অন্ধকার রাতের বিষাক্ত ফাঁদ

বৃষ্টি পড়ছিল। ঢাকার এক নিস্তব্ধ রাত। জানালার কাঁচে পানি গড়িয়ে পড়ছে, আর ঘরের ভিতরে শুধু দুজন মানুষের শ্বাস।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

রিয়া তার চুলে আঙুল চালাচ্ছিল। চুলগুলো ভেজা, ঘামে ভেজা। আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে শুয়েছিল। তার হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছিল—দ্রুত, অস্থির, যেন কিছু লুকিয়ে রাখছে।

“তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?” রিয়া ফিসফিস করে বলল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

আরিয়ান তার চিবুক তুলে ধরল। চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখ যেন কালো সমুদ্র। গভীর, শান্ত, কিন্তু নিচে হাজার বিপদ।

“ছেড়ে যাব?” আরিয়ান হাসল। হাসির মধ্যে একটা ছুরির ধার ছিল। “তুমি আমার। আমার শরীরের প্রতিটা অংশ জানে তুমি আমার। তুমি যেখানে যাবে, আমি সেখানে থাকব। এমনকি তোমার স্বপ্নেও।”

রিয়া হাসি দিল। সেই হাসিটা ছিল বিপজ্জনকভাবে সুন্দর। সে জানত আরিয়ান বিষ। সে জানত এই ভালোবাসা তাকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলছে। কিন্তু সে বিষ পান করতে চাইত।

তারা প্রথম দেখা হয়েছিল এক বইমেলায়। রিয়া একটা পুরনো কবিতার বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আরিয়ান এসে বলেছিল, “এই বইটা তোমার জন্য নয়। এটা আমার।”

রিয়া অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। “কেন?”

“কারণ তুমি এখনো জানো না কীভাবে ভালোবাসতে হয়। আমি শেখাব।”

সেই মুহূর্ত থেকে সবকিছু বদলে গিয়েছিল।

আরিয়ান ছিল নিয়ন্ত্রণের মানুষ। সে রিয়ার প্রতিটা পদক্ষেপ জানত। সে জানত রিয়া কখন ঘুমায়, কখন কাঁদে, কখন অন্য কারো সাথে কথা বলে। রিয়ার ফোনের পাসওয়ার্ড সে জানত। রিয়ার বন্ধুদের নাম, ঠিকানা, এমনকি তাদের গোপন কথাও।

রিয়া প্রথমে ভয় পেয়েছিল। পরে সে ভয়কে ভালোবাসা বলে ভুল করেছিল।

এক রাতে আরিয়ান এসে হঠাৎ করে রিয়ার ঘরে ঢুকে পড়েছিল। রিয়া তখন অন্য একজনের সাথে ফোনে কথা বলছিল—পুরনো প্রেমিক। আরিয়ান শুধু দাঁড়িয়েছিল। কোনো কথা বলেনি। শুধু তাকিয়েছিল।

রিয়া ফোন রেখে দিয়েছিল। হাত কাঁপছিল।

“কে?” আরিয়ান শুধু একটা শব্দ বলেছিল।

“কেউ না...”

আরিয়ান এগিয়ে এসে রিয়ার গলায় হাত রেখেছিল। চেপে ধরেনি। শুধু রেখেছিল। আঙুলগুলো নরম, কিন্তু ভয়ংকর।

“কেউ না বললে আমি বিশ্বাস করি না, রিয়া। তুমি জানো।”

সেই রাতে রিয়া কেঁদেছিল। আরিয়ান তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলেছিল, “কাজ করো না। আমি আছি। শুধু আমি।”

রিয়া সেই রাতে আরিয়ানের বুকে শুয়ে ভেবেছিল—এটাই ভালোবাসা। এটাই গভীরতা। কেউ যদি এতটা চায়, তাহলে সে তো সত্যিই ভালোবাসে।

কিন্তু বিষের স্বাদ আস্তে আস্তে জেগে উঠছিল।

আরিয়ান রিয়াকে কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। “তুমি আমার সাথে থাকবে। আমি সব দেখব।” রিয়া রাজি হয়েছিল। তার বন্ধুরা দূরে সরে গিয়েছিল। আরিয়ান বলেছিল, “তারা তোমাকে ঈর্ষা করে। আমিই শুধু তোমার।”

রিয়া বিশ্বাস করেছিল।

আজ রাতে, বৃষ্টির শব্দে ঘর ভরে আছে। আরিয়ান রিয়ার শরীরে হাত বুলোচ্ছে। ধীরে। নিয়ন্ত্রিত। যেন সে একটা শিল্পকর্ম স্পর্শ করছে, যেটা শুধু তার।

