অবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে মুক্তি

বিকেলের নরম আলোটুকু এসে পড়েছে মেহরিনের পড়নের ঘিয়ে রঙের সালোয়ার-কামিজের ওপর। জানালার বাইরে ব্যস্ত শহরের কোলাহল—রিকশার টুংটাং শব্দ, দূরে কোনো কারখানার হর্ন, আর রোদমাখা মেঘহীন এক শান্ত আকাশ। বাতাসে বিন্দুমাত্র আর্দ্রতা বা বৃষ্টির কোনো আভাস নেই, বরং শরৎকালের মতো ছিমছাম একটা আমেজ চারপাশটা আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এমন এক স্নিগ্ধ পরিবেশে নিজের ড্রয়িংরুমে বসে মেহরিন যখন এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লাল চায়ে চুমুক দিচ্ছিল, তখন তার মনের গভীরে ছিল অদ্ভুত এক স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। রাফি দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। চোখেমুখে ক্লান্তি আর এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। রাফিকে দেখলেই মেহরিনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। সম্পর্কটার শুরুর দিনগুলো কি দারুণ ছিল! ভার্সিটির সবুজ চত্বর, লাইব্রেরির কোণায় পাশাপাশি বসে ফিসফিস করে কথা বলা, কিংবা রিকশায় পাশাপাশি বসে হাত দুটো শক্ত করে ধরে রাখা—সবকিছুই তো রূপকথার মতো মনে হতো একসময়। তখন রাফির চোখে ছিল শুধু মেহরিনকে নিয়ে স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই ভালোবাসার রূপটা ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে। ভালোবাসার জায়গা দখল করে নিয়েছে এক অচেনা আতঙ্ক আর অসুস্থ সন্দেহ।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

রাফি ভেতরে এসেই সোফায় বসে পড়ল। ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে সোজা তাকাল মেহরিনের চোখের দিকে। মেহরিন মৃদু হেসে এগিয়ে গেল তার দিকে এক কাপ চা বাড়িয়ে দিতে। কিন্তু রাফি চায়ের কাপটা নিল না। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেহরিনের চেহারার ওপর স্থির হয়ে আছে।

 

"আজ ক্লাসে কার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলে বারান্দায়?"—রাফির গলার স্বরটা ভীষণ ঠান্ডা, অথচ ভেতরে ভেতরে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে।

 

মেহরিন একটু থমে গেল। চা কাপটা টেবিলে রেখে সে স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল, "ও তো আমাদের ডিপার্টমেন্টের আসিফ। একটা নোট দরকার ছিল, তাই কথা হচ্ছিল।"

 

"নốt দরকার ছিল, নাকি অন্য কিছু?" রাফি ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে সোজা হয়ে বসল। "আসিফের সাথে তোমার ইদানীং একটু বেশিই খাতির বেড়ে গেছে, কী বলো? ওর দিকে হাসিমুখে তাকাও কেন তুমি? আমার সামনে তো কখনো এমন মিষ্টি করে হাসো না!"

 

মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই দৃশ্যগুলো তার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকে রাত—প্রতিটি পদক্ষেপের হিসাব দিতে হয় তাকে। কার সাথে দেখা হলো, কার অনলাইন স্ট্যাটাস কখন সবুজ হলো, কে ফেসবুকে ছবিতে লাভ রিয়েক্ট দিল—সবকিছুর পেছনে একটা করে নোংরা সন্দেহের তীর ছুঁড়ে দেয় রাফি। মেহরিনের ফোনটা পকেটে থাকা মানেই একটা যুদ্ধক্ষেত্র। যেকোনো মুহূর্তে রাফি হাত বাড়িয়ে ফোনটা চেক করতে চাইবে। নিজের স্বাধীন অস্তিত্বটুকুকে যেন আর খুঁজে পায় না সে।

 

"রাফি, প্লিজ শুরু করো না আবার," মেহরিনের গলায় ক্লান্তি ঝরে পড়ল। "তুমি কেন বোঝো না, আসিফ কেবলই একজন সহপাঠী। আমাদের মধ্যে এর বেশি কিছু নেই এবং কখনো ছিলও না। আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি, এটা কি তুমি এখনো বিশ্বাস করো না?"

