ভেতরের কষ্ট গলে গেল

চারপাশটা তখন কেমন যেন এক অলস দুপুরে ডুবে ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পেছনের বারান্দাটায় তখন তীব্র রোদের ঝিলিক। রোদেলার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি আর মুখে লেগে থাকা চিরচেনা কৃত্রিম হাসির আড়ালে যে কী পরিমাণ ঝড় বইছিল, তা কেউ টের পেত না। সে সবসময় হাসিখুশি থাকত, আড্ডায় মাতিয়ে রাখত সবাইকে। কিন্তু নিজের ভেتরের গভীর কষ্টগুলো সে কখনো কারও সঙ্গে ভাগ করত না। এক অদ্ভুত শক্তিতে সে নিজেকে ঢেকে রাখত। কিন্তু সেই আড়াল ভেদ করে সেদিন ঠিকই এসে দাঁড়াল সাফওয়ান।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

সাফওয়ান লোকটা একটু অন্যরকম। ডিপার্টমেন্টের করিডোরে তার গম্ভীর উপস্থিতি আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সবারই চেনা। কিন্তু সেদিন রোদেলার মুখের ওপর সেই ম্লান হাসিটা দেখেই সে বুঝতে পেরেছিল, মেয়েটার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। রোদেলার নীরবতা, তার আনমনা চাউনি—কোনো কিছুতেই সাফওয়ানের চোখ এড়ায়নি। সে এসে রোদেলার মুখোমুখি বসল।

— "এভাবে রোজ নিজেকে পুড়িয়ে হাসার অভিনয় না করলেই নয়, রোদেলা?" সাফওয়ানের গলাটা ভারী অথচ ভীষণ নরম ছিল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

রোদেলা চমকে উঠে তার দিকে তাকাল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল এক অজানা আতঙ্কে। কেউ এত সহজে তার মনের পর্দা সরিয়ে ভেতরে উঁকি দেবে, সে ভাবেনি। সে নিজেকে সামলে নিয়ে কৃত্রিম হাসির আড়ালে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, "কে বলেছে অভিনয় করছি? আমি তো বেশ ভালোই আছি।"

— "চোখগুলো কিন্তু অন্য কথা বলছে," সাফওয়ান আরও একটু এগিয়ে এল। তার চোখের গভীরে এমন এক মায়া আর অধিকারবোধ ছিল, যা রোদেলার সমস্ত রক্ষণাবেচন গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। "তোমার এই নীরবতা আমি পড়তে পারি, রোদেলা। আর কতকাল একা একা লড়বে এই অদৃশ্য লড়াইগুলো?"

সেদিনের সেই কথোপকথনটাই যেন তাদের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার প্রথম ধাপ ছিল। এরপর থেকেই সাফওয়ান রোদেলার জীবনের এক অদ্ভুত ছায়া হয়ে গেল। রোদেলার বিশ্বাস ছিল, তার ভাগ্যে সুখের দেখা নেই। যতবারই সে একটু ভালো থাকতে চেয়েছে, ততবারই কোনো না কোনো ঝড় এসে তার সাজানো সংসার বা সুখের দিনগুলো ওলোটপালট করে দিয়েছে। তাই সে সুখকে ভয় পেত। সে ভাবত, বেশি আনন্দ মানেই সামনে বড় কোনো আঘাত অপেক্ষা করছে।

এক বিকেলে বৃষ্টির পর আকাশটা যখন ধোয়া ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন সাফওয়ান রোদেলাকে শহরের পুরোনো এক চায়ের দোকানে নিয়ে গেল। কড়া চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, আর বাইরে ঝিরিঝিরি বাতাস।

রোদেলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আনমনে বলল, "জানেন সাফওয়ান, আমার না সুখ জিনিসটার ওপর বড্ড ভয় হয়। যখনই মনে হয় জীবনটা একটু সহজ হচ্ছে, তখনই সব ওলটপালট হয়ে যায়। আমার বিশ্বাস, আমার কপালে সুখ বেশিদিন থাকে না।"