“তুমি সুন্দর,” আরিয়ান বলল। “কিন্তু সুন্দর হলেই যথেষ্ট নয়। তোমাকে আমার হতে হবে। পুরোপুরি।”

রিয়া চোখ বন্ধ করেছিল। তার শরীর সাড়া দিচ্ছিল। ভালোবাসা আর ভয় মিশে একটা অদ্ভুত নেশা তৈরি করেছিল।

“আমি তোমার,” রিয়া ফিসফিস করে বলল।

আরিয়ান তার ঠোঁটে চুমু দিল। চুমুটা ছিল গভীর, দাবিদার, যেন সে রিয়ার শ্বাস কেড়ে নিচ্ছে। রিয়া হাঁপাচ্ছিল। আরিয়ানের হাত তার কোমড়ে চেপে ধরেছিল।

“বলো আবার,” আরিয়ান বলল।

“আমি তোমার...”

“আর কখনো কাউকে ছুঁতে দিও না। কথা দিচ্ছ?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

আরিয়ান হাসি দিল। সেই হাসিটা এবার নরম লাগছিল। কিন্তু রিয়া জানত—এটা মায়া।

রাত গভীর হচ্ছিল। বৃষ্টি থামছিল না। আরিয়ান রিয়াকে বুকে চেপে ধরে শুয়েছিল। রিয়ার চোখ বন্ধ। কিন্তু তার মনে একটা কথা ঘুরছিল—

যদি একদিন আমি তাকে ছেড়ে যেতে চাই?

সেই প্রশ্নটাই বিষের শুরু।

আরিয়ান তার কানে ফিসফিস করে বলল, “তুমি আমার ছায়া। ছায়া কখনো আলাদা হয় না।”

রিয়া কিছু বলল না। শুধু আরিয়ানের হৃদস্পন্দন শুনতে থাকল। দ্রুত। অস্থির। যেন সেও কিছু লুকিয়ে রাখছে।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ভিতরে দুজন মানুষ একে অপরকে ধরে আছে—ভালোবাসা নামক এক বিষাক্ত ফাঁদে।

রিয়া জানত না, আগামীকাল থেকেই এই ফাঁদ আরও শক্ত হবে।

আরিয়ান জানত।

সে সবসময় জানে।

সকাল এসেছিল ধূসর আলো নিয়ে। রিয়া চোখ খুলল। আরিয়ান আর পাশে নেই।

টেবিলে একটা নোট পড়ে আছে।

“বাইরে যেও না। আমি শীঘ্রই ফিরছি। তোমার জন্য কিছু এনেছি।”

রিয়া নোটটা হাতে নিল। আঙুল কাঁপছিল। সে জানত “কিছু” মানে কী হতে পারে। গত সপ্তাহে আরিয়ান এনেছিল একটা নতুন ফোন—পুরনোটা ভেঙে ফেলেছিল। বলেছিল, “এখন শুধু আমি তোমার সাথে কথা বলব।”

রিয়া রান্নাঘরে গেল। চা বানাতে গিয়ে দেখল ফ্রিজে কিছু নেই। আরিয়ান গতকালই সবকিছু সাজিয়ে রেখেছিল। রিয়ার পছন্দের খাবারগুলো। কিন্তু রিয়ার পছন্দ এখন আর তার নিজের নয়। আরিয়ানের পছন্দই তার পছন্দ হয়ে গেছে।

দরজার ঘণ্টা বাজল।

রিয়া দরজা খুলল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তার পুরনো বন্ধু সায়া। চোখে ভয়।

“রিয়া... তুমি ঠিক আছো?”

রিয়া দ্রুত সায়া কে ভিতরে টেনে নিল। “তুমি এখানে কেন?”

“তোমার ফোন বন্ধ। কেউ খবর পাচ্ছে না। আরিয়ান...” সায়া থামল। “লোকটা ভয়ংকর, রিয়া। সবাই বলছে।”

রিয়া হাসল। সেই হাসিটা এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। “সে ভালোবাসে আমাকে। তোমরা বুঝবে না।”

সায়া তার হাত ধরল। “রিয়া, তোমার হাতে দাগ। গলার কাছে...”

রিয়া হাত সরিয়ে নিল। “কিছু না। আমরা খেলা করছিলাম।”

সায়া চুপ করে গেল। তার চোখে অশ্রু। “তুমি আমাকে মনে রাখো। যদি কখনো সাহায্য লাগে...”

