এক ছাতায় দুজন

বৃষ্টি নামছিল ঢাকার বিকেলে। রাস্তায় জল জমে উঠেছে, রিকশাওয়ালারা হর্ন বাজিয়ে ছুটছে, আর আকাশের রঙ ধূসর হয়ে গেছে। আনিকা দাঁড়িয়েছিল নিউমার্কেটের সামনে, ছাতা খুঁজতে খুঁজতে। তার হাতে থাকা ছাতাটা হঠাৎ বাতাসে উড়ে গিয়েছিল। চোখে জল, কিন্তু সে হাসছিল। বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে তার চুল কপালে লেগে গেছে, আর সাদা কুর্তার কাঁধে জলের দাগ পড়েছে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

তখনই একটা কালো ছাতা তার মাথার ওপর এসে থামল।

“ছুটে যাচ্ছো কেন? বৃষ্টিতে ভিজে অসুখ হবে।”

¦Ëk¢x/춺'ƒú

কণ্ঠস্বরটা মোলায়েম, একটু গম্ভীর। আনিকা মুখ তুলে দেখল। লম্বা, চওড়া কাঁধ, চোখে একটা শান্ত হাসি। তার নাম আর্য। সেদিন সে কোনো কাজের জন্যেই বেরিয়েছিল, কিন্তু বৃষ্টির কারণে আটকে গিয়েছিল। ছাতাটা সে নিজেই ধরেছিল আনিকার মাথার ওপর।

“ধন্যবাদ… কিন্তু তোমার ছাতা?” আনিকা জিজ্ঞেস করল।

“আমার আছে। তুমি নাও। আর চলো, এই ক্যাফেতে ঢুকি। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে দুজনেই ভিজব।”

তারা পাশাপাশি হেঁটে একটা ছোট্ট ক্যাফেতে ঢুকল। জানালার পাশের টেবিলে বসল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, ভেতরে কফির গন্ধ। আনিকা তার চুল মুছতে মুছতে বলল, “আমি আনিকা। তুমি?”

“আর্য।”

সেদিন তারা প্রায় দুই ঘণ্টা বসেছিল। কথা হয়েছিল বই নিয়ে, সিনেমা নিয়ে, বৃষ্টির দিনের পছন্দ নিয়ে। আনিকা জানাল যে সে একটা প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করে, আর আর্য একটা আর্কিটেকচার ফার্মে। কথায় কথায় আর্য হাসল, “তুমি কি জানো, বৃষ্টিতে ভেজা মেয়েরা সবসময়ই একটু বেশি সুন্দর লাগে?”

আনিকা লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জেগে উঠল। অনেকদিন পর কেউ এমন করে কথা বলেছে তার সাথে।

বৃষ্টি থামার পর আর্য তাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিল। রিকশায় পাশাপাশি বসে তারা চুপচাপ ছিল। শুধু মাঝে মাঝে চোখাচোখি হচ্ছিল। আনিকার বাসার সামনে নামার সময় আর্য বলল, “কাল যদি সময় থাকে, এক কাপ কফি খাবে?”

আনিকা হাসল, “হয়তো।”

সে রাতে আনিকা ঘুমাতে পারল না। মনে পড়ছিল আর্যের চোখের দিকে, তার হাসির দিকে। ফোনটা বারবার চেক করছিল। আর্য তার নম্বর নিয়েছিল, কিন্তু মেসেজ পাঠায়নি। আনিকা নিজেও পাঠায়নি।

পরের দিন অফিসে গিয়েও তার মন অন্য জায়গায় ছিল। দুপুরের দিকে ফোনে একটা মেসেজ এল।

“আজকের বৃষ্টিটা তোমার মনে আছে? আমার আছে। কফি খাবে?”