 

রাফি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার লম্বা শরীরটা যেন আরও বড় হয়ে মেহরিনের ওপর এসে পড়ল। সে মেহরিনের খুব কাছে এগিয়ে এল। রাফির গায়ের সুপরিচিত সুবাসের সাথে এখন মিশে আছে তীব্র জেদ আর দখলের মানসিকতা। সে মেহরিনের কাঁধে হাত রাখল, কিন্তু সেই ছোঁয়াতে ভালোবাসার কোমলতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বন্দি করার চেষ্টা।

 

"ভালোবাসো? সত্যিই ভালোবাসো আমাকে?" রাফি ফিসফিস করে বলল, তার মুখটা মেহরিনের একদম কাছে চলে এসেছে। তার চোখের তারায় জ্বলছে এক পাগলাটে আবেগ। "তাহলে আমার চোখ কেন সহ্য করতে পারে না অন্য কোনো পুরুষের ছায়াও তোমার ওপর পড়তে? তুমি শুধু আমার, মেহরিন। শুধু আমার। তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমার নাম থাকতে হবে। অন্য কারও সাথে তোমার হাসিমুখ আমি সহ্য করতে পারি না।"

 

রাফির এই তীব্র আচ্ছন্নতা এবং গভীর আবেগ মেহরিনকে এক অদ্ভুত দ্বিধায় ফেলে দেয়। একদিকে যেমন দমবন্ধ করা পরিবেশ, অন্যদিকে রাফির এই অন্ধ ভালোবাসার পাগলামি। রাফি যখন তাকে নিজের বাহুডোরে টেনে নেয়, তখন তার বুকের উত্তাপ আর শরীরের সুবাস মেহরিনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। রাফির শক্তিশালী বুকটার সাথে লেপ্টে থাকতে থাকতে মেহরিনের রাগগুলো কোথায় যেন জাদুকরী ছোঁয়ায় মিলিয়ে যেতে চায়। রাফির হাত দুটো যখন মেহরিনের কোমর জড়িয়ে ধরে, তার ছোঁয়ায় এক গভীর উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে পুরো শরীরে। রাফির উষ্ণ নিঃশ্বাস মেহরিনের চুলে এসে লাগে, আর তখনই রাফি তার ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় মেহরিনের ঘাড়ের নরম ত্বকে।

 

সে এক গভীর রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। রাফির ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া মেহরিনের সারা শরীরে শিহরণ জাগিয়ে তোলে। রাফি ফিসফিস করে বলে, "আমি তোমাকে হারাতে পারি না, মেহরিন। তোমাকে হারানোর কথা ভাবলেই আমার ভেতরের মানুষটা মরে যায়।"

 

মেহরিন চোখ বন্ধ করে রাফির শার্টের কলার খামচে ধরে। সে অনুভব করে রাফির হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক দ্রুত স্পন্দন। রাফি তাকে যতটা তীব্রভাবে ভালোবাসে, ঠিক ততটাই তীব্রভাবে তাকে দমবন্ধ করে ফেলে। এই রোমাঞ্চের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর বিষণ্ণতা। মেহরিন রাফির চুলে আঙুল চালায়, তার শক্ত বুকটার ওপর মাথা রেখে ফিসফিস করে বলে, "তুমি আমাকে এভাবে অবিশ্বাস করো না, রাফি। তোমার এই অতিরিক্ত সন্দেহই একদিন আমাদের শেষ করে দেবে।"

 

রাফি মেহরিনের মুখটা দুই হাতে তুলে ধরে তার ঠোঁটে এক গভীর, আকুলতাভরা চুমু এঁকে দেয়। সেই চুম্বনে কোনো শালীনতার বাধা ছিল না, ছিল এক প্রবল অধিকারবোধ আর হারানোর ভয়। মেহরিনও সেই চুম্বনের উত্তাপে নিজেকে সঁপে দেয়। কিন্তু চুম্বনের মাঝেই তার চোখের কোণ গড়িয়ে নামে এক ফোঁটা নোনতা জল।

 

রাফি সরে এসে মেহরিনের চোখের জল দেখতে পায়। তার ভ্রু কুঁচকে যায়। "কান্না কেন? কার কথা মনে পড়ে গেল? আসিফ?"

 

মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত রোমাঞ্চ বরফের মতো জমে গেল। রাফির মুখ থেকে ওই নামটা শোনার সাথে সাথে মেহরিনের ভেতরের সব কোমলতা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে রাফির বুক থেকে নিজেকে এক ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে রাগে ও অভিমানে।

 

"আবার সেই একই কথা!" মেহরিন চিৎকার করে উঠল। "তোমার এই অসুস্থ সন্দেহের সাথে আর এক মুহূর্তও বাঁচা সম্ভব নয়, রাফি। তুমি ভালোবাসো না, তুমি আমাকে পরাধীন করে রাখতে চাও! আজ সাফ সাফ বলে দিচ্ছি, এই অন্ধ কারাগার থেকে আমি মুক্ত হতে চাই।"

