নিঃসঙ্গতার অবসান হলো

বিয়ের পর থেকে নিহানের আচরণ মায়াবীর কাছে এক জটিল ধাঁধার মতো। চারদিকে যখন নতুন বউকে বরণ করে নেওয়ার উৎসব মুখর পরিবেশ, তখন নিহানের চোখে মুখে এক অদ্ভুত অচেনা ভাব। প্রথম দেখাতেই মায়াবী বুঝেছিল, এই মানুষটার মধ্যে কোনো জোড়াতালি দেওয়া কৃত্রিমতা নেই, কিন্তু এক শীতল দূরত্ব যেন সবসময় তাকে ঘিরে থাকে। নিহান ঘরে ঢোকে গম্ভীর মুখে, প্রয়োজনীয় দু-একটি কথা বলে নিজের ল্যাপটপ বা ফাইলপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাতের নিস্তব্ধতায়, যখন জানালার গ্লাস ছুঁয়ে মৃদু হাওয়া ঘরে আসত, তখন মায়াবী বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ভাবত—তবে কি এই মানুষটা তাকে একটুও ভালোবাসে না? নাকি এই বিয়ের পুরো আয়োজনটাই নিহানের ওপর কোনো অদৃশ্য সামাজিক চাপের ফল?

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

দিনের পর দিন এই অদ্ভুত দূরত্ব মায়াবীর মনে এক গভীর নিঃসঙ্গতার জন্ম দিচ্ছিল। বাড়ির অন্য সবাই তাকে যথেষ্ট স্নেহ করত, কিন্তু যার ছায়ার ওপর তার পুরো সংসার জীবন বাঁধার কথা, সেই নিহানই যেন সবচেয়ে দূরের মানুষ। মায়াবী নিজের মতো করে চেষ্টা কম করেনি। সকালে নিজ হাতে কফি বানিয়ে নিহানের পড়ার টেবিলে রেখে আসা, অফিস থেকে ফেরার সময় তার পছন্দের কোনো খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখা—সবই যেন কেমন ম্লান হয়ে যেত নিহানের নির্বিকার চাহনিতে। নিহান কফি কাপে চুমুক দিত ঠিকই, কিন্তু চোখের পলকেও মায়াবীর দিকে তাকাত না। শুধু বলত, "ধন্যবাদ, মায়াবী। এত কষ্ট করার দরকার ছিল না।" এই 'ধন্যবাদ' শব্দটা মায়াবীর বুকে তীরের মতো বিঁধত। স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কে এত ফরমাল শব্দ মানায় না। মায়াবী তখন বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলত, ভাবত কোনো ভুল কি সে নিজেই করে ফেলেছে?

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

এদিকে নিহানের মনের ভেতরটা যে একেবারে শান্ত ছিল, এমন নয়। অফিসে কাজের পাহাড়, ব্যবসায়িক নানা জটিলতা আর পারিবারিক কিছু চাপা টেনশন তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। কিন্তু সে কখনোই নিজের দুর্বলতা বা মানসিক চাপ কারও সামনে প্রকাশ করতে পছন্দ করত না। নিহান আসলে মানুষ হিসেবে ভীষণ অন্তর্মুখী। সে বিশ্বাস করে, অনুভূতিগুলো মুখে বলে জাহির করার চেয়ে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা বেশি জরুরি। কিন্তু তার এই কঠিন খোলসের আড়ালে যে একটা নরম মন লুকিয়ে আছে, তা বোঝার মতো ফুরসত বা সুযোগ তখনও মায়াবীর হয়ে ওঠেনি। নিহান মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুমন্ত মায়াবীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। তার ইচ্ছা করত হাত বাড়িয়ে মায়াবীর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে, বলতে যে সে একা নয়, কিন্তু তার পুরুষালী অহংকার বা ভেতরের কোনো অজানা জড়তা তাকে বারবার আটকে দিত। সে ভয় পেত, যদি তার এই হঠাৎ নরম হওয়াটা মায়াবীকে আরও বেশি বিভ্রান্ত করে তোলে!

