প্রতারণার আড়ালে গভীর টান

ঢাকার ধানমন্ডি লেকের পাড়ের মৃদু বাতাসে বিকেল তখন গলে গলে পড়ছে। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে লেকের জলের হালকা ছলাৎ ছলাৎ শব্দ এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিল। নাওরিন একটা নীল রঙের কুর্তি পরে লেকের ধারের পাথুরে বেঞ্চটায় একা বসে ছিল। তার হাতে একটা কবিতার বই, কিন্তু চোখের দৃষ্টি অন্য কোথাও। সে অপেক্ষা করছিল তার অফিসের এক সহকর্মীর জন্য, যার সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ফাইল এক্সচেঞ্জ করার কথা ছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে এসে হাজির হলো দীপ্ত। দীপ্ত ভেবেছিল, সে যার সাথে মিট করতে এসেছে সে অন্য কেউ। ভুল বোঝাবুঝির শুরুটা ঠিক ওই মুহূর্ত থেকেই। দীপ্ত নাওরিনের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল এবং একটু মুচকি হেসে বলল, "আপনি কি রাইসা? মানে, অর্ণবের পাঠানো সেই নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট?"

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

নাওরিন চমকে উঠে বই থেকে চোখ তুলল। ভ্রু কুঁচকে সে দীপ্তের দিকে তাকাল। রাইসা নামে কাউকে সে চেনে না, আর অর্ণব কে তাও তার জানা নেই। রাগী ও বিরক্ত সুরে সে বলল, "না, আমি রাইসা নই। আর আপনি কে বলুন তো? হুট করে এসে এভাবে জেরা করছেন কেন?"

 

দীপ্ত একটু অপ্রস্তুত হলো। সে নাওরিনের মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সে সত্যিই ভুল জায়গায় ভুল মানুষকে ধরেছে। কিন্তু নাওরিনের চোখের দীপ্তি আর তার আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমা দীপ্তর মনে একটা অদ্ভুত ভালো লাগা তৈরি করল। দীপ্ত নিজের ভুল স্বীকার করে মিষ্টি হেসে বলল, "আসলে দারুণ একটা ভুল হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম আপনি অন্য কেউ। তবে আপনার সাথে এভাবে কথা বলাটাও মন্দ নয়। আমি দীপ্ত।"

 

নাওরিন প্রথমে গম্ভীর হয়ে থাকলেও দীপ্তর সাবলীল এবং মার্জিত আচরণে তার রাগ অনেকটাই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে হালকা হেসে বলল, "আমি নাওরিন। আর আপনার এই ভুলটা কিন্তু বেশ অদ্ভুত।"

 

এভাবেই এক অদ্ভুত ভুল পরিচয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হলো নাওরিন আর দীপ্তর সম্পর্কের প্রথম অধ্যায়। এরপর থেকে প্রায়ই ধানমন্ডি লেকে, কিংবা কখনো বারিধারার কোনো কফি শপে তাদের দেখা হতে লাগল। প্রথমে সেটা আকস্মিক হলেও ধীরে ধীরে তা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলো। দিনের পর দিন তাদের কথাবার্তা শুধু কাজের গণ্ডিতে আটকে রইল না, বরং তা ব্যক্তিগত অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দ এবং জীবনের ছোটোখাটো গল্পে গড়াল।

 

সময় যেন চোখের পলকে গড়িয়ে যেতে লাগল। বর্ষার এক গুমোট বিকেলে তারা দুজনে বসেছিল গুলশানের একটা ক্যাফেতে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি পড়ছে, জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য এক মোহময় পরিবেশ তৈরি করেছিল। ক্যাফের নরম আলো আর কফির উষ্ণ কাপের ধোঁয়া তাদের মাঝের দূরত্বটাকে আরও কমিয়ে দিয়েছিল।

 