 

রাফি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে হয়তো কখনো ভাবেনি মেহরিন এভাবে তার মুখের ওপর কথা বলবে। তার চোখের চাহনি বদলে গেল। কিন্তু মেহরিন আর পিছিয়ে আসার পাত্রী নয়। সন্ধ্যার এই মেঘহীন শান্ত আকাশটার নিচে দাঁড়িয়ে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করল।

মেহরিনের চলে যাওয়ার সেই কঠিন সিদ্ধান্তের পর কেটে গেছে প্রায় দুটি মাস। আগস্ট মাসের ভ্যাপসা গরম আর গুমোট আবহাওয়া চারপাশটাকে ভারী করে রেখেছে। আকাশটা পরিষ্কার হলেও মেঘহীন সেই দিনের মতো একটা চাপা অস্বস্তি সবকিছুর মধ্যে বিরাজ করছে। উত্তরায় নিজের ছোট্ট বাসাটা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। মেহরিন তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার চেষ্টা করছে—ভার্সিটি, নিজের ফ্রিল্যান্সিং কাজ আর পরিবারের সাথে সময় কাটানো। সে রাফির সাথে সব ধরনের যোগাযোগ ছিন্ন করে দিয়েছে। ফোন নম্বর ব্লক, সোশ্যাল মিডিয়ায় সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন। সে প্রমাণ করতে চেয়েছে রাফিকে ছাড়াও সে স্বাভাবিক ও স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে।

 

কিন্তু মেহরিনের এই বাহ্যিক স্বাধীনতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অজানা শূন্যতা। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে সে প্রায়ই ভাবত রাফির কথা। রাফির সেই পাগলাটে চাহনি, তার বুকে মাথা রেখে কাটানো মুহূর্তগুলো, আর তার বাহুডোরের সেই তীব্র উষ্ণতা—কোনো কিছুই সে মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিল না। রাফির অতিরিক্ত সন্দেহ যতই বিষাক্ত হোক না কেন, তার ভালোবাসার তীব্রতাতেও কোনো খাদ ছিল না। আর ঠিক এই কারণেই দূরত্বটা মেহরিনের জন্যও কম কষ্টের ছিল না।

 

অন্যদিকে রাফির অবস্থা ছিল আরও করুণ। মেহরিনকে হারানোর পর রাফির পৃথিবী যেন পুরোপুরি থমকে গেছে। যে মানুষটা সবসময় মেহরিনের ওপর কড়া নজর রাখত, আজ সে নিজেই নিজের ভেতর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। সারাদিন অফিসের টেবিলে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে কেটে যায়, কিন্তু কাজে মন বসে না। মেহরিনের খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখে জল চলে আসে। সে বুঝতে পেরেছে, তার অতিরিক্ত সন্দেহ এবং হারানোর ভয়ই শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে তার থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। ভালোবাসা যখন বিশ্বাসের সীমানা ছাড়িয়ে বন্দিদশায় পরিণত হয়, তখন তার পরিণাম যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, রাফি আজ হাড়ে হাড়ে তা টের পাচ্ছে।

 

বর্ষার শেষ দিকের এক শুক্রবারে হঠাৎ করেই আবহাওয়া বদলাতে শুরু করল। আকাশে মেঘের ঘনঘটা না থাকলেও গুমোট গরমে দম আটকে আসার উপক্রম। অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ করেই প্রবল বেগে বাতাস বইতে শুরু করল। রাস্তায় মানুষের ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেছে। মেহরিন কোনোমতে রিকশা থেকে নেমে উত্তরার তার বাসার নিচে এসে পৌঁছাল। ঠিক তখনই গলির মুখে একটা চেনা অবয়ব তার চোখে পড়ল।

 

রাফি দাঁড়িয়ে আছে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে। তার চুলগুলো উসকোখুসকো, শার্টের হাতা গোটানো, চোখের নিচে গভীর ক্লান্তি ও অনিদ্রার ছাপ। গত দুই মাসে রাফি যেন অনেকটা শুকিয়ে গেছে। মেহরিনকে সামনে দেখতে পেয়ে রাফির পা দুটো আপনাআপনি এগিয়ে এল।

 

মেহরিন থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। সে রাফির মুখোমুখি হতে চায়নি কখনো, কিন্তু আজ ভাগ্য যেন তাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

 