 

বর্ষার এক গুমোট সন্ধ্যায় এই বরফ গলা শুরু হলো। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, আর ড্রয়িংরুমে বসে আছে নিহান ও মায়াবী। দুজনেই চুপচাপ। হঠাৎ করেই নিহানের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিহানের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ফোনটা কেটে দিলেও বারবার একই নম্বর থেকে কল আসতে লাগল। নিহান এক পলক মায়াবীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "আমাকে এখনই একটু বের হতে হবে।" মায়াবী অবাক হয়ে বলল, "এই বৃষ্টির মধ্যে রাতদুপুরে কোথায় যাবেন? কী হয়েছে?" নিহান কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত কোটটা গায়ে জড়াতে লাগল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। মায়াবীর মন কেমন যেন করে উঠল। যতই দূরত্ব থাক না কেন, বিপদের আভাস পেয়ে সে আর চুপ থাকতে পারল না। সে এগিয়ে এসে নিহানের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। নিহান চমকে উঠে মায়াবীর দিকে তাকাল। সেই প্রথমবার তাদের চোখের দৃষ্টি এক হলো, যেখানে কোনো দূরত্ব ছিল না, কেবল এক অজানা টান আর ব্যাকুলতা উঁকি দিচ্ছিল।

 

নিহান হাতটা সরিয়ে না নিয়ে মায়াবীর চোখের দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলল, "সব বিষয়ে নাক গলাতে হয় না, মায়াবী।" কিন্তু তার স্বরের সেই কাঠিন্য এবার আর আগের মতো জোরালো ছিল না। মায়াবী একটুও দমে না গিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "সংসারে যার সাথে জীবনটা জুড়ে দিয়েছি, তার বিপদ বা টেনশন দেখলে আমারও হৃদয়ে টান পড়ে। আমি কি কেবল শোভাবর্ধনকারী কোনো পুতুল নাকি?" মায়াবীর এই সাহসিকতা নিহানকে ভেতরে ভেতরে কাঁপিয়ে দিল। সে যেন নতুন এক মায়াবীকে দেখতে পেল, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত জেদ আর গভীর ভালোবাসা। নিহান আর কথা বাড়াল না, শুধু হাত দিয়ে মায়াবীর কাঁধটা হালকা ছুঁয়ে বলল, "দরজাটা ভালোভাবে লক করো, আমি সকালের মধ্যে ফিরে আসব।" সেই ছোট্ট ছোঁয়াটুকু মায়াবীর সারা শরীরে এক বিদ্যুতের শিহরণ জাগাল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার ভালোবাসার ভাষা আলাদা, যা হয়তো সময় পেলে পুরোপুরি বোধগম্য হবে।

 

পরের দিন সকাল বেলা। নিহান যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরল, তখন তার চোখ দুটো লাল। সারা রাতের ধকল তার চেহারায় স্পষ্ট। ঘরের ড্রয়িংরুমে ঢুকেই সে দেখল মায়াবী সোফায় বসে কফি কাপ হাতে তার জন্যই অপেক্ষা করছে। নিহানকে দেখেই মায়াবী দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো অভিযোগ নেই, আছে কেবল গভীর এক আকুলতা। মায়াবী কোনো কথা না বলে সরাসরি এগিয়ে এসে নিহানের সামনের জ্যাকেটের চেইনটা নিজের হাতে টেনে নামিয়ে দিল। নিহান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার নিশ্বাস ভারী হয়ে এল। মায়াবীর হাতের উষ্ণ ছোঁয়া তার বুকের কাছে লাগতেই নিহানের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষে উবে গেল। মায়াবী খুব softly ফিসফিস করে বলল, "এতটা কষ্ট একা বয়ে বেড়ানোর কী দরকার ছিল, নিহান? আমি তো পাশে থাকতেই পারি।"

 

নিহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভেতরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে তার শক্ত দুটো বাহু দিয়ে হঠাৎ করেই মায়াবীকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মায়াবীর মুখটা নিহানের চওড়া বুকের সাথে লেগে গেল, সে স্পষ্ট শুনতে পেল নিহানের দ্রুত হৃদস্পন্দন। নিহান মায়াবীর মাথার চুলে মুখ গুঁজে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলল, "তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখতে আমার নিজেরই সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো, মায়াবী। আমি শুধু ভয় পেতাম আমার এই বিশৃঙ্খল জীবনটা দিয়ে তোমাকে হয়তো কখনো ভালো রাখতে পারব না।" মায়াবী নিহানের কোমর শক্ত করে খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তাদের দুজনের নিঃশ্বাস মিশে একাকার হয়ে গেল। সেই প্রথম বারের মতো তাদের সম্পর্কের সমস্ত মেঘ কেটে গিয়ে এক উষ্ণ ভালোবাসার রোমান্টিক আবহ তৈরি হলো। একে অপরের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে তারা দুজনেই যেন এক স্বর্গীয় শান্তির পরশ পেল।

নিহানের প্রশস্ত বুকের ওমে ঘেরা মায়াবী যেন সময়কে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। যে মানুষটা এতদিন ঘরের এক কোণে থেকেও সমুদ্রের দূরত্ব বজায় রাখত, আজ সে নিজেই মায়াবীকে নিজের অন্তরের সবচেয়ে সুরক্ষিত আশ্রয়ে টেনে নিয়েছে। নিহানের হাতের চওড়া তালু মায়াবীর পিঠের ওপর আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছিল, আর সেই স্পর্শে মায়াবীর সারা শরীরে রোমাঞ্চের ঢেউ খেলে যাচ্ছিল। কত রাত সে এই মানুষটার বাহুডোরের কল্পনায় বালিশ ভিজিয়েছে, অথচ আজ সেই বাস্তবটা এত বেশি গভীর আর নেশাক্ত যে মায়াবীর মনে হচ্ছিল সে কোনো ঘোরের মধ্যে রয়েছে। নিহান মায়াবীর চুলে মুখ গুঁজে খুব নিচু ও ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দিও, মায়াবী। তোমাকে নিজের ভেতরের এই অন্ধকারের আঁচ লাগাতে চাইনি বলেই এতদিন এত দূরত্ব বজায় রেখেছি।" মায়াবী মুখটা সামান্য ওপরে তুলে নিহানের চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো অভিমান ছিল না, ছিল কেবল নিঃশর্ত সমর্পণ। মায়াবী নরম স্বরে জবাব দিল, "আলোর পাশাপাশি অন্ধকারও তো জীবনেরই অংশ, নিহান। তুমি একা কেন সব টানাপোড়েন বয়ে বেড়াবে? আমারও তো অধিকার আছে তোমার ভাগের কষ্টগুলো একটু হলেও ভাগ করে নেওয়ার।"

 

ঘরের ভেতর তখন সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে এসে পড়েছে। কিন্তু সেই রোদের চেয়েও অনেক বেশি উষ্ণ ছিল তাদের দুজনেক এই নিবিড় সান্নিধ্য। নিহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মায়াবীর চিবুকটা নিজের আঙুলের ডগায় আলতো করে উঁচুতে তুলে ধরল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি। নিহানের গরম নিশ্বাস মায়াবীর মুখের ত্বকে আছড়ে পড়ছিল, যা মায়াবীর বুকটাকে দ্রুত স্পন্দিত করে তুলছিল। নিহান পলকহীন তাকিয়ে থেকে মায়াবীর চোখের পাতার ওপরে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সেই ছোট্ট কোমল ছোঁয়াটুকুই মায়াবীর ভেতরের সমস্ত জমিয়ে রাখা বরফ গলিয়ে দিল। মায়াবী নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নিহানের শার্টের কলার খামচে ধরে তার আরও কাছাকাছি চলে এল। নিহানের হাত দুটো এবার আরও দৃঢ়ভাবে মায়াবীর কোমর জড়িয়ে ধরল, যেন সে এই পৃথিবীর সমস্ত ঝঞ্ঝা থেকে তার ভালোবাসাকে আগলে রাখতে চাইছে। তাদের সেই প্রথম প্রেমের গভীর প্রকাশ ঘরের নীরবতাকে আরও বেশি মোহময় করে তুলল।

