শহরের এক কোণে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে চারপাশটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। জানালার কাঁচের ওপাশে ঝাপসা হয়ে আসছে দূরের ইমারতগুলো। কফি কাপটা হাতে নিয়ে টেবিলে চুপচাপ বসে আছে ঐশী। ঠিক এই মুহূর্তটার জন্যই কি সে অপেক্ষা করেছিল? নাকি সময় নিজেই তাকে এনে দাঁড় করিয়েছে এমন এক মোড়ে, যেখান থেকে পেছনে ফেরার আর কোনো পথ নেই।
মাহির। একসময়ে এই একটা নামের মাঝেই ঐশীর পুরো পৃথিবীটা আটকে ছিল। সকালের প্রথম রোদের ঝিলিক থেকে শুরু করে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল মাহির। কিন্তু একটা ভুল সিদ্ধান্ত, একটা না বলা কথা তাদের জীবনের চাকাটাকে সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বছরখানেক কেটে গেছে সেই বিচ্ছেদের পর। এই দীর্ঘ সময়ে কত কি বদলে গেছে, অথচ বুকের ভেতরে জমে থাকা ক্ষতগুলোর গভীরতা এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি।
সেদিনের কথা আজও ঐশীর স্পষ্ট মনে আছে। তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরির শুরুটা হয়েছিল এক ছোট ভুল বোঝাবুঝি থেকে। ঐশীর ক্যারিয়ারের এক বড় সুযোগ এসেছিল দেশের বাইরে যাওয়ার। মাহির চেয়েছিল ঐশী তার নিজের পায়ে দাঁড়াক, কিন্তু মাহিরের ভেতরের গভীর ভয় কাজ করছিল—দূরত্ব হয়তো তাদের চিরতরে আলাদা করে দেবে। অন্যদিকে ঐশী ভেবেছিল, মাহির হয়তো তার এই স্বাধীনতায় খুশি নয়। কথা কাটাকাটি, অভিমান আর জেদের বশে দুজনেই তখন এক তীব্র অহংকারের দেয়াল তৈরি করেছিল। কেউ কাউকে এক পা-ও ছাড় দিতে রাজি ছিল না। শেষ পর্যন্ত রাগের মাথায় ঐশী সম্পর্ক ছিন্ন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। আর মাহির? সে কেবল নির্বাক হয়ে সেই ভাঙন মেনে নিয়েছিল। কোনো বাধা দেয়নি, কোনো আকুতি জানায়নি।
এই নীরবতাই পরবর্তীতে ঐশীকে সবচেয়ে বেশি পুড়িয়েছে। সে মনে মনে ভেবেছিল, মাহির যদি সত্যিই তাকে ভালোবেসে থাকে, তবে সে তো অন্তত একবার হাত বাড়িয়ে আটকাতে পারত! কেন মাহির তার জন্য অপেক্ষা করেও কখনো তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল না? এই ক্ষোভ আর অভিমানের আগুনে দিনের পর দিন জল ঢেলেছে ঐশী।
কিন্তু গত সপ্তাহের এক আকস্মিক ঘটনায় সেই সমস্ত ধারণার ভিত্তি নড়ে গেছে। মাহিরের এক ঘনিষ্ট বন্ধুর মাধ্যমে ঐশী জানতে পেরেছে এক নির্মম সত্য। মাহির কখনো তাকে ভুলে যায়নি। বিচ্ছেদের পর এই দীর্ঘ একটি বছর মাহির প্রতিদিন কেবল তার ফেরার পথ চেয়ে বসে ছিল। সে অপেক্ষা করছিল ঐশী যেন নিজেই তাকে একটু ডাক দেয়। কারণ, মাহির ভুলবশত বিশ্বাস করে নিয়েছিল যে, ঐশী তার জীবন থেকে চিরতরে মুক্তি চায়; মাহিরের সান্নিধ্য আর তার জীবনে থাকতে চায় না। মাহির ভেবেছিল, সে যদি জোর করে ঐশীকে ফিরিয়ে আনতে যায়, তবে ঐশীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হবে।
এই খবর শোনার পর থেকে ঐশীর মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে। এক অদ্ভুত অনুশোচনা আর ভালোবাসার তীব্র আকুলতা তাকে গ্রাস করেছে। যে মানুষটাকে সে এতদিন উদাসীন ভেবে ভুল করেছে, সেই মানুষটিই নিঃশব্দে তিলে তিলে তার অপেক্ষায় প্রহর গুনেছে।
জানালার কাঁচের ওপর হাত রাখল ঐশী। বাইরের ঠান্ডা কাঁচের স্পর্শ তার উত্তপ্ত মস্তিষ্ককে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করল। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, এই ভুল ধারণার অবসান ঘটাতেই হবে। অনেক হয়েছে দূরত্ব, অনেক হয়েছে অভিমানের খেলা।
