আকাশের ধূসর মেঘগুলো যেন পৃথিবীর সব দুঃখ একসঙ্গে ধারণ করে রেখেছিল। ঢাকার এক ব্যস্ত রাস্তার পাশে, একটি পুরনো বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিল রিয়া। তার হাতে একটি ছাতা, কিন্তু ছাতার নিচেও বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছিল তার চুলে। সে একটা বই খুঁজছিল—‘প্রেমের শেষ পাতা’। দোকানের মালিক বলেছিল, বইটা আর নেই। রিয়া হতাশ হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই কেউ তার কাঁধে হালকা ছোঁয়া দিল।
“মাফ করবেন… আপনার ছাতাটা একটু শেয়ার করতে পারি?”
রিয়া ঘুরে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়েছিল একজন যুবক। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু হাসিটা একেবারে আন্তরিক। তার নাম আরিফ। সেও সেই বই খুঁজতে এসেছিল। দুজনেই হেসে উঠল। বৃষ্টির মধ্যে সেই হাসির শব্দ যেন অন্যরকম শোনাল।
আরিফ বলল, “আমিও ওই বইটা খুঁজছি। মনে হয় আমাদের স্বাদ একই রকম।”
রিয়া কিছু বলতে পারল না। তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কম্পন অনুভব করল। বৃষ্টি থামল না। দুজনেই একই ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে গেল। ছাতাটা ছোট। তাদের কাঁধ প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল। রিয়ার গালে একটা লজ্জা লাল হয়ে উঠল। আরিফ লক্ষ্য করল, কিন্তু কিছু বলল না। শুধু হেসে বলল, “চা খাবেন?”
তারা কাছের এক চায়ের দোকানে গেল। বৃষ্টির শব্দ আর চায়ের গরম কাপ। আরিফ বলল তার গল্প। সে একজন ছোট গল্পলেখক। রাতে লেখে, দিনে একটা ছোট অফিসে কাজ করে। রিয়া বলল, সে একজন স্কুলের শিক্ষিকা। বাচ্চাদের গল্প শোনায়। দুজনের কথায় কথায় সময় কেটে গেল।
সেইদিন থেকেই শুরু। প্রতি শনিবার তারা সেই বইয়ের দোকানের সামনে দেখা করত। কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদ। কখনো তারা পুরনো বইয়ের পাতা উল্টাত, কখনো নীরবে বসে থাকত। আরিফ একদিন রিয়ার হাতে একটা ছোট নোট দিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল—
“তোমার চোখে যে বৃষ্টি থাকে, সেটাই আমার গল্পের শেষ লাইন।”
রিয়া সেই নোটটা বালিশের নিচে রেখে ঘুমাত। রাতে সে আরিফের কথা ভাবত। তার হাসি, তার ক্লান্ত চোখ, তার কথা বলার ধরন। একদিন আরিফ তাকে নিয়ে গেল বুড়িগঙ্গার পাশে। সূর্যাস্তের সময়। আকাশ লাল হয়ে গিয়েছিল। আরিফ রিয়ার হাত ধরল।
“রিয়া… আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
রিয়ার চোখে জল এসে গেল। সে কিছু বলতে পারল না। শুধু আরিফের হাত আরও শক্ত করে ধরল। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব কিছু থেমে গেছে। শুধু দুজনের শ্বাস আর নদীর জলের শব্দ।
তাদের প্রেম শুরু হয়েছিল বৃষ্টিতে। বেড়ে উঠেছিল পুরনো বইয়ের গন্ধে। আর গভীর হয়েছিল নদীর পাড়ে সূর্যাস্তের আলোয়।
কিন্তু প্রেম যত সুন্দর, ততই ভঙ্গুর। রিয়া জানত না, সামনে কী অপেক্ষা করছে।
এক বছর কেটে গেল। আরিফ আর রিয়ার সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছিল। তারা একে অপরের স্বপ্নের কথা বলত। আরিফ বলত, একদিন সে একটা বই লিখবে রিয়ার নামে। রিয়া বলত, সে স্কুলে বাচ্চাদের সেই বই পড়াবে। তারা বিয়ের কথাও ভেবেছিল। কিন্তু জীবন সবসময় পরিকল্পনা মেনে চলে না।
আরিফের বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গ্রামে। আরিফকে যেতে হল। রিয়া স্টেশনে এসে বিদায় জানাল। আরিফের চোখে জল ছিল।
“আমি ফিরে আসব। কথা দিচ্ছি।”
রিয়া হেসে বলল, “ফিরে এসো। আমি অপেক্ষা করব।”
কিন্তু সময় কেটে যেতে লাগল। প্রথমে এক মাস, তারপর দুই মাস। আরিফ ফোন করত, কিন্তু কথা কম হত। তার বাবার অবস্থা খারাপ। টাকার অভাব। আরিফ গ্রামেই থেকে গেল। চাকরি ছেড়ে দিতে হল। রিয়া প্রতিদিন অপেক্ষা করত। রাতে জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকাত। বৃষ্টি এলে মনে হত, আরিফ হয়তো এখনই এসে পড়বে।
একদিন আরিফের একটা চিঠি এল। তাতে লেখা ছিল—
“রিয়া, আমি আর ফিরতে পারব না। আমার জীবন এখন অন্যদিকে চলে গেছে। তুমি আমাকে ভুলে যাও। তোমার জন্য ভালো কিছু চাই।”
রিয়ার হাত কাঁপছিল। চিঠিটা পড়ে সে মেঝেতে বসে পড়ল। চোখের জল থামছিল না। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আরিফ কীভাবে এমন কথা লিখতে পারে? তারা তো এত কিছু শেয়ার করেছিল। এত স্বপ্ন দেখেছিল।