দরজা খুলল। আরিয়ান ঢুকল। হাতে একটা বড় ব্যাগ।

সায়া দ্রুত চলে গেল। আরিয়ান শুধু তাকিয়ে রইল। কোনো কথা বলল না।

রিয়া কাঁপছিল।

আরিয়ান ব্যাগটা টেবিলে রাখল। ভিতর থেকে বের করল একটা সুন্দর কালো পোশাক। আর একটা ছোট বাক্স।

“পরে নাও,” আরিয়ান বলল। “আজ রাতে আমরা কোথাও যাব না। শুধু আমরা।”

রিয়া পোশাকটা হাতে নিল। আরিয়ান তার পিছনে এসে দাঁড়াল। চুলে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, “সায়া এসেছিল?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

“কী বলেছে?”

“কিছু না...”

আরিয়ান রিয়ার কাঁধে হাত রাখল। চেপে ধরল। “মিথ্যা বলো না। তুমি জানো আমি সব জানি।”

রিয়া কেঁদে ফেলল। “সে শুধু জিজ্ঞেস করেছে আমি ঠিক আছি কিনা।”

আরিয়ান রিয়াকে ঘুরিয়ে দিল। চোখের দিকে তাকাল। “তুমি ঠিক আছো। কারণ আমি আছি। বন্ধুদের দরকার নেই। তারা তোমাকে নষ্ট করবে।”

সেই রাতে আরিয়ান রিয়াকে নিয়ে বিছানায় বসল। মোমবাতি জ্বালানো। ঘরে সুগন্ধি। সবকিছু রোমান্টিক। কিন্তু বাতাসে বিষের গন্ধ।

আরিয়ান রিয়ার গলায় একটা সরু সোনার চেইন পরাল। চেইনের নিচে একটা ছোট লক।

“এটা তোমার,” আরিয়ান বলল। “আর চাবিটা আমার কাছে।”

রিয়া স্পর্শ করল। লকটা ঠান্ডা।

“এটা খুলবে না কখনো,” আরিয়ান ফিসফিস করে বলল। “যতদিন আমি চাইব না।”

রিয়া তার চোখে তাকাল। “তুমি আমাকে ভালোবাসো?”

আরিয়ান হাসি দিল। “ভালোবাসা ছোট শব্দ। আমি তোমাকে খাই। আমি তোমাকে শ্বাস নেই। তুমি ছাড়া আমি মৃত।”

সে রিয়াকে চুমু দিল। এবার আরও গভীর। আরও দাবিদার। রিয়ার শরীর সাড়া দিল—ভয়ে, নেশায়, ভালোবাসায়। সব মিশে এক হয়ে গেছে।

রাতের পর রাত এভাবেই কাটতে থাকল। আরিয়ান রিয়াকে আরও কাছে টেনে নিল। রিয়ার পুরনো জীবন মুছে যেতে থাকল। বন্ধুরা ফোন করলে আরিয়ান ধরত। “রিয়া ব্যস্ত।”

রিয়া একদিন চেষ্টা করেছিল বেরোতে। শপিং মলে গিয়েছিল। আরিয়ান পিছনে পিছনে এসেছিল। দূর থেকে তাকিয়েছিল। রিয়া যখন ফিরে এসেছিল, আরিয়ান শুধু বলেছিল, “দেখেছো? তুমি একা থাকতে পারো না। আমি ছাড়া তুমি হারিয়ে যাও।”

রিয়া বিশ্বাস করেছিল।

এক রাতে রিয়া স্বপ্ন দেখল—সে দৌড়াচ্ছে। আরিয়ান পিছনে। সে চিৎকার করছে, কিন্তু গলায় কোনো শব্দ নেই। চেইনটা টেনে ধরে আছে।

সকালে উঠে দেখল আরিয়ান তাকিয়ে আছে।

“খারাপ স্বপ্ন?” আরিয়ান জিজ্ঞেস করল।

রিয়া মাথা নাড়ল।

আরিয়ান তার কপালে চুমু দিল। “আমি আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

রিয়া জানত—কিছুই ঠিক হচ্ছে না।

কিন্তু সে আর পালাতে পারছিল না।

কারণ আরিয়ান এখন তার শ্বাস। তার রক্ত। তার বিষ।

আর বিষ একবার শরীরে ঢুকে গেলে, বের করা যায় না সহজে।

তিন মাস পরে।

রিয়ার জীবন এখন একটা সোনার খাঁচা। সুন্দর। নিরাপদ। বিষাক্ত।

আরিয়ান তাকে নিয়ে একটা নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে। জানালাগুলো উঁচু। দরজায় দুটো তালা। রিয়ার ফোন এখন শুধু আরিয়ানের নম্বর জানে। অন্য সব মুছে ফেলা।