আনিকা হাসল। হ্যাঁ লিখে পাঠাল।

তারা দেখা করল আগের ক্যাফেতেই। এবার আর বৃষ্টি নেই। সূর্যের আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছে। আর্য একটা বই এনেছিল, আনিকার পছন্দের লেখকের। “গতলেক্টরের দোকান থেকে কিনেছি। তুমি বলেছিলে পড়বে।”

আনিকার চোখে জল এসে গেল। কেউ এত খেয়াল রাখে তার কথায়—এটাই তার কাছে অসাধারণ লেগেছিল।

সেদিন থেকে তাদের দেখা হওয়া শুরু হল। সপ্তাহে দু’দিন, তারপর তিন দিন। কখনো পার্কে হাঁটা, কখনো নদীর পাড়ে বসে চা খাওয়া, কখনো শুধু চুপচাপ পাশাপাশি বসে থাকা। আর্য খুব বেশি কথা বলত না, কিন্তু যখন বলত, আনিকার মন ভরে যেত। আর আনিকা যখন কথা বলত, আর্য শুধু শুনত—চোখের দিকে তাকিয়ে।

একদিন সন্ধ্যায় তারা ধানমন্ডির লেকের পাশে বসেছিল। আকাশ লাল হয়ে গেছে। আর্য হঠাৎ বলল, “আনিকা, তুমি কি জানো আমি কেন সেদিন ছাতা ধরেছিলাম?”

আনিকা তাকাল।

“কারণ তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, এই মেয়েটাকে হারিয়ে ফেললে আমি অনুশোচনা করব সারাজীবন।”

আনিকার হৃদয় দুরদুর করে উঠল। সে আর্যের হাত ধরল। শব্দ বেরোল না। শুধু হাত ধরে রাখল।

সে রাতে ফিরে আনিকা ডায়েরিতে লিখল—

“আজ প্রথমবার মনে হল, কেউ আমাকে সত্যিই দেখছে। শুধু বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেও।”

দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল খুব দ্রুত। তাদের মধ্যে একটা নীরব বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কখনো কথা বলার দরকার হত না। একটা দৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল।

কিন্তু প্রেম যখন গভীর হয়, তখন ভয়ও আসে। আনিকা ভয় পাচ্ছিল—এত সুন্দর কিছু কি টিকবে? আর্যের অতীত নিয়ে সে কিছু জানে না। আর্যও কখনো বলেনি। একদিন আনিকা জিজ্ঞেস করল, “তোমার পরিবার কেমন?”

আর্য একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, “একদিন বলব। এখন শুধু তোমাকে নিয়ে থাকতে চাই।”

আনিকা আর জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু মনে একটা ছোট্ট ছায়া রয়ে গেল।

সেই ছায়াটাই হয়তো পরে বড় হয়ে উঠবে। কিন্তু এখনো তারা শুধু প্রেমের আলোতেই ডুবে আছে। বৃষ্টির সেই প্রথম দিনের মতোই—ভিজে, অথচ সুন্দর।

আর্য একদিন আনিকাকে নিয়ে গেল তার অফিসের ছাদে। সন্ধ্যার আলোয় পুরো শহর জ্বলজ্বল করছে। সে আনিকার হাত ধরে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি। জানি, খুব তাড়াতাড়ি বলছি। কিন্তু মনে হয় না এটা তাড়াহুড়ো।”

আনিকা তার কাঁধে মাথা রাখল। চোখ বুজে বলল, “আমিও।”

সেই মুহূর্তে পুরো শহর থেমে গেছে বলে মনে হল তাদের। শুধু দুজনের শ্বাস, আর দূরের গাড়ির আওয়াজ।

এভাবেই শুরু হল তাদের গল্প। একটা বৃষ্টির দিনে, একটা কালো ছাতার নিচে। কেউ জানত না, এই প্রেম কতটা গভীর হবে, আর কতটা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

কিন্তু সেদিন তারা শুধু জানত একটা কথা—একে অপরের পাশে থাকাটাই যথেষ্ট।

প্রেম যখন গভীর হয়, তখন সময়ের হিসেব থাকে না। আনিকা আর আর্যের মধ্যে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল যেন একটা স্বপ্নের মতো। সকালে উঠেই ফোন চেক করা, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শুভরাত্রি বলা—এসবই তাদের নিয়ম হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু নিয়মের বাইরেও কিছু ছিল। আর্য কখনো কখনো হঠাৎ নিরুত্তর হয়ে যেত। দুই-একদিন ফোন ধরত না, মেসেজের জবাব দিত না। আনিকা প্রথমে ভাবত ব্যস্ত হবে। পরে ভয় পেত।