 

কিছুক্ষণ পরে অবশ্য বাস্তবতার তাগিদে নিহানকে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে হলো। রাতের ধকল এবং কোম্পানির চলমান সংকটের কারণে তার মাথায় তখনও অনেক কাজের চাপ রয়ে গেছে। কিন্তু আগের রাতের সেই দূরত্ব আর বরফ আজ আর নেই। নিহান যখন ড্রয়িংরুম ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছিল, তখন মায়াবী নিজে হাতে গরম কফি তৈরি করে টেবিলে রাখল। কিছুক্ষণ আগেও নিহান কফি খেয়ে শুধু একটা ফরমাল ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যেত, কিন্তু আজ চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। নিহান ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে সরাসরি কিচেনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। মায়াবী তখন কাপে চামচ দিয়ে নাড়ছিল। নিহান পেছন থেকে এসে হুট করে মায়াবীর কোমরে নিজের হাত জড়িয়ে ধরল। মায়াবীর হাতের চামচটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সে চমকে পেছনে তাকাতেই নিহান তার আরও কাছে ঘেঁষে এসে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "আজ অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরব। আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো?" মায়াবীর গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে কিছুটা আবেশে জড়ানো কণ্ঠে বলল, "এমনভাবে বলছেন যেন আমি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি!" নিহান মৃদু হেসে মায়াবীর কানের লতিতে ঠোঁটের ছোঁয়া দিয়ে বলল, "পালিয়ে যেতে দেব নাকি তোমাকে? তুমি তো এখন আমার এই কঠিন হৃদয়ের একমাত্র নরম ঠিকানা।"

 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামল। অফিসে বসেও নিহানের মন বারবার বাড়ির ওই মেয়েটির কাছেই ছুটে যাচ্ছিল। মায়াবীও আজ সারাদিন অন্যরকম এক আনন্দে মেতে ছিল। সে নিজের পছন্দের একটা হালকা নীল রঙের সালোয়ার কামিজ পরে চুলগুলো খোলা রেখেছিল, যাতে নিহান ফিরলেই তাকে দেখে একটু মুগ্ধ হয়। বিকালের দিকে নিহানের সেই পারিবারিক সংকটের মূল রহস্যটা একটু একটু করে উন্মোচিত হতে শুরু করল। নিহানের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়, যাকে সে অন্ধের মতো বিশ্বাস করত, কোম্পানির বিশাল অঙ্কের তহবিল তছরুপ করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। রাতের বেলা সেই কাগজপত্রের প্রমাণ জোগাড় করতেই নিহানকে জরুরি ভিত্তিতে বাড়ি থেকে বের হতে হয়েছিল। এই কথাগুলো যখন নিহান সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে মায়াবীকে এক কাপ চা খেতে খেতে খুলে বলল, তখন মায়াবীর চোখেমুখে বিস্ময়ের সাথে সাথে গভীর শ্রদ্ধাবোধ ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, নিহান কোনো সাধারণ টেনশনে ছিল না, সে আসলে একটা বিশাল ষড়যন্ত্র একা লড়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করছিল।

 