হঠাৎ করেই কফি শপের দরজা খুলে গেল। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দরজার গোল বেলটা বেজে ওঠার শব্দে ঐশী চমকে উঠে সামনের দিকে তাকাল। আর তখনই তার চোখ গিয়ে আটকে গেল সেই চেনা অবয়বটির ওপর।
মাহির। ঠিক আগের মতোই একটু ছিমছাম, পরনে ছাইরঙা শার্ট, চোখে ক্লান্তির গভীর ছাপ—অথচ ব্যক্তিত্বে সেই চিরচেনা তীব্র আকর্ষণ। মাহিরও ঠিক একই মুহূর্তে ঐশীকে দেখতে পেল। থমকে গেল তার পদক্ষেপ। দুজনের দৃষ্টি এক হলো। কফি শপের মৃদু হলদে আলোর নিচে দাঁড়িয়ে যেন সময় থমে গেল।
মাহিরের চোখের চাউনিতে যে বিস্ময় আর অব্যক্ত আকুলতা ফুটে উঠল, তা ঐশীকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। দীর্ঘ এক বছরের জমানো সব দূরত্ব যেন এক পলকে মিলিয়ে গেল এই চোখের পলকে। মাহির ধীরে ধীরে এগিয়ে এল ঐশীর টেবিলের দিকে। তার বুক চেরা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে এই নিস্তব্ধতার মাঝে।
"ঐশী... তুমি এখানে?" মাহিরের গলার স্বরটা কেঁপে উঠল। সেই কণ্ঠে ছিল দীর্ঘদিনের না বলা অনেকগুলো না পাওয়ার বেদনা।
ঐশী কোনো কথা বলতে পারল না। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু অপলক তাকিয়ে রইল মাহিরের দিকে। মাহির যখন টেবিলের ঠিক মুখোমুখি এসে দাঁড়াল, তখন তাদের শরীরের দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চি। মাহিরের গায়ের চেনা সুবাস আর গভীর চোখের দৃষ্টি ঐশীর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করে দিল।
মাহির আস্তে করে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল ঐশীর ঠিক ওপরে। কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে ঐশীর গালের একপাশ আলতো করে ছুঁয়ে দিল সে। এই মৃদু স্পর্শে দুজনেই কেঁপে উঠল। সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি, সমস্ত অভিমান যেন এই একটামাত্র ছোঁয়াতেই বরফের মতো গলতে শুরু করল।
মাহির ফিসফিস করে বলল, "জানতাম না তুমি এভাবে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াবে... এক মুহূর্তের জন্যও তোকে ভুলতে পারিনি, ঐশী।"
ঐশীর চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল মাহিরের আঙুলের ওপর। সেই চোখের জলের উষ্ণতা মাহিরের সমস্ত সংযম ভেঙে দিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। টেবিলের দূরত্বটুকু এক নিমেষে ঘুচে গেল। মাহির দুহাতে ঐশীকে টেনে নিলো তার নিজের বুকের খুব কাছে।
বাইরে তখন প্রবল বেগে বৃষ্টি নামছে। কফি শপের এই কোণটা যেন বাকি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মাহিরের উষ্ণ হাতের বেষ্টনী আর তার বুকের প্রবল স্পন্দন ঐশীর সমস্ত অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। কতদিন এই চওড়া বুকের ওপরে মাথা রেখে সে নিরাপদ বোধ করেনি! মাহির তার মুখের চুলগুলো সরিয়ে কপালে গভীর ও দীর্ঘ একটা চুমু খেল। সেই চুমুতে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল দীর্ঘ এক বছরের না পাওয়ার হাহাকার আর তীব্র ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিলন।
ঐশী নিজের দুই হাত দিয়ে মাহিরের পিঠ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছিল। সে মাহিরের কলারের কাপড় খামচে ধরে ফিসফিস করে বলল, "আমরা বড্ড দেরি করে ফেললাম, মাহির... বড্ড দেরি!"