একদিন আনিকা আর্যের অফিসে গেল। সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু রিসেপশনে শুনল আর্য ছুটিতে আছে। তিন দিন ধরে। আনিকা অবাক হয়ে ফোন করল। আর্য ধরল না। সন্ধ্যায় অবশেষে মেসেজ এল—

“কিছুদিন ব্যস্ত থাকব। তোমার জন্য দুঃখিত। ভালো থেকো।”

আনিকার বুকটা শক্ত হয়ে গেল। সে জানত আর্য মিথ্যা বলছে না, কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যও বলছে না।

সেই রাতে আনিকা ঘুমাতে পারল না। মনে মনে হাজার প্রশ্ন। আর্য কি অন্য কারো সাথে আছে? নাকি কোনো সমস্যায় পড়েছে? সে আর্যের বন্ধুদের নম্বর জানত না। পরিবারের কথাও সে কখনো বলেনি বিস্তারিত।

পরের দিন অফিসে সহকর্মী রাফিয়া বলল, “তুমি কেমন আছো? মুখ ম্লান লাগছে।”

আনিকা হাসার চেষ্টা করল, “কিছু না।”

কিন্তু রাফিয়া বুঝে গিয়েছিল। বিকেলে চায়ের সময় সে বলল, “প্রেম মানে শুধু ভালোবাসা না। বিশ্বাসও। যদি সে লুকোচ্ছে, তাহলে জিজ্ঞেস করো সরাসরি।”

আনিকা সেই রাতে আর্যকে মেসেজ করল—

“আমি জানি তুমি ব্যস্ত। কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি। তুমি যদি চাও, বলো। আমি অপেক্ষা করব। কিন্তু মিথ্যা বলো না।”

জবাব এল রাত দুটোয়।

“আমি তোমাকে হারাতে চাই না। কিছুদিন পর সব বলব। বিশ্বাস করো আমাকে।”

আনিকা বিশ্বাস করার চেষ্টা করল। কিন্তু রাতগুলো লম্বা হয়ে যাচ্ছিল।

এক সপ্তাহ পর আর্য ফিরে এল। হাতে ফুল নিয়ে। আনিকার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু হাসি আছে।

“ক্ষমা করে দাও। আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি।”

আনিকা দরজা খুলে দিল। তারা বসল। আর্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার মা অসুস্থ। ক্যানসার। শেষ পর্যায়। আমি ওকে দেখতে গিয়েছিলাম গ্রামে। বলতে চাইনি, কারণ তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।”

আনিকার চোখে জল চলে এল। সে আর্যকে জড়িয়ে ধরল।

“তুমি কেন বলোনি? আমি তোমার সাথে থাকতে পারতাম।”

আর্য মাথা নাড়ল, “এখনো সময় আছে। তুমি যদি চাও, আমার সাথে চলো।”

আনিকা ছুটি নিয়ে আর্যের সাথে চলে গেল। গ্রামের ছোট্ট বাড়ি। আর্যের মা খুব দুর্বল, কিন্তু চোখে আলো আছে। তিনি আনিকার হাত ধরে বললেন, “তুমিই সেই মেয়ে? আর্য যার কথা বলে।”

আনিকা কেঁদে ফেলল।

সেখানে তারা তিন দিন কাটাল। আর্যের মায়ের সেবা করল আনিকা। রাতে আর্য আর আনিকা বাড়ির উঠোনে বসে তারা দেখত। আর্য বলল, “আমার বাবা অনেক আগে চলে গেছেন। মাকে আমিই দেখি। ভয় পাই, যদি তুমি এসব দেখে দূরে সরে যাও।”

আনিকা তার হাত চেপে ধরল, “আমি দূরে যাব না। তোমার পাশেই থাকব।”