রিয়া আরিফকে ফোন করল। কেউ ধরল না। আবার করল। আবার। শেষ পর্যন্ত একদিন এক অপরিচিত মেয়ের গলা এল।
“আরিফ এখন ব্যস্ত। পরে কল করবেন।”
রিয়ার বুকটা ভেঙে গেল। সে বুঝতে পারল, আরিফ হয়তো অন্য কাউকে পছন্দ করেছে। অথবা পরিস্থিতির চাপে সে সব ভুলে গেছে। রিয়া চুপ করে গেল। স্কুলে গিয়েও মন বসত না। বাচ্চারা যখন গল্প শুনতে চাইত, সে আর পুরনো গল্পগুলো বলতে পারত না। প্রেমের গল্পগুলো তার কাছে এখন মিথ্যে মনে হত।
এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। রিয়া ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সেই পুরনো বইয়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দোকান বন্ধ। রাস্তা ফাঁকা। সে ছাতা ফেলে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল। মনে মনে বলল, “আরিফ, তুমি যদি থাকতে…।”
কিন্তু আরিফ ছিল না। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর একাকিত্ব।
রিয়া সিদ্ধান্ত নিল, সে আরিফকে ভুলবে। সময় লাগবে, কিন্তু ভুলবেই। সে নতুন করে জীবন শুরু করবে। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গেলেই আরিফের হাসি মনে পড়ত। তার কথাগুলো। “তোমার চোখে যে বৃষ্টি থাকে…”—সেই লাইনটা বারবার মাথায় ঘুরত।
একদিন স্কুলে এক সহকর্মী বলল, “রিয়া, তুমি অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছ। হাসো না আর।”
রিয়া শুধু হেসে বলল, “হাঁসিটা হয়তো বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।”
বিচ্ছেদের যন্ত্রণা এভাবেই চলতে থাকল। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। রিয়ার ভেতরের আরিফ আর বাইরের পৃথিবী আলাদা হয়ে গেল।
দুই বছর কেটে গেল। রিয়া এখন অন্য একটা শহরে চাকরি করে। নতুন স্কুল, নতুন মুখ। সে চেষ্টা করেছে ভুলে যেতে। কখনো কখনো সফলও হয়েছে। কিন্তু বর্ষাকাল এলেই সব মনে পড়ে যায়।
একদিন স্কুলের লাইব্রেরিতে গিয়ে সে দেখতে পেল একটা নতুন বই। নাম—‘বৃষ্টির নিচে তোমার নাম’। লেখক—আরিফ হাসান।
রিয়ার হাত কাঁপতে লাগল। সে বইটা খুলে দেখল। উৎসর্গপত্রে লেখা—
“যার চোখে বৃষ্টি থাকে, তাকে।”
রিয়া বইটা নিয়ে বাড়ি ফিরল। সারা রাত পড়ল। গল্পটা তাদেরই গল্প। প্রথম দেখা, চায়ের দোকান, নদীর পাড়, বিচ্ছেদ… সব। শেষে লেখা ছিল—
“আমি ফিরে এসেছি। যদি তুমি এখনো অপেক্ষা করে থাকো।”
রিয়ার চোখে জল এসে গেল। সে জানত না কী করবে। পরদিন সে লেখকের ঠিকানা খুঁজে বের করল। আরিফ এখন ঢাকায়ই থাকে। একটা ছোট ফ্ল্যাটে।
রিয়া গেল। দরজায় নক করল। দরজা খুলল আরিফ। দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। সময় যেন থেমে গেল।
আরিফ বলল, “রিয়া… তুমি এলে।”
রিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আস্তে করে বলল, “তুমি কেন চলে গিয়েছিলে?”
আরিফের চোখে জল। সে বলল সব। বাবার মৃত্যু, ঋণ, পরিবারের চাপ, একটা বাধ্যতামূলক সম্পর্কের কথা। সে সম্পর্ক টেকেনি। আরিফ পালিয়ে এসেছে। আর সেই সময় সে রিয়াকে চিঠি লিখেছিল, যাতে রিয়া অপেক্ষা না করে। যাতে রিয়া সুখী হয়।
“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভুলে যাবে। কিন্তু আমি পারিনি। প্রতিদিন তোমার কথা ভেবেছি। আর এই বইটা… এটা তোমার জন্যই।”
রিয়া আর সহ্য করতে পারল না। সে এগিয়ে গিয়ে আরিফকে জড়িয়ে ধরল। দুজনের চোখের জল এক হয়ে গেল। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল বাইরে। যেন প্রকৃতিও তাদের পুনর্মিলন উদযাপন করছে।
আরিফ বলল, “এবার আর কাউকে ছাড়ব না।”
রিয়া মাথা নাড়ল। “আমিও না।”
তারা আবার সেই পুরনো বইয়ের দোকানের সামনে গেল। দোকান এখনো আছে। মালিক বদলে গেছে। কিন্তু জায়গাটা একই। বৃষ্টি পড়ছে। দুজনে একই ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে। আরিফ রিয়ার হাত ধরল।
“গল্পের শেষ পাতা এবার তুমি লিখবে।”
রিয়া হেসে বলল, “শেষ পাতা নয়। এবার নতুন অধ্যায় শুরু।”
বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে দুজন হাঁটতে লাগল। পেছনে ফেলে আসা সব যন্ত্রণা, সামনে শুধু একটা আকাশ আর দুজনের হাত।
প্রেম কখনো শেষ হয় না। শুধু কখনো কখনো পথ হারায়। আর যখন পথ খুঁজে পায়, তখন আরও সুন্দর হয়ে ফিরে আসে।
আরিফ আর রিয়ার গল্পও তেমনই। বৃষ্টিতে শুরু, বৃষ্টিতেই আবার শুরু।
....