"মেহরিন..." রাফির গলাটা কাঁপছিল। সে মেহরিনের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। বাতাসে রাফির গায়ের সেই চিরপরিচিত সুবাসটা নাকে আসতেই মেহরিনের চোখ দুটো ভিজে উঠল। রাফি হাত বাড়াল মেহরিনের হাতটা ছুঁতে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে হাতটা নামিয়ে নিল। তার চোখে এক অসহায় মিনতি। "একবার শুধু কথা বলতে পারি না তোমার সাথে? প্লিজ, মেহরিন... আর সহ্য করতে পারছি না। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছি।"

 

মেহরিনের রাগের জায়গাটা তখন এক বুক অভিমান আর অব্যক্ত কান্নায় ঢেকে গেছে। সে কঠোর গলায় নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল, "কেন এসেছো রাফি? আমাদের তো সব শেষ হয়ে গেছে। তুমি তো এটাই চাইতে, তাই না? তোমার সন্দেহের বেড়াজালে আমাকে বন্দি করে রাখতে রাখতে তুমি নিজেই তো আমাদের সম্পর্কটা খুন করেছ।"

 

"আমি ভুল করেছি, মেহরিন! স্বীকার করতে আমার কোনো লজ্জা নেই যে আমি অসুস্থ ছিলাম," রাফির গলার স্বর ভেঙে এল। সে হঠাৎ করেই এক পা এগিয়ে এসে মেহরিনকে নিজের শক্ত বাহুডোরে টেনে নিল। মেহরিন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও যেন পেরে উঠল না। রাফির বুকটার উষ্ণতা আর তার শরীরের কাঁপন মেহরিনকে এক নিমেষে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

 

রাফি মেহরিনের চুলে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলল, "কাউকে হারানোর ভয় আমাকে পাগল করে দিয়েছিল। আমি জানতাম না যে আমার এই অন্ধ ভালোবাসাই তোমাকে আমার থেকে কেড়ে নেবে। আমাকে একটা সুযোগ দাও, মেহরিন। আমি বদলে যাব। নিজের এই ছায়াকেও আর তোমার ওপর পড়তে দেব না।"

 

রাফির সেই গভীর আলিঙ্গন আর তার স্পর্শের তীব্র নেশা মেহরিনের সমস্ত প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাফির কাঁধে মুখ গুঁজে সে কেঁদে ফেলল হিহি করে। রাফি তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, তার হাতের উষ্ণ ছোঁয়া মেহরিনের জমাট বাঁধা কষ্টগুলোকে গলিয়ে দিল।

 

রাফি মেহরিনের চিবুকটা ধরে মুখটা ওপরে তুলল। তার চোখে জ্বলছে এক অদ্ভুত আবেগ। সে মেহরিনের চোখের জল নিজের ঠোঁট দিয়ে মুছে ফেলল, আর ঠিক তখনই তার ঠোঁট নেমে এল মেহরিনের ঠোঁটের ওপর। সে এক গভীর, সর্বগ্রাসী রোমান্টিক চুম্বন। সেই চুম্বনে কোনো রাগ ছিল না, ছিল নিখাদ অনুশোচনা, ক্ষুধা আর অন্ধ প্রেমের আকুলতা। মেহরিনও তার দুই হাত দিয়ে রাফির ঘাড় জড়িয়ে ধরে সেই চুম্বনে সাড়া দিল। চারপাশের চায়ের কাপের রিংটং শব্দ, পথচারীদের ব্যস্ততা—সবকিছু যেন মুছে গেল। তাদের এই নিবিড় মিলন আর গাঢ় রোমান্স প্রমাণ করল যে, হাজার দূরত্বের পরেও তাদের টানটা কতটা গভীর।

শরতের এক সোনালী সকালে ঢাকার উত্তরার একটি চায়ের দোকানের সামনের চত্বরে রোদ এসে পড়েছে। রাতের সেই তীব্র আবেগময় মিলনের পর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। মেহরিন আর রাফি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত, অনেক বেশি শান্ত। রাফি তার ভুল বুঝতে পেরেছে—সে বুঝতে পেরেছে যে ভালোবাসার অর্থ কাউকে খাঁচায় বন্দি করা নয়, বরং তাকে নিজের আকাশটা পুরোপুরি উপভোগ করার স্বাধীনতা দেওয়া। মেহরিনও তার হৃদয়ের সমস্ত ক্ষোভ ধুয়ে মুছে রাফিকে আবার নিজের জীবনে জায়গা করে দিয়েছে, তবে এবার শর্ত একটাই—সম্পর্কের ভিত্তি হবে অন্ধ সন্দেহ নয়, বরং নিঃশর্ত বিশ্বাস।

 