সাফওয়ান তার হাত থেকে চায়ের কাপটা সাবধানে সরিয়ে রাখল। তারপর নিজের উষ্ণ হাত দিয়ে রোদেলার ঠান্ডা আঙুলগুলো শক্ত করে নিজের মুঠোয় বন্দি করল। সেই ছোঁয়ায় রোদেলার সারা শরীর একটা বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠল। গভীর রোমান্সে ভরা চোখে সাফওয়ান তার দিকে তাকাল।

— "অতীতের কষ্টগুলো ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিতে পারে না, রোদেলা," সাফওয়ানের গলাটা এবার বেশ দৃঢ়। "তুমি অতীতে কী হারিয়েছ বা কতটা ভুগেছ, সেটা তোমার বর্তমানের সুখকে কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাখে না। যতদিন আমি তোমার পাশে আছি, তোমার অতীতের কোনো অন্ধকার ছায়া তোমার আগামীতে পড়তে দেব না। আমার এই হাত দুটো শুধু তোমাকে আগলে রাখার জন্যই তৈরি হয়েছে।"

রোদেলার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। বুকের ভেতরের সেই পাথর চাপা কষ্টটা যেন গলতে শুরু করল। সাফওয়ানের হাতের উত্তাপ তার রক্তে ছড়িয়ে পড়ল। সে কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু সাফওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে অনুভব করল—এই মানুষটাই তার সমস্ত ঝড়ের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। ধীরে ধীরে তাদের এই না বলা অনুভূতিগুলো এক গাঢ় সম্পর্কের রূপ নিতে শুরু করল, যেখানে দুজনে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠল।
দিনের পর দিন পেরিয়ে যাচ্ছিল, আর সাফওয়ান ও রোদেলার সম্পর্কটা যেন এক অচেনা মোহনায় এসে মিলিত হচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দা, লাইব্রেরির কোণ কিংবা কোনো এক রূপালী সন্ধ্যার চায়ের কাপ—সব জায়গাতেই তাদের উপস্থিতি যেন এক নীরব কবিতার মতো বেঁচে থাকত। রোদেলা প্রথম প্রথম নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চাইত। তার পুরোনো ভয়গুলো বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। সে ভাবত, এই যে এত সুখ, এত ভালোলাগা—এসব কি একদিন নিমিষেই হারিয়ে যাবে? কিন্তু সাফওয়ানের অবিচল উপস্থিতি এবং চোখের সেই গভীর আশ্বাস তার সমস্ত শঙ্কাকে ধীরে ধীরে ম্লান করে দিচ্ছিল।

সেদিনের বিকেলটা ছিল বড় অদ্ভুত। হঠাৎ করেই ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল শহরে। রোদেলার সাথে ভার্সিটির গেটেই দেখা হয়ে গেল সাফওয়ানের। ছাতাটা একজনের জন্য হলেও সাফওয়ান সেটা রোদেলার মাথার ওপর এমনভাবে ধরে রাখল যে, নিজের একটা কাঁধ পুরো ভিজে গেল। তারা দুজনে দ্রুত পা চালিয়ে শহরের একটা পরিচিত ছিমছাম ক্যাফেতে এসে আশ্রয় নিল। কাঁচের জানালার বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে, আর জানালার এপাশে বসে রোদেলা তার ভেজা চুলগুলো কানের পেছনে গোঁজার চেষ্টা করছে।

সাফওয়ান তার পকেট থেকে একটা শুকনো টিস্যু বের করে রোদেলার দিকে বাড়িয়ে দিল। মৃদু হেসে বলল, "তুমি তো দেখি একদম ভিজে গেছো। একটু সাবধানে চলতে পারো না?"

