আসে, তেমনই এই দম্পতির জীবনেও এক নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে।

 

রাতে শোবার ঘরের আলো নিভে যাওয়ার পর আরিশ নীলাকে নিজের বাহুডোরে টেনে নিল। আগের সেই শক্ত আর দমবন্ধ করা আঁকড়ে ধরা নয়, বরং এক পরম শান্তির ও নিরাপদ আশ্রয়। নীলা আরিশের বুকে মাথা রেখে শুনতে পেল তার হৃদস্পন্দন—যে স্পন্দন এখন শুধু ভালোবাসার কথা বলে। জীবনের জটিলতাগুলো হয়তো পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু একে অপরকে বিশ্বাস করার এই নতুন পথচলায় তাদের ভালোবাসা আজ আরও বেশি গভীর ও পরিপক্ব হয়ে উঠেছে।

....
👁 15