মাহির ঐশীর চুলে মুখ ডুবিয়ে আরও নিবিড়ভাবে তাকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরল। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "দেরি হলেও তো আমরা আবার মিলেছি, ঐশী। এই দূরত্ব আর কোনোদিন আমাদের আলাদা করতে পারবে না।"
দুজনের ঠোঁট যখন একে অপরের খুব কাছাকাছি এসে মিলল, তখন বাইরে ঝড়ের তীব্রতা আরও বেড়ে গেল। এই গভীর রোমাঞ্চকর মুহূর্তে সমস্ত অভিযোগ, সমস্ত ভুল ধারণার মেঘ কেটে গিয়ে কেবল একটাই সত্য ভেসে উঠল—তারা একে অপরের জন্যই তৈরি, আর এই দূরত্ব কেবল তাদের ভালোবাসার গভীরতাকেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কফি শপের সেই তীব্র আবেগঘন মুহূর্তের রেশ কাটতে না কাটতেই তারা সিদ্ধান্ত নিল জায়গাটা বদল করার। বাইরে তখনো অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। মাহির তার কোটের হাতা দিয়ে ঐশীর ভেজা চুলগুলো আলতো করে ঢেকে দিল। তারপর নিজের গাড়িতে করে তাকে নিয়ে চলল শহরের এক শান্ত নিরিবিলি অ্যাপার্টমেন্টের দিকে। এটি এমন এক জায়গা, যেখানে কোনো কোলাহল নেই, নেই সমাজের কোনো কড়াকড়ি—কেবল তারা দুজন আর তাদের দীর্ঘ এক বছরের জমানো নীরবতা।
গাড়ির দরজা খুলে নামতেই মাহির আলতো করে ঐশীর হাতটা নিজের মুঠোয় তুলে নিল। হাতের তালুর সেই উষ্ণতা যেন এক বছর আগের হারিয়ে যাওয়া ঠিকানায় ফিরিয়ে দিল ঐশীকে। অ্যাপার্টমেন্টের ভারী দরজাটা খুলতেই চেনা সুবাসের এক তীব্র আবেশ চারপাশটা ঘিরে ধরল। এই ঘরটার প্রতি কোণায় যেন মাহিরের দীর্ঘ এক বছরের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে।
দরজা বন্ধ হতেই মাহির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। পেছন থেকে দুহাতে ঐশীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে তার ঘাড়ের ওপাশে মুখ গুঁজে দিল। মাহিরের গরম নিঃশ্বাস যখন ঐশীর নরম ত্বকে এসে লাগল, তখন ঐশীর সারা শরীরে এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে মাহিরের বাহুডোরে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিল।
"জানি না এতদিন কীভাবে বেঁচে ছিলাম তোকে ছাড়া, ঐশী," মাহিরের গলাটা ভারী হয়ে এল। তার কণ্ঠের সেই কাঁপন ঐশীর বুকটাকে চিরে ফেলল।
ঐশী ঘুরে দাঁড়াল। মাহিরের চওড়া বুকের ওপর হাত রাখল সে। চোখের কোণে জমে থাকা জল এবার আর আটকে রাখতে পারল না। সে ফিসফিস করে বলল, "আমিও তো রোজ মরেছি, মাহির। এই দূরত্ব কি শুধুই একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল, নাকি আমাদের আরও বড় কোনো পরীক্ষার অংশ?"