সেই মুহূর্তে তাদের প্রেম আরও গভীর হল। শুধু আনন্দের নয়, সহানুভূতির, দায়িত্বের।

কিন্তু ফিরে এসে নতুন সমস্যা শুরু হল। আর্যের কাজের চাপ বেড়ে গেল। মায়ের চিকিৎসার খরচ। আনিকা দেখল আর্য রাত জেগে কাজ করছে। তার চোখে ঘুম নেই।

একদিন আনিকা বলল, “আমাকে বলো, আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি।”

আর্য হাসল, “তুমি আছো, এটাই যথেষ্ট।”

কিন্তু আনিকার মনে হচ্ছিল যথেষ্ট নয়। সে আর্যের জন্য কিছু করতে চায়।

এদিকে আনিকার অফিসেও চাপ বাড়ছে। একটা বড় প্রজেক্ট। ডেডলাইন। তারা দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দেখা কম হয়ে গেল। ফোনের কথাও সংক্ষিপ্ত।

এক রাতে আনিকা ফোন করল। আর্য ধরল না। পরের দিনও না। তৃতীয় দিন মেসেজ এল—

“মা হাসপাতালে। খুব খারাপ অবস্থা। পরে কথা বলব।”

আনিকা ছুটে গেল হাসপাতালে। আর্য করিডোরে বসে আছে। চোখ লাল। আনিকা পাশে বসল। কিছু বলল না। শুধু হাত ধরল।

সেই রাতে আর্যের মা চলে গেলেন।

আর্য কেঁদেছিল আনিকার কাঁধে। প্রথমবার। আনিকাও কেঁদেছিল। তাদের প্রেম সেদিন আরও একটা পরীক্ষা পার করল।

দাফনের পর আর্য গ্রামেই থেকে গেল কয়েকদিন। আনিকা ফিরে এল ঢাকায়। একা। মনটা খালি খালি লাগছে।

ফিরে এসে আর্য আরও চুপচাপ হয়ে গেল। কথা কম। হাসি কম। আনিকা বুঝতে পারছিল তার ব্যথা। কিন্তু সাহায্য করতে পারছিল না পুরোপুরি।

একদিন তারা পার্কে বসেছিল। আর্য হঠাৎ বলল, “আনিকা, হয়তো আমি তোমাকে সুখী রাখতে পারব না। আমার জীবন এখন অনেক জটিল।”

আনিকার গলা শুকিয়ে গেল। “তুমি কী বলতে চাও?”

“আমি শুধু বলছি… তুমি যদি অন্য কাউকে চাও, আমি বুঝব।”

আনিকা উঠে দাঁড়াল। চোখে জল। “তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে এমন কথা বলো না। আমি তোমার সাথেই থাকতে চাই। সুখে-দুঃখে।”

আর্য কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে রইল।

সেই রাতে আনিকা ভেবেছিল—প্রেম কি শুধু সুন্দর মুহূর্তগুলোতেই থাকে? নাকি কষ্টের সময়ও?

উত্তর সে জানত। কিন্তু আর্য কি জানে?

তাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। শরীর কাছাকাছি, মন দূরে। আনিকা চেষ্টা করছিল সেই দূরত্ব কমাতে। আর্যও চেষ্টা করছিল, কিন্তু ব্যথা তাকে আটকে রাখছিল।

একদিন আনিকা সিদ্ধান্ত নিল। সে আর্যকে নিয়ে যাবে কোথাও—যেখানে শুধু তারা দুজন। কোনো স্মৃতি নেই, কোনো কষ্ট নেই। শুধু নতুন শুরু।

সে টিকিট কাটল কক্সবাজারের। আর্যকে বলল, “চলো। কয়েকদিনের জন্য শহর ছেড়ে।”

আর্য প্রথমে রাজি হল না। পরে আনিকার চোখের দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ বলল।

তারা চলে গেল। সমুদ্রের পাশে। ঢেউয়ের শব্দ। লাল সূর্যাস্ত।

সেখানে এক সন্ধ্যায় আর্য আনিকার হাত ধরে বলল, “আমি ভয় পাচ্ছিলাম তোমাকে হারাবো। তাই দূরে সরে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি থাকলে… আমি বাঁচি।”