দীপ্ত ঝুঁকে বসল নাওরিনের আরও কাছাকাছি। তাদের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। নাওরিনের হৃদস্পন্দন প্রচণ্ড গতিতে বাড়তে শুরু করল। দীপ্ত তার হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁল নাওরিনের আঙুল। সেই ছোঁয়া যেন বিদ্যুৎ চমকের মতো ছড়িয়ে পড়ল নাওরিনের সারা শরীরে। দীপ্ত ফিসফিস করে বলল, "নাওরিন, সত্যি বলছি, এই ভুল পরিচয়ের নাটকটা যদি আমার জীবনে না আসত, তবে আমি হয়তো জানতেই পারতাম না যে কারো উপস্থিতি এতটা নেশার মতো হতে পারে।"

 

নাওরিন দীপ্তর চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখন কেবলই আকুলতা আর গভীর ভালোবাসা। সে কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু তার কাঁপানো চোখের পলকই বলে দিল তার মনের ভেতরের তোলপাড়। দীপ্ত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আস্তে করে তার হাত দিয়ে নাওরিনের চিবুকটা একটু উঁচুতে তুলল। নাওরিন চোখ বন্ধ করে ফেলল। দীপ্তর উষ্ণ ঠোঁট যখন আলতো করে ছুঁল নাওরিনের ঠোঁট, তখন চারপাশের পৃথিবী যেন থমকে গেল। সেই চুম্বনে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল এক গভীর আবেশ ও আকুতি। প্রথম ছোঁয়ায় নাওরিন কেঁপে উঠলেও সে নিজেকে সঁপে দিল দীপ্তর সেই নিবিড় উত্তাপে। তাদের সেই রোমান্টিক মূহূর্তটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে লাগল, যেখানে শুধু দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ আর ভালোবাসার তীব্রতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।

 

পরের কয়েক সপ্তাহ তাদের সম্পর্ক এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছাল। তারা একে অপরকে ছাড়া একটা দিনও কল্পনা করতে পারত না। দীপ্তর হাতের উষ্ণ স্পর্শ, তার বুকে মাথা রেখে নাওরিনের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাওয়া—সব মিলিয়ে তাদের প্রেম তখন এক গভীর নদীর মতো প্রবহমান। গভীর রাতে দীর্ঘ ফোনালাপ, একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে নীরব ভাষায় কথা বলা, আর নির্জন কোনো ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে দীপ্তর শক্ত বাহুডোরে আবদ্ধ হওয়া—নাওরিনের জীবন যেন এক রূপকথায় পরিণত হয়েছিল। দীপ্ত তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে নাওরিন বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, এই ভালোবাসা কখনো ফুরোবার নয়।

 

কিন্তু এই গভীর নেশা আর সুখের জাল কি চিরস্থায়ী হতে পারে? গল্পের মোড় ঘোরার সময় তখন ঘনিয়ে আসছিল। নাওরিন জানত না যে দীপ্তর জীবনে এমন কিছু সত্য লুকিয়ে আছে, যা তাদের এই সুন্দর মুহূর্তগুলোকে এক নিমিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে পারে। প্রথম পর্বের এই রোমাঞ্চ আর ভালোবাসার রেশ কাটতে না কাটতেই আকাশে তখন কালো মেঘ জমতে শুরু করেছিল।

নাওরিন আর দীপ্তর ভালোবাসার নৌকাটা যখন এক অদ্ভুত নেশায় ভাসছিল, ঠিক তখনই নিয়তির এক নির্মম ধাক্কা তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। বসন্তের এক মিষ্টি বিকেলে তারা উত্তরায় একটা নিরিবিলি রেস্তোরাঁয় বসে কফি খাচ্ছিল। দীপ্তর মেজাজ সেদিন কেমন যেন একটু অন্যরকম ছিল। সে বারবার তার ফোনটা চেক করছিল এবং তার চোখেমুখে একটা অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল। নাওরিন সেটা লক্ষ করলেও প্রথমে পাত্তায় দেয়নি, ভেবেছিল অফিসের কোনো কাজের চাপ হয়তো।