মাহির আর কোনো উত্তর দিল না। সে তার গভীর ভালোবাসার সবটুকু আকুলতা দিয়ে ঐশীকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। তাদের মুখের দূরত্ব মুহূর্তের মধ্যে ফুরিয়ে গেল। মাহিরের উষ্ণ ঠোঁট যখন ঐশীর নরম ঠোঁটের ওপর এসে বসল, তখন বাইরের বৃষ্টির শব্দটুকুও যেন হারিয়ে গেল। এই চুম্বন কোনো সাধারণ ছোঁয়া ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ এক বছরের না পাওয়ার হাহাকার, জমে থাকা ক্ষোভের অবসান এবং ভালোবাসার এক তীব্র বিস্ফোরণ।
ঐশী তার আঙুলগুলো মাহিরের চুলের ভেতরে চালিয়ে দিল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল। মাহিরের হাতের শক্ত বেড়াজাল তাকে যেন পৃথিবীর সমস্ত ভয় থেকে মুক্তি দিচ্ছিল। ঘরের ভেতরের মৃদু আলোয় দুজনের ছায়া একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেল, যেন মনে হবে তারা দুজন আলাদা কোনো সত্তা নয়, বরং একই নদীর দুটি ভিন্ন স্রোত।
মাহির আস্তে করে ঐশীকে কোলে তুলে নিল এবং তাকে নিয়ে এগিয়ে গেল জানালার পাশের বড় সোফাটার দিকে। বাইরে তখনো বৃষ্টির ফোঁটা কাঁচের ওপর আছড়ে পড়ছে। জানালার ঝাপসা কাঁচের ওপাশের আলো-আঁধারি পরিবেশ তাদের এই একান্ত মুহূর্তটাকে আরও বেশি রহস্যময় আর রোমাঞ্চকর করে তুলল।
সোফায় বসার পর মাহির ঐশীর মুখের ওপর ঝুলে থাকা ভেজা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার চোখের গভীর চাহনিতে এমন এক পরাধীন তীব্র আকর্ষণ ছিল, যা ঐশীর সমস্ত শালীনতার দেয়াল গুঁড়িয়ে দিল। মাহির ঐশীর গলার ভাজে, কাঁধে নিজের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া বুলিয়ে দিল। ঐশী ব্যথায় নয়, বরং এক তীব্র ভালোলাগায় শিউরে উঠে মাহিরের শার্টের কলার খামচে ধরল। তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এক অদ্ভুত অস্ফুট গোঙানি।
"মাহির... বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছি তোকে," ঐশী প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে ফিসফিস করল।
"ভালোবাসা তো কেবল শুরু হলো, ঐশী," মাহির তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল। তার হাতের প্রতিটি স্পর্শ যেন ঐশীর শরীরে নতুন প্রাণের সঞ্চার করছিল। তাদের পোশাকের ব্যবধান তখন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। একে অপরের নিঃশ্বাসের উত্তাপে পুরো ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
মাহির ঐশীর ঠোঁটে আবারও এক দীর্ঘ, গভীর চুমু এঁকে দিল। সেই চুমুর তীব্রতায় ঐশীর সমস্ত চেতনা অসাড় হয়ে এল। সে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে মাহিরের কোলের ওপরে আরও নিবিড়ভাবে মিশে গেল। বাইরে ঝড়ের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতরের আবেগও তার চরমে পৌঁছাল। শরীরের প্রতিটি রোমকূপ তখন কেবল মাহিরের স্পর্শ আর তার ভালোবাসার উষ্ণতা অনুভব করছে।
দীর্ঘ এক বছরের শূন্যতা, অভিমান আর না পাওয়ার বেদনা যেন এই একটিমাত্র রাতের প্রতিটি মুহূর্তে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছিল। তারা দুজনেই যেন একে অপরের ভেতরে হারিয়ে যাওয়ার এক অদম্য খেলায় মেতে উঠল। এই মিলনের গভীরতা তাদের সমস্ত অতীতে জমা হওয়া কষ্টকে এক নিমেষে অর্থহীন করে দিল।
বাইরের রাত তখন তার গভীরতম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মুষলধারে ঝোড়ো বৃষ্টির সেই তাণ্ডব ধীরে ধীরে কমে এসে এক মিষ্টি রিমঝিম শব্দে রূপ নিয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টের বিশাল শোবার ঘরের নরম বিছানায় দুজনে পাশাপাশি শুয়ে আছে। ঘরের চারপাশের বাতাসে কেবল তাদের গায়ের চেনা সুবাস আর দীর্ঘ নিশ্বাসের উষ্ণতা।
ঐশীর মাথাটা আলতো করে রাখা আছে মাহিরের প্রশস্ত বুকের ওপর। মাহিরের একটি হাত পরম যত্নে জড়িয়ে আছে ঐশীর কোমর, আর অন্য হাতটির আঙুলগুলো খেলছে ঐশীর খোলা চুলের মাঝখানে। ঘরের মৃদু নাইট ল্যাম্পের হলুদ আলোয় দুজনের মুখাবয়ব এক শান্ত আবেশে ঢাকা।
দীর্ঘ এক বছরের ব্যবধান, না পাওয়ার যন্ত্রণা আর ভুল বোঝাবুঝির পাহাড়—সব যেন এই একটিমাত্র রাতের শান্তিতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। ঐশী তার আঙুল দিয়ে মাহিরের বুকের ছাতি আলতো করে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে ফিসফিস করে বলল, "জানি না, এই সুখটা সত্যি নাকি কোনো সুন্দর স্বপ্ন। যদি সকালে ঘুম ভেঙে দেখি তুমি আবার হারিয়ে গেছ, তবে আমি কীভাবে বাঁচব, মাহির?"