রোদেলা টিস্যুটা হাতে নিয়ে মুচকি হাসল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ আর ক্যাফের মৃদু আলোর নিচে সাফওয়ানের মুখটা আজ বড্ড মোহময়ী লাগছিল। সে নিচু গলায় বলল, "আপনার ছাতার নিচে দাঁড়ালে তো আমার ভিজে যাওয়াই স্বাভাবিক। কারণ আপনি তো নিজের কথা ভুলেই যান।"

সাফওয়ান একটুও সময় নষ্ট না করে রোদেলার আরও কাছাকাছি এসে বসল। টেবিলের ওপর রাখা রোদেলার ডান হাতটার ওপর নিজের হাত রাখল। সাফওয়ানের হাতের সেই উষ্ণ ছোঁয়া পেলেই রোদেলার বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাসগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যেত।

— "নিজের কথা ভুলেই তো তোমার কথা ভাবতে হয়, রোদেলা," সাফওয়ানের গলাটা এবার বেশ নিচু, ঠিক যেন এক অন্তরঙ্গ ফিসফিসানি। "তোমার ওই চোখের কোণটায় একটুখানি বিষাদের ছায়া দেখলেও আমার ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায়। আমি তোমাকে হাসাতে চাই, চিরকালের জন্য তোমার সব ভয় দূর করে দিতে চাই।"

রোদেলার বুকটা হঠাৎ করেই খুব দ্রুত স্পন্দিত হতে শুরু করল। সে সাফওয়ানের চোখের দিকে তাকাতে পারল না, দৃষ্টি নামিয়ে নিল চায়ের কাপের দিকে। কিন্তু সাফওয়ান তার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে মুখটা ওপরে তুলল। সেই স্পর্শে রোদেলার সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে এল। রোমান্সের এক তীব্র শিহরণ তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল।

— "আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো, রোদেলা," সাফওয়ানের স্বরটা আরও গাঢ় হলো। "তুমি কি এখনও বিশ্বাস করো যে তোমার কপালে সুখ নেই?"

রোদেলার গলাটা শুকিয়ে আসছিল। সাফওয়ানের সেই গভীর, মায়াবী দৃষ্টির সামনে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের পাতা ভিজে উঠল, কিন্তু সেবার সেই জল কষ্টের ছিল না; ছিল এক অদ্ভুত মুক্তির আনন্দ। সে কাঁপ-কাঁপ গলায় ফিসফিস করে বলল, "আগে করতাম... কিন্তু এখন আর করি না। কারণ আপনি আসার পর থেকে আমার মনে হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টা কেবল শুরু হয়েছে।"

কথাটা শোনার পর সাফওয়ানের মুখে যে হাসিটা ফুটে উঠল, তা রোদেলার সারা জীবনের সমস্ত অন্ধকার মুছে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ক্যাফের ওই কোণটা যেন তখন সারা পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে এক টুকরো স্বর্গীয় সুখের রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। তাদের দুজনের নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছিল বাইরের বৃষ্টির শব্দের সাথে। সাফওয়ান ধীরে ধীরে তার মুখটা রোদেলার আরও কাছে নিয়ে এল, আর রোদেলা নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে সেই ভালোবাসার চাদরে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। তাদের সেই মুহূর্তটা ছিল সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে এক অনন্ত রোমান্টিকতার দলিল, যেখানে শুধু ছিল একে অপরের প্রতি এক তীব্র টান আর এক নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভব।
ঝুম বৃষ্টির সেই ক্যাফেটার পর থেকে রোদেলা আর সাফওয়ানের সম্পর্কটা এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল। অতীতের কোনো ভয় বা আশঙ্কার কালো মেঘ আর রোদেলার মনে ছায়া ফেলতে পারত না। কারণ সে এখন নিশ্চিতভাবে জানত, তার জীবনের ঝোড়ো হাওয়াগুলোকে শান্ত করার জন্য সাফওয়ানের মতো এক দুর্ভেদ্য পাহাড় সবসময় তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের এই ভালোবাসা কেবল কথার ছিল না, তা ছিল নিবিড় বিশ্বাস আর এক তীব্র আবেগঘন অনুভূতির মেলবন্ধন, যা একে অপরকে প্রতিদিন নতুন করে আবিষ্কার করতে শেখাত।