 

ঠিক সেই মুহূর্তে রেস্তোরাঁর দরজায় এসে দাঁড়াল এক তরুণী। তার পরনে চমৎকার একটা জামদানি শাড়ি, চোখে চোখে তীব্র আত্মবিশ্বাস। সে সোজা হেঁটে এসে সরাসরি দীপ্তর টেবিলের সামনে থামল। নাওরিন অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল। মেয়েটি দীপ্তর দিকে এক পলক তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "দীপ্ত, তুমি এখানে লুকিয়ে আছো? আর কতদিন এই মিথ্যে নাটক চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আছে তোমার?"

 

দীপ্ত যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে দ্রুত দাঁড়িয়ে পড়ে নার্ভাস গলায় বলল, "আহনাফ... মানে মাহি, তুমি এখানে কী করছো? আর তুমি কী সব বলছ?"

 

নাওরিনের বুকটা কেঁপে উঠল। সে থরথর করে কেঁপে উঠে দীপ্তের দিকে তাকাল এবং জিজ্ঞাসা করল, "দীপ্ত, এই মেয়েটি কে? আর কীসের নাটকের কথা বলছে সে?"

 

মাহির মুখে একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটে উঠল। সে নাওরিনের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলল, "তুমি হয়তো জানো না, এই দীপ্ত গত ছয় মাস ধরে তোমার সাথে যা করছে তা একটা বড়ো প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। দীপ্তর সাথে আমার বিয়ের এনগেজমেন্ট হয়েছে গত বছরই। ও শুধু তোমার সাথে সময় কাটানোর জন্য একটা টাইমপাস হিসেবে ব্যবহার করছিল।"

 

কথাগুলো নাওরিনের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো শোনাল। সে দীপ্তর চোখের দিকে তাকাল। দীপ্তর চোখ তখন মাটিতে নামানো, সে কোনো সাফাই গাইতে পারল না। দীপ্তর সেই নীরবতাই বুঝিয়ে দিল যে মাহি যা বলছে তার পুরোটাই সত্যি। নাওরিনের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। তার সারা শরীর কাঁপতে শুরু করল। বুকের ভেতরটা তীব্র অভিমানে মোচড় দিয়ে উঠল। সে দীপ্তর দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় শুধু বলল, "তুমি এত নিচে নামতে পারলে দীপ্ত? আমার ভালোবাসা তোমার কাছে একটা খেলা ছিল?"

 

দীপ্ত হাত বাড়িয়ে নাওরিনের হাত ধরতে গেল এবং আকুল গলায় বলে উঠল, "নাওরিন, বিশ্বাস করো, পরিস্থিতি এমন ছিল যে আমি সাথে সাথে সব বলতে পারিনি। আমি তোমায় সত্যিই ভালোবাসি, মাহিকে নয়..."

 

"থামো!" চিৎকার করে উঠল নাওরিন। তার চোখ দিয়ে তখন কান্নার বাঁধ ভেঙে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে দীপ্তর হাতটা সজোরে সরিয়ে দিল। সেই ছোঁয়ায় আর আগের মতো উষ্ণতা ছিল না, ছিল চরম ঘৃণা আর অবিশ্বাস। নাওরিন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, দ্রুত পায়ে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল।

 

বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। নাওরিন সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে রিকশায় উঠল। তার মনের ভেতরটা শূন্য হয়ে গেছে। দীপ্তর সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, সেই চুম্বনের উষ্ণতা, লেকের ধারের সেই মিষ্টি বিকেলগুলো—সবকিছু যেন এক নিমেষে একটা বড়ো মিথ্যা বলে মনে হতে লাগল। সে নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করল যে কেন সে এত সহজে অন্ধের মতো একজন মানুষকে বিশ্বাস করেছিল।

 