আনিকা তার কপালে চুমু খেল। “আমিও।”

সেই রাতে সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে তারা একে অপরের কাছে ঘুমিয়ে পড়ল। প্রথমবারের মতো নিশ্চিন্তে।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। ফিরে এসে নতুন একটা ঝড় অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য।

কক্সবাজার থেকে ফিরে এসে আনিকা আর আর্যের সম্পর্ক আবার নতুন করে শুরু হল। যেন বৃষ্টির পর রোদ উঠেছে। আর্য আবার হাসতে শিখল। আনিকাও নিশ্চিন্ত হল।

কিন্তু শহরে ফিরেই একটা চিঠি এল আর্যের নামে। পুরনো। হাতে লেখা। পাঠিয়েছে কেউ একজন—নাম লেখা নেই, শুধু ঠিকানা।

আর্য চিঠিটা পড়ে চুপ করে গেল। আনিকা জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

আর্য চিঠিটা তার হাতে দিল।

লেখা ছিল—

“আর্য, আমি জানি তুমি আমাকে ভুলে গেছো। কিন্তু আমি পারি না। আমি ফিরে এসেছি। দেখা করো। —নয়ন।”

আনিকার হাত কাঁপল। “নয়ন কে?”

আর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমার প্রাক্তন। পাঁচ বছর আগে। আমরা বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার পরিবার রাজি হয়নি। সে বিদেশ চলে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম সব শেষ।”

আনিকা চুপ করে রইল। মনে অনেক কথা ঘুরছে।

আর্য তার হাত ধরল, “আনিকা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। নয়ন আমার অতীত। তুমি আমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ।”

আনিকা বিশ্বাস করতে চাইল। কিন্তু ভয়ও পেল।

পরের দিন আর্য নয়নের সাথে দেখা করল। আনিকা জানত। সে অপেক্ষা করছিল। সন্ধ্যায় আর্য ফিরে এল। মুখ গম্ভীর।

“সে এখনো আমাকে চায়। বলেছে, ফিরে এসো।”

আনিকার বুকটা ভেঙে গেল। “তুমি কী বললে?”

“না বলেছি। কিন্তু সে সহজে মানবে না।”

পরের কয়েকদিন নয়ন ফোন করছিল, মেসেজ পাঠাচ্ছিল। আর্য ব্লক করল। কিন্তু একদিন অফিসের সামনে নয়ন এসে দাঁড়াল। আনিকাও সেখানে ছিল।

নয়ন সুন্দরী। আত্মবিশ্বাসী। সে আনিকার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিই সেই মেয়ে? আর্য তোমাকে বেছে নিয়েছে। কিন্তু মনে রেখো, সে একসময় আমাকেও ভালোবেসেছিল।”

আনিকা কিছু বলল না। আর্য নয়নকে সরিয়ে দিল।

সেই রাতে আনিকা কেঁদেছিল। আর্য পাশে বসে মুছছিল তার চোখের জল। “আমি তোমাকে হারাবো না। কখনো না।”

কিন্তু সন্দেহের বীজ মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। আনিকা মাঝে মাঝে ভাবত—আর্য কি সত্যিই ভুলে গেছে নয়নকে?

একদিন আনিকা সিদ্ধান্ত নিল। সে নয়নের সাথে কথা বলবে। একা।

তারা দেখা করল একটা ক্যাফেতে। নয়ন হাসল, “তুমি সাহসী।”

আনিকা সোজাসুজি বলল, “আর্যকে ছেড়ে দাও। সে সুখী আমার সাথে।”

নয়ন চুপ করে থেকে বলল, “আমিও একসময় ভেবেছিলাম সে আমার। কিন্তু জীবন অন্যরকম। আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম, সে কি সত্যিই সুখী। যদি হয়, তাহলে আমি চলে যাব।”

আনিকা অবাক হল।

নয়ন উঠে দাঁড়াল। “তাকে ভালোবাসো। আমি আর ফিরব না।”