একদিন বিকেলে শহরের একটু দূরে নদীর ধারের একটা নিঝুম জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিল তারা। তখন গোধূলির আলোয় চারপাশটা কেমন যেন সোনালী রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে। নদীর মৃদু বাতাসের সাথে রোদেলার চুলে উড়ছিল এক মিষ্টি সুবাস। সাফওয়ান এক পাথরের ওপর বসে ছিল, আর রোদেলা তার পাশেই দাঁড়িয়ে নদীর জল দেখছিল। আনমনা রোদেলাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাফওয়ান হঠাৎ করেই তার হাত ধরে টেনে নিজের একদম কাছে বসিয়ে নিল।

রোদেলা একটু চমকে উঠে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, "কী করছেন! কেউ যদি দেখে ফেলে?"

সাফওয়ান মৃদু হেসে তার হাতটা আরও শক্ত করে নিজের মুঠোয় বন্দি করে বলল, "দেখুক না! কার সাধ্য আছে তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে? তাছাড়া এখানে তো আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।"

বলেই সে আলতো করে রোদেলার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। সেই মুহূর্তে তাদের দুজনের হৃদস্পন্দন যেন একই ছন্দে মিলিতে হয়েছিল। রোদেলার সমস্ত অহংকার, জেদ আর লুকানো কষ্টগুলো সাফওয়ানের বুকজুড়ে মিশে একাকার হয়ে গেল। সাফওয়ান তার চিবুকটা ধরে মুখটা ওপরে তুলল এবং গভীর চোখে রোদেলার চোখের দিকে তাকাল।

— "রোদেলা," সাফওয়ানের গলাটা রোমান্টিক এক মোহে আচ্ছন্ন ছিল, "তুমি কি জানো, আমার এই ছোট্ট জীবনে তুমি আসার পর সব কিছু কেমন বদলে গেছে? মনে হয়, এতদিন আমি শুধু বেঁচে ছিলাম, আর এখন আমি জীবনকে উপলব্ধি করছি।"

রোদেলার চোখ দুটো খুশিতে ভিজে উঠল। সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে তার বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফেলল। তার চোখের জল গলে সাফওয়ানের শার্টের বুক ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু সেই কান্নায় কোনো কষ্ট ছিল না; ছিল চরম তৃপ্তি আর ভালোবাসার পূর্ণতা।

সে ফিসফিস করে বলল, "আমি জানতাম না যে কোনো মানুষ কাউকে এত বেশি আপন করে নিতে পারে। আপনি আমার জীবনের সেই আলো, যা আমার সব অন্ধকার চিরকালের মতো মুছে দিয়েছে। আমি আর কখনো একা হতে ভয় পাই না, কারণ আমি জানি আমার পুরো পৃথিবীটা এখন আপনার এই দুই বাহুর মাঝে বন্দি।"

নদীর সেই শান্ত জলরাশি, গোধূলির নরম আলো আর দু'টি মানুষের এই গভীর প্রেমময় নিবেদন সেদিন একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাদের সেই আলিঙ্গন কেবল একটি সাধারণ ছোঁয়া ছিল না, তা ছিল একে অপরের জীবনে চিরকালের মতো আশ্রয় নেওয়ার এক নিঃশব্দ শপথ। অতীতে যাই ঘটে থাকুক না কেন, সাফওয়ানের ভালোবাসার পরশ রোদেলার জীবনকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল—যেখানে শুধুই ছিল সুখ, শান্তি আর এক অন্তহীন রোমান্টিকতার গল্প।

....
👁 52