বাসায় ফিরে আসার পর থেকেই নাওরিনের দুনিয়াটা উল্টে গেল। দীপ্তর একের পর এক ফোন কল এবং মেসেজ আসতে লাগল। দীপ্ত বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে মাহিকে বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে পরিবারের চাপে, কিন্তু সে ভালোবাসে শুধু নাওরিনকেই। কিন্তু নাওরিনের আত্মসম্মানবোধ এত সহজে পসার দেওয়ার পাত্রী ছিল না। সে দীপ্তর সমস্ত নম্বর ব্লক করে দিল এবং নিজের পৃথিবী থেকে দীপ্তকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার কঠিন সিদ্ধান্ত নিল।

 

এদিকে দীপ্ত নাওরিনকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, মাহিকে জীবনের সাথে জড়িয়ে সে নিজের সবথেকে বড়ো ভুল করেছে। যে মানুষটাকে সে সত্যিই ভালোবাসত, তাকে নিজের হাতে হারিয়ে সে এখন সর্বস্বান্ত। উত্তরায় সেই রেস্তোরাঁর ঘটনার পর কেটে গেছে দুটো মাস। নাওরিন এখন আর ধানমন্ডি লেকে যায় না, সে নিজেকে পুরোপুরি ব্যস্ত রেখেছে নিজের কেরিয়ার আর কাজের মধ্যে। কিন্তু রাতে একা শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে, দীপ্তের দেওয়া সেই গভীর শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।

দুটো মাস কেটে গেছে একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো। বর্ষার মেঘ কেটে গিয়ে শরৎকালের হালকা আকাশ এখন সাদা তুলোর মতো মেঘে ঢাকা। কিন্তু নাওরিনের মনের আকাশ থেকে সেই কালো মেঘ আজও কাটেনি। সে অফিসের কাজে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যস্ততার ভিড় পেরিয়ে যখনই রাত নামে, তখনই দীপ্তের স্মৃতিগুলো হুড়মুড় করে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সে যতই চেষ্টা করুক না কেন, দীপ্তর সেই স্পর্শ, তার চোখের আকুলতা আর হৃদয়ের গভীরের টান সে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারে না।

 

এদিকে দীপ্তর জীবন হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত নরক। পরিবার ও সমাজের চাপে সে মাহিকে বিয়ে তো করেছে, কিন্তু মনটাকে সে কোনোভাবেই সেই সম্পর্কে বাঁধতে পারেনি। প্রতিদিনের ছাদ, সংসার আর চারপাশের কোলাহল তার কাছে অর্থহীন ঠেকে। মাহির সাথে তার কেবল শারীরিক উপস্থিতি রয়েছে, কিন্তু মনের দিক থেকে সে অনেক আগেই মৃত। সে প্রতি মুহূর্তে বুঝতে পেরেছে, জীবনে অনেক কিছু জোর করে পাওয়া যায়, কিন্তু যার জন্য মন কেঁদে ওঠে তাকে হারিয়ে ফেললে সারা পৃথিবীর সুখও সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। দীপ্তর চোখের নিচে জমে গেছে ক্লান্তি আর অনুশোচনার গভীর কালো দাগ।

 

শরতের এক ছুটির দিন বিকেলে কাকতালীয়ভাবে হলেও তাদের আবার দেখা হয়ে গেল। স্থানটি সেই ধানমন্ডি লেক—যেখান থেকে তাদের ভালোবাসার গল্পটা শুরু হয়েছিল, আবার যেখান থেকেই সবকিছু জটিল হয়ে উঠেছিল। নাওরিন সেদিন একটা হালকা হলুদ কুর্তি পরে লেকের ধারের চেনা সেই পাথুরে বেঞ্চটার পাশ দিয়ে হাঁটছিল। তার কানে গোঁজা ছিল ইয়ারফোন, চোখে আনমনা চাহনি।

 

হঠাৎ করেই তার সামনে এসে দাঁড়াল দীপ্ত।

 