মেহরিন যখন হেঁটে আসছিল নির্দিষ্ট ক্যাফেটির দিকে, তখন তার পরনে ছিল হালকা আকাশি রঙের একটা কামিজ। খোলা চুলে রোদ পড়ে এক স্নিগ্ধ রূপ ফুটে উঠেছে তার চেহারায়। দূর থেকে রাফি তাকে দেখতে পেয়ে মৃদু হাসল। এই হাসিতে আগের সেই অসুস্থ ছটফটানি বা মালিকানার জেদ নেই; আছে এক প্রাপ্তির শান্তি আর ভালোবাসার শান্ত দীপ্তি। রাফি আজ অনেক পরিপাটি, তার চোখেমুখে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক।

 

মেহরিন এসে রাফির ঠিক সামনের চেয়ারটায় বসল। টেবিলে রাখা কাচের গ্লাসে রাখা ডাবের জল আর এক প্লেট গরম সিঙ্গারা। রাফি হাসিমুখে গ্লাসটা মেহরিনের দিকে এগিয়ে দিল।

 

"আজ এত দেরি হলো যে?" রাফির গলায় হালকা দুষ্টুমি মেশানো অভিযোগ, কিন্তু তাতে কোনো বক্রতা বা সন্দেহের লেশমাত্র নেই।

 

মেহরিন মৃদু হেসে গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে বলল, "আসবার পথে ট্রাফিকের যা অবস্থা! আর তাছাড়া একটু গুছিয়ে আসতেই তো সময় লাগে।"

 

রাফি আর কোনো জেরা করল না। সে শুধু অপলক তাকিয়ে রইল মেহরিনের মুখের দিকে। মেহরিন নিজেও বুঝতে পারল রাফির এই পরিবর্তনটা। আগের মতো প্রতিটা কথার পিঠে কৈফিয়ত চাওয়া মানুষটা আজ নিখুঁত এক শ্রোতা হয়ে গেছে। রাফি ধীরে ধীরে হাত বাড়াল টেবিলের ওপর রাখা মেহরিনের হাতের ওপর। তার ছোঁয়াতে আগের সেই ভীতিপ্রদ দখলদারিত্ব নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত সুরক্ষার আশ্বাস।

 

"জানো মেহরিন," রাফি ফিসফিস করে বলল, তার চোখের গভীরতা যেন সমুদ্রের মতো শান্ত, "তোমাকে হারিয়ে ফেলার ওই দুটো মাস নরকপারি মনে হয়েছে আমার কাছে। আমি বুঝেছি, ভালোবাসার মানে কাউকে দমবন্ধ করে রাখা নয়। তুমি যখন আমার পাশে এভাবে হাসিমুখে বসো, তখন আমার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ আমি।"

 

মেহরিনের বুকটা ভালোবাসায় ভরে উঠল। সে রাফির আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুলগুলো গলিয়ে দিল। টেবিলের নিচে তাদের হাত দুটো শক্ত করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। রোদের আলো তখন ক্যাফের কাঁচের জানাল দিয়ে ঠিক তাদের দুজনেই ছুঁয়ে গেছে। চারপাশের কোলাহল যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল।

 

রাফি চেয়ার ছেড়ে উঠে মেহরিনের ঠিক পাশ এসে বসল। তার পরিচিত সুবাসটা আবার মেহরিনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। রাফি তার বাহুডোরে মেহরিনকে হালকা করে টেনে নিল। সেই আলিঙ্গনে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল অনন্তকালের এক নিবিড় শান্তি। রাফি তার মুখটা মেহরিনের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আর কখনো তোমাকে কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন করব না, মেহরিন। আমার বিশ্বাস শুধু তোমার ওপর নয়, আমার নিজের ভালোবাসার ওপরও এসে গেছে।"

 

মেহরিন রাফির কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। সে অনুভব করল রাফির শক্তিশালী বুকের গভীর স্পন্দন—যে স্পন্দন একসময় ভয়ে কাঁপত, আজ তা আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। রাফির উষ্ণ ঠোঁটগুলো মেহরিনের কপালে এক দীর্ঘ, ভালোবাসাময় চুমু এঁকে দিল। সেই চুম্বনে অতীত ভুলের সমস্ত গ্লানি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।

 

তারা দুজনে জানালার বাইরে তাকাল। শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের টুকরোগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। কোনো ঝড় নেই, কোনো বৃষ্টি নেই—শুধু এক সোনালী রোদের আলোয় রাফি আর মেহরিনের নতুন জীবনের পথচলা শুরু হলো। বিশ্বাসের শক্ত জমিতে দাঁড়িয়ে তাদের এই গভীর রোমাঞ্চকর প্রেম পূর্ণতা পেল এক চিরন্তন সুখে।

....
👁 19