রিয়া আর প্রতিবাদ করে না। সে শিখে গেছে—প্রতিবাদ মানে আরও শক্ত নিয়ন্ত্রণ।

এক সন্ধ্যায় আরিয়ান এল। হাতে ওয়াইন। মোমবাতি। সবকিছু সাজানো।

“আজ আমাদের বিশেষ রাত,” আরিয়ান বলল।

রিয়া হাসি দিল। সেই হাসিটা এখন আয়নার মতো—প্রতিফলন, কিন্তু ভিতরে কিছু নেই।

তারা খেলল। আরিয়ান রিয়াকে নাচাল। গান বাজছিল—পুরনো, বিষণ্ণ, রোমান্টিক। আরিয়ান রিয়ার কোমড়ে হাত রেখে ফিসফিস করল, “তুমি আমার সবকিছু। আমি তোমাকে হারাতে পারি না।”

রিয়া তার চোখে তাকাল। “তুমি কখনো হারাবে না।”

আরিয়ান তাকে চুমু দিল। এবার চুমুটা নরম। যেন সে সত্যিই ভালোবাসে। রিয়ার চোখে জল এল।

“কেন কাঁদছো?” আরিয়ান জিজ্ঞেস করল।

“কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি,” রিয়া বলল। “এবং আমি জানি এটা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে।”

আরিয়ান চুপ করে গেল। তার চোখে প্রথমবারের মতো একটা ছায়া দেখা গেল। ভয়? না। কিছু আরও গভীর।

সে রিয়াকে বুকে টেনে নিল। “আমি জানি। আমিও জানি। কিন্তু আমি থামতে পারি না। তুমি আমার নেশা।”

সেই রাতে তারা একে অপরকে ছুঁয়েছিল যেন শেষবার। আরিয়ানের হাত রিয়ার শরীরে আঁকড়ে ধরেছিল যেন সে তাকে গিলে ফেলতে চায়। রিয়াও সাড়া দিয়েছিল—পুরোপুরি, নিঃশেষে। ভালোবাসা আর ধ্বংস এক হয়ে গিয়েছিল।

পরে, অন্ধকারে শুয়ে রিয়া বলল, “একদিন তুমি আমাকে মেরে ফেলবে।”

আরিয়ান হাসি দিল। অন্ধকারে সেই হাসি শোনা গেল। “না। আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব। আমার জন্য। চিরকাল।”

রিয়া চোখ বন্ধ করল। তার মনে পড়ল প্রথম দিনের কথা—বইমেলা, কবিতার বই, আরিয়ানের কথা: “আমি শেখাব কীভাবে ভালোবাসতে হয়।”

আরিয়ান শিখিয়েছিল। বিষাক্তভাবে। সম্পূর্ণভাবে।

সকালে রিয়া উঠল। আরিয়ান ঘুমাচ্ছে। তার মুখ শান্ত। সুন্দর। বিপজ্জনক।

রিয়া চেইনটা স্পর্শ করল। লকটা এখনও বন্ধ।

সে জানালার কাছে গেল। নিচে শহর জেগে উঠছে। মানুষ দৌড়াচ্ছে, হাসছে, বাঁচছে।

রিয়া ভেবেছিল—আমি কি আর বাঁচতে পারি?

সে আরিয়ানের দিকে তাকাল। সেই মানুষ যে তাকে ভালোবাসে এতটা, যে তার শ্বাসও নিয়ন্ত্রণ করে।

রিয়া বিছানায় ফিরে এল। আরিয়ানের বুকে মাথা রাখল।

আরিয়ান চোখ খুলল। “কোথায় গিয়েছিলে?”

“কোথাও না,” রিয়া বলল। “আমি তোমার।”

আরিয়ান তাকে চুমু দিল। নরম। মালিকানার।

রিয়া চোখ বন্ধ করে ভেবেছিল—এটাই শেষ। অথবা এটাই চিরকাল।

বাইরে সূর্য উঠছে। ভিতরে দুজন মানুষ একে অপরকে ধরে আছে।

ভালোবাসা নামক এক বিষ।

যে বিষ একবার শরীরে ঢুকলে, আর বের হয় না।

শুধু আরও গভীরে যায়।

আরও গভীরে।

আরও গভীরে।

....
👁 18