চা খাওয়ার ফাঁকে মায়াবী নিহানের পাশে সোফায় গা ঘেঁষে বসল। নিহানের ক্লান্ত মাথাটা সে নিজের কাঁধে টেনে নিল। নিহান চোখ বন্ধ করে মায়াবীর শরীরের সুবাস এবং তার নরম আঙুলের জাদুকরি ছোঁয়া উপভোগ করতে লাগল। মায়াবী নিহানের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খুব দৃঢ় গলায় বলল, "আর কখনো একা একা এত বড় বোঝা বইবেন না, নিহান। আমি হয়তো ব্যবসার হিসাব বুঝি না, কিন্তু আপনার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়াতে তো পারি।" নিহান মায়াবীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে ঠোঁটের কাছে নিয়ে গিয়ে একটা আলতো চুমু খেল। তার চোখে তখন ভালোবাসার চকচকে জল। নিহান মায়াবীর কোমর আবার নিজের দিকে টেনে নিয়ে তাকে সোফায় নিজের ঠিক ওপরে বসিয়ে ফেলল। মায়াবী কিছুটা লজ্জিত হয়ে নিহানের প্রশস্ত কাঁধে হাত রাখল। নিহান মায়াবীর চোখের গভীরতায় তাকিয়ে অত্যন্ত রোমান্টিক স্বরে বলল, "তুমি আসার আগে আমি জানতামই না জীবনটা এত সুন্দর হতে পারে, মায়াবী। আমার এই পাথরের মতো জীবনে তুমি যেন এক ফালি শ্রাবণের বৃষ্টি হয়ে এসেছ।"

 

কথাটা শেষ করেই নিহান আর কোনো দূরত্ব রাখল না। সে মায়াবীর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার নরম ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁটঁ রাখল। সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল নিখাদ ভালোবাসা, গভীর আকুতি এবং বহুদিনের না বলা আবেগের বহিঃপ্রকাশ। মায়াবীও তার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে নিহানের সেই গভীর অনুভূতির প্রতিদান দিল। বাইরের বারান্দায় তখন গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে, কিন্তু ঘরের ভেতরের সেই নিবিড় রোমান্টিক আবহে যেন এক নতুন জীবনের সূর্য উদিত হলো। তারা দুজনে একে অপরের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতের যেকোনো ঝড়ের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।

সেই গোধূলির পর থেকে নিহান আর মায়াবীর মাঝের সমস্ত অদৃশ্য দেওয়াল চিরতরে ভেঙে গেছে। এখন আর আগের মতো সেই অস্বস্তিকর নীরবতা বা দূরত্ব নেই। অফিস থেকে ফেরার পথে নিহান এখন প্রতিদিন নিয়ম করে মায়াবীর পছন্দের কোনো না কোনো ফুল বা মিষ্টি নিয়ে আসে। আর দরজা খোলার শব্দ পেতেই মায়াবী ছুটে এসে নিহানের কোটটা নিজের হাতে খুলে রাখে। কোম্পানির সেই দুর্নীতিবাজ আত্মীয়ের চক্রান্ত সফল হতে পারেনি; নিহানের সময়মতো বুদ্ধিমত্তা এবং আইনের সঠিক পদক্ষেপে সমস্ত তহবিল নিরাপদে ফিরে এসেছে। এই বিজয়ের পেছনে মায়াবীর সেই মানসিক সমর্থন আর গভীর ভালোবাসাও সমানভাবে কাজ করেছিল, যা নিহান প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করে। এখন তারা দুজনে শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়, বরং একে অপরের সেরা বন্ধু এবং জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

 

আজ ছুটির দিন। সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে জানালার কাচে। ঘরের ভেতরে নরম আলো জ্বেলে নিহান আর মায়াবী বসার ঘরের কার্পেটে পাশাপাশি বসে আছে। নিহানের ল্যাপটপটা একপাশে বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, আর তার সমস্ত মনোযোগ এখন শুধু মায়াবীর ওপর। মায়াবী নিহানের কাঁধে মাথা রেখে একটা পুরোনো ফটো অ্যালবাম উল্টে দেখছে। নিহানের ছোটবেলার ছবি দেখে মায়াবী খিলখিল করে হেসে উঠল। সে নিহানের গালের টোল টিপে ধরে বলল, "ছোটবেলায় আপনাকে তো একদম দুষ্টু একটা ছেলের মতো দেখতে লাগত!" নিহান মৃদু হেসে মায়াবীর কোমর নিজের একহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে আরও একটু কাছে টেনে নিল। তারপর তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "দুষ্টু তো আমি এখনও আছি, শুধু সেটা এখন তোমার ওপর প্রয়োগ করার লাইসেন্স পেয়ে গেছি।" মায়াবীর গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, সে নিহানের বুকে একটা হালকা কিল বসিয়ে দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু নিহান কোথায় কি! সে দুই বাহু দিয়ে মায়াবীকে আটকে রেখে তার চোখের দিকে গভীর রোমাঞ্চ নিয়ে তাকিয়ে রইল।