দীপ্তকে সামনাসামনি দেখে নাওরিনের পা দুটো যেন মাটিতে জমে গেল। সে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই দীপ্ত অত্যন্ত নরম অথচ কাঁপানো গলায় বলে উঠল, "দাঁড়াও নাওরিন, শুধু একটা মিনিট। আর কোথাও পালাব না, শুধু তোমার চোখের দিকে শেষবারের মতো একটু তাকাতে দাও।"

 

নাওরিনের বুকটা কেঁপে উঠল। সে দীপ্তর দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল তার সেই চিরপরিচিত মানুষটার চোখে রাজ্যের ক্লান্তি, যন্ত্রণা আর এক সমুদ্র অনুশোচনা। দীপ্তর ঠোঁট কাঁপছে, চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে চাইছে লুকোনো জল।

 

আবেগ আর অভিমানের মিশ্রণে নাওরিনের গলা দিয়ে কথা বের হলো না। সে শুধু ঠান্ডা গলায় বলল, "কেন এসেছো দীপ্ত? আর কী বাকি আছে? যাকে তোমার জীবনে চিরতরে মুছে ফেলেছি, তাকে নতুন করে জাগানোর তো কোনো মানে হয় না।"

 

দীপ্ত এক পা এগিয়ে এসে তার দুই হাত জোড় করার মতো ভঙ্গিতে নিচু গলায় বলল, "জানি, আমি তোমার সাথে অন্যায় করেছি। তোমার সরল ভালোবাসাকে আমি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করো নাওরিন, এই দুমাসের প্রতিটা সেকেন্ড আমার কাছে একটা শতাব্দীর সমান কেটেছে। আমি যাকে প্রতিদিন পাশে দেখছি, সে আমার স্ত্রী হতে পারে, কিন্তু আমার হৃদয় জুড়ে শুধু তুমি আছো। তোমায় হারিয়ে আমি বুঝেছি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিল সেদিন সত্যিটা লুকিয়ে রাখা।"

 

দীপ্তের এই আকুল স্বীকারোক্তি নাওরিনের সমস্ত শক্তের খোলস এক নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দিল। সে বুঝল, দীপ্ত যতই ভুল করুক না কেন, তার ভেতরের ভালোবাসাটা মিথ্যা ছিল না। কিন্তু তাদের এই মিলনের পথে সমাজ, নিয়ম আর বাস্তবতার এক বিশাল পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। মাহিকে নিয়ে দীপ্তর যে সংসার, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা আর চাইলেও সম্ভব নয়।

 

নাওরিন গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ থেকেও তখন জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল গালের ওপর। সে দীপ্তর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত অথচ অটল সুরে বলল, "দীপ্ত, আমরা হয়তো ভুল জায়গায় শুরু করেছিলাম, কিন্তু আমাদের এই গল্পটা এভাবেই শেষ হওয়ার ছিল। তুমি তোমার জায়গায় ফিরে যাও, আর আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। কিছু শূন্যতা জীবনে থেকে যাওয়াই ভালো, কারণ সব শূন্যতা পূরণ করতে নেই।"

 

দীপ্ত আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। নাওরিন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, দীপ্তকে পেছনে ফেলে সে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।

 

লেকের জলের মৃদু ঢেউয়ে তখন সন্ধ্যার আলো এসে কাঁপছে। দীপ্ত একা দাঁড়িয়ে রইল সেই একই জায়গায়, যেখানে সে প্রথম নাওরিনকে ভুল বুঝেছিল। আজ ভুল বোঝাবুঝি কেটে গেছে, কিন্তু দূরত্ব আরও অনেক বেশি দীর্ঘ হয়ে গেছে। কিছু মানুষ জীবনে হঠাৎ আসে, ঝড়ের মতো তোলপাড় করে যায়, আর চলে যাওয়ার সময় এমন এক অন্তহীন শূন্যতা রেখে যায়—যা সারা জীবনেও কেউ কোনোদিন পূরণ করতে পারে না।

....
👁 55