মাহির সঙ্গে সঙ্গে তার হাত দিয়ে ঐশীকে আরও একটু শক্ত করে নিজের বুকের গভীরে টেনে নিল। সে ঐশীর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল। "ভুল করেও এমন কথা মুখে আনবি না, ঐশী। জীবনে অনেক ভুল করেছি, অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করেছি কেবল নিজের জেদ আর অহংকার পুষে রেখে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আর কখনো তোকে এক মুহূর্তের জন্যও দূরে সরিয়ে দেবো না। এই দূরত্ব আমাদের জীবন থেকে চিরতরে মুছে গেছে।"
মাহিরের কণ্ঠে এমন এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আর নিঃশর্ত ভালোবাসার সুর ছিল, যা ঐশীর মনে সব ধরনের ভয়ের চিরতরে অবসান ঘটিয়ে দিল। সে মাথা তুলে মাহিরের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো অনুশোচনা বা মেঘ ছিল না; কেবল ছিল এক অফুরন্ত জলের মতো স্বচ্ছ ভালোবাসা আর আগামীর প্রতি এক গভীর বিশ্বাস।
ঐশী মুচকি হেসে নিজের ঠোঁট দুটো রাখল মাহিরের চিবুকে। তারপর ফিসফিস করে বলল, "তাহলে আর দেরি কিসের? কাল সকালেই আমাদের নতুন জীবনের শুরু হোক। যে সময়টা আমরা হারিয়েছি, সুখে-দুঃখে তার দ্বিগুণ সময় আমরা একসঙ্গে কাটিয়ে দেবো।"
মাহিরের ঠোঁটে এক চিলতে সুন্দর হাসি ফুটে উঠল। সে ঐশীর চিবুকটা আলতো করে ধরে তার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল। সেই চুম্বনটি আগেরগুলোর মতো অধৈর্য ছিল না; সেটি ছিল এক শান্ত, গভীর ও চিরন্তন প্রতিশ্রুতির চুম্বন। যেন দুই নদীর মিলন ঘটে অবশেষে এক বিশাল সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে।
জানালার কাঁচ ভেদ করে আস্তে আস্তে পূর্ব আকাশে ভোরের প্রথম আলোর রেখা উঁকি দিতে শুরু করেছে। রাতের সেই কালো মেঘ সরিয়ে এক নতুন সোনালী রোদের ঝিলিক এসে পড়ল বিছানার ওপর।
দুজনেই জানালার দিকে তাকাল। ঝোড়ো বৃষ্টি পেরিয়ে অবশেষে এক স্নিগ্ধ, সুন্দর সকাল তাদের অভ্যর্থনা জানাতে হাজির হয়েছে। মাহির বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং ঐশীর হাত ধরে তাকেও টেনে তুলল নিজের সামনে। দুজনে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে একসাথে বাইরের ওই নতুন সকালের আলো গায়ে মাখল।
মাহির পিছন থেকে ঐশীকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে চিবুক রাখল। দুজনেই সমস্বরে অনুভব করল—তাদের এই ভালোবাসা আর কোনো ভুল বোঝাবুঝির বেড়াজালে কখনো আটকা পড়বে না। জীবনের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া সময়গুলো ফিরে পাওয়ার এই লড়াইয়ে তারা আজ সম্পূর্ণ বিজয়ী।
....