সে চলে গেল। আনিকা বুঝতে পারল—কখনো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বীও সম্মান করতে পারে প্রেমকে।

ফিরে এসে আনিকা সব বলল আর্যকে। আর্য তাকে জড়িয়ে ধরল। “তুমি আমার সব।”

এর পরের মাসগুলো কেটে গেল শান্তিতে। আর্য মায়ের স্মৃতি নিয়ে শান্ত হয়ে উঠল। আনিকা তার পাশে রইল। তারা একসাথে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নিল। ঘর সাজাল। রান্না করল একসাথে। রাতে গল্প করল।

একদিন সন্ধ্যায় আর্য হাঁটু গেড়ে বসল। হাতে একটা ছোট্ট বক্স।

“আনিকা, তুমি কি আমার সাথে সারাজীবন কাটাবে? বিয়ে করবে আমাকে?”

আনিকার চোখে জল। সে হ্যাঁ বলল।

বিয়ের দিন বৃষ্টি নামল। ঠিক সেই প্রথম দিনের মতো। আনিকা হাসল, “দেখো, বৃষ্টি আমাদের সাক্ষী।”

আর্য ছাতা ধরল তার মাথার ওপর। “আজ থেকে সারাজীবন।”

তারা বিয়ে করল ছোট্ট করে। শুধু কাছের মানুষ। কোনো আড়ম্বর নেই। শুধু ভালোবাসা।

বিয়ের পর জীবন সহজ হয়নি। কাজের চাপ, অর্থের টানাটানি, কখনো কখনো ঝগড়া। কিন্তু প্রতিবার তারা ফিরে এসেছে একে অপরের কাছে।

একদিন রাতে আনিকা গর্ভবতী হওয়ার খবর দিল। আর্য কেঁদে ফেলল আনন্দের।

তাদের ছেলে হল। নাম রাখল আকাশ—কারণ তাদের প্রেম শুরু হয়েছিল আকাশের নিচে, বৃষ্টির দিনে।

বছর কেটে গেল। আনিকা আর আর্য বুড়িয়ে গেল। কিন্তু প্রেমটা একই রইল। প্রতিবার বৃষ্টি নামলে আর্য আনিকার হাত ধরে বলত, “মনে আছে?”

আনিকা হাসত, “মনে আছে।”

একদিন বৃদ্ধ বয়সে আর্য অসুস্থ হয়ে পড়ল। হাসপাতালে। আনিকা পাশে বসে আছে। আর্য দুর্বল গলায় বলল, “আনিকা, যদি আমি চলে যাই… তুমি একা থাকবে না তো?”

আনিকা তার হাত চেপে ধরল। “তুমি কোথাও যাবে না। আর যদি যাও, আমিও যাব তোমার সাথে। কারণ আমি শিখেছি—প্রেম মানে শুধু একসাথে থাকা নয়। একসাথে থাকা আর একসাথে চলে যাওয়া—দুটোই।”

আর্য হাসল। চোখ বুজে নিল।

কিন্তু সে বেঁচে গেল। আবার ফিরে এল। আরও কয়েক বছর তারা একসাথে কাটাল।

শেষ পর্যন্ত এক সকালে আর্য চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ল। আর আর জাগল না। আনিকা তার পাশে বসে ছিল। কেঁদেছিল, কিন্তু শান্ত ছিল।

তারপর সে একা থাকল। কিন্তু একা মনে হয়নি। কারণ প্রতিটা বৃষ্টিতে আর্যের ছাতা মনে পড়ত। প্রতিটা সন্ধ্যার আলোতে তার হাসি।

আনিকা ডায়েরিতে লিখল শেষ পাতায়—

“প্রেম শেষ হয় না। শুধু রূপ বদলায়। সে ছিল আমার প্রথম বৃষ্টি। আর আমি ছিলাম তার শেষ আশ্রয়।”

গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু প্রেমটা থেকে গেল—বৃষ্টির ফোঁটায়, বাতাসে, আর দুজন মানুষের স্মৃতিতে।

যারা একে অপরকে ভালোবেসেছিল সত্যি করে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

....
👁 17