 

বাইরের বৃষ্টির শব্দ আর ঘরের ভেতরের উষ্ণ নিস্তব্ধতা তাদের চারপাশের পরিবেশকে আরও বেশি মোহময় করে তুলল। নিহান তার ডান হাতের আঙুল দিয়ে মায়াবীর চিবুকটা আলতো করে উঁচুতে তুলে ধরল। তার দৃষ্টিতে এত তীব্র ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল যে মায়াবীর হৃদস্পন্দন মুহূর্তের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গেল। নিহান খুব নিচু ও আবেগময়ী গলায় বলল, "তুমি না এলে আমি হয়তো সারা জীবন কাজের মেশিনের মতো কাটিয়ে দিতাম, মায়াবী। তুমি আমার এই মরুভূমির মতো জীবনে হঠাৎ করে নেমে আসা এমন এক বৃষ্টি, যা আমার ভেতরের সব পুড়ে যাওয়া জায়গাগুলোকে ভিজিয়ে শীতল করে দিয়েছে।" মায়াবী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তার নিজের দুটো হাত নিহানের প্রশস্ত ঘাড়ের চারপাশে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। মায়াবী কাঁপাপা কাঁপাপা সুরে বলল, "আমি তো শুধু চেয়েছিলাম আমার ভাগের একটু ভালোবাসা পেতে, কিন্তু তুমি আমাকে যা দিলে তা আমার কল্পনারও অতীত।"

 

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই নিহান আর কোনো দূরত্ব রাখল না। সে তার উষ্ণ ঠোঁট নামিয়ে দিল মায়াবীর ঠোঁটের ওপর। সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল নিখাদ সমর্পণ, গভীর আবেগ আর চিরকালের জন্য একে অপরের হয়ে থাকার এক অটুট শপথ। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই ঝড়ের গর্জন ছাপিয়ে ঘরের ভেতরে বাজছিল তাদের দুই হৃদয়ের এক সুরেলা মিলনের গান। মায়াবী নিহানের শার্টের কলার খামচে ধরে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল এই ভালোবাসার সাগরে। নিহানের হাত দুটো মায়াবীর পিঠ ও কোমরে এমনভাবে জড়িয়ে ছিল, যেন পৃথিবীর কোনো শক্তি আর তাদের আলাদা করতে পারবে না।

 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামল। বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশে রোদের এক মিষ্টি হাসি ফুটল। ড্রয়িংরুমে ছড়ানো ছিটানো কুশন আর আলমারির খোলা ড্রয়ারের মাঝেই নিহান ও মায়াবী সোফায় পাশাপাশি শুয়ে একে অপরের বাহুডোরে আবদ্ধ ছিল। নিহানের চওড়া বুকের ওপর মাথা রেখে মায়াবী পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল, আর নিহান একহাতে মায়াবীর লম্বা চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে জানালার বাইরে রোদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, জীবনে টাকা-পয়সা বা সাফল্যই সব নয়; দিনশেষে নিজের মানুষটির চোখের কোণে এক চিলতে সুখের হাসি দেখার চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না। মায়াবী ঘুমের ঘোরেই নিহানের বুকটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, আর নিহান মায়াবীর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল, "সারাজীবন এভাবেই আমার পাশে থেকো, মায়াবী।" সেই মিষ্টি মুহূর্তের মধ্য দিয়ে তাদের নতুন জীবনের এক সুন্দর ও চিরস্থায়ী অধ্যায় শুরু হলো।

....
👁 50